Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যমুনাবতীর পুত্রশোক কিংবা একটি উন্নয়নের গল্প

অভীক ভট্টাচার্য

 

আদিকথাবস্তু ও প্রস্তাবনা

ছেলেটার পেটব্যথা ছিল সারাদিন ধরেই। সন্ধের মুখে তার সঙ্গে যখন তেড়ে জ্বরও এল, তখনই প্রমাদ গুনেছিল যমুনা। গত কয়েকদিন ধরেই গ্রামে অনেকের ছোয়াপিলাদের এমন পেটদরদের সঙ্গে জ্বর হয়ে মারা যাওয়ার খবর আসছিল। ছেলেটার পেটব্যথা হতেই মন কুডাক ডেকেছিল, তবে জ্বরটা না-আসায় মনকে কোনওক্রমে শক্ত রেখেছিল সে। কিন্তু সন্ধেয় জ্বর আসতে আর ঘরে থাকতে সাহস পায়নি। সবচেয়ে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তাদের গ্রাম থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে। এই অন্ধকারে গোটা রাস্তাটা ছেলেকে কোলে নিয়ে তাকে একাই অতটা পথ যেতে হবে। একাই, কেননা শ্রীমতী যমুনা প্রধানের সোয়ামি, শ্রীযুক্ত কাইন্থা প্রধান আপাতত অন্ধ্রের মহবুবনগরে, রাস্তা তৈরির কাজে ব্যস্ত। গ্রামের অনেকের সঙ্গেই সেও মজুর খাটতে গিয়েছে। ফিরবে মাসতিনেক পর।

অতএব, যমুনাকে একাই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, ছেলেকে নিয়ে। গোটা পথ হেঁটে। বর্ষাকাল, ফলে প্রচুর সাপখোপ থাকবে। উপরন্তু ঘাঁটির রাস্তা, মানে পথে দু’দুটো পাহাড় টপকাতে হবে। বাদলার দিন, কাজেই হারিকেন নিয়ে বেরনো যাবে না। কিন্তু, অতশত ভাবার সময় তার হাতে ছিল না। সামান্য যেক’টা টাকা ঘরে ছিল আঁচলে বেঁধে ছেলেকে চাদরে জড়িয়ে কোলে তুলে বেরিয়ে পড়ে মা। আর, যেন তাল বুঝেই, আকাশ ভেঙে নামে বৃষ্টি। তুমুল ধারাবর্ষণের মধ্যে ১৮ কিলোমিটার জঙ্গল-পাহাড়ের পথ পায়ে হেঁটে যখন সে কালিয়াপানি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছয়, তখন মাঝরাত পেরিয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির জলে ভিজে সপসপে চাদরের নীচে ছেলেটা জ্বরে বেহুঁশ।

যমুনার গল্পের পরবর্তী অংশ সংক্ষিপ্ত ও অনুমানযোগ্য। পরদিন সকালে তার ছেলেটা মারা যায়। সারাদিন অপেক্ষার পর বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার মুখে হাসপাতালের ডাক্তার তার হাতে একটা কাগজ দেয়, যেখানে লেখা ছিল – মৃতের নাম বাবুরু প্রধান, বয়স পাঁচ বছর, পিতা শ্রীযুক্ত কাইন্থা প্রধান, গ্রাম-পোস্ট গুহিয়াশাল, জেলা জাজপুর, ওডিশা। মৃত্যুর কারণ হিসেবে যা লেখা ছিল – ক্রনিক অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন – অত বড় কঠিন কথাটার মানে যমুনার জানা ছিল না। সারাদিন ধরে সে কেবল বুঝতে পেরেছিল এইটুকুই যে, তার ছোট ছেলেটা, গ্রামের আরও অনেকের বাচ্ছার মতোই, পেটদরদ আর তড়কা-জ্বরে মারা গিয়েছে।

সেসব কথা থাক। বাবুরুরা সমাজের যে স্তরের সেখানে কেউ কখনও কঠিন ব্যাধিতে মারা যায় না। কারণ, তা হলে পোয়েটিক জাস্টিস হয় না, শোকসভাও না। বরং এ-গল্পের একটা অন্য শেষ থাকে যেটা অনেক বেশি বর্ণময়, ফলে বেশি বর্ণনাযোগ্যও। ২০১৬-র জুন-জুলাইয়ে জাজপুরের পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা নগড়া-গুহিয়াশাল এলাকায় ১৯টি শিশু মারা যাওয়ার পর – আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে, সে-খবর মিডিয়ার হাতে পৌঁছে যাওয়ার পর, আচমকাই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। জেলাশাসকের নির্দেশে গ্রামে তড়িঘড়ি চালডাল পৌঁছয়, মুখ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দেন, জঙ্গুলে জায়গায় বর্ষাকালে অজানা জ্বর হওয়া এবং তা থেকে শিশুমৃত্যু যে কত স্বাভাবিক এক ঘটনা তা নিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচনা চলে, এবং ভবিষ্যতে বৃষ্টির মধ্যে মুমূর্ষু সন্তানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে যেতে বাপমায়েদের পথশ্রম যাতে কম হয় তা সুনিশ্চিত করতে গ্রাম-সড়ক যোজনায় রাস্তা বানানোর উদ্যোগ নেয় স্থানীয় চুঙ্গুডিপাল পঞ্চায়েত। অর্থাৎ এককথায়, ওডিশার ওই প্রত্যন্ত এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার বইতে থাকে। যার নিট ফল দাঁড়ায়, অন্ধ্রপ্রদেশে রাস্তা তৈরির কাজে দিনমজুর হিসেবে তিনমাস কাটিয়ে ঘরে ফেরার পথে কাইন্থা দেখে, কী আশ্চর্য, তার ঘরের দোর পর্যন্ত পাকা রাস্তা সকালের রোদে ফটফট করছে! দেখে সে, বলা বাহুল্য, খুবই খুশি হয়, এবং তারপর তিনমাস না-যেতে ফের যমুনার পেট ভারী হয়ে উঠতে শুরু করে।

 

মধ্যকথাবস্তু ও লার্জার পারস্পেকটিভ

গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স তৈরি করতে গিয়ে আইএফপিআরআই প্রধান যে চারটি সূচক নিয়ে কাজ করেছে – শিশু-অপুষ্টি, শিশুমৃত্যু, ‘চাইল্ড ওয়েস্টিং’ (উচ্চতার তুলনায় কম ওজনজনিত ঊনপুষ্টির সমস্যা) ও ‘চাইল্ড স্টান্টিং’ (বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাজনিত ঊনপুষ্টির সমস্যা) – এর প্রতিটিই কিন্তু প্রত্যক্ষত শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। তার কারণ, আইএফপিআরআই মনে করে, কোনও দেশে শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের গড়ই সে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের প্রধানতম নির্ণায়ক। এর পাশাপাশি, জন্মের পর থেকে পাঁচ-ছ’বছর বয়স পর্যন্ত যেহেতু শিশুদের শারীরিক মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটে সবচেয়ে বেশি, তাই এই বয়ঃসীমার মধ্যে অপুষ্টির আক্রমণ শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি ও অপরিবর্তনীয় প্রভাব বিস্তার করে। এ অবশ্য কোনও নতুন কথা নয়। এ-প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই আজ থেকে ৪০ বছরেরও বেশি আগে কেন্দ্রীয় সরকার ‘ইনটেন্সিভ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট স্কিম’ (আইসিডিএস) শুরু করেছিল। সেই প্রকল্পের আওতায় সদ্যোজাত থেকে শুরু করে ছ’বছর বয়সি শিশুদের পুষ্টি ও খাদ্যসরক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। শিশু-অপুষ্টি যে দেশের ভবিষ্যতের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ, তা মেনে নিয়ে ২০১৩-য় নয়া জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়নের সময়ও সরকার খুব স্পষ্টভাবে জানায়, জীবনের প্রথম ছ’বছরে পর্যাপ্ত পুষ্টির বিষয়টি ‘নন-নেগোশিয়েব্‌ল’ – অর্থাৎ যার সঙ্গে কোনওভাবেই আপস করা চলতে পারে না। একইসঙ্গে সরকার জানিয়েছিল, ছ’বছর বা তার কমবয়সি শিশুদের প্রত্যেকের কাছে অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবার মাধ্যমে আইসিডিএস-এর সুফল পৌঁছে দেওয়া হবে। অথচ সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, আইসিডিএস প্রকল্প কার্যকর হওয়ার চার দশক কেটে গেলেও দেশের ছ’বছর বয়সি শিশুদের মাত্র ৫০ শতাংশকেই এ-পর্যন্ত তার আওতায় আনা গিয়েছে। অর্থাৎ শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টি-সুরক্ষায় এ-পর্যন্ত যত পথ পার হয়ে আসা গিয়েছে, সামনে পাড়ি দেওয়ার জন্যও পড়ে আছে ঠিক ততটাই পথ। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার দাবিদার যে দেশ তার পক্ষে এ বড় গৌরবের কথা নয়

সম্প্রতি জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার চতুর্থ পর্যায়ের (এনএফএইচএস, ২০১৫-১৬) সমীক্ষার যে সবিস্তার রিপোর্ট হাতে এসেছে, সেখানেও কার্যত আইএফপিআরআই-এর মূল্যায়নেরই প্রতিফলন। যেহেতু জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার তৃতীয় পর্যায়ের কাজ হয়েছিল ২০০৫-০৬ সালে, ফলে এই দু’টি রিপোর্টের পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলে শিশু-অপুষ্টি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য সূচকগুলিতে গত এক দশকে সারা দেশে অগ্রগতির চেহারাটা ঠিক কেমন, তার মোটামুটি একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব। জন্মের মুহূর্ত থেকে দু’বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা কী খাবার পাচ্ছে, সে বিষয়ে এনএফএইচএস-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, জন্মের পর প্রথম ছয় থেকে আটমাস যেখানে প্রতিটি শিশুর এক এবং একমাত্র খাদ্য হওয়া উচিত মায়ের দুধ (পুষ্টিবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে ‘এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং’), সেখানে ওই বয়ঃসীমার মধ্যে শিশুদের মোট সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই (৪৬ শতাংশ) সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। মায়ের যে প্রথম দুধ (‘কোলোস্ট্রাম’, যা কিনা শিশুচিকিৎসকদের ভাষায় ‘মাদার অফ অল মেডিসিন্‌স’) জন্মের একঘণ্টার মধ্যে প্রতিটি শিশুকে খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি, আমাদের দেশের মাত্র ৪১ শতাংশ সদ্যোজাত সে সুযোগ পেয়ে থাকে। ছ’মাস থেকে দু’বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি মায়ের দুধ খাওয়ানোও জরুরি, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপুষ্টিতে ভোগা মায়েদের সন্তানরা সে সুযোগ পায় না। তথ্য বলছে, দু’বছরের কমবয়সি শিশুদের মাত্র আট শতাংশ পর্যাপ্ত আহার (‘অ্যাডিকুয়েট ডায়েট’) পায়। সহজ ভাষায় যার অর্থ, দু’বছরের কম বয়স, এমন প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ন’জনই খাদ্য সুরক্ষার সুফল থেকে বঞ্চিত। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, পুষ্টিবিজ্ঞানের পরিভাষায় পর্যাপ্ত আহার বলতে বোঝায়, দিনে অন্তত চারবার সুষম খাদ্যগ্রহণ – যার মধ্যে শর্করা, প্রোটিন, স্নেহ ও ভিটামিন-মিনারেলস প্রভৃতি সব ধরনের খাদ্যগুণ রয়েছে। পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার, শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সুরক্ষা বলতে যা বোঝায়, স্বাধীনতার ৭০ বছরেও আমরা তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারিনি।

শিশুদের খাদ্য সুরক্ষার নিরিখে এই যদি হয় অবস্থা, তার অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব যে পড়বে তাদের পুষ্টিবিধানের ক্ষেত্রেও, তা বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন হয় না। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার ফল বলছে, পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের এক-তৃতীয়াংশই জন্মায় কম ওজন নিয়ে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, শিশু-অপুষ্টির মাত্রা পরিমাপ করার জন্য আজকাল সারা বিশ্ব জুড়ে তিনটি মাপকাঠির ব্যবহার হয়ে থাকে। এক, বয়সের তুলনায় শিশুদের ওজন ঠিকমতো বাড়ছে কি না (‘আন্ডারওয়েট’); দুই, বয়সের তুলনায় তার উচ্চতা যথাযথ বেড়েছে কি না (‘স্টান্টিং’); এবং তিন, উচ্চতার তুলনায় তার ওজন বৃদ্ধি সন্তোষজনক কি না (‘ওয়েস্টিং’)। তথ্য বলছে, এই তিনটি সূচকেই লজ্জাজনক ফল করেছে ভারত। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার ফল অনুযায়ী দেশের পাঁচ বা তার কমবয়সি শিশুদের প্রায় ৩৯ শতাংশ ‘স্টান্টিং’-এর শিকার, আর ২১ শতাংশ ‘ওয়েস্টিং’-এর। ‘সিভিয়ারলি ওয়েস্টেড’ শিশুর হার সাত শতাংশের বেশি। বিশেষত এই তিনটি সূচকের ফলাফল নিয়েই গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএফপিআরআই। তার চেয়েও উদ্বেগজনক তথ্য, ‘আন্ডারওয়েট’ ও ‘স্টান্টেড’ সূচকের পরিসংখ্যানে গত এক দশকে সামান্য উন্নতি হলেও ‘ওয়েস্টেড’ ও ‘সিভিয়ারলি ওয়েস্টেড’ শিশুদের সংখ্যা গত এক দশকে বেড়েছে – কোনও উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে সংবাদ হিসেবে যা মর্মান্তিক। ২০০৫-০৬ সালে জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার তৃতীয় পর্যায়ের ফলাফলে দেখা গিয়েছিল পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ‘ওয়েস্টিং’ ও ‘সিভিয়ার ওয়েস্টিং’-এর হার যথাক্রমে ১৯ ও ছয় শতাংশ। ১০ বছরের ব্যবধানে চতুর্থ পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ ও সাড়ে সাত শতাংশ। যা থেকে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, বাবুরুদের জন্য যে শৈশব সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম, তা আমরা বাস্তবায়িত করতে পারিনি শুধু নয়, গত ১০ বছরে আরও পিছিয়েই গিয়েছি।  

দুশ্চিন্তার এখানেই শেষ নয়। শিশু-অপুষ্টির এই ম্লান ছবি অত্যন্ত নিশ্চিতভাবে আর যে একটি বিপজ্জনক তথ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে তা হল সন্তানসম্ভবা ও প্রসূতি মায়েদের অপুষ্টি। যদি একটু খুঁটিয়ে দেখা যায় তা হলে সহজেই বোঝা যাবে যে, গর্ভাবস্থায় মায়েদের পুষ্টি যথাযথ না-হওয়ার ফলেই অপুষ্টি নিয়ে জন্মেছে শিশুরা। কেবল একটি সূচকের দিকে নজর ঘোরালেই যে আশঙ্কা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা জানাচ্ছে, সারা দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি মায়েদের অর্ধেকেরও বেহি, প্রায় ৫৩ শতাংশই রক্তাল্পতার শিকার। এবং গর্ভাবস্থায় ‘আয়রন অ্যান্ড ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট’ নিয়েছেন মায়েদের মাত্র ৩০ শতাংশ। এরই পাশে যদি রাখা যায় রক্তাল্পতায় ভোগা শৈশবের চিত্র, গোটা ছবিটা নিমেষে পরিষ্কার হয়ে আসে। তথ্য জানায়, পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের প্রায় ৫৮ শতাংশ জন্ম থেকেই ‘অ্যানিমিয়া’-র শিকার।

 

অন্তঃকথাবস্তু ও উপসংহার

গল্পের এইখানে এসে আবার যদি আমরা ফিরতে চাই নগড়ায়, সেখানে গিয়ে কী দেখতে পাব তা আন্দাজ করার জন্য কোনও পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই। সেখানে রাস্তা হয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনও নেই। অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবা চালু হয়েছে, কিন্তু সেখানে সহায়িকার জন্য সরকারের ভাতা আসে ছ’মাস পর-পর। গ্রামের প্রতিটি শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, কিন্তু আইসিডিএস সেন্টার মাসে মোটে তিনদিন খোলে। আশাদিদি ভ্যাক্সিনের বাক্স নিয়ে আসেন, কিন্তু গ্রামের ওঝা যেহেতু বলেছে সুঁই দিলে ধনুষ্টঙ্কার অবধারিত, অতএব সরকারের বহুবিজ্ঞাপিত ইন্দ্রধনুষ প্রকল্প কার্যকর হওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে।

এভাবেই একদিন মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল পার হয়ে ভারতবর্ষ সাসটেনেব্‌ল ডেভেলপমেন্ট গোলের পথে যাত্রা শুরু করে; আর যমুনা আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকে কবে কোন বাদলার দিনে তার পরের সন্তানটিরও সন্ধের মুখে পেটব্যথা আর জ্বরের উপসর্গ দেখা দেবে।