শর্মিষ্ঠা পাল
২০২৬ সালের গ্লোবাল ইনইক্যুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড অসাম্যের উপলব্ধি এবং মোকাবিলায় জঁ দ্রেজের স্বতন্ত্র অবদানের একটি যথার্থ স্বীকৃতি— যা ভারতে দারিদ্র্য নিয়ে তাঁর কাজ, অধিকার-ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এগিয়ে নেওয়ায় তাঁর ভূমিকা এবং বিপুল পাণ্ডিত্যকে নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক কর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করার তাঁর অসাধারণ সক্ষমতাকে স্বীকার করে— এ ঠিক সেই সমন্বয়, যা সেন্স অ্যান্ড সলিডারিটি-র দশটি প্রবন্ধ জুড়ে প্রদর্শিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি এমন একটি সময়ে আসছে, যখন অসাম্য উন্নয়ন ও গণতন্ত্র নিয়ে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষাপটেই নয়— যেখানে জঁ তাঁর কাজের অধিকাংশ করেছেন— বরং বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ক্ষেত্রে ক্রমশ কেন্দ্রীয় স্থানে উঠে আসছে
জঁ দ্রেজের মতো বৌদ্ধিক উৎকর্ষতাকে গণ-নীতিতে প্রভাববিস্তার এবং তৃণমূল স্তরের সক্রিয়তার সঙ্গে এমন সফলভাবে মিলিয়ে দিতে পেরেছেন— এমন অর্থনীতিবিদ বিরল। গত চার দশক ধরে দ্রেজ উন্নয়ন-অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন, যিনি ভারতের অ্যাকাডেমিক বিতর্ক এবং সরকারি নীতি— দুই ক্ষেত্রকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। তাঁর অবদান নিছক গবেষণাপত্রের সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক সম্পৃক্ততা, সামাজিক সক্রিয়তা এবং নীতি-পরামর্শের এক অনন্য সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়ের সম্পর্ককে নতুন রূপ দিতে সাহায্য করেছেন, এবং ভারতের অধিকার-ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
২০২৬ সালের জুনে দ্রেজের গ্লোবাল ইনইক্যুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড (GiRA) প্রাপ্তি তাঁর মতো একজন পণ্ডিতের— যাঁর প্রভাব অ্যাকাডেমিয়ার সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত— অসাধারণ জীবন ও কাজের দিকে ফিরে তাকানোর একটি যথার্থ সুযোগ। পুরস্কার কমিটি স্বীকার করেছে যে, দ্রেজ অন্য যে কারও চেয়ে অনেক বেশি করে গবেষণা ও বাস্তব কাজকে সংযুক্ত করতে পেরেছেন এবং ভারতে সামাজিক সুরক্ষার একটি অধিকার-ভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছেন। এই স্বীকৃতি এমন একটি কর্মজীবনের মর্মবস্তুকে তুলে ধরল যা অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধান এবং গণ-সম্পৃক্তির মধ্যেকার সীমারেখাকে নিরন্তর ঝাপসা করে দিয়েছে।
বেলজিয়াম থেকে ভারত
জঁ দ্রেজের জন্ম ১৯৫৯ সালে বেলজিয়ামের লুভেইন শহরের এক স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী পরিবারে। তাঁর বাবা জাক দ্রেজও ছিলেন একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। কিন্তু প্রথাগত অ্যাকাডেমিক অর্থনীতিবিদদের থেকে জঁ দ্রেজের কর্মজীবন একেবারেই ভিন্ন পথে এগিয়েছে। অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতি-প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে দিয়ে প্রচলিত পথ অনুসরণ না করে, তিনি দারিদ্র্য ও বঞ্চনার নিত্যদিনের বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করার রাস্তা বেছে নেন।
দ্রেজ প্রথম ভারতে আসেন ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এবং এই দেশেই স্থায়ীভাবে থেকে যান। ২০০২ সালে তিনি একটি অসাধারণ পদক্ষেপ নেন— বেলজিয়ান নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্ত নিছক একটি আইনি পরিবর্তন ছিল না, বরং যে দেশের উন্নয়ন-সংকটই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের কাজের মূল কেন্দ্র, সেই দেশের প্রতি একটি গভীর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক তাঁকে দারিদ্র্য, অসাম্য, ক্ষুধা এবং সামাজিক বঞ্চনা সম্পর্কে এক অসাধারণ বাস্তব উপলব্ধি গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ যেখানে বঞ্চনাকে মূলত উপাত্ত ও পরিসংখ্যানগত মডেল দিয়ে বোঝেন, দ্রেজ সেখানে কয়েক দশক ধরে গ্রামীণ ভারত ঘুরে বেড়িয়েছেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন এবং অর্থনৈতিক সূচকের আড়ালে থাকা বাস্তব জীবনযাত্রার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
এক ব্যতিক্রমী অর্থনীতিবিদ
শুধু বৌদ্ধিক অবদানেই নয়, তাঁর জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের ক্ষেত্রেও জঁ দ্রেজ তাঁর সমসাময়িকদের থেকে পৃথক। প্রায়শই তাঁকে “নগ্নপদ অর্থনীতিবিদ” বলা হয়, যে অভিধা তাঁর সরলতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক— দুটিকেই সুন্দরভাবে ধারণ করে। পরিণত জীবনের প্রায় পুরো সময়টা ধরেই অ্যাকাডেমিক সাফল্যের সঙ্গে যে-সব সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায়, সে-সব প্রত্যাখ্যান করে তিনি এক স্বেচ্ছামূলক সরল যাপনের পথ বেছে নিয়েছেন। ডক্টরাল অধ্যয়নের সময়কালে এবং পরেও তিনি এমন একটি জীবনযাপনের পথ বেছে নিয়েছিলেন যা সামাজিক ন্যায়ের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে পড়াশোনার সময়, তিনি প্রায়শই গৃহহীনদের সঙ্গে রাস্তায় ঘুমাতেন এবং ১৯৮৮ সালের একটি স্কোয়াটার আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ শূন্য ভবনগুলোকে গৃহহীনদের জন্য খুলে দেওয়া হয়, এবং সেগুলি থেকে তাঁদেরকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। এই অভিজ্ঞতা তিনি পরে ১ নং ক্ল্যাফাম রোড: দ্য ডায়েরি অফ আ স্কোয়াট নামে একটি ছোট বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন।

১৯৯০-৯১ সালের প্রথম ইরাক যুদ্ধের সময়, জঁ কয়েকজনের সঙ্গে ইরাক-সৌদি সীমান্তে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদের জন্য একটি সংগঠন ‘গালফ পিস ক্যাম্প’ গড়ে তোলেন। হারিস গজদারের সঙ্গে তাঁর ১৯৯২ সালের প্রবন্ধ “হাঙ্গার অ্যান্ড পভার্টি ইন ইরাক, ১৯৯১” যুদ্ধোত্তর ইরাকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রথমদিকের মূল্যায়নগুলির একটি, যা পরবর্তী অবরোধ ব্যবস্থা মানুষের ওপর যে মানবিক মূল্য চাপাতে পারে, তার একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা দিয়েছিল। এই সময়কালের কাজ থেকেই জন্ম নেয় ওয়ার অ্যান্ড পিস ইন দ্য গালফ বইটি, যার সহ-সম্পাদক ছিলেন বেলা ভাটিয়া, জঁ দ্রেজ এবং ক্যাথি কেলি।
এই অভিজ্ঞতাগুলি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এগুলি প্রমাণ করে যে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের প্রতি তাঁর উদ্বেগ কখনওই নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক ছিল না। দূর থেকে বঞ্চনা পর্যবেক্ষণ না করে, তিনি বারবার সঙ্গে থেকে সেই মানুষদের পরিস্থিতি বুঝে নিতে চেয়েছেন, যাঁদের জীবন তিনি উন্নত করতে চান।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও এই মূল্যবোধেরই প্রতিফলন। তাঁর স্বাধীন গবেষক, লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী স্ত্রী বেলা ভাটিয়ার সঙ্গে তিনি বহু বছর ধরে দিল্লি, এলাহাবাদ এবং ঝাড়খণ্ডে সাদামাটা পরিবেশে বসবাস করেছেন। অর্থনীতিবিদদের নির্লিপ্ত প্রযুক্তিবিদ হিসেবে যে সাধারণ ভাবমূর্তি, তাঁদের জীবনযাত্রা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। জঁ-র পাণ্ডিত্য আর ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যেকার এই সামঞ্জস্য তৃণমূল স্তরের সমাজকর্মীদের কাছে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় কারণ।
উন্নয়ন অর্থনীতিতে অবদান
জঁ দ্রেজের অ্যাকাডেমিক অবদানের পরিসর সুদূরবিস্তৃত— দারিদ্র্য, অসমতা, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, লিঙ্গ-অসাম্য এবং জনসক্রিয়তা— এতগুলি বিষয়ে তাঁর মৌলিক অবদান রয়েছে।
নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা থেকে জন্ম নিয়েছে হাঙ্গার অ্যান্ড পাবলিক অ্যাকশন এবং ইন্ডিয়া: ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেশন-এর মতো উন্নয়ন অর্থনীতির কিছু অমূল্য রচনা, এই ক্ষেত্রে যেগুলির প্রভাব বিপুল। এই রচনাগুলি উন্নয়নের সংকীর্ণ আয়-ভিত্তিক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জনসেবা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং সামাজিক অধিকারের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়ে।

জঁ-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান সম্ভবত এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করা যে, ক্ষুধা ও বঞ্চনা নিছক সম্পদের অভাবের পরিণতি নয়— বরং প্রায়শই এগুলো সরকারি নীতি, শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা থেকে উদ্ভূত হয়। এই অন্তর্দৃষ্টি নীতি-আলোচনাকে নিছক বৃদ্ধি-কেন্দ্রিক কৌশল থেকে মানব-উন্নয়নের একটি বিস্তৃত উপলব্ধির দিকে সরিয়ে নিতে সাহায্য করে।
তাঁর কাজ ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং গণ-সক্রিয়তার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। বহু অর্থনীতিবিদ যখন বাজার-ভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন, তখন দ্রেজ ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে দারিদ্র্য ও অসাম্য মোকাবিলার জন্য কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের কোনও বিকল্প নেই। তাঁর গবেষণা দেখিয়ে দিয়েছে যে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ নিছক কল্যাণমূলক ব্যয় নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি।
ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক অর্থনীতিবিদ: সেন্স অ্যান্ড সলিডারিটি
জঁ কীভাবে অর্থনীতিকে একটি শাস্ত্র হিসেবে দেখেন, তার সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর প্রবন্ধ সঙ্কলন সেন্স অ্যান্ড সলিডারিটি: ঝোলাওয়ালা ইকোনমিক্স ফর এভরিওয়ান (পার্মানেন্ট ব্ল্যাক, ২০১৭)-এ। শিরোনামটির একটি সুনির্দিষ্ট দ্বৈত অর্থ রয়েছে: “ঝোলাওয়ালা”— একটি কাপড়ের ব্যাগ বহনকারী মানুষকে বোঝাতে ভারতীয় কথ্যভাষায় ব্যবহৃত একটি শব্দ, যা প্রায়শই সমাজকর্মী ও এনজিও কর্মীদের তাচ্ছিল্য করতে প্রয়োগ করা হয়। এখানে সচেতনভাবে শব্দটি এমন একটি পরিচয়পত্রের কাছাকাছি রূপে পুনর্নির্মিত হয়েছে, যা এমন অর্থনীতির ধারা ইঙ্গিত করে, যেখানে নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বিশ্লেষণাত্মক কাঠিন্যের বিপরীত শক্তি না ধরে, বরং তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে গণ্য করা হয়।
বইটির মূল বক্তব্য সহজ হলেও অত্যন্ত গভীর— সুস্থ ও অর্থবহ অর্থনীতি চর্চার জন্য বিশ্লেষণধর্মী প্রজ্ঞা (“Sense”)-র সঙ্গে সমানভাবে প্রয়োজন নৈতিক অঙ্গীকার (“Solidarity”)।

সঙ্কলনের সূচনা-প্রবন্ধ, “ইকোনমিক্স অ্যামং রোড স্কলার্স”, দারিদ্র্যের একেবারে নগ্ন রূপের মধ্যে সরাসরি প্রবেশ করে: রাঁচির অনানুষ্ঠানিক কয়লা-খনি শ্রমিকেরা, যাঁরা নিজের হাতে খুঁড়ে আনা কয়লা বহন করে চলেছেন— এমন জমি থেকে, যা একসময় তাঁদেরই ছিল, যেখান থেকে তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। জঁ জর্জ অরওয়েলের ভূগর্ভে অদৃশ্যভাবে শ্রম দেওয়া শ্রমিকদের দ্বারা টিকিয়ে রাখা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের চিত্রকল্প আহ্বান করেছেন, এবং সেই চিত্রকল্পই সুচারুভাবে বাকি পুরো সঙ্কলনটিরই সুর নির্ধারণ করে দেয়।
প্রথাগত টেক্সটবুকের বিপরীতে জঁ-র এই সঙ্কলনটি অর্থনীতিকে একটি বাস্তব-ভিত্তিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে— যে শাস্ত্র কোনও বিমূর্ত মডেলিংয়ের ওপর নয়, বরং দাঁড়িয়ে আছে সরাসরি মাটির অভিজ্ঞতার ওপর। সঙ্কলনের দশটি প্রবন্ধ খরা, ক্ষুধা, স্কুল-পুষ্টি কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু-বিকাশ, কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি, খাদ্যসুরক্ষা, নীতির ওপর কর্পোরেট প্রভাব এবং যুদ্ধ-শান্তির প্রশ্ন— এই বিষয়গুলি জুড়ে বিচরণ করে। পুরো বইয়ে, জঁ ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক গবেষণা এবং পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেছেন: তাঁর সিদ্ধান্তসমূহ নিছক উপাত্তের ওপর নির্মিত নয়, বরং ভারতের সেই অঞ্চলগুলিতে বছরের পর বছর ভ্রমণের ওপর নির্মিত, যেগুলি খুব কমই নীতি-দলিলে জায়গা পায়— চাম্বার পার্বত্য অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রদেশের চম্বল অঞ্চল, কালাহান্ডির অরণ্য এবং বিহারের গ্রামীণ সমতলভূমি পর্যন্ত।
অমর্ত্য সেনের সঙ্গে যৌথভাবে বিকশিত ‘সামর্থ্যভিত্তিক উন্নয়ন’ (Capability Approach)-এর ধারাকে অনুসরণ করে জঁ দ্রেজ ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দেন যে উন্নয়ন কেবল মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)-এর প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। বইটিতে বারবার দেখানো হয়েছে যে পুষ্টি, মানবিক মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং লিঙ্গসমতা— এসব কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফল নয়; বরং এগুলো উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য ও অন্তর্নিহিত উপাদান। সমকালীন অর্থনীতিবিদদের মধ্যে জঁ দ্রেজের মতো নৈতিক অবস্থানে এতটা ধারাবাহিক ও আপসহীন লেখক বিরল। পুরো বইজুড়ে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য কেবল থোক দক্ষতা (aggregate efficiency) দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; বরং সেই নীতির প্রভাব সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আনছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা সত্ত্বেও ন্যায়বিচার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতি তাঁর অটল অঙ্গীকারই বইটিকে একটি অসাধারণ ঐক্য ও সংহতি প্রদান করেছে।
বইটির একটি পুনরাবৃত্ত সূত্র হল নিম্নসীমা দারিদ্র্য রেখা (BPL) শ্রেণিবিভাগকে কল্যাণমুখী লক্ষ্য নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে কার্যকর করার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। জঁ দেখিয়েছেন যতক্ষণ না একটি ভিন্ন যুক্তি উঠে এসেছিল ততক্ষণ কীভাবে সমন্বিত শিশু বিকাশ পরিষেবা এবং জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইনের মতো প্রকল্পগুলো প্রায় কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে BPL-চিহ্নিত পরিবারের জন্য সীমিত হয়ে যাচ্ছিল। ভিন্ন যুক্তিটি এই সহায়তাকে শর্তাধীন দানের পরিবর্তে একটি অধিকার হিসেবে দেখে, কারণ সরকার নিজেই বিশ্বাসযোগ্য BPL তালিকা তৈরি ও তা যুক্তিযুক্ত করতে হিমশিম খেয়েছিল।
বইটি জনপরিসরে কর্পোরেট প্রভাবের প্রশ্নেও সমান তীক্ষ্ণ। জঁ যুক্তি দেন যে ভারতে কর্পোরেট স্বার্থ অর্থনীতির সীমা ছাড়িয়ে নগর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা, গণমাধ্যম এবং বিনোদনের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। চমস্কি “বিজনেস-ড্রিভেন সোসাইটি” বলতে যা বুঝিয়েছিলেন, এই প্রবণতা যেন সেই বক্তব্যেরই একটি দৃষ্টান্ত। রেলওয়ে নিয়ে একটি প্রবন্ধে, জঁ টিকিটধারী যাত্রীদের তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক অভিজ্ঞতাকে রিজার্ভেশন ছাড়া যাত্রা করা মানুষদের অপরিবর্তিত কষ্টের বিপরীতে তুলে ধরেন, এবং এই বৈসাদৃশ্যকে ব্যবহার করেন এই বিস্তৃত বক্তব্য হিসেবে যে ভারতে সুযোগ-সুবিধা প্রায়শই উপার্জিত হওয়ার চেয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আরেকটি প্রবন্ধে স্কুলের রান্না করা খাবার প্যাকেটজাত বিস্কুটে বদলে দেওয়ার একটি সংসদীয় প্রচেষ্টার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় বিস্কুট প্রস্তুতকারকদের তরফে চাপ সৃষ্টিতে— একটি ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা দেখায় বাণিজ্যিক স্বার্থ কত সহজে সবচেয়ে মৌলিক কল্যাণমূলক সুবিধাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এই সঙ্কলনের চিরস্থায়ী গুরুত্ব হল এর অন্তর্নিহিত যুক্তি: প্রমাণ-ভিত্তিক অর্থনীতি কেবল তখনই কার্যকর নীতিতে রূপ নেয়, যখন এটি যাদের সেবা করার দাবি করে সেই সম্প্রদায়গুলির সঙ্গে আসল সম্পৃক্তির মধ্যে দিয়ে পরীক্ষিত ও গঠিত হয়। এটি এমন একটি বিশ্বাস যা শুধু এই একটি বইয়ে নয়, জঁ-র সমগ্র কর্মজীবন জুড়ে বিস্তৃত।
গবেষণা ও কর্মের সংযোগ
জঁ দ্রেজের কর্মজীবনের সংজ্ঞায়ক বৈশিষ্ট্য হল পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার সীমার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে তাঁর অস্বীকৃতি।
বহু অর্থনীতিবিদ প্রভাবশালী গবেষণার জন্ম দেন। কিন্তু সরকারি নীতির বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত হন এমন সংখ্যা অনেক কম। জঁ সেই বিরল গোষ্ঠীর অংশ, যাঁরা এই দুই জগতকে সফলভাবে সংযুক্ত করতে পেরেছেন।
তাঁর কাজ এমন কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে, যাকে “সম্পৃক্ত অর্থনীতি” বলা যেতে পারে— এক ধরনের পাণ্ডিত্য, যা কঠিন প্রায়োগিক বিশ্লেষণকে জনপরিসরের বিতর্ক এবং নীতি-প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের সঙ্গে সম্মিলিত করে। তিনি প্রায়শই দূরবর্তী গ্রামে গিয়েছেন, জনশুনানিতে অংশ নিয়েছেন, তথ্যানুসন্ধান অভিযানের আয়োজন করেছেন এবং নাগরিক সমাজ সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। এই সম্পৃক্তি তাঁকে এমন নীতিগত ব্যর্থতা চিহ্নিত করার সুযোগ দিয়েছে, যা নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের কাছে অন্যথায় অদৃশ্য থেকে যেতে পারত। এটি তাঁকে বাস্তবায়নের জটিলতা সম্পর্কে এমন একটি প্রায়োগিক উপলব্ধিও দিয়েছে, যা নিছক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে প্রায়শই এড়িয়ে যায়।
ভারতের অধিকার-ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্রের স্থপতি
জঁ দ্রেজের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার সম্ভবত ভারতের সামাজিক সুরক্ষায় অধিকার-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে তাঁর ভূমিকা। ১৯৯০-এর দশকে শুরু করে, এবং বিশেষভাবে সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (UPA) সরকারের সময়, তিনি বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী সামাজিক নীতি পরিকল্পনা ও সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যেগুলি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ককে রূপান্তরিত করেছিল।
২০০৫ সালে প্রবর্তিত মহাত্মা গান্ধি জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (MGNREGA)-এ তাঁর অবদান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য, যা কর্মসংস্থানকে একটি প্রদত্ত সুবিধার পরিবর্তে একটি বৈধ অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ২০০৫ সালের তথ্য জানার অধিকার আইনের পেছনের আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, যা সাধারণ নাগরিকদের সরকারি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার বৈধ হাতিয়ার দিয়েছিল। খাদ্যের অধিকার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ২০১৩ সালের জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নে সহায়তা করেছিল, যা ক্ষুধামুক্তিকে নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। তিনি স্কুলে রান্না করা মধ্যাহ্নভোজন কর্মসূচির সার্বজনিকীকরণের একজন শক্তিশালী প্রবক্তাও ছিলেন, বাণিজ্যিক চাপের বিরুদ্ধে যে কর্মসূচিকে রক্ষার বিবরণ সেন্স অ্যান্ড সলিডারিটি-তে রয়েছে। এবং সম্প্রতি তিনি বিকেন্দ্রীকৃত নগর কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ (DUET) প্রকল্পের মতো নগর কর্মসংস্থান গ্যারান্টি প্রস্তাবের পক্ষেও সোচ্চার হয়েছেন।
সমালোচনা ও বিতর্ক
কোনও প্রভাবশালী গণ-ব্যক্তিত্বই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে জঁ দ্রেজের কল্যাণ-অধিকার ও সরকারি কর্মসূচির ওপর জোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাজার-চালিত উন্নয়নের গুরুত্বকে খাটো করে দেয়। অন্য অনেকে মনে করেন বড়মাপের কল্যাণমূলক প্রকল্প রাজস্ব চাপ বা বাস্তবায়ন-জটিলতা সৃষ্টি করে। MGNREGA, উদাহরণস্বরূপ, দুর্নীতি, মজুরি প্রদানে বিলম্ব এবং রাজ্যভেদে অসমান বাস্তবায়নের জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছে; এবং সেন্স অ্যান্ড সলিডারিটি-তে বর্ণিত স্কুল-খাবার নিয়ে চাপ সৃষ্টির ঘটনাটি নিজেই দেখিয়ে দেয় যে, জঁ যে কর্মসূচিগুলি সমর্থন করেছেন, সেগুলো এখনও রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
এসব সত্ত্বেও, অনেক সমালোচকই স্বীকার করেন যে ভারতের জনপরিসরের আলোচনায় দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসায় তাঁর ভূমিকা রয়েছে; আজকের বিতর্কগুলো অন্তর্নিহিত লক্ষ্যের যথার্থতার চেয়ে বাস্তবায়ন প্রশ্নেই বেশি কেন্দ্রীভূত।
GiRA পুরস্কারের তাৎপর্য
২০২৬ সালের গ্লোবাল ইনইক্যুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড অসাম্যের উপলব্ধি এবং মোকাবিলায় জঁ দ্রেজের স্বতন্ত্র অবদানের একটি যথার্থ স্বীকৃতি— যা ভারতে দারিদ্র্য নিয়ে তাঁর কাজ, অধিকার-ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এগিয়ে নেওয়ায় তাঁর ভূমিকা এবং বিপুল পাণ্ডিত্যকে নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক কর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করার তাঁর অসাধারণ সক্ষমতাকে স্বীকার করে— এ ঠিক সেই সমন্বয়, যা সেন্স অ্যান্ড সলিডারিটি-র দশটি প্রবন্ধ জুড়ে প্রদর্শিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি এমন একটি সময়ে আসছে, যখন অসাম্য উন্নয়ন ও গণতন্ত্র নিয়ে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষাপটেই নয়— যেখানে জঁ তাঁর কাজের অধিকাংশ করেছেন— বরং বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ক্ষেত্রে ক্রমশ কেন্দ্রীয় স্থানে উঠে আসছে।
উপসংহার
জঁ দ্রেজ সমকালীন অর্থনীতির জগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব— তিনি একই সঙ্গে একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, গণ-বুদ্ধিজীবী, নীতিনির্ধারণে পরামর্শদাতা, সমাজকর্মী এবং প্রান্তিক স্তরের আন্দোলনের সক্রিয় সহযাত্রী। খুব কম অর্থনীতিবিদই গবেষণা ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে এমন সফল সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পেরেছেন, যেখানে কঠোর অ্যাকাডেমিক গবেষণা রূপ নিয়েছে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রনীতিতে। ভারতের অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার— যার মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধি জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (MGNREGA), তথ্য জানার অধিকার আইন (RTI), জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন (NFSA) এবং বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচির সম্প্রসারণ— পেছনে জঁ দ্রেজের বৌদ্ধিক নেতৃত্বের ছাপ স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত কোনও একটি বই, গবেষণাপত্র বা নীতিগত সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা নিহিত রয়েছে এই সত্য প্রতিষ্ঠায় যে অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ এবং সমাজের প্রতি নৈতিক অঙ্গীকার পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। সমগ্র কর্মজীবন জুড়ে তিনি দেখিয়েছেন, অর্থনীতি কেবল বাজার, প্রবৃদ্ধির হার বা পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেলের অধ্যয়ন নয়; এর চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের সক্ষমতার বিকাশ, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার অবসান এবং প্রত্যেক মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা।
আজ যখন বৈষম্য ক্রমশ বেড়ে চলেছে; কৃষিক্ষেত্রের সংকট অব্যাহত; কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ ভারতীয় জনজীবনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে, তখন জঁ দ্রেজের চিন্তাভাবনা আগের যে-কোনও সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য কেবল মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রবৃদ্ধি বা শেয়ারবাজারের উত্থান-পতন দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং বিচার করতে হবে সেই নীতি সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবন কতটা উন্নত করতে পেরেছে। এই অর্থে, জঁ দ্রেজ কেবল একজন অসামান্য উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ নন; তিনি উন্নয়ন অর্থনীতির নৈতিক বিবেক।
লেখক প্রফেসর, সারে বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাজ্য) এবং জঁ দ্রেজের প্রাক্তন পিএইচডি ছাত্রী


আপনার মতামত...