আন্দোলনের নারী-স্পন্দন

পৌলমী গুহ

 


এইখানেই ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে নারীবাদের যোগ। কারণ প্রতিবাদ কেবল সরকারের বিরুদ্ধে নয়; প্রতিবাদ সেই মানসিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও, যা নাগরিককে অনুগত দেখতে চায়। রাষ্ট্র, পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়— সব প্রতিষ্ঠানই কোনও না কোনওভাবে শৃঙ্খলা তৈরি করে। মিশেল ফুকো এই ক্ষমতার অদৃশ্য জালকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। জুডিথ বাটলার দেখিয়েছেন, লিঙ্গও সেই ক্ষমতার উৎপাদিত এক সামাজিক অভিনয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর শরীর কেবল প্রতিবাদ করছে না; সে একই সঙ্গে নারীসত্তার প্রচলিত অভিনয়কেও প্রত্যাখ্যান করছে

 

মুম্বইয়ের রাস্তায় হুডি পরা রোগা-পাতলা এক সদ্য তরুণী। বৃষ্টির মধ্যে একটি পুলিশের গাড়িতে এক হাত দিয়ে আটকানোর ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র সবচাইতে চর্চিত যে ছবিটি হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের ভাষা, তার কেন্দ্রে ছিলেন এক কন্যা। দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো সেই কন্যাকে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ বিস্ময়ে দেখেছিলেন।

এমন আরও টুকরো টুকরো ফ্রেম উঠে এসেছিল এই নবতম রাজনৈতিক দলের আন্দোলনে। কোথাও পুলিশের হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলা তরুণী চিৎকার করে কবিতার লাইন বলছেন। কোথাও পুরুষ সহপাঠীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জে দু-হাত মেলে আগলে দাঁড়িয়ে আছেন এক মেয়ে। সরকার, রাষ্ট্র, সমাজ এই তিনের বিপরীতে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে যাঁরা সবচেয়ে লাঞ্ছিত হন, সেই লিঙ্গ। কেন? কেন তাঁদের নিয়ে আলোচনার দরকার হয়ে পড়ছে? কেনই বা নারী-পুরুষ বাইনারি এসে পড়ছে এক স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-আন্দোলনের প্রেক্ষিতে? এর উত্তর বোধহয় নিহিত আছে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনে। এবং দু-হাজার ছাব্বিশে দাঁড়িয়ে যে দর্শন অতীব গুরুত্বপূর্ণ!

দেশের ক্ষমতাশালী শাসকদল প্রথমেই খবরের শিরোনামে ও নারী বনাম রাষ্ট্রের তরজায় জায়গা করে নিয়েছিল যেদিন সাদরে বিলকিস বানোর ধর্ষক কুলদীপ সেঙ্গারকে মালা পরিয়ে বরণ করা হয়েছিল। তারপর একে একে আসারাম বাপু, রামরহিম তালিকায় সংযোজিত হয়েছে। বিস্ময় এখানে নয় যে মনুবাদী রাষ্ট্রশক্তি পৌরুষের জয় হিসেবে ‘ধর্ষণ’-কে মান্যতা দিচ্ছে; বিস্ময় এখানে যে, সেই একই ঘৃণ্য অপরাধের শিকাররাও কম-বেশি ভোটাধিকার-প্রাপ্ত নাগরিক। সুতরাং, নিজের সুস্পষ্ট অবস্থানে কি কোনওভাবে শাসকদল বুঝিয়ে দিয়েছে নারী-জাতির ভোট নিয়ে তারা আসলে চিন্তিত নয়। কে জানে, হয়তো-বা ভবিষ্যতে তারা নারীদের ভোটাধিকার থাকা উচিত নয় মর্মে আইন এনে ফেলবে!

এ আশঙ্কার কারণে ঘৃতাহুতি পড়েছে সোশাল মিডিয়ায় শাসক-দলের ঘোষিত কর্মী-সমর্থকদের ভাষাসন্ত্রাসে। বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদের তো বটেই, এমনকি মতে না মিললে নিজের দলের সমর্থককেও রেপ-থ্রেট, ক্রমাগত যৌনহিংসাত্মক গালি-গালাজ করা এদের স্বভাব। এবং ভাবলে কিঞ্চিৎ অবাকই লাগে, সাম্প্রতিক বঙ্গ-বিজয়ে যারা এক রেপ-ভিক্টিমের মা-কে বিচার পাইয়ে দেবে বলে বিধায়ক পদে দাঁড় করিয়েছে, সেই দলের এমত অবস্থান নিয়ে জনগণেশের হেলদোল বিশেষ নেই। বরং, বিরোধী পক্ষের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য উড়ে এলে বকলমে আহ্লাদিতই হন!

এহেন রাজনৈতিক ও সামাজিক বদলের মুখে দাঁড়িয়ে নারী হিসেবে নিজের অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম যে আদপেই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ কথা বলাই বাহুল্য। তাই আপামর জনসাধারণের নতিস্বীকারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে সম্পূর্ণ নতুনভাবে আন্দোলনের কাণ্ডারি হিসেবে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন— এ দৃশ্য বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশারও উদ্রেক করে বইকী।

বিপ্লবেরও বয়স হয়। তারও ভাষা বদলায়। একসময় বিপ্লবের মুখ ছিল দাড়িওয়ালা তরুণ, হাতে পতাকা; আজকের বিপ্লবের মুখ হয়তো সিলভার নোজ-পিন, কালো কাজল, এলোমেলো চুল, হাতে প্ল্যাকার্ড আর ফোনের ক্যামেরা। এক হাতে সে পুলিশের ব্যারিকেডের ভিডিও করছে, অন্য হাতে বন্ধুকে জল এগিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্র তাকে এখনও “ছাত্রী” বলে, সংবাদমাধ্যম কখনও “যুবতী”, সমাজ “মেয়ে”— কিন্তু সে নিজেকে প্রথমে নাগরিক ভাবে। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনটিই সম্ভবত একবিংশ শতকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা।

সাম্প্রতিক সিজেপি আন্দোলনকে যদি কেবল পরীক্ষা, শিক্ষা বা ছাত্র-অধিকারের আন্দোলন হিসেবে পড়ি, তবে আমরা তার সবচেয়ে গভীর স্তরটি হারিয়ে ফেলব। কারণ এই আন্দোলনের কেন্দ্রে কেবল রাষ্ট্র বনাম ছাত্র নেই; রয়েছে রাষ্ট্র বনাম নতুন নাগরিক, আর সেই নতুন নাগরিকের মুখ ক্রমশ নারীর মুখ, কুইয়ার শরীর, নন-বাইনারি কণ্ঠ এবং এমন এক প্রজন্ম, যারা ক্ষমতার সঙ্গে আপসকে আর রাজনৈতিক পরিণতিবোধ বলে মনে করে না।

সিমোন দ্য বোভোয়ার লিখেছিলেন— “কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে।” কিন্তু আজকের প্রশ্নটি সম্ভবত আরও কঠিন। জেন-জি কি আদৌ সেই ‘নারী’ হয়ে উঠতে চায়, যাকে বিংশ শতক কল্পনা করেছিল? নাকি সে “ভালো মেয়ে”, “আদর্শ কন্যা”, “সম্ভ্রান্ত স্ত্রী”, “সংযত নাগরিক”— এই সমস্ত পরিচয়ের অভিধানটাকেই ছিঁড়ে ফেলছে?

আশি ও নব্বইয়ের দশকের নারীরা লড়েছিলেন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে জায়গা করে নেওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, সংসারে মতামতের স্বীকৃতি— তাঁদের সংগ্রাম ছিল প্রবেশাধিকারের সংগ্রাম। কিন্তু জেন-জির প্রশ্ন আলাদা। তারা জিজ্ঞাসা করতে পারে— যে প্রতিষ্ঠান আমাকে বারবার অপমান করে, সেখানে প্রবেশ করাই বা কেন আমার লক্ষ্য হবে? এখানেই এই প্রজন্মের রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিক পরিবর্তন।

এই প্রজন্মের নারীরা “সহ্য” শব্দটির রাজনৈতিক মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে নারীর গুণ হিসেবে যে সহিষ্ণুতা, নীরবতা, সমঝোতা এবং আত্মত্যাগকে উদযাপন করা হয়েছে, জেন-জি সেই নৈতিকতাকেই প্রত্যাখ্যান করছে। সম্পর্কে অসম্মান? ছেড়ে দেব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য? প্রকাশ্যে বলব। শিক্ষক, প্রশাসন বা রাষ্ট্র— কোনও ক্ষমতাকেই আর জন্মগত নৈতিক মর্যাদা দেওয়া হবে না। সারা আহমেদ তাঁর Living a Feminist Life-এ লিখেছিলেন, নারীবাদ প্রায়ই “কিলজয়” হয়ে ওঠার সাহস। অর্থাৎ যে আনন্দের ভেতর অন্যায় লুকিয়ে থাকে, সেই আনন্দকে ভেঙে দেওয়া। জেন-জি নারী সেই “ফেমিনিস্ট কিলজয়”— সে পারিবারিক নৈশভোজের আসরে মাথা নিচু করে বসে থাকার জন্য জন্মায়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে প্রশ্ন তোলার, প্রেমের সম্পর্কেও সমান সম্মান দাবি করার, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে জায়গা করার, সহ-নাগরিকের ঔদ্ধত্যের সমুচিত জবাব দেওয়ার অস্ত্রে সজ্জিত।

এই প্রজন্মকে অনেকেই উদ্ধত বলে। কিন্তু উদ্ধত তারা কার কাছে? যে সমাজ এখনও নারীর বিনয়কে তার নৈতিকতার মাপকাঠি বলে মনে করে, তার কাছেই তো আত্মমর্যাদা উদ্ধত মনে হবে! যে সমাজের প্রায় অধিকাংশ পুরুষ মনে করেন গৃহকর্মে নিপুণতা নারীদের জন্মগত ব্যাপার, এবং তাঁরা নিজেদের মা-দিদিমার আমলের তুলনা টেনে সন্তানধারণ, রাঁধা-বাড়ার মহান কর্তব্যে অবিচল নারীদের আদর্শ ঠাওরান, সেখানে নারীর স্বাধিকারের প্রশ্ন ঔদ্ধত্য নয়তো আর কি?

 

এইখানেই ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে নারীবাদের যোগ। কারণ প্রতিবাদ কেবল সরকারের বিরুদ্ধে নয়; প্রতিবাদ সেই মানসিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও, যা নাগরিককে অনুগত দেখতে চায়। রাষ্ট্র, পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়— সব প্রতিষ্ঠানই কোনও না কোনওভাবে শৃঙ্খলা তৈরি করে। মিশেল ফুকো এই ক্ষমতার অদৃশ্য জালকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। জুডিথ বাটলার দেখিয়েছেন, লিঙ্গও সেই ক্ষমতার উৎপাদিত এক সামাজিক অভিনয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর শরীর কেবল প্রতিবাদ করছে না; সে একই সঙ্গে নারীসত্তার প্রচলিত অভিনয়কেও প্রত্যাখ্যান করছে।

আজকের নারী আর “মেয়েলি” হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। সে শাড়ি পরে মিছিল করতে পারে, আবার পরদিন কার্গো প্যান্ট পরে ব্যারিকেডে দাঁড়াতে পারে। সে লিপস্টিক পরতে ভালোবাসতে পারে, আবার একেবারেই প্রসাধনবিমুখ হতে পারে। সে বিষমকামী হতে পারে, সমকামী হতে পারে, নন-বাইনারি পরিচয় গ্রহণ করতে পারে, কিংবা কোনও পরিচয়ের খাঁচাতেই নিজেকে আটকে রাখতে অস্বীকার করতে পারে। অর্থাৎ নারীত্ব এখন আর কোনও স্থির সাংস্কৃতিক প্রকল্প নয়; এটি প্রতিদিন পুনর্লিখিত একটি রাজনৈতিক ভাষা। এই কারণেই জেন-জির নারীবাদকে কেবল “মেয়েদের অধিকার” বলে বোঝা যায় না; এটি লিঙ্গ-পরিচয়, শরীর, আকাঙ্ক্ষা এবং নাগরিকত্বের সম্পূর্ণ নতুন ব্যাকরণ।

এখানেই সমকালীন রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হয়। কারণ অধিকাংশ আধুনিক রাষ্ট্র— সে ডানপন্থী হোক বা বামপন্থী— একটি স্থিতিশীল, নিয়ন্ত্রিত, পূর্বনির্ধারিত নাগরিককে কল্পনা করে। কিন্তু জেন-জি সেই স্থিতিশীলতার ধারণাকেই অস্বীকার করছে। তারা অ্যালগরিদমের যুগে বড় হয়েছে; তথ্যের কেন্দ্রীকরণ নয়, নেটওয়ার্কে বিশ্বাস করে। নেতৃত্বের চেয়ে অংশগ্রহণে, ভাষণের চেয়ে সংলাপে, আদেশের চেয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আস্থা রাখে। ফলে এই প্রজন্মের আন্দোলনও স্বভাবতই বিকেন্দ্রীভূত, বহুস্বরিক এবং অনিয়ন্ত্রিত।

রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ন্যান্সি ফ্রেজার যাকে “ক্যানিবাল ক্যাপিটালিজম” বলেছেন, সেই ব্যবস্থা শিক্ষা, শ্রম এবং যত্ন— সবকিছুকেই বাজারে পরিণত করে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি উৎপাদন করে, ডিগ্রি শ্রমিক উৎপাদন করে, শ্রমিক মুনাফা উৎপাদন করে। কিন্তু এই সমীকরণ ভেঙে পড়ে যখন শিক্ষিত যুবসমাজ কাজ পায় না, অথবা কাজ পেলেও মর্যাদা পায় না। তখন ছাত্র-আন্দোলন অর্থনৈতিক প্রশ্ন থেকে রাজনৈতিক প্রশ্নে, রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে অস্তিত্বের প্রশ্নে পৌঁছে যায়। আর নারীদের ক্ষেত্রে এই সংকট দ্বিগুণ; কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের সামাজিক স্বাধীনতাকেও খর্ব করে।

এই কারণেই সিজেপি আন্দোলনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়েকে কেবল একজন প্রতিবাদী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সে ইতিহাসেরও উত্তরাধিকারী। প্যারিস ‘৬৮, সোয়েটো, শাহবাগ, হংকং, ইরানের “Woman, Life, Freedom”— সব সংগ্রামের অদৃশ্য প্রতিধ্বনি তার ভেতরে কাজ করছে। সে কোনও একক মতাদর্শের সন্তান নয়; বরং এক বিশ্বায়িত রাজনৈতিক কল্পনার উত্তরসূরি, যে একই সঙ্গে বেল হুকস পড়ে, রোকেয়াকে মনে রাখে, বিলকিস বানোকে ভোলে না, আর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে তত্ত্বের সমান গুরুত্ব দেয়।

সম্ভবত এই কারণেই আজকের প্রশ্ন আর কেবল— “নারীরা আন্দোলনে কেন?”— নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত— “আজকের ছাত্র-আন্দোলন কি এই নতুন নারীর রাজনৈতিক ভাষা না বুঝে আদৌ নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে?”

আগেই বলেছি, রাষ্ট্রের একটি প্রিয় কল্পনা আছে— একজন “ভালো নাগরিক”। সে আইন মানবে, প্রশ্ন করবে সীমিত পরিসরে, প্রতিবাদ করবে নির্ধারিত ভাষায়, আর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্বে আস্থা রাখবে। একইভাবে পিতৃতন্ত্রেরও একটি প্রিয় কল্পনা আছে— একজন “ভালো নারী”। তিনি বিনয়ী হবেন, সহনশীল হবেন, পরিবারের সম্মান বহন করবেন, ক্রোধকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে ভাববেন। এই দুই কল্পনা আশ্চর্যভাবে একে অপরের প্রতিবিম্ব। ফলে যখন কোনও তরুণী রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলে, সে একই সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতার বিরুদ্ধেও দাঁড়ায়। এই কারণেই নারীর ছাত্র-রাজনীতি কখনও কেবল ছাত্র-রাজনীতি নয়; এটি শরীরেরও রাজনীতি, ভাষারও রাজনীতি, উপস্থিতিরও রাজনীতি।

র‍্যাডিক্যাল নারীবাদ বহুদিন ধরেই এই সম্পর্কটির দিকে আঙুল তুলেছে। ক্যাথরিন ম্যাককিননের মতে, রাষ্ট্র প্রায়শই এমন এক নিরপেক্ষতার ভাষা ব্যবহার করে, যার ভেতরে ক্ষমতার বিদ্যমান সম্পর্কগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। আইন সকলের জন্য সমান— এই বাক্যটি কাগজে সত্য হতে পারে; কিন্তু সামাজিক ক্ষমতা সকলের সমান নয়। ফলে ছাত্র-আন্দোলনের প্রশ্নে নারীর অভিজ্ঞতা কখনও পুরুষের অভিজ্ঞতার অনুলিপি নয়। একই ব্যারিকেড, একই লাঠিচার্জ, একই স্লোগান— তবুও তার শরীরকে আলাদা সামাজিক অর্থ বহন করতে হয়।

এই প্রসঙ্গে ভারতীয় সমাজের দীর্ঘ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিশেষত যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছি। মনুস্মৃতি ইতিহাসে নারীর অবস্থান সম্পর্কে এমন বহু বিধান ধারণ করে যা আধুনিক নারীবাদী চিন্তায় অবশ্যম্ভাবীভাবে তীব্র সমালোচিত। “পিতা রক্ষতি কৌমারে, ভর্তা রক্ষতি যৌবনে…”— এই ধারণা নারীর স্বাধীন অস্তিত্বকে নয়, তার অভিভাবকত্বকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও সমকালীন ভারতীয় সমাজকে সরলরৈখিকভাবে মনুস্মৃতি-র প্রতিফলন বলা ইতিহাসগতভাবে যথাযথ হবে না, তবুও বহু নারীবাদী চিন্তক যুক্তি দিয়েছেন যে নারীর শরীর, যৌনতা এবং সামাজিক ভূমিকা নিয়ে যে নিয়ন্ত্রণমূলক কল্পনা ভারতীয় সমাজে বারবার ফিরে আসে, তার সাংস্কৃতিক শিকড় এই ধরনের ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপে গড়ে উঠেছে। এই কারণেই “মনুবাদ” শব্দটি সমকালীন রাজনৈতিক আলোচনায় বহু কর্মী ও লেখকের কাছে একটি সামাজিক রূপক— শুধু একটি গ্রন্থের নাম নয়, বরং একটি ক্ষমতার বিন্যাসের প্রতীক। এবং তার সবচাইতে পরিচিত মুখটি বর্তমান শাসকদলে খোদাই করা রয়েছে!

এখানেই সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির এক মৌলিক বিতর্ক উপস্থিত হয়। একদিকে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্য পরিবার এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেয়; অন্যদিকে বহু নারীবাদী, দলিত, কুইয়ার ও ছাত্র-আন্দোলন সেই ঐতিহ্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা অসম ক্ষমতা, লিঙ্গবৈষম্য ও সামাজিক স্তরবিন্যাসকে প্রশ্ন করে। এই দ্বন্দ্ব কেবল কোনও এক রাজনৈতিক দলের সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি আধুনিক ভারতের আত্মপরিচয়ের বিতর্ক। রাষ্ট্র কেমন হবে? নাগরিক কেমন হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— নারী কি জাতির প্রতীক, না জাতির সমান নাগরিক?

এই প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু উত্তর বদলেছে।

সত্তরের দশকের নারীবাদ রাষ্ট্রকে বলেছিল— “আমাকেও ঢুকতে দাও।” জেন-জি এই অনুমতি প্রার্থনার অপেক্ষায় থাকেনি, তারা জানে তাদের অধিকার। এবং সেই অধিকারের মর্যাদা লঙ্ঘিত হওয়ামাত্র তারা ফেটে পড়তেও জানে।

এই প্রজন্মের রাজনৈতিক অভিধানে “অসম্মান” আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি কাঠামোগত। একজন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীর যৌনকর্মীদের ও নারীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য, প্রশাসনের নীরবতা, ক্যাম্পাসের যৌন হয়রানি, রাজনৈতিক সহিংসতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা— সবকিছুকে তারা একই ক্ষমতার মানচিত্রে পড়তে শেখে। এখানেই কিম্বার্লে ক্রেনশ-এর intersectionality ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। নারী কেবল নারী নয়; তিনি শ্রেণি, জাত, ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল, বর্ণ, যৌন পরিচয়— সবকিছুর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন। ফলে কোনও ছাত্র-আন্দোলন যদি এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে স্বীকার না করে, তবে তার গণতন্ত্রও থাকবে অসম্পূর্ণ।

এই প্রজন্মকে বোঝার জন্য তাদের নন্দনতত্ত্বও বোঝা জরুরি। তারা প্রতিবাদকে কেবল রক্তাক্ত বীরত্বে সীমাবদ্ধ রাখে না। ব্যঙ্গ, মিম, কবিতা, রিল, পোস্টার, স্টিকার, গ্রাফিত্তি— সবই তাদের রাজনৈতিক ভাষা। তারা কান্নাকে লুকোয় না, আবার রাগকেও ভয় পায় না। তারা প্রেম করে, প্রতিবাদও করে। তারা সাজে, আবার ব্যারিকেডও তোলে। বহু সমালোচক একসময় ভাবতেন নারীবাদ মানেই নারীত্বের প্রত্যাখ্যান। জেন-জি সেই ধারণাকে অচল করে দিয়েছে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে— লিপস্টিক কখনও বিপ্লবের বিপরীত নয়; বিপ্লবের শত্রু হল বাধ্যতামূলক লিপস্টিক। শাড়ি প্রতিক্রিয়াশীল নয়; প্রতিক্রিয়াশীল হল শাড়িকে নারীত্বের একমাত্র বৈধ পোশাক হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ নারীত্ব তখনই মুক্ত, যখন তা পছন্দের ফল; বাধ্যবাধকতার নয়।

এই অবস্থানই জুডিথ বাটলারের “gender performativity”-কে নতুন সামাজিক অর্থ দেয়। জেন-জির কাছে লিঙ্গ কোনও স্থায়ী পরিচয় নয়; এটি আলোচনাযোগ্য, পরিবর্তনযোগ্য, প্রশ্নযোগ্য। তাদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের নারী হিসেবেই চিহ্নিত করেন, আবার অনেকেই লিঙ্গপরিচয়ের বাইরেও নিজেদের ভাবেন। ফলে এই প্রজন্মের রাজনীতি “মেয়েদের সমস্যা” নয়; এটি পরিচয়ের স্বাধীনতার রাজনীতি।

কিন্তু এখানেই আরেকটি বিপদও রয়েছে। পুঁজিবাদ খুব দ্রুত প্রতিবাদকেও বাজারে পরিণত করে। যেভাবে চে-গেভারা টি-শার্টে বিক্রি হন, কর্পোরেট বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হন, ব্র্যান্ডের প্রচারে বিক্রি হন— সেভাবেই নয়া-নারীবাদকেও বাজারে তোলা হয়। তবে মজার কথা এই যে, নতুন প্রজন্ম নিজের শরীরের অধিকারকে এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করার ক্ষমতা রাখে যে, নারীর পণ্যায়নের দিকটি তাদের কাছে অজানা বা ‘জোর করে চাপানো’— এমনটা ভাবার কারণ নেই।

অ্যাঞ্জেলা ম্যাকরবি ও ক্যাথরিন রটেনবার্গ দেখিয়েছেন, নব-উদারবাদ নারীর স্বাধীনতাকেও ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পে পরিণত করে। ফলে একজন সফল নারীকে সামনে রেখে সমাজের কাঠামোগত বৈষম্যকে আড়াল করা সহজ হয়ে যায়। এই কারণেই ছাত্র-আন্দোলনের নারীবাদ কর্পোরেট “empowerment”-এর ভাষা নয়; এটি সমষ্টিগত মুক্তির ভাষা।

ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি বড় ছাত্রবিদ্রোহ একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনার জন্ম দিয়েছে। প্যারিস ‘৬৮ আমাদের শিখিয়েছিল কল্পনাও রাজনৈতিক। চিলি শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন প্রশ্ন করেছিল। হংকং দেখিয়েছিল, শহরও প্রতিবাদের শরীর হতে পারে। ইরানের “Woman, Life, Freedom” আন্দোলন দেখিয়েছে, নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আসলে গণতন্ত্রের সংগ্রাম। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-অভ্যুত্থানও দেখিয়েছে যে যুবসমাজ কখনও কখনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে নতুন নাগরিক ভাষা নির্মাণ করে। এই সমস্ত ইতিহাসের ভেতরেই আজকের ভারতীয় ছাত্র-আন্দোলনকে পড়তে হবে।

সিজেপি আন্দোলনের তাৎপর্য তাই কেবল তার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফলে নয়। এর গুরুত্ব এই যে, এটি আমাদের সামনে এমন এক প্রজন্মকে হাজির করেছে, যারা আপসকে পরিণতিবোধ, নীরবতাকে ভদ্রতা, আর আনুগত্যকে দেশপ্রেম বলে মানতে নারাজ। তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে তর্ক করে, পরিবারের সঙ্গে তর্ক করে, প্রেমের সঙ্গীর সঙ্গে তর্ক করে, এমনকি নিজেদের সঙ্গেও তর্ক করে। তারা কোনও একক মতাদর্শের সন্তান নয়; তারা বৈপরীত্যের সন্তান। এই বৈপরীত্যই তাদের শক্তি।

হয়তো এই কারণেই বর্তমান ছাত্র-আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অবদান কোনও সরকারকে বিব্রত করা নয়। তার সবচেয়ে বড় অবদান— একটি নতুন রাজনৈতিক মানুষ তৈরি করা। যে মানুষ নারীও হতে পারে, পুরুষও হতে পারে, নন-বাইনারিও হতে পারে; কিন্তু সর্বাগ্রে সে নাগরিক। আর যে মুহূর্তে নারী নিজেকে প্রথমে নাগরিক বলে ঘোষণা করে, সেই মুহূর্তেই পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে পুরনো ব্যাকরণ ভেঙে পড়তে শুরু করে।

সিজেপি-র আন্দোলনে জেন-জি বেছে নিয়েছিল সোশাল মিডিয়াকে। যে সোশাল মিডিয়া ভারতীয় উপমহাদেশে পুরুষকে দিয়েছে অবারিত যৌনহিংসাত্মক উক্তির অধিকার, ফেক প্রোফাইল থেকে যথেচ্ছ আক্রমণের অধিকার এবং নারী, যে কোনও নারী তার বয়স, ধর্ম, সামাজিক অবস্থান যাই-ই হোক না কেন, পুরুষের লালসার একটি পণ্য হিসেবে দেখার দায়হীন নির্ভার অধিকার। অথচ, সোশাল মিডিয়াতে গোটা পৃথিবীর চোখের সামনে একটি অপ্রেসড ক্লাস হিসেবে ভারতীয় নারীরা বেঁচে থাকবেন— এ আশা নষ্টমস্তিষ্ক পুরুষতান্ত্রিক অবমানবরা ছাড়া বোধহয় আর কেউই করেন না। এবং এই প্রজন্মের পুরুষরাও নারীকে সেকেন্ড সিটিজেন হিসেবে ভাবতে নারাজ। সেই মানসিকতার প্রতিফলনও এই সোশাল মিডিয়াতে বারংবার উঠে আসে। জেন-জি-রা নব্বইয়ের দশকের অসহায় নায়িকা, যাঁদের নায়ক ছাড়া উত্তরণের আর কোনওই উপায় ছিল না— এই ভূমিকাটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। শিভ্যালরির নামে কেউই দুর্বল করে রাখার ফান্ডাতে আর কাজ করেন না। তাই সহপাঠিনী অনায়াসে পুলিশের লাঠিচার্জে এগিয়ে এলে তাঁদের পৌরুষ আহত হয় না। একই কারণে রাষ্ট্রের চোখরাঙানিতে কন্যারা মাইক হাতে স্লোগান তোলেন। দৃপ্ত ভঙ্গিমায় উচ্চারণ করেন, “রাজা, তোমার কাপড় কোথায়?”

বাইবেল বলেছিল মানবসন্তানের স্বর্গচ্যুত হওয়ার কারণ এক নারী। নারী যে চিরকাল অঘটনঘটনপটিয়সী এ-বিষয়ে ধর্মরক্ষকদের কোনওই সন্দেহ ছিল না। ভারতীয় সমাজ চিরকাল বোঝা হিসেবে দেখে এসেছে যাদের, তাদের জন্য লক্ষণরেখা পার না হওয়ার আদেশটাই এতদিন কার্যকরী ছিল। কিন্তু এ প্রজন্মের ভাষা তা নয়। এ প্রজন্ম কী করণীয় নয়-এর তালিকা শুনে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্ম নয় বলেই এরা প্রশ্ন করতে শিখেছে। এরা গাইতে পারে নির্দ্বিধায়—

And I can be all the things you told me not to be
When you try to come for me, I keep on flourishing
And he sees the universe when I’m in bed
It’s all in it, you’ll believe God is a woman
(I’m tellin’ you, yeah, you’ll believe God is a woman)

এদের কাছে নারীর ভূমিকা সুখী গৃহকোণে মা, স্ত্রী, বোন, মেয়ে হয়ে জীবন কাটানো ও সার্টিফিকেটে খুশি থাকা নয়। এরা চিৎকার করে বলতে জানে—

All day, every day, therapist, mother, maid
Nymph then a virgin, nurse then a servant
Just an appendage, live to attend him
So that he never lifts a finger
24/7, baby machine
So he can live out his picket fence dreams
It’s not an act of love if you make her
You make me do too much labour…

সম্ভবত ইতিহাস একদিন এই সময়টিকে কোনও একটি আন্দোলনের নামে মনে রাখবে না। মনে রাখবে এক প্রজন্মকে— যে প্রজন্ম “ভালো মেয়ে”, “লক্ষ্মী মেয়ে” হওয়ার দায় থেকে আক্ষরিকভাবেই মুক্ত। যারা “আদর্শ কন্যা” হওয়ার পুরস্কারও চায় না। তারা কেবল স্বাধীন মানুষ হতে চায়। আর ইতিহাস সাক্ষী, স্বাধীন মানুষের চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছুই রাষ্ট্র কখনও খুব বেশি ভালোবাসেনি।

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.