তন্ময় বিশ্বাস
আপাতদৃষ্টিতে অপরাধ দমনের এই সর্বাত্মক প্রয়াসকে সাধুবাদ জানানোই স্বাভাবিক। কিন্তু আসল সংশয় জাগে অন্য জায়গায়—রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের কোনও সুনির্দিষ্ট অপরাধ ছাড়াই এই সংজ্ঞার জালে জড়িয়ে দেওয়া হবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে অনুরূপ আইনের রাজনৈতিক অপপ্রয়োগের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা এই আশঙ্কাকে আরও উস্কে দেয়। এই আইনে সমাজবিরোধীর সংজ্ঞা এতখানি নমনীয় ও প্রশস্ত রাখা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইকে “সমাজবিরোধী কার্যকলাপ” বলে দাগিয়ে দেওয়া শাসকের পক্ষে মোটেই কঠিন নয়
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল বহুচর্চিত ও বহুবিতর্কিত জোড়া ‘গুন্ডাদমন’ বিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিজেপি সরকার নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল দুটিকে আইনি রূপ দিল। বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৭৬টি এবং বিপক্ষে ৪১টি। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিস বিল, ২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেইনটেনেন্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’— এই নাম দুটিই জানান দেয় যে, আগামী দিনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে শাসকপক্ষ চরম দমনমূলক অবস্থান গ্রহণ করতে চলেছে। যেকোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন এই ধরনের বড় মাপের আইনি পরিবর্তন আসে, তখন তার রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। এই বিল পাশ হওয়ার পর থেকে বাংলার রাজনৈতিক মহলে যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত নাগরিক অধিকারের এক গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত।
সরকারের দাবি, এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় চলতে থাকা তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটরাজের অবসান ঘটবে। তাদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হলে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বাঁচতে পারবেন; পাশাপাশি রাজ্যে শিল্পায়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে, যা কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করবে। শাসকপক্ষের এই উন্নয়নবাদী যুক্তি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠও রয়েছে। সংগঠিত অপরাধের অবসান ঘটিয়ে নাগরিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যে-কোনও নির্বাচিত সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব, তা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই মহৎ উদ্দেশ্যের অন্তরালে যুক্ত করা কঠোর আইনি ধারাগুলো নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নতুন কোনও স্বৈরাচারী আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে কি না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জননিরাপত্তা রক্ষা এবং বুনিয়াদি নাগরিক অধিকার সঙ্কোচনের মধ্যেকার সীমারেখাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। গুন্ডাদমন আইন পাশের ক্ষেত্রে সরকার তা স্মরণে রেখেছে তো?
জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেনিয়ামিন দেখিয়েছিলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই কোনও ‘সংকট’, ‘অপরাধ’ বা ‘আপৎকালীন পরিস্থিতির’ দোহাই দিয়ে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই এমন কিছু চরম বিধি তৈরি করে, যা সংবিধানপ্রদত্ত সাধারণ নাগরিক অধিকারকে সাময়িকভাবে বাতিল করে দেয়। বেনিয়ামিনের এই ধারণার সূত্র ধরেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘স্টেট অব এক্সেপশন’ বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যেখানে শাসকেরা আইনের রক্ষাকবচ পরেই আইনের টুঁটি চেপে ধরে। বাংলার এই নতুন গুন্ডাদমন আইনটিও তার ব্যতিক্রম নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, ২০২৪ সাল থেকে দেশজুড়ে কার্যকর হওয়া নতুন ফৌজদারি আইন ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (বিএনএস) এবং ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা’ (বিএনএসএস)-এর অধীনে পুলিশকে ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের কঠোর ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। কেন্দ্রীয় স্তরের সেই সর্বব্যাপী আইনি কড়াকড়ির সঙ্গে রাজ্যস্তরের এই নতুন আইন যুক্ত হওয়ায়, নাগরিক স্বাধীনতা এখন দ্বিগুণ সংকটের মুখে।
জননিরাপত্তার দোহাই দিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে এখানে যে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হল, তা নাগরিক সুরক্ষার ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। ‘গুন্ডা’ বা ‘সমাজবিরোধী’ কে, তার সংজ্ঞা নির্ধারণের চাবিকাঠি রাষ্ট্র নিজের হাতে রাখছে। ফলে, সাধারণ মানুষের আইনি সুরক্ষার অধিকার কার্যত শাসকের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। এই ধরনের আইনি সংস্কার স্বাভাবিক নিয়মেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতার চিরাচরিত ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। এর শেষ পরিণতিতে কোনও মহৎ উদ্দেশ্য সাধন হওয়া মুশকিল, বরং শাসকের প্রশাসনিক ক্ষমতাই নিরঙ্কুশ হওয়ার সম্ভাবনা।
পাশাপাশি, নতুন এই আইনের সর্বাপেক্ষা উদ্বেগজনক দিকটি হল বিনা বিচারে টানা এক বছর আটকে রাখার সংস্থান। কোনও অপরাধ ঘটার আগেই কেবল সন্দেহের বশে প্রতিরোধমূলক গ্রেপ্তারের যে ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে, তাতে স্বৈরাচারী মানসিকতারই প্রতিফলন স্পষ্ট। আরও বিপদের কথা হল আইনটির ১০(৪) ধারা— যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তি অ্যাডভাইসরি বোর্ডের শুনানির সময় কোনও আইনজীবীর সহায়তা পাবেন না। আত্মপক্ষ সমর্থনের এই ন্যায়সঙ্গত আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদের মূল ভাবনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অন্যদিকে, আন্দোলনের নামে সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ক্ষেত্রে মূল উস্কানিদাতাদের চিহ্নিত করে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলামের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ‘ক্লেমস কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। নিরর্থক হিংসা বা ভাঙচুর নিশ্চয়ই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ইতিমধ্যেই ‘দ্য উত্তরপ্রদেশ রিকভারি অফ ড্যামেজেস্ টু পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যাক্ট, ২০২০’ কিংবা মধ্যপ্রদেশের সমগোত্রীয় ২০২১ সালের আইনের প্রয়োগ দেশ দেখেছে। সেখানে স্রেফ প্রশাসনিক আমলাদের দিয়ে গঠিত ‘ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল’-এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার যে একতরফা প্রক্রিয়া চলেছিল, তাকে স্বয়ং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে “স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী” বলে তীব্র ভর্ৎসনা করে। সেই সঙ্গে সমস্ত রিকভারি নোটিস প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। আসলে প্রশাসন নিজেই যেখানে অভিযোগকারী এবং নিজেই বিচারক, সেখানে আইনি পর্যালোচনার সুযোগহীন এই প্রক্রিয়া ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধের এক উগ্র হাতিয়ারে পরিণত হয়। ক্ষয়ক্ষতির ‘দায়’ নির্ধারণের এই বিচারহীন প্রক্রিয়া যেন শেষ পর্যন্ত শাসকের একতরফা রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করবে কে?
উপরন্তু, এমন কঠোর আইন প্রণয়ন করতে গিয়ে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ছিল ‘সমাজবিরোধী’ বা ‘গুন্ডা’ শব্দের একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। কিন্তু আলোচ্য আইনে সরকার এই সংজ্ঞার পরিধি এতখানি বিস্তৃত ও ধূসর রেখেছে যে, তার অপব্যবহারের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়। কেবল দাগি অপরাধীই নয়, তোলাবাজ, বেআইনি দখলদার, সিন্ডিকেট-চক্রের প্রধান এবং দাঙ্গাকারীদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনও সমাজবিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত, প্ররোচনাকারী, নেপথ্যের মদতদাতা কিংবা অর্থদাতাদেরও এই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে অপরাধ দমনের এই সর্বাত্মক প্রয়াসকে সাধুবাদ জানানোই স্বাভাবিক। কিন্তু আসল সংশয় জাগে অন্য জায়গায়— এই অস্পষ্ট সংজ্ঞার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের কোনও সুনির্দিষ্ট অপরাধ ছাড়াই এই সংজ্ঞার জালে জড়িয়ে দেওয়া হবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে অনুরূপ আইনের রাজনৈতিক অপপ্রয়োগের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা এই আশঙ্কাকে আরও উস্কে দেয়। এই আইনে সমাজবিরোধীর সংজ্ঞা এতখানি নমনীয় ও প্রশস্ত রাখা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইকে “সমাজবিরোধী কার্যকলাপ” বলে দাগিয়ে দেওয়া শাসকের পক্ষে মোটেই কঠিন নয়।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মুসোলিনির ইতালিতে কিংবা হিটলারের জার্মানিতে ঠিক এইভাবেই ‘প্রোটেক্টিভ কাস্টডি’ বা সুরক্ষামূলক আটকের নামে নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করা হয়েছিল। এ ছাড়া, আমাদের দেশেই কেন্দ্রীয় স্তরে ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট’-এর (ইউএপিএ) মতো সন্ত্রাসদমনমূলক আইনের অপপ্রয়োগের ন্যক্কারজনক উদাহরণ বিরল নয়। লিবারেশন থিওলজিস্ট ফাদার স্ট্যান স্বামীকে কীভাবে মাসের পর মাস বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছিল, তা অনেকেরই মনে আছে। শেষ পর্যন্ত কোনও অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই পার্কিনসনে আক্রান্ত অশীতিপর এই বৃদ্ধ বিচারবিভাগীয় হেফাজতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বভাবতই এই প্রশ্ন অসঙ্গত নয়— রাজ্যস্তরের এই নতুন গুন্ডাদমন আইন প্রকারান্তরে ইউএপিএ-র এক ক্ষুদ্র, আঞ্চলিক সংস্করণ হয়ে উঠবে না তো, যেখানে বিরোধী স্বরকে স্তব্ধ করার এক নতুন আইনি লাইসেন্স পেয়ে যাবে প্রশাসন?
ফ্রানৎজ় কাফকা তাঁর বিচার (Der Prozess; ১৯২৫) উপন্যাসে দেখিয়েছিলেন, এক সাধারণ নাগরিক জোসেফ কে, হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে সে গ্রেপ্তার হয়েছে; অথচ নিজের অপরাধের কথা সে জানতেও পারে না। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রশক্তির নির্মম শিকার হতে হয় তাকে। জননিরাপত্তা রক্ষা করা যেকোনও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য এবং তার জন্য প্রশাসনিক সদিচ্ছাও জরুরি। কিন্তু অপরাধ দমনের তাগিদে তৈরি হওয়া নতুন আইনি বিধিমালা যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য কাফকার উপন্যাসের সেই মানবিকতাহীন গোলকধাঁধা হয়ে না ওঠে। জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনের আড়ালে যদি বিরুদ্ধবাদীদের কণ্ঠস্বর দমনের ‘আইনি সহিংসতা’-ই মূল উদ্দেশ্য হয়, তবে গণতন্ত্রে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। এখন জল কোন দিকে গড়ায়, সেটাই দেখার অপেক্ষা।
*মতামত ব্যক্তিগত


আপনার মতামত...