Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ভাষার আন্দোলন আর আন্দোলনের ভাষা

রাজেকুজ্জামান রতন

 


মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জীবন দিলেও সে মাতৃভাষায় কথা বলতে গেলে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ লাগে, সকল জাতিসত্তার বিকাশের সুযোগ লাগে তা কি অর্জিত হয়েছে? শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার সাহস দিয়েছে একুশ, আর মাথা নত করে রাখতে বাধ্য করছে রাষ্ট্র। একের পর এক দমনমূলক আইন প্রণীত হচ্ছে। শাসকের চেহারা বদল হচ্ছে, কিন্তু জনগণকে শোষণ আর দমনের চরিত্র বদল হচ্ছে না। বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন, তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ইত্যাদি দিয়ে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এই রাষ্ট্র তো জনগণ চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন এমন এক রাষ্ট্র যা জনগণকে ভরসা দেবে আর বিনিময়ে পাবে জনগণের ভালবাসা

 

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসে কিন্তু একই চেতনা নিয়ে আসে না আর একই তাৎপর্যও বহন করে না।

একুশের প্রথম প্রহরে এবং সকালে হাজার হাজার মানুষ শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য যান যেখানে থাকে না ধর্মের পার্থক্য, গায়ের রং কিংবা লিঙ্গের পার্থক্য। কিন্তু তাদের সবাই যে একই চেতনা নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যান তা বলা যাবে না। শক্তি এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের উৎকট প্রতিযোগিতা শ্রদ্ধার স্নিগ্ধতা ম্লান করে দেয়। শহিদ মিনারের দিকে তাকালে দেখা যাবে, মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মা, তার দুদিকে চার সন্তান, যে সন্তানেরা মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। মায়ের মাথাটা শোক আর বেদনায় ভারী, একটু নিচু হয়ে আছে। কিন্তু যারা শহিদ মিনারে যান তাদেরকে এই বেদনা বিষণ্ণ করে না বরং প্রতিবাদের শক্তি জোগায়।

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়, ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়।’ ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা এই অবিস্মরণীয় গান যে জনগণকে বারবার গাইতে হবে তা কি গীতিকার ভেবেছিলেন? এই ওরা কারা? পরাধীনতার সুদীর্ঘ বছরগুলোতে ব্রিটিশ, পাকিস্তানিদেরকে আমরা দেখেছিলাম কীভাবে শোষণ করেছে। শোষণের প্রয়োজনেই শাসন করা ছিল তাদের কাজ। না হলে এত দূর থেকে এসে কিংবা এত ব্যয় করে সৈন্যসামন্ত আর কর্মচারী পুষে তাদের লাভ কী হত? সোনার বাংলা যে বাস্তবিক অর্থেই সোনার বাংলা ছিল তা আমাদের দুর্দশা আর আমাদেরকে যারা শোষণ করত তাদের জৌলুস দেখে বুঝতে অসুবিধা হত না কারওই। আমাদেরকে তারা যে পরিমাণ শোষণ করেছে, আমাদের সম্পদ যত লুঠ করেছে, তাদের সমৃদ্ধি ততই বেড়েছে। যে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি জেনারেলের মুখে এই হুঙ্কার আমরা শুনেছি যে, মানুষ চাই না মাটি চাই। অর্থাৎ, মানুষ মেরে সাফ করে হলেও এই ভূখণ্ড তাদের দখলে রাখতে হবে। তাই তখন স্পষ্ট ছিল যে ওরা বলতে কাদেরকে বোঝায়। দেশের মানুষ তাড়িয়েছে তাদের এবং ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তে ভেজা এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছে। আজ যখন মানুষ তার অধিকারের কথা বলছে তখন আবার নতুন করে খুঁজতে হচ্ছে ওদেরকে, যারা অধিকার কেড়ে নেয়।

যে কোনও সংগ্রামের একটা সূচনাবিন্দু থাকে, স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াইয়েরও সূচনা খুঁজতে হলে প্রথমেই আসে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা। ৮ ফাল্গুন বা ২১ ফেব্রুয়ারি যে বেদনা এবং যে চেতনা জাগিয়ে দিয়েছিল তা আমাদেরকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বেদনা ছিল বৈষম্যের আর চেতনা ছিল মুক্তির, এই বৈষম্য থেকে মুক্তির আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা জোগায়।

 

মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমির আন্দোলনে নিম্নবিত্ত দরিদ্র মুসলমান দলে দলে যুক্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে পাকিস্তানে কোনও শোষণ থাকবে না। কারণ মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। ভাই কি ভাইকে শোষণ করতে পারে? আর উচ্চবিত্ত ধনী উচ্চশিক্ষিত মুসলমান যুক্ত হয়েছিলেন এই আশায় যে রাষ্ট্রটা হাতে পেলে ক্ষমতার দুধ মধু সবই তাঁরা খেতে পারবেন। ফলে এই দুই শ্রেণির ছিল দুই আশা, কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক, সেটা হল পাকিস্তান সৃষ্টি। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাথমিক আবেগ থিতিয়ে যাবার পর প্রথম যে প্রশ্ন এল তা হল শুধু মুসলমানদের জন্য কেন, কোনও ধর্মের ভিত্তিতে কি দেশ হতে পারে? যদি তাই হত তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের অধিবাসীই তো মুসলমান, তাহলে তারা সবাই মিলে একটা দেশ হতে পারে না কেন? কেন জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এক খ্রিস্টান ধর্মের জনগোষ্ঠী নিয়ে এক দেশ হয়নি? আর চিন, কোরিয়া, জাপান বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের নিয়ে এক দেশ হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারা সহজ ছিল না। কারণ শুধু ধর্মের ভিত্তিতে কোনও রাষ্ট্র হয় না। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিজ্ঞানসম্মতও নয়, আর ইতিহাসও তাকে সমর্থন করে না। তাই সংবিধান প্রণয়নের সভায় জিন্নাহ এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, একদিন হিন্দু আর হিন্দু হিসেবে নয়, মুসলমান আর মুসলমান হিসেবে নয় তাঁরা সবাই বিবেচিত হবেন পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে। সাধারণ মানুষ দেখলেন, এ যে একেবারে দ্বিজাতি তত্ত্বের বিপরীতমুখী যাত্রা! তাহলে এত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, কোটি মানুষের জন্মভূমি পরিত্যাগ করে নিরাশ্রয় বা উন্মুল হয়ে যাওয়া কীসের জন্য? ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র এবং সংবিধান হবে কীভাবে?

এই পথ অন্বেষণে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে দীর্ঘ সময় লেগে গেল। যে নেতারা ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করবেন বলে জনগণকে খেপিয়ে তুলেছিলেন তারাও পথ খুঁজছিলেন আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও ৯ বছর বিতর্কের পর ১৯৫৬ সালে প্রণীত হয়েছিল পাকিস্তানের সংবিধান। এই সময়কালে সংবিধান না থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিধান তো ছিল, তা দিয়েই চলছিল সব। রাষ্ট্রের ধর্ম কী হবে তা নিয়ে সমাধানে আসতে না আসতেই প্রশ্ন এল, রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে? রাষ্ট্রের অখণ্ডতার স্বার্থে এক ধর্ম এক দেশ এক ভাষা দরকার। এই ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা থেকেই মুসলমান, পাকিস্তান এবং উর্দুকে সমার্থক করার আয়োজন চলছিল সর্বত্র। বিপরীতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে ঢাকা তখন উত্তাল।

এই সময় ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এলেন মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) অনুষ্ঠিত গণ-সম্বর্ধনায় তিনি বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনও ভাষা নয়। ভাষা আন্দোলনকে তিনি মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ হয় সমাবেশের মধ্যেই।

এর পর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে স্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবিকে বাতিল করে দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি অবশ্যই উর্দু। কারণ উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয় তুলে ধরে। ছাত্ররা সমস্বরে না, না বলে জিন্নাহ-র বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন জিন্নাহ কিন্তু পিছনে রেখে যান ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ।

জিন্নাহ তো গেলেন কিন্তু প্রশ্ন রেখে গেলেন একরাশ। উর্দু কি পাকিস্তানের কোনও প্রদেশের ভাষা? সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, প্রত্যেকেরই তো আলাদা ভাষা। ভাষা দিয়ে কি ধর্মের পরিচয় তুলে ধরা যায়? আরবি ভাষায় কি মুসলমান ছাড়া কেউ কথা বলে না? মানুষ যত দ্রুত ধর্মান্তরিত হতে পারে ভাষান্তরিত হওয়া কি তত সহজ? আরবের মুসলমান, ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান ধর্মে এক হলেও ভাষা এবং সংস্কৃতিতে কি এক? আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথাও যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে যে ভাষায় ৫৪ শতাংশ মানুষ কথা বলে তাদের দাবি কি অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হবে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গড়ে উঠা ভাষা আন্দোলনের মুল সুর ছিল অসাম্প্রদায়িক, রাষ্ট্র তার নাগরিককে ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করবে না। বিবেচনা করবে যে সে তার নাগরিক। যুক্তি হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি, যুক্তি যদি সঠিক হয় তাহলে তা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ১৯৫২ সালের আত্মদান আর একটি বিষয় সামনে তুলে এনেছিল। যাঁরা জীবন দিয়েছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার পথ কী হবে? মুসলমান কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মসজিদে প্রার্থনা, হিন্দু ধর্মের কেউ হলে মন্দিরে, অর্থাৎ, ধর্মীয় রীতিতেই তাঁকে শ্রদ্ধা সম্মান জানানোর প্রথা ছিল। মৃত্যুদিবসে কবরস্থানে বা শ্মশানে গিয়ে স্মৃতিফলকে স্মৃতি তর্পণ করার প্রথাও ছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলন ছিল এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে দূর করে দেওয়ার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল শহিদ মিনার। এখানে ছিল না কোনও ধর্মের বিভাজন। যেহেতু তাঁরা জীবন দিয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের সকল মানুষের মুখের ভাষার জন্য। তাই সকল ধর্মের মানুষ যেন শ্রদ্ধা জানাতে পারে সে উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল শহিদ মিনার। সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা বা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহিদ মিনার এখনও মানুষের মিলনক্ষেত্র। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই চেতনাকে শুরুতেই ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, প্রথম শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার পর পরই তা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সে সময়ে প্রতিবাদী কবিতা লেখা হয়েছিল, স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনও চার কোটি পরিবার। এর পর শহিদ মিনার গড়া হয়েছিল এবং ৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনি আবার সেটা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।

 

একুশ শিখিয়েছিল আত্মসমর্পণ নয় আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিতে। একুশ মানে মাথা নত না করা। এটা আমাদের কাছে এখনও একটি প্রেরণাদায়ক কথা। প্রবল শক্তির কাছে বা যুক্তিহীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে বেঁচে থাকা যায় কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বাঁচা যায় না। অন্ধত্ব বা অন্ধকার যত প্রবলই হোক না কেন যুক্তির অস্ত্রে তাকে পরাভূত করা সম্ভব যদি ব্যাপক মানুষের মধ্যে সেই যুক্তির আলো পৌঁছে দেওয়া যায়। যুক্তির আলো পথ দেখিয়েছে আমাদেরকে স্বাধীনতার। আবার স্বাধীনতার সঙ্গে মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ তা অর্জন করতে হলেও যুক্তিই হবে অন্যতম হাতিয়ার। ভাষার দাবিতে লড়াই পথ দেখিয়েছে নাগরিক অধিকার অর্জন করতে হলে ভোটের অধিকার দরকার। বৈষম্য দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হল সকলের ভাতের অধিকার। সে কারণেই স্লোগান উঠেছিল কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। আর এসব দাবিকে একসঙ্গে যুক্ত করেছিল আর একটি দাবি যে, এই ভূখণ্ডকে স্বাধীন করতে হবে। পরবর্তীতে তাই স্লোগান উঠেছিল, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। তুমি কে আমি কে বাঙালি, বাঙালি। গান লেখা হয়েছিল, বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি। তাহলে দেখা যায় ভাষা ভাত ভোট ভূখণ্ড এই চারটি শব্দ যা ‘ভ’ দিয়েই শুরু তা আমাদের জীবন ও রাজনীতিকে কতটা প্রভাবিত করেছে এবং এখনও করছে।

ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমরা স্বাধীনতায় এলাম। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব ছিল বুর্জোয়াদের হাতে, বাঙালি উঠতি ধনিকশ্রেণির দল আওয়ামি লিগের কাছে তাই দেশ স্বাধীন হলেও মানুষ বন্দি হয়ে গেল পুঁজির কাছে। সে কারণে সব স্বাধীনতাই এখন পুঁজিপতিদের, গণযুদ্ধ হল কিন্তু গণমানুষের স্বাধীনতা এল না।

 

তাই প্রশ্ন উঠছে, মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জীবন দিলেও সে মাতৃভাষায় কথা বলতে গেলে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ লাগে, সকল জাতিসত্তার বিকাশের সুযোগ লাগে তা কি অর্জিত হয়েছে? শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার সাহস দিয়েছে একুশ, আর মাথা নত করে রাখতে বাধ্য করছে রাষ্ট্র। একের পর এক দমনমূলক আইন প্রণীত হচ্ছে। শাসকের চেহারা বদল হচ্ছে, কিন্তু জনগণকে শোষণ আর দমনের চরিত্র বদল হচ্ছে না। বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন, তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের পর সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে যে, দেশ, অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে বন্ধু-স্বজনরাও পরামর্শ দেয় এবং বলে, খুব সাবধান! কথা বলতে গেলে বিপদে পড়বে। অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে ভাঁওতাবাজি। যে দল বা যারা যত ভাঁওতা দিতে পারবে তারা তত সফল। কিন্তু এই ভয় আর ভাঁওতার রাষ্ট্র তো জনগণ চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন এমন এক রাষ্ট্র যা জনগণকে ভরসা দেবে আর বিনিময়ে পাবে জনগণের ভালবাসা।

স্বাধীনতার ৫২ বছর আর ৫২-র একুশের ৭২ বছর পর বাংলাদেশের জনগণ দেখছে তাদের আকাঙ্ক্ষার সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এখনও অধরা। কিন্তু একুশ আমাদেরকে শিখিয়েছে স্বপ্ন দেখতে আর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংগ্রাম করতে। তাই অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার সংগ্রাম শক্তিশালী করাই তো একুশের চেতনা। এই চেতনা ধারণ করা এবং সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে মাথা নত না করার শিক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের বারবার একুশের কাছে আসতে হয়। ভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে আন্দোলনের যে ভাষা তৈরি হয়েছে তা পথ তৈরি করে প্রতিবাদের। তাই যখনই রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর নিপীড়ন চলে, প্রতিবাদের শক্তি গড়ে তুলবার জন্যই তখন একুশের চেতনার কথা বলতে হয়।


*লেখক বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সহ সাধারণ সম্পাদক এবং বিশিষ্ট লেখক। মতামত ব্যক্তিগত