শুভ প্রতিম
বারুইপুরের নৃশংস গণধর্ষণ কাণ্ড নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেতমজুর সমিতি, শ্রমজীবী মহিলা সমিতি ও আমরা এক সচেতন প্রয়াস গত ৬ জুলাই সেখানে একটি তথ্যানুসন্ধান চালায়। তথ্যানুসন্ধান দলে ছিলেন সুচিত্রা হালদার, খাদিজা খাতুন, নমিতা হালদার, রেহানা খাতুন, নির্মলা সরদার, ফারুক উল ইসলাম এবং শুভ প্রতিম। বর্তমান প্রতিবেদনটি সেই তথ্যানুসন্ধানেরই একটি প্রাথমিক রিপোর্ট। সেইদিনের পরের ঘটনাক্রম নিয়ে শুভ প্রতিম কিছু সংযোজন করেছেন প্রতিবেদনের শেষে
গত শনিবার ৪ জুলাই, ২০২৬ দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুরের সূর্যপুরে এক ১২ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। এক দিন নিখোঁজ থাকার পরে ৫ জুলাই, ২০২৬ সকালে সূর্যপুর স্টেশন-সংলগ্ন পুকুর থেকে তার দেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে মেয়েটি গণধর্ষণের শিকার। মাথায় আঘাত ও মারধরে অর্ধমৃত কিশোরীকে পুকুরে ফেলা হয়। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়েছে এলাকা।
ধর্ষণ এবং খুনের অভিযোগে ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতেরা হলেন আনন্দ সর্দার, প্রভাস মণ্ডল এবং দিবাকর সর্দার। কিশোরীর দেহ উদ্ধারের পর গণপিটুনিতে মৃত্যু হয় এক যুবকের। তার নাম ইন্দ্র তাঁতি।
গত ৬ জুলাই ২০২৬, শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠন, পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেতমজুর সমিতি, শ্রমজীবী মহিলা সমিতি ও ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’-এর পক্ষ থেকে তথ্যানুসন্ধান করতে যাওয়া হয়। কথা বলা হয় মৃতা কিশোরীর পিতা, আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে। অনেকেই নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁদের অনুরোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই রিপোর্টে তাঁদের প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি। দেশের আইন অনুসারে নির্যাতিতা তথা মৃতা কিশোরীর নাম, তার পরিবারের ঘনিষ্ঠজনের নাম প্রকাশ করা যায় না। এখানে তা প্রকাশ করা হল না। এটা একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট। সূর্যপুরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবং আমাদের অভিজ্ঞতার নিরিখে একটি দাবিপত্রও আমরা এই রিপোর্টের সঙ্গে যুক্ত করছি।
পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের কথা বলেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুসারে জানা যাচ্ছে, পুকুরে ফেলার সময়েও কিশোরী জীবিত ছিল। মেয়েটির পেটে জল ছিল বলে ডাক্তাররা জানিয়েওছেন তাঁদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে। অর্থাৎ জলে ফেলার সময়েও মেয়েটি জীবিত ছিল। দেহে ২৮টির বেশি ক্ষতচিহ্ন, মাথার ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শেষ পর্যন্ত জলে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে, পুলিশ জানায়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী ৬৫ [ধর্ষণ], ৭০ (২) [গণধর্ষণ], ১০৩ (১) [খুন], ২৩৮ [তথ্য-প্রমাণ লোপাট], ৬১ [অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র] এবং পকসো আইন অনুযায়ী ধারা ৬, ধারা ১৩৭ (২) ও ১৪০ (২) [নাবালিকাকে অপহরন]-এ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
শেষ সময় পর্যন্ত সে লড়াই করে গেছে, তাই আমাদের কাছে সে অপরাজিতা। এই রিপোর্টে তাকে ‘অপরাজিতা’ নামেই অভিহিত করা হল।
তথ্যানুসন্ধান দলে যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেন—
সুচিত্রা হালদার, খাদিজা খাতুন, নমিতা হালদার, রেহানা খাতুন, নির্মলা সরদার, ফারুক উল ইসলাম এবং এই প্রতিবেদক।
[১]
আমরা সকাল ১০টার সময় সূর্যপুর স্টেশনে পৌঁছই। সূর্যপুর স্টেশন থেকে অনতিদূরেই সেই পুকুর যেখানে অপরাজিতার লাশ উদ্ধার করা হয়। সেখানে মোতায়েন ছিলেন একজন পুলিশকর্মী। শিয়ালদা-লক্ষ্মীকান্তপুর রেললাইনের এই স্টেশনের শিয়ালদা-প্রান্তের এলাকাটা নির্জন। উঁচু রেললাইন থেকে নিচের জলাশয় অনেক নিচেতে। সেখানে কয়েকটি ঝোপরপট্টি বা বস্তি আছে। কিন্তু কোথাও কেউ বসবাস করে বলে মনে হল না। এলাকার সমাজবিরোধীদের আড্ডা এখানে। জানা গেল রাত্রে তাদের আনাগোনা বাড়ে।
স্টেশন থেকে সূর্যপুর বাজার সর্বত্র পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান। বাজারে দোকান সব খোলা ছিল। আমরা যখন অপরাজিতার বাড়িতে তখন ৫-৬ জন আত্মীয়-পরিজন সেখানে ছিলেন। ছিলেন সিভিল ড্রেসে থাকা পুলিশকর্মী।
বাবা এবং অন্যান্যরা
অপরাজিতার বাড়িতে আমরা কথা বলি বাবার সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই কথা বলার মতো অবস্থায় তিনি ছিলেন না। মেয়ের মা সেখানে ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রামের বাড়ি, রতনপুরে। বাবা কাঠের ব্যবসা করেন। তিনটি মেয়ে ও এক পুত্র নিয়ে তাঁদের সংসার। ‘অপরাজিতা’ তাঁর ছোট মেয়ে। পড়ত পঞ্চম শ্রেণিতে, স্থানীয় কেয়াতলা হাইস্কুলে। বাবা বলেন—
আমি আসামির ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি। আমরা সরকারকেও এই অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে কঠিনতম শাস্তি হয় আমার মেয়ের খুনিদের।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বলেন—
—বেশি কিছু বলব না। আমরা ফাঁসি চাইছি। পুলিশ প্রশাসন আছে, বেশি কিছু বলব না। যেহেতু কালকে মুখ্যমন্ত্রী আসবেন, এই বিষয়ে আর কিছু বলা যাবে না।
—কাল কি মুখ্যমন্ত্রী আসবেন?
—হ্যাঁ, উনি আসবেন।
বাবা বলেন—
—হ্যাঁ উনি আসবেন। উনি যখন কথা দিয়েছেন…।
—তাহলে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আপনাদের আস্থা আছে?
—হ্যাঁ, আছে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরও একজন বলেন—
—হ্যাঁ, আমাদের পুরোপুরি আস্থা আছে।
কিশোরীর পিতা বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে, উনি আগামীকাল আসবেন। আমি আসামিদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছি। উনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন আমার দাবি উনি রাখবেন। তবে কারও সাথে কোনও কিছু বলতে বারণ করছেন। উনি আরও বলেন যে আমার বাড়িতে পুলিশ আছে সবসময়, আমাদের ফোনও রেখে দিয়েছে ওনারা। অভিযুক্তরা সকলেই বিজেপির কর্মী ও সমর্থক বলে জানান কিশোরীর পিতা-সহ উপস্থিত ব্যক্তিরা।
বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন হেলাল লস্কর (নাম পরিবর্তিত)। কতটা নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে তা উনি জানান। ওঁর বাড়ি রতনপুরে। যেখানে অপরাজিতার বাবার পৈতৃক ভিটে। যথেষ্ট উষ্মার সঙ্গে তিনি জানাচ্ছিলেন—
—এখন এত পুলিশ দেখছেন, বাড়ির মধ্যেও তাদের আনাগোনা, কিন্তু মেয়েটা নিখোঁজ হওয়ার পর যদি তারা তৎপর হত তাহলে হয়তো আমাদের মেয়েটা বেঁচে যেত।
—পুলিশের ভূমিকায় আপনাদের ক্ষোভ আছে?
—অবশ্যই আছে। কেন পুলিশ বিজেপি নেতার কথায় ছেড়ে দিল মূল আসামিকে। পরে গ্রামের মানুষের ক্ষোভ দেখে আর ওপর থেকে চাপ দেওয়াতে তৎপর হয়েছে।
—কে চাপ দিয়েছে?
—রাজ্য সরকার।
—মুখ্যমন্ত্রীর কথা বলছেন?
—হ্যাঁ, উনি ফোন করেছিলেন। আসবেন জানিয়েছেন। কিছু করে দেখান, তাহলে বুঝব।
—মমতা বন্দোপধ্যায় আসতে চেয়েছিলেন?
—উনি এসে কী করবেন? ওনার আমলেই তো আরজিকর হয়েছে? তামান্নাকে খুন করেছে ওনার দলেরই গুণ্ডারা। আনিস খানকে কে খুন করল? ওনার ভূমিকা কী ছিল?
মৃতা কিশোরীর বাড়ির সামনে আমরা কথা বলি প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সঙ্গে। সেখানে কথা হয় মূলত বাবলু মোল্লার সঙ্গে।
বাবলু মোল্লা: আমরা প্রায় ৫-৬টি গ্রামের ৫০-৬০ হাজার মানুষ এখানে ছিলাম (সূর্যপুর বাজার)। সেখানে পুলিশ আমাদের সঙ্গে কথা না বলে, কোঅপারেট না করে, লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। তাতে জনসাধারণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। জনরোষে একজন মারা যায়, তার নাম ইন্দ্র তাঁতি। পাবলিকের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে যে ক্ষিপ্ত করে দিয়েছে তার জন্যই এই ঘটনা হয়েছে। এটা না হলে এখানে এত পুলিশ রাখতে হত না।
—পুলিশের এই পক্ষপাতিত্বের কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?
—পুলিশের পক্ষপাতিত্বের কারণ কেন, কী বৃত্তান্ত আমরা বলতে পারি না। আমরা জানি না কেন করেছে, স্থানীয় বিজেপির যে লিডার, শান্তনু, সেও পুলিশকে প্রভাবিত করে সকালবেলা মূল আসামি আনন্দকে ছাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। শান্তনু এইরকম কাণ্ডকারখানা করেছে। তাই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা জানি না, পুলিশ কেন এটা করেছে। তবে প্রশাসনের তরফ থেকে আইজি সাহেব যে আশ্বাস দিয়েছেন ও মুখ্যমন্ত্রী যে আশ্বস্ত করেছেন, আমরা সেই আশ্বাসের প্রতি আশাবাদী। যে আমাদের এই বাচ্চাটা ন্যায়বিচার পাবে এবং আসামিরা কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি পাবে। আমরা শুধু এইটুকুই আশা করছি।
—এই ঘটনা নিয়ে সাম্প্রদায়িক কোনও উত্তেজনা আছে কি?
—না এখানে হিন্দু-মুসলিম কোনও ব্যাপার নেই। দীর্ঘদিন সূর্যপুর সম্প্রীতির জায়গা। হিন্দু-মুসলিম আমরা মিলেমিশে থাকি। ভাই-ভাইয়ের মতো থাকি। আমাদের ঈদে তারা আসে, তাদের পুজোতে আমরা মিলেমিশে চলি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা নিমন্ত্রিত হই, একসঙ্গে খেলাধূলা করি। একসঙ্গে বসে চা খাই, এক্ষুনি বসে চা খাচ্ছিলাম (হাত দিয়ে চায়ের দোকান দেখিয়ে) আমার এক হিন্দু বন্ধুর সঙ্গে।
—আচ্ছা এখানে আগেকার চিত্র কেমন, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক কেমন?
—দীর্ঘদিন ধরে সূর্যপুর সম্প্রীতির জায়গা। (মিলিতভাবে)
কথা হল জগন্নাথ মণ্ডলের (নাম পরিবর্তিত) সঙ্গে। সূর্যপুর বাজারেই তাঁর দোকান। আমরা কথা বলি অল্পসময়। উনি খুব বেশি কিছু বলতে চাইছিলেন না।
জগন্নাথ মণ্ডল: এই অপরাধের শাস্তি হোক, আমরা চাই। মেয়েটা আমার দোকানেও আসত। এখনও গলা কেঁপে যাচ্ছে কিছু বলতে। কী বলব, বিগত জামানা থেকেই এলাকায় সমাজ-বিরোধীদের রমরমা। মাদকচক্র আছে।
—এখনও কি তারা সক্রিয়?
—হ্যাঁ, তারা আছে। কেউ কি সমাজবিরোধীদের কিছু বলে?
—সরকার বদল হয়েছে, কিছু কি বদল হয়নি?
—সে আমি কী বলব! (কিছুটা সাবধানী হয়ে)
—গতকাল গণপ্রহারে একজনের মৃত্যু হল, কিছু বলুন?
—প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারাই জড়িত তাদের পেলে পাবলিক ছাড়বে না। তবে এর ফলে এলাকায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
—উত্তেজনা মানে কি হিন্দু-মুসলমান?
—সেসব বলতে পারব না। (এবার আরও সাবধানী, দোকানে কিছু খদ্দের এসেছে তখন)
[২]
গণপ্রহারে মৃত্যু প্রসঙ্গ
এই বিষয়ে সাধারণভাবে কেউ মুখ খুলতে চাইছিলেন না। রোশন মোল্লা (নাম পরিবর্তিত)-র ওষুধের দোকান। তিনি প্রথমে জানালেন তিনি ওইসময় ছিলেন না। পরে বলেন—
রোশন মোল্লা: সাধারণ মানুষ ক্ষেপে গেলে কিছু করার থাকে না।
—কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কি ঠিক?
—দেখুন পাবলিকের ওসব খেয়াল থাকে না। তা ছাড়া পুলিশ যদি খুনিকে ছেড়ে না দিত তাহলে পাবলিক ক্ষেপে যেত না।
আর কিছু বলতে চাননি উনি। আমরা কথা বলি স্থানীয় ফলের দোকানের মালিকের সঙ্গে। তিনি জানান, ঘটনার সময় এখানে কয়েক হাজার লোক, আশেপাশের সব গ্রামের মানুষ। রাজ্য সরকার যদি তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় তাহলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি চুপ করে যান। বলেন, এসব বলতে পারব না।
অন্যান্য
জনৈক চায়ের দোকানদার, যিনি আদতে বিহারের বাসিন্দা, বহুদিন ধরে সূর্যপুর বাজারে তাঁর দোকান। সেখানে আমাদের সঙ্গে দেখা হয় জিন্নাতের (নাম পরিবর্তিত) মায়ের সঙ্গে। দোকানে বসা আমানত মোল্লা (নাম পরিবর্তিত) জানান, জিন্নাতের সঙ্গে কী হয়েছিল, জানাও জিন্নাতের মা। জিন্নাতের মা সবে বলতে শুরুছেন, “আমার মেয়েকে টন্ট করত ওরা…”, রাস্তার ওপারের বাড়ির বারান্দা থেকে একজন চিৎকার করে জানালেন, “কারুর কাছে মুখ খুলো না, জিন্নাতের মা। চুপ থাকো।” না, তারপর উনি আর কিছু বলেননি। আমাদের পক্ষ থেকেও কোনও জোর করা হয়নি। ওরা কারা জানতে চাইলে আমানত মোল্লা বলেন, কারা আবার, এই যারা এত বড় কাণ্ড ঘটাল। এরা নারীপাচার, ড্রাগ সবকিছুতেই যুক্ত।
সাধারণভাবে বেশিরভাগ মানুষ জানান, পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তি এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। কিশোরী শনিবার বিকেলে খাবার কিনতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তার পর থেকে তার খোঁজ মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ, চারজন তাকে তুলে নিয়ে যায়। তাকে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে বলেই তাঁদের অনুমান। অভিযুক্তদের একজনকে রবিবার থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়, এই ব্যাপারে থানায় প্রভাব খাটায় শান্তনু মণ্ডল। প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে উক্ত শান্তনু মণ্ডল এখানের চারটি গ্রাম পঞ্চায়েতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র মণ্ডল সভাপতি।
এলাকায় কথা বলে জানা যায় অভিযুক্ত আনন্দ মণ্ডল এর আগেও মেয়েদের উত্যক্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত। সংবাদে প্রকাশ, যে অটোতে চাপিয়ে কিশোরীকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই অটোচালক গণপ্রহারে মারা যায়। আমরা এই বিষয়ে জানতে চাইলে কেউ কিছু বলতে চাননি। সামগ্রিকভাবে এলাকায় ভয় ও উত্তেজনা প্রবল। কিশোরীর বাড়িতে কথা বলার সময়ও আমাদের সিভিল ড্রেসে পুলিশের উপস্থিতি নজরে এসেছে।
কিশোরীর বাড়িতে উপস্থিত ব্যক্তিরা একবাক্যে বলেছেন এই ঘটনার শাস্তি চেয়েছে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষই। কিন্তু বিভিন্ন মিডিয়াতে যেভাবে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে বা বিষয়টাকে ধর্মীয় প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে তাতে শঙ্কিত তাঁরা।
আমরা ফোনে কথা বলি কেয়াতলা হাইস্কুলের শিক্ষক শ্রীকুমার মুখোপধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, অপরাজিতা খুব ভালো মেয়ে। গোটা স্কুল হতবাক ও শোকবিহ্বল। তিনি ইস্কুলে গিয়ে কথা বলতে বলেন, ফোনে খুব বেশি কিছু বলতে চান না।
এই প্রেক্ষিতে প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি:
- অবিলম্বে সকল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হোক, শান্তনু মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হোক।
- অপহরণ, ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যা কোনও বড় ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা তা তদন্ত করা হোক।
- দক্ষিণ ২৪ পরগণা জুড়ে নাবালিকা পাচার চক্র সক্রিয় বলে অভিযোগ। সাধারণ মানুষের বয়ানে এলাকায় পাচার ও ড্রাগচক্রের কথা জানা গেছে, তাঁরা জানিয়েছেন, পুলিশ এ বিষয়ে জানে না তা নয়। এই চক্র ভাঙতে রাজ্য সরকার জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিক।
- পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার ও অভিযুক্তদের বাঁচানোর ভূমিকা স্পষ্ট। দোষী পুলিশ আধিকারিকদের চিহ্নিত করা হোক, আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
- পুলিশের অতিরিক্ত তৎপরতা আমাদের নজরে এসেছে, ফলে মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। এলাকায় চাপমুক্ত পরিবেশ রাখতে হবে। পুলিশ-রাজ চলবে না।
- গণপিটুনি ও হত্যার সঙ্গে যুক্ত সকল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এলাকায় ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- কোনওক্রমেই যাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, হিংসা না ঘটে সে দিকে নজর রাখা দরকার।
৭ জুলাই, ২০২৬
তথ্যনুসন্ধান দলের অন্যতম সদস্য, শুভ প্রতিমের সংযোজন
পরবর্তী ঘটনাক্রম
পরবর্তী ঘটনাক্রম যা আমাদের তথ্যনুসন্ধানের পরে ঘটতে থাকে, যা শুধু ওই এলাকার নয় রাজ্যের ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক। যে পুকুর থেকে ১২ বছরের মেয়ের নিথর দেহ উদ্ধার হয়েছিল, সেই পুকুর থেকেই এক ব্যক্তির দেহ পাওয়া যায়, গত সোমবার, ৬ জুলাই। পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্রে খবর, মৃত ব্যক্তির নাম কৃষ্ণকান্ত হালদার। গত শুক্রবার থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
বারুইপুরে নাবালিকাকে গণধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় ধৃত অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু হল পুলিশের গুলিতে। প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাকেই। পুলিশ সূত্রে দাবি, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই রাতে তাকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অপরাধস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানেই সে পুলিশের হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ। আত্মরক্ষার্থে পুলিসও গুলি চালাতে বাধ্য হয়। ফলে, অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল আহত হয় এবং হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। তদন্ত চলাকালীন এইভাবে পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুকে আইনি ভাষায় এ-ন-কা-উ-ন-টা-র বলা ছাড়া অন্য কোনও প্রতিশব্দ আছে বলে আমাদের জানা নেই। খুব স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠছে এই হত্যা নিয়ে। কেন অত রাত্রে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হল? কেন আশেপাশের মানুষ গুলির শব্দ পেল না? আইন অনুসারে ঘটনার পুনর্নির্মাণ ক্যামেরাবন্দি করা উচিত, তা কি করা হয়েছে?
২০১৪ সালে People’s Union for Civil Liberties (PUCL) বনাম মামলায় ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আরএম লোধার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। এই রায়ে পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্তের জন্য ১৬টি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা জারি করা হয়। আমরা জানি না প্রভাস মণ্ডলের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করার সময় এই নির্দেশিকা কতটা মানা হবে! ময়নাতদন্তর ভিডিও রেকর্ড করার কথা, হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানানোর কথা।
সমাজ-মন ও এনকাউন্টার বা গণপিটুনিতে হত্যা
যে-কথা উল্লেখ করা দরকার তা হল সমাজে গণপিটুনির গ্রহণযোগ্যতা। বলতে দ্বিধা নেই এখন গণপিটুনির সামাজিকীকরণ তো হয়েছেই সামাজিক গণমাধ্যমের কল্যাণে তা এখন জনপ্রিয় পথ। একইভাবে এনকাউন্টার। এ-কথা ঠিক সাধারণ মানুষের আশাহীনতা আছে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে। তাই তারা চায় দ্রুত শাস্তি। ‘খুন কা বাদলা খুন’। আমাদের দেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যাতে প্রতিশোধের দৃশ্যে হাততালিতে ফেটে পরে সিনেমা হল। ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ পুলিশ অফিসারের চরিত্র জনপ্রিয়তা পায়। ‘জনমত’-এর সামনে জনপ্রিয়তা বজায় রাখার দায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যা বলে তাতেও ‘নিকেশ’ করার কথা থাকে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যখন বিরোধী দলনেতা ছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আগে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, “রেকর্ড করে রাখুন বিরোধী দলনেতার কথা, বিজেপি এলে এই ধর্ষকদের কোর্টে পাঠাব না, সকালে জমা নেব বিকেলে খরচ করব। যোগী আদিত্যনাথ-হিমন্ত বিশ্বশর্মার দেখানো পথে সরকার চলবে, কথা দিয়ে গেলাম।” কার্যক্ষেত্রে হলও তাই। রাত্রেই খরচ হয়ে গেল অন্যতম অভিযুক্ত, প্রভাস মণ্ডল।
এই ঘটনা শোনার পর সূর্যপুরে কিছু মানুষের উল্লাস শোনা যায়, যা এখন আবার উদ্বিগ্নতায় গ্রাস করেছে, ‘গণপ্রহারে হত্যা’-য় অভিযুক্তদের খোঁজে পুলিশি অভিযান শুরু হওয়াতে। তথ্যানুসন্ধানের বাইরে সমাজমনের এই হর্ষ-বিষাদ আমাদের বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। সরকার যে এত বড় অপরাধ করল, সেই নিয়ে প্রশ্ন কোথায়? বাসে-ট্রেনে সর্বত্র এনকাউন্টার নিয়ে বীরোচিত সংলাপ। প্রমাণ লোপাটের জন্য পুলিশ এনকাউন্টার ঘটাল কিনা, এই প্রশ্ন ‘সংখ্যাগুরু’ প্রতিহিংসা-প্রেমীদের উল্লাসে উড়ে যাচ্ছে নিমেষে।
আমরা দাবি জানাচ্ছি বিচারবিভাগীয় তদন্তের। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের দিয়ে এই এনকাউন্টার হত্যার তদন্ত হোক।
৯ জুলাই, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেতমজুর সমিতি, শ্রমজীবী মহিলা সমিতি এবং আমরা এক সচেতন প্রয়াস কর্তৃক প্রকাশিত।


আপনার মতামত...