Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — ষষ্ঠ পর্ব

চার্লস বুকাওস্কি

বাংলায়ন : শুভঙ্কর দাশ

(পঞ্চম পর্বের পর)

 

১০/২/৯১

রাত ১১টা ০৩

যারা অপেক্ষা করে মৃত্যু তাদের কাছে আসে আর আসে তাদের কাছে যারা অপেক্ষা করে না। আজ একটা জ্বলে যাওয়া দিন, একটা জ্বলন্ত ভাষাহীন দিন। পোস্টঅফিস থেকে বেরিয়ে দেখি গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। আমি একজন ভদ্র নাগরিক। আমি অটো ক্লাবের লোক। তাই আমার একটা টেলিফোন দরকার। চল্লিশ বছর আগে টেলিফোন থাকত সর্বত্র। টেলিফোন আর ঘড়ি। আপনি এদিক ওদিক তাকালেই জানতে পারতেন কটা বেজেছে। এখন আর তা নয়। এখন সময় ফ্রি নয়। আর পাবলিক টেলিফোনগুলো ক্রমে ভ্যানিস হয়ে যাচ্ছে।

আমি হাঁটছিলাম সহজাত ধারণায়। আমি পোস্টঅফিসের ভেতরে গেলাম, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম আর একটা অন্ধকার কোণে, একা একা আর বিজ্ঞাপিত না হয়ে আছে একটা টেলিফোন। একটা চটচটে নোংরা কালো টেলিফোন। দু মাইলের ভেতর আর একটাও নেই। আমি জানি কী করে একটা টেলিফোনে কাজ করতে হয়। হয়ত তথ্য অপারেটরের গলা ভেসে এল আর আমার মনে হল যাক বাবা বাঁচলাম। শান্ত আর বিরক্তিকর একটা গলা আর সে জিজ্ঞাসা করল কোন শহরের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাইছি। আমি নাম বললাম শহরের আর অটো ক্লাবের। (আপনাকে জানতে হবে এইসব ছোট ছোট কাজ কীভাবে করতে হয় আর আপনাকে তা করে যেতে হবে বারবার নাহলে আপনি শেষ। রাস্তাঘাটে খতম। সঙ্গীহীন, অবাঞ্ছিত।) ভদ্রমহিলা আমাকে একটি নাম্বার দিলেন কিন্তু সেটা ভুল নাম্বার। বিজনেস অফিসের জন্য। তারপর আমি গ্যারাজে ফোন করলাম। একটা পুরুষালি গলা, বিন্দাস, ক্লান্ত কিন্তু লড়াকু। দারুণ ব্যাপার। আমি তাকে তথ্যটুকু দিলাম। ’৩০ মিনিট’, সে বলল।

আমি গাড়ির কাছে ফিরে গেলাম, আর খুললাম একটা চিঠি। একটা কবিতা। হে ভগবান। আমাকে নিয়ে। আর তাকে নিয়ে। দেখা যাচ্ছে আমাদের দেখা হয়েছিল দু বার ১৫ বছর মতো আগে। তার পত্রিকায় সে আমার কবিতাও ছেপেছে। আমি একজন মহান কবি, সে লিখেছে কিন্তু আমি মাল খাই। আর সে একটা দৈন্যপীড়িত খারাপ জীবন কাটিয়েছে। এখন তরুণ কবিরা মাল খাচ্ছে আর বাঁচছে দৈন্যপীড়িত আর খারাপ জীবন কারণ তারা ভেবেছে এভাবেই ঘটবে ব্যাপারটা। আর আমার কবিতায় আমি আক্রমণ করেছি অন্য লোকজনকে, এমনকি ওকেও। আর আমি ভেবেছি বোধহয় আমাকে নিয়ে সে লিখেছে তেল না দেওয়া কবিতা। সত্যি নয়। ও সত্যিই একটা ভালো মানুষ, ও লিখেছে ওর কাগজে ও গত ১৫ বছর ধরে অনেক কবির কবিতা ছেপেছে। আর আমি লোকটা ভালো নই। আমি একজন মহান লেখক কিন্তু ভালো মানুষ নই। আর ও কখনওই আমার সাথে বনদুর মতো ঘুরত না। তাই ও লিখেছে ‘বনদুর’। আর ও সমানে ‘তোমার’-কে ‘তোমাড়’ লিখে গেছে। ও খুব একটা ভালো বানান জানে না।

গাড়িতে বেশ গরম। ১০০ ডিগ্রি। ১৯০৬-এর পর এই প্রথম একটা নিদারুণ অক্টোবর।

আমি ওর চিঠির উত্তর দেব না। ও আবার লিখবে।

আরেকটা চিঠি একজন এজেন্টের কাছ থেকে, সাথে একজন লেখকের কাজ। আমি চোখ বোলাই। খুব খারাপ। অবশ্যই। ‘আপনার যদি কোনও সাজেশন থাকে বা কোনও প্রকাশকের ব্যাপারে কোনও পথ নির্দেশ দেন, আমাদের খুব ভালো লাগবে…’

আরেকটা চিঠি পাঠিয়েছেন একজন ভদ্রমহিলা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে। তাঁর কথায় তাঁর বরের জন্য একটা ড্রয়িং আর কয়েক লাইন পাঠিয়েছিলাম বলে। তার বর খুব আপ্লুত। কিন্তু তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে এখন, আর সে কি এসে আমার একটা সাক্ষাৎকার নিতে পারে?

সপ্তাহে দু বার আমি সাক্ষাৎকারের জন্য অনুরোধ পাই। ওসব নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। অনেক কিছু বেশি আছে লেখার, কথা বলার থেকে।

একবার মনে আছে অনেকদিন আগে, আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল এক জার্মান সাংবাদিক। আমি তার গায়ে ওয়াইন ঢেলে দিয়েছিলাম আর ৪ ঘণ্টা ধরে কথা বলেছিলাম। তারপর সে মাতাল হয়ে ঝুঁকে পড়েছিল সামনের দিকে আর বলেছিল, ‘আমি কোনও সাক্ষাৎকার নিতে আসিনি, আমি জাস্ট আপনার সাথে দেখা করার জন্য একটা সুযোগ নিয়েছি।’

আমি এক পাশে চিঠিপত্রগুলো ফেলে বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তখন দেখলাম গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়ার ট্রাকটা। একজন হাসিখুশি তরুণ। মিষ্টি ছেলে।

‘হে বেবি’, আমি আওয়াজ দিলাম, ‘এখানে’।

ছেলেটি বেরিয়ে এসে বলল কী হয়েছে।

‘আমাকে অ্যাকুরা গ্যারাজ অবধি টেনে নিয়ে চলো’, আমি বললাম তাকে।

‘গাড়ির ওয়ারেন্টি এখনও ঠিকঠাক আছে তো?’

সে খুব ভালো করেই জানত তা নেই। এখন ১৯৯১ আর আমি চালাচ্ছি একটা ১৯৮৯-এর গাড়ি।

‘কিছু আসে যায় না’, আমি বললাম, ‘তুমি আমাকে অ্যাকুরা ডিলারের কাছে টেনে নিয়ে চলো।’

‘ওরা কিন্তু সারাতে অনেক সময় নেবে, হয়ত এক সপ্তাহ।’

‘না না ওরা খুব দ্রুত কাজ করে।’

‘শুনুন,’ ছেলেটা বলে, ‘আমাদের নিজের গ্যারাজ আছে। আমরা ওখানে গাড়িটা নিয়ে যেতে পারি, হয়ত গাড়িটা আজই ঠিক করে দিতে পারা যাবে। আর আর না হলে, আমরা লিখে জানাব আপনাকে আর ফোন করব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’

ওখানেই আমি দেখতে পেলাম আমার গাড়িটা ওর গ্যারাজে এক সপ্তাহ ধরে পড়ে আছে। আমাকে বলা হচ্ছে আমার একটা নতুন ক্যামশ্যাফট দরকার। বা আমার সিলিন্ডারের বারোটা বেজে গেছে।

‘তুমি আমাকে অ্যাকুরায় টেনে নিয়ে চলো’, আমি বললাম।

‘দাঁড়ান’, ছেলেটা বলল, ‘আগে আমার বসকে আমায় ফোন করতে হবে।’

আমি অপেক্ষা করে রইলাম। ছেলেটি ফিরে এল।

‘উনি বললেন আপনার গাড়ি জাম্প স্টার্ট করতে।’

‘কী?’

‘জাম্প স্টার্ট’।

‘বেশ, তাই করা যাক’।

আমি উঠলাম গিয়ে আমার গাড়িতে আর ওটাকে গড়াতে দিলাম ট্রাকের পেছন দিকে। ও কেবেল বের করে আমার গাড়িতে লাগিয়ে টেনে নিয়ে খানিকটা যেতেই আমার গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিল। আমি কাগজে সই করে দিলাম তারপর সেও চলে গেল আর আমিও।

তারপর আমি ঠিক করলাম রাস্তার কোণার গ্যারাজটায় গাড়িটা ছেড়ে আসার।

‘আমরা আপনাকে চিনি। আপনি তো এখানে আসছেন বহু বছর,’ বললেন ম্যানেজার।

‘বেশ ভালো কথা,’ আমি বললাম, তারপর হেসে বললাম, ‘আমার গাঁড়টা মারবেন না যেন’। 

উনি জাস্ট আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

‘আমাদের ৪৫ মিনিট সময় দিন’।

‘বেশ।’

‘আপনাকে ছেড়ে আসতে হবে’?

‘একদম।’

উনি আঙুল তুলে দেখালেন। ‘ও আপনাকে নিয়ে যাবে।’

মিষ্টি ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আমরা হেঁটে তার গাড়িতে গেলাম। আমি বলে দিলাম কোন দিকে যাবে। আমরা পাহাড়ের উপর চড়লাম।

‘আপনি এখনও ছবি করেন?’ সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল।

আমি তো একজন সেলিব্রিটি, বুঝতেই পারছেন।

‘না’, আমি বললাম, ‘হলিউডের গাঁড়ে’।

সে ব্যাপারটা বুঝতে পারল না।

‘এইখানে থামো’।

‘ওরে বাবা, এতো বিশাল বাড়ি’।

‘আমি শুধু ওখানে কাজ করি’, আমি বললাম।

এটা সত্যি কথা।

আমি বেরিয়ে এলাম গাড়ি থেকে। ওকে দু ডলার দিলাম। ও নেবে না বলেও শেষমেশ নিলো।

আমি বাড়ির ড্রাইভওয়ে হেঁটে পেরোলাম। বেড়ালরা সব এলোমেলো ছড়িয়ে আছে, হেগেছে। পরের জন্মে আমি বেড়াল হয়ে জন্মাতে চাই। দিনে ২০ ঘন্টা ঘুমোতে চাই আর খাবার দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে চাই। বসে বসে নিজের পোঁদ চাটতে চাই। মানুষেরা বড় দুঃস্থ আর ক্ষুব্ধ আর একমুখী।

আমি ওপরে গিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসলাম। এটা আমাকে প্রবোধ দেওয়ার নতুন একটা জিনিস। এটা পাওয়ার পর থেকে আমার লেখালিখির শক্তি আর আউটপুট দুগুণ বেড়ে গেছে। এটা একটা ম্যাজিক জিনিস। আমি এর সামনে বসে থাকি যেভাবে লোকে ঠিক টিভির সামনে বসে থাকে।

আমার জামাই একবার বলেছিল, ‘ওটা একটা মহিমান্বিত টাইপরাইটার শুধু’। [[১]]

কিন্তু ও তো আর লেখক নয়। ও জানে না কী হয় যখন শব্দরা কামড়ে ধরে শূন্যতা, ঝলকে ওঠে আলোয়, যখন মাথায় আসা চিন্তাদের পেছনে তৎক্ষণাৎ ধাওয়া করা যায় শব্দ দিয়ে, যা উৎসাহ দেয় আরও চিন্তা আরও শব্দকে। একটা টাইপরাইটার দিয়ে কাজ করা হল কাদার ভেতর হাঁটা। আর কম্পিউটারে সেটা বরফে স্কেট করার মতো। এটা একটা গনগনে ধামাকা। অবশ্য আপনার ভেতর কিছু না থাকলে, কিসুই হবে না। আর তারপর পরিষ্কার করার কাজ, ভুল শুধরোনো। নরক, আমাকে সব কিছু দুবার লিখতে হত। প্রথমবার লেখাটা নামাতে আর দ্বিতীয়বার ভুলগুলো শুধরোতে, ঠিক করতে যেখানে ধেড়িয়েছি। এভাবে একটাই দৌড় আনন্দের, সেই মহিমা আর অব্যাহতি।

আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি কম্পিউটারের পর কী আসতে চলেছে? হয়ত আপনি শুধু আপনার রগ আঙুল দিয়ে টিপে ধরলেই বেরিয়ে আসবে নির্ভুল প্রকাশের ধারা। অবশ্যই আপনাকে ভেতরটা ভর্তি রাখতে হবে শুরু করার আগে কিন্তু চিরকালই ভাগ্যবান কেউ থাকবে যে ওটা করতে পারে। আশা করা যাক।

ফোনটা বেজে উঠল।

‘ব্যাটারিটার জন্য’, সে বলল, ‘আপনার একটা নতুন ব্যাটারি দরকার ছিল।’

‘যদি আমি পয়সা না দিতে পারি?’

‘তাহলে আপনার অতিরিক্ত টায়ারটা আমরা রেখে দেব’।

‘আসছি এখনই’।

পাহাড় থেকে নিচে নামা শুরু করতেই আমি শুনতে পেলাম আমার বয়স্ক পড়শির গলা। আমাকে চেঁচিয়ে ডাকছে। আমি সিড়ি বেয়ে ওনার কাছে গেলাম। উনি পরে আছেন পাজামা আর পুরনো একটা ধূসর সোয়েটার। আমি ওনার সাথে হাত মেলালাম।

‘আপনি কে’? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আমি আপনার পড়শি। গত দশ বছর আছি এখানে১।’

‘আমি ৯৬’, উনি বললেন।

‘আমি তা জানি, চার্লি।’

‘ভগবান আমাকে নেয় না কারণ ও ভয় পায় যে আমি ওর চাকরিটা খেয়ে নেব’।

‘আপনি তা পারবেন।’‘আপনার বয়স কত?’

‘৭১’।

‘৭১’?

‘হ্যাঁ’।

‘ওটাও অনেক বয়স’।

‘ওহ, আমি জানি তা, চার্লি’।

আমরা হাত মেলালাম আর তারপর আমি ওনার সিড়ি দিয়ে নেমে এলাম আর তারপর নামতে লাগলাম পাহাড় বেয়ে, ক্লান্ত গাছেদের পাশ দিয়ে, ক্লান্ত বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে।

আমি চলেছি গ্যারাজের দিকে।

আরেকটা দিন গাঁড়ে লাথি মারল।

(আবার আগামী সংখ্যায়)