Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

উগ্রডানের অগ্রযাত্রা

মোহাম্মদ ইরফান

 

দুহাজার আঠারোর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব। শতবর্ষ আগে ঊনিশশো আঠারোয় নাৎসীবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের শুরু জার্মানীতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত-ইঙ্গ-মার্কিন মিত্রশক্তির কাছে জার্মান-ইতালীয়-জাপানী অক্ষ শক্তির নির্মম পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাসীবাদের ইউরোপীয় ভিত্তিমূল ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেলেও যুদ্ধোত্তরকালের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পুনরাবির্ভাব ঘটেছে নব্য ফ্যাসীবাদীদের। গত কবছরে বিশেষ করে গত বছরে রক্ষণশীল উগ্র ডানপন্থীদের দ্রুত উত্থানের যে ধারা দেখা গেছে বিত্তশালী, উচ্চ, মধ্য আয়ের কতিপয় দেশে তাতে করে শঙ্কা জেগেছে সকলের মনে — আবারও কি বিশ্বজুড়ে ফ্যাসীবাদী আগ্রাসনের সম্ভাবনা আছে অচিরে, অদূর কিংবা দূর ভবিষ্যতে?

মার্কিন দেশের শ্বেত প্রাসাদে লুটেরা ধনিক ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈধ প্রবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সতেরো। অনভিজ্ঞ ট্রাম্প উদ্বোধনী বর্ষে  নানান ঝামেলায় নাস্তানাবুদ হলেও বছরের শেষ নাগাদ অবস্থান সংহত করেছেন সুস্পষ্টভাবে ধনিকবান্ধব নূতন করনীতি পাশ করে। দাম্ভিক, নারীদ্বেষী, অভদ্র, বর্ণবাদী এমনি নানান উপাধিতে নানান সময়ে ট্রাম্পকে ভূষিত করা সজ্জনেরা সহ (একজন বাদে) সকল সিনেট রিপাবলিকান সমর্থন দিয়েছে এমন এক ট্যাক্স পলিসিতে অদূর ভবিষ্যতে যা মার্কিনীদের বাধ্য করবে সামাজিক কিংবা নিরাপত্তামূলক ব্যয় কমিয়ে দিতে। উত্তর কোরিয়াকে উস্কে দেয়া কিংবা একতরফাভাবে জেরুজালেমকে ইজরেয়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন সামরিক ব্যয় কমানোর কোনও ইচ্ছাই তাঁর নেই। যথেচ্ছ সামরিক ব্যয়, নেট নিউট্রালিটির মতো সমতামূলক বিধিবিধানের অবসান, মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার করমুক্তি ইত্যাকার পদক্ষেপে ট্রাম্প এবং তাঁর মদতদাতারা পুঁজিবাদী বাজারেও সংকট ডেকে আনবেন পুনরায়। দুহাজার সাত-আটের তীব্র মন্দার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভুক্তভোগী মার্কিন আমজনতা ওবামাকে বেছে নিয়ে অন্তত বছর আটেকের জন্য ঠেকাতে পেরেছিল ম্যাকভেইদের মাভৈ। তবে বিগত পঁচিশ বছরের দুই-মেয়াদী ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে কুড়িকুড়ির নির্বাচন ট্রাম্প আবারও ট্রাম্প করে ফেললে আট বছর ধরে যে মোচ্ছব চালাতে থাকবে সেই সামাজিক ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে আমেরিকার, এমনকি স্যান্ডার্স জাতীয় কোনও প্রগতিবাদীও যদি উঠে আসে দুহাজার চব্বিশে।

যুক্তরাষ্ট্রে ওবামার আটের মতো ব্লেয়ার-গর্ডন আমলে উগ্রবাদের বিস্তারে ছেদ পড়েছিল যুক্তরাজ্যে। ব্রিটিশ বি,এন,পি-র জনসমর্থনে ভাটা পড়েছিল কিছুটা। তবে বছর খানেক আগে ইউরোপীয় যুক্তব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশ জাতিকে সরিয়ে আনার প্রশ্নে ডান-বাম যুক্ত বিরোধিতার মোকাবিলায় নেমেছিল জাত্যাভিমানী উগ্র ব্রিটিশ ডান। সুপরিকল্পিত কৌশলে অসম অর্থনৈতিক উন্নতির শিকার জনগণকে সংগঠিত করে বিজয়ীও হয়েছে তারা। ব্রেক্সিট বিজয়ী ব্রিটিশ ট্রাম্প বরিস জনসনের নাম গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়েছে দশ নম্বর ডাউনিং-এর সম্ভাব্য বাসিন্দা হিসেবে।

শঙ্কা ছিল সতেরোতে শাঁজেলিজেও ঢুকে পড়বে ডান উগ্রবাদীরা। বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরসূরী ফরাসীরা বাঁচিয়েছে এযাত্রা, ঠেকিয়ে দিয়েছে মাদাম ল্যপেঁকে। তবে মুক্তচিন্তার জন্য গর্বিত ফ্রেঞ্চ সমাজে বাবা ল্যপেঁর তুলনায় কন্যার জনপ্রিয়তার এই জোয়ার চোখে পড়ার মতো। এর কারণটি ইঙ্গ-মার্কিন সমাজের মতোই কি অর্থনৈতিক না মূলতঃ সামাজিক সেটি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম অসম ফরাসী দেশে — জিনি সূচক কিংবা ধনী/গরীবের আয় অনুপাত দুই নিরিখেই ফ্রান্স আমেরিকার চেয়ে প্রায় দশ পয়েন্ট নীচে — অর্থনৈতিক অবিচার খুঁজতে গরীবির মাপকাঠি বাড়াতে হয় মাত্রায়, বঞ্চনার ভুক্তভোগী যতটা না শ্বেতকায় ফরাসীরা তার চেয়ে অনেক বেশী প্রান্তিক পরিচিতির জনগোষ্ঠীরা। সেই ধরনের গভীর বিশ্লেষণের অনুপস্থিতিতে উগ্র ডান জাতীয়তাবাদী  উত্থান ফরাসী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার উপর মৌলবাদী ইসলামী সন্ত্রাসীদের একের পর এক নির্মম আঘাতের আশু প্রতিক্রিয়া মাত্র বলে মনে হতে পারে। তবে সেই একমাত্রিক বিশ্লেষণই যে উচ্চচেতনার ফরাসীদের বেশি আকৃষ্ট করছে তার প্রমাণ সমাজতান্ত্রিক ওঁলাদের উত্তরসূরী হিসেবে নরম-ডান ম্যাঁক্রোর বিজয়, চরম-ডান মারীর বর্ধন। গদিনসীন ফরাসী নেতৃত্বও পাল তুলেছেন এই দখিনা বাতাসে। অর্থনীতিবিদ পিকেটি যখন মজুরির উপর মুনাফার আধিপত্য তথ্য উপাত্ত দিয়ে নূতন করে প্রমাণ করে সমাজতন্ত্রের সপক্ষে নূতন করে সমর্থন তৈরি করছেন সারা বিশ্বে পিকেটির প্রধানমন্ত্রী তখন ব্যস্ত ৯/১১ পরবর্তী আমেরিকান রক্ষণশীলদের মতো বাকস্বাধীনতা বিনাশী জননিরাপত্তা আইন প্রণয়নে।

বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধিনিষেধের কারণে যেই জার্মানীতে কখনওই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি নাৎসীরা সতেরোর নির্বাচনে সেদেশেও তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উগ্র ডান বিকল্প এ,এফ,ডি। হিটলারের মাতৃভূমি অস্ট্রিয়ায় সেভাবে কখনওই নিষিদ্ধ হয়নি নাৎসীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। ফলস্বরূপ শতাব্দী শেষ হতে না হতে সেদেশে সরকার গঠন করেছিল নব্য-নাৎসীরা ইয়র্গ হাইডারের নেতৃত্বে। দুর্নীতি-অপশাসনের কারণে হাইডার পরবর্তীতে ক্ষমতা হারালেও দমে যায়নি তার দল। নিজেদের ঢেলে সাজিয়ে তরুণ-সুদর্শন ডান রক্ষণশীল সেবাস্টিয়ান কুর্জের জোটের মাধ্যমে অস্ট্রিয়ার মন্ত্রীসভায় আবারও ঢুকে গেছে হাইডারের দল। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে বেরিয়া আসা রাশিয়ায় নিজ জনগণের দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরাক্রমশালী মার্কিন প্রতিপক্ষের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে ভ্লাদিমির পুতিনের বিরূদ্ধে। শুধু ট্রাম্প-ই নয় হাঙ্গেরীর অতিডান ওরবানের পক্ষে ইলেক্ট্রনিক জালিয়াতির অভিযোগও উঠেছে পুতিনের বিরূদ্ধে। আর ফ্রান্সের ল্যপেঁ-তো তার নির্বাচনী খরচ চালাতে রীতিমতো মালকড়ি ধার চেয়েছিলেন পুতিনবান্ধব এক রাশিয়ান ব্যাঙ্কের কাছে।

এমনকি প্রগতিশীল ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে নিত্য উদাহৃত সোশাল ডেমোক্রেটিক স্ক্যান্ডিনেভিয়াতেও উত্থান ঘটেছে প্রতিক্রিয়াশীল পপুলিস্ট দলের। নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্ক, কিংবা ফিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে ঢুকে গেছে উগ্র ডানেরা ইসলামবিরোধী, শরণার্থীবিরোধী কর্মসূচী দিয়ে। পোল্যান্ড, চেক, হাঙ্গেরীর মতো তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়ের পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতেও ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ডান চরমপন্থী রাজনৈতিক দল।

ইউরোপের যে অঞ্চলে নাজী উত্থান চোখে পড়ে না এখনও সেটি আইবেরীয় পেনিনসুলা। স্পেন আর পর্তুগালের জনগণের স্মৃতিপট থেকে এখনও বোধহয় মুছে যায়নি ফ্রাঙ্কো কিংবা সালাজারের দুঃশাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দু থেকে তিন দশক পরের স্মৃতি সেটি। আর এই শাসকদের বিতাড়নও করেছিল তাদের নিজেদেরই জনগণ, বিদেশী সামরিক জোটের হাতে পরাজিত হয়নি তারা হিটলার কিংবা মুসোলিনীর মতো।

ডানপন্থী লোকরঞ্জকবাদিতায় উন্নত দেশের তুলনায় কখনওই পিছিয়ে ছিল না উন্নয়নশীল অঞ্চল। পার্থক্য শুধু একটিই। মোদী কিংবা এরদোয়ানেরা সনাতনী পূর্ব মানসিকতা মাথায় রেখে “ইমাজিনড” জাতীয় পরিচয়ের বদলে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করেই নিজেদের হালাল করেছে। ল্যাটিন আমেরিকা অবশ্য এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। পলাতক নাজীদের আশ্রয়দাতা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কিংবা চিলের পেরনপন্থীদের কাছে আর্যরক্তের বিশুদ্ধতার চেয়ে বড় কিছু নেই।

সাম্প্রতিক কিংবা ইতঃপূর্বের ফ্যাসিবাদী উত্থানের প্রকৃতি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে ইতঃমধ্যে। দু হাজার আঠারোর মতো দু হাজার সতেরোর শুরুতেও উদ্বেগ উৎকন্ঠার আভাস পাওয়া গেছিল বিশ্লেষকদের কণ্ঠে। অড্রে শিহী ফেব্রুয়ারীর হার্ভার্ড পলিটিক্যাল রিভিউ-তে লিখেছিলেন — “Over the past year, far right political parties have made major gains in divisive elections throughout the West.” এই ধরনের জার্নালিস্টিক এমনকি অধিকাংশ একাডেমিক লেখায় ফ্যাসিবাদের ধরন বর্ণনা যতটা বিস্তৃত হয়, এর কারণ অনুসন্ধান ততটা গভীর হয় না। ঐ একই লেখায় শিহী যেমন সংশ্লেষণ করে এনেছিলেন ফ্যাসিবাদী প্রচারণার প্রধান দুটো উপাদান, একটি অর্থনৈতিক অপরটি সামাজিক। তবে যদি আমরা ধরে নিই কেবল এই দুটো ব্যাপারই — বঞ্চিত শ্রমিকশ্রেণীকে কোনওমতে বোঝানো যে বিশ্বের অপরাপর দেশের লোকেদের কারণেই তাদের এই দুর্দশা আর এর জ্বাজ্জল্যমান দৃষ্টান্ত হিসেবে শরণার্থী স্রোতের দিকে অঙ্গুলি উত্তোলন — উগ্র ডানের উত্থানের কারণ তবে সেটি একাধারে টটোলজিক্যাল এবং উদোর পিণ্ডি উদোরই ঘাড়ে চাপানো অর্থাৎ “ভিকটিম ব্লেমিং”-এর দায়ে দুষ্ট। কার্যকারণ সম্পর্ক আরও কয়েক ধাপ বিস্তৃত করতে হলে আমাদের জানতে হবে — কোন পরিস্থিতিতে, কী ধরনের আর্থসামাজিক উৎপাদন বণ্টন ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে বঞ্চিত আর বঞ্চকের মাঝে অলঙ্ঘ্য দূরত্ব তৈরি হয়; মনোজাগতিক বিকাশ আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কোন ধরনের বিবর্তন কি ম্যানিপুলেশন প্রয়োজন ব্যাপক কোনও জনগোষ্ঠীকে পরিচিত, অপরিচিত, বাস্তব কিংবা কাল্পনিক কোনও এক “অপরের” বিরূদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য। এইসবের বিস্তারিত আলোচনা এই নিবন্ধের বিষয়বস্তুর মধ্যে বিবেচ্য হয়নি। তাই এই কার্যকারণ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে ছোট্ট আর একটি বিষয়ের অবতারণা করেই এ বিষয়টি শেষ করব।

বিশ্লেষকদের অনেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদীদের কথা বলতে গিয়ে এর লোকরঞ্জকবাদী বা পপুলিস্ট কৌশলের প্রসঙ্গটি এনে দ্রুত সিদ্ধান্তে চলে আসেন — এধরনের চরম-ডান আসলে সমাজতন্ত্রী বামেরই আরেক সংস্করণ। আসলে কি তাই? ফ্যাসিবাদী জাত্যাভিমানী, সমাজতন্ত্রী আন্তর্জাতিকতাবাদী। ফ্যাসিবাদী নিজেদের অবস্থার জন্য দায়ী করে সমান্তরাল কোনও “অপর” গোষ্ঠীকে, সমাজতন্ত্রী উল্লম্ব অসাম্যের কারণ খোঁজে পুঁজির মালিকের শ্রমচুরিতে। ফ্যাসিবাদী যুদ্ধের দামামা বাজায় জাতিতে জাতিতে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে, সমাজতন্ত্রীর বিপ্লব কেবলই শোষক মালিকের বিরূদ্ধে। এইসব সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কোনও কোনও বিশ্লেষক গোষ্ঠী ফ্যাসিবাদ আর সমাজতন্ত্রকে এক কাতারে ফেলতে চায়। এই সুচিন্তিত ভ্রান্তিবিলাস যাদের স্বার্থে তাদের খুব একটা আপত্তি নেই উগ্র ডানের উত্থান, বিকাশ, পতনের পুনরাবৃত্তিতে। “ফোর্সেস অ্যাওয়েকেন” আর “এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাকের” চক্রে জানমালের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয় বটে তবে ব্যবসাও মন্দ হয় না এতে।

তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজোড়া যুদ্ধ শুরু হলে অবশ্য আর ছোটখাট ক্ষয়ক্ষতি নয় গোটা মানবজাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে। বিধ্বংসী অস্ত্রের যে ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে ধনী দেশগুলো তার ক্ষুদ্র কোন অংশও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে গোটা একটি জনপদকে। অপেক্ষা কেবল বোতামে চাপ দেয়ার। ট্রুম্যান সাহেবের বিগলি রেকর্ড অতিক্রম করার সুযোগ হলে মিস্টার ট্রাম্প কি টুইট সেরে ট্রিগার টানবেন না ট্রিগার টেনে টুইট করবেন সেই প্রশ্নের শতভাগ সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব কেবল হাইন্ডসাইটেই। তবে ট্রিগার টানার মতো পর্যায়ে বিশ্ব পৌঁছুবে কিনা দু-দশ বছরে সেটি অনেকাংশেই নির্ভর করে উগ্রডানের অব্যাহত অগ্রযাত্রার ওপর।

শেষের দু-শতক বাদে বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল বাম প্রগতিশীল রাজনীতির বিজয়কাল। একবিংশ শতাব্দীর যেটুকু আমরা এপর্যন্ত অতিক্রম করেছি, তাতে মনে হতে পারে এই শতাব্দীটি মনে হয় হবে ডান প্রতিক্রিয়াশীলদের। সহস্রাব্দের ঊষাকাল থেকে এই পর্যন্ত ইউরোপে ডান লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির শক্তি বেড়েছে দ্বিগুণ। দুহাজার সালে ইউরোপে নির্বাচনে দাঁড়ানো এই ধরনের দলের সংখ্যা ছিল চব্বিশ। দুহাজার সতেরো সাল নাগাদ তা বেড়ে হয়েছে ছেচল্লিশ। মোট ভোটের প্রায় আঠারো ভাগ পড়েছে এই দলগুলোর বাক্সে। এই গতি অব্যাহত থাকলে ইউরোপ গিলে ফেলতে সময় নেবে না খুব একটা ডান চরমপন্থীরা।

এই গতি অব্যাহত থাকবে কি থাকবে না তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, রাজনীতির কুশীলবদের নেওয়া নানান পদক্ষেপের ওপর। ইউরোপ-আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গত শতকের তুলনায় অনেক শক্তিশালী এখন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যতদিন গণতন্ত্রের পক্ষে, বাকস্বাধীনতা রক্ষার লক্ষে কাজ করে যাবে ততদিন উগ্র ডানের পক্ষে জনচেতনার বড় ধরনের কোনও ম্যানিপুলেশন সম্ভব নয়।

স্বতঃস্ফুর্তভাবে জনগণ আরও বেশি ডানে ঝুঁকবে কিনা, সেটি যেসব বিষয়ের উপর নির্ভর করবে তার একটি হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের আচরণে প্রজ্ঞা কিংবা তার অভাবের উপর। আমেরিকা-ইউরোপের পাশাপাশি বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের নামও উচ্চারিত হচ্ছে আজকাল। এশিয়া আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্রমাগত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে তুলনামূলভাবে চড়া সুদের চীনা ঋণের উপর। ঋণ আদায়ের যুদ্ধে বিশ্বব্যাঙ্ক আর চীনা সরকার একযোগে এগিয়ে এলে সত্তর আশির দশকের লাতিন আমেরিকার মতো উগ্র স্বৈরাচার ছড়িয়ে পড়তে পারে অনুন্নত বিশ্বে। উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুততর বিকাশ, অর্থনীতি বিশেষ করে কর্মসংস্থানের উপর এই বিকাশের প্রভাব এবং কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে সৃষ্ট সংকটও ফ্যাসিবাদীদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে যাবে যদি না যন্ত্রের কাছে কাজ হারানো লোকদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ, উত্তরণমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। আশা রইল, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সঠিক পরিকল্পনা অনুসৃত হবে দু হাজার আঠারো সালে।