অস্তিত্বের সংকট ও মুক্তির সুর: বব ডিলানের সঙ্গীতদর্শন

শুভব্রত সরকার

 


বব ডিলান আধুনিক সময়ের এমন এক প্রবক্তা বা 'Oracle', যিনি আমাদের কোনও সস্তা বা মিথ্যা সান্ত্বনা দেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, ক্ষমতাতন্ত্র আমাদের পিষে মারবে, সমাজ আমাদের অস্তিত্বকে এক চরম একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেবে এবং আমাদের নিজেদের অবচেতন মনস্তত্ত্ব প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করবে। এই চরম অস্তিত্ববাদী সংকটকে তিনি তাঁর গানে কোনও রাখঢাক ছাড়াই নগ্নভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। আর ঠিক এই নিরাভরণ স্বীকারোক্তির ভেতর দিয়েই তিনি জন্ম দিয়েছেন এক নতুন ধরনের মুক্তির দর্শন

 

সভ্যতার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে এক চারণকবি

আধুনিক মানুষের বেঁচে থাকাটা আক্ষরিক অর্থেই এক জটিল গোলকধাঁধা। একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের কড়া নজরদারি, বিশ্বায়িত পুঁজির আগ্রাসন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা গভীর নিখাদ শূন্যতা। এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আধুনিক মানুষ প্রতিনিয়ত এক অস্তিত্বের সংকটে ভুগে চলেছে। এই ধূসর, প্রায়-পরাবাস্তব জগতে দাঁড়িয়ে বব ডিলানের গান যেন আর কেবল কয়েকটা সুরের সমষ্টি নয়; হয়ে দাঁড়ায় অসুস্থ সভ্যতার এক নিখুঁত সাইকো-অ্যানালাইসিস। বব ডিলান কোনও ইউটোপিয়ান স্বপ্ন দেখান না, তিনি কোনও সস্তা আশার বাণী শোনান না। ডিলান এক তীক্ষ্ণ আয়না, যা সমাজের কাঠামোগত ভণ্ডামি এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতগুলোকে নির্মমভাবে প্রতিফলিত করে চলেছে। তাঁর গান যেন একই সঙ্গে আমাদের অস্তিত্বের সংকটকে ব্যবচ্ছেদ করে এবং সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই এক আশ্চর্য মুক্তির সুর নির্মাণ করে।

অস্তিত্বসংকট প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের এটাও মাথায় রাখা দরকার, ডিলান কিন্তু নিজেকে কখনও একটিমাত্র পরিচয়ে আটকে রাখেননি। রবার্ট অ্যালেন জিম্যারম্যান নামে ডুলুথ শহরে জন্ম নেওয়ার পর যুবক বয়সে যখন বাড়ি ছাড়েন বদলে ফেলেন নাম। হয়ে ওঠেন বব ডিলান। বদলে ফেলেন নিজের পরিবার ও জন্মস্থানের গল্প, যেমন বলতেন অনেককে ছোটবেলায় সার্কাসদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভবঘুরের মতো ঘুরে চলেছেন তিনি।

এর পরে যখন প্রথম রেকর্ডিং শুরু করেন তখন তিনি ছিলেন লোকগীতিকার, কিন্তু যখনই তাঁর সেই পরিচয় একটি ব্র্যান্ড হয়ে যেতে লাগল, তিনি বেরিয়ে এলেন সেই পরিচয় থেকে, চলে গেলেন ইলেকট্রিক রকসঙ্গীতে। তারপর সেখান থেকে আবার অন্তর্মুখী সঙ্গীতে, তারপর গসপেল এবং চলছে। মোদ্দা কথা, তিনি কখনওই নিজেকে একটি পরিচয়ে বাঁধেননি, এবার সেটাকে কি তাঁর অস্তিত্বের সংকট বলা যাবে কিনা তা কেবল ডিলানই জানেন। তাঁর কাছে জীবন “লাইক এ রোলিং স্টোন”, তাঁর জীবন ও তাঁর গানের কোনও ব্র্যান্ড হয় না। ডিলান ফেলে আসা পথে ফিরে যেতে ঘেন্না করেন। “Don’t look back”— সবেতে থেকেও কোথাও না থাকা, অনেকটা শঙ্করের দর্শনের মতন।

 

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও কাঠামোগত যন্ত্রণার রূপরেখা

ডিলানের প্রাথমিক দিককার সৃষ্টিগুলির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই এক তীব্র রাজনৈতিক সচেতনতা, যা প্রচলিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা ক্ষমতার কাঠামোর নগ্ন রূপটাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। ষাটের দশকের আমেরিকা তখন ঠান্ডা যুদ্ধের উত্তাপে ফুটছে, ভিয়েতনামে চলছে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। এই প্রেক্ষাপটে ডিলান লেখেন “Masters of War” যা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের সামরিক-শিল্প কাঠামোর বিরুদ্ধে এক অমোঘ দার্শনিক চাবুক। ডিলান যখন গিটারে সুর তোলেন, তখন তিনি সেই অদৃশ্য ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তোলেন, যারা নিজেদের সুরক্ষিত প্রাসাদে বসে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে দাবার চাল চালে। এই গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের যন্ত্রণা কেবল তার ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত কাঠামোগত সহিংসতার ফল। ডিলান এখানে এক অর্থে মার্কসীয় শ্রেণিদ্বন্দ্বের কথা না বলেও, পুঁজিপতি ও যুদ্ধবাজদের দ্বারা সাধারণ মানুষের এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতার কথা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর চোখে, যতক্ষণ না এই শোষণের কাঠামো ভাঙছে, ততক্ষণ মানুষের কোনও পরিত্রাণ নেই।

 

অস্তিত্ববাদী শূন্যতা এবং নিহিলিজমের ছায়া

ডিলান কেবল বাইরের পৃথিবীর রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি, তিনি মানুষের ভেতরের শূন্যতাকেও এক অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র বা জার্মান দার্শনিক নিটশের লেখনীতে আমরা যেমন ‘ঈশ্বরের মৃত্যু’ বা জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থহীনতার কথা পাই, ডিলানের “A Hard Rain’s A-Gonna Fall” গানে সেই একই শূন্যতা এক অ্যাপোক্যালিপটিক রূপকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। এই গানে ডিলান যে নীল চোখের ছেলের কথা বলেন, যে এক ভয়াবহ, মৃতপ্রায় পৃথিবীর ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে তা আসলে আধুনিক মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় লেখা এই গানে ডিলান যে ‘বিষাক্ত বৃষ্টি’র কথা বলেছেন, তা কেবল বোমার তেজস্ক্রিয়তা নয়; তা হল আধুনিক সভ্যতার নৈতিক অবক্ষয়, যেখানে মানবিক সম্পর্কগুলি ক্রমশ যান্ত্রিক ও অর্থহীন হয়ে পড়ছে। এখানে ডিলান এক নৈরাশ্যবাদী প্রবক্তা, যিনি জানেন যে পুরনো সমস্ত মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে এবং মানুষকে এই ভয়ঙ্কর স্বাধীনতার মুখোমুখি একা দাঁড়াতে হবে

Come mothers and fathers
Throughout the land
And don’t criticize
What you can’t understand
Your sons and your daughters
Are beyond your command
Your old road is rapidly agin’
Please get out of the new one
If you can’t lend your hand/For the times they are a-changin’.

 

মনোসমীক্ষণ, স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত ট্রমা: ব্লাড অন দ্য ট্র্যাকস

রাজনীতির বৃহত্তর ক্যানভাস থেকে সরে গিয়ে ডিলান যখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁর কলম হয়ে ওঠে ফ্রয়েড বা লাকাঁর মনোসমীক্ষণের এক অমোঘ হাতিয়ার। মানুষের অবচেতন মন, তার আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ এবং ট্রমা কীভাবে তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ ডিলানের ১৯৭৫ সালের অ্যালবাম ‘Blood on the Tracks’। বিবাহবিচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত জীবনের চরম টানাপোড়েনের মাঝে লেখা এই অ্যালবামের গানগুলো বিশেষ করে “Tangled Up in Blue” বা “Idiot Wind” কেবল প্রেম বা বিরহের গান হিসেবে দেখলে তার মূল্যায়ন সঠিক হবে না, বলা যেতে পারে এগুলো মানুষের খণ্ডিত সত্তার দলিল। লাকাঁনীয় দর্শনে যেমন বলা হয়, মানুষের আকাঙ্ক্ষা কখনওই তৃপ্ত হওয়ার নয়, তা সর্বদা এক ‘অভাব’ দ্বারা তাড়িত হয় ডিলানের এই গানগুলোতেও আমরা সেই অন্তহীন অভাববোধ দেখতে পাই। স্মৃতি এখানে এক অন্ধকার গোলকধাঁধা, যেখানে মানুষ বারবার পথ হারায়। ডিলান দেখিয়েছেন যে, আমরা আসলে আমাদের অতীত ট্রমা এবং অবচেতনের বাসনাগুলির হাতে বন্দি। এই ব্যক্তিগত ক্ষত বা বিষাদকে তিনি এমন এক দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে, তা গোটা মানবজাতির সর্বজনীন যন্ত্রণার রূপক হয়ে উঠেছে।

 

পরিত্রাণের দর্শন: শূন্যতার মাঝেই প্রকৃত মুক্তি

তাহলে কি এই অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা থেকেই মানুষের আর ফেরা নেই? ডিলানের সঙ্গীত কি কেবলই অন্ধকারের কথা বলে? এখানেই বব ডিলানের দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটি লুকিয়ে আছে। ডিলানের কাছে পরিত্রাণ বা Salvation কেবল কোনও ঈশ্বরপ্রদত্ত অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি হল সমস্ত মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করা। কার্ল মার্কস যেমন পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছিলেন, ডিলান যেন গানে গানে সেই বিচ্ছিন্ন আত্মাকে তার মেকি জাগতিক পরিচয় থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনেন। আমরা সমাজে যে পদবি, সম্মান বা সম্পত্তির আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখি, ফরাসি মনোসমীক্ষক জাক লাকাঁর পরিভাষায় তা হল ‘সিম্বলিক অর্ডার’ বা এক ধরনের কাঠামোগত বিভ্রম। ডিলানের গান এই সমাজ-নির্ধারিত বিভ্রমের ওপর সরাসরি আঘাত হানে।

তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি “Like a Rolling Stone” গানটির কথা ভাবুন। আপাতদৃষ্টিতে এটি সমাজচ্যুত বা পথে বসে যাওয়া এক তরুণীর গল্প। কিন্তু অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোয় দেখলে এটি চরম স্বাধীনতার এক ইশতেহার। ডিলান যখন গেয়ে ওঠেন, “When you got nothing, you got nothing to lose/You’re invisible now, you got no secrets to conceal,” তখন তিনি আসলে সেই পরম শূন্যতার কথা বলছেন, যেখানে সমস্ত মুখোশ খসে পড়েছে। ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদে যাকে ‘র‍্যাডিকাল ফ্রিডম’ বা চরম স্বাধীনতা বলা হয়েছে, ডিলান এখানে সেই দর্শনেরই এক সাঙ্গীতিক ভাষ্য তৈরি করেছেন হয়তো। যতক্ষণ আমরা সমাজের তৈরি করা পরিচিতি বা সম্পর্কের মায়াজালে আটকে থাকি, ততক্ষণ আমরা পরাধীন। যখন আমাদের সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়, যখন আমরা আক্ষরিক অর্থেই ‘কিছুই না’ হয়ে যাই, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা এক চরম, ভয়ঙ্কর অথচ অসীম স্বাধীনতা লাভ করি। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিটশে যেমন মনে করতেন, পুরনো জীর্ণ মূল্যবোধ ধ্বংস হলেই তবে নতুন এবং স্বাধীন মানুষের জন্ম হতে পারে; ডিলানের গানেও আমরা সেই নিহিলিজম বা শূন্যবাদ থেকে উত্তরণের পথ দেখতে পাই। তাঁর “It’s All Over Now, Baby Blue” গানে এই ধ্বংস এবং নবজন্মের অমোঘ ইশারা ফুটে ওঠে— “Leave your stepping stones behind, something calls for you…” এই ডাক হল অস্তিত্বের শূন্যতাকে মেনে নেওয়ার ডাক। “Ballad of a Thin Man”-এর ‘মিস্টার জোনস’-এর মতো যারা চিরকাল যুক্তির ঘেরাটোপে জীবনকে মেপে বুঝতে চায়, তারা এই শূন্যতার ভাষা কোনওদিন আয়ত্ত করতে পারে না।

 

আর ঠিক এখানেই ডিলানের সেই বিখ্যাত ‘মিস্টিক’ বা রহস্যময় বাউলসত্তার চূড়ান্ত উন্মোচন ঘটে। তিনি যুক্তির অতীত এক বোধের কথা বলেন, যেখানে অতিরিক্ত চেষ্টা বা বিশ্লেষণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। মানবজীবন ও সম্পর্কের জটিল মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি এমন এক দার্শনিক নির্লিপ্ততায় পৌঁছান, যা আলবেয়ার কামুর ‘অ্যাবসার্ড’ দর্শনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই মহাবিশ্বের কাছে মানুষের জাগতিক যুক্তির যে কোনও দাম নেই, তা ডিলান গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তাই এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা থেকে তিনি উচ্চারণ করেন সেই অমোঘ শব্দবন্ধ:

Understand you know too soon, there’s no sense I am trying.

এই একটি পংক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ডিলানের নন্দনতত্ত্বের সবচেয়ে গভীর সত্য। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে জাগতিক হিসেবনিকেশ এবং যুক্তির সাহায্যে জীবনকে বশে আনার চেষ্টা কতটা অর্থহীন, তখনই সে সমস্ত বৃথা চেষ্টা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই নির্লিপ্তি কোনও পরাজয় নয়; বরং এটি হল নিজের অহং এবং মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা থেকে নিজেকে মুক্ত করার চূড়ান্ত পর্যায়। হয়তো ডিলান বলতে চেয়েছেন, এই শূন্যতা এবং নির্লিপ্তিকে আলিঙ্গন করতে পারাই হল মানুষের প্রকৃত পরিত্রাণ।

 

বাঙালির মননে ডিলান: দূরবর্তী এক আত্মার আত্মীয়

বাঙালির বৌদ্ধিক চর্চার সঙ্গে ডিলানের দর্শন খুব সহজেই মিশে যায়। বাঙালি চিরকালই রাজনীতিসচেতন এবং একই সঙ্গে বাউল দর্শনের উদাসীনতায় বিশ্বাসী। ডিলানের গানের ভেতরে কাঠামোগত শোষণের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ রয়েছে, তা সহজেই বাঙালির মার্কসীয় চেতনার সঙ্গে অনুরণিত হয়। আবার তাঁর গানের ভবঘুরেমি, সব ছেড়েছুড়ে অসীমের পথে হাঁটার যে আকুলতা, তার সঙ্গে বাংলার বাউলদের “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি” তত্ত্বের অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। বাঙালির সঙ্গে বব ডিলানের এক অদ্ভুত এবং গভীর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৬৭ সালে লন্ডনের অ্যালবার্ট হলে ডিলানের সঙ্গে বাংলার পূর্ণদাস বাউলের সাক্ষাৎ এবং পরবর্তীকালে ডিলানের অ্যালবামের কভারে বাউলদের ছবি, মহীনের গানে “ভালোবাসি পিকাসো বুনুয়েল দান্তে/বিটলস ডিলান ও বিঠোভেন শুনতে।” পরবর্তীকালে, নব্বইয়ের দশকে কবীর সুমনের হাত ধরে ডিলান আক্ষরিক অর্থেই বাংলায় প্রবেশ করেন। “Blowin’ in the Wind” যখন “কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়” হয়ে উঠে, তখন তা আর কোনও বিদেশি গান নয়; তা হয়ে ওঠে বাঙালির নিজস্ব প্রতিবাদ ও প্রশ্নের ভাষা। অঞ্জন দত্তের মতো শিল্পীরাও ডিলানের সঙ্গীতকাঠামো ও গল্প বলার ভঙ্গি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন, “যদি পারো চিনে নিও আমার ববি ডিলানকে…।” এসব বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অভ্যস্ত শ্রবণে অনভ্যাসের প্রথম অভিঘাতের অধ্যায়। বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজ ডিলানের গানে খুঁজে পেয়েছে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষোভ, ভাষা, মার্কসীয় শ্রেণিচেতনার প্রতিধ্বনি এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের বিষাদ।

 

উপসংহার

বব ডিলান আধুনিক সময়ের এমন এক প্রবক্তা বা ‘Oracle’, যিনি আমাদের কোনও সস্তা বা মিথ্যা সান্ত্বনা দেন না। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, ক্ষমতাতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের পিষে মারবে, সমাজ আমাদের অস্তিত্বকে এক চরম একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেবে এবং আমাদের নিজেদের অবচেতন মনস্তত্ত্ব প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করবে। এই চরম অস্তিত্ববাদী সংকটকে তিনি তাঁর গানে কোনও রাখঢাক ছাড়াই নগ্নভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। আর ঠিক এই নিরাভরণ স্বীকারোক্তির ভেতর দিয়েই তিনি জন্ম দিয়েছেন এক নতুন ধরনের মুক্তির দর্শন। তাঁর দেখানো এই মুক্তি নিছক শেকল ছেঁড়ার কোনও বায়বীয় স্লোগান নয়; বরং শেকলের অস্তিত্বকে গভীরভাবে অনুধাবন করে, নিজের মনের ভেতর এক স্বাধীন ও অবারিত শূন্যতা তৈরি করার নামান্তর। প্রচলিত কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে, সুর ও শব্দের এই যে অভাবনীয় যুগলবন্দি তিনি তৈরি করেছেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একজন গীতিকার হয়েও নোবেল জয় করা এই অসামান্য ঘটনাটি প্রমাণ করে তিনি “দ্য শেক্সপিয়র অফ রক ন রোল”।

পরিশেষে, লেখা শেষ করব ডিলানের “I and I” গানের অংশ দিয়ে যেখানে সেই অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়েই চূড়ান্ত দার্শনিক নির্লিপ্ততার সঙ্গে উচ্চারিত হয় সেই অমোঘ সত্য, মানুষের এই বিভক্ত সত্তা, নিজের ভেতর নিজেরই বাস:

I and I In creation where one’s nature neither honors nor forgives. I and I One says to the other, no man sees my face and lives.

 

মানুষ এভাবেই তার নিজের অবচেতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, চূড়ান্ত শূন্যতার ভেতর দিয়ে নিজের পরিত্রাণ খুঁজে নেয়।

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5371 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...