সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজভাবনার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। যে পান্ডবনি উপস্থাপনের জন্য তিজনকে একসময় সামাজিক বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল, সেই রক্ষণশীলতায় বদল এসেছে ১৯৮০ সালের পর থেকেই। এই পরিবর্তনের পেছনে তিজন বাইয়ের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর একরোখা অদম্য লড়াইয়ের ফলেই হয়তো এই বদল সম্ভবপর হয়েছিল একটু একটু করে। একচেটিয়া পুরুষ-আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিজন ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি, এক হার-না-মানা সংগ্রামের প্রতীক
এটা ২০০০ সালের কিছু আগের ঘটনা। মধ্যপ্রদেশ রাজ্যকে ভেঙে তখনও অধুনা ছত্তিশগড় রাজ্যের আনুষ্ঠানিক স্থাপনার কথা সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে লোকজনের মন ও মানসিকতা তার মধ্যেই বিভাজিত হয়ে গেছে। নতুন রাজ্যের রাজধানী হিসেবে রায়পুর শহরের অঙ্গসজ্জার কাজ চলছে জোরকদমে। মানুষজনের মধ্যে সে এক চরম উন্মাদনার পর্ব। সামনেই দেওয়ালি উৎসব, তারই উদযাপন উপলক্ষে বাড়ির সামনের সুবিশাল ময়দানে বিশাল মেলা বসেছে ভাবী প্রশাসনের উদ্যোগে। সে এক এলাহি ব্যাপার। সন্ধের জো কেটে গেছে খানিক আগে। বাড়ির সবাই মিলে হাজির হলাম মেলাপ্রাঙ্গণে।
মেলার বিশাল সাংস্কৃতিক মঞ্চে তখন ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশের লোকশিল্পীরা বিখ্যাত পন্থি নৃত্য পরিবেশন করছেন। একসঙ্গে প্রায় জনা বিশেক নর্তক। নৃত্যে পুরুষালি বীররসের দাপট অনেকটা আমাদের বাংলার রায়বেশে নৃত্যের চলন যেন। সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে রকমারি পসরায় ভরপুর বিপণিবিতানে পা বাড়াই। কিছুসময় মেলার এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতেই লোকজনদের মধ্যে একধরনের ব্যস্ততা লক্ষ করি, সবাই যেন নতুন করে ছুটছেন সাংস্কৃতিক মঞ্চের দিকে। মাইকে ভেসে আসে ঘোষণা— তিজন বাই আ রহি হ্যায়। আইয়ে আইয়ে পান্ডবনি কি মজা লিজিয়ে। দোকানের পসরা সরিয়ে রেখে হাজির হলাম সেই মঞ্চের কাছে। সেখানে তখন ভিড়ে ভিড়াক্কার। তিল ঠাঁই আর নাহিরে।
তিজন বাই চলে গেলেন। তিনি ছিলেন পান্ডবনি লোকনাট্যের সবচেয়ে জোরালো অভিনেত্রী। ছত্তিশগড়-মধ্যপ্রদেশের এই সুপ্রাচীন লোকনাট্যের হাত ধরে তিজন গুটিগুটি পায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়, পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক স্তরের স্বীকৃতি। অথচ সম্মানের এমন বিপুল প্লাবন কখনওই তাঁকে তাঁর গভীর লোকজীবনের শিকড় থেকে বিছিন্ন করতে পারেনি। মাথা আকাশ স্পর্শ করলেও তাঁর হৃদয় পূর্ণ ছিল নিজের গ্রামের প্রতি গভীর ভালোবাসায়, পা দুটো বাঁধা ছিল দুর্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাটিতেই। সাফল্যের গরিমা তাঁকে কখনও নিজের জীবনের একান্ত অনুভব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর গত রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬, অনন্তলোকের পথে যাত্রা করলেন তিনি। রেখে গেলেন এক নাট্যমুখর জীবনের অগণিত স্মৃতি ও অসংখ্য গুণমুগ্ধ শ্রোতা দর্শকদের।

দুর্গ জেলার এক অতি সাধারণ মঞ্চে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিজনের প্রথম পান্ডবনি নাট্য উপস্থাপন। প্রথম মঞ্চায়ন খুব স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সেখানেই তিজন পান্ডবনিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অন্য উচ্চতায়। ওই নাবালিকা বয়েসেই। উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে রীতিমতো সাড়া পড়ে গিয়েছিল— “ইয়ে লড়কি মে দম হ্যায়। পান্ডবনিকে নতুন মাত্রা দেবে এই বালিকা, দুর্গ কি নয়ি দুর্গা।” এক পুরুষ-দাপিত সমাজে এক উপেক্ষিত আদিবাসী বালিকার সেই প্রথম আত্মপ্রকাশ।
পান্ডবনি মধ্যভারতের এক প্রাচীন লোকনাটক, মহাভারতের কাহিনি যার উপজীব্য। এই লোকধারাটি কতটা প্রাচীন তা বোধহয় নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এক সাক্ষাৎকারে তিজন জানিয়েছিলেন সম্ভবত মহাভারতের সময় থেকেই পান্ডবনির অভিনয় শুরু হয়েছিল। পান্ডবনি হল মহাভারতের কাহিনি-আশ্রিত লোকগান ও লোকনাট্যের এক যুগল সম্মিলন। মাত্র একজন কুশীলব কাহিনির অন্তর্গত সমস্ত চরিত্রের রূপায়ণ করেন। মূল কাহিনির উপস্থাপনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে সামান্য কিছু যন্ত্রানুষঙ্গের সাহায্য নেওয়া হয় বটে, তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে অভিনেতা বা অভিনেত্রীর অভিনয়দক্ষতা, বাচনভঙ্গি, ঋজু পরিবেশনই পান্ডবনিতে প্রধান হয়ে ওঠে। অভিনেতা বা অভিনেত্রীর হাতে থাকা তম্বুরা বা তানপুরা এখানে খুব বড় ভূমিকা নেয়। ওই একান্ত দেশজ তারযন্ত্রটিই হল নাটকের অভিনেতা বা অভিনেত্রীর একমাত্র সহায়ক উপকরণ। অভিনয়ের সময় ওই তম্বুরাই কখনও হয়ে ওঠে অর্জুনের গাণ্ডীব ধনু, কখনও-বা মধ্যমপাণ্ডবের হাতের গদা, কখনও-বা শ্রীকৃষ্ণের মুরলী। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে শরীরের বিচিত্র অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের আশ্চর্য প্রক্ষেপণ-কুশলতা। তিজন বাই এই লোকনাটকের অভিনয়ের সমস্ত ক্ষেত্রেই অসামান্য পারঙ্গমা ছিলেন। আর তাই তাঁর খ্যাতিতে ভর করে পান্ডবনি হয়ে উঠেছিল মনোরঞ্জনের এক আশ্চর্য উপস্থাপন।
রায়পুরের মঞ্চে সেদিন ছিল কীচক বধ পালা। যদিও সকলেরই জানা কাহিনি তবুও একটু ধরিয়ে দিই এর পটভূমির অংশটি। বারো বছর বনবাসে কাটিয়ে অজ্ঞাতবাসে থাকার সময় দ্রৌপদী-সহ পঞ্চপাণ্ডব বিরাট রাজার আশ্রয়ে আশ্রিত হিসেবে ছিলেন। সেখানে পাঞ্চালি দ্রৌপদীর ওপর বিরাট রাজার শ্যালক দুরাত্মা কীচকের কুনজর পড়ে। এ-কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ভীম। দুরাত্মা কীচক সৈরিন্ধ্রীবেশী দ্রৌপদীর কক্ষে প্রবেশ করে গভীর রাতে। সেখানে আগে থেকেই ছদ্মবেশে অপেক্ষা করছিলেন মহাবলী ভীম। তিনি কীচককে হত্যা করেন। পাপীর বিনাশ হয়।
এই কাহিনির ওপর নির্মিত হয়েছিল সেদিনের পান্ডবনির অভিনয়-আখ্যান। মঞ্চের ওপর তখন তিজন-ঝড় চলছে। কখনও দ্রৌপদীর অসহায়তা, ভীতি; আবার কখনও কীচকের লাম্পট্য, লোভ, কামাতুর দুরাত্মার ছলনা; পরক্ষণেই ভীমের ক্রোধ, পরাক্রম, পুরুষালি বীররসের অভিব্যক্তি— সবকিছুই বারংবার নিখুঁতভাবে ফুটে ফুটে উঠছিল তিজন বাইয়ের অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে। সারা মঞ্চ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিজন। হাতের তম্বুরা তাঁর অভিনেত্রীসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করছিল। দাপুটে অভিনয়ের জন্য অনুষ্ঠানস্থল মুখরিত হচ্ছে হাজারো মানুষের করতালিতে। সেদিন আমিও সামিল হয়েছিলাম। এই স্মৃতি ভুলবার নয়। আমিও ভুলিনি। আজ তাঁর চলে যাওয়ার কথা শুনে প্রায় তিন দশক আগের রায়পুরের সেই মুহূর্তের কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

১৯৫৬ সালের ২৪ এপ্রিল ভিলাই থেকে কিছুদূরের নিলগতর গনিয়ারি গ্রামের এক পাদ্রি সম্প্রদায়ভুক্ত তফসিলি জনজাতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিজন। বাবা চুনুক লাল ও মা সুখবতী দেবী। তিজন ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠা সন্তান। বাড়ির আবহাওয়ায় পান্ডবনির ধারা বহমান ছিল। তাই খুব ছোটবেলা থেকেই একটু একটু করে মানসিকভাবে নিজেকে তৈরি করেছিলেন তিনি। পাদ্রি সমাজের রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক আবহে মহিলাদের নিজেদের ইচ্ছামতো স্বাধীনভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সেকালে ছিল না। অথচ তিজন সেই নিষেধের বেড়া ভেঙে নিজেকে মেলে ধরতে উন্মুখ ছিলেন। পান্ডবনি করার অপরাধে একসময় তাঁকে সমাজচ্যুত করা হয়। কিন্তু তিনি দমে যাননি। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিজনের বিবাহ হয়, যদিও প্রথম স্বামীর সঙ্গে তাঁর দাম্পত্যজীবন মোটেই সুখকর হয়নি। পরবর্তী সময়ে তিনি টুক্কারামকে বিবাহ করেন।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজভাবনার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। যে পান্ডবনি উপস্থাপনের জন্য তিজনকে একসময় সামাজিক বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল, সেই রক্ষণশীলতায় বদল এসেছে ১৯৮০ সালের পর থেকেই। এই পরিবর্তনের পেছনে তিজন বাইয়ের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর একরোখা অদম্য লড়াইয়ের ফলেই হয়তো এই বদল সম্ভবপর হয়েছিল একটু একটু করে। একচেটিয়া পুরুষ-আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিজন ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি, এক হার-না-মানা সংগ্রামের প্রতীক। তাঁকে প্রণাম।


আপনি সৌভাগ্যবান বলতে হবে।
তিজন ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। লোক গানের শিল্পী হয়েও তিনি নিজের যোগ্যতায় পান্ডবনিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায়। জীবনভর লড়াই করে গেছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অনিয়মের বিরুদ্ধে। তাই তাঁর চলে যাওয়া এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করলো। লেখক একটা ভালো কাজ করলেন তাঁকে স্মরণ করে।
তিজন বাঈ এবং পান্ডবনি লোকনাট্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারলাম এই প্রাঞ্জল বিবরণ থেকে। লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ।
Jeney shomriddho holam. Tijon Bai er atma Shanti pak, ei kamona kori. Oshadharon lekha!