উচ্ছেদ, বিবেক ও বিকল্প: কিছু বিক্ষিপ্ত ভাবনা

অবিন চক্রবর্তী

 


বিভিন্ন ধরনের স্থূলতা ও ক্রূরতা আমাদের ক্রমশ এতটাই ফাঁপা ও অসার করে তুলছে যে নানাবিধ অনাচার-অবিচার সম্পর্কে আমাদের যে স্বাভাবিক প্রতিবাদের বোধ সেটাই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর সমাজমাধ্যমে সারাক্ষণ ভেসে থাকা ঘৃণা এবং অশ্লীলতার স্রোত আমাদের সকল সহানুভূতি ও সমব্যথিতা কেড়ে নিয়ে আমাদের কেমন যেন জীবন্মৃত অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে

 

When order is injustice, disorder is the beginning of Justice.

আমরা যখন সাবেক প্রেসিডেন্সি কলেজের দেওয়ালে রমা রঁলার এই বাক্যটা পড়তাম তখন এর মর্মার্থ যথার্থভাবে বুঝতে পারার মতো বয়স হয়তো হয়নি। নিয়ম না মানাটাকেই অনেক সময় স্বাধীনতা এবং ন্যায়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতাম। পরবর্তীকালে ক্রমশ বুঝতে পেরেছি যে আমাদের দৈনিক যাপনের মধ্যেই নানান ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার লুকিয়ে রয়েছে। আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা একজন দরিদ্র মানুষের পক্ষে কতটা কঠিন তার অসংখ্য উদাহরণ অনেকেরই জানা। যে পুলিশ-প্রশাসন সাধারণ মানুষের অভিযোগ নিতে চায় না, তাদের হেনস্থা করে, নিজের দায়িত্ব পালনের জন্য বারবার ঘুষ চায় তারাই যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নানারকম ব্যবসায়ী, শিল্পপতি বা অপরাধজগতের পাণ্ডাদের সমস্ত অপরাধ নীরবে এড়িয়ে যায়, সেটাও আমাদের জানা। সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে বাধ্য হয়ে কীভাবে অনেক মানুষ অনাবশ্যক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নানান আকাশছোঁয়া মূল্যের পরিষেবার চাপে নিঃস্ব হয়ে যান সে আখ্যানও আমরা শুনেছি। ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ সাফল্যের আশায় নানা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণের আর্থিক বোঝা কীভাবে নানা পরিবারকে ঋণের আবর্তে বেঁধে ফেলেছে সেই বাস্তবও আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। এই সমস্ত বৈষম্য রাষ্ট্রীয় আইন মেনেই সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলে। যে রাষ্ট্র আইনানুগ পদ্ধতি অনুসারে এই বৈষম্যের স্বাভাবিকীকরণ সুনিশ্চিত করে সেই রাষ্ট্রই নির্বাচনী তালিকার নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে বহুল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। সেই একই চরিত্র অনুসারে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া রেলস্টেশন থেকে হকারদেরও উচ্ছেদ করা হয়। রাষ্ট্র তার চিরকালীন শ্রেণিচরিত্র বজায় রেখেই নিয়মতান্ত্রিকতার দোহাই দিয়ে এই কাজ করে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই নিয়মানুবর্তিতার অক্ষ থেকে রাষ্ট্রের নিজের প্রদত্ত পরিষেবা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণকারী ধনিকশ্রেণিকে সযত্নে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। ট্রেন ঘন্টার পর ঘন্টা দেরিতে চলতে থাকে, তার জন্য যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকে, অথচ কেউ পদত্যাগও করে না, সংশ্লিষ্ট সংস্থার কোনও জরিমানাও হয় না। সাধারণ মানুষকে কম তেলে রান্না করতে বলা হয়, অথচ কোটিপতিদের সম্পত্তির উপর করের হার বাড়ে না। অতিমারির সময় যে নাগরিকরা বিদেশে আটকে ছিলেন সরকার তাদের পোষ্যসমেত বিমান-মারফত দেশে ফেরত আনতে পারে অথচ ট্রেনলাইনে শুয়ে থাকা পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত অভিবাসী শ্রমিকদের ট্রেনে কাটা পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারে না। আমরা এই সবই দেখি এবং বঞ্চিত মানুষগুলোকে নিজেদের সহানুভূতির এবং সমান অধিকারের জগৎ থেকে খেদিয়ে দিয়ে এক মোহাচ্ছন্ন আত্মপ্রতারণার প্রশান্তিতে ডুবে যাই।

এই বৈষম্যের কুৎসিত ভণিতা কি আগে ছিল না? ছিল। শহুরে মধ্যবিত্তের কপটতা ও ভণ্ডামি কি আগে ছিল না? ছিল। ৭৭-এর বন্যা-পরবর্তী সময়ে শহর কলকাতায় কি বিপুল আড়ম্বরে পূজা হয়নি? হয়েছে। তবুও তিলোত্তমা কলকাতায় সকল শ্রেণির মানুষের মোটামুটি সহাবস্থানের সুযোগও ছিল। এর মূলে ছিল এক ধরনের বেনিয়মের সমঝোতা। এই সমঝোতায় ছিল বাইরের চাকচিক্য সম্পর্কে নিষ্পৃহতা, প্রাচুর্য ও দীনতাকে পরস্পরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখার অনীহা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের এক নিত্যদিনের আত্মীয়তা যা কিনা শ্রেণি-ধর্ম-জাত-লিঙ্গ ইত্যাদি আত্মপরিচয় নির্ণায়কের বিভাজনমূলক কৌশলের বিপরীতধর্মী। সেইজন্যেই এই শহরে বহুতল ও বস্তির পাশাপাশি অস্তিত্ব বজায় থেকেছে, কন্ডাক্টর অনেক সময় বিনা টিকিটে মানুষজনকে বাসে যাতায়াত করতে দিয়েছে, গলির চায়ের দোকানের আইনি মালিকানা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি এবং স্থায়ী বাজারের বাইরের রাস্তায় বসে থাকা সস্তার ফলের ব্যাপারীকে কেউ অপরাধী ঠাওরায়নি। এটাও সম্ভব হয়েছিল ভোগবাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা নিরন্তর আদর্শগত সংগ্রামের বদান্যতায়। এই সংগ্রাম যে শুধুমাত্র বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বামপন্থী রাজনীতির পরিণতি ছিল তা নয়। গান্ধিবাদী আদর্শ, নানারকম বাউল-ফকিরদের আধ্যাত্মিক চেতনা, এমনকি “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে” জাতীয় পংক্তির মাধ্যমে উচ্চারিত আড়ম্বরহীন স্বাচ্ছন্দ্যের ভাবনা বহুকাল পর্যন্ত বাঙালি সমাজে ধনতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার বোধকে সর্বাত্মকভাবে জাঁকিয়ে পড়া থেকে সুরক্ষিত রেখেছিল। কিন্তু বাঙালি সমাজ স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় এবং বিশ্ব-অর্থনীতির বাইরে নয়। তাই একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে অর্থ, সম্পদ এবং আড়ম্বরের যে মোহ ভোগবাদী ধনতন্ত্র সারা পৃথিবী জুড়ে তৈরি করেছে, তা ক্রমশ বাঙালি সমাজকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল। এরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে সংঘবদ্ধ জীবনের পরিবর্তে একক সাফল্য এবং সেই সাফল্যের আস্ফালন অমানবিক অসভ্যতার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকল। মেধা, সংস্কৃতিচর্চা, সারস্বতচর্চা, নিঃস্বার্থ পরোপকার— এই সব কিছুর পরিবর্তে ক্রমশ বিত্ত এবং ক্ষমতার আস্ফালনটাই আরাধ্য হয়ে উঠল। অধ্যাপিকার মার্সিডিজ বা ডাক্তারের প্রাসাদ দুটোই এই প্রবণতার প্রমাণ। আসলে ব্যক্তিগত সত্তাটাই যখন উপাস্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষের সঙ্গে মানুষের অন্য সব সম্পর্কই গৌণ হয়ে পড়ে। সেই কারণেই স্টেশনের হকারদের সব হারানোর হাহাকার অনেক মধ্যবিত্ত বাঙালিকে স্পর্শই করে না. বরঞ্চ ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম এবং আগামী সময়ের নানান মনোহারি নামিদামি দোকানের উপস্থিতির দিবাস্বপ্নেই তারা বিভোর। এই সবকিছুর মূলেই রয়েছে অর্থ ও বিত্তের সেই সর্বগ্রাসী ক্ষমতা যার কথা মার্কস অনেকদিন আগেই বলে গিয়েছিলেন— “অর্থ, ব্যক্তি এবং সমাজ ইত্যাদির বন্ধনের বিরুদ্ধে এক বিকৃতকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়… এটি বিশ্বস্ততাকে অবিশ্বস্ততায়, ভালোবাসাকে ঘৃণায়, ঘৃণাকে ভালোবাসায়, পুণ্যকে পাপে, পাপকে পুণ্যে, ভৃত্যকে প্রভুতে, প্রভুকে ভৃত্যে, নির্বুদ্ধিতাকে বুদ্ধিমত্তায় এবং বুদ্ধিমত্তাকে নির্বুদ্ধিতায় রূপান্তরিত করে।” বাঙালি যে ক্রমশ অর্থলোভে আর সব কিছু বিস্মৃত হচ্ছে এ-কথা চন্দ্রিল ভট্টাচার্য-সহ নানা লেখক বিগত কয়েক বছরে বহুবার বলেছেন, লিখেছেন। আজকে যখন জীবিকা হারানো নিঃস্ব মানুষগুলোর কান্নাকাটি দেখে বা তাঁদের পরিজনদের অসহায়তা দেখে অনেকে নির্বিকার থাকছেন তখন আমাদের কারও কারও হতবাক লাগলেও এই নির্লিপ্ততা ধনতন্ত্রের অনিবার্য পরিণাম। যে সাংস্কৃতিক চেতনা এর বিপরীতে আমাদের সহায় হতে পারত তার চর্চা বাঙালি মননে বহুকাল হল ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। সীমাবদ্ধ, শাখাপ্রশাখা, আগন্তুক ইত্যাদি সিনেমার মাধ্যমে রায়সাহেব যে মানবতার দ্যুতি আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তা অনেকাংশেই প্রতিবেশীকে ব্র্যান্ড ভ্যালুর দৌড়ে টেক্কা দেওয়ার তেজে ফিকে হয়ে গেছে। সদ্য-প্রয়াত অনীক দত্তের সিনেমাও এই সংকটের হদিশ দিয়ে গেছে। তিপ্পান্ন লাখের বাইকটা বড়লোকি দেখনদারির ঘৃণ্য আস্ফালন না হয়ে কাঙ্খিত উত্তরণের প্রতীক হয়ে গেছে।

এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক ধরনের অভিশাপ— আবেগের দীনতা— waning of affect— যার কথা ফ্রেডরিক জেমসন বলে গেছিলেন। বিভিন্ন ধরনের স্থূলতা ও ক্রূরতা আমাদের ক্রমশ এতটাই ফাঁপা ও অসার করে তুলছে যে নানাবিধ অনাচার-অবিচার সম্পর্কে আমাদের যে স্বাভাবিক প্রতিবাদের বোধ সেটাই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর সমাজমাধ্যমে সারাক্ষণ ভেসে থাকা ঘৃণা এবং অশ্লীলতার স্রোত আমাদের সকল সহানুভূতি ও সমব্যথিতা কেড়ে নিয়ে আমাদের কেমন যেন জীবন্মৃত অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। ঠিক যেভাবে উচ্চকিত বাজনার সঙ্গে খুনোখুনির সমারোহের ঠেলায় বীভৎস রক্তবন্যা দেখেও বমি পাওয়ার পরিবর্তে হাততালি বাজতে থাকে, সেইরকমভাবেই জাত-ধর্ম নির্বিশেষে হকারদের হাহাকার দেখে কারও হাসি পায়, কারও উল্লাস হয়, কেউ প্রগতির বুলি ফোটান আর কেউ নতুন ব্যবসার গন্ধ পান। যাঁরা এই সব প্রতিক্রিয়া দেখে আহত হয়ে নানা লেখালেখি করেন এই আশায় যে সেগুলো পড়ে কারও হয়তো লজ্জা হবে, তাঁরাও হতাশ হন কারণ লজ্জাবোধের জন্যেও যে নৈতিক কাঠামোটি দরকার সেটিও অনেকাংশেই উবে গেছে। আসলে সিনেমা থেকে মোবাইল গেম— সবকিছুর জগতে মানুষের মতো দেখতে প্রাণীগুলোকে অবলীলায় হত্যা করতে করতে, বা সমাজমাধ্যমে মানুষের আত্মীয়পরিজনের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ করতে করতে পাশের লোকটার প্রতি সামান্য ইতিবাচক অনুভূতির পরিবর্তে শুধুমাত্র অবজ্ঞাই উঠে আসে। এইভাবে মানুষজনের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার ফলে মনের ভেতরে যে শূন্যতাটা তৈরি হয় সেটা পূরণ করার তাগিদেই রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে নতুন নতুন ঘৃণার পাত্র তুলে ধরে, যাতে কিনা অবদমিত দুঃখ এবং হতাশা ভ্রাতৃঘাতী ক্রোধের রূপ নেয়। যে সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকাঠামো এই অবস্থার জন্য দায়ী তাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক আখ্যান এভাবেই মানুষকে মূলত বিভ্রান্ত করে, যাতে কিনা শোষণমূলক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার প্রতি মানুষের মনে কোনও স্থায়ী অসন্তোষ দানা না বাঁধে। সেই কারণেই যখন Cockroach Janata Party-র মতো কোনও অপ্রচলিত বিরোধী শক্তির উত্থ্বান ঘটে তখন রাষ্ট্র তাকে স্তব্ধ করতে উঠে পড়ে লাগে।

তবে সবকিছু আটকানো সবসময় সম্ভব হয় না। যাদের পোকামাকড়ের মতো খেদিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের অসন্তোষ কালের নিয়মে জারিত ও সংক্রামিত হতে হতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছয় যে সব শেকলই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে— “দেখবে হঠাৎ নয়ন মেলে, হয় না যেটা সেটাও হবে”। তখন কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই ক্ষোভের ঝড় ধ্বংসাত্মক রূপে আছড়ে পড়ে— যেমন ঘটেছে নেপালে বা শ্রীলঙ্কায়, যেমন ঘটছে ফ্রান্স বা বলিভিয়ায়। সেই ক্ষোভকে গঠনমূলক বহিঃপ্রকাশের অভিমুখ না দিলে তার পরিণাম নানা দুর্বিপাক ডেকে আনতে পারে। যারা আজকে বঞ্চিত, দিশাহারা মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাদের অবশ্যকর্তব্য এই ক্ষোভ প্রশমনের উপযুক্ত গণতান্ত্রিক বিকল্পের সন্ধান করা যা মুষ্টিমেয় বিত্তশালীদের হাত থেকে জাতীয় সম্পদের কর্তৃত্ব মুক্ত করে সামাজিক পুঁজির বিকাশ ও প্রসারের ব্যবস্থা করবে।

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.