নিঃশ্বাস

জুরি বরা বরগোহাঞি

 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ: বাসুদেব দাস

 


১৯৭৮ সনে আসামের মাজুলিতে জুরি বরা বরগোহাঞির জন্ম। ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। লেখিকার প্রথম উপন্যাস ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের নন্দিনী। পরবর্তী উপন্যাসগুলি যথাক্রমে আপনজনের ঠিকানা, অভিলাষী যাত্রা, নাং-ফা, লিডলাম এবং ভোক। ‘আসাম সাহিত্যসভার বিশেষ সাহিত্য সম্মান’, ’হরেন্দ্র চন্দ্র বরকাকতী বঁটা[1]’, ‘যুব অনুপ্রেরণা বঁটা’ লাভ করেন।

 

 

 

 

—বাবা, আরম্ভ করুন।

তাঁকে বড় ছেলে দূর থেকে বলল। তার কণ্ঠস্বরে চাপা উত্তেজনা। সে কখন এভাবে কথা বলে তিনি জানেন। হারজিতের খেলাটাতে জয়ের সম্ভাবনায় তাঁর কণ্ঠস্বরের উত্তেজনা ঊর্ধ্বমুখী চেতনায় ক্ষিপ্র হয়ে উঠেছে। তিনি শিউরে উঠলেন। সকাল থেকে তাঁর শরীরটা ভালো লাগছে না। ঘন ঘন হাই উঠছিল। গ্যাস হয়েছে। এখন নামঘরে অসুস্থ হয়ে পড়লে ঝামেলার সৃষ্টি হবে। বলিনের পিতার মতো নামঘরে অসুস্থ হয়ে পড়লে লোকেরা বলাবলি করবে।

—পাপ লেগেছে
—পাপের ফল ভুগছে।
—নামঘরের গোঁসাই ঠাকুর সবকিছুই দেখছে।

পূর্ণিমার ধবধবে জ্যোৎস্নার আলো নামঘরের মেঝেতে পড়ছে। কাঁচা ভিজে মেঝের উঁচুনিচু জমি জ্বলজ্বল করছে। আলোছায়ার ঐন্দ্রজালিক প্রাচীন গরুড় মূর্তিটাতে পড়েছে। তোতাপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকাভাবে গড়া নাকটার একদিক চাঁদের আলোতে জ্বলজ্বল করে এক বিচিত্র রূপ লাভ করেছে। মূর্তিটার খাঁজকাটা স্থির ডানা দুটিও মায়াবিভ্রমের সৃষ্টি করেছে। তিনি তড়িৎ গতিতে দৃষ্টি নামিয়ে দূরের দিকে তাকালেন। নামঘরের চারপাশে থাকা বিশাল মাঠটা জ্যোৎস্নায় এত আলাদা মনে হচ্ছে। পিছিয়ে পিছিয়ে পিছলে পড়া চাঁদটাও এত নিঃসঙ্গ এবং মৌন। এইভাবে তাঁর বুকের ভেতরে নিরাশ্রয় হওয়া মানুষের মতো সীমাহীন ক্লান্তি এবং বিষাদ এনে দিয়েছে। দিনে এই মাঠটা প্রাণময়তায় রৌদ্রোজ্জ্বল ছিল।

বরডুবি বিলটা এবার তাঁর বড় ছেলে পেয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি তাঁকে সাহায্য করেছেন। কয়েকজনকে অতিক্রম করে সে এবার সেই বিলের অধিকারী হয়েছে। সেই বিলে কপাল খুলে যায়। তিনি আজ তীরে দাঁড়িয়ে মাছমারা দেখছিলেন। খলবল করতে থাকা জ্যান্ত কৈমাছ এক খালৈ নিয়ে ঠিক দুপুরবেলা এই মাঠের মাঝখান দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। মাঠটা সোনালি ধানে ভরে ছিল। প্রদীপদের ভয়াল বাগানটা থেকে ঝিল্লির গভীর শব্দ দুপুরের নির্জনতাকে খানখান করে ভেঙে দিয়ে শব্দময় করে তুলেছিল।

এখন চারপাশ নীরব নিস্তব্ধ। না কি তিনি ভেবে নিয়েছেন?

মানসিক অস্থিরতা এবং স্ব-দুর্বোধ্যতায় তিনি অবাক হয়ে নামঘরের মেঝেতে বসলেন। রহিমলা মাঠের বিখ্যাত পাটি দৈ দিয়ে কঠটা তৈরি। শুকনো এবং খসখসে।

গ্রামের মানুষগুলি চেপে-চুপে বসল। ধাড়ি পেতে বসে নিল। প্রত্যেকেই মৌ্নতার সঙ্গে এবং সজাগ হয়ে তাঁর দিকে তাকাল। দুই-একটি অস্পষ্ট গুনগুনানি তাঁর কানে আসছে। ক্রমশ ভারী হয়ে আসা কান দুটি নিয়ে তিনি শঙ্কায় ভোগেন।

সামনের মেঝের মাঝখানে নরেন সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছে। সাদা গেঞ্জি, ধুতি পরে আসা ছেলেটির সুঠাম বাহু, প্রশস্ত লোমশ বুক দেখে তাঁর ভালো লাগছে। এই যে তিনি নরেনকে এত কাছ থেকে এভাবে দেখলেন।

তিনিও মণিকূটের উদ্দেশ্যে মাথা নোয়ালেন। জ্যোৎস্নার মায়াময় আলো পরিচিত সাতস্তরের সিংহাসনটার সিংহগুলির চোখেও পড়েছে। একদিক অন্ধকারে ডুবে থাকা মণিকূটের সিংহাসনের সিংহের মূর্তি তাঁর দিকে তাকিয়ে যেন শ্লেষ এবং শোকের হাসি হাসল। তাঁর ভয়ার্ত মনে ঝড় বইতে শুরু করেছে। পাশের কলাগাছ থেকে একটা বাদুর ধপধপ করে উড়ে গেল। তিনি চমকে উঠলেন। সমগ্র শরীর পুনরায় শিউরে উঠছে।

খুতুক! খুতুক! খুতুক!
খুতুর! খুতুর! খুতুর!
হুতুর! হুতুর! হুতুর!

অনন্ত ভূঞা নামঘরের মেঝেতে সুপুরি খুঁড়ছে। শব্দটা তাঁর বুকের মধ্যে বাজছে। ধড়মড় করে তিনি অস্থির হয়ে খসখসে কাঠটা খামচে ধরে থাকলেন। কর্কশ স্পর্শে তিনি মানসিক স্থৈর্য হারাতে চলেছেন।

সমস্ত সামাজিক সমস্যায় মতামতদানের মতো আজও কিছু একটা শুরু করা দরকার। তাঁর ঠোঁট থেকে একটা শব্দ, একটা বাক্যও বেরিয়ে আসছে না। তাঁর মুখের ভাষা বাক্যহারা হয়েছে। আওয়াজ করার জন্য তাঁর সমস্ত দেহমন আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তিনি গ্রামের মোড়ল। রাতের নির্জনতায় তাঁর বজ্রকঠিন ভাষা মুহূর্তের মধ্যে এই বৃহৎ সমাজের একটি জটিল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। এতদিন ধরে নিচ্ছে। তিনি এই সমাজটার ভরসা। রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তিশালী হাতগুলি তিনি চেনেন। সেই হাতগুলির সঙ্গে তাঁর হাতটা মাঝেমধ্যে জোড় বাঁধে। জোড়বাঁধা হাতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা। এবার তিনি একা।

চাঁদের আলোতে তিনি দেখলেন নরেন হাঁটু গেড়ে বসেছে। নামঘরের মেঝেতে। তার গায়ে চাঁদের এক ঝলক আলো পড়েছে। তার সুঠাম শরীর পুনরায় জ্বলজ্বল করে উঠছে। আজ তার বিচার হবে। সে একবার মণিকূট, আর একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার মুখটা শান্ত, চোখদুটি অস্থির। তার মুখে প্রাপ্তি এবং পূর্ণতা।

—চেহ

তাঁর মুখ দিয়ে অজান্তে বেরিয়ে গেল। আজ একটা সিদ্ধান্তের দিন, একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। আজ এই সন্ধ্যাবেলা তাঁর সিদ্ধান্ত নরেনের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। কিন্তু সে কী আশ্চর্যভাবে নির্বিকার।

—নরেন, নরেন!

অস্ফুট ভাষায় বেদনাকাতর হয়ে মমতা মিশিয়ে তিনি ডাকলেন। তিনি চারপাশে তাকালেন। না কেউ শোনেনি। প্রত্যেকেই এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে।

—নরেন! আমার বাছা! আমার সোনা!

তাঁর বুক থেকে সঙ্গোপনে নিনাদিত হওয়া সেই কণ্ঠস্বর কেউ শোনেনি। শুকনো, কঠিন গলা থেকে বের হওয়া অস্ফুট আর্তনাদ। কেবল তিনিই শুনেছেন। নিজেই চমকে উঠেছেন। নরেনকে এভাবে ডাকার দুর্বার আশা সঞ্চয় করে করে তিনি বৃদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি নরেনকে একবার ছুঁতে চাইছিলেন, একবার তার বাহুতে হাত রেখে সাহস দিতে চাইছিলেন, একবার বুকে জড়িয়ে তার গায়ের গন্ধ নিতে চেয়েছিলেন। কিছুই তো করা হল না। সমস্ত জীবন নরেন নামঘরের ওইখানটাতে নয়, ওই মুক্ত মাঠের না-দেখা দিগন্তের ওপারেই থেকে গেল। নরেন ফাগুনের উদাস সন্ধ্যার বিশাল মাঠে দৌড়ে বেড়ানো একটা আলেয়া। সোনার হরিণের মতো একটা বিভ্রমের পেছনে পেছনে দৌড়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ দূরত্ব থেকে তিনি নরেনকে ছুঁতে পারলেন না, তার চোখের দিকে তাকাতে পারলেন না। ক্ষমতার শক্তিশালী আবেষ্টনীতে থেকেও তিনি কী করুণভাবে অসহায়!

—দাদা, তাড়াতাড়ি সভা ভঙ্গ হলে ভালো। আজ লক্ষ্মীপূর্ণিমা। রাসমেলায় নাটক হবে। আমাদের যেতে হবে।

চায়ের বাটিটা মুখের সামনে নিয়ে পুতুকণ কানেকানে বলে গেল।

পূর্ণিমার এক রাতে নরেনের জন্ম। খড়ের ঘরের একটা কোঠায় অন্ধকারে মুখে চাপা দিয়ে নরেনের মা সন্তান জন্মদানের ব্যথা সহ্য করেছিল। আশেপাশে কেউ ছিল না। সমগ্র ঘরটা, পরিবেশটাও নির্জনতায় ডুবে গিয়েছিল। বাতাসে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। অবাঞ্ছিত শব্দের জন্য প্রত্যেকেই কান খাড়া করে রেখেছিল। সেই নির্জন মুহূর্তে প্রত্যেককে অবাক করে সুস্থ শরীরে নরেনের জন্ম। তাকে গর্ভেই হত্যা করার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে ভূমিষ্ঠ হল। ট্যাঁ ট্যাঁ রবে আশেপাশের অঞ্চলকে শুনিয়ে সে কাঁদল। তার কান্না চরিত্রহীন মানুষগুলির বুক কাঁপিয়ে তুলল।

তাঁর চোখের সামনে একজন অবিবাহিতা মাতার চারপাশে অনাদর অবহেলায় নরেন ক্রমশ বড় হয়ে উঠল। তাকে প্রত্যেকেই এড়িয়ে চলল। গ্রামের কিছু উচ্ছৃঙ্খল বন্ধুর সঙ্গে থেকে একদিন সে আবিষ্কার করল, সে পিতৃপরিচয়হীন। গড়ে ওঠা কৈশোর ঘরে-মাঠে নানা অপ্রিয় কথায় রিক্ত হয়ে উঠল। সে বদলে গেল। ডাংগুটি খেলা ছেলেটি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পড়ল। অকস্মাৎ সে নিজেকে আবিষ্কারে মগ্ন হল। নিজের চারপাশে দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলল। সে দীর্ঘদিন মায়ের এক-রুমের ঘরে আত্মগোপন করল।

শামুকের খোলসের মতো কঠিন একটা আবরণ গড়ে নিয়ে সে পুনরায় বেঁচে উঠল।

নরেনের দ্বিতীয় জন্ম। শক্তিশালী। সবল। কঠিন। ঊর্ধ্বমুখ। কৈশোরের শঙ্কা, পরিচয়হীনতার লজ্জা, নিচাত্মিকার দুঃখ— কিছুই নেই। গড়ে ওঠা যৌবন দুর্দমনীয় হয়ে উঠল। একটা সময়ে কেউ গুরুত্ব না দেওয়া ছেলেটিকে প্রত্যেকেই ভয় আর সমীহ করতে লাগল।

নরেন তাঁর ছেলে। তার শরীরে নিজের রক্ত প্রবাহিত। নরেনের কোঁকড়া চুল, ঊর্ধ্ব বাহু, সুঠাম শরীর তার সাক্ষ্য বহন করে। চাঁদের আলোর মতো ধবধবে সেই সত্য। তিনি বড় অসহায়।

—কাকু, বিচার আরম্ভ করতে হবে। যুবকদের ভুলগুলি দেখিয়ে দিতে হবে। নাহলে পরে পুনরায় জনগণই দায়ী হবে। তাই নয় কি জনগণ?
—হ্যাঁ ভুলগুলি শুধরে নিতে হবে।

চল্লিশ বছর আগে তিনি ভুল করেছিলেন। নরেনের মা তখন গ্রামের মধ্যে চাঁদের মতো ঝলমল করছিল। দিনের পর দিন ধানের মুঠি বেঁধে বেঁধে সতেজ হয়ে থাকা যুবতী। এক নির্জন সন্ধ্যায় তাকে একা পেয়ে তিনি জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেই নিষিদ্ধ সময়ের স্মৃতি মনে থেকে গেল। একটা ভঙ্গুর কোমল লতাকে ছিনিয়ে আনার মতো ভাব। নিজের ভেতরে কঠিন কিছু একটার উপস্থিতিতে নিজের পুরুষত্বকে জানার সুখ। জীবনের জন্য এক অপরিচিত গন্ধ তার চারপাশে থেকে গেল।

—ঠিক আছে। যা হয়েছে গ্রামে। কিছুটা কঠোর না হলে গ্রাম আর গ্রাম থাকে না।

তিনি নরেনকে দেখছেন। কথাগুলি নরেনকে বিদ্ধ করছে কি? যদি সে ভুল করে থাকে সে ভেতরে ভেতরে ঠকঠক করে কাঁপছে কি?

পূর্ণিমা রাতে পাশের বসতি থেকে আগত নিষিদ্ধ একটা খবরে তিনি ঠকঠক করে কাঁপছিলেন। সেদিন প্রাচীন বিশাল চৌহদে নিজের ঘরটাতে থাকার সাহস হচ্ছিল না। ধানের শুকনো খসখসে নাড়ায় শুয়ে শুয়ে তিনি ভোর পর্যন্ত কাঁপছিলেন।

কষ্ট হল না। সহজ হয়ে গেল। তিনি মাথা তুলে রইলেন। পিতা সমস্ত সহজ করে রেখে গেলেন। নরেনের পিতৃপরিচয় ঘোষণা করার সাহস লতার মতো আশ্রিত নরেনের মায়ের আজ পর্যন্ত হল না।

তবে এখনও তাঁর নিজের শয্যাশায়ী মাকে ভয় হয়। মায়ের দিকে তাকালে একটা অপরাধবোধ এবং দুঃখ উজিয়ে আসে। মায়ের চোখজোড়া জিজ্ঞেস করা বোবা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি স্থির হয়ে পড়েন।

ক্রমে বড় হওয়া নরেনকে দেখে দেখে তিনি বিমূঢ় হয়ে পড়েন।

কচি কুমড়োর মতো ছেলে। হাত-পা স্বাস্থ্যবান।

তাঁর মতোই গড়ন পেয়েছে। ছেলেটির প্রতি স্নেহ জেগেছিল। কোলে নেওয়ার অবকাশ নেই। অনন্ত হাহাকার গভীর বেদনা মর্মস্থলীতে জমাট বাঁধা সামলে নিয়ে নিজের ঘর করলেন। তিন সন্তানের পিতা হলেন। তিনি আজ সমাজস্বীকৃত মানুষ। নরেন অনেক দূরে থেকে গেল।

—কিছু বলবে কি? আমার হাতে একদম সময় নেই। কাজ আছে। আমাকে যেতে হবে।

নরেনের স্পষ্ট কণ্ঠস্বর। সে ফোন কানে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

—যাচ্ছি। একটা অদরকারি কাজে ফেঁসে আছি…

নরেন প্রত্যেককে শোনানোর মতো করে কাকে যেন বলছে। লোকগুলি তার দিকে তাকাচ্ছে।

সামাজিক অপমানের মধ্যে গড়ে উঠা ছেলেটিকে সমাজ ভয় করছে। তিনিও ভয় করছেন। স্ব-আবিষ্কারে মগ্ন শক্তিশালী ছেলেটি চারপাশ উজ্জ্বল করে তুলছে। বৈভবের উজ্জ্বলতা তাকে একটা নতুন পরিচয় দান করেছে। ধন, জন, সমাজ সবকিছুতে। কষ্ট করে গড়ে তোলা শক্তিশালী পরিচয় তাকে, তার পরিবারকে হারিয়ে দিতে চাইছে। হিংসা এবং ঈর্ষায় তাঁরই স্বীকৃত পুত্ররা তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরাও নরেন কার পুত্র জানে। সেই অপরাধের ভাগ ওরাও মাঝেমধ্যে পায়।

এক সামান্য অজুহাতে নরেনকে সামাজিকভাবে দোষী করা হয়েছে। গ্রামের একজন মহিলার সঙ্গে সে খারাপ ব্যবহার করেছে। পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে তাকে জনগণের আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য ডাকা হয়েছে। এটা এক নির্মম আনুষ্ঠানিকতা। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতে তাঁর বড় ছেলে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। এই কয়েকদিন মহিলাটির বাড়িতে তার বড় ছেলে ঘনঘন আসা-যাওয়া করেছে। বড়বিলে জাল ফেলার প্রথম খেপের মাছের বেশিরভাগ সেই বাড়িতেই গিয়েছে। চালনিতে ঢেলে দিতেই এদিকে ওদিকে গড়িয়ে যাওয়া চকচক করতে থাকা কাতলামাছ।

নরেন দোষী হলে তাকে জেলের ভাত খেতে হবে। তাঁর পরিবার সেটাই চায়। তাকে গ্রাম থেকে তাড়াতে চায়। প্রতিদিন উজ্জ্বল হয়ে ওঠা নরেনকে সামনে দেখতে থাকা বড় যন্ত্রণার।

সাদা ধবধবে ধুতি পরে নরেন তার সামনে ধাড়ি পেতে বসল। মাঝখানে খালি জায়গা। কিন্তু তাঁর মনে হচ্ছে সে সেখানে নয়, মাঠটা পার হয়ে দেখতে না-পাওয়া কোনও একটা সীমায়। তাঁর ইচ্ছা করল তিনি দু-হাত মেলে দেবেন, আস্তে আস্তে হাতদুটি দীর্ঘ হতে হতে গিয়ে নরেনকে পাবে। একবার নরেনকে স্পর্শ করে দেখবে, তার কোঁকড়া চুলে হাত বোলাবে, তার সুঠাম বাহুদুটিতে হাত দুটি রাখবে। আজই সেই সুযোগ। হয়তো শেষ সুযোগ।

তিনি চুপ থাকায় গ্রামের মানুষগুলি বিষয়টির আলোচনা এগিয়ে নিয়ে গেল। নরেনকে বলতে বলল।

—আমি সেই মহিলাকে দিদি বলে ডাকি। সম্মান করি। আমি কোনও খারাপ কাজ করিনি। ডেকে আনুন তাকে। জনগণের সামনে নিজের মুখে বলুক।

তার কথাগুলি স্পষ্ট। তার ভাষা শক্তিশালী। তার কণ্ঠস্বরে প্রত্যয়।

জনগণ পুনরায় তাঁর দিকে তাকাল।

এই কয়েকদিন বাড়িতে বড়ছেলের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। কথাগুলি তাঁকে পাক মেরে ধরল। পুনরায় কঠিন কণ্ঠস্বর জেগে উঠছে। বড়ছেলের কাছে মুখস্থ করে আসা কথাগুলি নাম ঘরে বলে যেতে হবে। যে-কোনও উপায়ে নরেনকে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে হবে। তাঁকে কঠোর হতে হবে।

তাঁর বড়ছেলে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। নরেন প্রত্যয়ের সঙ্গে তাকিয়ে রয়েছে। চারটি চোখ ভেসে ভেসে এসে তাঁর বুকের মধ্যে আঘাত করতে চাইছে।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সমস্ত জনগণ সন্তোষের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল। কোনও অস্পষ্ট গুঞ্জনধ্বনি নেই। সবাই নৈঃশব্দ্যে ডুবে গেছে। তিনি পুনরায় মণিকূটের দিকে তাকালেন। হঠাৎ তিনি আশ্চর্য হলেন। অদৃশ্য আবাহনী মুদ্রার কিছু ঢেউ যেন মণিকূটের দেওয়ালে উচ্ছৃংখল হয়ে নেচে চলেছে। তাঁর নিজের মায়ের দুটো বোবা চোখ এসে তাঁর দিকে তাকিয়ে অলেখ অযুত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চাইছে। তাঁর শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। নিঃশ্বাস ছোট হয়ে এল। তিনি সামনের দিকে হেলে পড়তে চাইলেন।

নরেন লাফ দিয়ে উঠল। অকস্মাৎ তাঁর শরীরটা নরেন এসে জড়িয়ে ধরল। তিনি নরেনের সুঠাম শরীরের আবেষ্টনীতে ঢুকে পড়লেন। ক্রমে ক্রমে স্থির হলেন। নিরাপদ বলে মনে হল। দেহের কম্পন মিলিয়ে গেল। নিঃশ্বাস ফিরে পেলেন। নরেনের শরীরের গন্ধ ভেদ করে আসছিল বিশুদ্ধ বাতাস।

নরেনের শরীরেই ছিল বহন করে বেড়ানো মৌ-মৌ করা অপরিচিত গন্ধটা। সেই গন্ধটা অতিক্রম করে তিনি মাথা তুলে দাঁড়ালেন।

 

 


[1] অসমিয়া বঁটা শব্দের অর্থ পুরস্কার।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5413 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. খুব অন্যরকম গল্প। ভালো লাগলো। অনুবাদটিও স্বচ্ছন্দ।

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.