দেবাশিস মিথিয়া
খাদ্যনিরাপত্তা মানে কেবল রাষ্ট্রের গুদামে লক্ষ লক্ষ টন খাদ্যশস্য মজুত থাকা নয়; প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তা হল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষটির থালায় প্রতিদিন তিনবেলা পুষ্টিকর খাবার পৌঁছানো। ২০২৬ সালের এই খরিফ সংকট আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কৃষিক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য তুলে নেওয়া চলবে না; বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থাকে কোনওভাবেই সঙ্কুচিত করা যাবে না। এই অনাবৃষ্টির ধাক্কা থেকে এখনই আমাদের শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং পুষ্টি-ভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে; তা না হলে ‘অদৃশ্য ক্ষুধা’ ও অপুষ্টি আমাদের মানবসম্পদকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দেবে
এ-বছরের খরিফ মরশুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত দেশের খাদ্য-নিরাপত্তাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চলেছে। জুনে ‘এল নিনো’-র কারণে মৌসুমি বায়ু দেরিতে আসায় দেশজুড়ে চাষিরা বৃষ্টিপাতের জন্য হাহাকার করেছেন। আবহাওয়া দপ্তরের মতে, জুন মাসে এমন অনাবৃষ্টি ১৯০১ সালের পর ভারতে আর দেখা যায়নি, যেখানে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ। এই বৃষ্টিহীনতা খরিফ চাষের সময়সূচিকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিয়েছে। গত বছরের তুলনায় খরিফ শস্যের বীজ বোনা ইতিমধ্যেই ২০ থেকে ২৩ শতাংশ কম হয়েছে, যা আগামী দিনে দেশের কোটি কোটি মানুষের অন্নসংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
সাধারণত, জুন ও জুলাই মাসের বৃষ্টিপাত ঠিক করে দেয় সারা বছরের খাদ্য সরবরাহ কেমন থাকবে। বৃষ্টিহীনতার কারণে ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের বীজ বোনা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম হয়েছে। জুন মাসের মধ্যে যে বীজতলা তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, জলের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। ফলে জমিতে চারা রোপণ মারাত্মকভাবে পিছিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে তৈলবীজের ক্ষেত্রে। জুনের শেষ পর্যন্ত দেশের প্রধান ‘সয়াবিন বেল্ট’— মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে, জলের অভাবে প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি জমিতে সয়াবিনের বীজ বোনাই যায়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সয়াবিনের বাজারদাম এবং আমদানির ওপর। এমনিতেই ভোজ্য তেলের জন্য ভারতকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়, আগামী দিনে আরও বেশি খরচ করে আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে চেয়ে থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রোটিনের প্রধান উৎস ডালের (অড়হর, মুগ ও বিউলি) ক্ষেত্রেও একই ছবি। গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে কম চাষ হয়েছে যা আগামী দিনগুলিতে ডালজাতীয় শস্যের মূল্যস্ফীতিকে একলাফে অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। দেশের সেচহীন প্রায় ১১১টি জেলা যেখানে মূলত বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে খরিফ চাষ হয়, কৃষি মন্ত্রক সেগুলিকে ‘উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
নীতিনির্ধারকদের একাংশ অবশ্য দাবি করছেন এই পরিস্থিতি দেশে বড় কোনও খাদ্যসংকট তৈরি করবে না। তাঁরা বাফার স্টক বা সরকারি গুদামে মজুত শস্যের উপর ভরসা করছেন। তবে বিগত বছরগুলির সঞ্চিত বাফার স্টকের ওপর ভর করে যাঁরা সাময়িকভাবে চরম অন্নসংকট ঠেকানোর দাবি করছেন, তাঁদের একটা তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। ২০২১-২২ সালে সরকারের গম সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ৪৩.৩ মিলিয়ন টন, তা পরবর্তী মরসুমগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ২৬-২৮ মিলিয়ন টনে নেমে এসেছে। এই সংগ্রহ-পদ্ধতিকে কৃত্রিমভাবে সঙ্কুচিত করার জন্যই পিছনের দরজা দিয়ে সুকৌশলে ক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যান ও নীতিগত অবস্থান থেকে পরিষ্কার, ভারতের সামগ্রিক গণবণ্টন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে সঙ্কুচিত করে ফেলা হচ্ছে। যে দেশের সরকার পুষ্টিকর খাদ্য তো দূরস্থান, চাল-গমের ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থা থেকেই ধীরে ধীরে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে, তাদের পক্ষে এই অনাবৃষ্টির বাজারে সাধারণ মানুষের পুষ্টির নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব।
আসলে অর্থনীতির এই শুষ্ক পরিসংখ্যান বা গুদামে মজুত শস্যের হিসাব দিয়ে খাদ্য-নিরাপত্তার প্রকৃত রূপ বোঝা অসম্ভব। খাদ্য-নিরাপত্তার আসল চেহারাটি ফুটে ওঠে মানুষের রান্নাঘরে এবং দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৈনিক যাপনে। এখন দেখে নেওয়া যাক, চলতি খরিফ-সংকট গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতির মূল ভিতগুলিকে কীভাবে নাড়িয়ে দিতে চলেছে।
প্রথমত, চাল, ডাল ও ভোজ্য তেলের মতো খরিফ ফসলের উৎপাদন কম হলে বাজারে তার সরবরাহ বিঘ্নিত হবে এবং তার প্রভাব পড়বে দামে। এই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া হলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি খাদ্যতালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার কাটছাঁট করতে বাধ্য হবেন। অর্থনীতিতে একে বলা হয় ‘ক্যালোরি বনাম পুষ্টির দ্বন্দ্ব’— যেখানে স্রেফ পেট ভরাতে বা ক্যালোরি পেতে মানুষ সস্তা চাল-গম কিনতে পারলেও, শরীর গঠনের প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি মেটাতে পারবেন না। ফলে সামাজিকভাবে এক বিশাল অংশের মানুষ, বিশেষত শিশুরা, তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার হবে।
দ্বিতীয়ত, চলতি খরিফ মরশুমের এই অনাবৃষ্টি আগামী দিনগুলিতে গ্রামীণ মহিলাদের পুষ্টি ও শ্রমের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হানতে চলেছে। ভারতীয় গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় মহিলাদের ‘সবার শেষে ও সবচেয়ে কম’ খাওয়ার সংস্কৃতি টিকে রয়েছে, যার ফলে খরিফের ফলন কম হলে এবং বাজারের দাম চড়লে তার অবধারিত কোপ গিয়ে পড়বে পরিবারের নারীদের ওপরেই। ঘরে যখন খাদ্যের টান আরও তীব্র হবে, তখন পরিবারের পুরুষ ও শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিয়ে সংসারের মহিলারা আধপেটা খেয়ে বা না-খেয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হবেন। এর পাশাপাশি, বিলম্বিত মনসুনের ধাক্কায় কৃষিতে মহিলাদের অবৈতনিক শ্রমের বোঝাও আগামী মাসগুলোতে বহুগুণ বেড়ে যাবে। জলের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া চারা পুনরায় রোপণ করা, দূর থেকে জল বয়ে আনা কিংবা শুকিয়ে যাওয়া ফসল বাঁচানোর জন্য যে বাড়তি হাড়ভাঙা খাটুনি, তার সিংহভাগই করতে হবে গ্রামীণ মহিলাদের। অথচ এই অতিরিক্ত শ্রমের কোনও আর্থিক স্বীকৃতি তো মেলেই না, উল্টে মরশুমের শেষে তীব্র পুষ্টিহীনতা ও অতিরিক্ত পরিশ্রমে তাঁদের স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, অনেক চাষিই জুন মাসের শুরুতে বৃষ্টির আশায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে প্রথমবার বীজ বুনেছিলেন, যা জলের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন জুলাই মাসের বৃষ্টির আশায় তাঁদের আবার ধারদেনা করে দ্বিতীয়বার বীজ বুনতে হচ্ছে। এর ফলে চাষের খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও যে কৃষক নিজে খাদ্য উৎপাদন করে দেশের জনগণের পেট ভরায়, ফলন নষ্ট হলে তিনি নিজেই তখন বাজার থেকে চড়া দামে খাবার কিনতে বাধ্য হবেন। আয় কমে যাওয়া এবং বাজারের চড়া দাম— এই দুইয়ের জাঁতাকলে গ্রামীণ ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে নেমে যাবে।
তাছাড়া, জুনের এই বৃষ্টির ঘাটতির প্রভাব কেবল খরিফ মরশুমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর আরও নিচে নেমে যাবে এবং দেশের বড় বড় জলাশয়গুলিও শুকিয়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে আগামী রবি চাষের ওপর। ফলে খরিফ-এর এই ধাক্কা এক প্রকার তরঙ্গ তৈরি করে আগামী মরশুমকেও খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেবে।
প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার মোকাবিলা করতে হলে আমাদের চাষের ধরনে পরিবর্তন আনা জরুরি। ধান বা তুলোর মতো জল-নিবিড় ফসলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, মিলেটের (বাজরা, জোয়ার ও রাগী) মতো জলবায়ু-সহনশীল পুষ্টিকর দানাশস্যের চাষ বাড়াতে হবে। এটি যেমন জলের সাশ্রয় করবে, তেমনই পুষ্টির নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে কৃষিনীতি নির্ধারণের সময় অবৈতনিক মহিলা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, যাতে সংকটের সময়ে তাঁরা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার না হন। এই সমস্ত অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পাশাপাশি, ভারতের গণবণ্টন ব্যবস্থার খামতি দূর করতে আমরা ব্রাজিলের সফল ‘ফমে জিরো’ (জিরো হাঙ্গার) মডেলের সাহায্য নিতে পারি, যার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিচালিত ‘কমিউনিটি কিচেন’ বা পুষ্টিশালা। আমাদের দেশের রেশন ব্যবস্থার বড় খামতি হল এটি কেবল কাঁচা চাল-গম দেয়। কিন্তু খরা বা অনাবৃষ্টির বাজারে যখন ডাল, ভোজ্য তেল ও জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হয়, তখন নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে বাজার থেকে সেসব কিনে কাঁচা শস্যকে পুষ্টিকর খাদ্যে রূপান্তরিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্রাজিলের আদলে এই রাষ্ট্রীয় পুষ্টিশালাগুলি চালু করা গেলে, তা বাজারের মূল্যস্ফীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রান্তিক মানুষ— বিশেষত নারী ও শিশুদের কাছে সরাসরি রান্না করা প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম আহার পৌঁছে দিতে পারবে।
খাদ্যনিরাপত্তা মানে কেবল রাষ্ট্রের গুদামে লক্ষ লক্ষ টন খাদ্যশস্য মজুত থাকা নয়; প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তা হল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষটির থালায় প্রতিদিন তিনবেলা পুষ্টিকর খাবার পৌঁছানো। ২০২৬ সালের এই খরিফ সংকট আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কৃষিক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য তুলে নেওয়া চলবে না; বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থাকে কোনওভাবেই সঙ্কুচিত করা যাবে না। এই অনাবৃষ্টির ধাক্কা থেকে এখনই আমাদের শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং পুষ্টি-ভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে; তা না হলে ‘অদৃশ্য ক্ষুধা’ ও অপুষ্টি আমাদের মানবসম্পদকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দেবে।
*মতামত ন্যক্তিগত


আপনার মতামত...