Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যে লেখা মানুষ গন্ধে গান্ধিক

অমিতাভ প্রহরাজ

 

 

সূচনা —

এই উপন্যাসটি আমি সবাইকে সংগ্রহ করতে অনুরোধ করব। আমার গত পাঁচ-ছ বছরে পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এবং চরম ডিস্টার্বিং।

এইরকম ডিস্টার্বিং লেখা যাতে সেক্স বা যৌনশব্দ, খিস্তি, ভয়ংকর চিত্রকল্প কোনওকিছু ছাড়া জাস্ট একটা রূপকমাত্র, ফুল, ফুলের চাষ, তা দিয়ে লেখা যেতে পারে কল্পনাতেও আনতে পারিনি। আমি বৈদ্যনাথদাকে বলেছিলাম, এখানে সর্বসমক্ষে বলছি, লেখকের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই কোনওরকম, সন্দীপনের পর আর অজিত রায়ের যোজন ভাইরাসের পর (অবশ্যই কমল চক্রবর্তীর ব্রহ্মভার্গবপুরাণ আমি রাখব) এই স্তরের ডিস্টার্বিং উপন্যাস আমি পড়িনি।

ডিস্টার্বিং কথাটায় জোর দিলাম। এবং, এবং আপনি যদি শূন্য দশক নব্বই দশক দেখা মানুষ হন এবং লিটল ম্যাগাজিন করে থাকেন, তাহলে এই উপন্যাস সন্দীপনের চেয়েও চরম ডিস্টার্ব করবে। তার নগ্ন সত্যি পেশকশের ভঙ্গি দিয়ে।

বাংলা লিটল ম্যাগাজিন জগতের গত তিন দশকে কি চেহারা হয়েছে, সেই পাঁচিল তোলা ফুলের বাগানের মধ্যে প্রকৃত কী ঘটে চলে তা জানতে চাইলে এই উপন্যাসটি টেক্সটবুক।

আমি প্রথমে উপন্যাসটি পড়তে পারছিলাম না, অথচ এ্যাট দ্য সেম টাইম, এত তুমুল রিডেবিলিটি যে ছাড়তেও পারছিলাম না। এই দশা আমার শেষ কবে হয়েছে মনে করতে পারি না। সরল গল্পের ফ্রেম, একটাই রূপক, ফুলের, আর অনেক চরিত্র। আর প্রতিটা চরিত্র আপনার সামনে আয়না নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। ওফফফফ। কী অভিজ্ঞতা এটা পড়ার!!

প্রথমে মনে হয়েছিল এটা কি শূন্য দশকের আমাদের পত্রিকা নিয়েই লেখা? এত নিখুঁত জানলেন কী করে লেখক?!! পরে বুঝলাম এটাই সার্বিক ছবি যা এই ম্যাগনাম ওপাসে তৈরি করেছেন রাহুলবাবু। প্লিজ, ধার করে হোক, চুরি করে হোক, টাকা জোগাড় করে এই বইটি কিনে পড়ুন/পড়। প্লিজ পড়। তারপর বলুন/বলিস আমার এত উত্তেজিত হয়ে নিজে থেকে এত কথা লেখা বইটি সম্পর্কে অযৌক্তিক কিনা। লিটল ম্যাগাজিনের যাপন, গত তিন দশকের (কৃত্তিবাসীয় বা কৌরবীয় যাপন নয়) নিয়ে শ্রেষ্ঠ এবং নগ্নতমভাবে সত্যনিষ্ঠ লেখা “বাতাসে এখন ফুলের গন্ধ নেই”। পিরিয়ড। ম্যাগনাম ওপাস বলতে যা বোঝায়, তাই।

বাতাসে এখন ফুলের গন্ধ নেই

লেখক- রাহুল দাশগুপ্ত

প্রকাশক- দমদম জংশন

মূল্য-৩০০

বিস্তার —

দেবব্রতবাবু চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের জন্য রাহুল দাশগুপ্তের “বাতাসে এখন ফুলের গন্ধ নেই” সম্পর্কে কিছু লেখার কথা বললেন বললেন যখন, পড়লাম চরম ফ্যাসাদে। কারন অতিরিক্ত প্রিয় পাঠবস্তু নিয়ে কম কথায় লেখা বড় যন্ত্রণা আমার কাছে। তাই ঠেলতে ঠেলতে এই শেষ মুহূর্তে এসে যখন লেখাটি জমা দিচ্ছি, তখন অনেক কথাই না লেখা থেকে যাবে স্বাভাবিক।

বাতাসে-ফুলের-গন্ধ (এখন থেকে এই ডাকনামে ডাকলাম উপন্যাসটিকে) একটি লুপ্তপ্রায় ধারার সাহিত্যকীর্তি। লুপ্তপ্রায় কারণ প্রকৃত প্লট বেসড, কনটেন্ট বেসড, ন্যারেটিভ বেসড উপন্যাস লেখার জন্য প্রয়োজন হয় মানুষের আদিম ওই গল্প বলার সহজাত ক্ষমতা ও দক্ষতা। যা জটিলে জটিলে জটজটে হয়ে বর্তমান গদ্যকারেরা অজান্তেই কখন হারিয়ে ফেলেছেন, আর ভাষাপরীক্ষা, স্ট্রাকচারপরীক্ষার নাম করে ওই ক্ষমতা ও দক্ষতার অভাবকে জাস্টিফাই করে একদল এসকেপিস্ট গদ্যভাণ্ডারের মোচ্ছব লাগিয়ে দেন নানা লিটল এবং ওয়েব ম্যাগে। সেইখানে রাহুল দাশগুপ্তর মতো গুটিকয়, সত্যিই আঙুলে গোনা যায় এনাদের সংখ্যা, যাঁরা উপন্যাস নামক ফর্মটির আদ্যন্ত শুদ্ধতা বজায় রেখে চর্চা করে থাকেন। এ বড় বিরল এক শিল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধীরে ধীরে।

তাই বাতাসে-ফুলের-গন্ধ আপনাকে প্রথম পাতা থেকে তার সারল্যে ডেকে নেবে। হৃদয়পুর বলে এক দ্বীপ, যেখানে ফুল অবলুপ্ত, আর কিছু কচি গাছের মতো তরুণ। হৃদয় তার একজন। যারা ফুলের চর্চা করে। কী? বড্ড সরল ঠেকছে না এমন এক প্লট? বড্ড বাংলা রোমান্টিসিজমের আতর খুশবাই পাচ্ছেন তো? আর এখানেই পিরানহার মতো সাদাসিধে শব্দরা রাহুলবাবুর, চরিত্ররা কখন ঘিরে ধরবে আপনাকে বুঝতেই পারবেন না। যখন বুঝবেন যে এত রোমান্টিসিজম, লিরিসিজম নয়, এ তো এই অভাবনীয় সারল্যে অত্যুজ্জ্বল এক নৃশংস শান্ত রাক্ষস। শান্ত রাক্ষসের মতো এই উপন্যাসটি। যেখানে একের পর এক চরিত্র আসবে। কোনও জটিলতা নেই বিন্যাসে। একদম সাইকোলজির থিসিস পেপারের মতো, কেস স্টাডি-১, কেস স্টাডি-২, এইভাবে একের পর এক ঘটনাবর্ণন করেছেন রাহুলবাবু। ঘটনা না চরিত্র বিশ্লেষণ? চরিত্র বিশ্লেষণ না আন্তঃসম্পর্ক আবহাওয়ার মর্জি মেজাজ বর্ণন? একেকটা কেস স্টাডিতে প্রকৃত কী আছে আপনি বুঝতে পারবেন না। গল্প আছে, সরল গল্প, সম্পর্ক আছে, মেহুলী, আগ্নেয়, বিশ্রুত, উদ্ভাস, বিহান, সাঁঝ, অনির্বেদ, সমিধা, এইসব চরিত্ররা আছে, তবু বুঝতে পারবেন না। এক অলৌকিক সরল ভাষায় যেন দেখে দেখে বলে যাচ্ছে কেউ এইভাবে বলা হবে নানান ঘটনা সম্পর্ক, ওঠাপড়া। তবু বুঝতে পারবেন না আপনি। চরম অস্বস্তি হবে, কেন অস্বস্তি তাও বুঝতে পারবেন না।

ওরা সবাই আসবে। সবাই ফুলের পরিধি ঘিরে, লুপ্তফুলের সংকট ঘিরে। কেউ নিয়ে আসবে নাচ, কেউ ম্যাজিক, কেউ জোকস নিয়ে, কিন্তু ওই লুপ্ত বাগান ও তার হৃদয়মানুষ একে ঘিরেই একটা সভ্যতার মতো “কী-যেন” গড়ে উঠবে। কেস স্টাডি-৩, ৪ এ পৌঁছে আপনি প্রথম বুঝবেন এই “কী-যেন” আসলে এক বিস্তীর্ণ যাপন, ফুলযাপন যা গড়ে উঠছে। আর আপনি সমস্ত চরিত্রকে চিনতে পারবেন। সবাইকে দেখবেন নিজের পত্রিকা করার সময়কার ওই বন্ধু, এই বান্ধবী। অবিকল। এক বীভৎস তান্ত্রিকের মতো রাহুলবাবু যেন আপনার যাপনের সমস্ত গোলাপ-কুহেলি-কোপ জেনে বসে আছেন। আর অবিকল ঝর্ণাজলস্বরূপ ভাষার সারল্যস্রোতে রাহুলবাবু আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। শান্ত রাক্ষসের মতো উপন্যাসটি ততক্ষণে আপনাকে খেয়ে ফেলেছে। যাকে পাখির কিচির মিচির মনে হচ্ছিল বিলের ধারে, বুঝবেন সেটি আসলে এক রাক্ষুসে দাঁতের কচর মচর যা আপনার অভিজ্ঞতা স্মৃতি চিবিয়ে চলেছে। চেবায়, খালি চেবায়, এ কাজ চিরবিপ্লবী চে দিয়ে শুরু। এবং আপনি ভাববেন আপনি উপন্যাসটি ধরে ফেলেছেন।

আর সেখানেই কেস স্টাডি ৫ আর ৬ এবং শেষ স্বপ্ন এসে খুন করে যাবে। এখানেই রাহুল দাশগুপ্তর উপন্যাসটি এক নিছক দুরন্ত বা অসামান্য উপন্যাস থেকে ম্যাগনাম ওপাস হয়ে ওঠে। দেখবেন চরিত্র, সম্পর্ক, ঘটনা যা সব আপনি স্মৃতি দিয়ে রিলেট করছিলেন, অভিজ্ঞতা দিয়ে রিলেট করছিলেন, আর নিজেকে হৃদয় নামক নায়কের স্থানে রিপ্লেস করে মুগ্ধ আনন্দে মগ্ন ছিলেন, ওটা এক ভ্রম ছিল মাত্র। আপনি রিলেট করছিলেন নিজের অস্তিত্ব দিয়ে। ওই সব কটা এলিমেন্ট আসলে আপনার নিজেরই টুকরো। আপনার পত্রিকা ও লেখা যাপনের সৎ অসৎ গূঢ় গোপন সমস্ত কিছু একসাথে হাট হয়ে খুলে যাবে। যার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি এক ব্রহ্মাণ্ডের মতো বিপুলতম ন্যংটোবোধে ফেটে পড়বেন। আর এখানেই উপন্যাসটি সময় কোতল করে অপারে চলে যায়। শুধুমাত্র কোনও এক ওপারে নয়।