শুভজিৎ বসাক
সরকার কেবল সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণই করছে না— আইনের মাধ্যমে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলছে। একে আমরা ‘লেজিসলেটিভ মাসল’ বলতে পারি। ব্রডকাস্টিং সার্ভিস রেগুলেশন বিল ২০২৩-এর মাধ্যমে ওটিটি ও ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলোকে কঠোর রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। একদিকে কর্পোরেট দিয়ে মিডিয়া কেনানো, অন্যদিকে আইনের মাধ্যমে সুরক্ষাকবচ কেড়ে নেওয়া— এই দুইয়ের চাপে স্বাধীন সাংবাদিকতা আজ কোণঠাসা
নাটকের মঞ্চে যখন হঠাৎ আলো নিভে যায়, দর্শকদের অনেকেই হাততালি দিয়ে ওঠে। কোনও ট্র্যাজেডি শেষ হয়েছে, চরিত্রের যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে— এই বিশ্বাসেই তালি ওঠে। কিন্তু খবরের এই রঙ্গমঞ্চে এখন যে আলো নেভানোর তোড়জোড় চলছে, তা কোনও নাটকের সমাপ্তি নয়। বরং, এটি এক ভয়ঙ্কর একতরফা চিত্রনাট্যের প্রথম অঙ্ক। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক দেখায়— নিউজ চ্যানেলে চড়া সুরের বিতর্ক, স্ক্রোলে উড়ে চলা হেডলাইন, চোখরাঙানি করা বিতার্কিকের মুখ। কিন্তু পর্দার আড়ালে কুশীলবরা বদলে গেছে। ব্যাকস্টেজের কন্ট্রোলরুমে এখন অন্য হাত।
আমি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে লিখছি, যেখানে খবর আর তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়— তা পরিণত হয়েছে কর্পোরেট আর আইনের এক সুপরিকল্পিত গোলকধাঁধায়। প্রশ্নটা শুধু সাংবাদিকদের নয়, প্রশ্নটা আমাদের প্রত্যেকের। কারণ আমরা যারা ইন্টারনেটে চোখ রাখি, মোবাইল স্ক্রোলে চোখ বুলাই, সংবাদপত্রের পাতায় নজর দিই— তারা সবাই এখন এই অদৃশ্য শেকলে বন্দি। শেকলটি দেখি না, কিন্তু তার টান অনুভব করি।
কর্পোরেট হাতের গোলকধাঁধা
আমি যখন আদানি গ্রুপের মিডিয়া সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনি খুঁটিয়ে দেখি, তখন বুঝতে পারি— এটি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি এক ‘ফাইন্যান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’, যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল যখন আমরা অনেকেই হয়তো ফেসবুক অ্যাকাউট খোলার কথাও ভাবিনি।
ক. এনডিটিভি ও প্রণয় রায়ের উত্তরাধিকার
১৯৮৮ সালে প্রণয় রায় এনডিটিভি শুরু করেছিলেন। একজন অর্থনীতিবিদের হাত ধরে জন্ম নেওয়া এই সংবাদমাধ্যম ভারতের প্রথম বেসরকারি ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল হিসেবে ২০০৩ সালে আত্মপ্রকাশ করে। দীর্ঘদিন ধরে এই চ্যানেলটি তার নিরপেক্ষ ও সাহসী সাংবাদিকতার জন্য স্বীকৃত ছিল। আমি ছোটবেলায় এনডিটিভি দেখে বড় হয়েছি— রবীশ কুমারের কণ্ঠে ভরসা পেতাম, প্রণয় রায়ের উপস্থাপিত বিষয়ে লজিক থাকত, তা আমার-আপনার পছন্দসই হোক আর নাই হোক। একটা ন্যায়পরায়ণতার ছাপ দেখতাম।
কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের পতনের বীজ বপন করা হয়েছিল অনেক আগে। ২০১৩ সালের পর সেই বীজ মহীরুহ হয়ে দেখা দেয়।
খ. ১৩ বছরের পুরনো ‘ঋণের ফাঁদ’
আদানি গ্রুপের এনডিটিভি দখল কোনও প্রথাগত ‘হোস্টাইল টেকওভার’ ছিল না। জোর করে কেউ কাউকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়নি। এটি ছিল ঋণের এক কৌশলী ব্যবহার— যেন এক মৃদু বিষধর সাপ, যে কামড়ানোর আগেই ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
২০০৯ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড (VCPL) নামে এক স্বল্প পরিচিত কোম্পানি প্রণয় রায় ও রাধিকা রায়ের হোল্ডিং কোম্পানি ‘আরআরপিআর’-কে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ দেয়। এই ঋণের চুক্তিতে লুকিয়ে ছিল এক বিষাক্ত শর্ত— ভিসিপিএল চাইলে যে কোনও সময় এই ঋণকে এনডিটিভির ২৯.১৮ শতাংশ শেয়ারে রূপান্তর করতে পারবে। তেরো বছর ধরে এই শর্তটি নথিপত্রে সুপ্ত ছিল। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সাপের মতো।
২০২২ সালে আদানি গ্রুপ ভিসিবিএল কোম্পানিটিকে কিনে নেয়। কিনে নিয়ে তারা সেই পুরনো ঋণের শর্তটি সক্রিয় করে দেয়। ঋণের বিনিময়ে রাতারাতি এনডিটিভির ২৯.১৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়ে যায় আদানি। এরপর ওপেন অফার, ধীরে ধীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার। প্রণয় রায় ও রাধিকা রায় বিদায় নেন। কোনও বড় ব্রেকিং নিউজ নয়, কোনও চিৎকার-চেঁচামেচি নেই। কেবল কাগজে-কলমে একটি সংবাদমাধ্যমের মালিকানা বদলে যায়।
আমি ভাবি— আমরা কি জানতে পেরেছিলাম? জানতে পেরেছিলাম, কিন্তু সেভাবে মাথা ঘামাইনি। কারণ ঘটনাটি ঘটেছিল এতটাই শান্ত ও ‘আইনি’ পথে যে সাধারণ দর্শকের কাছে তা ছিল একপ্রকার ‘মালিকানা’র হাতবদল। বিশেষজ্ঞ মহল যথেষ্টই চিৎকার করেছিল।
গ. শুধু এনডিটিভি নয়
আদানি গ্রুপ শুধু এনডিটিভিতেই থেমে থাকেনি। তাদের নিজস্ব মিডিয়া উইং ‘এএমজি মিডিয়া নেটওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপে পা বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে তারা ‘কুইন্টিলিয়ন বিজনেস মিডিয়া’ বা বি কিউ প্রাইম অধিগ্রহণ করে— যা আগে ব্লুমবার্গ কুইন্ট নামে পরিচিত ছিল। ব্যবসার খবরের জগতেও এখন তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। আর আউটডোর অ্যাডভার্টাইজমেন্টের ব্যবসা তো আগে থেকেই ছিল। মূলধারার নিউজ চ্যানেল আর ডিজিটাল বিজনেস মিডিয়া হাতে আসায় তৈরি হয়েছে এক বিশাল সমন্বিত মিডিয়া ইকোসিস্টেম।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল— এখানে কোনও ইডি বা সিবিআইয়ের রেইড হয়নি, কাউকে গ্রেপ্তার করতে হয়নি। পুরো ব্যাপারটি সম্পন্ন হয়েছে আর্থিক লেনদেন আর সুকৌশলী চুক্তির মাধ্যমে। অত্যন্ত আইনি পথে একটি শক্তিশালী মিডিয়া হাউস চলে গেছে কর্পোরেট স্বার্থের অধীনে।
এখন এনডিটিভিতে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে কোনও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আর দেখা যায় না। কারণ যখন একটি কর্পোরেট সাম্রাজ্য নিজেই সংবাদমাধ্যমের মালিক হয়, তখন সেই হাউসের স্বার্থবিরোধী খবর পরিবেশন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আইনের চাদরে সেন্সরশিপ
আমি যদি একটু জুম আউট করি, তাহলে দেখব যে কর্পোরেট দখল শুধু গল্পের এক দিক। অন্য দিকটি হচ্ছে আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে ডিজিটাল জগতে নীরব সেন্সরশিপ প্রতিষ্ঠা।
ভারতের ডিজিটাল জগতের স্বাধীনতা আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা যারা ইন্টারনেটে মুক্তভাবে কথা বলি বা খবর দেখি, তাদের সবার মাথার ওপর একটি আইনি খাঁড়া ঝুলছে। এই পুরো বিষয়টির কেন্দ্রে রয়েছে আইটি অ্যাক্টের সেকশন ৭৯ এবং সরকারের প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনীসমূহ।
ক. ‘সেফ হারবার’: ইন্টারনেটের সুরক্ষা বর্ম
সেকশন ৭৯-কে সাধারণ ভাষায় ‘সেফ হারবার’ বলা হয়। এটি একটি আইনি সুরক্ষা যা ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে দেওয়া হয়। মূলনীতি হল— কোনও ব্যবহারকারী যদি এই প্ল্যাটফর্মে বিতর্কিত কন্টেন্ট পোস্ট করে, তার জন্য প্ল্যাটফর্ম সরাসরি দায়ী হবে না। কারণ তারা কেবল একটি ‘মাধ্যম’।
এই সুরক্ষা না থাকলে কোনও প্ল্যাটফর্মই আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে কন্টেন্ট লিখতে বা ফেসবুকে বা ইউটিউবে আপলোড করতে দিত না। একটি ভুল পোস্টের জন্য ইউটিউব বা ফেসবুককে হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি হতে হত। এই সুরক্ষাবলেই আমরা আজ মুক্তভাবে লিখতে পারি, কথা বলতে পারি— আপাতত।
খ. সুরক্ষার বিবর্তন ও বর্তমান হুমকি
২০১৫ সালে শ্রেয়া সিঙ্ঘল মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সেকশন ৬৬-এ বাতিল করে জানিয়েছিল যে অনলাইনে মানুষের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। এটি ছিল ডিজিটাল স্বাধীনতার এক বড় জয়।
২০২১ সালে আইটি রুলসের মাধ্যমে প্রথম কড়াকড়ি শুরু হয়। সরকার কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ এবং বিতর্কিত কন্টেন্ট সরানোর অধিকার নিজের হাতে নেয়।
কিন্তু বর্তমানে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হল ড্রাফট আইটি অ্যামেন্ডমেন্ট রুলস ২০২৫। এখানে সরকার এমন একটি ধারা প্রস্তাব করেছে যা সরাসরি ‘সেফ হারবার’ কেড়ে নিতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকার যদি কোনও প্ল্যাটফর্মকে কোনও কন্টেন্ট নিয়ে ‘অ্যাডভাইজরি’ বা নির্দেশ দেয় এবং প্ল্যাটফর্মটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পালন না করে, তবে তাদের সেকশন ৭৯-এর সুরক্ষা বাতিল হয়ে যাবে। একবার এই সুরক্ষা চলে গেলে, ওই প্ল্যাটফর্মে থাকা কোটি কোটি পোস্টের দায়ভার সরাসরি কোম্পানির ওপর পড়বে। আইনি ঝামেলা এড়াতে তখন তারা নিজেরাই সব ধরনের সমালোচনামূলক কন্টেন্ট মুছে ফেলবে। একেই বলে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’।
গ. ফ্যাক্ট চেক ইউনিট: বিচারক ও জুড়ি একসঙ্গে
২০২৩ সালে সরকার একটি ‘ফ্যাক্ট চেক ইউনিট’ তৈরির কথা বলেছিল। এর মাধ্যমে সরকার নিজেই ঠিক করবে কোন খবর ‘ফেক নিউজ’। অর্থাৎ, সরকার সম্পর্কে কোনও নেতিবাচক খবরকে যদি সরকার নিজেই ‘মিথ্যা’ বলে ঘোষণা করে, তবে প্ল্যাটফর্মগুলো তা সরাতে বাধ্য হবে।
বোম্বে হাইকোর্ট কুনাল কামরা মামলায় এই ইউনিটের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল, কিন্তু সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে। এটি প্রমাণ করে যে সরকার এই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে নারাজ।
আমি যখন এই আইনগুলো পড়ি, তখন বার্লুসকোনির ইতালি আর এরদোগানের তুরস্কের কথা মনে পড়ে যায়। সেখানেও ঠিক এভাবেই শুরু হয়েছিল— আইনি পথে, ঘোষণাবিহীন যুদ্ধের মতো।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট— আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে
বিশ্বের মানচিত্রে তাকালে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মডেল কাজ করছে। ভারতে বর্তমানে যা ঘটছে তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়— এটি একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।
ক. ইতালির বার্লুসকোনি মডেল
১৯৯৪ সালে সিলভিও বার্লুসকোনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী হন। তার অধীনে আগে থেকেই ছিল দেশের বৃহত্তম বেসরকারি মিডিয়া এম্পায়ার ‘মিডিয়াসেট’। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি সরকারি ব্রডকাস্টার ‘আরএআই’-কেও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। ইতালীয় সাংবাদিকরা তখন বলেছিলেন, দেশের প্রধান পাঁচটি টিভি চ্যানেলের মধ্যে চারটিই একজন মানুষের নিয়ন্ত্রণে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
খ. তুরস্কের নিরেট নিয়ন্ত্রণ
তুরস্কের উদাহরণটি বর্তমান ভারতের পরিস্থিতির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ২০১৩ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা তুরস্কের প্রধান প্রধান মিডিয়া হাউসগুলো একে একে অধিগ্রহণ করতে শুরু করেন। ২০২২ সালে তুরস্ক একটি সোশাল মিডিয়া আইন পাশ করে, যা প্ল্যাটফর্মগুলোকে তুরস্কে স্থানীয় অফিস খুলতে ও সরকারি নির্দেশ মানতে বাধ্য করে। আজ তুরস্ক বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৫৮তম স্থানে। সেখানে সরকারের সমালোচনা করা সাংবাদিকদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
গ. হাঙ্গেরির ন্যারেটিভ কনসোলিডেশন
হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের সরকার আরেক পদ্ধতি বের করেছিল। অরবানের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫০০-র বেশি ছোট-বড় হাঙ্গেরিয়ান মিডিয়া আউটলেট কিনে নেন। এরপর সেগুলোকে একটি বিশাল ফাউন্ডেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। ফলে ৫০০টি আলাদা মিডিয়া হাউস থাকলেও তাদের সবার সম্পাদকীয় নীতি ছিল হুবহু এক। সাধারণ মানুষ যে চ্যানেলেই চোখ রাখুক, তারা কেবল সরকারের তৈরি করা বয়ানই শুনতে পেত।
ঘ. বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত
আন্তর্জাতিক এই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ভারতের বর্তমান অবস্থার তুলনা করলে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০১৪ সালে ভারত প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৪০তম স্থানে ছিল। ২০২৪ সালে মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে ভারত ১৯ ধাপ নিচে নেমে ১৫৯তম স্থানে অবস্থান করছে। আমাদের আগেপিছে আছে ইরান, তুরস্ক, হাঙ্গেরির মতো দেশ— যেখানে সংবাদমাধ্যমের অবস্থা আমরা জানি।
এই অবনমন কোনও বিশেষ ঘটনার জন্য নয়। এটি বিশ্বজুড়ে সেন্সরশিপের সেই মডেলের অনুসরণ— যেখানে কর্পোরেট-বন্ধু ও কঠোর আইন ব্যবহার করে সত্যকে চেপে ধরা হয়।
বিজ্ঞাপনের খেলা— অর্থনৈতিক গলায় টান
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল আইনের মাধ্যমেই কেড়ে নেওয়া হয় না। আরও সূক্ষ্ম ও কার্যকর একটি অস্ত্র আছে— আর্থিক চাপ। ভারতের মিডিয়া হাউসগুলোর টিকে থাকার লড়াই আর সরকারের ‘বিজ্ঞাপনের খেলা’ বিশ্লেষণ করলে পেছনের অর্থনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং স্পষ্ট হয়।
ক. ডিএভিপি: নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি
ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলির আয়ের একটি বড় অংশ আসে সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে। এই বিজ্ঞাপন বণ্টনের দায়িত্ব ডাইরেক্টরেট অফ অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড ভিজ্যুয়াল পাবলিসিটি (ডিএভিপি)-র ওপর। এই সরকারি বডিই ঠিক করে কোন মিডিয়া হাউস কত টাকার বিজ্ঞাপন পাবে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএভিপি প্রায় ১০,৪৬৭ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বণ্টন করেছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা বণ্টনের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কোন নিউজ চ্যানেল বা সংবাদপত্র টিকে থাকবে।
যে মিডিয়া হাউসগুলো সরকারের অনুকূলে খবর পরিবেশন করে, তাদের বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। যারা সরকারের সমালোচনা করে বা বিশ্লেষণমূলক খবর করে, তাদের বিজ্ঞাপনের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয় বা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০২২ সালে ‘পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটি অন কমিউনিকেশন’-এর ১৯তম রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে মিডিয়া হাউসগুলোকে প্রভাবিত করার জন্য ডিএভিপি-কে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা সংসদের নথি, কোনও গুজব নয়।
খ. ‘ট্রুথের ইকোনমিক ইঞ্জিনিয়ারিং’
আমি এই পুরো প্রক্রিয়াকে ‘ট্রুথের ইকোনমিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলতে চাই। সমীকরণটি অত্যন্ত সহজ কিন্তু ভয়ঙ্কর:
সরকারের প্রশংসা করো → বিজ্ঞাপন বাবদ বিপুল রেভিনিউ → ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হয়ে টিকে থাকা।
সরকারের সমালোচনা করো → সরকারি বিজ্ঞাপনের পথ বন্ধ → আর্থিক সংকটে পড়ে মিডিয়া হাউস বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
যখন একটি মিডিয়া হাউসের অস্তিত্বই সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন সম্পাদকরা বাধ্য হয়েই সেলফ-সেন্সরশিপ শুরু করেন। তাঁরা এমন কোনও খবর প্রচার করতে চান না যা সরকারের বিরাগভাজন হতে পারে। কোনও আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই আর্থিক চাপের মুখে সংবাদমাধ্যমের টুঁটি টিপে ধরা হয়।
আমি একজন সাংবাদিক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— তোমরা কেন সরকারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করো না? সে হেসে বলেছিল, “বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিলে আমার বেতন কে দেবে?” উত্তরটা সহজ। খুব সহজ। আর সেই সহজ-সরল উত্তরটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
আমাদের স্ক্রিনে কী আসছে?
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনে এই সংবাদমাধ্যমের বিবর্তন ও আইনি কড়াকড়ির প্রভাব কতটা গভীর— তা আমরা তাৎক্ষণিকভাবে টের পাই না। কিন্তু আমি যখন গভীরভাবে দেখি, তখন ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়।
ক. তথ্যের ‘ফিল্টার বাবল’
আমরা যখন ইউটিউব বা গুগলে কোনও বিষয়ে সার্চ করি, আমরা মনে করি যা রেজাল্ট আসছে সেটাই ধ্রুব সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হল— যখন বড় নিউজ প্ল্যাটফর্ম ও সোশাল মিডিয়া অ্যালগরিদম কেবল একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির খবর দেখাবে, তখন সাধারণ মানুষ অন্যপাশের সত্যটা জানতেই পারবে না। আমাদের জানানোই হবে না যে এর বাইরেও কোনও শক্তিশালী যুক্তি বা কণ্ঠস্বর ছিল। আমরা যা দেখছি সেটা ‘সত্য’ নয়— বরং আমাদের জন্য ‘তৈরি করা একটি বয়ান’ মাত্র।
খ. স্বতঃস্ফূর্ত সেন্সরশিপ
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে প্ল্যাটফর্মের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা আইনি চাপ বাড়ে, সেখানে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ সেলফ-সেন্সরশিপ বেড়ে যায়।
আমি নিজেও ইন্টারনেটে লিখি। আমি ভাবি— ‘যদি এই কথাটি বললে আমার লেখা বন্ধ হয়ে যায় বা সেনসরড হয় বা আইনি ঝামেলায় পড়ি?’ তখন আমি হয় সরাসরি সত্য না বলে একটি ‘ব্যালেন্স’ করার চেষ্টা করতে পারি, অথবা চুপ থাকতে পারি। ফলে সাধারণ মানুষ আসল তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে।
গ. অদৃশ্য অস্বীকৃতি
আগে সেন্সরশিপ মানে ছিল খবরের কাগজ কালো করে দেওয়া বা সরাসরি চ্যানেল বন্ধ করা। এখনকার সেন্সরশিপ অনেক বেশি ‘অদৃশ্য’। কোনও রেইড নেই, কোনও গ্রেপ্তার নেই, কিন্তু আর্থিক চাপ ও আইনি অনিশ্চয়তার কারণে আপনার স্ক্রিন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো স্রেফ বাষ্প হয়ে যায়। আপনি জানতেই পারবেন না আপনার তথ্য পাওয়ার অধিকার কখন খর্ব করা হয়েছে। যেন এক অঘোষিত এমারজেন্সি।
একটি মজার ব্যাপার হল— সরকার জনসমক্ষে বলে তারা সমালোচনার ভক্ত। অথচ ভেতরে ভেতরে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা হয় যাতে প্ল্যাটফর্ম বা ক্রিয়েটর নিজেই নিজের মুখ বন্ধ করে দেয়। সাধারণ মানুষের মনে হয় দেশ গণতান্ত্রিকই আছে, অথচ তারা যা শুনছে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত।
ঘ. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর প্রভাব
আমি যখন আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভাবি, তখন এই প্রশ্নটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়— আগামী প্রজন্মের কেউ যখন কোনও রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে ইন্টারনেটে গবেষণা করবে, তখন সে কি ‘আসল ইতিহাস’ খুঁজে পাবে? না কি সে কেবল সেই তথ্যগুলোই পাবে যা কোনও বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য বা সরকার তার জন্য ‘সঠিক’ বলে ঠিক করে রেখেছে?
তথ্যের এই নিয়ন্ত্রণ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটা মিডিয়ার সমস্যা নয়— এটা আমাদের নাগরিক অধিকারের ওপর নিঃশব্দ আঘাত।
প্রতিরোধের শেষ সুযোগ— ১৪ এপ্রিল
আমরা যদি এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব যে সরকার কেবল সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণই করছে না— আইনের মাধ্যমে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলছে। একে আমরা ‘লেজিসলেটিভ মাসল’ বলতে পারি।
ব্রডকাস্টিং সার্ভিস রেগুলেশন বিল ২০২৩-এর মাধ্যমে ওটিটি ও ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলোকে কঠোর রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। একদিকে কর্পোরেট দিয়ে মিডিয়া কেনানো, অন্যদিকে আইনের মাধ্যমে সুরক্ষাকবচ কেড়ে নেওয়া— এই দুইয়ের চাপে স্বাধীন সাংবাদিকতা আজ কোণঠাসা।
আমাদের সংবিধানের আর্টিকেল ১৯(১)(এ) বাকস্বাধীনতা দেয়। আর্টিকেল ১৯(২) বলে ‘যৌক্তিক বিধিনিষেধ’ আরোপ করা যেতে পারে। সরকার এই ‘যৌক্তিক বিধিনিষেধ’-এর দোহাই দিয়ে কন্টেন্ট সরিয়ে দেওয়া ও সেন্সরশিপের পথ প্রশস্ত করছে। আদালত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই কন্টেন্ট ডিলিট হয়ে যাচ্ছে, ক্রিয়েটররা আইনি ভয়ে ভীত হয়ে পড়ছেন।
ক. শেষ আইনি সুযোগ
এই অন্ধকার পরিস্থিতিতেও কিছু নির্দিষ্ট পথ খোলা আছে। আইটি সংশোধনী নিয়ম ২০২৫-এর ওপর জনসাধারণের মতামত জানানোর একটি আইনি সুযোগ রয়েছে। ডেডলাইন— ১৪ এপ্রিল।
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল পোর্টাল meity.gov.in-এ গিয়ে আমাদের রেকর্ডকৃত প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন। এটিই সেই শেষ লিগ্যাল উইন্ডো যেখানে আমাদের দাবিগুলো নথিবদ্ধ হতে পারে।
খ. আমাদের প্রশ্ন
আমি প্রতিটি নাগরিককে নিজেকে প্রশ্ন করতে বলব— আমরা কি কেবল দর্শক হয়ে থাকব, নাকি নিজের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হব? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি নিরপেক্ষ তথ্য পাবে, নাকি কেবল কোনও এক সাম্রাজ্যের ঠিক করে দেওয়া বয়ান শুনবে?
সরকার যদি কোনও পুশব্যাক বা প্রতিরোধের মুখে না পড়ে, তবে ভারতের মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপ তুরস্ক বা হাঙ্গেরির মতো নিরেট অন্ধকারে ডুবে যাবে। কেবল অভিযোগ নয়— আইনগতভাবে ও নথিপত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে হবে। যেমনটি বোম্বে হাইকোর্টের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, যখন সিভিল সোসাইটি ও সাংবাদিকদের প্রতিবাদের ফলে একটি স্থগিতাদেশ এসেছিল।
যবনিকা পতনের আগে
১৪ এপ্রিলের পর কি আমাদের সকালের খবরের সঙ্গে কেবল ‘সব ঠিক আছে’-মার্কা একঘেয়ে সরকারি জপমালা শুনতে হবে? প্রশ্নটা শুধু কয়েকটা ইউটিউব চ্যানেল বা খবরের কাগজের নয়— প্রশ্নটা আমাদের ব্যক্তিগত অস্তিত্বের।
নাটকের শো শেষ হওয়ার পর পর্দা পড়ে ঠিকই। কিন্তু বাস্তবের রঙ্গমঞ্চে একবার যদি এই অদৃশ্য সেন্সরশিপের পর্দা পড়ে যায়, তবে আর কোনওদিন ‘তালি’ বাজানোর বা প্রতিবাদের সুযোগ থাকবে না। আপনার ফোনের স্ক্রিনে যে সত্যটা ভেসে উঠছে, সেটা সত্যিই ঘটে যাওয়া ঘটনা— না কি কারও ড্রইংরুমে বসে লিখে দেওয়া কোনও কর্পোরেট ফ্যান্টাসি— তা চেনার সময় এখনই।
যবনিকা পতনের আগে নিজের গলার স্বরটুকু রেকর্ড করে রাখাটাই এখন একমাত্র কাজ।
আমি লিখতে লিখতে ভাবছি— এখনও কি আমরা দর্শক হয়ে বসে থাকব? নাকি মঞ্চে নেমে আসব? কারণ এই নাটকের নাম ‘অদৃশ্য শেকলের সংবাদ’, এবং এর শেষ অঙ্ক এখনও লেখা হয়নি। সেটা লেখার দায়িত্ব আমাদের হাতে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি
- বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত ১৫৯তম (২০২৪)
- ইন্টারনেট শাটডাউন বিশ্বে প্রথম (২০২৪)
- সরকারি বিজ্ঞাপন বাজেট ১০,৪৬৭ কোটি টাকা (২০২৩-২৪)
আমরা কি কেবল পরিসংখ্যানের দর্শক হয়ে থাকব, নাকি ইতিহাসের লেখক হওয়ার সাহস দেখাব?
প্রশ্নটা এখন আপনার।
*মতামত ব্যক্তিগত


!!!
হীরক সেনগুপ্ত