Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বস্তারের দেবদেবীরা, পর্ব — দুই

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

চতুর্থ উপকথা, পর্ব — এক এখানে

 

শীতলা    

গোণ্ড আদিবাসীদের গ্রামে গ্রামে দেখা যায় শীতলার থান। গত অর্ধ সহস্রাব্দ জুড়ে বাণিজ্যিক-ঔপনিবেশিক-বর্ণবাদী ক্ষমতাগোষ্ঠীর লুঠতরাজের ফলে ক্রমবর্ধমান মহামারীর করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে শীতলাপুজোর আশ্রয় নেয় উপমহাদেশের পূর্বভাগের মানুষ -– মূলতঃ, বাঙ্গাল, বিহার, ওড়িশা, অহম-এর বিভিন্ন অন্ত্যজ সমাজেরা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঐ একই সময়কাল ও তার আগের থেকেই, চিহ্নিত অঞ্চলের কৌমসমাজ অপসৃয়মাণ অরণ্য তথা সামন্তবাদ-নির্দিষ্ট স্থায়ী-কৃষির বাণিজ্যতাড়নায় ক্রমশ তাদের টোটেম হারিয়ে ফেলছিল। তাদের টোটেমনির্দিষ্ট এন্ডোগ্যামি পরিবর্তিত হচ্ছিল ব্রাহ্মণ-নির্দিষ্ট গোত্রভিত্তিক এন্ডোগ্যামি-তে। পূর্ব উপমহাদেশের আদিবাসী ক্রমশ গ্রহণ করছিল দলিত ও মুসলমান আইডেন্টিটি। সেই সময়ের ছবি এইচ এইচ রিসলি দিয়েছেন -– কীভাবে সেই সময়ে এই এন্ডোগ্যামি পরিবর্তন তথা রক্তান্তরের ফলে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলীন্যপ্রথা, সহমরণ, পুনঃবিবাহ ইত্যাদি প্রথা প্রবল আকার ধারণ করেছিল পূর্ব উপমহাদেশে। এই অঞ্চলে আসলে তখন ব্রাহ্মণ ও জমিদাররা একটু একটু করে সম্পূর্ণ কবজা বসিয়ে ফেলল কৌমলোকের ব্যক্তিমালিকানাবিহীন ভূসম্পদের উপর।

মহামতি এঙ্গেলসের রচনায় আমরা জানি কীভাবে মাটির উপর মালিকানা-দখল ও পুরুষ দ্বারা নারী তথা সমগ্র নাপুরুষ জেণ্ডার-স্পেক্ট্রামকে বস্তু বা ‘চ্যাটেল’ আকারে দেখা ও মালিকানা জাহির করবার প্রচেষ্টা তথা সামগ্রিক পুরুষতান্ত্রিক ধাঁচা-নির্মাণ কার্য্য-কারণ-সাম্বন্ধিক। বুড়ো কুলীন বামুন মরলে তাই তার জমি যাতে যথার্থ ব্রাহ্মণপাত্রেই যায়, তা সুনিশ্চিত করতে তাই সতীদাহপ্রথা। একই কারণে অর্থশাস্ত্রে মাটির উপরে রাজা ও মনুসংহিতায় নারী ও ‘নিম্ন’বর্ণের উপরে কী কী ভাবে মালিকানা হক ফলাবে পুরুষ ও ‘উচ্চ’বর্ণ -– তা এত তর্জন গর্জন করে নিদান দিয়ে গেছে ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণপুষ্ট হিন্দুধর্ম যখন পূর্ব উপমহাদেশের কৌমলোককে আদিবাসী থেকে দলিতে পরিণত করছিল, অর্থাৎ টোটেম রূপান্তরিত হচ্ছিল গোত্রে, সেই সময়েই বাণিজ্য, ঔপনিবেশিকতা, আর্য ও শ্বেতাঙ্গ জাতিদের বর্ণবাদ এইসবের কারণে উপদ্রুত লোকসমাজে উপর আছড়ে পড়েছিল নানান মহামারী-মন্বন্তর। আর তার প্রকোপ থেকে রেহাই পেতেই ভক্তিপথে ‘শীতলা’-পুজো আরম্ভ করে দলিতসমাজ।

কিন্তু দণ্ডকবন সহ সমগ্র গোণ্ডওয়ানার প্রায় সবকটা আদিবাসী গ্রামেই যে ‘ম্যাজিক-হিলিং’-এর দেবী শীতলা থান পাচ্ছে, গোণ্ডি ভাষা-প্রাকৃতি অনুসরণ করলে তার নামের অপরাপর এটিমোলজি প্রকাশ পায়। এই সব অঞ্চলে অজস্র নদী, নালা, ঝিরা, ঝোরা, কাঁদোর, খাল, বিল রয়েছে, রয়েছে ইতিহাসের ধূসর কালে বিভিন্ন দলপতি-মাঁঝিদের তত্ত্বাবধানে উৎখণিত কৃত্রিম ট্যাঙ্ক-জলসত্র-তালাও-পরিখা; তাছাড়া মাটির নীচে যেখানে অনেক বক্সাইট ও অন্যান্য মিনারেল, যেরকম বস্তার তথা দণ্ডকবন সহ মধ্যভারতের সামগ্রিক আদিবাসী এলাকা (অপর নামচিহ্ন এটিমোলজি পথ ধাবন করলে জানা যায় -– দণ্ডকারণ্যের ‘দণ্ডক’ শব্দটা এসেছে শবর ভাষার শব্দ ‘দন’ ও ‘ডক’ থেকে। দু’টি শব্দের মানেই, ‘জল’, একত্র, লোকবচনে, ‘দণ-ডক’-এর তাই অর্থ দাঁড়ায় ‘জল-টল’)। সব মিলিয়ে এত যে জল, অথচ পথগুলো তো মেটে। তাতেও আবার নিবিড় বনস্পতিদের ছায়া -– পাতা-ফল-ফুল ঢেকে থাকে সেইসব বনের সরু সরু পথ, তাতে আবার নিরন্তর রিভার্স-অসমোসিস-এর ফলে কুয়াশার মতো বাষ্প ঘিরে ধরতে থাকে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তে। তাই, রাস্তায় খুব কাদা হয়, চলাফেরা দুষ্কর হয়। ‘কাদা’-কে গোণ্ড ভাষায় বলে চিখল। ওড়িয়া, হিন্দী ও চর্যাপদের সময়কার প্রোটো-বাঙলাতেও ‘চিখল’ শব্দ ব্যবহৃত। (স্মর্তব্য : ‘ভবনঈ গহন গম্ভীর বেগে বাহি/ দু’অন্তে চিখল মাঝে ন ঠাঁহি’)। তো, এই চিখল বা কাদা থেকে রক্ষা করে বনপথ সুগম করতেই চিখলা দেবীর পুজা প্রচলন। কালক্রমে ‘অপেক্ষাকৃত হিন্দু’ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যগোত্র-ব্যবস্থার অন্তর্গত লোকারাধ্যা ম্যাজিক-হিলিং-এর অধিষ্ঠাত্রী ‘শীতলা’র নামে সাথে মিলেমিশে গিয়েছে গোণ্ড আদিবাসীদের এই কাদা-মাটির দেবী চিখলার নাম।

হিংলাজ

অপর এক অদ্ভুত আদিদেবী ‘হিংলাজ’। বালোচিস্তানস্থ মরূতীর্থ হিংলাজ সিন্ধুসভ্যতা তথা প্রাগার্য, প্রাগ-লৌহ যুগকাল থেকে উপমহাদেশময় লোকসমাজে বিন্যস্ত, যেমন বিন্যস্ত বাকু-র জ্বালামুখী থেকে হিমাচলের জ্বালামুখী-হিড়িম্বা অবধি লোকভক্তির ধারাপাত। এগুলো সব আদিমানবের পৃথিবী বা মাটি-কে নারী ও মা হিসেবে পুজোআচ্চা করবার প্রাচীন শিকড়। বস্তার সহ সমগ্র গোণ্ডওয়ানার প্রোটো-দ্রাবিড় সংস্কৃতির সাথে এই হিংলাজ পুজোর মাধ্যমে আমরা টের পেয়ে যাই বালোচ প্রাক-সিন্ধু কমন ভক্তিধারার। সংস্কৃতির, শাসনের মালিকানাবাজির দালাল আজকের ব্রাহ্ম্যণ্যাভিমানী অন্বেষক আজও ‘commons’-এর ধারণাকে ঠাঁই দেবে না ভূ-ভোগের আইনি হিসেব অথবা কালচার-এর সংস্কৃত তথা নাপ্রাকৃত সংজ্ঞাবোধে। বস্তারের গ্রামে গ্রাম পুজো পাচ্ছে ‘হিংলাজ’, গোণ্ড আদিবাসী দেবী হিসেবেই। আবার মধ্যভারতের আদি-প্রস্তর-যুগের গুহাচিত্রদের সাথে সিন্ধু-সভ্যতার শীলমোহরাদির চিত্রলিপি তুলনামূলক অন্বেষণ করছে আজকের গোণ্ড গবেষক। লিপিচিত্রদের ‘রুট মেম্ব্রেন’ হিসেবে ব্যবহার করছে বিভিন্ন টোটেমে-টোটেমে ব্যবহৃত প্রাকৃত চিহ্নচ্ছবিদের। কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত, উপরবর্ণিত প্রোজেক্টের ফলে মোতি‘রাবেণ’ কাঙালী প্রাগার্য তথা প্রোটো-দ্রাবিড় ভাষা ও টোটেম-সংস্কৃতির মালমসলা দিয়ে সাঁকো বাঁধছে সিন্ধু সভ্যতা ও গোণ্ড সভ্যতার।

ভৈঁসাসুর

এই রকমই এক প্রাগার্য প্রাচীন ভক্তিব্রিজ পাওয়া যায় গোণ্ড আদিবাসীদের গ্রাম গ্রামে ভৈঁসাসুরের গুড়ি থেকে। মুণ্ডারী ভাষাগোষ্ঠী আদিবাসীদের মধ্যেও মহিষাসুর-পুজোর প্রচলন দেখা যায়। তাদেরই মধ্যে এক এক সম্প্রদায় আবার ‘অসুর’ নামচিহ্ন ধরে রেখেছে গোষ্ঠীনামেই। বস্তারের গ্রামে গ্রামে যে ভৈঁস-অসুরের পুজোপাঠ হতে দেখা যাচ্ছে, তা-ও সেই একই কালচারাল কন্টিনিউইটির অন্তর্গত।

সেই প্রাকৃতসরণীতে বহুদূর অতীত ছায়া ফেলেছে। প্রাগার্য ব্রোঞ্জযুগে, খ্রিস্ট জন্মের হাজার দেড়-দুই বছর আগের মেসোপটেমিয়াতে অমিত ক্ষমতা একত্র করছেন অসুর-রাজারা তাদের অ্যাসিরিয়া সাম্রাজ্যে। আবার মোষের পিঠে আসীন সেই অ্যাসিরিয়ার অসুরনগরীর অসুরদেবের থান রক্ষা করছে সেদিনের সেই সেমিট-দ্রাবিড় কৌমলোককে। সেইখানে দেখি, অসুরের আরাধানা পাচ্ছেন সিংহারূঢ়া দেবী ইশতার। সেদিনের মেসোপটেমিয়ার লোকেরা তখনকারই চলতি সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের ডাকত ‘মেলুহা’ বলে। এই ‘মেলুহা’দের রাজ্যপাটের ভিতরেও কোথাও পুজো পেত হিংলাজ, কোথাও আবার শীলমোহরে, মুদ্রায় খচিত হচ্ছে সিংহ-মহিষ ইত্যাদি পশু-অবয়ব, আবার কোথাও শোভা পাচ্ছে চাঁদ-সূর্য-গাছগাছালি ইত্যাদি প্রাকৃত বস্তুচিত্র-সমাহার। অসুরের পুজো পাওয়া মাদার-আর্থ ডিভিনিটির উপর অসুর-বধের কাহিনী চাপানো গঙ্গা-কিনারে ওয়ালা ব্রাহ্মণ্যসংস্কৃতির প্রকোপ, তথা আদিমাতা, পশুপতি ও প্রকৃতির উপাসকদের রুটলেস করে, পৃথিবী, মাটি ও ভূমির থেকে মনোগত, ভক্তিগত তথা সংস্কৃতিগতভাবে বিচ্ছিন্নমূল করবার কূটিল সহিংসতা পুরুষতান্ত্রিক চক্রান্তেরই প্রকাশ।

রাজা রাও দেবী

জটবা-র মতোই আবার স্থানবিশেষে বীর যোদ্ধারা পুজো পেয়েছে বস্তারের বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে। এদের মহিমা বিস্তারের পিছনেও মধ্যযুগের ছিন্দওয়াড়া টোটেমবাহী শাসকবংশের জটবা অথবা আদিযুগের কাকতিয় বংশের ইন্ডিজিনাস প্রতিষ্ঠাতা দলপতি ভেন্না, গুণ্ডা-দের যে ক্ষুরধারকে এমনকি সেকালের ব্রাহ্মণ্যাভিমানী লিপিকার, বংশকার, ইতিহাসকারেরাও চিহ্নিত করে গেল ‘দুর্জয়’ হিসেবে, তাদের বীরগাথার নানান লোকবয়ান রয়েছে। এইভাবেই পুরাকথার প্রলেপ এতটাই লেগে গিয়েছে বস্তারের উত্তর-পশ্চিমের গভীর বনাঞ্চলে মুখ লুকোনো গ্রামগুলোতে এক ঐশী মিথিক-হিরো রাজা-রাও-এর লেজেণ্ড-বিস্তারে, যে তার পিছনের প্রামাণ্য ইতিহাস, দিন-কাল-টোটেম-গোত্রের ছবিগুলো, আস্তে আস্তে মুছে গিয়েছে।

মধ্যযুগের অন্তঃকালে বারংবার যুদ্ধবিগ্রহে সৃষ্ট মূলবাসী যোদ্ধাবাহিনী ও তাদের কৌমে মিশে যাওয়া 

ছত্তিসগড়ের অবুজমাড় পাহাড় আর মহারাষ্ট্রের গড়চিরৌলীর মধ্যে রয়েছে কিছু দুর্লঙ্ঘ্য অথচ অগম্য নয় এই ধরণের পাকদণ্ডী-পাস ইত্যাদি। সেই পথেই মারাঠা হিন্দু সামন্তবর্গের লুণ্ঠনকামী ঘোড়ারা ছুটে এসেছে বারেবারে, বস্তার-দণ্ডকারণ্যের আদিবাসীদের উপর নানান জুলুমবাজি চালিয়ে পুবপথে ওড়িশার মালকানগিরি পর্বতমালা পেরিয়ে ইন্দ্রাবতীর বিপরীত ধারা ধরে কোরাপুট-কালাহাণ্ডি-বোলিঙ্গা অতিক্রম করে প্রবল পরাক্রমে বাঙলার গাঁ-গঞ্জের দিকে ছুটে গিয়েছে সেই সামন্তশ্রেণীরই একদল ‘বর্গী’। সেই সব সময় জুড়েই উপমহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম জুড়ে নিরন্তর জংবাজির ফলে তৈরি হয় কিছু আদিবাসী-মূলবাসীদের যোদ্ধাবর্গ। ফৌজবাহিনীর সাথে বেরিয়ে বস্তার, বিদর্ভের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে বসে গিয়েছে সেই সব মূলবাসী তথা আদিবাসী-দলিত যোদ্ধারা। বিভিন্ন কারণে তারা ঘরে ফেরেনি, ভুররা আর কোতির ছেলেমেয়েদের মতোই। হয়তো মহারাষ্ট্রের তৎকালীন শাসকশ্রেণী ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সেনাদের চোটদাপট তাদের সয়নি। এইভাবে যাযাবরবৃত্তি করতে থাকা মূলবাসী যোদ্ধারাই, বর্গী হামলা বা ভোঁসলে-রাজাদের দাপট শুরু হওয়ার আগেই, মানে আরংজেবের দক্ষিণ-দেশের অভিযানগুলো যখন থেকে ধ্বসে যেতে থাকল এবং দক্ষিণ মালভূমির মাঝি, মুকুরদুম তথা বিভিন্ন চিফটেন-শাসিত বিভিন্ন আদিবাসী সমাজের শাসনব্যবস্থায় তার প্রকোপ পরতে লাগল, তখন থেকেই, এই সব ঘুরতে ফিরতে থাকা কৌমগুলোই যে অঞ্চলে ক্রমশ সেটল করতে থাকে সেই সব বসতিগুলোকেই ১৭০২ সালে বখত বুলন্দ শাহ নামে এক স্থানীয় ‘সাপ’ টোটেমধারী দলপতি একত্র করবার অভিপ্রায়ে প্রতিষ্ঠা করল অধুনার নগরী নাগপুর। আবার নাগপুরের অপর এটিমোলজিকাল সূত্র দিচ্ছেন মোতি কাঙালি ‘গোণ্ডিনাং-পুর’, অর্থে, গোণ্ডিদের পুর। গোণ্ডি ভাষায় ‘নাং’-প্রতয়ের অর্থ ‘সমষ্টি’ — ‘দের’। এই নগরপত্তনের শতবর্ষ অতিক্রান্ত হতে না হতেই যে মারাঠা রাজা আর ইংরেজ রাজাদের যুদ্ধ-বিগ্রহে ভরমার রাইফেল হাতে ক্যানন-ফডার হল মূলবাসীদের ‘পিণ্ডারী’ বাহিনী। বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিল বিভিন্ন গোণ্ড ও অন্যান্য ইন্ডিজিনাস দলপতিরা। ইতিহাসের এই ধূসর দৈর্ঘ ধরেই এইভাবে বস্তারে বসত আরম্ভ করে হালওয়া আদিবাসীরা। এদের মুখের ভাষাটা মূলতঃ গোণ্ড-ভাষা আর মারাঠী ভাষার মিশ্রণ। সেই মিশ্রণ এতটাই গভীর যে আজ আদিবাসী হালভা আর গোণ্ডদের মধ্যে ফারাক যারা এইসব ভাষা বোঝে না তাদের পক্ষে এদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক মিটিং-বৈঠক-আড্ডাগুলোর থেকে বুঝে নেওয়া দুষ্কর। শুধু আজই নয়, কোম্পানি শাসনের ছায়া ধরে ধরে যখন উপমহাদেশে মন্বন্তর আসন্ন হয়েছিল, তখন ছোটনাগপুরের মালপাহাড়িয়া আদিবাসী, সুবে-বাঙলার পুবদেশের ফকির বিদ্রোহদের সমসাময়িকি তাল ঠুকেই পশ্চিম বস্তারের ছোটপাহাড়-বড়পাহাড় জুড়ে  জমিদারতন্ত্রের তথা ট্যাক্স-আদায়কারীদের ক্রমবর্ধমান জুলুমবাজির বিরুদ্ধে ‘ছোটে ডোঞড়-বড়ে ডোঞড়’ জুড়ে মাদল বাজিয়ে যুদ্ধে গেছিল হালওয়ারা। এদেরই একটা নীতিমূলক কাহিনী বর্ণনা করেছি আগের এক অধ্যায়ে। এবং, সেই মধ্যযুগের অন্তকাল ও উপনিবেশ-যুগের আরম্ভকালের বিস্তীর্ণ টাইমস্কেপের ঘূর্ণিধুলো ছুটিয়েই হয়তো, গড়চিরৌলীর পাহাড়ি দুর্গম প্রহরার আড়ালে, অবুজমাড় পাহাড়ের উত্তরের কোল ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল এইরকম কোনও দলপতি বা জমিদার, যে, যুগের হাওয়ায় নামের সাথে পদবী বা উপাধি-র অলঙ্কার এঁটেছিল ‘রাও’, আজও যেইরকম সাবেকি ভূস্বামীতন্ত্রের স্মৃতিপালনে ‘ঠাকুর’, ‘প্যাটেল’ এইসব উপাধি রাখে অনেক টোটেমমুখীন আদিবাসীরাও।

রাজা রাওয়ের নামে একটা বিরাট পাহাড়ের নাম হয়ে গেল ‘রাওঘাট’, যা আজও ছত্তিসগড়ে ভ্রমণকালে জেলা কাঙ্কের, সাব-ডিভিশান অন্তাগড় থেকে জেলা নারায়ণপুরে উত্তর থেকে দক্ষিণগামী পথে, পৌঁছতে গেলে, টপকাতে হবেই।

 

এরপর চতুর্থ উপকথা, শেষ পর্ব