ইসলামে গণধর্মান্তর: তত্ত্ব ও প্রবক্তারা

রিচার্ড এম ইটন

 

বাঙালি মুসলিম, তথা বাংলার মুসলিম জনগণ, বর্তমানে, যথেষ্ট অনভিপ্রেত হলেও, চর্চার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বিষয়টি নিয়ে অতীতেও গবেষণা কম হয়নি, এবং সেই সব গবেষণাকর্মের মধ্যে মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটনেThe Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760 একটি প্রামাণ্য গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। সেই গ্রন্থেরই একটি অধ্যায় ‘ইসলামে গণধর্মান্তর: তত্ত্ব ও প্রবক্তারা’ রইল আমদের এই সংখ্যার স্টিম ইঞ্জিনে। বঙ্গানুবাদ আমাদের।

 

ভারতে ইসলামায়নের চারটি প্রচলিত তত্ত্ব

ভারতে ইসলামের বিস্তার ব্যাখ্যা করতে যে তত্ত্বগুলি প্রচলিত, সেগুলিকে মূলত চারটি ভিত্তিগত যুক্তিধারায় নামিয়ে আনা যায়। প্রতিটিই অপর্যাপ্ত। এর মধ্যে প্রথমটি, যাকে আমি ‘অভিবাসন তত্ত্ব’ (Immigration theory) বলব, আসলে ধর্মান্তরের কোনও তত্ত্বই নয়; কারণ এটি ইসলামায়নকে বিশ্বাসের বিস্তার হিসেবে নয়, বরং জনগোষ্ঠীর বিস্তার হিসেবে দেখে। এই মতানুসারে, ভারতের অধিকাংশ মুসলমানের পূর্বপুরুষ ছিলেন অন্য মুসলমানেরা, যারা হয় ইরানি মালভূমি পেরিয়ে স্থলপথে, নয়তো আরব সাগর অতিক্রম করে জলপথে ভারতে এসেছিলেন। নিঃসন্দেহে, দক্ষিণ এশিয়ার যে অঞ্চলগুলি ভৌগোলিকভাবে ইরানি মালভূমি বা আরব সাগরের সংলগ্ন, সেখানে ইসলামায়নের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া কিছুটা ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু, নিচে যে কারণগুলি আলোচনা করা হবে, তার ভিত্তিতে বলা যায় যে বাংলায় ব্যাপক ইসলামায়ন ব্যাখ্যা করতে এই যুক্তি প্রযোজ্য নয়।

ভারতে ইসলামায়নের প্রাচীনতম তত্ত্বটি, যাকে আমি ‘তরবারির ধর্ম’ তত্ত্ব (Religion of the Sword thesis) বলব, ভারতে এবং অন্যান্য অঞ্চলে ইসলামের বিস্তারে সামরিক শক্তির ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। অন্তত ক্রুসেডের যুগ থেকে প্রচলিত এই ধারণাটি উনিশ শতকে— যখন মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য তুঙ্গে— বিশেষ জোর পায়; পরে বিংশ শতকের শেষভাগে বিশ্বব্যাপী ইসলামি সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতেও এটি নতুন করে গুরুত্ব লাভ করে। সপ্তম শতকের আরবে ইসলামের উত্থান ব্যাখ্যা করতে উনিশ ও বিংশ শতকের বহু প্রাচ্যবিদ যে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তাতে এই তত্ত্বের সামগ্রিক সুর ধরা পড়ে। এর উদাহরণ হিসেবে ১৮৯৮ সালে স্যার উইলিয়াম মুইর রচিত এই উত্তেজনাপূর্ণ পংক্তিগুলি উল্লেখ করা যায়:

যুদ্ধের গন্ধই তখন আরব গোষ্ঠীগুলির বিষণ্ন মনোভাবকে উন্মুখ আনুগত্যে রূপান্তরিত করেছিল।… যোদ্ধার পর যোদ্ধা, বাহিনীর পর বাহিনী, অগণিত ধারাবাহিকতায় সমগ্র গোষ্ঠী— নারী ও শিশুদের সঙ্গে নিয়ে— যুদ্ধে অংশ নিতে বেরিয়ে পড়েছিল। আর প্রতিনিয়ত, নগর জয়ের বিস্ময়কর কাহিনি; হিসাবের অতীত লুঠতরাজ; যুদ্ধক্ষেত্রেই তরুণীদের ভাগ করে দেওয়া— “প্রত্যেক পুরুষের জন্য এক বা দুইজন তরুণী”— এইসব গল্প শুনে নতুন নতুন গোষ্ঠী উঠে দাঁড়াত এবং যুদ্ধে যোগ দিতে চলে যেত। সামনে, আরও সামনে— যেন মৌচাক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি বেরিয়ে আসছে, অথবা পঙ্গপালের দল আকাশ অন্ধকার করে দিচ্ছে— এভাবে একের পর এক গোষ্ঠী বেরিয়ে পড়ে, উত্তরের দিকে ধাবিত হয়ে, পূর্ব ও পশ্চিমে বিরাট জনসমাবেশের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।[1]

কিন্তু শেষ পর্যন্ত, বজ্রধ্বনির মতো ঘোড়ার খুরের শব্দ থেমে গেলে এবং ধুলোবালি বসে গেলে, আরব বিজয় অভিযানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মুইর আমাদের হাতে তেমন কোনও সারবস্তুই তুলে দেন না। বরং তিনি কেবল আরবদের ‘যুদ্ধের গন্ধ’-এর প্রতি আকর্ষণ, ‘লুঠতরাজ’-এর প্রতি ভালোবাসা, এবং ‘এক বা দুইজন তরুণী’-র প্রতিশ্রুতির কথাই জোর দিয়ে বলে যান। যুদ্ধোন্মত্ত ও পুনরুত্থানশীল এক উন্মাদ ইসলামের যে চিত্র মুইর এঁকেছিলেন, তা শুধু ইউরোপীয়দের পুরনো ইসলাম-সম্পর্কিত যুদ্ধ ও যৌনতার ধারণার প্রতিফলনই ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল উপনিবেশবাদী আশঙ্কাও— যে ইউরোপের অধীনস্থ মুসলিম প্রজারা হয়তো ঠিক এমনই পঙ্গপালের ঝাঁকের মতো বিদ্রোহে ফেটে পড়বে এবং ইউরোপীয়দের ইউরোপে ফিরে যেতে বাধ্য করবে। সর্বোপরি, স্যার উইলিয়াম নিজেই ছিলেন ঔপনিবেশিক ভারতের এক উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা, পাশাপাশি সেখানে খ্রিস্টান মিশনারি আন্দোলনের এক সক্রিয় প্রবক্তাও।[2]

যদি ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা কল্পনা করে নেন যে ইসলামের উত্থানের কারণ তার অন্তর্নিহিত সামরিক চরিত্র, তবে একই ধরনের যুক্তিতে ভারতে তার বিস্তার ব্যাখ্যা করতেও তাঁদের অসুবিধা হয়নি। কিন্তু পিটার হার্ডি যেমন লক্ষ করেছেন, যাঁরা দাবি করেছেন যে ভারতীয় মুসলমানদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল, তাঁরা সাধারণত ‘জোর’ বা ‘ধর্মান্তর’— কোনওটিরই স্পষ্ট সংজ্ঞা দেননি।[3] ফলে মনে হয় যেন কেবল গলায় তরবারি ঠেকালেই একটি সমাজ তার ধর্মীয় পরিচয় বদলে ফেলতে পারে এবং ফেলবেই। আসলে তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক— কোনও স্তরেই এই প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে কাজ করেছিল, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কখনও দেওয়া হয়নি। তদুপরি, এই তত্ত্বের সমর্থকেরা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর এবং ১২০০ থেকে ১৭৬০ সালের মধ্যে উত্তর ভারতে তুর্কো-ইরানি শাসনের বিস্তার— এই দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছেন বলেই মনে হয়। সম্ভবত ভারতের ‘ইসলামি’ বিজয় বর্ণনাকারী ফারসি মূলসূত্রগুলির অতিরিক্ত আক্ষরিক অনুবাদ থেকেই এই বিভ্রান্তির উৎপত্তি। জোহানন ফ্রিডম্যান যেমন দেখিয়েছেন, এইসব বিবরণে প্রায়ই এমন দ্ব্যর্থবোধক বাক্যাংশ দেখা যায়— যেমন “তারা ইসলামের অধীনতা স্বীকার করল” (“iṭā‗at-i Islām numūdand”), অথবা “তারা ইসলামের বশ্যতায় এল” (“dar iṭā‗at-i Islām āmadand”)— যেখানে “ইসলাম” বলতে ধর্ম, মুসলিম রাষ্ট্র, অথবা “ইসলামের সেনাবাহিনী”— যে-কোনওটিকেই বোঝানো হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের অংশগুলিকে প্রাসঙ্গিকভাবে পড়লে সাধারণত শেষের দুটি অর্থই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। বিশেষত, একই সূত্রে ইন্দো-তুর্কি সেনাবাহিনীকে প্রায়ই লস্কর-ই ইসলাম বা “ইসলামের সেনাবাহিনী” বলা হয়েছে, লস্কর-ই তুর্কান বা “তুর্কিদের সেনাবাহিনী” নয়।[4] অর্থাৎ, মানুষ যার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল বলে বলা হচ্ছে, তা ছিল ইন্দো-মুসলিম রাষ্ট্র— আরও স্পষ্টভাবে বললে, তার সামরিক শক্তি; ইসলাম ধর্মবিশ্বাসের কাছে নয়।

এই তত্ত্ব দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় ভূগোলের সঙ্গেও খাপ খায় না। যদি ইসলামায়ন সত্যিই সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তির ফল হত, তবে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে যেসব অঞ্চল মুসলিম রাজবংশগুলির শাসনের অধীনে সবচেয়ে দীর্ঘকাল এবং সবচেয়ে নিবিড়ভাবে ছিল— অর্থাৎ যেগুলি “তরবারি”-র প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছিল— সে-সব জায়গাতেই আজ মুসলমানের সংখ্যা সর্বাধিক হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ঠিক তার উল্টো। যেসব অঞ্চলে সবচেয়ে নাটকীয় ইসলামায়ন ঘটেছিল, যেমন পূর্ববঙ্গ বা পশ্চিম পাঞ্জাব, সেগুলি ছিল ইন্দো-মুসলিম শাসনের প্রান্তবর্তী এলাকা, যেখানে “তরবারি” ছিল সবচেয়ে দুর্বল এবং যেখানে নগ্ন বলপ্রয়োগের প্রভাব থাকার সম্ভাবনাও ছিল সবচেয়ে কম। এইসব অঞ্চলে প্রথম নির্ভরযোগ্য জনগণনা অনুযায়ী মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৭০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে। বিপরীতে, মুসলিম শাসনের কেন্দ্রভূমি— উচ্চ গাঙ্গেয় সমভূমি, দিল্লি দুর্গ ও তাজমহলের অঞ্চল, যেখানে মুসলিম রাজত্ব সবচেয়ে দীর্ঘকাল এবং সবচেয়ে নিবিড়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল— সেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। অন্য কথায়, সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে মুসলিম রাজনৈতিক প্রভাবের মাত্রা এবং ইসলামায়নের মাত্রার মধ্যে একটি বিপরীত সম্পর্ক দেখা যায়। এমনকি বাংলার ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য। ১৯০১ সালের ভারতের জনগণনা রিপোর্টে যেমন বলা হয়েছিল:

এই [পূর্বাঞ্চলীয়] জেলাগুলির কোনওটিতেই মুসলিম শাসকদের সদর দপ্তর হিসেবে খ্যাত স্থানগুলি নেই। ঢাকা প্রায় একশো বছর নবাবদের আবাসস্থল ছিল, কিন্তু ফরিদপুর বাদ দিলে আশপাশের যে-কোনও জেলার তুলনায় সেখানে মুসলমানের অনুপাত কম। মালদা ও মুর্শিদাবাদে ছিল প্রাচীন রাজধানীগুলি, যা প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী ধরে মুসলিম শাসনের কেন্দ্র ছিল; তবুও দিনাজপুর, রাজশাহী ও নদিয়ার মতো সংলগ্ন জেলাগুলির তুলনায় সেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যার অনুপাত অনেক কম।[5]

এই রিপোর্টে বরং এমন কথাও বলা হয় যে, ইসলামায়নের প্রসার ঘটানোর পরিবর্তে মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির নিকটতা কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবে তা বাধাগ্রস্তই করেছিল। এসএল শর্মা এবং আরএন শ্রীবাস্তবের মতে, রাজস্থানের নামমাত্র ধর্মান্তরিত মিও (Meo) সম্প্রদায়ের উপর মুঘল নিপীড়নের ফলে তাদের ইসলামি পরিচিতি শক্তিশালী হয়নি; বরং ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধই আরও জোরদার হয়েছিল।[6]

ভারতে ইসলামায়ন ব্যাখ্যা করার জন্য সাধারণভাবে উত্থাপিত তৃতীয় যে তত্ত্বটি তাকে আমি ‘পৃষ্ঠপোষকতার ধর্ম’ তত্ত্ব (Religion of Patronage theory) বলব। এই মতানুসারে, প্রাক-আধুনিক যুগে ভারতীয়রা ইসলাম গ্রহণ করত শাসকশ্রেণির কাছ থেকে কোনও অ-ধর্মীয় সুবিধালাভের উদ্দেশ্যে— যেমন করমুক্তি, প্রশাসনে পদোন্নতি ইত্যাদি। এই তত্ত্ব বরাবরই পাশ্চাত্য-শিক্ষাপ্রাপ্ত ধর্মনিরপেক্ষ সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে জনপ্রিয় ছিল, কারণ তাঁরা ধর্মকে সাধারণত কোনও অ-ধর্মীয় শক্তির উপর নির্ভরশীল চলক হিসেবে দেখেন— বিশেষত সামাজিক উন্নতি বা মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার ফল হিসেবে। ভারতের ইতিহাসে বহু উদাহরণ এই তত্ত্বকে সমর্থন করে বলেই মনে হয়। চতুর্দশ শতকের গোড়ায় ইবন বতুতা লিখেছিলেন যে ভারতীয়রা নিজেদের নতুন ধর্মান্তরিত মুসলমান হিসেবে খলজি সুলতানদের দরবারে উপস্থিত করত, এবং সুলতানরা তাঁদের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী সম্মানসূচক পোশাক উপহার দিতেন।[7] উনিশ শতকের জনগণনা অনুযায়ী, উত্তর ভারতের বহু ভূস্বামী পরিবার নিজেদের মুসলমান বলে ঘোষণা করেছিল রাজস্ব না দেওয়ার অপরাধে কারাবাস এড়াতে, অথবা পৈতৃক সম্পত্তি পরিবারের হাতে রাখার জন্য।[8] এই তত্ত্বকে আরও প্রসারিত করলে এমন গোষ্ঠীগুলিকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা যায়, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ না করলেও মুসলিম শাসকদের অধীনে কাজ করতে গিয়ে ইসলামি সংস্কৃতির অনেকাংশ আত্মস্থ করেছিল। গাঙ্গেয় সমভূমির কায়স্থ ও ক্ষত্রি, মহারাষ্ট্রের পারসনিস এবং সিন্ধের আমিল সম্প্রদায়— এরা সকলেই প্রশাসনের কেরানি ও কর্মচারীর প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ইসলামি সংস্কৃতি চর্চা করেছিল। আজিজ আহমেদ একসময় এই প্রক্রিয়ার তুলনা করেছিলেন উনিশ ও কুড়ি শতকের “পাশ্চাত্যায়ন”-এর সঙ্গে।[9] যুদ্ধে বন্দি সৈনিক বা দাসদের সাংস্কৃতিক অভিযোজনও সম্ভবত এই প্রক্রিয়ার আর-একটি দিক ছিল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং নিজভূমির সঙ্গে স্থায়ী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক হারিয়ে, এরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রভুদের সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।[10]

যদিও এই তত্ত্বটি ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রভূমিতে তুলনামূলকভাবে কম ইসলামায়নের ঘটনা ব্যাখ্যা করতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে, তবে পাঞ্জাব বা বাংলার মতো রাজনৈতিক প্রান্তবর্তী অঞ্চলে যে ব্যাপক ধর্মান্তর ঘটেছিল, তা এটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, তরবারির প্রভাবের মতোই, সেই পৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে বাড়ার বদলে কমে যাওয়ারই কথা। অতএব, আমাদের এমন একটি তত্ত্বের প্রয়োজন, যা শুধু মুসলিম শক্তির কেন্দ্রভূমিতেই নয়, তার প্রান্তবর্তী এলাকাগুলিতেও কেন ব্যাপক ইসলামায়ন ঘটেছিল, তা ব্যাখ্যা করতে পারে; এবং যা শুধু শহুরে অভিজাতদের নয়, লক্ষ লক্ষ কৃষক জনগণের মধ্যেও ইসলামের প্রসার ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।

এই উদ্দেশ্যে সাধারণত চতুর্থ একটি তত্ত্ব সামনে আনা হয়, যাকে আমি ‘সামাজিক মুক্তির ধর্ম’ তত্ত্ব (Religion of Social Liberation thesis) বলব। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের তৈরি এই তত্ত্ব পরে বহু পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি চিন্তকের দ্বারা বিস্তৃত হয়েছে, এবং দক্ষিণ এশিয়ার অসংখ্য সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদের— বিশেষত মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের— সমর্থন লাভ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি উপমহাদেশে ইসলামায়নের সবচেয়ে বহুল স্বীকৃত ব্যাখ্যা হিসেবে প্রচলিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, হিন্দু জাতিভেদ ব্যবস্থাকে মূল দায়ী হিসেবে অনুমান করা হয়, সময়ের সঙ্গে যার কোনও পরিবর্তন হয়নি এবং তার নিম্নস্তরের মানুষের প্রতি এই ব্যবস্থা কঠোর বৈষম্যমূলক। বলা হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিম্নবর্ণের মানুষ অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী উচ্চবর্ণের হিন্দুদের— বিশেষত ব্রাহ্মণদের— নিপীড়নের ভারে পিষ্ট ছিল। এরপর যখন ইসলাম ভারতীয় উপমহাদেশে “আগমন” করে এবং (এই তত্ত্বের অধিকাংশ সংস্করণ অনুযায়ী) সুফি শেখদের প্রচারিত সামাজিক সাম্যের মুক্তিদায়ক বার্তা নিয়ে আসে, তখন সেই নিপীড়িত নিম্নবর্ণের মানুষ ব্রাহ্মণ্যবাদী অত্যাচারের জোয়াল থেকে মুক্তি পেতে এবং এতদিন অস্বীকৃত সামাজিক সমতার সন্ধানে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।

দেখা যায়, ইসলামকে স্বভাবত ন্যায়সঙ্গত এবং হিন্দু সমাজকে স্বভাবত দুষ্ট হিসেবে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে ‘সামাজিক মুক্তির ধর্ম’ তত্ত্ব ধর্মান্তরের এমন কিছু প্রেরণা চিহ্নিত করে, যা মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে মনে হয়। কিন্তু সমস্যাটি হল, এই তত্ত্বের সমর্থনে কোনও প্রমাণই পাওয়া যায় না। তদুপরি, এটি গভীরভাবে অযৌক্তিক। প্রথমত, বর্তমান যুগের মূল্যবোধ অতীতের মানুষের উপর আরোপ করে এই তত্ত্ব ইতিহাসকে উল্টো দিক থেকে পড়ে। মুসলমানদের সংস্পর্শে আসার আগেই ভারতের নিম্নবর্ণের মানুষ যেন জঁ-জাক রসিউ বা থমাস জেফারসনের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিল— এমনভাবে ধরে নেওয়া হয় যে তারা মানবজাতির মৌলিক সাম্যের কোনও সহজাত ধারণা পোষণ করত, যা এক অত্যাচারী ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন তাদের থেকে কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে, ইসলাম ও ভারতীয় ধর্মগুলির সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে গিয়ে প্রাক-আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা হিন্দু বৈষম্যের বিপরীতে ইসলামের সামাজিক সাম্যের আদর্শকে গুরুত্ব দেননি; বরং তাঁরা জোর দিয়েছিলেন হিন্দু বহুদেববাদের বিপরীতে ইসলামের একেশ্বরবাদের উপর।[11] অর্থাৎ, এই দুই সভ্যতার তুলনা করার ক্ষেত্রে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ধর্মতাত্ত্বিক, সামাজিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে— (ধর্মীয় সাম্যের বদলে)— এই ধারণাটিই তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক বলে মনে হয়; এর সূত্রপাত মূলত ইউরোপীয় রেনেসাঁসের যুগে, এবং আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে উনিশ শতকের মুসলিম সংস্কারকদের উপর ফরাসি বিপ্লবের উত্তরাধিকারের প্রভাব থেকে।[12]

দ্বিতীয়ত, এমনকি যদি ভারতীয়রা মানবজাতির মৌলিক সাম্যে বিশ্বাসও করে থাকে, এবং এমনকি যদি ইসলাম তাদের কাছে সামাজিক সাম্যের এক মতাদর্শ হিসেবে উপস্থাপিতও হয়ে থাকে— যদিও এই দুই ধারণাই বাস্তবে অসত্য বলে প্রতীয়মান হয়— তবুও প্রচুর প্রমাণ রয়েছে যে ইসলাম গ্রহণের পর ভারতীয় সম্প্রদায়গুলির সামাজিক মর্যাদা বিশেষ উন্নত হয়নি। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা হিন্দুসমাজে জন্মনির্ধারিত যে সামাজিক অবস্থান ভোগ করত, মুসলিম সমাজেও সেই একই অবস্থান বহন করে নিয়ে গিয়েছিল।[13] বাংলার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য। ১৮৮৩ সালে জেমস ওয়াইস লিখেছিলেন: “ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে নিকৃষ্ট কাজগুলি নিচুজাতের হিন্দুরা করে থাকে; কিন্তু বাংলায় যে কোনও ঘৃণ্য বা অপমানজনক কাজ মুসলমানদের উপরই বর্তায়। বেলদার [ময়লা পরিষ্কারকারী ও মৃত পশুর দেহ অপসারণকারী] মুসলমান গ্রামে সেই ভূমিকা পালন করে, যা হিন্দু গ্রামে ভূঁইমালি করে থাকে; এবং এ কথা অসম্ভব নয় যে তার পূর্বপুরুষরা এই ঘৃণিত জাতিভুক্ত ছিল।”[14]

শেষ পর্যন্ত, ‘তরবারির ধর্ম’ এবং ‘পৃষ্ঠপোষকতার ধর্ম’ তত্ত্বগুলির মতোই ‘সামাজিক মুক্তির ধর্ম’ তত্ত্বও ভৌগোলিক তথ্যের কাছে খণ্ডিত হয়। ১৮৭২ সালে, যখন প্রথম নির্ভরযোগ্য জনগণনা করা হয়, তখন মুসলমানদের সর্বাধিক ঘনত্ব দেখা গিয়েছিল পূর্ববঙ্গ, পশ্চিম পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল এবং বালুচিস্তানে। এই অঞ্চলগুলির বিশেষ তাৎপর্য শুধু এই নয় যে সেগুলি মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে ছিল; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ইসলামের সংস্পর্শে আসার সময় পর্যন্ত সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলি হিন্দু বা বৌদ্ধ সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে একীভূত হয়নি। বাংলায় মুসলিম ধর্মান্তরিতদের প্রধান অংশ এসেছিল রাজবংশী, পোদ, চণ্ডাল, কোচ এবং অন্যান্য দেশজ গোষ্ঠী থেকে, যারা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব খুব সামান্যই অনুভব করেছিল। একইভাবে পাঞ্জাবে বিভিন্ন জাঠ গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; পরবর্তীকালে তারাই মুসলিম সমাজের মূল অংশটি গঠন করে।[15]

কিন্তু এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। উত্তর বৈদিক যুগের একটি গ্রন্থ বৌদ্ধায়ন ধর্মসূত্র (খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম-ষষ্ঠ শতক)-এ নিজেদের “শুচি” বলে দাবি করা জাতিগুলির মূল্যবোধের প্রতিফলন পাওয়া যায়। এখানে ভারতীয় উপমহাদেশকে তিনটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তে ভাগ করা হয়েছিল; প্রতিটি বৃত্ত গঠিত হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্প্রদায় নিয়ে। প্রথম বৃত্তটি ছিল আর্যাবর্ত বা আর্যদের স্বদেশ, যা উত্তর-মধ্য ভারতের উচ্চ গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলকে নির্দেশ করত। সেখানে বাস করত ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যের “বিশুদ্ধতম” উত্তরাধিকারীরা— যারা নিজেদের উচ্চজাত ও আচারগতভাবে শুচি বলে মনে করত। দ্বিতীয় বৃত্তটি ছিল এক বহিঃবেষ্টনী (অবন্তী, অঙ্গ-মগধ, সৌরাষ্ট্র, দক্ষিণাপথ, উপাবৃত এবং সিন্ধু-সৌবীর), যা মালব, পূর্ব ও মধ্য বিহার, গুজরাত, দাক্ষিণাত্য ও সিন্ধ অঞ্চলের সঙ্গে মিলে যায়। এই অঞ্চলগুলি ইন্দো-আর্য বসতির আওতায় পড়লেও সেখানে বাস করত “মিশ্র উৎস”-এর মানুষ, যারা প্রথম অঞ্চলের মানুষের মতো একই মাত্রার আচারগত শুদ্ধতা ভোগ করত না। আর তৃতীয় সমকেন্দ্রিক বৃত্তে ছিল সেই সব বহির্ভাগীয় অঞ্চল, যেখানে বসবাসকারী “অশুচি” জনজাতিগুলিকে এতটাই বহিরাগত বলে মনে করা হত যে, সেখানে ভ্রমণ করলেও প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান ছিল। এই তৃতীয় বৃত্তের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল পাঞ্জাবের আরট্ট, দক্ষিণ পাঞ্জাব ও সিন্ধের সৌবীর, উত্তরবঙ্গের পুন্ড্র এবং মধ্য ও পূর্ববঙ্গের বঙ্গবাসীরা।[16]

এখন, ‘সামাজিক মুক্তির’ তত্ত্বটি ধরে নেয় যে ইসলাম আগমনের পূর্বেই ভারতে একটি কঠোরভাবে স্তরবিন্যস্ত হিন্দু সামাজিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যার শীর্ষে ছিল দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও নিপীড়নমূলক ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়। যদি এই তত্ত্ব সত্য হত, তবে যুক্তিগতভাবে ইসলাম গ্রহণের সর্বাধিক প্রবণতা দেখা যাওয়ার কথা ছিল সেইসব অঞ্চলে, যেখানে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক ব্যবস্থা সবচেয়ে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল— অর্থাৎ আর্যাবর্তের মূল অঞ্চলে। বিপরীতভাবে, যেসব অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার প্রভাব সবচেয়ে কম ছিল— অর্থাৎ সেই সভ্যতার প্রান্তে বা তার বাইরের এলাকায়, অর্থাৎ বৌদ্ধায়ন ধর্মসূত্র -এ উল্লিখিত তিনটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তের বহিঃস্থ অংশে ইসলামের অনুসারী সবচেয়ে কম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল সংখ্যক মুসলমান বাস করে ঠিক সেই বহিঃস্থ বৃত্তেই— যে অঞ্চলটি মোটামুটি ১৯৪৭ সালের অবিভক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের (তার পূর্ব ও পশ্চিম অংশ-সহ) অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলির সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ, দেশভাগ-পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলমানদের যে ভৌগোলিক বণ্টন দেখা যায়, তা এই তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত ফল নির্দেশ করে। বাস্তব চিত্রটি হল: ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার পূর্বপ্রভাব যত কম ছিল, পরবর্তী ইসলামায়নের হার তত বেশি হয়েছে। ভারতের “প্রান্তবর্তী” অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলি যদি আদৌ কোনও ব্রাহ্মণ্য-নিয়ন্ত্রিত সমাজের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তবে তারা কোনও অত্যাচারী হিন্দু সামাজিক ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল— এমন ধারণা যুক্তিগতভাবেও টেকে না, বাস্তব তথ্যের সঙ্গেও মেলে না।

 

বাংলায় ইসলামায়নের তত্ত্বসমূহ

বাংলায় তুলনামূলকভাবে বেশ দেরি করে ইংরেজরা এই উপলব্ধিতে এসেছিল যে প্রদেশটিতে মুসলমান জনসংখ্যার পরিমাণ কত বিপুল। ব্রিটিশ কার্যকলাপ যেহেতু প্রধানত হিন্দু-প্রধান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষত কলকাতাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হত, তাই উনিশ শতকের অধিকাংশ সময় জুড়ে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলিকে এক বিশাল ও অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী পশ্চাৎভূমি হিসেবে দেখতেন, যার সাংস্কৃতিক চরিত্র সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান খুবই কম ছিল। ফলে ১৮৭২ সালের প্রথম সরকারি জনগণনায় যখন দেখা গেল যে চট্টগ্রাম, নোয়াখালি, পাবনা ও রাজশাহী জেলায় মুসলমানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ বা তারও বেশি, এবং বগুড়ায় ৮০ শতাংশেরও উপরে (নিচের মানচিত্র দেখুন), তখন তাঁরা বিস্মিত হয়ে পড়েন।[17] ১৮৯৪ সালে বাংলায় দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তা জেমস ওয়াইজ লিখেছিলেন যে, “১৮৭২ সালের জনগণনা সবচেয়ে যে আকর্ষণীয় তথ্যটি প্রকাশ করেছিল, তা হল নিম্নবঙ্গে বসবাসকারী বিপুল মুসলমান জনসমষ্টি— যারা পুরনো রাজধানীগুলির চারপাশে কেন্দ্রীভূত ছিল না, বরং বদ্বীপের পলিগঠিত সমভূমিতে ছড়িয়ে ছিল।” তাঁর আরও পর্যবেক্ষণ: “নিম্ন ও পূর্ববঙ্গে মুহাম্মদীয় ধর্মের বিস্তারের ইতিহাস বর্তমান সময়ে এমন একটি বিরাট গুরুত্বের বিষয় যে, তা অত্যন্ত সতর্ক ও বিশদ অনুসন্ধানের দাবি রাখে।”[18]

বাংলায় মুসলিম জনবিন্যাস, ১৮৭২

 

বিষয়টি সত্যিই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছিল। ১৮৭২ সালের জনগণনা এমন এক তীব্র বিতর্কের সূচনা করেছিল, যা উনিশ শতকের বাকি সময় জুড়ে এবং বিংশ শতকের অনেকটা সময় পর্যন্ত চলেছিল। এই বিতর্কের প্রথম আঘাতটি হেনেছিলেন জনগণনা রিপোর্টের সঙ্কলক হেনরি বেভারলি নিজেই। মুসলিম শাসনের প্রাচীন কেন্দ্রগুলি থেকে বহু দূরের অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের উপস্থিতিকে আপাতদৃষ্টিতে অসঙ্গত মনে করে বেভারলি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, “বাংলায় মুহাম্মদানদের অস্তিত্বের কারণ দেশে মুঘল রক্তের প্রবেশের চেয়ে বরং পূর্বতন অধিবাসীদের ধর্মান্তর, যাদের কাছে কঠোর জাতিভেদমূলক শৃঙ্খলা হিন্দুধর্মকে অসহনীয় করে তুলেছিল।”[19] সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি ‘অভিবাসন তত্ত্ব’ প্রত্যাখ্যান করে ‘সামাজিক মুক্তির’ তত্ত্বের একটি প্রাথমিক রূপ উপস্থাপন করেছিলেন। এরপর থেকে এই তত্ত্বই বাংলায় ইসলামায়ন সম্পর্কে ব্রিটিশ চিন্তাধারায় প্রাধান্য বিস্তার করে, এবং পরবর্তীকালে অধিকাংশ মুসলমানও এই ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করে।

কিন্তু বেভারলির এই ব্যাখ্যা বিনা চ্যালেঞ্জে গৃহীত হয়নি। ১৮৭২ সালের জনগণনার ফল প্রকাশের অল্পদিন পরেই ময়মনসিংহ জেলার এক সম্মানিত মুসলিম ভদ্রলোক, আবু এ গজনভি, তাঁর জেলার কালেক্টরের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে তিনি বেভারলির ব্যাপক ধর্মান্তরের তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেন। গজনভি বরং প্রস্তাব করেন যে, “আধুনিক মুহাম্মদানদের অধিকাংশই চণ্ডাল বা কৈবর্তদের বংশধর নয়; বরং তারা বিদেশি উৎসজাত, যদিও অনেক ক্ষেত্রে সেই উৎস কমবেশি সুদূর অতীতের হতে পারে।”[20] নিজের যুক্তির সমর্থনে গজনভি উল্লেখ করেন তুর্কি বিজয়ের আগেই আরবদের অভিবাসন, সুলতান হুসেন শাহের বিদেশিদের ভূমিদান, মুঘল বিজয়ের পরে “প্রতিটি গ্রামে” আফগানদের ছড়িয়ে পড়া, বহুবিবাহ ও বিধবাবিবাহের ফলে মুসলমানদের তুলনামূলক বেশি জননক্ষমতা, তাদের দীর্ঘায়ু, এবং মুসলিম সমাজে জাতিভেদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্রহ্মচর্যের অনুপস্থিতির কথা।[21] যদিও তিনি স্বীকার করেছিলেন যে “কিছু” ধর্মান্তর অবশ্যই ঘটেছিল, তবুও গজনভি জোর দিয়ে বলেন যে তা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে ঘটেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন: “আমরা কেন শুধু নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরের কথাই বলব? ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলার মুসলমান রাজপুত দেওয়ানদের কথা আমরা কেন ভুলে যাব? … একইভাবে, সিলেটের মজুমদার, ফরিদপুরের রাজা সাহেব, বিক্রমপুরের গাঙ্গুলি এবং আরও অগণিত অন্যদের কথাও তো রয়েছে।”[22]

এখানে গজনভি মূলত ইসলামায়নের ‘অভিবাসন তত্ত্ব’-এরই রূপরেখা দিচ্ছিলেন— যে মতবাদটি সমগ্র ভারতে আশরাফ শ্রেণির কাছে জনপ্রিয় ছিল। গজনভির মতে, যদি স্থানীয় ধর্মান্তর আদৌ ঘটে থাকে, তবে তা সমাজের ঘৃণিত নিম্নবর্ণ থেকে নয়, বরং হিন্দু সমাজের উচ্চস্তর থেকেই ঘটেছিল। বিংশ শতকের সূচনালগ্নে সত্যিই এমন দাবি করা হয়েছিল যে মুঘল যুগে বাংলার কিছু ভূস্বামী অভিজাত পরিবার, এমনকি পুরোহিত শ্রেণিরও কিছু সদস্য ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বলা হয়, আকবরের এক সেনাপতির কাছে পরাজিত হয়ে খড়গপুরের রাজারা (মেদিনীপুর জেলা) নিজেদের পারিবারিক জমিদারি বজায় রাখার শর্ত হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; উত্তর বিহারের দ্বারভাঙার পারসৌনির রাজা পুরদিল সিংহ মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ মুসলমান হন; ত্রিপুরার সরাইল পরগনার এবং ময়মনসিংহের হায়বতনগর ও জঙ্গলবাড়ির মুসলিম দেওয়ান পরিবারগুলি আগে ব্রাহ্মণ ছিল; এবং দ্বারভাঙার মাঝৌলির পাঠানরা নরহনের রাজার পরিবার থেকে উদ্ভূত।[23] তবে এই উদাহরণগুলি মোট মুসলিম জনসংখ্যার অতি সামান্য অংশকেই ব্যাখ্যা করতে পারে; জনগণনার হিসাব অনুযায়ী যে লক্ষ লক্ষ মুসলমান কৃষকের অস্তিত্ব দেখা যায়, তাঁদের আবির্ভাবের ব্যাখ্যা দিতে পারে না।

এদিকে, উনিশ শতকের শেষ দশকগুলিতে ইসলামায়নের প্রশ্নে ব্রিটিশ সরকারি মহলে ধীরে ধীরে একটি মতৈক্য গড়ে উঠতে শুরু করে। এই প্রসঙ্গে আমরা জেমস ওয়াইজের কাজ পর্যালোচনা করতে পারি। তিনি এক অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তা, ঢাকায় দশ বছর সিভিল সার্জন হিসেবে কাজ করেছেন, ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত একতি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ “The Muhammadans of Eastern Bengal”-এ তিনি নিজের মতামত বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।[24] ওয়াইজ শুরুতেই গজনভির মতো আশরাফ মুখপাত্রদের সমর্থিত ‘অভিবাসন তত্ত্ব’ খারিজ করে দেন। তিনি মন্তব্য করেন, “মুহাম্মদান ইতিহাসগুলিতে উত্তর ভারত থেকে কোনও বৃহৎ মুসলিম অভিবাসনের উল্লেখ নেই; এবং আমরা জানি যে আকবরের আমলে বাংলার জলবায়ুকে মুঘল আক্রমণকারীরা এতটাই প্রতিকূল বলে মনে করত যে সেখানে যাওয়ার আদেশকে কার্যত নির্বাসনের শাস্তি বলে ধরা হত।”[25] এরপর ওয়াইজ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন কীভাবে এবং কেন জাতিগত বাঙালিরা মুসলমান হয়ে উঠেছিল। প্রথমত, তিনি ‘তরবারির ধর্ম’ তত্ত্বের আশ্রয় নেন এবং কোনও প্রমাণ ছাড়াই উল্লেখ করেন যে, “তেরো ও চৌদ্দ শতকে উৎসাহী সৈন্যরা বাংলার ভীরু জাতিগুলির মধ্যে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে দেয়, তরবারির জোরে ধর্মান্তর ঘটায়, এবং পূর্ব সীমান্তের ঘন অরণ্যে প্রবেশ করে সিলেটের গ্রামগুলিতে অর্ধচন্দ্রের পতাকা স্থাপন করে।” তিনি মেনে নেন যে, চট্টগ্রাম অঞ্চল আরব বণিকদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। তাঁর দাবি ছিল— আবারও কোনও প্রমাণ ছাড়াই— এই বণিকরা চট্টগ্রাম উপকূলে ব্যাপক বাণিজ্য চালাত এবং সেখানে “স্থানীয় জনগণের মধ্যে তাদের ধর্মীয় ধারণা ছড়িয়ে দিত।” এছাড়াও, তিনি ধারণা দেন যে পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চল থেকে ধরে আনা দাসরাও মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে; কারণ হতদরিদ্র ও অসহায় পরিবারগুলি নাকি নিজেদের সন্তানদের মুসলমানদের কাছে দাস হিসেবে বিক্রি করতে বাধ্য হত। তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ড বা ব্যভিচারের শাস্তি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবেও হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণ করে থাকতে পারে, যেহেতু এই পদক্ষেপকে ওইসব অপরাধের পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত বলে গণ্য করা হত।[26] তবে এই সমস্তই ছিল নিছক অনুমাননির্ভর বক্তব্য।

তবে, ওয়াইজের মূল যুক্তিটি— “যখন মুহাম্মদান বাহিনী বাংলায় ব্যাপক হারে প্রবেশ করে”— পরবর্তীকালে সরকারি মহলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি লিখেছিলেন:

এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন যে কাঠকাটা ও জলবহনকারী নিম্নবর্গের মানুষরা তাঁদের স্বাগত জানায়নি, এবং বহু হতাশ চণ্ডাল ও কৈবর্ত আনন্দের সঙ্গে এমন এক ধর্মকে গ্রহণ করেনি, যা সকল মানুষের সাম্যের কথা ঘোষণা করত এবং যা ছিল সেই জাতির ধর্ম, যারা তাদের পূর্বতন অত্যাচারীদের বশীভূত করেছিল। হিন্দুধর্ম বহিষ্কৃত মানুষকে দ্বিজ ব্রাহ্মণের সঙ্গে একই গ্রামে বসবাস করতে নিষেধ করেছিল, তাকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য পেশা গ্রহণে বাধ্য করেছিল, এবং কার্যত তাকে এমন এক পশুর মতো বিবেচনা করেছিল, যে কোনও সহানুভূতির যোগ্য নয়; কিন্তু ইসলাম ঘোষণা করেছিল যে দরিদ্র ও ধনী, দাস ও তার প্রভু, কৃষক ও রাজপুত্র— সকলেই ঈশ্বরের দৃষ্টিতে সমান মূল্যবান। সর্বোপরি, ব্রাহ্মণ সবচেয়ে সদাচারী ভূমিদাসটিকেও ভবিষ্যৎ জীবনের কোনও আশা দেখায়নি, অথচ মোল্লা শুধু এই জগতের সুখের প্রতিশ্রুতিই দেয়নি, পরজগতেও এক অবিচ্ছেদ্য উত্তরাধিকারের আশ্বাস দিয়েছিল।[27]

এটি ‘সামাজিক মুক্তির’ তত্ত্বের সম্ভবত সবচেয়ে জোরালো বিবৃতিগুলির একটি, এবং এর মধ্যে সেই তত্ত্বের সমস্ত মৌলিক উপাদানই উপস্থিত রয়েছে: পূর্বধারণা হিসেবে একটি কঠোরভাবে স্তরবিন্যস্ত হিন্দু সামাজিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব; শোষিত, নিচু পেশায় নিয়োজিত বহিষ্কৃত মানুষের একটি শ্রেণি; অত্যাচারী ব্রাহ্মণদের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী; এবং ইসলামকে এমন এক সামাজিক সাম্যবাদী মতাদর্শ হিসেবে দেখা, যা জনগণ “আনন্দের সঙ্গে” গ্রহণ করবে।

কিন্তু বাংলার আশরাফ মুসলমানরা এই ধরনের যুক্তি মেনে নেননি। ব্রাহ্মণদের নিষ্ঠুর অত্যাচারী হিসেবে ওয়াইজের বর্ণনার সঙ্গে তাঁরা হয়তো একমত হতে পারতেন, কিন্তু বাংলার অধিকাংশ মুসলমান যে এই বদ্বীপের দেশজ জনগোষ্ঠী থেকেই এসেছে— এ কথা তাঁরা মানতে রাজি ছিলেন না। তাই ১৮৯৫ সালে, ওয়াইজের প্রবন্ধ প্রকাশের পরের বছরই, খোন্দকার ফুজলি রুব্বি তাঁর The Origin of the Musalmans of Bengal গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। তাঁর পূর্বসূরি আবু গজনভির মতোই রুব্বিও অস্বীকার করেন যে “এই দেশের অধিবাসীরা বাধ্যতায় বা স্বেচ্ছায় কোনও এক সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল।”[28] বরং তাঁর দাবি ছিল, “এই দেশের বর্তমান মুসলমানদের পূর্বপুরুষরা নিঃসন্দেহে সেইসব মুসলমান, যারা প্রাক্তন শাসকদের আমলে বিদেশ থেকে এখানে এসেছিল।”[29] আসলে, রুব্বি বদ্বীপের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাকেই এই প্রক্রিয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল যে এই অঞ্চল “সর্বদাই বিদেশি আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত ছিল, এবং ফলত মুসলমানদের জন্য এক দারুণ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।”[30] তবে রুব্বি ব্যাখ্যা করেননি যে প্রাকৃতিক সীমান্ত, যা মুসলমানদের বিদেশি আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল, সেই একই প্রাকৃতিক সীমান্ত বাঙালিদের মুসলিম আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি কেন। সম্ভবত তিনি মুসলমানদের আক্রমণকারী বলে মনে করেননি; বরং তাঁদের কেবল অভিবাসী বসতি স্থাপনকারী হিসেবেই দেখেছিলেন।

রুব্বি বাংলায় “সম্মানিত মুসলমানদের” উদ্দেশে দেওয়া বহু ভূমিদান (আইমা)-এর কথাও উল্লেখ করেছিলেন, এবং ইঙ্গিত করেছিলেন যে এগুলিই বিদেশি মুসলমান বসতির ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। তিনি লিখেছিলেন: “বাংলার তিনটি প্রাচীন বিভাগ— রাঢ় [দক্ষিণ-পশ্চিম], বরেন্দ্র [উত্তর], এবং বঙ্গ [পূর্ব]— এর মধ্যে আইমা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় রাঢ়ে, বরেন্দ্রে কিছু কম, এবং সবচেয়ে কম বঙ্গে।”[31] কিন্তু এই যুক্তির সমস্যা হল, মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাস করত ঠিক সেইসব এলাকায়, যেখানে রুব্বির নিজের বক্তব্য অনুযায়ী ভূমিদান ছিল সবচেয়ে কম। এছাড়াও, বিশ্বের বৃহত্তম কৃষিজীবী জনসমষ্টিগুলির একটি কীভাবে এমন উচ্চবংশজাত অভিবাসীদের বংশধর হতে পারে, যারা মূলত কৃষিকাজ করতে অস্বীকার করত— এই প্রশ্নের উত্তর দিতেও লেখক সমস্যায় পড়েছিলেন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে, “যখন তাদের সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেছিল,” অথবা যে-সব সৈনিকরা সামরিক চাকরি পায়নি, তারা কৃষিকাজে নেমে পড়ে। পরে, বাংলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হলে, এই মুসলমান কৃষকশ্রেণি স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়।[32]

রুব্বির গ্রন্থ প্রকাশের অল্পদিন পরেই প্রকাশিত হয় বিতর্কিত ১৯০১ সালের ভারতের জনগণনা রিপোর্ট, যেখানে আবারও সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করা হয়, যার বিরুদ্ধে গজনভি ও রুব্বি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। এই জনগণনার প্রতিবেদনে ইএ গেইট এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে নিজেদের “শেখ” বলে পরিচয়দানকারী মুসলমানদের— যা জাত জানতে চাইলে মুসলমান বাঙালি কৃষকদের প্রায় সাধারণ উত্তর ছিল— সম্ভবত দশজনের মধ্যে নয়জনই স্থানীয় উৎসজাত।[33] গেইট সন্দেহ প্রকাশ করেন যে বাংলার ভেতরেই মুসলিম বসতি স্থাপনকারীদের কোনও উল্লেখযোগ্য অভিবাসন ঘটেনি; বদ্বীপের বাইরের অঞ্চল থেকে আগমন তো আরও অসম্ভব। তিনি লক্ষ করেছিলেন যে মুসলিম বসতি স্থাপনকারীরা সাধারণত পুরনো রাজধানীগুলির আশপাশের উঁচু জমি পছন্দ করত। সেই সূত্রে তিনি যুক্তি দেন যে, “তারা কখনও স্বেচ্ছায় নোয়াখালি, বগুড়া এবং বাকেরগঞ্জের ধান-জলাভূমিতে বসবাস করতে যেত না।”[34]

এই বিতর্কে গেইটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তাঁর এই পর্যবেক্ষণ যে বাংলায় মুসলমান জনসংখ্যার আধিক্য সেইসব অঞ্চলের সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত, যেখানে সামাজিক সংগঠন ছিল সবচেয়ে সরল— অর্থাৎ যেখানে জাতিভেদের বিস্তার ছিল সবচেয়ে কম। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সঙ্গে দেশজ পোদ ও চণ্ডাল সম্প্রদায়ের, এবং উত্তরবঙ্গের মুসলমানদের সঙ্গে দেশজ রাজবংশী ও কোচ সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য লক্ষ করে গেইটের মন্তব্য: “দেশের এই অংশগুলিতে অন্যান্য জাতিভুক্ত হিন্দুদের অনুপাত খুবই কম, এবং সবসময়ই তাই ছিল। উত্তরবঙ্গে প্রধান জাতিগুলি হল রাজবংশী (কোচ-সহ), এবং পূর্ববঙ্গে চণ্ডাল ও অন্যান্য অনার্য উৎসজাত জাতিসমূহ।”[35] এই পর্যবেক্ষণটি বিতর্কটিকে এতদিন পর্যন্ত যে অস্পষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করছিল, তার মধ্যে এক বড় অগ্রগতির সূচনা করতে পারত। কারণ এর থেকে যুক্তিগতভাবে বোঝা যায়— যেখানে জাতিভেদের বিস্তার কম, সেখানে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যও কম, এবং ফলে তথাকথিত বহিষ্কৃতদের উপর নিপীড়নের প্রশ্নও কম প্রাসঙ্গিক। আর এমন নিপীড়ন না থাকলে ‘সামাজিক মুক্তির’ তত্ত্ব ভেঙে পড়ে; কারণ তখন কোনও সুপ্রতিষ্ঠিত, ব্রাহ্মণ্য-নিয়ন্ত্রিত সমাজই থাকত না “নিম্নস্তরের” মানুষরা যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।

কিন্তু গেইট তাঁর নিজের পর্যবেক্ষণের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যগুলি আর পরের ধাপে উন্নীত করেননি; প্রকৃতপক্ষে, তিনি ইসলামায়ন সম্পর্কে কোনও সুসংহত তত্ত্বই উপস্থাপন করেননি, কেবল এই মন্তব্যটি ছাড়া— বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা স্থানীয় উৎসজাত মানুষই। তবুও, তাঁর মতামত যেহেতু ভারতের সরকারি জনগণনা রিপোর্টের মতো প্রামাণ্য গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল, তাই সেগুলি যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করে। শীঘ্রই এই ধারণাগুলি বিভিন্ন সেটলমেন্ট রিপোর্ট এবং বিংশ শতকের গোড়া থেকে প্রকাশিত অত্যন্ত প্রভাবশালী Bengal District Gazetteer-গুলিতেও পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, নোয়াখালি জেলার গেজেটিয়ার (১৯১১) বলেছিল যে “শেখদের [অর্থাৎ মুসলমান কৃষকসমাজের] এবং সম্প্রদায়ের নিম্নস্তরের মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বংশধর”— অর্থাৎ প্রধানত চণ্ডালদের।[36] একইভাবে, বগুড়া ও পাবনা জেলার সেটলমেন্ট রিপোর্ট (১৯৩০)-এ ওই জেলাগুলির মুসলিম সম্প্রদায়কে “তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিককালে ধর্মান্তরিত হিন্দুদের” বংশধর বলা হয়েছিল, এবং উল্লেখ করা হয়েছিল যে জনসংখ্যার অধিকাংশই “উত্তরবঙ্গের আদিবাসী কোচ জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি।”[37]

১৯৪৭ সালের আগের দশকে পরিচালিত তিনটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা সরকারি মহলে গড়ে ওঠা ঐকমত্যের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ হাজির করে। পদ্ধতি, নমুনা সংগ্রহের কৌশল এবং বদ্বীপের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা পরিচালিত হলেও, এই তিনটি গবেষণাই একমত হয়েছিল যে বাঙালি মুসলমানদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী দেশজ সম্প্রদায়ের বংশধর, বাইরের আগন্তুকদের নয়। এই গবেষণাগুলির প্রথমটি ১৯৩৮ সালে চব্বিশ পরগনা জেলায় পরিচালনা করেছিলেন এইলিন ম্যাকফারলেন। তিনি উপসংহারে বলেন: “বজবজের মুহাম্মদানদের ব্লাড গ্রুপ-সংক্রান্ত তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে এই জনগোষ্ঠী নিম্নবর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিতদের বংশধর, যেমনটি স্থানীয় লোকপ্রথায় বলা হয়; এবং এই অনুপাত তাদের বর্তমান হিন্দু প্রতিবেশীদের মধ্যেও প্রায় একই রকম রয়ে গেছে।”[38] তিন বছর পরে বিকে চ্যাটার্জি এবং একে মিত্র ব্লাড গ্রুপের বণ্টন নিয়ে আরেকটি গবেষণা করেন। তাঁরা শুধু নিম্নবর্ণের বাঙালি হিন্দু ও গ্রামীণ মুসলমানদের— আবারও চব্বিশ পরগনা জেলায়— তুলনা করেননি; পাশাপাশি গ্রামীণ মুসলমানদের সঙ্গে শহুরে মুসলমান ও অ-বাঙালি মুসলমানদেরও তুলনা করেছিলেন। এই গবেষণায় দেখা যায় যে গ্রামীণ মুসলমানদের সঙ্গে তাদের নিম্নবর্ণের হিন্দু প্রতিবেশী— মাহিষ্য ও বাগদিদের— ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণাটি এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছায় যে শহুরে বাঙালি মুসলমানরা ব্লাড গ্রুপগত দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের দূরবর্তী পাঠানদের সঙ্গে গ্রামীণ বাঙালি মুসলমানদের তুলনায় বেশি ঘনিষ্ঠ। এর ফলে শহুরে মুসলমানদের সেই দাবির কিছু ভিত্তি পাওয়া যায় যে তাঁদের পূর্বপুরুষরা বাংলায় আগত বিদেশি অভিবাসী ছিলেন।[39]

অবশেষে, ১৯৬০ সালে ডিএন মজুমদার এবং সিআর রাও একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। এটি ১৯৪৫ সালে— অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী বিপুল জনসংখ্যা স্থানান্তরের ঠিক আগে— পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় অঞ্চল থেকে সংগৃহীত তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। উচ্চতা, কপালের প্রস্থ এবং নাসার উচ্চতার মতো শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে গোষ্ঠীগত পার্থক্য নির্ধারণ করে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে: “বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য উৎস আমাদের খুঁজতে হবে বাংলার আদিবাসী জনজাতি ও তফসিলভুক্ত অ-মুসলিম গোষ্ঠীগুলির মধ্যে…। দেশভাগ-পূর্ব বাংলার মুসলমানদের থেকে সংগৃহীত ব্লাড গ্রুপ-সংক্রান্ত তথ্যও একই মতের দিকে ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানদের উৎস ভারতের বাইরের মুসলমানদের থেকে, এমনকি উত্তরপ্রদেশের শিয়া ও সুন্নিদের থেকেও পৃথক। ব্লাড গ্রুপ-সংক্রান্ত প্রমাণের যদি আদৌ কোনও অর্থ থাকে, তবে তা মুসলমানদের স্থানীয় উৎসের দিকেই ইঙ্গিত করে।”[40] লেখকরা আরও দেখতে পান যে অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক সূচকের— যেমন মাথার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, নাকের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ— বিচারে পূর্ববঙ্গের জনগোষ্ঠী, মুসলিম ও অ-মুসলিম উভয়ই, পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠী থেকে মৌলিকভাবে পৃথক।[41] এই শেষ পর্যবেক্ষণটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকেও অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

বিংশ শতকের গোড়ার দিকে, যখন ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গতি সঞ্চয় করতে শুরু করে, এবং বিশেষত ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠার পর, যখন ব্রিটিশ ভারতে পৃথক মুসলিম “স্বদেশ”-এর দাবি শক্তিশালী হতে থাকে, তখন ইসলামায়নের বিভিন্ন তত্ত্বকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা সাধারণত এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চাইতেন। কারণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশের বিদেশি উৎস বা অতীতে সেই জনগোষ্ঠীর ইসলামায়নের বিষয়টি স্বীকার করলে, ভারতীয় জাতিসত্তার মৌলিক ঐক্য ও সমজাতীয়তার পক্ষে তাঁদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ত। হিন্দুদের পক্ষেও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সমর্থিত ‘সামাজিক মুক্তির’ তত্ত্ব গ্রহণ করা সহজ ছিল না; কারণ এই ব্যাখ্যায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারীর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হত।[42]

অন্যদিকে, বহু মুসলমানের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশে একটি পৃথক মুসলিম সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের ধারণাটি মৌলিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তাতে ভবিষ্যৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ন্যায্যতা অনেকাংশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। ফলে ‘অভিবাসন তত্ত্ব’ সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা তাঁদের পক্ষে সহজ ছিল না, যদিও অন্তত বাংলার ক্ষেত্রে বিপুল নৃতাত্ত্বিক তথ্য ইতিমধ্যেই দেখিয়েছিল যে মুসলিম জনসমষ্টির পূর্বপুরুষরা ত্রয়োদশ শতকেরও বহু আগে থেকে এই বদ্বীপের দেশজ অধিবাসী ছিল। এর ফলে কেউ কেউ এমন একটি সংকর তত্ত্ব গ্রহণ করেন, যা ‘অভিবাসন তত্ত্ব’ এবং ‘সামাজিক মুক্তির’ তত্ত্ব— উভয় উপাদানকেই একত্রিত করেছিল। এই ব্যাখ্যায় বলা হয়, আশরাফ অভিবাসীরা বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বাঙালিতে পরিণত হয়েছিল, আর একই সময়ে বিপুল সংখ্যক জাতিগত বাঙালি ইসলামের সাম্যবাদী নীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এই পারস্পরিক অভিযোজন নাকি আশরাফ ও সাধারণ জনগণের মধ্যেকার সামাজিক পার্থক্য মুছে দিয়েছিল। ফলে ১৯৪৭-পরবর্তী মুসলিম সরকারগুলির কাছে এই তত্ত্বটি আদর্শগতভাবে সুবিধাজনক হয়ে ওঠে, কারণ তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের সীমান্তের মধ্যে বসবাসকারী সমস্ত মুসলমানের ঐক্যের উপর জোর দিতে চেয়েছিল।[43]

ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক যুগ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার হিন্দু ও মুসলমানদের পরস্পর-বিচ্ছিন্ন, এমনকি বৈরী শ্রেণিতে বিভক্ত করে তুলেছিল; তারপর সেই শ্রেণিবিভাগকে অতীতের উপর আরোপ করে প্রাক-আধুনিক বাংলার ইতিহাসকে তাদের পারস্পরিক সংঘর্ষের ইতিহাস হিসেবে পড়া হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে বাংলা ভাষার খ্যাতনামা ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদ এসকে চ্যাটার্জি তুর্কি বিজয় সম্পর্কে যে উত্তেজনাপূর্ণ বর্ণনা লিখেছিলেন, তা এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ:

এই নির্মম বিদেশিদের দ্বারা বাংলা বিজয় ছিল দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের মতো। শান্তিপ্রিয় জনগণকে কল্পনাতীত আতঙ্ক ও যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল— গণহত্যা, লুণ্ঠন, নারী-পুরুষ অপহরণ ও দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ করা, মন্দির, প্রাসাদ, মূর্তি ও গ্রন্থাগার ধ্বংস, এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তর— সব কিছুই ঘটেছে। মুসলিম তুর্কিরা, যেমন মেক্সিকো, পেরু ও আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলে স্পেনীয় ক্যাথলিক বিজেতারা করেছিল, তেমনভাবেই এই দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মকে শয়তানের সৃষ্টি বলে ধ্বংস করতে চেয়েছিল।[44]

এবং সুপরিচিত ভারতীয় বাঙালি ইতিহাসবিদ আরসি মজুমদার প্রাক-আধুনিক বাংলায় ইসলামের বিস্তারকে ১৯৭৩ সালে এইভাবে বর্ণনা করেছিলেন:

হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি শক্ত প্রাচীরঘেরা দুর্গের মতো ছিল; প্রতিটিরই কেবল একটি মাত্র দ্বার— হিন্দুদের ক্ষেত্রে প্রস্থানের, এবং মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রবেশের। স্পর্শ ও শুচিতার নিয়ম থেকে সামান্য বিচ্যুতির জন্যও হিন্দুরা সমাজচ্যুত হত এবং পুনঃপ্রবেশের কোনও সুযোগ পেত না; আর একবার ইসলামের দুর্গে প্রবেশ করলে সেই নবাগত ব্যক্তির জন্য বেরিয়ে যাওয়ার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। এর সঙ্গে জোরপূর্বক ধর্মান্তর, বস্তুগত লাভ বা সুবিধার প্রলোভনে— খুব কম ক্ষেত্রেই বিশ্বাসের কারণে— স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ, সব মিলিয়ে হিন্দুদের ধারাবাহিকভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছিল এবং মধ্যযুগে হিন্দু সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করেছিল।[45]

চট্টোপাধ্যায়ের উত্তেজনাপূর্ণ ভাষার মধ্যে অন্তর্নিহিত রূপে, এবং মজুমদারের দুর্গ ও প্রবেশদ্বারের সামরিক রূপকের মধ্যে স্পষ্টভাবেই যে ধারণাটি উপস্থিত সেটি হল— ধর্মগুলি হচ্ছে এমন কিছু চিরন্তন সত্তা যা সম্পূর্ণ বদ্ধ, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পরস্পরের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও এই ধরনের ইতিহাসবিবর্জিত ও বিধিবদ্ধ ধর্ম-ধারণা কেবল আধুনিক যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে বিংশ শতকে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদ ধ্বংস (১৯৯২) পর্যন্ত, ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনীতিবিদরা এই ধারণাকে উৎসাহিত করেছেন এবং কার্যকরভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসবিদেরাও ধর্মের এই মৌলবাদী (essentialist) ধারণা থেকে মুক্ত ছিলেন না; চট্টোপাধ্যায় ও মজুমদার এই ধারণাটিকেই অতীতের উপর প্রতিফলিত করে বাংলার প্রাক-আধুনিক ইতিহাসের উপর আরোপ করেছিলেন।[46]

 

বাঙালি মুসলমান কৃষকসমাজের আবির্ভাব

বাংলায় ইসলামায়ন-সংক্রান্ত ইতিহাসচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, উপরোক্ত তত্ত্বগুলির— অভিবাসন, তরবারি, পৃষ্ঠপোষকতা, বা সামাজিক মুক্তি— প্রায় কোনও সমর্থকই তাঁদের মতবাদকে মৌলিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁরা এ-কথাও নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করার চেষ্টা করেননি যে ঠিক কখন এবং কোথায় ইসলাম প্রথম গণধর্মে পরিণত হয়েছিল। যেহেতু যে কোনও সুসংহত ঐতিহাসিক পুনর্গঠনকে ভূগোল ও কালানুক্রমের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের উপর নির্ভর করতেই হয়, তাই ইসলামে ব্যাপক ধর্মান্তরের ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে আমাদের প্রথমে যতটা সম্ভব নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে হবে— ঠিক কখন এবং কোথায় বাঙালি মুসলমান কৃষকসমাজ প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল।

ইসলামি প্রভাব প্রথম কোন দিক থেকে বাংলার ডেল্টায় পৌঁছেছিল, সে প্রশ্নে ভারত মহাসাগরের মানচিত্রের দিকে একবার তাকালেই মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমুদ্রপথের যোগাযোগের সম্ভাবনা মনে হতে পারে। সত্যিই, সুলেইমান তাজির (মৃত্যু ৮৫১), ইবন খুরদাদভিহ (মৃত্যু আনুমানিক ৮৫০), মাসুদি (মৃত্যু ৯৫৬), এবং আল-ইদ্রিসি (মৃত্যু আনুমানিক ১১৫০)-র মতো আরব ভূগোলবিদেরা বাংলার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন; এবং তাঁদের মধ্যে একজন, মাসুদি, দশম শতকে সেখানে মুসলমানদের— সম্ভবত দূরপাল্লার সামুদ্রিক বণিকদের— বাসের কথাও উল্লেখ করেছিলেন।[47] দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চন্দ্র রাজবংশের আমলে (আনুমানিক ৮২৫–১০৩৫) স্থানীয় মুদ্রা প্রচলনের ঐতিহ্য, এবং লালমাই অঞ্চলে আব্বাসীয় মুদ্রা আবিষ্কারও এই অঞ্চলের ভারত মহাসাগরীয় বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযুক্তির ইঙ্গিত দেয়, যখন সেই মহাসাগরীয় বাণিজ্যে আরব মুসলমানদেরই আধিপত্য ছিল।[48] তবে সুন্নি ইসলামের চারটি আইনশাস্ত্রভিত্তিক ধারার— হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি— বিশ্বব্যাপী বিস্তারের তুলনামূলক অধ্যয়ন ইঙ্গিত দেয় যে বাংলায় ইসলামায়ন সমুদ্রপথে ঘটেনি। সাধারণভাবে ইসলামি বিশ্বে ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠী সেই আইনশাস্ত্রের ধারাই গ্রহণ করেছে, যা তাদের অঞ্চলে ইসলাম বহন করে নিয়ে আসা মানুষদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। দশম শতক থেকে শাফেয়ি মতবাদ দক্ষিণ ও পশ্চিম আরবে প্রধান হয়ে ওঠে— এগুলি আরব উপদ্বীপের সেই অঞ্চলগুলি, যেগুলি ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের সঙ্গে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ছিল। পরবর্তী শতকগুলিতে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল, ভারতের মালাবার উপকূল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপাঞ্চল— সবই শাফেয়ি আরব বণিকদের বাণিজ্যিক সংযোগের মাধ্যমে ইসলামায়িত হয়েছিল। এবং ১৫০০ সালের মধ্যে এই সমস্ত অঞ্চল শাফেয়ি আইনশাস্ত্র মেনে চলত। বাংলাও যদি প্রধানত শাফেয়ি নাবিক আরবদের মাধ্যমে, অথবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা অন্যান্য সমুদ্রবণিক মুসলমানদের মাধ্যমে ইসলামায়িত হত, তবে আশা করা যেত যে বাংলার মুসলমানরাও শাফেয়ি মত অনুসরণ করবে। কিন্তু ১৫০০ সাল নাগাদ এবং তার পরেও বাঙালি মুসলমানরা প্রধানত হানাফি ছিল— যে মতবাদ তখন যেমন ছিল, এখনও তেমনই, গঙ্গা সমতলের উজান অঞ্চল এবং সমগ্র মধ্য এশিয়ার স্থলভাগীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রধান আইনশাস্ত্র।[49] এটি স্পষ্টভাবেই বাংলার ইসলামায়নের উত্তর-পশ্চিমমুখী, স্থলপথ-নির্ভর উৎসের দিকে ইঙ্গিত করে।

কিন্তু এটি কখন এবং কীভাবে ঘটেছিল? বাঙালি মুসলমানদের উৎস অতি সুদূর অতীতে নিহিত— এমন দাবি সত্ত্বেও, অন্তত কৃষকসমাজের ক্ষেত্রে, যারা জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ— এই মতের সমর্থনে প্রাথমিক উৎসসমূহে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। ষোড়শ শতকের পূর্ববর্তী বিদেশি সূত্রগুলিতে বাংলার মুসলমানদের যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তার একটি বাদে সবকটিই অভিবাসী বা শহুরে মুসলমানদের— অর্থাৎ আশরাফ সমাজকে— নিয়ে। একমাত্র ব্যতিক্রমটি ইবন বতুতা-র বিবরণ। তিনি ১৩৪৫ সালে বিখ্যাত সাধক শাহ জালাল-এর সঙ্গে দেখা করতে সিলেটে গিয়েছিলেন। পরে এই খ্যাতনামা আরব পর্যটক লিখেছিলেন যে, “এই পর্বতাঞ্চলের অধিবাসীরা তাঁর [শাহ জালালের] হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, এবং সেই কারণেই তিনি তাদের মধ্যেই বাস করতেন।”[50] কিন্তু এখানে ইবন বতুতা আদৌ কোনও কৃষকসমাজের কথা বলছিলেন কি না, তা মোটেই স্পষ্ট নয়। তিনি নিজেই বলেছেন, শাহ জালালের থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল “পর্বতের অধিবাসীরা”, সমতলের মানুষরা নয়। এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সম্ভবত জুমচাষ বা স্থানান্তরিত কৃষিকাজ করত; কারণ তিনি যেন এই জনগোষ্ঠীকে নিম্নভূমির কৃষকদের থেকে পৃথক করেই দেখিয়েছেন। নিচের কৃষকরা, যারা ভেজা জমিতে ধান উৎপাদন করত, তাদের তিনি স্পষ্টভাবেই হিন্দু বলে চিহ্নিত করেছিলেন।[51]

পরবর্তী যে বিদেশি পর্যটক বাংলায় মুসলমানদের কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি হলেন চিনা সরকারি কর্মকর্তা মা হুয়ান, যিনি ইবন বতুতার প্রায় নব্বই বছর পরে, ১৪৩৩ সালে ডেল্টায় পৌঁছেছিলেন। তখন রাজা গণেশের অস্থির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সদ্য স্তিমিত হয়েছে, এবং সুলতান জালাল আল-দিন মুহাম্মদ শাহ এমন এক ইসলামি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেছেন, যা বাংলার পরিবেশ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। চট্টগ্রাম থেকে সোনারগাঁও হয়ে পাণ্ডুয়া পর্যন্ত ভ্রমণের সময় চিনা পর্যটক একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জনপদ দেখতে পান। কিন্তু মানুষের জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে তাঁর একমাত্র মন্তব্যটি ছিল পাণ্ডুয়াকে ঘিরে। সেখানে তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, “রাজার প্রাসাদ এবং অভিজাতদের বড় ও ছোট প্রাসাদ ও মন্দির— সবই এই শহরের মধ্যে অবস্থিত। তারা মুসলমান।”[52] অর্থাৎ, এই বিদেশি পর্যটক যে মুসলমানদের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন শহরবাসী, কৃষক নয়।

১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা-র সমুদ্রপথে ভারতে আগমনের পর ষোড়শ শতকের গোড়ায় আমরা বাংলা ও তার জনগণ সম্পর্কে প্রথম ইউরোপীয় বিবরণ পাই। কিন্তু আবারও দেখা যায়, বদ্বীপের মুসলমানদের প্রসঙ্গে এই লেখকেরা মূলত শহুরে জনগোষ্ঠীর কথাই জানতেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নয়। লুডোভিকো ডি ভার্থেমা, যিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি ১৫০৩ থেকে ১৫০৮ সালের মধ্যে কোনও এক সময়ে গৌড় সফর করেছিলেন, লিখেছিলেন: “আমি এর আগে যত শহর দেখেছি এই শহরটি তার মধ্যে অন্যতম সেরা, এবং এর রাজ্যও অত্যন্ত বিস্তৃত।” তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে সুলতানের সমগ্র সেনাবাহিনী— দুই লক্ষ মানুষ— ছিল মুসলমান।[53] ১৫১২ থেকে ১৫১৫ সালের মধ্যে সম্ভবত বাংলা সফরকারী বণিক বা জাহাজের অধিনায়কদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, টোম পিরেস মন্তব্য করেছিলেন যে বাংলার রাজা “অত্যন্ত বিশ্বস্ত মুহাম্মদান” এবং “এই রাজ্যের রাজারা তিনশো বছর আগে মুহাম্মদান হয়েছিলেন।”[54] কিন্তু পিরেসের বিবরণেও সাধারণ জনগণের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না।

পিরেসের সমসাময়িক ডুরেট বারবোসা, যাঁর বাংলাবিষয়ক বিবরণও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নয়, বরং ভ্রমণকারীদের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে রচিত, গৌড়ের “সম্মানিত মুর”দের সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। তিনি তাঁদের বর্ণনা করেছেন এভাবে: তাঁরা “সাদা সুতির জামা, কাপড়ের কোমরবন্ধ, রেশমি স্কার্ফ এবং রুপো-সোনায় খচিত ছুরি” পরে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁদের ভাল খাওয়াদাওয়া, বেহিসেবি খরচ, এবং “আরও বহু বিলাসিতার” প্রসঙ্গ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তিনি ধনী শহুরে বণিকদের কথাই বলছিলেন, গ্রামীণ সমাজের নয়। প্রকৃতপক্ষে, বারবোসা গৌড়কে এমন এক শহর হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে শ্বেতাঙ্গ মানুষ বাস করত, এবং যেখানে ছিল “আরব, পারসিক, আবিসিনীয় ও ভারতীয়-সহ বহু বহিরাগত মানুষ।”[55] তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যও করেছিলেন: “এই অঞ্চলের হিথেনরা [অমুসলিমরা] প্রতিদিনই শাসকদের অনুগ্রহ লাভের জন্য মুর হয়ে যাচ্ছে।” এই উক্তি ইসলামায়নের ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা’ তত্ত্বকে সমর্থন করে বলে মনে হয় এমন একমাত্র সমসাময়িক প্রমাণ।[56] কিন্তু যেহেতু বারবোসা রাজধানী শহরের প্রসঙ্গ ছাড়া কোথাও মুসলমানদের উল্লেখ করেননি, তাই মনে হয় তিনি কৃষকদের ইসলামায়নের কথা নয়, বরং সেইসব হিন্দু কারিগর জাতিগোষ্ঠীর কথা বলছিলেন, যারা বিভিন্ন সূত্রে সুলতানি আমলের শহুরে শ্রমজীবী সমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে, ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে— বিশেষত মুঘল বিজয়ের (১৫৭৪) পরে— আমরা বাংলার কোনও জায়গায় মুসলমান কৃষকসমাজের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাই। সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখটি পাওয়া যায় ভেনিসীয় পর্যটক সিজার ফেদেরিচি-র লেখায়। তিনি ১৫৬৭ সালে উল্লেখ করেছিলেন যে চট্টগ্রামের বিপরীতে বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত বৃহৎ দ্বীপ সন্দ্বীপের সমগ্র জনসংখ্যাই মুসলমান, এবং সেখানে তাদের নিজস্ব মুসলিম “রাজা” ছিল। ফেদেরিচি সন্দ্বীপের কৃষি উন্নয়নেও বিস্মিত হয়েছিলেন; এতটাই যে তিনি সন্দ্বীপকে “সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উর্বর দ্বীপ” বলে অভিহিত করেন।[57] ফেদেরিচির সফরের অল্প কিছু পরে, ১৫৯৯ সালের এপ্রিল মাসে, ফ্রান্সিস ফার্নান্দেজ নামের এক জেসুইট মিশনারি পূর্ববঙ্গের মেঘনা নদীপথ ধরে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেন। তিনি স্থানীয় মানুষের রীতিনীতি সতর্কভাবে নথিবদ্ধ করেন এবং তাদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার সম্ভাবনাও বিচার করেন। দক্ষিণ-পূর্ব ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ সংলগ্ন গ্রামীণ অঞ্চলে পৌঁছে ফার্নান্দেজ লিখেছিলেন: “আমি খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কোনও সম্ভাবনা আছে কি না তা পরীক্ষা করতে শুরু করলাম, কিন্তু দেখলাম যে এখানকার মানুষ প্রায় সকলেই মুহাম্মদান।” বদ্বীপের মূল কেন্দ্রীয় অঞ্চলে মুসলমান কৃষকসমাজ সম্পর্কে এটিই সবচেয়ে প্রাচীন দ্ব্যর্থহীন উল্লেখ।[58]

সপ্তদশ শতকের বহু ইউরোপীয় পর্যটকই বাংলার গ্রামাঞ্চলে মুসলমানদের আবির্ভাব সম্পর্কে অনুরূপ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, এবং উল্লেখ করেছিলেন যে ইসলাম তখন একেবারেই সাম্প্রতিক একটি প্রবণতা, যার সূত্রপাত মুঘল বিজয়ের পর থেকেই। তাঁদেরই একজন, অগাস্টিনীয় ধর্মযাজক সেবাস্টিয়াও মানরিক ১৬২৯ সালে, অর্থাৎ যে সময়ে মুঘল ক্ষমতা ডেল্টায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে, লিখছেন— “প্রথম যুগে বাংলার সমস্ত রাজ্যই পৌত্তলিক উপাসনা অনুসরণ করত, যেমন এখনও অধিকাংশ মানুষ করে থাকে। তবে কিছু মানুষ, এই অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অধীন হওয়ার পর, পৌত্তলিক ধর্ম এবং নরকের কঠিন পথ ত্যাগ করে কোরআনের প্রশস্ত ও সহজ পথ গ্রহণ করেছে।”[59] ১৬৬৬ সালে ফরাসি পর্যটক জাঁ দি থেভেন প্রায় একই মন্তব্য করেছিলেন— এবং সেই সঙ্গে মুসলমানদের প্রতি একই ধরনের বিদ্বেষও প্রকাশ করেছিলেন, যা সপ্তদশ শতকের ইউরোপীয়দের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয়:

এই দেশ [অর্থাৎ বাংলা] পাঠান রাজাদের আমলে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ছিল— অর্থাৎ মুহাম্মদান ও মুঘলরা এর শাসক হওয়ার আগে— কারণ তখন ধর্মে ঐক্য ছিল। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে মুহাম্মদান ধর্মের আগমনের সঙ্গে বিশৃঙ্খলা এসেছে, এবং ধর্মের বৈচিত্র্য এখানে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হয়েছে।[60]

মানরিকের মতোই থেভেন-ও বাংলার প্রাক-মুঘল যুগকে প্রাক-মুসলিম যুগ হিসেবে দেখেছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে মুঘল বিজয়ের পরেই বাংলায় ইসলাম প্রাধান্য লাভ করে— যা তাঁর লেখার সময় থেকে হিসাব করলে এক শতকেরও কম সময় আগে ঘটেছিল। এটিও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যে, ইউরোপীয়রা মুসলিম কৃষকদের ঘনত্ব লক্ষ করেছিলেন কেবল বদ্বীপের পূর্বাংশে, কিন্তু পশ্চিমাংশে— যা তুলনামূলকভাবে পুরনো ও ইতিমধ্যেই হিন্দু-প্রভাবিত অঞ্চল— সেখানে এমন কিছু দেখতে পাননি। এই কারণে, ১৬৯৯ সালে, ফার্নান্দেজ যখন ঢাকার গ্রামীণ অঞ্চলে মুসলমানদের দেখেছিলেন তার ঠিক এক শতাব্দী পরে, আরেকজন জেসুইট ফাদার মার্টিন এসজে— যিনি আমাদের জানা মতে কেবল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন— মন্তব্য করেন যে “প্রায় সমগ্র দেশই মূর্তিপূজায় নিবেদিত।”[61]

অন্যান্য সমসাময়িক তথ্যও মানরিক এবং থেভেন-র সাধারণ পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে— অর্থাৎ মুঘল বিজয়ের আগে পর্যন্ত সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসলামায়ন তেমনভাবে দৃশ্যমান ছিল না। এই বিষয়ে প্রাচীনতম পারসীয় সূত্রটি ১৬৩৮ সালের। সেই সময়ে বাংলার মুঘল গভর্নর ইসলাম খান মাশহাদি পর্তুগিজরা নোয়াখালির উপকূলে হামলা চালিয়ে লুটপাট করছে বলে আরাকানের রাজাকে অভিযোগ করেছিলেন। এই অভিযোগে মাশহাদি লিখছেন, পর্তুগিজরা “মুসলিম জনগণের ওপর হামলা চালাচ্ছে।”[62] এরপর ১৬৬০-এর দশকে আরেকটি মুঘল সূত্র— কাজিম বি মুহাম্মদ আমিনের আলমগির-নামা— উল্লেখ করে যে ঘোড়াঘাট অঞ্চলের (বর্তমান উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চল) অধিকাংশ কৃষকই মুসলমান ছিলেন।[63]

 

সারসংক্ষেপ

যদি এমনকি ষোড়শ শতকের শেষ বা তার পরেও বিপুল সংখ্যায় গ্রামীণ মুসলমানদের অস্তিত্বের প্রমাণ না মেলে তবে আমরা একটা বিরোধাভাসের মুখোমুখি হই— একদিকে, এটা বোঝা যায় যে গণ-ইসলামায়নের ঘটনাটি ঘটেছিল একটি শাসনকালেই, অর্থাৎ মুঘল আমলে, আবার অন্যদিকে এটাও সত্য যে, নীতি হিসেবে মুঘলরা ইসলামে ধর্মান্তরকরণের বিষয়ে কোনও আগ্রহ দেখায়নি। কৃষির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশাল সাম্রাজ্য চালাতে গিয়ে মুঘল কর্মকর্তদের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে জমি থেকে যত বেশি সম্ভব উদ্বৃত্ত সম্পদ আহরণ করা, এবং সেই সম্পদ তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করত প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্থানীয় প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে। যদিও রক্ষণশীল ‘উলেমা’রা সবসময়ই ছিল, এবং তারা হিন্দু “অবিশ্বাসীদের” ইসলামে ধর্মান্তরিত করাটা সম্রাটদের “কর্তব্য” মনে করত, কিন্তু বাস্তবত, বিশেষত বাংলায়, এরকম নীতি কখনওই কার্যকর করা হয়নি, এমনকি রক্ষণশীল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলেও (১৬৫৮-১৭০৭) নয়।

ফলত আমাদের অবশ্যই এখন মুঘল আমলে বাংলার দিকে নজর দিতে হবে। এটা কি নিছকই কাকতালীয় যে, বাংলার বিপুল মুসলিম কৃষক জনগণের আবির্ভাব মুঘলদের আগমনের পরেই ঘটেছিল, নাকি কোনও গভীরতর শক্তি ছিল যা এই দুই দিকের মিলন ঘটিয়েছিল?

 


[1] William Muir, The Caliphate: Its Rise, Decline, and Fall, London: 1898, reprint, Beirut: Khayat: 1963, p.45.
[2] Richard M. Eaton, Islamic History as Global History, Washington, D. C.: American Historical Association, 1990, p.13.
[3] Peter Hardy, Modern European and Muslim Explanations of Conversion to Islam in South Asia: A Preliminary Survey of the Literature, in Conversion to Islam, ed. Nehemia Levtzion, New York: Holmes & Meier, 1979, p.78.
[4] দেখুন, Yohanan Friedmann, A Contribution to the Early History of Islam in India, in Studies in Memory of Gaston Wiet, ed. Myrian Rosen-Ayalon, Jerusalem: Institute of Asian and African Studies, 1977, p.322.
[5] Census of India, 1901, vol. 6, The Lower Provinces of Bengal and Their Feudatories, Calcutta: Bengal Secretariat Press, 1902, p.156.
[6] দেখুন, S. R. Sharma and R. N. Srivastava, Institutional Resistance to Induced Islamization in a Convert Community—an Empiric Study in Sociology of Religion, Sociological Bulletin 16, no. 1, March 1967, p.77.
[7] Ibn Battuta, Rehla, trans. Mahdi Hussain, p.46.
[8] Hardy, Modern European and Muslim Explanations, p.80-81.
[9] Aziz Ahmad, Studies in Islamic Culture in the Indian Environment, Oxford: Clarendon Press, 1964, p.105.
[10] বিষয়টি বোঝার জন্য সমসাময়িক অটোমান সাম্রাজ্যের জানিসারি-দের কথা ভাবা যেতে পারে। এইসব খ্রিস্টান যুবকদের তুর্কিকরণ এবং ইসলামিকরণ করে বলকান অঞ্চলে নিয়োগ করা হয়েছিল।
[11] দেখুন, Yohanan Friedmann, Medieval Muslim Views of Indian Religions, Journal of the American Oriental Society 95, 1975, p.214-21.
[12] দেখুন, Albert Hourani, Arabic Thought in the Liberal Age, 1798-1939, London: Oxford University Press, 1962, p.75-79, 99, 138, 155-56, 162, 164-70, 173, 182, 238; Bernard Lewis, The Impact of the French Revolution on Turkey: Some Notes on the Transmission of Ideas, Journal of World History 1, no.1, July 1953, p.105-25.
[13] উদাহরণস্বরূপ দেখুন, Caste and Social Stratification among the Muslims, ed. Imtiaz Ahmed, Delhi: Manohar Book Service, 1973.
[14] James Wise, Notes on the Races, Castes and Traders of Eastern Bengal, 2 vols, London: Harrison & Sons, 1883, 1: 40.
[15] দেখুন, Richard M. Eaton, The Political and Religious Authority of the Shrine of Baba Farid, Moral Conduct and Authority: The Place of Adab in South Asian Islam, ed. Barbara D. Metcalf, Berkeley and Los Angeles: University of California Press, 1984, p.333-56.
[16] Baudhāyana-Dharmasūtra.1. p.9-14, in Georg Bühler, trans., Sacred Laws of the Aryas as Taught in the Schools of Apastamba, Gautama, Vasishtha, and Baudhayana, part 2, Vasishtha and Baudhayana, vol. 14 of Sacred Books of the East, ed. F. Max Müller, Oxford: Clarendon Press, 1882, p.147-48. আরও দেখুন, History of Bengal, ed. R. C. Majumdar, 2d ed., Dacca: University of Dacca, 1963, p.8, 290.
[17] H. Beverley, Report on the Census of Bengal, 1872, Calcutta: Secretariat Press, 1872, p.12-15.
[18] James Wise, The Muhammadans of Eastern Bengal, Journal of the Asiatic Society of Bengal 63, 1894, p.28.
[19] টীকা ১৭, পৃঃ ১৩২।
[20] Abu A. Ghuznavi, Notes on the Origin, Social and Religious Divisions and Other Matters Touching on the Mahomedans of Bengal and Having Special Reference to the District of Maimensing, India Office Library, London, European MSS., E 295., vol. 17 [n.d.], p.3.
[21] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪-১২।
[22] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৪।
[23] E. A. Gait, The Muhammadans of Bengal, in Census of India, 1901, vol. 6, The Lower Provinces of Bengal and Their Feudatories, pt. 1, Report, Calcutta: Bengal Secretariat Press, 1902, p.170.
[24] দ্রষ্টব্য, টীকা ১৮। পৃঃ ২৮-৬৩।
[25] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২৯। তিনি আরও যোগ করেন, যে-সমস্ত ভাইসরয় এবং নোবেলরা বাংলার শাসনকার্যে নিযুক্ত হত, তারা যত দ্রুত সম্ভব যতটা পারা যায় সম্পদ হস্তগত করে এই প্রতিকূল প্রদেশ ছেড়ে চলে যেত। “শুধু মুষ্টিমেয় কিছু অফিসার এবং প্রাইভেট সেনা দেশীয় পরিবারে বিয়ে করে এখানে থেকে গেছিল।”
[26] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২৮-৩০।
[27] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৩২।
[28] Khondkar Fuzli Rubbee, The Origin of the Musalmans of Bengal, 1895; 2d ed., Dacca: Society for Pakistan Studies, 1970, p.40-41.
[29] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৪৩।
[30] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৭।
[31] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৫৯।
[32] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৮৭-৯৪।
[33] দ্রষ্টব্য, টীকা ২৩। পৃঃ ১৬৯।
[34] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৬৬।
[35] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৬৯।
[36] J. E. Webster, East Bengal and Assam District Gazetteers: Noakhali, Allahabad: Pioneer Press, 1911, p.39.
[37] D. MacPherson, Final Report on the Survey and Settlement Operations in the Districts of Pabna and Bogra, 1920-29, Calcutta: Bengal Secretariat Book Depot, 1930, p.31, 32.
[38] Eileen W. E. Macfarlane, Blood-Group Distribution in India with Special Reference to Bengal, Journal of Genetics 36, no. 2, July 1938, p.230, 232.
[39] B. K. Chatterji and A. K. Mitra, Blood Group Distributions of the Bengalis and Their Comparison with Other Indian Races and Castes, Indian Culture 8, 1941-42, p.197, 201, 202.
[40] D. N. Majumdar and C. R. Rao, Race Elements in Bengal, Calcutta: Asia Publishing House, 1960, p.96, 98, 114.
[41] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৯৬।
[42] এর একজন ব্যতিক্রম হলেন নীহাররঞ্জন রায়। ১৯৪৫ সালে তিনি লিখেছিলেন: “সামাজিক স্তরে বেশি গণতান্ত্রিক হওয়ায়, ধর্মীয় রীতিনীতি সহজতর হওয়ায়, এবং তার সঙ্গে শাসকশ্রেণির আনুকূল্য লাভের একটি সহজ পন্থা হওয়ায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কিছু অংশের কাছে ইসলাম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। এবং অন্তত কিছু সংখ্যকের কাছে উচ্চবর্ণের ধর্মীয় এবং সামাজিক পীড়নের বিরুদ্ধে এটি একটি আশ্রয় হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিল।” Ray, Medieval Bengali Culture, p.49.
[43] এই তত্ত্ব প্রথম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঙালি ঐতিহাসিকদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আবদুল করিম। তিনি লিখেছিলেন: “মুসলিমরা এদেশে বসতি স্থাপন করেছিলেন, স্থানীয় ভাষা শিখেছিলেন, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, স্থানীয় রমণীদের বিবাহ করেছিলেন, তাঁদের প্রতিভার সঙ্গে মানানসই বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছিলেন, খাদ্য এবং বাসস্থানের জন্য স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত জিনিসপত্রের ওপর নির্ভর করেছিলেন। এই সব কিছুই দেখিয়ে দেয় যে তাঁরা বাংলাকে নিজেদের বাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি, তাঁরা ঐস্লামিক ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতেন, এবং নিজেদের জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও তৈরি করেছিলেন। ফলে, এটা বলার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ রয়েছে যে, একটি বাঙালি মুসলিম সমাজ তার রূপান্তরের স্তরগুলি পার করে এসেছে, একটি নির্দিষ্ট আকার নিয়েছে, এবং একটি দেশে সহনশীলতা, সাম্য এবং সর্বজনীন প্রেমের আদর্শ এতটাই গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে যে, বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, তৎকালীন হিন্দুত্ববাদকেও যে তা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল তা চৈতন্য-আন্দোলনের বেশ কিছু প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়।” Karim, Social History, 210-11. অভিবাসন তত্ত্বের সঙ্গে কিছু পরিমাণে সামাজিক মুক্তির তত্ত্বের মিশ্রণের একটি সাম্প্রতিক বয়ানের জন্য দেখুন: Muhammad Mohar Ali, History of the Muslims in Bengal, Riyadh: Imam Muhammad Ibn Sa’ud Islamic University, 1985, 1B: 750-88.
[44] Suniti Kumar Chatterji, Languages and Literatures of Modern India, Calcutta: Bengal Publishers, 1963, p.160-61.
[45] R. C. Majumdar, History of Medieval Bengal, Calcutta: G. Bharadwaj & Co., 1973, p.196-97.
[46] প্রকৃতপক্ষে, মজুমদারের ধারণা অনুযায়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা সাম্প্রদায়িক ঐক্যের যে ছবি তুলে ধরেছিলেন, তা অযৌক্তিক, এবং তিনি কেবল তা সংশোধনের প্রয়াস করেছেন মাত্র। তিনি লিখেছেন, “ভারতে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হওয়ার সময় থেকেই এই সংগ্রামের সাফল্যের জন্য সম্পূর্ণ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে অপরিহার্য শর্ত রূপে গণ্য করা হত। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলস্বরূপ মুসলিম শাসকরা হিন্দুধর্মের প্রতি যে গোঁড়ামি এবং অসহিষ্ণুতা দেখিয়েছিলেন, সেই গোটা পর্বটিকে যদি সম্পূর্ণ মুছে নাও দেওয়া হয়, তবুও অনেক লঘু করে বর্ণনা করে ভারতের ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রয়াস করা হয়েছিল।” পূর্বোক্ত।
[47] The History of India as Told by Its Own Historians, trans. and ed. H. M. Elliot and John Dowson, Allahabad: Kitab Mahal, 1964, 1: 5, 13-14, 25, 90. Mas‗udi, Prairies d‘or, 1: 155.
[48] F. A. Khan, Mainamati, Karachi, 1963, p.25-27. Cited in Tarafdar, Trade and Society, p.277.
[49] দেখুন, Francis Robinson, Atlas of the Islamic World since 1500, Oxford: Phaidon Press, 1982, p.29.
[50] দ্রষ্টব্য, টীকা ৭। পৃঃ ২৩৯।
[51] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২৪১।
[52] Ma Huan in P. C. Bagchi, Political Relations, p.117.
[53] Ludovico di Varthema, Travels, p.211.
[54] Tome Pires, Suma Oriental, p.89. তবে পিরেস ত্রিপুরার রাজার মতো আঞ্চলিক তথাকথিত “বর্বর” রাজাদের কথা বলেছেন। তাঁর এই কথাটি, যে বাংলার রাজারা ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই “মুসলমান হয়ে গেছিলেন”, যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। এতে মনে হয় যে তিনি যেন বাংলার রাজতন্ত্র বিষয়টিকে সেনা বা তুর্কি-পূর্ব যুগ থেকে চলে আসা কোনও অবিকৃত বিষয় বলে ধরে নিয়েছিলেন। এমনটা কি হতে পারে যে পিরেস বাংলার তুর্কি, আফগান এবং আরব রাজাদের বিদেশি উৎস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না? স্পষ্টতই, হুসেন শাহী আমল বাংলার সংস্কৃতিকে এতটাই সম্পূর্ণরূপে আত্মস্থ করে ফেলেছিল যে, এই পর্তুগিজ অফিসিয়ালের কাছে না সেই আমলে, না তার সম্রাটের মধ্যে কোনও বহিরাগত চিহ্ন ধরা পড়েনি। বরং তাঁর মনে হয়েছিল বাংলার রাজতন্ত্র একটি অবিকৃত ধারাবাহিক শাসনধারা যা তিনশো বছর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।
[55] Duarte Barbosa, Book of Duarte Barbosa, p.135-39, 147.
[56] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৪৮।
[57] Federici, Extracts, p.137.
[58] H. Hosten, Jesuit Letters from Bengal, Arakan and Burma (1599-1600), Bengal Past and Present 30, 1925, p.59.
[59] Manrique, Travels 1: 67. জোর লেখকের।
[60] Surendranath Sen, ed., Indian Travels of Thevenot and Careri, New Delhi: National Archives, 1949, p.96.
[61] M. L. Aimé-Martin, ed., Lettres édifiantes et curieuses concernant l‘Asie, l‘Afrique et l‘Amérique, Paris: Société du Panthéon littéraire, 1843, 2: 258. H.Hosten, The Earliest Recorded Episcopal Visitation of Bengal, 1712-1715, Bengal Past and Present 6, 1910, p.217.
[62] S. H. Askari, The Mughal-Magh Relations Down to the Time of Islam Khan Mashhadi, in Indian History Congress, Proceedings, 22d session, Gauhati, 1959 (Bombay: Indian History Congress), 1960, p.210.
[63] Jam ī kathīr az ṣaghīr o kabīr-i ra āyā-yi ānjā ki akthar Musalmān būdand. Munshi Amin Kazim b. Muhammad Amin, ālamgīr-nāma, ed. Khadim Husain and Abd al-Hai, Calcutta: Asiatic Society of Bengal, 1868, p.677.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5413 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.