সিদ্ধার্থ বসু

পাঁচটি কবিতা

 

ফুলশানা

হাসির কথা, কাঁদার কথা, কী যে সহজ
অথচ আমি ফুল্ল হই না, দুঃখ পাই না
খুশি মানুষ দেখি পথে, ক্ষুণ্ণ মন মনোরথে
যা কিছু পাই, পেয়ে হারাই, কিছুই চাই না

বাঁচার আয়োজনেই বড় জটিল শ্রম
তা বলে, ছাই জীবন-বলে রেহাই নিই না
আহত সব পরাক্রম, খুঁজে বেড়াই হলিডে হোম
তবুও মহা প্রোপ্রাইটরকে তলব দিই না

মনের তলায় কোনও ব্যথাই তলিয়ে কিনা
রয়েছে ওঁত পেতেই বা সে কোন অমৃত
বুঝে পাই না কিছুই তার, বোঝার কিছু নেই-ও আর
সমঝোতা এই, পরক্ষণেই অসংবৃত

আনন্দ চাই, চাই বেদনা, কলজে ফাটা ক্রূর কামনা
অথচ চাই চিরস্থির আয়ুর বৃত্ত
কিছু আমার হয়নি আর, এমনও কিছু নয় হবে না
চাওয়াও ডাকে, পাওয়াও থাকে, নিত্যানিত্য।

 

দোয়া

প্রতিটি মানুষ যেন খেতে পায়
থাকবার ঘর যেন পায় তারা
শীত-গ্রীষ্মে গা-ঢাকার কাঁথাকানি
পায় যেন প্রান্ত থেকে প্রান্তজন

জ্বরে জলপটি আর ব্যথায় মলম
যেন পায়, দুরারোগ্যে আরোগ্য-আরাম
প্রতিটি মানুষ যেন রাতে ঘুম পায়
ঘুমে যেন ডুবে যায় বৈশাখের রাতে

প্রতিটি মানুষ পায় বরাভয়
অসম্মানে ভিত ধসে না যায়
যেন কারও মূলশুদ্ধু উপড়ে
ফেলতে আর অন্য কেউ না জাগে

মানুষের রক্তে যেন অন্য মানুষের
অনায়াস পুজো না-মোচ্ছব না চড়ে
মানুষের কান্না যেন মানুষকে কাঁদায়
যে স্বর্গ অলীক, তার থেকে প্রেম ঝরে।

 

বাংলার ত্রস্ত নীলিমা-য়

আমি তো ভয় পাই
ভীষণ ভয় পাই
দারুণ ভয় পেয়ে
নিজেরই পেটে-বুকে
সেঁধিয়ে থাকি নিজে

যা ছিল, ভয়ানক
যা হল, তারও বেশি
তারও চে’ ভয়াবহ
যা হবে, হচ্ছে

আমি তো একা থাকি
আমি তো দলছুট
আমি তো আমাদের
দলে-বেদলে বাঁধি

আমি তো মিশে যাই
জলের মতো জলে
বহুর মধ্যে যে
অলীক নির্জন
তারই অমৃতে-বিষে
পাগল, অন্ধ

আমি যে স্মৃতিহীন
ভূত-ভবিষ্যৎ
তাবতই ভ্রষ্ট
তবুও এত ব্যথা
কেন যে শুঁড় নাড়ে
রোমশ ঘিরে ধরে
কেন যে এত ভয়

আমি তো বেঁচে আছি
কেন যে আছি বেঁচে
আমি তো মৃতবৎ
আমি তো ধ্বস্ত

তবুও কেন এত
ভয়ের মতো ভয়
শেষেরও পরে শেষ
কেন যে তাড়া করে
সত্তা পুড়ে ছাই
হাওয়ায় মিশে গিয়ে
স্রোতের জল হয়ে
মাটিতে ধুলো হয়ে
তবু কী কষ্ট?

 

হে নূতন

এই যে অনর্থ এত
বুড়িগঙ্গা ফুঁসে উঠবে
অথবা হয়তো ভেঙে নেমে আসবে সূর্যের ফাল
এই মাটি, আগ্নেয় পাতাল
হয়তো কেঁপে উঠবে থরোথরো
আকাশ গা ছেড়ে দ্রুত
অচানক মাটিতে আছড়াবে
সবকিছু, সব
ভালো-মন্দ উঁচু-নিচু জ্যান্ত-মরা
আলো-কালো
প্রলয়ের মতন সরব
ভেঙে, পুড়ে, ক্ষয়ে, পিষে, মরে, মিশে যাবে

জ্বলে থাকবে মরা আলো
বেজে চলবে বোবা বাজনা
আর
আমরা যারা দুয়েকজন
এক চোখ টিপে
বুঝে নেব কত আয়ু–কত তেল
আছে আজও দরবারের
নিভন্ত প্রদীপে।

 

পরববেলা

আমরা গো-হারা হেরেছি

অন্যভোজী, অন্যভাষী, অন্যধর্মী, অন্য জাতি, অপর অপর
এ বাবদে দেয়ালের পর দেয়ালের পর দেয়াল তুলে দিতে পেরেছে ওরা

ছেলেরা পেয়েছে মেয়েদের, কোমরের নিচের জমিতে।
মেয়েরাও আবার— খুব স্বাভাবিকভাবেই— ছেলেদের গায়ে থুতু দিচ্ছে।

হিন্দুরা পেয়েছে ইসলামকে, সর্বব্যাধির সর্বজনীন জীবাণু হিসেবে,
আর মোল্লারাও— অনুরূপে প্রতিরূপে— দম চেপে পালায় আর কোনওদিন বাগে পেলেই হিঁদুদের স্যাটা ভেঙে দেয়ার তালে থাকে।

আমার পাট্টি তোমার পাট্টি
আমার জামা তোমার ইজের
আমার মাছ তোমার মিছরিপানা
(শোর-গরুর কথা আর না-ই তুললাম)
আমার কাজল তোমার সুর্মা-চোখ
এমনকি শেষতক,
আমার পাঁচ আর তোমার পাঁচশো টাকা
প্রতিটি পরিপার্শ্বভেদে,
তুমি আমার পিঠে আর
আমিও তোমারই তলপেটে
ছুরি-চাকু-ভোজালি উঁচিয়ে, দ্যাখো, অতন্দ্র রয়েছি
যেই একেকবার ফিনকি দিচ্ছে রক্ত
গররা উঠছে উল্লাস করতালি আর হাহা-রবের

কারা যে ঠোঁট টিপে হাসছে, আর
ভরে উঠছে-ফেঁপে উঠছে
সারে-প্রাণে-রসে
আমরা কেউ খবর রাখছি না।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5413 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.