নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন কোনও দলেরই অ্যাজেন্ডায় নেই

অনুক্তা মজুমদার

 


এটা স্পষ্ট যে দেশের মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলোর সত্যিকারের মহিলা-সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা কেবলমাত্র ভোটের অঙ্কে মহিলাদের কিছু পাইয়ে দেওয়ার ভাবনায় আটকে আছে। আর নারীবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এখনও পর্যন্ত কেউই মূলধারার রাজনীতির গাঙে নাও ভাসাতে পারেনি। পিতৃতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী শক্তি-নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামোয় বিকল্প রাজনীতির জায়গা করতে পারা যে বেশ দুরূহ, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকতে যে সাংগঠনিক পরিকাঠামো আর আর্থিক মূলধন প্রয়োজন, সেখানেও সীমাবদ্ধতা আছে

 

প্রায় একমাস হতে চলল বিধানসভার ভোট হয়ে গেছে দেশের পাঁচ-পাঁচটি রাজ্যে। যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম। তা সেই ভোটঋতুতে মরশুমি ফসল ঘরে তোলা সম্পন্ন হয়েছে বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। ভোটদাতারা ভোটযাপন শেষ করে প্রাত্যহিকীতে ফিরে এসেছেন। ভোটকে কেন্দ্র করে প্রায় একমাস ধরে টানা নানান কিসিমের আলোচনা, বিশ্লেষণ, তুলনা, অনুমান, সব মিলিয়ে যে তুলকালাম নাগরিক চেতনার বিস্ফার চলেছিল সেইসবও আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়েছে। সেই বৈশাখী ডামাডোল থেকে এতটা দূরত্বে পৌঁছে যদি একবার পিছন ফিরে তাকানো যায়, যদি খুঁজতে চেষ্টা করা যায় ভোটের রাজপাটে নারীবাদের ছিটমহল, কেমন হয়? আসুন তাহলে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়তে চেষ্টা করা যাক, এবারের বঙ্গভোটের প্রধান তিনটি যুযুধান রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারগুলো। দেখা যাক, তাদের কাছে ২০২৬-এও নারী আদৌ কোনও রাজনৈতিক সত্তা, নাকি স্রেফ ভোটের অঙ্ক।

প্রথমেই দেখা যাক তৃণমূল কংগ্রেসের ৮৮ পাতার ইশতেহারটি যা নিঃসন্দেহে বেশ রংচঙে। এদের ২০২১ সালের ৬৬ পাতার ইশতেহারটাও ঠিক এমনটাই ছিল বটে। সেবার পুরো ইশতেহারের ১৯টা পাতায় শুধুমাত্র ছবি ছিল, কোনও লেখা ছিল না। অর্থাৎ ইশতেহারের প্রায় ২৯ শতাংশই ছিল ছবি। এবারের ইশতেহারের ৮৮ পাতার মধ্যে ১৩ পাতা ছবি, অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু তুমি কি কেবলই ছবি? না, অবশ্যই না। ছবি বাদ দিলে, আর আছে ৪ পাতা জুড়ে দিদির আবেদন, ২ পাতা জুড়ে ছড়া ও ছবিতে দিদির ১০টি প্রতিজ্ঞার সারাংশ, পরের ২ পাতায় বিজেপির বাংলার সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র তালিকা, ১ পাতা সূচিপত্র, ২৫ পাতা জুড়ে মূলত ছবি, তার সঙ্গে সামান্য কয়েক লাইন লেখা, শেষের ৫টা পাতা লাইন-টানা খাতার মতো, যেখানে কিছু লেখা নেই। তার আগে আছে ১ পাতার ধন্যবাদজ্ঞাপন। অর্থাৎ অঙ্কের হিসেবে ৮৮ পাতার বুকলেটের মধ্যে শুধু ৩৫ পাতা জুড়ে আছে মূল বক্তব্য, যা সম্পূর্ণ পুস্তিকার ৪০ শতাংশ মাত্র। আর সেই বক্তব্যের অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে তাদের বিগত ১৫ বছরের শাসনকালের সাফল্যের খতিয়ান। বাকিটুকু চালু প্রকল্পেরই চর্বিতচর্বণ। তাদের মোট একুশটি অঙ্গীকারের মধ্যে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ একটা আলাদা শিরোনাম হলেও তার মধ্যে সারবত্তা বলতে তেমন কিছু নেই। সেই এক লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, কুখ্যাত অপরাজিতা বিল, পিঙ্ক বুথ ইত্যাদির কথাই ঘুরে ফিরে এসেছে। অর্থাৎ নারী এদের কাছে বেনিফিসিয়ারি, রাষ্ট্রের অনুদানপ্রাপ্ত নাগরিক মাত্র, কোনওভাবেই সক্রিয় এজেন্ট নয়। নারীবাদী তত্ত্বে যা রাষ্ট্রের কৌশল হিসেবে প্রমাণিত। এই ইশতেহারে মহিলাদের জন্যে একমাত্র নতুন সংযোজন ছিল সম্ভবত ‘প্রতি জেলায় একটি করে কর্মরত মহিলাদের সরকারি হোস্টেল’। তবে প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌনতার মানুষদের এবারেও এখানে ঠাঁই হয়নি।

এবার দেখা যাক ভারতীয় জনতা পার্টির ইশতেহার ‘ভরসার শপথ’। এটা দেখনদারির দিক থেকে বেশ ভারসাম্যযুক্ত। ১৩ পাতার ল্যান্ডস্কেপ ওরিয়েন্টেশনে ফোল্ড করা এই ছিমছাম পুস্তিকাতে মাত্র ৩টি পাতা জুড়ে সম্পূর্ণ ছবি। বাকি পাতাগুলোয় তাদের নানান শপথ, আশ্বাস ইত্যাদির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবি থাকায় ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু হয়নি। এ তো গেল বহিরঙ্গের কথা। শপথের তালিকা খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় এদের নীতিগত অবস্থান অনুযায়ী যা যা প্রতিশ্রুতি থাকার কথা, সেগুলো স্বমহিমায় উপস্থিত। সেই প্রতিশ্রুতিমালার দীর্ঘতম তালিকাটা জুটেছে ‘নারীর সুরক্ষার’ জন্য! অন্যান্য বিষয়ে যেখানে শপথের তালিকা ৭ থেকে ১২র মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে, মহিলাদের জন্য তা ১৭টা! এই দলটির মনুবাদী নীতির যথার্থ প্রকাশ পেয়েছে ‘নারী সুরক্ষা দরকার’— এই স্লোগানে। এরা এখনও নারীকে স্রেফ ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেহ’ হিসেবেই দেখে, আর বিশ্বাস করে যে নারীর সুরক্ষার দায়িত্ব পুরুষতন্ত্রের অর্থাৎ কিনা শাসকের। পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর এ এক চিরাচরিত কৌশল। এরা আজও বুঝতে পারে না ‘সুরক্ষা’ কখনওই নারীর স্বাধীনতার পরিপূরক নয়, বরং প্রায়শই তার বিকল্প হিসেবে হাজির হয়। মনুবাদ এইভাবেই নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নকে আড়াল করে তাকে ‘রক্ষার প্রয়োজনীয় এক সত্তা’ হিসেবে নির্মাণ করে। তা এই ‘রক্ষাকাজের’ অংশ হিসেবে আরও নানান কিছুর সঙ্গে কলকাতা পুলিশের দুটো নতুন মহিলা ব্রিগেড গঠনের শপথ এদের ইশতেহারে ছিল। একটি ‘মাতঙ্গিনী হাজরা’র নামে, আর একটি ‘রানি শিরোমণি’র নামে। এই ‘রানি শিরোমণি’ নামকরণের ব্যাপারটা একটু গোলমেলে ঠেকছে। এটা কি রানি রাসমণি-র বিজেপি-ভার্সন, নাকি শিরোমণি নামে কোনও বাঙালি রানি ছিলেন!

এবার, কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী)-র ‘বিকল্প ইশতেহার’টা দেখা যাক। ওয়েব ভার্সনে এর পৃষ্ঠাসংখ্যা স্পষ্ট হল না। কোনওরকম চাকচিক্যহীন, একেবারে সাদামাটা এই ইশতেহারে মোট ২২টি শিরোনামের নিচে অজস্র প্রতিশ্রুতির সমাহার। বামপন্থী হিসেবে দাবি করলে, তালিকায় যা যা থাকার কথা সে সবই আছে। তার সঙ্গে ফাউ হিসেবে আছে গোলকায়ন-পূর্ব জমানার একমাত্রিক চরিত্র, যা আজকের সোশালমিডিয়াজীবী মানুষের কাছে প্রাগৈতিহাসিক নমুনার মতো ঠেকতে পারে। উপরন্তু, বেশ কয়েকটি ভুল বানান ইত্যাদি। যা সন্দেহ জাগায় আদৌ কতটা যত্ন নিয়ে এটা তৈরি করা হয়েছে। যাই হোক, এখানে ১২ নম্বর শিরোনাম ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ এবং একমাত্র এদের ইশতেহারেই LGBTQ+ নিয়ে কিছু ভাবনার কথা লেখা আছে, যা অন্য দুটি দলের থেকে এদের আলাদা করেছে। আবার একই সঙ্গে এখানে নারী সুরক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ‘শিক্ষার মাধ্যমে ধর্মান্ধতা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করার প্রচেষ্টা’র কথা, যা বেশ একটা ধন্দ তৈরি করে।

ইশতেহার তিনটে থেকে যে ছবিটা স্পষ্ট হয় তা হল, রাজনৈতিক দলগুলির কাছে নারী আজও একটা টার্গেট গ্রুপ মাত্র, যার জন্যে কিছু নির্দিষ্ট প্রকল্প এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বোঝা যায়, এদের কাছে আজও নারীরা ভোট-সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। মোটামুটি সব দলই স্বনির্ভর গোষ্ঠী, বিকল্প পেশা, বিকল্প শিক্ষা, সরকারি লোন, ভাতা, এইসবের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। ঋতুকালীন ছুটি, কর্মক্ষেত্রে সমান বেতন, সংরক্ষণ, বৈবাহিক ধর্ষণ, বিবাহ বা মাতৃত্বের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের যোগ ছিন্ন করা, রাজ্যজুড়ে নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচালয়, ক্রেশ ইত্যাদি মৌলিক ইস্যুগুলো কোথাওই নেই। মালুম হয়, আজও নারীর প্রাত্যহিক বাঁচার বস্তুগত শর্তগুলি নয়, তার ‘উপকারভোগী’ পরিচয়কেই রাজনৈতিক দলগুলি মূলধন করতে চায়।

অগত্যা খুঁজতে বসলাম নারীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম যে বিভিন্ন সময়ে এদেশে একাধিক নারীবাদী রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকেই এই প্রবণতার শুরু বলে অন্তর্জাল জানান দিচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণও করেছে। সম্ভবত প্রথম এরকম একটি দল হল Womanist Party of India। ২০০৩ সালে এই দলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। মূলত নারীর অধিকার, নারীবাদ আর লিঙ্গসাম্য, এইগুলিই এই দলের মূল আদর্শ। আনুষ্ঠানিকভাবে এই দলটির এখনও অস্তিত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু সেইভাবে আর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের খবর পাওয়া যায় না।

এরপর ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘United Women’s Front’ (UWF)। এই নারীবাদী রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সুমন কৃষ্ণ কান্ত। এদের মূল দাবি ছিল জনসংখ্যার ভিত্তিতে মহিলাদের ৩৩ শতাংশ নয়, পুরোপুরি ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ। এইরকম সব নারীবাদী দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে এরা নির্বাচনে অংশগ্রহণও করেছে। কিন্তু এখন আর এই দলেরও কোনও কার্যক্রম খবরে আসে না। ফলে দলটির অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ বা আশঙ্কা জাগে।

২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করে National Women’s Party। প্রতিষ্ঠাতা শ্বেতা শেট্টি। এদের মূল দাবি নারীর ক্ষমতায়ন আর সংসদে ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ। কিন্তু বর্তমানে এই দলটির খবরও বিশেষ পাওয়া যায় না।

২০১৭ সালে গঠিত আরেকটি নারীবাদী রাজনৈতিক দল ‘All India Mahila Empowerment Party’। রাজনৈতিক আদর্শ সেই অর্থে আগে উল্লেখিত দলগুলোরই মতো। সম্ভবত এই দলটাই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং এখনও সক্রিয়। যদিও এর নেত্রী নওহেরা শাইকের বিরুদ্ধে ভুরিভুরি দুর্নীতির অভিযোগের খবর পাওয়া যায়, কিন্তু তার সত্য-মিথ্যা এখনও আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ।

সব মিলিয়ে এটাই স্পষ্ট হয় যে দেশের মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলোর সত্যিকারের মহিলা-সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা কেবলমাত্র ভোটের অঙ্কে মহিলাদের কিছু পাইয়ে দেওয়ার ভাবনায় আটকে আছে। আর নারীবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এখনও পর্যন্ত কেউই মূলধারার রাজনীতির গাঙে নাও ভাসাতে পারেনি। পিতৃতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী শক্তি-নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামোয় বিকল্প রাজনীতির জায়গা করতে পারা যে বেশ দুরূহ, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকতে যে সাংগঠনিক পরিকাঠামো আর আর্থিক মূলধন প্রয়োজন, সেখানেও সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভবিষ্যতে এরকম নারীবাদী রাজনৈতিক দল অধিকার বুঝে নেওয়া প্রখর দাবিতে সংসদ বা বিধানসভা কাঁপাবে না। আমরা আশাবাদী আগামীর জন্য।

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5371 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...