Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

“পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও সুব্রত মিত্র-সৌম্যেন্দু রায়েরা এমন সব কাজ করে গেছেন, যা আজও আমরা অতিক্রম করতে পারিনি”

জয়দীপ ব্যানার্জি

 




বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের প্রথিতযশা চিত্রগ্রাহক ও শিক্ষক সৌম্যেন্দু রায় চলে গেলেন। তাঁর ছাত্র জয়দীপ ব্যানার্জি স্মৃতিচারণ করলেন সৌম্যেন্দুবাবুর। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর তরফে জয়দীপবাবুর সাক্ষাৎকার নিলেন চলচ্চিত্রের একনিষ্ঠ ছাত্র সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

 

 

 

 

 

সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়: আপনাকে আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনি সৌম্যেন্দুবাবুকে বহুদিন শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন। আমাকে যা কৌতূহলী করছে তা হল উনি শিক্ষক হিসেবে কেমন ছিলেন। একটা সিনকে উনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন তা যদি আমাদের একটু বলেন।

জয়দীপ ব্যানার্জি: এই প্রসঙ্গে বলতে গেলে আমাকে একটু শুরু থেকে বলতে হবে৷ আমার পুরো পড়াশুনোটাই রূপকলা কেন্দ্র থেকে। যেদিন আমাদের এন্ট্রান্স পরীক্ষাটা হয়, বিশেষ করে লিখিত পরীক্ষাটা যেদিন হয়, সেদিনই আমি স্যারকে অর্থাৎ সৌম্যেন্দু রায়কে প্রথম দেখি। কিছুটা বড় হয়ে ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ অথবা ‘সোনার কেল্লা’ দেখার সূত্রে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে স্যারের নাম জেনেছিলাম। কিন্তু এত বড় একজন মানুষকে সামনে দেখার অভিজ্ঞতা সেবারই প্রথম।

রূপকলা কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার প্রথম ছ-মাস সব বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গে ক্লাস হত। তার পর থেকে যে যার মতো স্পেশালাইজেশনে চলে যেত। প্রথম প্রথম গুরুগম্ভীর মনে হত স্যারকে। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে স্যারের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত হল, সৌম্যেন্দু রায় শুধুমাত্র আমাদের শিক্ষক রইলেন না, বন্ধুও হয়ে উঠলেন। সিনেমা-সংক্রান্ত বিষয় হোক কি তার বাইরের সাহিত্য বা সঙ্গীত সংক্রান্ত কোনও বিষয়, এমন কোনও প্রসঙ্গ ছিল না যা নিয়ে স্যারের সঙ্গে আলোচনা হয়নি আমার। আমাদের ক্লাস দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলে, ধীরে ধীরে স্যারের সঙ্গে সম্পর্কটা অন্য জায়গায় পৌঁছে যায়। ক্লাস তো হতই। সিনেমা ছাড়াও আমি নিজে একটু লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, একটু গানও করতে চেষ্টা করি, ক্লাস শেষ হলে স্যার বলতেন— জয়দীপ, একটা গান গাও, শুনি। নতুন কী কবিতা লিখেছ? নতুন কিছু লিখলে স্যারকে শোনাতাম। স্যার নানারকম বই-পত্রপত্রিকা আমাকে পড়বার জন্য দিতেন। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা অন্যরকম পাওয়া।

একটা ঘটনার কথা বললে বোঝা যাবে সৌম্যেন্দু রায় মানুষটা কীরকম ছিলেন। একবার কোনও একটা কারণে আমার বাবা-মা স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কাজ ও নানা ব্যস্ততার কারণে সেটা আর হয়ে উঠছিল না। স্যার আমাকে একদিন ফোন করে বললেন— জয়দীপ প্ল্যান করছি, একদিন তোমাদের বাড়ি যাব। স্যার সত্যিই এলেন, সারাদিন আমাদের কত আড্ডা-গল্প হল, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন। ওইরকম একজন বড় মাপের মানুষ, কিন্তু কী সহজে শিক্ষক থেকে আমাদের বন্ধু, পথপ্রদর্শক ও প্রায় আপনজন হয়ে উঠেছিলেন, তা ভাবলে এখন অবাকই লাগে৷ আর শুধু আমিই নয়, স্যার চলে যাওয়ার পর অনেক সহপাঠীর স্মৃতিচারণ থেকে জানতে পারছি, স্যার অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গেও একইরকম অন্তরঙ্গ ছিলেন।

আরেকটা মজার ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ক্লাস চলাকালীন স্যারকে লিকার চা দেওয়া হত। স্যার জানতেন যে আমরা চা খেতে ভালবাসি। তাই উনি চা-টা মাত্র এক চুমুক বা দু-চুমুক খেতেন। তারপর সেই বাকি চা-টাই আমাদের তিন-চারজনের মধ্যে ঘুরত। এটা আমাদের প্রতিদিনের রুটিন ছিল। এইরকম টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা মনে আসছে।

আমি স্যারকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করেছি— Ray, A journey behind the lens। স্যারকে যেদিন প্রথমবার কথাটা বলি, অনুমতি চাই, স্যার একবাক্যে রাজি। বললেন— বলো, তুমি কবে থেকে কাজ শুরু করতে চাও। স্যারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন এমন অনেক টেকনিশিয়ানের ইন্টারভিউ নিয়েছি। প্রত্যেকেই বলেছেন তাঁদের সকলের সঙ্গে কীভাবে বন্ধুর মতো মিশে গেছেন সৌম্যেন্দু রায়। এই ডকুমেন্টারিটা করার সময় স্যারের শরীর খুব খারাপ। বিছানা থেকে সেভাবে উঠতে পারছেন না। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল। তাও আমাকে সময় দিয়েছেন। বলেছেন, জয়দীপ তুমি আমাকে শুধু একটা ফোন করে চলে এসো। কথায় বলে, গুরুভাগ্য মহাভাগ্য। এক্ষেত্রে আমার গুরুভাগ্যকে সত্যিই কত ভাল, তা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।

 

এবারে আমি একটা অন্য একটা বিষয়ে প্রশ্ন করি। সিনেমাটোগ্রাফি গত একশো বছরে তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকেও প্রচুর পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। বর্তমানে আমরা ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এসে দাঁড়িয়েছি। এবার সৌম্যেন্দু রায় যখন আপনাদের থিওরির ক্লাসগুলো নিতেন, অথবা অন ক্যামেরা অর্থাৎ হাতেকলমে ক্লাস করাতেন, আপনাদের সেই অভিজ্ঞতাটা ঠিক কেমন?

এক কথায় বলতে গেলে, সিনেমাটোগ্রাফির টেকনিকাল খুঁটিনাটি হাতে ধরে শিখিয়েছেন স্যার। তখনকার দিনে এখনকার মতো এত প্রযুক্তিগত সুযোগসুবিধে, এত উপকরণ কিছুই ছিল না। খুব সামান্য উপকরণ, মাত্র দুটো লাইট দিয়ে স্যার অদ্ভুত একটা আলো তৈরি করে নিলেন। ‘প্লেসমেন্ট অফ লাইট’ বলে একটা বিষয় রয়েছে। কোথায় কোথায় আলো বসাতে হবে, এই বোধটা থাকা খুব জরুরি। ছোট ছোট আলোর প্লেসমেন্টের সুন্দর একটা আবহ বানিয়ে ফেলতে পারতেন স্যার। ক্লাসে কোনওদিন স্যারকে আলোর প্লেসমেন্টে ভুল করতে দেখিনি। একবার আলোটা বসিয়ে ফেললে পরে সেটাকে সরিয়ে অন্যত্র বসানোর কোনও প্রয়োজন পড়ত না এবং স্যার সবটাই করতেন খুব কম আলো ব্যবহার করে। এই জায়গাটার ওপর আমি জোর দেব। কম বাজেটে, কম রিসোর্সেও কীভাবে একটা ভাল কাজ করা যায়, তা আমরা স্যারের কাছ থেকে শিখেছি। অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত আলো নিয়ে কাজ করাটা আমাদের স্কুলিং-এ নেই, আর আমাদের এই অভ্যাসের পুরো কৃতিত্বটাই সৌম্যেন্দু রায়ের।

এই মুহূর্তে একটা উদাহরণ দিতে পারি। আমাদের একটা ওয়ার্কশপে স্যার ক্লাস করাচ্ছিলেন, সেখানে একটি চরিত্র বসে আছে। চরিত্রের জামার রং ও পেছনের জানালার পর্দায় একটা কালার ওভারল্যাপ করছিল। ওয়ার্কশপ চলছে। চলতে চলতে স্যার আমাকে ডেকে বললেন, জয়দীপ, বলো তো কী ভুল আছে ফ্রেমে? আমি অবশ্য তখন সেই ভুলটা খুঁজে পাচ্ছি না। স্যার ভুলটা ধরিয়ে দিলেন। আমাদের চোখে যা ধরা পড়েনি, এক দেখাতেই স্যারের চোখ সেই বৈসাদৃশ্যটুকু ধরে ফেলেছিল। এইভাবে আমাদের নানা ছোট ছোট কিন্তু অত্যন্ত জরুরি জিনিস শিখিয়ে দিয়েছেন স্যার৷

অবশ্যই স্যারেরা কাজ করেছেন তা সেলুলয়েড মাধ্যমে। পরবর্তীকালে প্রযুক্তি পালটে গেছে৷ এখন তো পুরোপুরি ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ হচ্ছে। স্যার শেষের দিকে ডিজিটাল মাধ্যমেও বেশ কিছু কাজ করেছেন। তবে স্যারের ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গা বলতে গেলে তা অবশ্যই অ্যানালগ, ডিজিটাল নয়। স্যার ভারী ক্যামেরা খুব পছন্দ করতেন। স্যারদের সময় ওঁরা অ্যারিফ্লেক্স, মিচেল এইসব ভারী ক্যামেরায় কাজ করতেন। এখন ডিজিটাল ক্যামেরার ক্ষেত্রে যদি অ্যালেক্সা বা রেড, এইধরনের ক্যামেরাগুলোকে বাদ দিয়ে কথা বলি, তাহলে সব ক্যামেরাই সাধারণত খুব ছোট ও হালকা। স্যারের এইসব হালকা ক্যামেরা অ্যাডজাস্ট করতে বেশ অসুবিধাই হত। নতুন টেকনোলজির অবশ্য সুবিধে অসুবিধে দুটো দিকই থাকে। কিন্তু সব মিলিয়ে সৌম্যেন্দু রায়ের যুগের মানুষেরা ডিজিটালের চেয়ে সেলুলয়েড বা ফিল্মেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন।

আচ্ছা, আলোর প্রসঙ্গে মনে এল, সৌম্যেন্দুবাবু সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অনেকগুলো কাজ করেছেন। সুব্রত মিত্রের সঙ্গেও কাজ করেছেন৷ সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে প্রাকৃতিক আলোয় প্রচুর শুটিং হত, যা সমসাময়িক অন্যান্য বাংলা ছবির তুলনায় অনেকটাই বেশি। সৌম্যেন্দুবাবু ইন্ডোর আর আউটডোর লাইটিং-এর তফাত কীভাবে ম্যানেজ করতেন, বা প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আলোর উৎস, দু-ধরনের আলোর মিক্সিং কীভাবে করতেন?

আগেই বললাম, আলোর প্লেসমেন্টের ব্যাপারে স্যার ছিলেন নির্ভুল। ইন্ডোরে বাইরে থেকে কোনও প্রাকৃতিক আলো ঢুকছে, সেটাকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে পুরো লাইটিংটাকে গড়ে তোলা, স্যার প্রচুর ছবিতে বহুবার এই কাজ করেছেন এবং সেগুলো কাজ হিসেবে চমৎকার হয়েছে। স্যারদের সময়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হার্ড লাইট ব্যবহার হত, বাউন্স লাইট দিয়ে স্যার নিজেই প্রচুর শুট করেছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১০০ আইএসও থেকে ৪০০ আইএসও-তে ছবি শুট হত। কিন্তু এখন আমরা সর্বত্র সফট লাইট ব্যবহার করি, কারণ এখন ক্যামেরার সংবেদনশীলতাও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাই এখনকার সিনেমাটোগ্রাফিতে হার্ড লাইট বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা হয় না, করার দরকারও পড়ে না।

হার্ড লাইটের যুগেও স্যার ন্যাচারাল লাইট ও আর্টিফিশিয়াল লাইট খুব সুন্দরভাবে ব্যালেন্স করতেন। ইন্ডোরে তো বটেই, এমনকি আউটডোরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যখন দরকার হয়েছে, স্যার তা করেছেন৷ যেমন সূর্যের আলো এসে পড়েছে, তার সঙ্গে কিছু কিছু ফ্রেমে ছায়ার অংশও আছে। এবার ওই শ্যাডোটাকেও আমি যেন ডিটেলে পাই, তা নিশ্চিত করতে অসাধারণ এক্সপোজার দিয়েছেন৷ এই ঠিকঠাক এক্সপোজার দেওয়াটা তখন খুব একটা সামান্য ব্যাপার ছিল না, কারণ ওঁরা তো কী দাঁড়াল তা সরাসরি দেখতে পেতেন না, পুরোটাই মিটারের ওপর নির্ভর করতে হত। তা সত্ত্বেও স্যারের করা সাদাকালো ছবিগুলোর ক্ষেত্রে আমরা দেখব, ইন্ডোর হোক কিংবা আউটডোর, প্রতিটি ফ্রেমই আলাদা আলাদা করে ডিটেলে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এই সবই স্যারের কাছ থেকে প্রথমদিকের ক্লাসগুলোতেই শিখেছিলাম আমরা।

‘নয়া ভারাক’ নামে একটি উর্দু ম্যাগাজিন বেরোত। সেখানে সিনেমা সংক্রান্ত নানা লেখাপত্র থাকত। সেখানে আমি একবার জাভেদ সিদ্দিকির একটা লেখা পড়েছিলাম। ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র হিন্দি-উর্দু স্ক্রিপ্টও জাভেদ সিদ্দিকি ও সামা জায়দি যুগ্মভাবে লিখেছিলেন। কিন্তু জাভেদের ওপর আরও একটা ভার ছিল— অভিনেতাদের লখনৌ-এর উর্দু অর্থাৎ ‘খড়ি বোলি’ ঠিকঠাক শেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। যা হোক, ওই ম্যাগাজিনে জাভেদ নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে শুটিং হচ্ছে, সৌম্যেন্দুবাবু সমস্ত সেটটার লাইটিং করেছেন, বাইরে থেকে সূর্যের আলো ঘরের মধ্যে এসে পড়ছে। এর পরের শটটা হয়তো লখনৌতেই হবে। সত্যজিৎ সেইসময় সৌম্যেন্দুবাবুকে বললেন, রায়, তুমি আলোটা আরও দু-ফুট নিচে নামিয়ে দাও। জাভেদ সিদ্দিকি লিখছেন, সৌম্যেন্দু রায় সামান্য কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, কেন সত্যজিৎ এমন বলছেন, কারণটা সঙ্গে সঙ্গে বুঝেও গেলেন ও যা করার করেও দিলেন। অর্থাৎ ওঁদের স্কুলিংটা এমনভাবে হয়েছিল যে টেকনিকাল বিষয়ের সঙ্গে অ্যাসথেটিক্সটা কী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সেটা উনি সহজেই বুঝে নিলেন। জাভেদ সিদ্দিকি নিজে তখন বোঝেননি কেন এমন করা হল। পরে সৌম্যেন্দু রায় ওঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, পরের সিনটা লখনৌতে ন্যাচেরাল লাইটে হবে, তখন ডিসেম্বর মাস বা শীতকাল, তখন লখনৌতে সূর্য কতটা প্রখর থাকবে, কতটা আলো দেবে, সেসব মাথায় রেখে দুটো সিনের আলোর তীব্রতায় একটা সামঞ্জস্য রাখতে হবে৷ সত্যজিৎ এত ভেঙে কিছু না বললেও সৌম্যেন্দু রায় নিজের বোধ ও অভিজ্ঞতায় ঠিক বুঝে নিয়েছিলেন যে সত্যজিৎ কী চাইছেন, আর কেন-ই বা চাইছেন। জাভেদ সিদ্দিকি অবাক হয়েছিলেন সৌম্যেন্দুবাবু কীভাবে এটা বুঝলেন।

একদম তাই। আমি একইরকম অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। স্যার আমাদের বলেছিলেন। তখন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর শুটিং হচ্ছে। একজায়গায় সত্যজিৎ বলছেন, রায় তুমি লেন্সটা ৩৫ লাগাও। এখানে আমি একটু ডিটেল চাই। সত্যজিৎ স্যারকে রায় বলেই ডাকতেন। সেখানে গুপি বাঘা প্রথমবার আমলকি রাজার ঘরে আসছে। সেখানে সাদা দেওয়ালে কালো রঙে নানা মোটিফ আঁকা ছিল। আপনি যেমন বললেন, সৌম্যেন্দু রায় অল্পক্ষণ চিন্তা করে বুঝে নিলেন সত্যজিৎ কী চাইছেন। সত্যজিৎই পরে বলেছিলেন, তিনি দেওয়ালের মোটিফগুলোকে ভাল করে ধরতে চাইছিলেন, আর তিনি যা চাইছিলেন সৌম্যেন্দু রায় সেটাই করে দিলেন। দুজনের এই বোঝাপড়াটা অসামান্য ছিল। সেই বোঝাপড়ার ছাপটা ওঁদের সমস্ত ছবিতেই বোঝা যায়।

এখানে আমি আপনাকে একটা একটু ক্রিটিকাল প্রশ্ন করতে চাই। আপনি সৌম্যেন্দুবাবুর ছাত্র ছিলেন। পরে নিজেও আপনি একজন প্রথিতযশা সিনেমাটোগ্রাফার, অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। সত্যজিৎ রায় প্রথম পর্বে সুব্রত মিত্রর সঙ্গে কাজ করেছেন, পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন সৌম্যেন্দু রায়কে নিয়ে কাজ করলেন। দুজনেই সর্বোচ্চ মানের দুজন সিনেমাটোগ্রাফার, আর সত্যজিৎ রায়ের স্টাইলও নিশ্চয়ই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। তাই তাঁদের মধ্যে ওইভাবে তুলনা করা হয়তো উচিত নয়। তাও নিজে একজন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে এই দুই পর্বের মধ্যে কোনও বিশেষ ভিসুয়াল এলিমেন্টের ফারাক কি আপনার চোখে পড়েছে?

আসলে সৌম্যেন্দু রায়ের জার্নিটা না বললে এই ব্যাপারটা ঠিক বোঝানো যাবে না। সুব্রত মিত্র যখন ‘পথের পাঁচালি’ শুট করছেন, সৌম্যেন্দু রায় তখনও ইউনিটে আছেন, কিন্তু তখন তিনি একজন ক্যামেরা কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছেন। পথের পাঁচালিতে পুরোপুরি ন্যাচারাল আলোয় গোটা ছবি শুট করা হয়। সেদিক থেকে এই ছবির চিত্রগ্রহণ ইউনিক ছিল। সৌম্যেন্দু রায় খুব ভালভাবে সুব্রত মিত্রর কাজ লক্ষ করতেন। স্যার বলতেন যে, মেঘলা আলোতে কীভাবে এত সুন্দর ছবি তোলা যায় তা আগে কেউ বিশ্বাস করতে পারত না৷ সেই সময় সুব্রত মিত্রর কাজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সৌম্যেন্দু রায়। এতখানি কাজ শিখেছিলেন যে একটা গুরু-শিষ্য পরম্পরা তৈরি হয়ে গেছিল। পরবর্তীকালে সৌম্যেন্দু রায় যখন ‘তিন কন্যা’ ছবি থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করা শুরু করলেন, তিনি কিন্তু সুব্রত মিত্রর স্কুলিং বা তাঁর ঘরানাটাই বয়ে নিয়ে গেছেন। তার সঙ্গে অবশ্যই সৌম্যেন্দু রায়ের নিজের স্বাতন্ত্র্য যুক্ত হয়েছে। ফলে সিনেমাটোগ্রাফার সুব্রত মিত্রর আমলে সত্যজিৎ রায়ের ছবি আর পরবর্তীকালে সৌম্যেন্দু রায়ের আমলে সত্যজিতের ছবি, এই দুইয়ের মধ্যে কিন্তু কোনও ডিপারচার বা বড়সড় তফাত আমার চোখে পড়ে না৷ তবে ঘরানা সুব্রত মিত্রের হলেও সৌম্যেন্দুবাবু স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে নিজের মতো করেই ছবি শুট করেছেন। পরবর্তীকালে সৌম্যেন্দুবাবু আবার পূর্ণেন্দু বোসের মতো একজন দক্ষ অ্যাসিস্ট্যান্ট পেয়েছিলেন। স্যার নিজের বারবার পূর্ণেন্দুবাবুর কথা বলেছেন।

বুঝতে পেরেছি। সৌম্যেন্দুবাবু সুব্রত মিত্রের ধারাটাই বহন করে নিয়ে গেছেন৷ আচ্ছা, সিনেমার অনেকগুলো পর্বান্তর নিয়ে আমরা কথা বললাম। একইভাবে সিনেমা সাদাকালো ছবি থেকে রঙিন ছবির যুগে পৌঁছল। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা রঙিন হল সৌম্যেন্দু রায়ে হাত ধরেই। উনি কি এই ট্রানজিশনটা নিয়ে আলাদা করে আপনাদের কিছু বলেছিলেন?

এই বিবর্তনটা তো আসলে খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসেছে, তাই এটা নিয়ে আলাদা করে তেমন কিছু কথা হয়নি৷ অনেকের অবশ্য একটা রিজার্ভেশন ছিল, যে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে কেউ বেশি স্বচ্ছন্দ। স্যার কিন্তু রঙিন ছবিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই স্বীকার করেছিলেন, কোনও অসুবিধে হয়নি বা আলাদা করে কোনও মতামতও প্রকাশ করেননি। অন্তত আমি স্যারকে এই ট্রানজিশনটা নিয়ে কিছু বলতে শুনিনি৷ স্যার তো কালারে অসংখ্য ছবি শুট করেছেন, আমরা সবাই জানি সেসব বেশিরভাগই বিখ্যাত ছবি। স্যার বলেছিলেন, মানিকদাই আমাকে বলেছিলেন যে তুমি সাদাকালোতে ছবি শুট করছ নাকি কালারে করছ, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবে না, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে যেভাবে কাজ করতে সেভাবেই করে যেও। ফলে স্যার আলাদা করে কোনওদিন ভাবেনইনি যে তিনি কালারে শুট করছেন ও তাঁকে আলাদা করে তা নিয়ে সচেতন হতে হবে৷ আমার ডকুমেন্টারিতেও এই কথাটা উঠে এসেছে।

একটা কথা মনে এল, সৌম্যেন্দু রায় তো সত্যজিৎ রায় ছাড়াও অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের ছবিতে কাজ করেছেন। তপন সিংহ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তরুণ মজুমদার ছাড়াও ভারতের বড় বড় চলচ্চিত্রকার সৌম্যেন্দুবাবুকে নিজেদের ছবিতে ডেকে নিয়ে গেছেন। তা বিভিন্ন পরিচালকের কাজের ধারা নিয়ে কি কখনও সৌম্যেন্দুবাবু আপনাদের কিছু বলেছিলেন?

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করার খুব ইচ্ছে ছিল স্যারের। ঋত্বিক যেভাবে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করতেন… লো অ্যাঙ্গেল, ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, হঠাৎ করে ক্লোজে চলে গেল, এসব স্যারকে খুব আকৃষ্ট করত। ঋত্বিকের অ্যাপ্রোচটা স্যারকে খুব টানত। স্যার বলেছিলেন, আমার একটা আক্ষেপ থেকে গেল যে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আমার কাজ করা হল না। তবে যেমন আপনি বললেন, স্যার বড় বড় পরিচালকের সঙ্গে নানারকম কাজ করেছেন। তরুণ মজুমদারের ‘কুহেলি’ ছবিতে কাজ করেছেন, তপন সিংহের ‘এক ডক্টর কি মৌত’, ‘হুইলচেয়ার’-এ কাজ করেছেন। তরুণবাবুর সঙ্গে তো অজস্র ছবিতে কাজ করেছেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘চরাচর’ ছবিতে কাজ করেছেন, সেখানে কি অসাধারণ কালারের ব্যবহার!

একটা অন্য প্রসঙ্গ মনে পড়ল। আমাদের ছেলেবেলায় দূরদর্শনে হিন্দিতে একটা পাপেট শো হত। এনএফডিসি-র প্রযোজনা। একেবারে নয়ের দশকের শুরুর দিকে, আমরা তখন খুবই ছোট। অনুষ্ঠানটার নাম ছিল ‘পোটলি বাবা কি’। পরিচালক ছিলেন সঞ্জিত ঘোষ, তাতে পুতুল দিয়ে ‘আলিবাবা’, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’, আলাদিন ইত্যাদি পাপেট শো দেখানো হতো। সেখানেও সৌম্যেন্দু রায় ক্যামেরায় ছিলেন…

হ্যাঁ, স্যার ওখানে কাজ করেছিলেন। আর শুধু ওই শো-টা নয়, স্যার সম্ভবত দূরদর্শনে পাঁচ-ছটা ধারাবাহিকেও কাজ করেছিলেন, সপ্তাহে একদিন করে দেখানো হত। যেমন, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী দূরদর্শনের জন্য ‘অপরিচিতা’ বলে একটা ধারাবাহিক তৈরি করেছিলেন, তপন সিংহ বানিয়েছিলেন ‘হুতোমের নকশা’ বলে একটা ধারাবাহিক, দুটোতেই সৌম্যেন্দু রায় কাজ করেছেন।

আচ্ছা, যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, সৌম্যেন্দুবাবুর কোন ছবির কাজগুলো আপনার ব্যক্তিগতভাবে বেশি পছন্দের, সেক্ষেত্রে আপনি কোন ছবিগুলোকে এগিয়ে রাখবেন?

স্যারের কাজের মধ্যে প্রথমেই আমি রাখব ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’কে, ঠিক তার পরেই রাখব ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। স্যারের করা এই দুটো ছবি আমার খুব প্রিয়। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ আমার অসাধারণ লাগে, এখনও। ‘সোনার কেল্লা’ও খুব প্রিয় ছবি। তারপরে রাখব ‘কুহেলি’। স্যারের প্রথম চারটে ছবি বললে আমি এই চারটে ছবিকেই সবচেয়ে প্রথমে রাখব। ছবিগুলো আগে দেখেছি, ভাল লেগেছে, পরবর্তীকালে যখন যে মানুষটা এইসব ছবি শুট করেছেন তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি আর তাঁর কাছে এইসব ছবির শুটিং-এর গল্প শুনছি, এটাই আমার কাছে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এ জঙ্গলের মধ্যে ভূতেরা রাজার দৃশ্য শুট হচ্ছে, চারধারে জোনাকি জ্বলছে, আসলে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে ভেতরে টর্চ জ্বালিয়ে কাপড়ের ফুটো দিয়ে টর্চ অন-অফ করা হচ্ছে। আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ‘অভিযান’ ছবিতে একটা দৃশ্য আছে, যে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় একটা গ্রামকে দেখা যাচ্ছে। সত্যজিৎ রায় স্যারকে বলে দিয়েছিলেন, যে গাড়ির হেডলাইটই একমাত্র সোর্স, আর কোনও আলো থাকবে না, ঘুটঘুটে অন্ধকার গ্রামকে শুধু হেডলাইটের আলোতেই দেখা যাবে। স্যার তখন কী করেছিলেন, বুদ্ধি করে এরোপ্লেনের ল্যান্ডিং লাইট হেডলাইটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। কত বেসিক জিনিসপত্র দিয়ে স্যারদের কাজ করতে হয়েছে, ভাবাই যায় না৷ স্যার বলতেন, এখন হাতের কাছে এত সুযোগসুবিধে রয়েছে যে মাথার কাজ তেমনভাবেই করতেই হচ্ছে না, টেকনোলেজির বাড়বাড়ন্ত ঘটে যাওয়ার ফলে ক্রিয়েটিভ দিকটা কোথায় যেন একটু ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

এছাড়া কাহিনিচিত্র ছাড়াও সত্যজিতের তৈরি ‘টু’, ‘পিকু’ আর ‘সদগতি’-তে স্যারের করা কাজ আমার খুব প্রিয়।

তার মানে দেখা যাচ্ছে প্রযুক্তির খামতিটুকু তাঁরা কীভাবে নিজের বুদ্ধিবৃত্তি এবং নান্দনিক বোধ দিয়ে বারবার অতিক্রম করে যেতেন। একটা প্রশ্ন মাথায় এল, রূপকলা কেন্দ্রে আপনারা যখন পড়াশুনো করছিলেন, শেষে আপনাদের একটা ডিপ্লোমা ফিল্ম করতে হত। তখন কি সৌম্যেন্দুবাবু আপনাদের কোনও আইডিয়া দিতেন, নাকি আপনারা স্বাধীনভাবেই কাজটা করতেন?

না, ডিপ্লোমা ফিল্ম আমরা স্বাধীনভাবেই করতাম। শুধু স্যারের সঙ্গে আমাদের একটা স্ক্রিপ্ট সেশন হত। স্যার শুনতেন, আমরা কী করছি দেখতেন, তার ওপরে মতামত দিতেন, কিন্তু আমরা শেষমেশ স্বাধীনভাবেই কাজ করতাম। আমাদের ওপর কেউ কিছু চাপিয়ে দিতেন না। সেকেন্ড সেমিস্টারে একটা ডায়লগ প্রোজেক্ট হয়, যেখানে আমরা ছবিতে ডায়লগ ইনক্লুড করে শুট করি সেখানে স্যার নিজের আমার শুটিং দেখতে গিয়েছিলেন৷ আমার আলো করা দেখলেন। আমার ডিপ্লোমা ফিল্মের সময় উনি অবশ্য যেতে পারেননি। তবে পরবর্তীতে ছবিটা দেখার পরে, ওঁর কী মনে হয়েছে সেগুলো তো অবশ্যই বলেছেন। মনে আছে, স্যার আমাকে বলেছিলেন, জয়দীপ, তুমি যেমন কবিতা লেখো, তেমনই আলো আর লেন্স দিয়েও তোমাকে একধরনের কবিতাই লিখতে হবে। আসলে আমরা যখন ছবিতে অন্ধকার তৈরি করি, সেটাও আমরা আলো দিয়েই তৈরি করি। তাই তো? আমরা তো আর অন্ধকারকে অন্ধকারে শুট করি না, অন্ধকারকে শুট করি আলো দিয়েই। তাই স্যার আমাকে বলতেন, তোমাকে কবিতা লিখতে হবে আলো আর লেন্স দিয়েই। এই কথাটা আমি বরাবর মনে রাখি আর সেইমতো চেষ্টা করে যাই।

বাহ! উপমাটা বড় চমৎকার। খুব ভাল লাগল আপনার সঙ্গে কথা বলে। একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। সৌম্যেন্দুবাবুকে নিয়ে আপনার ডকুমেন্টারিটি— Ray, A journey behind the lens, এটা আমরা কীভাবে দেখতে পারি?

আমার ছবিটা? ওটা আসলে এই মুহূর্তে নানা ফেস্টিভ্যালে ঘুরছে। একটা পরিকল্পনা তো আছেই কলকাতায় দেখানোর। এছাড়া আমি যদি ছবিটা কোনও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দিই, আমি অবশ্যই জানাব। ছবিটার জন্য মহারাষ্ট্র থেকে একটা পুরস্কার আমি পেলাম। বাংলা ভাষায় আমার ছবিটাই বেস্ট ডকুমেন্টারি হিসেবে দ্বিতীয় পুরস্কৃত হয়েছে। নিজের ছবি বলে বলছি না, তবে স্যারকে নিয়ে আমার কাজ একটা স্বীকৃতি পাচ্ছে, এটা আমার কাছে একটা তৃপ্তির জায়গা। স্যারকে নিয়ে তো আগেও বেশ কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু আমার কাজটা একেবারেই সিনেমাটোগ্রাফি-কেন্দ্রিক এবং স্যারের জার্নিটা ধরার চেষ্টা করেছি। সঙ্গে স্যারের ছবিগুলো নিয়ে একটা বিশ্লেষণ রয়েছে। আসলে সিনেমাটোগ্রাফি কী, অনেকে এখনও সেটা ভাল করে বুঝতে পারে না। আমরা স্যারের ছবিগুলোর ছোট ছোট জায়গা তুলে ধরেছি, যেখানে স্যার সিনেমাটোগ্রাফির দিক থেকে সেগুলো ধরে ধরে ব্যাখ্যা করছেন।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র মেমোরি গেমের দৃশ্যটা। বিখ্যাত শট একটা। সেখানে প্রত্যেকে কয়েকটা করে নাম বলছে আর ক্যামেরা এক এক করে তাদের মুখে প্যান হচ্ছে৷ এখন হলে আমরা অন্য গ্যাজেট ব্যবহার করতাম। কিন্তু স্যার ওটা নিজে হাতে করে ক্যামেরা প্রত্যেকের মুখে মুখে ধরেছিলেন। ক্যামেরা নিয়ে তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরতে হয়েছিল স্যারকে। অত্যন্ত কঠিন একটা শট, দেখলে বোঝা যায় না। স্যারের ক্যামেরা হ্যান্ডলিং অর্থাৎ ক্যামেরাকে গ্রিপে এনে ঠিকঠাক চালানো, এই কাজটা স্যার খুব মসৃণভাবে করতে পারতেন। ক্যামেরার চলনে কোনও জার্ক থাকত না। মনে হত যেন কবিতার মতো ক্যামেরাটা মুভ করল। স্যার যখন আমাদের ক্লাস নিচ্ছেন, তখন তো স্যারের অনেক বয়স, তাও ক্যামেরা হাতে নিলেই হাত একদম স্টেডি। আমরা স্যারকে বলতাম, আপনার হাতে স্বয়ং বিশ্বকর্মা রয়েছেন৷ স্যারকে এত কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে একটা বিশাল প্রাপ্তি।

স্যারের প্রসঙ্গে আরেকটা কথা মনে পড়ছে। ‘ভোম্বল সর্দার’ ছবির পরিচালক ছিলেন নৃপেন গাঙ্গুলি। আমরা তাঁকে ন্যাপাদা বলে ডাকতাম। আমার ডকুমেন্টারিটার সময় ন্যাপাদাকে ইন্টারভিউ করেছিলাম। উনি বলছিলেন, ওঁর পরিচালক হওয়ার পেছনে সৌম্যেন্দু রায়ের একটা বড় অবদান আছে। ভোম্বল সর্দার ছবিতে সৌম্যেন্দু রায়ের পরামর্শ ন্যাপাদাকে অনেক সাহায্য করেছিল। যেমন ন্যাপাদা বলেছিলেন, সৌম্যেন্দু রায় সিনেমার একেকটা চরিত্রের মনস্তত্ত্ব খুব ভাল বুঝতেন, তার শেডসগুলো কী কী হতে পারে এবং সেই অনুযায়ী আলো করতেন। ন্যাপাদার কথা শুনতে শুনতে আমার ‘মণিহার’ ছবিটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ‘অশনিসংকেত’-এও দুর্ভিক্ষের মধ্যে ভুগতে থাকা মানুষগুলোর চারিদিকে ওইরকম আলো-আঁধারিও কিন্তু সৌম্যেন্দু রায়ের এক সচেতন নির্মাণ, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকটার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা। একইভাবে ‘অভিযান’ ছবিতে জ্ঞানেশ মুখার্জি একটা লাইটার জ্বালেন, এক মুহূর্তের সেই আলোর ঝলকানি তাঁর মুখে এসে পড়ে, ছবিতে ওই বিশেষ উন্মোচন বা ইঙ্গিত নির্মাণে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্রভাষাকে উত্তীর্ণ করে দেয় এই দৃশ্য।

শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে গেল, আমরা ছোটবেলায় ‘ডাবল বিল’ হিসেবে সিনেমা হলে প্রথমার্ধে সত্যজিৎ রায়ের তথ্যচিত্র ‘সুকুমার রায়’ ও দ্বিতীয়ার্ধে ‘ভোম্বল সর্দার’ দেখেছিলাম। যাই হোক, আপনি মেমোরি গেমের কথা তুললেন বলে মনে পড়ল, এক-দু-মাস আগেই ওয়েস অ্যান্ডারসনের একটা ছবি বেরিয়েছে, ‘অ্যাস্টরয়েড সিটি’। সেই ছবিতে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র মেমোরি গেমের দৃশ্যটা প্রায় হুবহু পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আজ থেকে কত বছর আগে যে সমস্ত ফ্রেমিংগুলো ওঁরা করেছিলেন, সেগুলো এখনও কতখানি প্রাসঙ্গিক।

একই কথা আমারও মনে হয়। স্যারেরা যেসব কাজ করে গিয়েছেন, তার এত বছর পরেও আমরা যে খুব একটা নতুন কিছু দেখাতে পেরেছি বলে আমার মনে হয় না। স্যারের কাছে যা দেখেছি, যা শিখেছি সেই সময়ের ছবিগুলো থেকে, তাই কিছুটা এদিক-ওদিক করে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমরা রিক্রিয়েট করার চেষ্টা করছি। স্যার বারবার বলতেন, ক্যামেরা মুভমেন্ট যেন বোঝা না যায়। অর্থাৎ ক্যামেরা যে চলছে বা নড়ছে, সেটা দর্শককে বুঝতে দেওয়া যাবে না। ফর্ম কখনও কন্টেন্টকে ব্যাহত করবে না, বরং প্রচ্ছন্নভাবে বিষয়ের সঙ্গে মিশে যাবে। আমরা সবসময় সেটা মেনে চলার চেষ্টা করেছি। যদি শুধু সিনেমাটোগ্রাফির কথাই ধরি, আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও সুব্রত মিত্র-সৌম্যেন্দু রায়েরা এমন সব কাজ করে গেছেন, তা আজও আমরা অতিক্রম করতে পারিনি।

আমরা, রূপকলা কেন্দ্রে, স্যারের সঙ্গে