ওহজা জামাতিয়া
গভীরতর প্রশ্নটি শুধু ধর্মান্তরিত আদিবাসীরা সংরক্ষণের “অধিকারী” কি না তা নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক ও ধর্মীয়ভাবে বহুত্বপূর্ণ ভারতে আদিবাসী পরিচয়ের মানদণ্ড কী হবে, এবং তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার থাকবে— সেটি
২০২৬ সালের ২৪ মে দিল্লির লালকেল্লা প্রাঙ্গণে ৫০০-রও বেশি জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রায় দেড় লক্ষ নারী-পুরুষ সমবেত হন। উপলক্ষ ছিল বিরসা মুন্ডার স্মারকবর্ষ উদ্যাপন— ‘জনজাতি সাংস্কৃতিক সমাগম’ নামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আরএসএস-ঘনিষ্ঠ জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ।
সেখানে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গেরুয়া পতাকার সমারোহ, আদিবাসী গৌরবের বন্দনার পাশাপাশি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হল— খ্রিস্টধর্ম বা ইসলামে ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের তফসিলি জনজাতি স্বীকৃতি বাতিল করা উচিত, এমনকি যাঁরা বর্তমানে সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদেরও।
সমাবেশটিকে সাংস্কৃতিক উদ্যাপন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত বিষয় ছিল অন্যত্র— সেই দাবি।
বহু বছর ধরে খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম গ্রহণ করলে আদিবাসীদের তফসিলি জনজাতির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা উচিত— এই ধারণাটি মূলত প্রান্তিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল; প্রচারপত্রে, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সম্মেলনগুলিতে এবং আঞ্চলিক বিতর্কের পরিসরে। ২৪ মে সেই দাবি আর প্রান্তিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকল না; লালকেল্লার ছায়াতলে তা প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করল, আর তার জন্য একদমই বেমানানভাবে ব্যবহার করা হল বিরসা মুন্ডাকে।
ভারতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক দাবিদাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যখন সেগুলি মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে, তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর এই রূপান্তর উত্তর-পূর্ব ভারতে যতটা বিপজ্জনক, ততটা অন্য কোথাও নয়; কারণ এখানে জনজাতি, জাতিসত্তা, ভূমি, ধর্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক পরিচয় এক জটিল ও ভঙ্গুর ভারসাম্যের মধ্যে সহাবস্থান করে।
এখন প্রশ্ন আর কেবল সংরক্ষণ নয়; বরং আধুনিক ভারতে আদিবাসী পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা কার থাকবে, সেই প্রশ্নই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
আদিবাসী রাজনীতির নতুন শব্দভাণ্ডার
ঐতিহাসিকভাবে ভারতে আদিবাসী রাজনীতির মূল প্রশ্নগুলি ভূমি, স্বশাসন, প্রথাগত অধিকার এবং অস্তিত্ব রক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। নাগা, মিজো, কুকি, গারো, খাসি, বোডো, ত্রিপুরি, সাঁওতাল, মুন্ডা কিংবা ভিল— যে জনজাতির কথাই ধরা হোক না কেন, তাদের প্রতিরোধ ও সংগ্রামের ভিত্তি ছিল ভূমি, মর্যাদা, শাসনব্যবস্থা এবং বহিরাগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা; ধর্মীয় পরিচয় নয়।
ঔপনিবেশিক ভারতে আদিবাসী বিদ্রোহগুলির কারণ ছিল ভূমি থেকে উচ্ছেদ, শোষণমূলক করব্যবস্থা, মিশনারিদের হস্তক্ষেপ এবং প্রথাগত কর্তৃত্ব কাঠামোর ভাঙন। আর উপনিবেশ-উত্তর ভারতে আদিবাসী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে পৃথক রাজ্যের দাবি, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, সাংবিধানিক সুরক্ষা, বনাধিকার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন।
আজ সেই রাজনৈতিক পরিসরে এক ভিন্ন শব্দভাণ্ডার প্রবেশ করছে— ধর্মান্তরণ, সভ্যতাগত পরিচয়, জনসংখ্যাগত উদ্বেগ, ধর্মীয় বিশুদ্ধতার প্রশ্ন এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যাচ্ছে মধ্য ভারতে, যেখানে বৃহত্তর হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলি আদিবাসী সমাজের মধ্যে বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, স্বাস্থ্যশিবির এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত সাংগঠনিক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে।
১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠন বনবাসী কল্যাণ আশ্রম দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলে সক্রিয়। তাদের অন্যতম মূল বক্তব্য হল, আদিবাসী সমাজ বৃহত্তর হিন্দু সভ্যতারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
রাজনৈতিক তাৎপর্য পরিষ্কার। আদিবাসী পরিচয়কে আর সাংবিধানিক অধিকার কিংবা আদিবাসী স্বায়ত্তশাসনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা হচ্ছে না; বরং সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ এবং জাতীয় ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে তাকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা চলছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতে এই রূপান্তর সর্বত্র সমানভাবে ঘটেনি। ত্রিপুরা ও আসামে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী বৃহত্তর অনাদিবাসী ও হিন্দু জনসংখ্যার সঙ্গে সহাবস্থান করে, সেখানে অভিবাসন, পরিচয় এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন আদিবাসী রাজনীতিকে ধর্মীয় মেরুকরণের সহজ শিকার করে তুলেছে। রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শিক সংগঠনগুলি ক্রমশই আরও তীব্রভাবে আদিবাসী পরিচয়কে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের বয়ানের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয়ের মতো খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলিতে আবার চিত্রটি আলাদা। এসব জায়গায় খ্রিস্টধর্ম নিছক ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস নয়; তা আদিবাসী সমাজের পরিচয়, নাগরিক পরিসর, শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক জীবনের বুনোটের মধ্যে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, নাগাল্যান্ডে ৮৭.৯৩ শতাংশ, মিজোরামে ৮৭.১৬ শতাংশ এবং মেঘালয়ে ৭৪.৫৯ শতাংশ মানুষ খ্রিস্টান। এই বাস্তবতায় হিন্দুত্ববাদী বয়ানের কাঠামোর মধ্যে আদিবাসী পরিচয়কে স্থান দেওয়ার প্রচেষ্টা স্বভাবতই দুষ্কর।
ফলে উত্তর-পূর্ব ভারত এক জটিল বৈপরীত্যের চিত্র তুলে ধরে: আদিবাসী রাজনীতির ভেতরে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রভাব একই সঙ্গে বিস্তার লাভ করছে, প্রতিরোধের মুখে পড়ছে, নানা সমঝোতা ও দরকষাকষির মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে, এবং অঞ্চলভেদে তার প্রভাবের মাত্রাও ভিন্ন হচ্ছে।
সাংবিধানিক যুক্তির আড়াল
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি পার্থক্য, যাকে প্রায়শই ঝাপসা করে দেওয়া হয়: আদিবাসী পরিচয় এবং তফসিলি জনজাতি (এসটি) মর্যাদা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হলেও অভিন্ন নয়।
খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম গ্রহণ করলেই কোনও আদিবাসী ব্যক্তি তাঁর জাতিগত আদিবাসী পরিচয় হারান না। একজন খ্রিস্টান খাসি খাসিই থাকেন। একজন ব্যাপ্টিস্ট নাগা নাগাই থাকেন। ধর্মান্তরণের ফলে ধর্মীয় আচার-অনুশীলনে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু তা বংশপরিচয়, গোষ্ঠীগত উত্তরাধিকার কিংবা সম্প্রদায়গত পরিচয় মুছে যায় না।
কিন্তু আইনি বিতর্কের বিষয়টি আলাদা। প্রশ্ন হল, ধর্মান্তরণের পরও কোনও ব্যক্তি কি তফসিলি জনজাতি (এসটি) মর্যাদার ভিত্তিতে প্রদত্ত সাংবিধানিক সংরক্ষণের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন?
ভারতীয় সংবিধানের ৩৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোন কোন সম্প্রদায়কে তফসিলি জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত। পরবর্তীকালে ১৯৬৫ সালের লোকুর কমিটি-র সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু প্রশাসনিক মানদণ্ড গড়ে ওঠে, যেখানে ‘আদিম বৈশিষ্ট্য’, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা এবং অনগ্রসরতাকে তফসিলি জনজাতি চিহ্নিতকরণের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তফসিলি জাতি (এসসি) সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে যেমন ধর্মের ভিত্তিতে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তফসিলি জনজাতি (এসটি)-দের ক্ষেত্রে তেমন কোনও ধর্মগত সীমাবদ্ধতা কখনও আরোপিত হয়নি।
১৯৫০ সালের ‘সংবিধান (তফসিলি জাতি) আদেশ’-এ প্রথমে তফসিলি জাতি (এসসি) স্বীকৃতি কেবল হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল; পরে তা শিখ ও বৌদ্ধদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়। কারণ, জাতভিত্তিক অস্পৃশ্যতার প্রথা ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
তফসিলি জনজাতিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনও ধর্মগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়নি, কারণ তাদের অনগ্রসরতার উৎসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল— যার শিকড় ছিল ভূমিচ্যুতি, ভূমি-বিচ্ছিন্নতা, অনুন্নয়ন এবং রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণে।
২০২৬ সালের মার্চে চিন্থাডা আনন্দ বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় উল্লেখ করে যে, খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম গ্রহণের ফলে দলিতদের তফসিলি জাতি (এসসি) মর্যাদা লোপ পায়। কিন্তু আদালত একইসঙ্গে স্পষ্ট করে দেয় যে, শুধুমাত্র ধর্মান্তরণের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তির তফসিলি জনজাতি (এসটি) মর্যাদা বাতিল করা যায় না।
আদালত রায়ে জানায়, ধর্মান্তরণের পরও কোনও আদিবাসী ব্যক্তি তফসিলি জনজাতি (এসটি) মর্যাদা বজায় রাখতে পারেন, যদি তিনি আদিবাসী পরিচয়ের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারণ করে চলেন, প্রথাগত রীতিনীতি অনুসরণ করেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের স্বীকৃতিচ্যুত না হন। আদালতের মতে, কেবল তখনই এসটি মর্যাদা লোপ পেতে পারে, যখন আদিবাসী জীবনযাত্রা ও সামাজিক সত্তার সঙ্গে তাঁর ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ’ (complete severance from the tribal way of life) ঘটে।
আইন স্পষ্ট। রাজনীতি, যদিও, নয়।
মধ্য ভারত: ‘আউটরিচ’-এর বলি
ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় এবং মধ্যপ্রদেশে হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলি আদিবাসী সমাজের মধ্যে বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস এবং নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কার্যপদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যের ছাত্রাবাস, যেখানে কঠোর দৈনন্দিন নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয়, এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে কর্মী পাঠানো হয় এই ধারণা প্রচারের জন্য যে আদিবাসীরা ‘সনাতন’ হিন্দু সভ্যতারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঝাড়খণ্ডের সিমডেগা জেলায় বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের প্রধান সত্যেন্দ্র সিং যুক্তি দিয়েছেন যে আদিবাসীদের বিশ্বাসব্যবস্থা মূলত হিন্দু ঐতিহ্যেরই অংশ। তাই, তাঁর মতে, পৃথক ‘সারনা’ ধর্মকোডের দাবি গির্জার প্ররোচনায় পরিচালিত ‘সমাজকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্রবিশেষ’।
আরএসএস ও বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে বর্ণিত জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ তফসিলি জনজাতি (এসটি) সংরক্ষণকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বলে তুলে ধরেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, ধর্মান্তরণের ফলে সেই বঞ্চনার চরিত্র বদলে যায়, ফলে জাত-ভিত্তিক সংরক্ষণের পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয়, তার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মধ্য ভারতে হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আদিবাসী সংগঠনগুলি নিজেদের মিশনারি প্রভাবের বিরুদ্ধে ‘খাঁটি’ আদিবাসী পরিচয়ের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে তারা ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের তফসিলি জনজাতি মর্যাদা প্রত্যাহারের দাবিও জোরালোভাবে উত্থাপন করে আসছে— ২০২৬ সালের মে মাসে লালকেল্লার এই সমাবেশে যে দাবির জনসমক্ষে প্রকাশ ঘটল।
বৈপরীত্যটি স্পষ্ট ও তীব্র: যে সংগঠনগুলি নিজেদের আদিবাসীদের বন্ধু ও সহযোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরে, তারাই এমন একটি দাবি সামনে আনছে, যা আদিবাসী সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে সংরক্ষণ ও অন্যান্য সাংবিধানিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
ত্রিপুরা— যেখানে আদিবাসী স্বায়ত্তশাসন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানায়
ত্রিপুরায় আদিবাসী রাজনীতির চরিত্র নির্ধারিত হয় জনসংখ্যাগত বিন্যাস, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক প্রতিযোগিতার দ্বারা। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৮৩.৪০ শতাংশ হিন্দু, ৮.৬০ শতাংশ মুসলমান, ৪.৩৫ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ৩.৪১ শতাংশ বৌদ্ধ।
আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনসংখ্যার বিচারে তারা অনাদিবাসী অভিবাসী ও বসতিস্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলির তুলনায় সংখ্যালঘু অবস্থানে রয়েছে। এই বাস্তবতা ভূমি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
ত্রিপুরার আদিবাসী রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি তিপ্রা মথা পার্টি (টিএমপি)। প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেববর্মার নেতৃত্বে দলটি ২০২৬ সালের টিটিএএডিসি নির্বাচনে ৩০টির মধ্যে ২৪টি আসন জিতে নিজেদের আধিপত্য সুস্পষ্ট করে। এর বিপরীতে, রাজ্য সরকারে তাদের জোটসঙ্গী বিজেপির আসনসংখ্যা ২০২১ সালের ৮ থেকে কমে ৪-এ নেমে এসেছে।
এ থেকে বোঝা যায় যে ত্রিপুরার আদিবাসী রাজনৈতিক চেতনা স্বতঃসিদ্ধভাবে হিন্দুত্ববাদী আখ্যানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে না। সেখানে আদিবাসী ভোটাররা জাতীয় ধর্মীয় পরিচয়ের বয়ানের চেয়ে স্বদেশীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিতে সক্ষম।
নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয়ের মতো রাজ্যগুলিতে, যেখানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে হিন্দুত্ববাদী আখ্যানের কাঠামোর মধ্যে আদিবাসী পরিচয়কে পুনঃসংজ্ঞায়িত করার উদ্যোগ স্বভাবতই শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে।
এই সব অঞ্চলে খ্রিস্টধর্ম আদিবাসী সামাজিক পরিচয়, শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ধর্মান্তরণের ফলে বহু আদিবাসী সমাজের প্রাচীন বিশ্বাসব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে বটে, কিন্তু বহু অঞ্চলে খ্রিস্টধর্ম আদিবাসী পরিচয়কে প্রতিস্থাপিত করেনি; বরং তার সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গেছে।
আর ঠিক এই কারণেই আদিবাসী স্বীকৃতি প্রত্যাহারের রাজনীতি এত বিস্ফোরক ও বিতর্কিত।
উত্তর-পূর্ব ভারতের জটিলতা
উত্তর-পূর্ব ভারতে এই বিতর্ক বিশেষভাবে জটিল ও বহুস্তরীয়, কারণ সেখানে ধর্ম, জাতিসত্তা, আদিবাসী পরিচয়, ভূখণ্ড এবং রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এবং কার্যত অবিচ্ছেদ্য।
এই অঞ্চলে হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম কিংবা ইসলামের আগমনের বহু পূর্বে আদিবাসী সমাজগুলির নিজস্ব আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ছিল। সেই ঐতিহ্যের ভিত্তি ছিল প্রাণবাদী বিশ্বাস, পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও পূজা, এবং প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনদর্শন। বন, নদী, পাহাড় ও গোত্রগত বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে তাদের ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক জীবন ছিল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্যগত ধর্মবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চর্চা প্রধানত ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণব্যবস্থার পরিসরের বাইরে গড়ে উঠেছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা বিচ্ছিন্ন ছিল; বরং পার্শ্ববর্তী রাজ্য ও রাজনৈতিক শক্তিগুলির সঙ্গে তাদের দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাস রয়েছে।
খাসি ও গারো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অসমিয়া ও বাঙালি হিন্দু সমাজের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। ত্রিপুরার রাজপরিবার হিন্দু ধর্মীয় আচার ও প্রথা গ্রহণ করেছিল। দিমাসা রাজ্যও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হিন্দুয়ায়নের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল। তবু বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ধারার এই পারস্পরিক মিশ্রণ— অর্থাৎ সংকরায়ণ— উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল।
এই ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়ার বাস্তবতা থেকে সমস্ত আদিবাসী ইতিহাসকে একক হিন্দু সভ্যতাগত কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে দেখা ইতিহাসসম্মত নয়।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু আদিবাসী সমাজ ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণভাবেই জাতপাতের কাঠামোর বাইরে অবস্থান করেছে। তাদের সামাজিক সংগঠন, আত্মীয়তার সম্পর্কের ধরন এবং প্রথাগত আইন-কানুন মূলধারার ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক বিন্যাস থেকে স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত ও পরিচালিত হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণেই আদিবাসী পরিচয়কে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার প্রচেষ্টা সহজে গ্রহণযোগ্য হয় না। উত্তর-পূর্বের বহু জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধের মূলে রয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক উদ্বেগ— মূল ভূখণ্ডের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও পরিচয় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
যেখানে ভূমি, ভাষা এবং বিদ্রোহ কিংবা স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের স্মৃতি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে সর্বভারতীয় ধর্মীয় বয়ানের কাঠামোয় আদিবাসী পরিচয়কে পুনর্গঠনের চেষ্টা প্রায়শই অন্তর্ভুক্তির বার্তা হিসেবে নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব লোপ করার চক্রান্ত হিসেবেই প্রতিভাত হয়।
কে নির্ধারণ করবে আদিবাসী পরিচয়?
দিল্লির এই সমাবেশ ইঙ্গিত দেয় যে ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের তফসিলি জনজাতি (এসটি) মর্যাদা প্রত্যাহারের দাবি আর প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে নেই; বরং তা এখন বৃহৎ ও সংগঠিত জনপরিসরের মধ্যে থেকে উচ্চারিত একটি সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে উঠেছে।
চিন্থাডা আনন্দ বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে শুধুমাত্র ধর্মান্তরণ তফসিলি জনজাতি (এসটি) মর্যাদা বিলোপের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু এই দাবির পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয় রয়েছে, তা নির্দেশ করে যে আইনি স্তরে যতই ব্যাখ্যা দেওয়া হোক না কেন, রাজনৈতিকভাবে তাকে বিরোধিতা করার জমি তৈরি হচ্ছে।
গভীরতর প্রশ্নটি শুধু ধর্মান্তরিত আদিবাসীরা সংরক্ষণের “অধিকারী” কি না তা নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক ও ধর্মীয়ভাবে বহুত্বপূর্ণ ভারতে আদিবাসী পরিচয়ের মানদণ্ড কী হবে, এবং তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার থাকবে— সেটি।
মধ্য ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি আদিবাসী পরিচয়কে সভ্যতাগত কাঠামোর মধ্যে পুনর্ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। ত্রিপুরায় আবার আদিবাসী ভোটাররা সেই রাজনৈতিক শক্তিকেই সমর্থন দিয়েছে, যারা স্বদেশীয় স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয়ের মতো রাজ্যগুলিতে খ্রিস্টধর্ম ও আদিবাসী পরিচয় এতটাই গভীরভাবে পরস্পর-সংযুক্ত যে সেখানে আদিবাসী পরিচয়কে ‘হিন্দুয়ায়ন’-এর কাঠামোয় পুনর্গঠনের যে কোনও উদ্যোগকে অনেক ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক বিলুপ্তকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হতে পারে।
বিতর্কটি এখন আর শুধু সংরক্ষণনীতিকে ঘিরে নয়; বরং তা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এই প্রশ্নে— আধুনিক ভারতে আদিবাসী পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা কার থাকবে। বর্তমানে এই প্রশ্নের কোনও সহজ সমাধান নেই, কোনও নিরপেক্ষ বিচারকও নেই।
*নিবন্ধটি ইস্ট মোজো-তে গত ১ জুন ইংরেজিতে প্রকাশিত


আপনার মতামত...