অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
তবুও যা মনে থাকবে— ইরানের প্রতিবাদ, প্যালেস্তাইনের জন্য প্রতিবাদ, প্যাট্রিস লুমুম্বার জন্য প্রতিবাদ— এবারের বিশ্বকাপ চলাকালীন জনতার সমর্থনে এমনই প্রতিটি প্রতিবাদ চলমান মানবেতিহাসের পাতায় একইভাবে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকল
বিরাট এক মহাদেশ, আফ্রিকা। সেই আফ্রিকা মহাদেশের মোট দশটি দেশ এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। গ্রুপ লিগ থেকেই ছিটকে যায় তিউনিশিয়া। বাকি নয়টি দেশ নক-আউট পর্বের প্রথম ধাপে জায়গা করে নেয়। যদিও, সেই ধাপ থেকেই ক্রমশ ছিটকে যায় আরও সাতটি দেশ। এরপর আফ্রিকার শেষ দুই প্রতিনিধি হিসেবে মিশর ও মরক্কো প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইতে অংশগ্রহণ করে। পরাক্রমশালী আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে দীর্ঘক্ষণ এগিয়ে থেকেও শেষমেশ মিশরের পরাজয় ঘটে। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে শেষাবধি মরক্কোরও প্রতিরোধ ভাঙে। তবু এরই মধ্যে পৃথিবী দেখে নেয় কেপ ভার্দের রূপকথা। ব্রিটিশ সিংহের বিরুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর লড়াই…
এভাবে লিখলেই কেমন যেন ক্লান্তি বোধ হয়। অশেষ বিরক্তির ভাব জাগে। অন্তঃসারশূন্য এক গতানুগতিকতা। তারই সঙ্গে মনে পড়ে আগন্তুক ছবিতে মনমোহন মিত্রের সেই কালজয়ী সংলাপ, “বাঙালির অতিপ্রিয় শব্দ— স্ট্রাগল!” আমরা চিরকালের রোম্যান্টিকতাপ্রবণ জাত। অথবা বিভূতিভূষণের অপুর কথাও আমাদের ভাবনায় ভেসে ওঠে। পরাজিত নায়কের প্রতি, যেমন কর্ণ; যেমন রামায়ণের মেঘনাদ ওরফে ইন্দ্রজিৎ, এহেন চরিত্রের প্রতিই আমাদের অন্তরের আকর্ষণ চিরকালীন। কমেডির চেয়েও ট্র্যাজেডির রসেই মানুষ তলিয়ে ডুবতে চায়। সূক্ষ্ম প্রকৌশলে বিশ্বগ্রাসী ধনতন্ত্রের নির্মাতারাও কি আদতে তেমন প্রবৃত্তিরই রকমে-সকমে ফায়দা তুলতে চায়? এইবারে বোধহয় বিষয়টা কনস্পিরেসি-থিওরিস্টের মতো শোনায়।
বরঞ্চ কিঞ্চিৎ ইতিহাস ফিরে দেখি চলুন। ২০১৮-য় ফুটবল-রাজপুত্র দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “দেখবে, ২০২৬ বিশ্বকাপে ওরা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) দুইয়ের বদলে চারটি অর্ধে খেলা পরিচালনা করবে। ফুটবলের প্রতি আবার ওদের কোনও আবেগ আছে নাকি? চার-অর্ধে খেলা ভেঙে ওরা আরও বেশি বাণিজ্যিক প্রচার করবে। বিজ্ঞাপন থেকে টাকা তুলবে!”[1] তাৎপর্যপূর্ণভাবে এবারের বিশ্বকাপেই প্রথম ফিফার তরফে হাইড্রেশন ব্রেক অথবা জলপানের বিরতি চালু করা হল। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে আয়োজিত পূর্ববর্তী কাতার বিশ্বকাপেও এমন কোনও নিয়ম প্রচলিত ছিল না। মনে রাখতে হবে সে-দেশের পারিপার্শ্বিক স্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে কাতার বিশ্বকাপের আয়োজন সেবারে এতটাই সংকটের মুখে পড়েছিল, গতানুগতিক সময়সূচি বদলে শেষাবধি সেবারের প্রতিযোগিতাকে জুন-জুলাই মাসের বদলে ডিসেম্বর মাসে নিয়ে যেতে হয়। এবারের বিশ্বকাপে চালু হওয়া নতুন এই হাইড্রেশন ব্রেকের পদ্ধতি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক উঠতে শুরু করেছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ফিফার নতুন গাইডলাইনের কারণে অভাবনীয় আকারে ম্যাচগুলি দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ সামনে এসেছে। ওয়াকিবহাল মানুষেরা জানেন অতিরিক্ত সময় বাড়লে অনেক সময়েই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ফয়সালা এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের অভিমুখে অনায়াসেই পালটিয়ে যায়। সে-ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও যেমন ‘তাদের তরফে আরও পেশাদারিত্বের প্রয়োজন’ এ-কথা বলা যায়, তেমনই পছন্দের দলকে ‘টেনে খেলানো’র ক্ষেত্রেও এই নিয়মের অপপ্রয়োগ সম্ভব। ইতিউতি তেমন প্রশ্নও উঁকি মারছে বৈকি।
কেউ কেউ প্রাতিষ্ঠানিক গড়াপেটারও প্রশ্ন তুলছেন। সরাসরি সেই পথে না হাঁটলেও, কখনও যেন সুযোগের সমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে চায়। অথবা কোনও কোনও ম্যাচে মোড়বদলের অদ্ভুত সাদৃশ্য নিয়েও। নকআউট পর্যায়ের বিশেষ কয়েকটি ম্যাচকে দেখলেই আলাদা করে যেন এক অবাক সমতা নজরে আসে। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ড-কঙ্গো, বেলজিয়াম-সেনেগাল, নরওয়ে-আইভরি কোস্ট অথবা আর্জেন্তিনা-মিশর— এই ম্যাচগুলিকেই বেছে নেওয়া যায়। এই প্রতিটি ম্যাচেই আফ্রিকার দেশগুলি সত্তর থেকে আশি মিনিট অবধিও ইউরোপীয় দলগুলির বিরুদ্ধে (অথবা বিখ্যাত দল আর্জেন্তিনার বিপক্ষে) এগিয়ে ছিল অথবা সমতা বজায় রেখেছিল। শেষাবধি অবশ্য কোনও ক্ষেত্রেই শেষরক্ষা হয়নি। শেষ মুহূর্তের গোল অথবা অতিরিক্ত সময়ে ইউরোপীয় (অথবা পড়ুন পছন্দের) দলগুলিই জয় ছিনিয়ে নেয়। বিশ্বাসীরা বলতেই পারেন, ফুটবল এক মহাঅনিশ্চয়তার নাম। শেষ মুহূর্ত অবধি খেলার ফলাফল সম্পর্কে এমন প্রতিযোগিতায় কোনও পূর্বাভাস মেলে না। তবুও প্রশ্ন জাগে, সুযোগের সমতাও কি এই ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়? নামী-দামী দেশগুলির বিপরীতে আফ্রিকার প্রান্তস্য অন্ধকার থেকে উঠে আসা একেকটি দল, তাদের কপালে জোটা সামান্য যেটুকু সুযোগ, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ— তার পরবর্তীতে কোথাও গিয়ে এক-একটি অবাক করা অফসাইড, অথবা রেফারির একাধিক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত, খেলার গতি ভেঙে হাইড্রেশন ব্রেকের বিরতি— মনসংযোগ ভাঙতে, ছন্দপতনকে ত্বরান্বিত করতে এমন এক-একটি সামান্য বিচ্যুতিও বোধ করি সহায়তা করে। তাই সংশয় থেকেই যায়।

যেমন সংশয় থাকে ইরানের বিদায়-প্রসঙ্গেও। একটিও ম্যাচ না হেরে বিশ্বকাপ থেকে ইরানের বিদায় এক দুঃসংবাদ হয়ে থাকবে। গ্রুপ লিগের শেষ দিকে, ৪৮-দলের এই বিশ্বকাপে পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায়, যে দেখা যায় দুইটি অন্য দল (আলজিরিয়া ও অস্ট্রিয়া, গ্রুপ ‘জে’) নিজেদের মধ্যে লিগের শেষ ম্যাচে নির্দিষ্ট সংখ্যায় (৩-৩) গোল-সমতা বজায় রাখলেই অপর দিক থেকে ইরানের বিদায় নিশ্চিত হবে ও অন্য দল দুটিই (আলজিরিয়া ও অস্ট্রিয়া) পরবর্তী রাউন্ডে পৌঁছবে। এমন আশ্চর্য সমাপতন বোধহয় বেশ কিছু অপ্রিয় প্রশ্নেরই জন্ম দেয়। এর পাশাপাশি, সেই শুরুর সময় থেকেই এবারের বিশ্বকাপে, ইরান-সহ এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশের খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক, সাপোর্ট-স্টাফ থেকে শুরু করে সমর্থকদের অবধি ভিসা নিয়ে টালবাহানা, তদুপরি মার্কিনভূমে পৌঁছানোর পরবর্তীতেও তাঁদের লাগাতার হেনস্থা, সেই প্রসঙ্গে সরাসরি বলা যায়— সুযোগের সমতা কখনওই এই দেশগুলির পক্ষে ছিল না। এই বিশ্বকাপ তাই এক চূড়ান্ত বৈষম্যের বিশ্বকাপ হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকবে।

বেলজিয়াম-সেনেগাল ও ইংল্যান্ড-কঙ্গোর দ্বৈরথ। বিশেষ এই দুইটি ম্যাচ ঘিরেই বারংবার মন আন্দোলিত হয়। বর্ণবিদ্বেষ, ঔপনিবেশিকতা, সাম্রাজ্যবাদ ও তার পাশাপাশি দাসপ্রথার অন্ধকার— উচ্চকোটির শ্বেতাঙ্গ সমাজের ‘প্রগতি’র কথা ভাবলেই, প্রাচীন এই অভ্যাসগুলিরই অবাক বিবরণ স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠতে চায়। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে, বেলজিয়ামের লুকাকু অথবা ইংল্যান্ডের সাকা, বেলিংহ্যাম-প্রমুখ… কঙ্গো অথবা সেনেগালের বিরুদ্ধে খেলার সময়, কখনও কি তাদেরও ফেলে আসা ভূমিরূপের কথাই মনে পড়ছিল? ভুললে চলবে না ফ্রান্সের জাতীয় নায়ক, বিশ্বকাপ-জয়ী চরিত্র জিনেদিন জিদান— তাঁর পুত্র লুকা জিদান কিন্তু শেষাবধি স্বদেশভূমে ফিরে গিয়েছেন। আলজেরীয়-বংশোদ্ভূত জিনেদিন জিদানের পুত্র লুকা জিদান, এবারের বিশ্বকাপে তিনি আলজেরিয়া দলের হয়ে গোলরক্ষীর দায়িত্ব পালন করেছেন।[2] উদ্বাস্তু ও স্বদেশ, কাঁটাতার ও তার বিপরীতে ভালোবাসা— সমগ্র পৃথিবীতেই, সচেতন জনমানসে এহেন স্পর্শকাতর বিষয়গুলি বোধহয় আজ ক্রমশ মানবিক-মান্যতা ও সহমর্মী-স্বীকৃতির দিকে এগোচ্ছে। কেবল আমাদের দেশই কি এই প্রসঙ্গে একমাত্র ব্যতিক্রম?

কঙ্গোর পরাজয় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় মনকে আচ্ছন্ন করে। অনেক রাত্রিতে খেলা শেষের বাঁশি যখন বাজল, প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সিংহের বিপরীতে ক্রমশ নতজানু হতে বাধ্য হল আফ্রিকান যোদ্ধাদের দল, ঘড়ির কাঁটায় দেখলাম ২ জুলাইয়ের তারিখ। গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর প্রথম রাষ্ট্রপতি প্যাট্রিস লুমুম্বার জন্মদিন। এই প্যাট্রিস লুমুম্বাকেই তার পরবর্তীতে ভূতপূর্ব ঔপনিবেশিক শাসক বেলজিয়ামের হীন চক্রান্তে, সেনা-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারাতে হয়। তাঁর নশ্বর দেহটিকে অবধি কড়া অ্যাসিডে চুবিয়ে গলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬১-র এই ঘটনার পরবর্তীতে, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পর, ২০০২ সালে এসে অবশেষে, বেলজিয়ামের তরফে এই কাণ্ডের জন্য সরকারি ভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করা হয়। এরও প্রায় কুড়ি বছর পর, ২০২২ সালের জুন মাসে প্যাট্রিস লুমুম্বার দেহাবশেষ হিসেবে একখানি মাত্র সোনায় বাঁধানো দাঁত বেলজিয়াম সরকারের তরফে তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।[3] এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়ছে মাইকেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গা-কেও।[4] লুমুম্বা-ভেয়া হিসেবে পরিচিত এই মানুষটি কঙ্গো ফুটবল দলের একনিষ্ঠ সমর্থক ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্যাট্রিস লুমুম্বার আদর্শের অনুগামী। এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত কলম্বিয়া বনাম কঙ্গো ম্যাচে এই লুমুম্বা-ভেয়াকেই দেখা গেছে, সমস্ত ম্যাচের সময়টুকু জুড়ে প্যাট্রিস লুমুম্বার অনুকরণে সজ্জিত হয়ে ঠায় গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লুমুম্বা-ভেয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। তাই ইংল্যান্ড-কঙ্গো দ্বৈরথের সময় হ্যারি কেন বাহিনীকে আর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লুমুম্বার দীর্ঘ ছায়ার সম্মুখে পড়তে হয়নি।

এর পাশাপাশি, আমেরিকার দাদাগিরি ও তারই সঙ্গে নিয়ামক সংস্থা হিসেবে ফিফার চূড়ান্ত মেরুদণ্ডহীনতা বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রেই এই বিশ্বকাপে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের আগে, যে অদ্ভুত পরিস্থিতিতে নির্লজ্জ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার একজন খেলোয়াড়ের লাল কার্ড-জনিত শাস্তি স্থগিত রাখার দাবি তুললেন, এবং ফিফার তরফে অদ্ভুত দাসত্বসুলভ মানসিকতায় সেই দাবি মেনেও নেওয়া হল, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে তা এক চূড়ান্ত কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে। এই প্রসঙ্গে স্বভাবতই রসিকজনেরা মনে করিয়েছেন ২০০২ বিশ্বকাপ। কার্ড সমস্যার কারণে সেবারের ফাইনালে ব্রেজিলের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারেননি জার্মানির তদানীন্তন টিমের মূল স্তম্ভ মাইকেল বালাক। বালাক মাঠে নামলে ইতিহাস পালটানোও সম্ভব ছিল বোধহয়।
এদিকে আমাদের মনে পড়ছে, পেনাল্টি শ্যুট আউটে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার পর মিশরের প্রশিক্ষককেও দেখা গেছে খাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে জলভরা চোখে মুক্ত প্যালেস্তাইনের পতাকা ওড়াতে।[5] আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে বিতর্কিত প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে মিশর দলকে কি তবে পরোক্ষে এরই মূল্য চোকাতে হল? সন্দেহ বাড়ছে। সেই ম্যাচে রেফারির বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও। মহাতারকা হিসেবে মেসির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না। তবুও মিশরের কোচ ঠিক কোন পরিস্থিতিতে দু-হাত তুলে আর্জেন্তিনা দলের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্যের অভিযোগ আনলেন, সেই ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। এসব বিতর্কের উদ্ভব আদতে মহাতারকার প্রতিভাকেই ক্ষুণ্ণ করে বোধহয়। এহেন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সামনে আসা উচিত ছিল না একেবারেই।
তবুও যা মনে থাকবে— ইরানের প্রতিবাদ, প্যালেস্তাইনের জন্য প্রতিবাদ, প্যাট্রিস লুমুম্বার জন্য প্রতিবাদ— এবারের বিশ্বকাপ চলাকালীন জনতার সমর্থনে এমনই প্রতিটি প্রতিবাদ চলমান মানবেতিহাসের পাতায় একইভাবে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকল। জানা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা থেকে বিদায়ের পর সাধারণ মেক্সিকান নাগরিকদের তরফেও ইরানীয় ফুটবলারদের এক স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক সংবর্ধনার মাধ্যমে আবেগপূর্ণ সম্ভাষণে বিদায় জানানো হয়।[6]
তাই মানুষের পাশে দাঁড়াতে আজ, সেই মানুষই ক্রমশ অসঙ্কোচে এগিয়ে আসছে। এহেন মানবতার প্রতি আমাদের বিশ্বাস হারানো পাপ। আজ বরং মনে পড়ছে আমাদের সেই অন্যরকম ছোটবেলার কাল। যে সময়ে দাঁড়িয়ে কিশোর-পাঠ্য কাকাবাবুর গল্পেও আমরা জেনে ফেলতাম কঙ্গো দেশের আপসহীন সংগ্রামী নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বার ইতিহাস (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রণীত সন্তু ও এক টুকরো চাঁদ গল্প দ্রষ্টব্য), অথবা বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেই মার্কিন দূতাবাস যে রাস্তায় রয়েছে— সেই রাস্তার নাম বদলিয়ে রাখত হো চি মিন সরণি। কলকাতার মাটিতে অপ্রতিরোধ্য মার্কিন ঈগলকেও তাই সসম্ভ্রমে মনে রাখতে হত, সেই নাম। ‘ভিয়েতনাম’।
এমন প্রতিরোধ আজ, আজকের এই উত্তাল সময়েও, সোচ্চারে পুনরুজ্জীবিত হোক!
বিশ্বকাপের মাটিতে অপ্রতিরোধ্য আগুনরূপে জাগ্রত উত্তাল আফ্রিকান বসন্তের প্রতি, বরং আজ সেটুকুই হোক আমাদের পালটা অঙ্গীকার!
[1] Sulayman Salahudeen, “Divide the game into four halves instead of two to insert ads” – Diego Maradona’s old claim resurfaces amid hydration break drama at FIFA World Cup, Sportskeeda, Jul 2, 2026.
[2] Billy Heyen, Why Luca Zidane is playing for Algeria despite being related to France legend Zinedine, yahoo sports, Jul 3, 2026.
[3] Jason Burke, Belgium returns Patrice Lumumba’s tooth to family 61 years after his murder, The Guardian, Jun 20, 2022.
[4] Lumumba Vea, the DR Congo super fan, makes his first FIFA World Cup appearance, Sportsstar, Jun 24, 2026.
[5] Samy Magdy, Egypt’s coach waved Palestinian flag after winning World Cup game, AP news, Jul 5, 2026.
[6] Adda E. Lavalle Lara, World Cup 2026: Iran wins Mexican hearts with emotional farewell—’Go for the trophy!’, MSN, Jul 4, 2026.
*মতামত ব্যক্তিগত


আপনার মতামত...