Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

উপনিবেশের উত্তরাধিকার সুরক্ষিত করতে ‘উপনিবেশ’-বিরোধী আইন আনছে মোদি সরকার

বহ্নিহোত্রী হাজরা

 


অধিকাররক্ষা আন্দোলনের কর্মী, বন্দিমুক্তি আন্দোলনের সাথী, বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের কর্মী যাঁরা মানুষের জীবনজীবিকা থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়ছেন, এককেন্দ্রিক হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের প্রকল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাঁরা বহুত্বের কথা বলছেন, নিপীড়িত জাতিসত্তার আওয়াজকে যাঁরা তুলে ধরছেন, জনস্বাস্থ্যের সংজ্ঞা পাল্টে স্বাস্থ্য নজরদারি সহ মানুষের ন্যূনতম মানবাধিকার অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে যাঁরা লড়ছেন, রাষ্ট্রের প্রতিদিন নানা কায়দায় মানুষকে বে-নাগরিক করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়ছেন বা উপনিবেশের ধারাবাহিকতায় দেশকে একচেটিয়া কর্পোরেটদের হাতে বিকিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়ছেন বা এমনকি যাঁরা লেখালেখি এবং চর্চার মধ্যে দিয়েও সত্যসন্ধান করছেন, নতুন কিছু ভাবছেন— তাঁদের সকলকে কার্যত কারাগারে রাখতে চাইছে শাসকরা। উপনিবেশ বিরোধিতার নাম করে যে-কোনও বিরুদ্ধ স্বরকে বুটের তলায় পিষে মেরে ফেলার এবং ভয়াবহ এককেন্দ্রিক পুলিশি রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্যই এত আয়োজন

 

যে রাজকে যুদ্ধে জেতাতে এই সেদিন পর্যন্ত তিনি সৈন্য সংগ্রহ করেছেন, সেই রাজ যুদ্ধশেষে, এমন তাড়াহুড়ো করে, এত ভয়াবহ দমনমূলক আইন পাশ করল— এ লজ্জা তিনি রাখবেন কোথায়?

যে-দেশনেতার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠির এই উক্তি তিনি হলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতের জাতীয় নেতারা পুরোদস্তুর সাহায্য করেছিলেন ব্রিটিশদের। তার পুরস্কার হিসেবে ব্রিটিশরা একহাতে ধরাল মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আর অন্যহাতে রাওলাট আইনের মতো দমনমূলক আইন। এই আইন অনুযায়ী সন্দেহজনক ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ আদালত গঠন এবং বিনা বিচারে আটক রাখার বিধান ছিল। এমনকি রাজদ্রোহমূলক বই সঙ্গে থাকলেও বিনা বিচারে আটক রাখার বন্দোবস্ত ছিল। হ্যাঁ দেশের মানুষের মধ্যে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ খুঁজে বেড়ানোর এক নতুন অধ্যায় শুরু হল সেদিন। কিন্তু ৪৭-এই এর শেষ নয়। সিডিশন আইন কিন্তু আজও বর্তমান। নাম বদলেছে, আবারও বদলাবে, কিন্তু কাঠামোটা বজায় রয়েছে অবিকল। ‘টাডা-পোটা-ইউএপিএ’ পেরিয়ে আজ ‘সিডিশন’ আইন তার খোলসটা বদলে ন্যায়সংহিতা-দণ্ডসংহিতা ইত্যাদি নাম নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হতে চলেছে। ১১ আগস্ট ২০২৩-এ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আইপিসি, সিআরপিসি এবং এভিডেন্স অ্যাক্ট প্রতিস্থাপনের জন্য লোকসভায় তিনটি নতুন বিল পাশ করানোর প্রস্তাব এনেছেন। অজুহাত হিসেবে বারবার আনছেন উপনিবেশ-বিরোধিতার কথা। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

 

স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন বাতিল কি সত্যিই উপনিবেশ-বিরোধী পদক্ষেপ?

জম্মু, কাশ্মির এবং লাদাখের মাননীয় লেফটেন্যান্ট গভর্নর বলেছিলেন— “ওদের শ্বাস ফেলার জায়গাটুকুও দেওয়া যাবে না!”— আক্ষরিক অর্থেই যেন তা বাস্তবায়িত হতে চলেছে। কীভাবে?

ন্যায়সংহিতার ১১১ ধারাতে ‘সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ’ সম্পর্কিত সংজ্ঞার্থ, ব্যাখ্যা পুরোপুরিভাবে বিশেষ আইন ইউএপিএ (UAPA)-র যাবতীয় দমনমূলক ধারার সঙ্গে প্রায় এক এবং কোনও-কোনও ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত। ফলে ইউএপিএর মতো বিশেষ আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে যাবতীয় যা বাধা ছিল— অনুমতির, বন্দির রিভিউ করার অধিকার ইত্যাদি— সবই উঠিয়ে দেওয়া হল। সেই সঙ্গে অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য বিশেষ আইনের ধারাও নাগরিক সুরক্ষা বিলে ১০৭ ধারায় যুক্ত করা হয়েছে।

“সন্ত্রাসবাদী” কে? ন্যায়সংহিতার ধারা ১১১-তে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা যা দেওয়া হয়েছে তা পড়লে আপনি চমকে যাবেন। কারণ, যে কোনও প্রতিবাদকে সন্ত্রাসবাদ তকমা দিয়ে দমনপীড়ন নামিয়ে আনার পথকে প্রশস্ত করেছে এই ধারা ও তার ব্যাখ্যা। দু-তিনটে উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ধারায় রয়েছে, পাবলিক অর্ডারে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে যে বা যারা তারা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অভিযুক্ত হবে। পাবলিক অর্ডারে বিঘ্ন বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে? ধরুন কোনও একটি সেক্টরে শ্রমিকরা ন্যায্য দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছে। আন্দোলন দমন করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবায় বাধা দেওয়া হচ্ছে এই অজুহাতে, নতুন বিল অনুসারে, আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসবাদী ধারায় অভিযুক্ত করতে পারবে সরকার। ইউএপিএ-র আওতায় মূলত সহিংস কার্যকলাপকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হিসেবে ধরা হয়েছিল। এই পরিবর্তিত আইনে সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় শান্তিপূর্ণ, অহিংস কাজকেও সন্ত্রাসবাদ হিসেবে দেগে দেওয়া হচ্ছে। বক্তৃতা বা লেখার মাধ্যমে মতপ্রকাশ করা হলেও তা সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। নতুন আইনে একটি কাজ যদি “দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বা সামাজিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল বা ধ্বংস করে” তাহলে তা সন্ত্রাসবাদী কাজ। অর্থাৎ ডঃ বিআর আম্বেদকরের ধারায় “জাত-পাত নির্মূল করার আহ্বান” এবং পিতৃতন্ত্র বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনকেও এবার সন্ত্রাসবাদ বলে দেগে দিতে পারে শাসকরা তাদের মর্জিমাফিক। এই তিন বিলে এমন ১২টি পরিবর্তন আনা হচ্ছে তা কার্যত দেশকে একটা পুলিশি রাষ্ট্রের চেহারা দেবে। ভিন্ন মতকে দমন করতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাজনিত কারণে বিরোধীদের জেলে পুরতে বা শাসক-বিরোধী চিন্তাভাবনার সুযোগটুকু পর্যন্ত যাতে না থাকে তা নির্দিষ্ট করতেই আনা হচ্ছে এই পরিবর্তন।

 

পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা?

এই আইন অঢেল ক্ষমতা দেবে পুলিশের হাতে। কোনও নাগরিক যদি পুলিশের কোনও নির্দেশকে প্রশ্ন করে বা অমান্য করে তাহলে পুলিশের হাতে সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে সেই ব্যক্তিকে আটক করার। আটক কেন করছে তার কোনও কারণ দেখানোর প্রয়োজনও হবে না। যদিও সংবিধানের বিচারে এ-ধরনের গ্রেফতারি আসলে জবরদস্তি। কিন্তু এই আইনের ভাষ্য দেখে মনে হচ্ছে যে গ্রেফতারের জন্য সাংবিধানিক বিধি না মেনেই আটক করা যেতে পারে, এতটাই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশ আধিকারিকদের হাতে। এছাড়া পুলিশি হেফাজতে বন্দিকে রাখার যে সময়সীমা ছিল তা আর থাকছে না। ফলে গোটা তদন্তকালে অভিযুক্তদের মাথায় পুলিশি হেফাজতের হুমকি ঝুলবে। পুলিশকে যথেচ্ছ অধিকার দেওয়া হয়েছে তার খেয়ালখুশিমতো বিচারাধীন বন্দিকে হাতকড়া পরানোরও। এভাবে অপরাধীর সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া গেল। কাউকে সন্দেহ হলেই তাকে আটক করা যাচ্ছে এবং বিনা প্রমাণে জেলে রাখা যাচ্ছে। উপরন্তু বিচারাধীন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্র ধরেই নিচ্ছে সে অপরাধী। প্রমাণ করার দায় তার, যে সে নিরপরাধ। এ কি পরাধীন ভারতবর্ষের স্মৃতিই উস্কে দেয় না?

ন্যায়সংহিতার ধারা ৩৪৯-এ বলা হয়েছে— “একজন ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্ত ব্যক্তি সহ যে-কোনও ব্যক্তিকে নমুনা স্বাক্ষর বা আঙুলের ছাপ বা হাতের লেখা বা ভয়েস নমুনা দিতে নির্দেশ দিতে পারেন।” এমনকি যে-ব্যক্তি ফৌজদারি কার্যবিধি (আইডেন্টিফিকেশন) অ্যাক্ট, ২০২২-এর আওতায় পড়েন না তিনিও এখন ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দিলেই তার জৈবিক তথ্য (আঙুলের ছাপ, গলার স্বর ইত্যাদি) দিতে বাধ্য। নাগরিকদের প্রাইভেসির কোনও অধিকার রাষ্ট্র সুরক্ষিত রাখবে না। মনে পড়ছে ‘নয়া বিশ্বব্যবস্থা’র প্রবক্তা ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের প্রধান ক্লাউস শোয়াবের সেই বিখ্যাত উক্তি। “You’ll own nothing, will have no privacy, still you will be happy!” অর্থাৎ নিজের সমস্ত তথ্য পুলিশি রাষ্ট্রের হাতে সঁপে দিয়ে আপনি সুখী থাকুন। আজকের বিশ্বব্যবস্থার রূপকারেরা আপনার নাগরিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে আপনার সুখ-দুঃখের সংজ্ঞা পর্যন্ত বদলে দেবে! ভাবুন তাহলে কীভাবে নজরদার পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে পা বাড়ানোর সিঁড়ি তৈরি হচ্ছে।

 

রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারা বাতিল? নাকি দানবীয় প্রত্যাবর্তন?

পুরনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইনের সঙ্গে তুলনা করে যদি দেখেন তাহলে বুঝবেন এর ৮০ শতাংশই অপরিবর্তিত। আর যে ২০ শতাংশ পরিবর্তন করা হয়েছে তা আরও স্বৈরাচারী এবং দমনমূলক। এই প্রতিটি পরিবর্তন আপনাকে রাওলাট আইনের কথা মনে করিয়ে দেবে। স্বাধীন দেশে এক খোলা কারাগারে বাস করতে আপনাকে বাধ্য করা হবে এই আইন বলে।

রাষ্ট্রদ্রোহিতা বাতিলের আওয়াজের আড়ালে ‘ন্যায়সংহিতা’য় অন্য ধারায় (১৫০; তাও আবার ব্যাখ্যা অংশটি অসম্পূর্ণ) আরও ভয়ঙ্করভাবে দেশদ্রোহিতার ধারণাকে স্থান দেওয়া হল, যা সে-যুগের রাওলাট আইনকেও হার মানায়। পাঁচটি কার্যকলাপকে অপরাধমূলক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হল: (১) ‘বিধ্বংসী কার্যকলাপ’; (২) ‘বিচ্ছিন্নতা’; (৩) ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ’; (৪) ‘ভারতের সার্বভৌমত্ব, একতা ও অখণ্ডতা বিপন্ন করার পদক্ষেপ’ এবং (৫) ‘সশস্ত্র বিদ্রোহ’। অস্পষ্ট এবং অনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে দিয়ে এই ধরনের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ করা হতে পারে। বারেবারেই বলা হয়েছে মানুষের মধ্যে এই ধরনের অনুভূতিকে বাড়িয়ে তোলাও সন্ত্রাসবাদী কাজ; আর প্রচারের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমের প্রয়োগ ইত্যাদিকেও এর আওতায় ধরা হয়েছে।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এই নিষিদ্ধ কার্যকলাপ এবং তার পদ্ধতি এতটাই বিস্তৃত এবং অস্পষ্ট যে যখনতখন যে-কোনও সরকার এই আইনকে কাজে লাগিয়ে এমনকি গণতান্ত্রিক এবং অহিংস ভিন্ন কণ্ঠস্বর ও বিরোধিতার প্রকাশকেও দমন করতে সক্ষম হবে। আর বিজেপির হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের বিরুদ্ধে যারাই বহুত্বের কথা বলবে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এই আইনের ছত্রে ছত্রে।

এককেন্দ্রিকতার স্পষ্ট বার্তা বহন করে এই আইনগুলির নামকরণ যাকে ইতিমধ্যেই বিরোধীদের অনেকেই বলেছেন অসাংবিধানিক। ভারতের মতো বহুজাতি-অধ্যুষিত দেশে হিন্দিতে নামকরণ কেন? হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার এই পদক্ষেপ অন্য ভাষাভাষীর মানুষ মেনে নেবেন কেন? ভারতের বহুত্বকে বাঁচাতে প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। জন্মলগ্ন থেকেই উপমহাদেশের জাতীয়তা ছিল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া আর তাকে ঘিরে থেকে গেছে বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন। বহুত্বের এই দেশে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠী এবং প্রত্যেকটি আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর পরিপূর্ণ বিকাশের ন্যূনতম শর্ত হিসাবে ভাষাভিত্তিক রাজ্যগঠন এবং রাজ্যের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা থাকা ফেডারেলিজমের ন্যূনতম শর্ত হওয়া উচিত। ধারাবাহিকভাবে বিজেপি এই জায়গাতেই আঘাত দিচ্ছে এবং এই বিষয় নিয়ে কেউ কথা বললেই তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার রাস্তা করছে এই আইন এনে।

ন্যায়সংহিতায় সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞায় সচেতনভাবে “সাংবিধানিক কাঠামোর” উপর আক্রমণ কথাটা বাদ দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ, ভারতের “সাংবিধানিক কাঠামো” ধ্বংস করা হলে তা সন্ত্রাসবাদী কাজ হিসেবে গণ্য করা হবে না, অথচ ভারতের সামাজিক কাঠামো (যেমন, জাতপাত ব্যবস্থা) ধ্বংস বা অস্থিতিশীল করার কাজ হবে সন্ত্রাসবাদী। সেই আঘাত গুরুতর বা মৌলিক না হলেও! এই সচেতন পরিবর্তন আরএসএসের রাস্তা আরও প্রশস্ত করে দেবে ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোকে শক্তিশালীভাবে ধরে রাখা এবং হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের দিকে ধাপে ধাপে এগোনোর জন্য।

 

মহিলাদের কি ন্যায়বিচার দেবে এই আইন?

জোরগলায় শাসকরা প্রচার করে চলেছে এই আইনের কিছু সংশোধনী ধারা মহিলাদের ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। শুধু তাই নয়, পুরনো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধের বাইরে বের করে মহিলাদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে আনা ধারাগুলি। সত্যি কি তাই? আসুন একটু খতিয়ে দেখি।

১৯ শতকের ভিক্টোরিয়ান মরালিটির ধারণা অনুযায়ী এতদিনকার ফৌজদারি আইনে মহিলাদের প্রতি অপরাধমূলক আচরণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। সমকামিতা, ব্যাভিচার, বিবাহিত মহিলাকে প্রলুব্ধ করা ইত্যাদিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার যে দৃষ্টিভঙ্গি এই আইনগুলোতে রয়েছে তা সেই আঠারো-উনিশ শতক থেকে চলে আসা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতার সংশ্লেষের দিকেই ইঙ্গিত করে। এই ধারাগুলি রক্ষণশীল এবং পিতৃতন্ত্রের প্রতিভূ তো বটেই, সেই সঙ্গে ভারতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকে স্থায়ী চেহারা দেয়। ভারতীয় ন্যায়সংহিতা বিল (বিএনএস), ২০২৩-এ এক্ষেত্রে কী কী পরিবর্তন এল? এখানে একজন বিবাহিত মহিলাকে প্রলুব্ধ করাকে এই আইনেও অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে যেখানে গোটা আইনের ভাষ্যই স্বামীর স্বার্থরক্ষা করার জন্য, স্ত্রীর মতামতকে কোথাও গুরুত্ব পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় যদি স্বামী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যৌনসম্পর্ক তৈরি করে তাহলেও সেক্ষেত্রে সেই অন্য ব্যক্তিকে অভিযুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে প্রলুব্ধ করার অভিযোগে। অর্থাৎ এই নতুন আইনের ধারায় খোলাখুলি বুঝিয়ে দেওয়া হল যে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি এবং একজন মহিলার যৌনতা এবং তার শরীরের ওপর তার নিজের কোনও কর্তৃত্ব নেই, কর্তৃত্ব থাকবে তার স্বামীর। ৪৯৮-এ ধারায় যৌন মিলনের অভিপ্রায়ে বিবাহিত মহিলাকে প্রলুব্ধ করা বা তুলে নিয়ে যাওয়াকে অপরাধী করা হয়েছে, মহিলার মতামতের তোয়াক্কা না করে। বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বিএনএস আইপিসিতেও। বিবাহ-পরবর্তী স্ত্রীর উপর স্বামীদের ‘মালিকানা’ আছে এই বিশ্বাস প্রতিফলিত আইনের ছত্রে ছত্রে। নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাল কোথায়?

 

দমনমূলক আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা

মিথ্যে মামলায় দীর্ঘদিন আটকে রেখে ফাদার স্ট্যান স্বামীকে একটু একটু করে পচিয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছিল ভারত রাষ্ট্র। ক্ষমতা-কেন্দ্রে থাকা ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং তার হাতিয়ার দানবীয় ইউএপিএ আইন ওঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী। এই মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়। স্বাধীন দেশের নাগরিককে এভাবে কণ্ঠরোধ করে দেওয়াকে আমরা সেদিন আটকাতে পারিনি। দু-বছর হয়ে গেছে সেই মৃত্যুর। আজ সেই ভয়ঙ্কর দমনমূলক আইনকে যখন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে সাধারণ ফৌজদারি ধারার মধ্যেই তখন অনুমান করতে ভুল হয় না যে কোনও অন্য স্বরকে এতটুকু জায়গা দিতে নারাজ ওরা। দেশের মানুষকে খোলা কারাগারেই রাখতে চায় শাসক। তাই আজ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। আজ যদি আমরা ঘুরে দাঁড়িয়ে এই প্রত্যেকটি বিল বাতিল করা এবং এতদিনকার ঔপনিবেশিক আইনের আওতায় যে একের পর এক গণতান্ত্রিক মানুষের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছে তার বিরুদ্ধে আওয়াজ না তুলি তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। পাঁচ মিনিটের জন্য আসুন বলে কাশ্মিরে যখন সাংবাদিক ইরফান মেহরাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ প্রয়োগ করা হয়েছে তখন আমরা রাস্তায় নামিনি। হিন্দুত্ব নিয়ে টুইট করার জন্য গ্রেফতার কন্নড় অভিনেতা চেতন কুমার— তখনও আমরা তেমন গলা ফাটাইনি। উত্তরপ্রদেশে একতরফাভাবে দিনের পর দিন চলছে যোগীর বুলডোজার রাজ। যাকে-তাকে মিথ্যে মামলায় আটক, পুলিশের একচ্ছত্র আধিপত্য। উত্তরপ্রদেশ-হরিয়ানা ছাড়াও অসম, মধ্যপ্রদেশে চলছে মুসলিম সমাজের উপর চরম নির্যাতন। এমনকি মোদি হঠাও পোস্টারের জন্যও গ্রেফতার, টুইট করার জন্য জেল। দেশের ফ্যাসিস্ট সরকার ন্যূনতম বিরোধিতা সহ্য করতে পারছে না। শুধু গণ-আন্দোলনের কর্মীদেরকেই নয়, সাংবাদিকদেরকেও একের পর এক গ্রেপ্তার করা হয়েই চলেছে। এখনও পর্যন্ত ৩১ জন সাংবাদিক দেশদ্রোহী তকমা পেয়ে জেলে বন্দি। এর মধ্যে ১৬ জনের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে ইউএপিএ। তাহলে কি এ-দেশে সত্যানুসন্ধান করাও বেআইনি? দেশদ্রোহিতা বা সন্ত্রাসবাদের নতুন সংজ্ঞা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। এই শাসকরা সর্বস্তরে নামাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। অপরদিকে বিদ্বেষ বিভাজনের রাজনীতিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সারা দেশে ইউএপিএ-তে প্রায় ৪০০০ মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে (মাওবাদী, কামতাপুরী, পিএফআই প্রভৃতি বিভিন্ন তকমা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে)। পশ্চিমবঙ্গের জেলে এই মুহূর্তে আছেন ৮৮ জন বন্দি। এই প্রত্যেক বন্দির মুক্তির দাবিতে জোরালো আওয়াজ কোথায়? সম্প্রতি নিউজক্লিকের প্রবীর পুরকায়স্থ, পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা সহ একাধিক সাংবাদিককে যখন ইউএপিএ দেওয়া হচ্ছে, পুলিশি হানায় হয়রান করা হচ্ছে তখন আমরা কেউ কেউ কথা বলছি; কিন্তু বিশ্বাস করুন সেই স্বর আজও খুব ক্ষীণ। এর পরে এই ধরনের বিল যদি পাশ হয়ে যায় সেটুকু বলার সুযোগও থাকবে কি?

ভারতীয় ন্যায়সংহিতা বিল, ভারতীয় সাক্ষ্য অধিকার বিল এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বিল আনা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার বলেছেন যে সংস্কারের উদ্দেশ্য হল ফৌজদারি আইনকে উপনিবেশ-মুক্ত করা এবং “ভারতীয় আত্মার সাথে মিশে থাকা” আইন দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করা। বলাই বাহুল্য এ মোদি-শাহ সরকারের আরেক মিথ্যাভাষণ। কেন বলছি?

উপনিবেশ-মুক্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হওয়া উচিত ঔপনিবেশিক শাসনের অবশেষকে খুঁজে বার করা। পরাধীন ভারতে ফৌজদারি আইন তৈরিই হয় ভারতীয়দের ওপর ব্রিটিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে। আর আজও আমাদের দেশের আইনব্যবস্থা একই যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেশের মানুষকে শাসন করতে এবং দমন করতেই আইন প্রণয়ন হয় আজও। রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকের মধ্যেকার সম্পর্ক পরাধীন ভারতের মতোই আজও বিদ্বেষপূর্ণ এবং দমনমূলক। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর-পরই ইংরেজরা প্রথম ফৌজদারি আইন আনে সেই দেশজ মানুষের ওপর তাদের কর্তৃত্ব কায়েম করতে যাদের তারা আসলে নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে দেখে। তাই আইনের ধারাগুলির মধ্যে কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকেছে সব সময়। সংশোধন করতে আইন নয়, বরং সমাজে ভীতিপ্রদর্শন করতেই আইন-কানুন। আজ ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়, সংশোধনাগার নামে ডাকা হয় কারাগারকে, কিন্তু ধাপে ধাপে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো, দেশের মানুষের ওপর কঠোর নজরদারি, সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার, যে-কোনও প্রতিস্পর্ধী কণ্ঠস্বরকে সন্ত্রাসবাদী বা দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া দেখে বেশ বোঝা যায় আজও আইন প্রনয়নের লক্ষ্য জনগণের মধ্যে ভয়ের আবহাওয়া তৈরি করা। তাই দেখা যাচ্ছে নতুন এই তিনটি বিলে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলিও স্বৈরাচারী ঔপনিবেশিক মর্মবস্তুকে আরও সুচারুভাবে বলবৎ করে, ধরে রাখে এবং প্রসারিত করে— ভাষ্যে ও চেতনায়। উপনিবেশ-মুক্ত ভাঁওতা দিয়ে আসলে অন্তর্বস্তুতে ঔপনিবেশিক সময়ের রাওলাট আইনের মতো এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে আরও কঠোর দমনমূলক ধারায় নিজের দেশের নাগরিককেই পরাধীন করে রাখার চক্রান্ত নিয়েই এই ধরনের পরিবর্তন। তাই আমাদের স্পষ্টভাবে বলতে হবে শুধু নামে পরিবর্তন করার ভণ্ডামি নয়, স্পিরিটের দিক থেকে দেশকে আজ সত্যিই উপবিবেশ-মুক্ত করা প্রয়োজন।

অধিকাররক্ষা আন্দোলনের কর্মী, বন্দিমুক্তি আন্দোলনের সাথী, বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের কর্মী যাঁরা মানুষের জীবনজীবিকা থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়ছেন, এককেন্দ্রিক হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের প্রকল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাঁরা বহুত্বের কথা বলছেন, নিপীড়িত জাতিসত্তার আওয়াজকে যাঁরা তুলে ধরছেন, জনস্বাস্থ্যের সংজ্ঞা পাল্টে স্বাস্থ্য নজরদারি সহ মানুষের ন্যূনতম মানবাধিকার অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে যাঁরা লড়ছেন, রাষ্ট্রের প্রতিদিন নানা কায়দায় মানুষকে বে-নাগরিক করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়ছেন বা উপনিবেশের ধারাবাহিকতায় দেশকে একচেটিয়া কর্পোরেটদের হাতে বিকিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়ছেন বা এমনকি যাঁরা লেখালেখি এবং চর্চার মধ্যে দিয়েও সত্যসন্ধান করছেন, নতুন কিছু ভাবছেন— তাঁদের সকলকে কার্যত কারাগারে রাখতে চাইছে শাসকরা। উপনিবেশ বিরোধিতার নাম করে যে-কোনও বিরুদ্ধ স্বরকে বুটের তলায় পিষে মেরে ফেলার এবং ভয়াবহ এককেন্দ্রিক পুলিশি রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্যই এত আয়োজন। বিরোধীরাও আইনকানুন থেকে শুরু করে আমাদের মননে সঠিক উপনিবেশ-বিরোধী স্পিরিটের প্রয়োজনীয়তাকে কোথাও অস্বীকার করেনি। সেক্ষেত্রে তাদের কাছেও প্রশ্ন তারা যে-সব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে সেখানে ইউএপিএ এবং সিডিশন-এ এত এত রাজনৈতিক বন্দি কেন জেলে পচছে? এই আইনগুলো সম্পূর্ণ বাতিল হওয়া প্রয়োজন। এই আইনগুলি প্রত্যেকটিই পরাধীন ভারতের রাওলাট আইনের ধারাগুলোকেই অনুসরণ করে। ১০০ বছর পেরিয়ে আজও যাঁরা স্বাধীনতার খোঁজে পথ হাঁটছেন তাঁদেরই কি আজ কর্তব্য নয় এই আইনগুলির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো?

 

তথ্যসূত্র:


*মতামত ব্যক্তিগত