আইরিন শবনম
এ কথা সত্যি যে বর্তমান বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, তদন্তের ত্রুটি এবং অপরাধীদের অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাই অনেক মানুষকে এনকাউন্টারকে তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার বলে মনে করতে বাধ্য করছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের বিকল্প রাষ্ট্রের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে পারে না। কারণ প্রশাসন যদি বিচারকের ভূমিকাও নিজেই নিয়ে নেয়, তাহলে নির্দোষ মানুষও তার শিকার হতে পারেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ খুলে যায়
বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট, আরজিকর হাসপাতালের নজিরবিহীন এবং নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দগদগে ক্ষতকে আবার খুঁচিয়ে তুলেছে। মনে পড়িয়ে দিয়েছে দেশজোড়া মানুষের নিষ্ফল প্রতিবাদ ও হাহাকারের কথা। মানুষ আন্দোলনের পর আন্দোলনে রাজ্য প্রায় অচল করে ফেলেছে, কিন্তু কোনও ফল পায়নি। যদিও এই সূত্রে একের পর এক দুর্নীতির প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে। মানুষ দেখেছে রাজ্যের চিকিৎসাজগতে কী চলে! অথচ তৎকালীন সরকার দোষীদের আড়াল করতে ব্যস্ত থেকেছে, কাউকে কাউকে পুরস্কৃতও করেছে। এই ঘটনা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই চরম হতাশার জন্ম দিয়েছিল— ‘যাই করা হোক না কেন, কিছুতেই কিছু হবে না, সাধারণ মানুষ এই অচলায়তনকে ভাঙতে পারবে না’। একটা জনআন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা একটা বিরাট ধাক্কা। লড়াকু মানসিকতাকে ধ্বংস করতে, মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে তৎকালীন সরকারের এই ভূমিকা ছিল ভয়ঙ্কর। এ সবকিছুই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী খুব ভালোভাবে জানতেন এবং বুঝতেন। রাজ্যের সরকার বদলে অভয়াকাণ্ডের প্রভাব যে রীতিমতো পড়েছে, তা তাঁর অজানা নয়। এই অবস্থায় সরকারে আসার দু-মাসের মাথায় ঘটে গেল বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক একটা ঘটনা।
সাধারণ মানুষ স্বস্তি চেয়েছিল, শান্তি চেয়েছিল, দুর্নীতি, ধর্ষণ, খুন, তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ থেকে মুক্তি চেয়েছিল। এই সমস্ত প্রত্যাশার চাপ সরকারের উপর ছিল। কিন্তু দু-মাস যেতে না যেতেই এরকম ঘটনা— আবার পুলিশের গাফিলতি, গ্রামবাসী অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরেও তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া, গণরোষের বিস্ফোরণ, গণপিটুনিতে এক অভিযুক্তের মৃত্যু… মানুষ যেন আবার পুরনো সরকারের ভূত দেখতে পায়। ঘটনার নিন্দায় বিরোধী দল-সহ সমাজমাধ্যম মুখর হয়। অভয়ার স্মৃতি আবার মানুষকে তাড়া করে। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ে। কারণ অভয়ার ঘটনায় তৎকালীন সরকারের নিস্পৃহতা একটা শিক্ষা তো দিয়ে গেছে! মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেন এবং কড়া বার্তা দেন— কোনও দোষীকেই ছাড়া হবে না। পুলিশি গাফিলতিও যে কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না, তাও জোর দিয়ে বলা হয়। মানুষ কিছুটা আশ্বস্ত হয়, নাবালিকার পরিবারও মুখ্যমন্ত্রীর উপর আস্থা রাখেন। দ্রুত তিনজন অভিযুক্ত ধরা পড়ে, মানুষের আশা বাড়ে— এবার নিশ্চয়ই বিচার পাওয়া যাবে। সোশাল মিডিয়ায় এমন পোস্টও দেখা গেল, ‘কোথায় তোমার প্রতিশ্রুতি, সকালে জমা বিকেলে খরচের?’ নির্বাচনের আগে ধর্ষকদের সম্পর্কে এই বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন তখনকার বিরোধী দলনেতা এবং প্রচুর হাততালিও পেয়েছিলেন। সমাজের একটা অংশ তার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। এর মধ্যে অবশ্যই অভয়ার আন্দোলনকারীরাও ছিলেন। পরদিন সবাইকে চমকে দিয়ে সেই বাক্যবন্ধের সত্যতা সামনে আসে। এনকাউন্টারে অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে। কিছু মানুষ স্তব্ধ হয়ে যান, কিছু মানুষ ক্ষুব্ধ হন আর অনেক মানুষ খুশি হন। খুশি শব্দটা এখানে বেমানান, কিন্তু তাঁরা সত্যিই খুশি হন কারণ বিচার না পেতে পেতে মানুষের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল যে এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে, মানুষ কোনওদিনই সুবিচার পাবে না। এই ঘটনা তাঁদের কাছে বিচার হিসেবেই হাজির হয়, ন্যায়বিচার। যদিও কেউ কেউ ক্ষীণকণ্ঠে বলতে চান, এই অভিযুক্তকে মেরে ফেলার মধ্যে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই তো? কারণ প্রথম থেকেই অভিযুক্তদের সঙ্গে শাসক দলের নাম জড়িয়েছিল। পুলিশ অবশ্য বলছে, তারা আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়েছে, আমরা সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু এনকাউন্টার নিয়ে বিতর্কের স্বর ক্রমশ উঁচু হচ্ছে। অনেকেই ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে যোগী মডেলের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন, প্রথমে বুলডোজার, তারপর এনকাউন্টার…। এনকাউন্টার বেআইনি বা গণতন্ত্র-বিরোধী কিনা সেই প্রশ্নে পরে যাচ্ছি। তার আগে দেখে নিই অপরাধদমনে যোগীরাজ্যে এনকাউন্টার কতখানি সফল হয়েছে। উত্তরপ্রদেশকে বলা হয় ধর্ষকদের স্বর্গরাজ্য, হাথরাসের নৃশংস ঘটনা আমরা নিশ্চয়ই ভুলিনি, ভুলিনি এই ঘটনার খবর করতে গিয়ে সাংবাদিকদের কী নাকাল হতে হয়েছে! মাসের পর মাস জেলে কাটাতে হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭-২০২৬ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ১৭০৪৩টি এনকাউন্টার করেছে। অর্থাৎ গড়ে দিনে পাঁচটি করে। যার ফলে ২৮৯ জন অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ১১৮৩৪ জন। অথচ NCRB-র সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের মধ্যে উত্তরপ্রদেশে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড সর্বোচ্চ। যার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ এবং পণের জন্য হত্যা।
তাহলে কী বোঝা গেল? এনকাউন্টার করে সত্যিই কি ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়? অপরাধ কমানো যায়? অন্ততপক্ষে পরিসংখ্যান তা বলে না। পরিসংখ্যান বলছে গত দশ বছরে উত্তরপ্রদেশে প্রায় তিনশোজনকে এনকাউন্টারে মারা হয়েছে। কিন্তু তাতে ধর্ষণ বা অপরাধের সংখ্যা কমেনি। অথচ এনকাউন্টার যাঁরা চান বা সমর্থন করেন তাঁরা মনে করেন এই ধরনের ঘটনা হলে মানুষ অপকর্ম করার আগে দুবার ভাববে! কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পরও তাদের ‘শিক্ষা’ হচ্ছে না। এনকাউন্টার অপরাধ কমাতে ব্যর্থ।
এবারে তো এনকাউন্টারের সমর্থকদের ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে, যে উদ্দেশ্যে পুলিশ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, যে কারণে মানুষ এই ঘটনাকে সমর্থন করছে, তা-ই যদি সিদ্ধ না হয় তাহলে কেন এনকাউন্টার? আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া ভুক্তভোগীরা খুব জ্বালা, দুঃখ ও ক্ষোভ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, জটিলতা, হয়রানি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঘুষ এবং উকিল বিক্রি হয়ে ফাঁসির আসামির বেকসুর খালাস পেয়ে যাওয়া (মৌসুমী কয়াল এবিপি আনন্দে যে বক্তব্য রেখেছে) ইত্যাদির কথা বলেছেন। অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, কিন্তু এর বিকল্প কি এনকাউন্টার হতে পারে? একজন বিজেপি সাংসদ টিভি চ্যানেলে বসে বলছিলেন, “আমরা যখন ‘সকালে জমা বিকেলে খরচ’ বলেছিলাম, তখন জনগণ হাততালিতে ফেটে পড়েছিল, অর্থাৎ মানুষ এটা চায়, এতে জনগণের সমর্থন আছে। মানুষ যা চায় তাই হবে, মানুষের জন্যই তো আইন। কথাগুলো শুনতে ভালো, কিন্তু ঠিক এই যুক্তি যদি গণপিটুনির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়? কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, এনকাউন্টার, যা পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় হত্যা, যদি অপরাধ না হয়, তাহলে তাৎক্ষণিক গণরোষের প্রকাশ যে গণপিটুনি তা কেন হবে? গণপিটুনিকে কড়া হাতে দমন করার কথা মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন এবং অতি তৎপরতার সঙ্গে তা করা হচ্ছে। এই ধরপাকড়ে ইতিমধ্যেই রাজনীতির রং লেগেছে। আমরা যদি সে বিষয়ে কোনও প্রশ্ন না-ও তুলি, এ প্রশ্ন তো মাথাচাড়া দেবেই— যে অপরাধে গণপিটুনিতে অভিযুক্তরা অপরাধী সেই অপরাধে…। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যাকে গণপিটুনিতে মারা হয়েছে সে নির্দোষ ছিল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করছে— সে দোষী ছিল, না-কি নির্দোষ, তা বিচার হওয়ার আগে তাকে পিটিয়ে মারা যেমন অপরাধ, তেমনি এনকাউন্টারও অপরাধ। এটা আরও বড় অপরাধ কারণ এটি রাষ্ট্রের দ্বারা সংঘটিত একটি পরিকল্পিত হত্যা। তাই তারা এই এনকাউন্টারের বিরোধিতা করে মিছিল করেছে। টিভিতে একজন সঞ্চালক এই মিছিল প্রসঙ্গে বলছিলেন, এরা প্রভাস মণ্ডলের মানবাধিকারের জন্য গ্যালন গ্যালন চোখের জল ফেলছে, কিন্তু এই নাবালিকাটির মানবাধিকারের কী হবে? তার কি বাঁচার অধিকার ছিল না? যেন একজনের মানবাধিকারের কথা বলার অর্থ অন্যজনেরটা অস্বীকার! এরা তো শুধু বলতে চেয়েছে সাজা আইন দেবে, পুলিশ নয়।
অনেকে বলছেন, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি! যেহেতু প্রভাসের মা এবং স্ত্রী এই হত্যাকে অপরাধের শাস্তি (অনেকটা ভগবানের বিচারের মতো) বলে মনে করেছে, তাই এর পর আর এনকাউন্টার নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠা উচিত নয়। যেন এটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার! এখানে প্রভাস মণ্ডল, তার মা বা স্ত্রী বিষয় নয়, বিষয়টা রাষ্ট্রীয় নীতির। এখানে প্রভাস মণ্ডলের মা এবং স্ত্রী সেই দলেই পড়েন, যাঁরা মনে করেন যে এই ধরনের জঘন্য ঘটনা যারা ঘটায় তাদের বাঁচার কোনও অধিকার নেই এবং তাদের মৃত্যুই প্রাপ্য। ওঁরা অত আইনের মারপ্যাঁচ বোঝেন না। যাঁরা এনকাউন্টারকে সমর্থন করছেন, অনেকটা তাঁদের মতোই এঁদের মনোভাব, তাই এই ক্ষেত্রে প্রভাস মণ্ডলের মা বা স্ত্রী কী বলছেন, তা কখনও নির্ধারক হতে পারে না।
যাঁরা এনকাউন্টারকে সমর্থন করছেন তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন যে একবার এনকাউন্টার বৈধতা পেয়ে গেলে তা শুধু প্রভাসের মতো ধর্ষকদের জন্যই সীমাবদ্ধ থাকবে না, রাজনৈতিক কর্মী, সরকার-বিরোধী কণ্ঠ, পুলিশ বা নেতাদের ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার অস্ত্র হয়ে যাবে।
এ কথা সত্যি যে বর্তমান বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, তদন্তের ত্রুটি এবং অপরাধীদের অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া – মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাই অনেক মানুষকে এনকাউন্টারকে তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার বলে মনে করতে বাধ্য করছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের বিকল্প রাষ্ট্রের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে পারে না। কারণ প্রশাসন যদি বিচারকের ভূমিকাও নিজেই নিয়ে নেয়, তাহলে নির্দোষ মানুষও তার শিকার হতে পারেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ খুলে যায়। তাই প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচার, দোষীদের নিশ্চিত ও কঠোর শাস্তি এবং পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবশ্যই দরকার, কিন্তু সেই কঠোরতা আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যেই প্রয়োগ হওয়া উচিত। তা নইলে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সমাজ ও রাষ্ট্র— উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
এটা ঠিক যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবু গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুক দিয়ে আগলাতে হবে। কারণ এগুলো দুর্বল হয়ে পড়া মানে মানুষের ন্যূনতম স্বাধীনতা ও অধিকারও ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়া। এরকম অবস্থায় প্রশ্নহীন রাষ্ট্রানুগত্যই হবে নাগরিকের একমাত্র কর্তব্য, যখন হিটলারের গ্যাসচেম্বারও বৈধতা পেয়ে যায়।
*মতামত ব্যক্তিগত


আপনার মতামত...