Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্বপ্নযাত্রা, সময়যান ও একটি বিরল সম্পর্কের উদযাপন: “বুবুর সঙ্গে দ্রাক্ষাবনে”

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

 

কৌশিক বাজারীর অধিকাংশ জামায় কোনও কলার থাকে না। দৈবাৎ থাকলেও তা তিনি মনে রাখেন না। রাখলে এরকম একটি বিরল দৃশ্য দেখা যেতে পারত : কলার উঁচু করে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন আধুনিকতার রাংতা খুলে (চকোলেটের বদলে) শ্বেত কপোত। কিন্তু সেটা সম্ভবত তাঁর ম্যাজিক প্র্যাকটিসের উপযুক্ত ক্ষেত্র নয়। বরং স্বাচ্ছন্দ্য বলতে তিনি নিজস্ব ঘর বোঝেন এবং সেখানেই চোখ বুজে কিংবা খুলে বিবিধ মুদ্রায় ধ্যান প্র্যাকটিস করেন, আর তাঁর বিস্তৃত ক্যানভাস জুড়ে একটি শান্ত শিশু (ইদানিং বালক) প্রতিদিন পড়া ভুলতে ভুলতে ড্রয়িং শিটে যথেচ্ছ রঙ ছড়ায়। শিশুটি তাঁর আত্মার অংশ, আত্মজ, বুবু।

যে একফর্মা কবিতাপুস্তকের আলোচনায় প্রবেশ করব এইবার, তার জন্য সামান্য কিছু প্রস্তুতি প্রয়োজন। যথা বুবু, অর্থাৎ শ্রীমান হিমঘ্ন বাজারীর অলংকরণে সম্প্রতি ভাষালিপি থেকে প্রকাশিত এই পুস্তকের পাতায় পাতায় যে অফুরন্ত বর্ণবৈভব লুকোনো আছে, সেদিকে মানসচক্ষুর উন্মীলন প্রয়োজন, ঠিক যেভাবে শিশুকালীন অভ্যাসে আমরা ঠাকুমার ঝুলি ক্ষীরের পুতুল বুড়ো আংলা নালকের পাতা উল্টেছি, আর একরঙা ছবিগুলির অদৃশ্য বর্ণবিচ্ছুরণে ভেসে গেছি।

রেখাচিত্র নয়, বুবুর স্কেচগুলি রেখানৃত্য। তার কচিহাতের কাঁপন স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। বোঝা যায়, ছবিগুলো স্থির নয়, সচল।

বুবু স্বয়ং এই বইয়ের মূল চরিত্র। তার বাস্তব বয়স দশ বছর। কিন্তু কৌশিকের পরাবাস্তব-অতিক্রমী জাদুপৃথিবীতে সে পাঁচ বছরের পর আর বাড়েনি। কারণ কৌশিক তাঁর একমাত্র বাস্তব উত্তরসূরিকে সময়যানে নিজস্ব স্বপ্নজগতে সরিয়ে নিয়েছেন। সেখানে আজীবন ওর নরম শরীর থেকে হালকা নীলাভ সবুজ আভা ছড়াবে। অ-লৌকিক এই আভা, ডিসেম্বরের শীতার্ত আকাশে চিরকালীন একটি তারা চিনিয়ে দেয়, যার আলোয় প্রতিটি অমৃতের সন্তান শিশুদশায় স্নিগ্ধ।

এই স্নিগ্ধতা আছে বলেই “বুবুর শরীরে কোনো রাগ নেই, তাই তাকে খেলনা বন্দুক কিনে দেওয়া হয়নি কখনো।”

বইটির উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছে:

“…তবু এই ছবি আর গল্পগুলি উড়ে যাক তার আগামী পৃথিবীর দিকে। আমারও ছোটবেলাকার দ্রাক্ষাবনের ভিতর…।” লক্ষণীয় এই ভিন্নমুখী উড়াল, একদিকে ভবিষ্যৎ অন্যদিকে অতীত স্পর্শ করতে উন্মুখ। মাঝখানে ভেসে আছে অসমবয়সী দুই বন্ধু, বাস্তব পৃথিবীতে যাদের পিতাপুত্র সম্পর্ক, তাদের অলীকপ্রায় বর্তমান। প্রস্তুতি বলতে শুধু এইটুকুই।

           “আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে

                 গুচ্ছ গুচ্ছ ধরিয়াছে ফল।

           পরিপূর্ণ বেদনার ভরে

            মুহূর্তেই বুঝি ফেটে পড়ে,

             বসন্তের দুরন্ত বাতাসে

                  নুয়ে বুঝি নামিবে ভূতল —

              রসভরে অসহ উচ্ছ্বাসে

                  থরেথরে ফলিয়াছে ফল…”

চৈতালি কাব্যের কবি উত্তরতিরিশে পৌঁছে রসের ভারে নম্র নত মনটি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর চিরন্তন অংশ, তাঁর জীবনদেবতাকে। কৌশিকের দ্রাক্ষাবন সদ্য উত্তরচল্লিশের সমর্পণ। কিন্তু কাকে? এ অরণ্য একান্তভাবেই তাঁর আত্মজ বুবুর। বুবুর ব্যবধানশূন্য ‘তুই’, তার বাবার শিশুকালীন দ্রাক্ষাবনের নির্যাস এসে মিশছে এর হাওয়ায়। উতলা করছে? করলেও তা খুব শান্ত; আর মুঠিভরা আলোকিত মেঘফল নিয়ে মধুময় রসার্দ্রতা পেরিয়ে সানন্দ শৈশবের মধুবন ধীরপায়ে পার হয়ে চলেছেন পিতাপুত্র, তাঁদের মৃদুস্বরের কথোপকথন এই ধ্যানের পৃথিবীর একমাত্র মূর্ছনা:

“–চাঁদ পেরিয়ে কি তেপান্তরের মাঠ? সেখানে যাব কি বাবা?

–হ্যাঁ,যাবেই তো… নিশ্চয় যাবে, একা…

–শূন্যে আমি তো ভাসব, তাহলে যাব বা কেমন করে?

–পক্ষীরাজ তো! ঠিক যেতে পারে… উড়িয়ে কেশর জোরে…

–না, আমি যাব না… ভাল লাগবে না মোটে…

–কেন রে! ও বুবু, কী হল আবার তোর

–আমি তোর কোলে বসব একটিবার…।”

“অনেক দূরের কথায় তাহার শিশুমনে একটা বিস্ময়মাখানো আনন্দের ভাব সৃষ্টি করিত। নীল রঙের আকাশটা অনেক দূর, ঘুড়িটা — কুঠির মাঠটা অনেক দূর — সে বুঝাইয়া পারিত না, বলিতে পারিত না কাহাকেও, কিন্তু এসব কথায় তাহার মন যেন কোথায় উড়িয়া চলিয়া যাইত — এবং সর্বাপেক্ষা কৌতুকের বিষয় এই যে, অনেক দূরের এই কল্পনা তাহার মনকে অত্যন্ত চাপিয়া তাহাকে যেন কোথায় লইয়া ফেলিয়াছে — ঠিক সেই সময় মায়ের জন্য তাহার মন কেমন করিয়া উঠিত, যেখানে যাইতেছে সেখানে তাহার মা নাই…”

অনিবার্য, বুবুর এই দ্রাক্ষাবনে বিভূতিভূষণের স্বপ্নপুত্রটির প্রবেশ অনিবার্য! শিশুর মনলোক। অপার বিস্ময়, আধো ভীতি, আধো দুঃসাহসে, সুদূরপিপাসায়, উচ্ছ্বসিত কল্পনার রং-এ মাখামাখি শিশুর মনলোক — সে তার নাম অপু বুবু যাই হোক না কেন, সমান অনুভূতিপ্রবণ। বুবুর ঘরে সারাদিন তার মা নেই বলে অনেক দূরে উড়তে শিখেই প্রথম মনকেমন তার বাবার জন্য হয়েছে। মনকেমন নিজেই এক পরম কাব্য। তাকে অণুবীক্ষণের নিচে ধরা যায় কি? তবু মনে পড়ল সম্প্রতি পড়েছি এমন একটি বইয়ের কথা। লেখক রমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর “লাকাঁ” বইটিতে উল্লেখ করেছেন এই আশ্চর্য তথ্য যে লাকাঁর মতে, শিশুর জীবনের সূত্রপাতটি তার “মাদারার” দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। “মাদারার” কিন্তু সর্বদা শিশুর মা নন, এমনকী তাঁর নারী হওয়ারও বাধ্যতা নেই কোনও, তিনি শিশুর বাবা কিংবা দাদাও হতে পারেন। যে-ই হোন, তিনিই তার পরম আশ্রয়। শিশুটির সকল অসহায়তার নির্বিকল্প সমাধান তিনি। দুধ ছাড়বার বয়সে মাদারার শিশুকে কী খেতে দেন? লাকাঁ বলছেন, ভাষা। মাতৃভাষা তাই মাতৃদুগ্ধের সমান। বুবুকে তার বাবা দুগ্ধাভাবে একটি পরিপূর্ণ দ্রাক্ষাবন যুগিয়ে দিয়েছেন। বুবুর রূপকথার ভুবন, বুবু আর বাবার মিলমিশে তৈরি হওয়া জগৎ, মাত্র তাদের দুজনের জন্যই রচিত অনন্ত, দূর থেকে চোখ ভরে তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, খুব কাছে গিয়ে পড়লে এর ঘোর নষ্ট হয়ে যাবে, এত ভঙ্গুর লাবণ্যময় এই কল্পলোক, এতই স্বর্গীয়।

আকাশ তাদের খুবই প্রিয় জায়গা যেখানে প্রায়ই নানারকম কাজে বুবুকে যাতায়াত করতে হয়। সেটা পক্ষীরাজেই হোক কিংবা হাওয়ার রকেটে। একবার যেমন রকেটে যেতে যেতে দুজনে মাঝপথে ঝগড়া হল। বাবাকে নামিয়ে দিয়ে বুবু বলল “যা বাবা, মহাশূন্যে ভাসমান থাক।” বলেই নেবুলার দিকে একা একা উড়ে গেল।… বর্ণে বর্ণে বিস্ফোরিত এইসব ইমেজারিতে নেশা লাগে, মনকেমনের নেশায় চোখ বারবার দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হতে বুজে আসে।

বুবুর কি সত্যিই কোনও বাস্তব নেই? ওর জন্য কি কৌশিক শুধুই গল্পের পৃথিবী তৈরি করে রাখলেন? শুধু বাবা নয় তো, আম্মার কাছেও বুবু গল্প শোনে, কথা-না-ফোটা বয়স থেকেই। বুবু-ছাগল আর মা-ছাগলের গল্প। বুবু-ছাগল তার মা-ছাগলকে বনে বনে খুঁজছে। তার খিদে পেয়েছে, মায়ের “বু” খুঁজছে। বুবু-ছাগলের দুঃখে ভাষা আয়ত্ত করতে না-পারা শিশুটির চোখ কান্নায় ভেসে যায়। তারপর চোখের জল শুকোয়, আর সে তার দুঃখী দুঃখী জানলায় একলা গিয়ে বসে থাকে। মনে মনে খোঁজে, কখন তার মা ইস্কুল থেকে ফিরবে, তাকে “বু” দেবে। ভাষাহারা সন্তানের চোখের পাতা পড়তে পারেন তার অসহায় পিতা, দেখতে পান তাঁর শিশুর ভিজে চক্ষুপল্লবে ভারী হয়ে নেমে আসছে অব্যক্ত অসহায়তা… সমস্ত নিবেশকে থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়ে এইভাবেই পাঠকের ভেতর প্রবেশ আদায় করে নিয়েছেন কৌশিক, আমরা বারবার ছুঁয়ে দেখতে পারছি মেঘফল, থরেথরে, আলোজ্বলা মেঘফলের অঝোর বর্ষণসুখ!

বেদনার আলিঙ্গনে শূন্য জেগে আছে। শূন্যতাই এই পুস্তকের ধ্রুব সত্য। বাৎসল্যে রচিত কাব্যে এহেন মায়াবী শূন্যতা অপ্রত্যাশিত। বুবুও এই শূন্যতায় শ্বাস নিচ্ছে টের পাই যখন পড়ন্ত বিকেলে শূন্য ইস্কুলবাড়িটা তাকে টানে, জ্যোৎস্নায় ভেসে থাকা উঠোনে জটায়ুর বিরাট ডানা ভেঙে পড়ে আছে দেখে গ্রিল ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সে, কিংবা উঠোন থেকে নিঃশব্দে অন্ধকার হাইরোডের দিকে মিলিয়ে যেতে দেখে পোষা কুকুরছানা মালসীর আত্মাকে। বইটি পড়তে পড়তে চরাচরব্যাপী অলীক শূন্যতার টানে শরীর লঘু হয়ে যাচ্ছে টের পেলাম। হু হু হাওয়া বইতে শুরু করল আর ফেরার জন্য আকুল মনকেমনও। কিন্তু কার কাছে ফেরা? পাঠকের ফেরার উপায় কৌশিক রাখেন না। তাঁকে পাঠ করার এই এক অনিবার্য অনিশ্চয়। বুবুর হাত ধরে এ বইয়ের শেষ লেখায় পুব থেকে পশ্চিমবাহিনী একটি অনামা নদীর কাছে পৌঁছন তার বাবা। ঘাটে ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে, আর বাবা ডুবের পর ডুব দিয়ে স্নান করে চলেন… ডুবের পর ডুব… মাথা ভাসাবার থৈ পান না… কষ্টে ভেসে উঠে দেখেন ঘাটে সে কই? তাঁর স্বপ্নপুত্র, বিস্ময়বালক? না, কোথাও নেই তাঁর আলোজ্বলা মেঘলা শিশুটি! দাঁড়িয়ে আছে শুধু এক শ্মশ্রুগুম্ফময় যুবা… তার মুখের শিশুলাবণ্যটুকু ছাড়া তাকে চেনার আর কোনও অভিজ্ঞান নেই।

বাংলা কাব্যসারণীতে সম্পূর্ণ গোত্রপরিচয়হীন একটি পুস্তক সংযোজিত হল, যা পিতা ও পুত্রের যৌথ সৃজন। পুত্রের জন্য কবি পিতার চিরকালীন শ্রেষ্ঠ উপহার। তুলনা খুঁজতে রবীন্দ্রনাথের শিশুকাব্যগুলি ঘুরে অন্যতর বিস্ময় নিয়ে ফিরে এলাম। না,এর সঙ্গে জোড় মিলল না। কারণ কৌশিকের মনলোকে রবীন্দ্রনাথ একা নন, জীবনানন্দ আছেন, প্রবলভাবে আছেন বিভূতিভূষণ, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও, ভিন্ন ইশারা নিয়ে, স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছেন। নিবিড়ভাবে লগ্ন হয়ে, পরমাশ্রয় হয়ে মিশে আছেন কৌশিকের কলমে, তাঁর কবিতার মাতৃভাষা যুগিয়ে দিচ্ছেন। এ ভাষা আটপৌরে আঁচলের গিঁটে অলংকার বেঁধে রেখে ভুলে যায়, প্রসাধনে মন দিতে পারে না, ছন্দের সচেতন বৈভব দেখায় না একেবারেই। তবু ছলনাহীন, তার “অব্যাজমনোহর বপু”।

দশ মিনিটে বইটি পড়া শেষ হয়ে যায়। অতঃপর অন্তত আধঘণ্টা রীতিমতো আচ্ছন্নতা। পৃথিবীর সমস্ত মালিন্য-ধোওয়া স্নিগ্ধতার স্রোতে ধুয়ে যাচ্ছিলাম। মনে পড়ছিল এই কবি একবার বলেছিলেন, পৃথিবীতে তাঁর কোনও শত্রু নেই। কী শান্তি এই বিশ্বাসে! এই বিশ্বাসের আশ্রয়ে সমগ্র পৃথিবী তাঁর কুটুম্ব হোক। আমরা দেখি, পৃথিবী স্বয়ং নীলাভ সবুজ দ্যুতিময় একটি গ্রহ, এখানে শরীর জৈব সন্তান নয়, বরং আত্মা জন্ম দিচ্ছে আত্মাকে, ধারণ করছে, পালন করছে আর আত্মনির্মাণের অসমাপ্ত খেলা তুলে দিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নাশ্রিত আগামীর হাতে: অনন্তের ঘরে তারার সঙ্গে যেমন তারার খেলা, শুধুই আলোর ভাষায় সংকেতময়:

“অঘ্রানের দুটি তারা তেমন স্বতন্ত্র নয় তারাদের মতো

নয় দূর, ব্যবধানভরা, শূন্য আকাশে, দুদিকে…

পৃথিবীর ঘরে শুয়ে তারকা দুজন

কথা বলে, একজন জন্মদাতা, অন্যটি জাতক

অঘ্রানে, হেমন্তসূত্রে এসে খেলা করেছে একদা

একজন, আর বাকি খেলা তুলে দেয় অন্য হাতে।…”

–শক্তি চট্টোপাধ্যায়।