অংশুমান দাশ
এ যেন সত্যিই প্রতিবাদের এক কার্নিভ্যাল। অক্লান্ত গান গাইছে, নাচছে, মজার মজার স্লোগান দিচ্ছে। ধীর-স্থির ভাবের চেয়েও প্রকট হয়ে উঠল— মজা, ব্যঙ্গ। প্রতিপক্ষকে অসম্ভব খিল্লি করে উড়িয়ে দেওয়া, তুড়ি মেরে হাস্যস্পদ করে তোলা। এই ভাষা আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি আগে— তাই আলাদা থেকেছি, বোরিং হয়ে গেছি। আমরা দেখেছি পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার গা-জোয়ারিপনা। এখন দেখলাম— ব্যারিকেডের উপরে ছাত্ররা জাঙ্গিয়া শুকোতে দিয়েছে, গাড়ি গাড়ি খেলছে। পুলিশকে গিয়ে বলছে আই লাভ ইউ, গোলাপ উপহার দিচ্ছে! শহিদ কাদরির সেই তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কবিতাটিকেই চোখের সামনে ঘটতে দেখছি যেন
বাদলদা বলতেন— হাস্যরসের জুড়ি নেই। বাদল সরকারের বেশ কিছু যুগান্তকারী নাটকে তাই রঙ্গব্যঙ্গের খুব জরুরি প্রয়োগ আছে। যুদ্ধবিরোধ বিষয়ে খাটমাট ক্রিং আগাগোড়াই স্ল্যাপস্টিক। মিছিল নাটকে, এমনকি ভোমা-র মতো নাটকেও বাদলদা হাস্যরস আনতে দ্বিধা করেননি। অধুনা দেশ জুড়ে ছাত্রযুবদের আন্দোলন দেখে আবার সে কথা মনে পড়ল।
মিছিলে হাঁটার, কথা বলার সময় অনেক হাত-পা ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কখনও গানের আশ্রয় নিই, স্লোগানেরও। আর পোস্টারের। গানের ভাঁড়ারে— ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’ বা ‘পথে এবার নামো সাথী’ বা ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’। এমন গান হতে হবে যা বেশ তালে তালে ঝম্পর ঝম্পর করে গাওয়া যায়। স্লোগানেও ‘জবাব চাই জবাব দাও’ অথবা ‘দিকে দিকে কমরেড— গড়ে তোলো ব্যারিকেড’। ইদানীং কানহাইয়ার দৌলতে আজাদির স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এখন এই আজাদির মানে আবার অনেকে ‘ভারত থেকে আজাদি’ এইরকম ভেবে দেশদ্রোহিতার গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন— তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি আমার করুণা রইল। স্বাধীন-পরাধীনের এমন সঙ্কীর্ণ ধারণা তৈরি করেছে যে শিক্ষাব্যবস্থা— তার থেকে আজাদি চাইতে ইচ্ছে করে। যাগ্গে, সে প্রশ্ন পরে।

আমার পোস্টার লিখতে ভালো লাগে। আমাদের একটা পোস্টার ওয়ার্কশপ নামে দলও আছে যেখানে আমরা মাঝে মাঝে পোস্টার আঁকি। চমৎকার সব পোস্টার হয়— বুদ্ধিদীপ্ত, সুদর্শন, দারুণ ক্যালিগ্রাফি, রঙের বাঁধুনি। আমরা, অধিকাংশই সেখানে হয় বিরলকেশ নয় পক্ককেশ।
মিছিলে মিছিলে আমদেরই ভিড়। মিছিলের সেই ভাষার জন্ম চল্লিশের, ষাটের, সত্তরের দশকে। তারপর তথাকথিত বামপন্থী মানুষ সরকারে, ফলে বামপন্থী প্রতিবাদের ভাষা আর তৈরি করবেই বা কে, আর করবেই বা কেন! দরকারে সেই পুরনো ভাষা, সুর ও রং ধার করা। যা প্রায় বংশপরম্পরায় বয়ে আসছে, মুখস্থবিদ্যার মতো। আমাদের ধরনও সেই— স্লোগান দিয়ে মিছিল করি, পথের মোড়ে জমায়েত করি, ভাষণ দিই, গণসঙ্গীত গাই, কালো জামা পরে পথনাটক করি— সবই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে প্রাচীনের পুনরাবৃত্তি— লোকে জানে আমরা কী বলব। আমরাও জানি আমরা কী বলব। ফলে মিছিলে না এসেই আমরা সব জেনে যাই।
এই বস্তাপচা ভাষাটা বদলানোর দরকারের কথা কারও মনে হয়েছে কি না জানি না।


সাম্প্রতিককালে যে দুটি আন্দোলন ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিয়েছে তার একটা কৃষক আন্দোলন, আর একটা এই ছাত্র আন্দোলন। সে দুটিই কিন্তু প্রতিবাদের ছকের বাইরে। কৃষকরা দল বেঁধে এসে, রেঁধে বেড়ে, খেয়ে খাইয়ে, হৈ হৈ করে একবছর বসে থাকলেন। পিৎজা খেলেন (সে নিয়ে কথা উঠল— কৃষকরা আবার পিৎজা খায় নাকি), খিচুড়ি খেলেন। ট্রাকে এলেন, ট্রাক্টরে এলেন, ঝামেলা করলেন না, ভাংচুর করলেন না। মাঝেমাঝে ঢোকার চেষ্টা করলেন— জলকামানের ধাক্কা খেলেন। ব্যারিকেড। ইন্টারনেট বন্ধ। কিন্তু অনড় হয়ে বসে রইলেন। অসম্ভব কষ্ট হল— কিন্তু সেই কষ্ট ভাগ করে নিলেন। এক বিশাল বড় স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত— প্রায় মেলার মতো, উৎসবের মতো। অনেক সময় খুব হালকা চালে দেওয়াললিখন দেখি— বিপ্লব হল শোষিতের উৎসব— সেইরকম একটা। খানিকটা। কিন্তু আসল ভাষাটা হল বুকচিতিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা। চোখে চোখ রেখে থাকা সেই খেলাটার মতো— দেখি কার আগে পলক পড়ে! আসল ভাষাটা হল— কুছ পরোয়া নেই ভাবটা। পার্টটাইম প্রতিরোধের বিষয় নয় এটা। প্রতিপক্ষ এতে বুঝতেই পারে না— ব্যাটারা এর পরে কী করতে চাইছে। ঠান্ডা ধীর স্থির।
এই ভাষাটা আর এক দফা এগিয়ে নিয়ে গেল এই ছাত্র আন্দোলন। এ যেন সত্যিই প্রতিবাদের এক কার্নিভ্যাল। অক্লান্ত গান গাইছে, নাচছে, মজার মজার স্লোগান দিচ্ছে। ধীর-স্থির ভাবের চেয়েও প্রকট হয়ে উঠল— মজা, ব্যঙ্গ। প্রতিপক্ষকে অসম্ভব খিল্লি করে উড়িয়ে দেওয়া, তুড়ি মেরে হাস্যস্পদ করে তোলা। এই ভাষা আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি আগে— তাই আলাদা থেকেছি, বোরিং হয়ে গেছি। আমরা দেখেছি পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার গা-জোয়ারিপনা। এখন দেখলাম— ব্যারিকেডের উপরে ছাত্ররা জাঙ্গিয়া শুকোতে দিয়েছে, গাড়ি গাড়ি খেলছে। পুলিশকে গিয়ে বলছে আই লাভ ইউ, গোলাপ উপহার দিচ্ছে! শহিদ কাদরির সেই তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কবিতাটিকেই চোখের সামনে ঘটতে দেখছি যেন! আন্দোলনে আসছেন স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা। আর অবাক করেছে, হাসিয়েছে পোস্টারের ভাষা। ওই প্রসঙ্গেই বাদলদার নাটকের কথা মনে হচ্ছিল। আমরা যখন কবিতা লিখে নিয়ে যাচ্ছি, ওরা পোস্টারে লাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্যানিটারি ন্যাপকিন— এর লিক আটকানোর ক্ষমতা নাকি শিক্ষাদপ্তরের থেকে ভালো। পোস্টারে অনায়াসে লিখছে গালাগাল, স্ল্যাং। লিখছে এমন ভাষা— যা তারা পরস্পরের সঙ্গে বলে থাকে, লেখার আর কথা বলার আড়াল খসে যাচ্ছে যেন। আর কী সব মজা— ‘এই সরকার আমার প্রাক্তন প্রেমিক/প্রেমিকার থেকেও নিষ্ঠুর’, ‘অব কি বার/অন্তিম সংস্কার’, ‘Nobody funds me. I hate corr*** go******** for free’, ‘এই আচ্ছে দিনের থেকে তো খারাপ দিন ভালো ছিল’, ‘চা বেচুন, দেশ নয়’… এইসব আরও নানা। কারও ভুরু কোঁচকাচ্ছে— বুঝি শালীনতার বেড়া টপকাল! তাতে লবডঙ্কা। যাদের বিরূদ্ধে রাস্তায় নামা— তারা কোন শালীনতার গণ্ডিতে থাকছে শুনি? এখানে দেখছি ছেলেদের ভাষা মেয়েদের ভাষার হাঁফধরা কৃত্রিম জেলখানাও ভেঙে গেছে অনায়াসে। পুলিশকে এসে প্রশ্ন করছে— ‘ইস, জলকামানের ব্যবস্থা রাখোনি? তাহলে তো কোনও মজাই নেই। এমন কি টিয়ার গ্যাসও নেই?’ মারতে এলেই গেয়ে উঠছে— ‘জন গণ মন…’। ওমনি পুলিশ স্ট্যাচু। জলের কামানের সামনে নাচছে ভাসানের নাচ। গোটা ব্যবস্থাটাকে একরকম নস্যাৎ করে দিয়ে গোপাল ভাঁড়ের চুটকি করে দিতে পারল এই নব প্রজন্ম। বন্দুকের সামনে এমন রসিক হওয়ার ভাষা আমরা শিখিনি!

প্রতিবাদের মুখে হারিয়ে যাওয়া ভাষা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ রে ছেলেপুলের দল!
*মতামত ব্যক্তিগত


আহা, মন ভরে গেল
হীরক সেনগুপ্ত