সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার বাংলার মিড-ডে মিল

মানবেশ সরকার

 


মিড-ডে মিল চালু হওয়ার পর এই প্রকল্প নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। এই প্রকল্প চালু হওয়ার পর শিশুদের স্কুলে ভর্তি হওয়া বা স্কুলে যাওয়া বেড়েছে, এমনটাই গবেষণায় দেখা গিয়েছে। পুষ্টির প্রশ্নে মিড-ডে মিলের প্রভাব কী, এই নিয়ে বিশেষ গবেষণা না থাকলেও কয়েক বছর আগে কর্নাটকের একটি গবেষণা এই প্রশ্নে নজর কেড়েছে। মিড-ডে মিলে নিরামিষ ভোজন নিয়ে বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে থাকা কর্নাটকে ২০২০-২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে এমন দুটি জেলার একটিতে ডিম এবং অন্যটিতে দুধ দেওয়া শুরু হয়। গবেষণায় দেখা যায় ওই দুটি জেলার মধ্যে যেটিতে ডিম দেওয়া হয়েছে সেখানে পড়ুয়াদের পুষ্টিতে বেশি অগ্রগতি হয়েছে

 

এ-যাবৎ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মিড-ডে মিল নিয়ে বিশেষ আলোচনা না থাকলেও, সদ্যগঠিত নতুন সরকারের প্রথম রাজ্য বাজেটে লক্ষ্যণীয়ভাবে এই প্রকল্পের জন্য কিছু ঘোষণা রয়েছে। যার ফলে মিড-ডে মিল প্রকল্প এখন রাজনীতির আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। এই প্রথম এ-রাজ্যে রাজ্য সরকারের নিজস্ব আর্থিক ক্ষমতার উপর নির্ভর করে মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হল। যদিও প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্যই শুধুমাত্র এই বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, তবু প্রাথমিকের পড়ুয়া পিছু দৈনিক ৩.২২ টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই প্রশংসার যোগ্য। ২০০৩ সাল থেকে এ-রাজ্যে রান্না করা খাবার দেওয়া শুরু হলেও এতদিন পর্যন্ত রাজ্যের কোনও সরকারই নিজস্ব রাজকোষের ভরসাতে স্থায়ীভাবে মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি করেনি। উল্লেখনীয় যে, এই বাজেটে রাঁধুনিদের সাম্মানিকও ১০০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তবে এই বাজেট-বক্তৃতাতে, কলকাতা পুর এলাকায় মিড-ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব ‘ইসকন’-এর হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা মিড-ডে মিল নিয়ে রাজ্যে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

মিড-ডে মিলের বরাদ্দ

শিশুদের স্কুলে হাজিরা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টির উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে দেশের সমস্ত সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য ১৯৯৫ সালে মিড-ডে মিল প্রকল্প (বর্তমানে ‘পিএম পোষনের’ অধীন) চালু হলেও, এ-রাজ্যে মিড-ডে মিল দেওয়া শুরু হয় ২০০১ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্কুলের পড়ুয়াদের রান্না করা খাবার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার দু-বছর পর। এর আগে ভারতের বেশ কিছু রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও পড়ুয়াদের রান্না করা খাবার না দিয়ে, শিশুদের প্রাপ্য চাল প্রতি মাসে অভিভাবকদের হাতে দিয়ে দেওয়া হত। রান্না করা খাবার দিতে গেলে রাজ্য সরকারের ঘাড়ে অতিরিক্ত খরচের ‘বোঝা’ চাপবে বলে, রাজ্যগুলি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল। চালের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের উপর ন্যস্ত ছিল। যদিও তামিলনাড়ু বহু আগে থেকেই স্কুলে শিশুদের রান্না করা খাবার দেওয়া শুরু করেছিল।

এখানে বলা দরকার, মিড-ডে মিলের রান্নার খরচ কেন্দ্র ও রাজ্য যুক্তভাবে বহন করলেও (ভারতের মূল ভূখণ্ডের রাজ্যগুলিতে ৬০:৪০ অনুপাতে), এই প্রকল্পে শুরু থেকেই পড়ুয়া-পিছু রান্নার খরচের দৈনিক বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত কম— কেন্দ্রের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিকে পড়ুয়া-পিছু ৬.৭৮ টাকা এবং উচ্চ-প্রাথমিকে পড়ুয়া-পিছু ১০.১৭ টাকা। এই বরাদ্দ থেকে ডাল, তেল, নুন, মশলা বা সব্জিই শুধু নয়, জ্বালানির ব্যবস্থাও করতে হয়। ফলে এই দুর্মূল্যের বাজারে ডিম তো দূরের কথা, মিড-ডে মিলের খাদ্যগুণ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের সাধারণ নির্দেশিকাটুকুও মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। মিড-ডে মিলের সমীক্ষার কাজে অতীতে যখনই কোনও স্কুলে গিয়েছি, তখনই শিক্ষক-শিক্ষিকারা বা রাঁধুনিরা বরাদ্দের এই সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। এই সমস্যার সমাধানে, কোনও কোনও স্কুলের উদ্যোগী শিক্ষক-শিক্ষিকারা গুণমানের খাবার দেওয়ার তাগিদে মানুষের সহযোগিতায় স্কুলপ্রাঙ্গণে সব্জিচাষের মতো সৃজনশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, সর্বত্র তা সম্ভব হয় না। ফলে, যেসব শিশুর বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার বা বাড়ি থেকে খাবার আনার সুযোগ থাকে, তারা মিড-ডে মিল খায় না। উল্টোদিকে, যেসব প্রান্তিক শিশুর মিড-ডে মিল না খেলে স্কুলে খালি পেটেই থাকতে হবে, তারা নিম্নমানের খাবারও সাগ্রহে খেয়ে নেয়। আর এখানেই দু-দুটো দশক পার হওয়ার পরও মিড-ডে মিলের দৈনিক বরাদ্দ বাজারমূল্যের হিসাবে কম থাকার কারণ লুকিয়ে রয়েছে। সমাজে যাদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী সেই সমস্ত তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল ঘরের শিশুরা মিড-ডে মিল থেকে দূরে থাকায়, রান্নার খরচের দৈনিক বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের উপর সে চাপ পড়ে না, যা অন্য অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হয়। বরং অবস্থাপন্ন মানুষেরা একসময় এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। স্কুলপ্রাঙ্গণে রান্না-খাওয়াতে পড়াশুনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে— এটাই ছিল তাঁদের সাধারণ অভিযোগ।

 

প্রান্তিক শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য মিড-ডে মিল

মিড-ডে মিল চালু হওয়ার পর এই প্রকল্প নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। কোনও গবেষণাতেই মিড-ডে মিলের জন্য পড়াশুনায় ব্যঘাত ঘটছে, এমন পর্যবেক্ষণের কথা শোনা যায়নি। বরং এই প্রকল্প চালু হওয়ার পর শিশুদের স্কুলে ভর্তি হওয়া বা স্কুলে যাওয়া বেড়েছে, এমনটাই গবেষণায় দেখা গিয়েছে। পুষ্টির প্রশ্নে মিড-ডে মিলের প্রভাব কী, এই নিয়ে বিশেষ গবেষণা না থাকলেও কয়েক বছর আগে কর্নাটকের একটি গবেষণা এই প্রশ্নে নজর কেড়েছে। মিড-ডে মিলে নিরামিষ ভোজন নিয়ে বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে থাকা কর্নাটকে ২০২০-২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে এমন দুটি জেলার একটিতে ডিম এবং অন্যটিতে দুধ দেওয়া শুরু হয়। গবেষণায় দেখা যায় ওই দুটি জেলার মধ্যে যেটিতে ডিম দেওয়া হয়েছে সেখানে পড়ুয়াদের পুষ্টিতে বেশি অগ্রগতি হয়েছে।

সুতরাং প্রান্তিক শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য গুণমানের মিড-ডে মিলের প্রয়োজনীয়তা একটি প্রশ্নাতীত বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্রের তরফে বরাদ্দের প্রশ্নে যথোচিত মনোযোগের অভাবে গুণমানের মিড-ডে মিলের সমস্যা থেকেই গিয়েছে। মিড-ডে মিলে গুণমানের খাবার দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কখনওই বরাদ্দ নিয়ে বিশেষ ভাবেনি। মিড-ডে মিলের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার গত বছর পড়ুয়া-পিছু প্রাথমিকের জন্য দৈনিক মাত্র ৫৯ পয়সা এবং উচ্চ-প্রাথমিকের জন্য পড়ুয়া-পিছু দৈনিক মাত্র ৮৮ পয়সা বাড়িয়েছিল। রাজ্যস্তরেও গত দু-দশকে যে দলই এ-রাজ্যে ক্ষমতায় থাকুক না কেন, মিড-ডে মিলের জন্য রাজ্যের ভাগের ৪০ শতাংশের অতিরিক্ত খরচা করতে চায়নি। বিগত সরকার একবার মিড-ডে মিলের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা ঘোষণা করলেও, তা শুধুমাত্র চার মাসের জন্যই চালু করা হয়েছিল। মিড-ডে মিল নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের এরকম ভূমিকার প্রেক্ষাপটে, বর্তমান সরকারের অতিরিক্ত বরাদ্দের সিদ্ধান্ত, শুধুমাত্র প্রাথমিকের শিশুদের জন্য হলেও অভিনন্দনযোগ্য। আমরা আশা করব ভবিষ্যতে উচ্চ-প্রাথমিকের ক্ষেত্রেও সরকার একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 

মিড-ডে মিল ও ইসকন

কিন্তু, সরকার ইসকনকে কলকাতায় মিড-ডে মিল সরাবরাহের দায়িত্ব দেওয়ায় এই অতিরিক্ত বরাদ্দ কলকাতায় মিড-ডে মিলের গুণমান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ইসকনের ধর্মীয় আচার অনুযায়ী, তারা আমিষ খাবার সরাবরাহ করতে পারে না। তাই, ইসকনকে কলকাতায় মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়ায় কলকাতার শিশুরা মিড-ডে মিলে ডিম খাওয়ার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হবে। এই শহরের প্রান্তিক শিশুরাই এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মিড-ডে মিলে পাকাপাকিভাবে এভাবে ডিম বন্ধ করার ব্যবস্থা, শিশুর পুষ্টির জন্য নিশ্চিতভাবেই কোনও ভালো খবর নয়। পুষ্টি-বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত যে, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন মানুষের শরীরে প্রাণীজ প্রোটিনের প্রয়োজন মেটাতে পারে না। অথচ, সস্তায় প্রাণীজ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ডিমের কোনও বিকল্প নেই। কর্নাটকে মিড-ডে মিলে ডিম প্রচলনের ফলে শিশুর পুষ্টির উন্নতির কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনের হাতে থাকার অর্থ যে শুধুমাত্র ডিম বন্ধ হওয়া তা নয়, পেঁয়াজ-রসুনের ব্যবহারও বন্ধ হওয়া। কারণ, ইসকনের ধর্মীয় আচারে পেঁয়াজ-রসুনকেও আমিষ হিসাবেই গণ্য করা হয়। ফলে, ইসকনের সরবরাহ করা মিড-ডে মিল বেশিরভাগ শিশুরই খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করবে, যা শেষ পর্যন্ত শিশুদের অনেককেই মিড-ডে মিলে অনাগ্রহী করে তুলবে। অথচ, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন, “কলকাতা পুরসভার অন্তর্গত স্কুলগুলিতে ইসকনের মাধ্যমে মিড-ডে মিল চালানো একটা পাইলট বা পরীক্ষামূলক প্রজেক্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি দেখা যায় এটি সফল হল, তা হলে আরও বিভিন্ন জায়গায় এর প্রয়োগ করা যায় কি না সেটা ভবিষ্যতে দেখা হবে।” সুতরাং স্কুলশিক্ষা মন্ত্রীর কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, পশ্চিমবঙ্গে আরও অনেক শিশুর জন্যই মিড-ডে মিলে নিরামিষ খাবার অপেক্ষা করছে।

মিড-ডে মিল সরাবরাহের ক্ষেত্রে ইসকনের দুর্নীতি ও অনিয়মের কথাও বর্তমানে আলাপ-আলোচনায় উঠে আসছে। ইসকনের বিরুদ্ধে মিড-ডে মিলে অনিয়মের প্রথম অভিযোগ ওঠে ২০১৫ সালে ‘সিএজি’-র একটি রিপোর্টে। মিড-ডে মিল নিয়ে ‘সিএজি’-র ওই রিপোর্টে বলা হয়, মহারাষ্ট্রে ইসকনকে মিড-ডে মিলের রান্নার খরচ বাবদ ২০১০-১৪-তে তাঁদের প্রাপ্য টাকার তুলনায় ১১.৬৭ কোটি টাকা বেশি দেওয়া হয়েছে। ওই রিপোর্টেই বলা হয়, কর্নাটকের বেলারি জেলায় ইসকন সরকারি নিয়মের তুলনায় কম চাল দিয়ে মিড-ডে মিলের রান্না করেছে। ইসকন প্রতিষ্ঠিত ‘অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন’-এর ইন্ডিপেন্ডেন্ট ট্রাস্টিরাও ২০২০ সালে ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। ইসকন প্রতিষ্ঠিত এই অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশনই দেশের বিভিন্ন জায়গায় মিড-ডে মিল সরাবরাহের কাজ করে এবং বর্তমানে এই ফাউন্ডেশন দেশের ১৬টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রায় ২৩ লক্ষ শিশুকে মিড-ডে মিল সরাবরাহ করছে। এখানে উল্লেখনীয় যে, ফাউন্ডেশনের ওই ইন্ডিপেন্ডেন্ট ট্রাস্টিরা সকলেই ছিলেন কর্পোরেট জগতের বড় বড় মাথা।

 

মিড-ডে মিল ও কলকাতার বিশেষত্ব

কলকাতায় ইসকনের মিড-ডে মিল সরাবরাহ নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে এই শহরে মিড-ডে মিলের প্রসার কীভাবে হয়েছিল তা বলা জরুরি। রাজ্যে ২০০৩ সালে মিড-ডে মিল চালু হলেও, কলকাতায় ২০১১ সালের আগে পর্যন্ত মিড-ডে মিল চালু করার ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ছিল না। ২০০৯ সালেও দেখা গিয়েছে, কলকাতায় দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল দেওয়া হয় না। উচ্চ-প্রাথমিকের তখন এমন একটি বিদ্যালয়ও ছিল না যেখানে মিড-ডে মিল দেওয়া হয়। কলকাতার বহু স্কুলেই রান্না করার জায়গা না থাকার ফলে এই শহরে মিড-ডে মিল চালু করা এক বড় সমস্যা ছিল। তবে ‘সেন্ট্রাল কিচেন’-এর ধারণাকে সামনে রেখে সমাধানের পথ খোঁজা শুরু হয়ে গিয়েছিল। রান্না করার জায়গা আছে এমন স্কুলে মিড-ডে মিল তৈরি করে, আশেপাশের স্কুলগুলিতে খাবার সরবরাহ করার কাজ ২০১১ সালের আগেই শুরু হয়েছিল। স্কুলপ্রাঙ্গণে অবস্থিত সেন্ট্রাল কিচেনে রান্না করে স্কুলে স্কুলে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন ‘নেবারহুড কমিটি’কে, যা মহিলাদের সেলফ হেল্প গ্রুপের শহুরে সংস্করণ ছিল।

২০১১ সালে কলকাতার সমস্ত সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে মিড-ডে মিল চালু করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পর, লক্ষ্যণীয়ভাবে বহু এনজিও সেন্ট্রাল কিচেন ব্যবস্থার মাধ্যমে মিড-ডে মিল সরাবরাহের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসে। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতার বেশিরভাগ স্কুলে মিড-ডে মিল চালু হয়ে যায় এবং ২০১৬ সালের মধ্যে তা সর্বজনীন হয়ে পড়ে। প্রতীচীর ২০১৬ সালের নমুনা সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে, কলকাতার ৬০ শতাংশ স্কুলে এনজিও-রাই মিড-ডে মিল সরবরাহ করছে। এখানে বলে রাখা ভালো যে এই এনজিও-গুলির অন্যতম ছিল ‘ইসকন ফুড রিলিফ ফাউন্ডেশন’। সুতরাং মিড-ডে মিল সরবরাহের কাজে ইসকন কলকাতায় মোটেই নতুন নয়। তারা গত দশকেই কলকাতায় তাদের পরিষেবা শুরু করে দিয়েছিল। তবে অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশনের নামে নয়, ইসকন ফুড রিলিফ ফাউন্ডেশনের নামে। অন্যদিকে, যে নেবারহুড কমিটিকে দিয়ে কলকাতায় সেন্ট্রাল কিচেন ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছিল, ওই সমীক্ষায় কলকাতার ৩২ শতাংশ স্কুলে তাদের মিড-ডে মিল সরবরাহ করতে দেখা যায়। অর্থাৎ কলকাতায় মিড-ডে মিল সরবরাহের কাজে তারা রাষ্ট্রের একমাত্র পার্টনার থেকে জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়। সব মিলিয়ে কলকাতার ৯২ শতাংশ স্কুলে সে-সময় সেন্ট্রাল কিচেন থেকে মিড-ডে মিল সরাবরাহ করা হচ্ছিল (সেন্ট্রাল কিচেনগুলি যে সব স্কুলপ্রাঙ্গণের মধ্যেই অবস্থিত ছিল এমনটা নয়)। বাকি স্কুলগুলিতে স্কুলভিত্তিক রাঁধুনি নিয়োগ করে মিড-ডে মিল দেওয়া হচ্ছিল। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, নেবারহুড কমিটি বা স্কুলভিত্তিক রাঁধুনিদের ক্ষেত্রে রান্নার কাজে নিযুক্ত সকলে মহিলা হলেও, এনজিও-দের ক্ষেত্রে তা সবসময় সত্য ছিল না। ফলে মিড-ডে মিল প্রকল্পে মহিলাদের সীমিত মাত্রায় হলেও রোজগারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, এনজিও-দের অংশগ্রহণে কলকাতায় তা কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়।

কলকাতায় মিড-ডে মিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল যে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় এখানে পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলে অংশগ্রহণ কম। গ্রামাঞ্চলে যেখানে স্কুলে উপস্থিত পড়ুয়াদের প্রায় সকলেই মিড-ডে মিল খায়, কলকাতায় সেখানে, বিশেষত উচ্চ-প্রাথমিকের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে, এই হার বেশ কিছুটা কম। উচ্চ-প্রাথমিকের কিছু কিছু স্কুলে অর্ধেকেরও বেশি পড়ুয়া মিড-ডে মিল খায় না। অথচ, অবস্থাপন্ন ঘরের শিশুরা বর্তমানে প্রাইভেট স্কুলে বেশি ভর্তি হয় বলে, কলকাতার সরকারি বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলি কার্যত প্রান্তিকদেরই স্কুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও সেখানে বেশ কিছু পড়ুয়া মিড-ডে মিল না খাওয়ার একটাই অর্থ যে, গুণমানের মিড-ডে মিল না হলে কলকাতায় প্রান্তিক শিশুদেরও একটা অংশ স্কুলের খাবার খেতে রাজি নয়। এটা আরও বেশি ভালো বোঝা যায় মিড-ডে মিলের মেনুতে ডিম থাকলে পড়ুয়াদের বেশি অংশগ্রহণ দেখে। গ্রামাঞ্চলে ডিম দেওয়ার দিন পড়ুয়াদের মিড-ডে মিল খাওয়ার আগ্রহ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু তাতে পড়ুয়াদের অংশগ্রহণে বিশেষ তারতম্য হয় না, কারণ গ্রামাঞ্চলে প্রায় সকলেই প্রতিদিন মিড-ডে মিল খায়। কিন্তু কলকাতায় ডিম দেওয়ার দিন, অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি সংখ্যক পড়ুয়া মিড-ডে মিল খায়। ফলে শিশুর খাদ্যাভ্যাসের বিপরীতে পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া ইসকনের নিরামিষ মিল পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলে অংশগ্রহণে কী পরিণতি নিয়ে আসতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

 

রাষ্ট্র আজ কতটা কল্যাণকামী

একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসাবে ভারত রাষ্ট্র বহু সীমাবদ্ধতা নিয়েও ১৯৯৫ সালে সারা দেশে মিড-ডে মিল প্রকল্প চালু করে। কিন্তু বর্তমান সরকার কলকাতায় ইসকনকে মিড-ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব দিয়ে, শুধু যে শিশুর খাদ্যাভ্যাসের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে বা তাদের প্রাণীজ প্রোটিন-সমৃদ্ধ মিড-ডে মিল পাওয়ার অধিকারকে হরণ করছে, তাই নয়; বরং তা শেষ বিচারে শিশুর স্কুলে হাজিরা ও পুষ্টির উন্নতির মতো মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যগুলিকেও চ্যালেঞ্জ করছে। রাজ্যের বর্তমান শাসকের ইসকনকে মিড-ডে মিল সরাবরাহের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত, বিগত সরকারের খারাপ দৃষ্টান্তকে গ্রহণ করেছে। অথচ, বিগত সরকারের চার মাসের জন্য চালু করা অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রাণীজ প্রোটিন দেওয়ার জন্যই ব্যবহার করার সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করেনি। বর্তমান সরকার নেবারহুড কমিটির মতো মহিলাদের ক্ষমতায়নের সংস্থাগুলিকে কলকাতায় মিড-ডে মিল সরাবরাহের দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে, মহিলাদের রোজগারের সামান্য সুযোগকেও তাঁদের হাত থেকে কেঁড়ে নিচ্ছে। এটা মিড-ডে মিল প্রকল্পের অন্যতম সুফলকে অস্বীকার করারই সমান। এক্ষেত্রেও তারা বিগত সরকারের এনজিও-দের উপর জোর দেওয়ার দৃষ্টান্ত থেকেই শিক্ষা নিয়ে মিড-ডে মিল সরাবরাহের পুরো দায়িত্বটা ইসকনের উপর ছেড়ে দিতে চাইছে। কিন্তু সরকার মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি বা রাঁধুনিদের সাম্মানিক বাড়ানোর মতো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েও, ইসকনের মতো সংস্থাকে মিড-ডে মিল সরাবরাহের দায়িত্ব কেন দিল, তা ভেবে দেখা দরকার। এই পদক্ষেপ কি তাহলে ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে সকলের উপর হিন্দুত্বের সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা? বাংলায় হিন্দুত্বকরণের প্রক্রিয়ায় কি তবে প্রান্তিক শিশুদের খিদের অসহায়তাকেও কাজে লাগানো হচ্ছে? বর্তমান বাংলায় বাস করতে গেলে সব ধর্মের মানুষকেই হিন্দুত্বের কাছে মাথা নত করে থাকতে হবে, এই বার্তা দিতে কি মিড-ডে মিল প্রকল্পকেও বেছে নেওয়া হল? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই হয়তো হ্যাঁ-বাচক। তাহলে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুত্বকে সামনে রেখে শাসিতকে পদানত করে রাখার রাজনীতি শিশুদেরকেও বাদ দিচ্ছে না। বাংলার ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগিয়ে চলেছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ আছে বৈকি।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. ইসকন ফুড রিলিফ ফাউন্ডেশন ২০১৬ থেকে যে খাবার সরবরাহ করে তার কি সম্পূর্ণ আমিষ বর্জিত? সেই সময়ের কোনো তথ্য বা রিপোর্ট আছে কি?

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.