Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

পিনাক বিশ্বাসের লেখা

পিনাক বিশ্বাস 

 

অলিভ রিডলে, দুর্লভ প্রজাতির এক কচ্ছপ যার বিজ্ঞানসম্মত নাম Lepidochclys Olivacea। বাংলায় পান্না কচ্ছপ। বাস করে সমুদ্রে কিন্তু ডিম পাড়তে আসে মোহনায়, ওই ইলিশ মাছের মতোই। মজাটা হচ্ছে বছরের পর বছর একই জায়গাটা চিনে ঠিক চলে আসে হাজারে হাজারে। এক পক্ষকালের মধ্যে ত্রিশ চল্লিশ হাজার স্ত্রী কচ্ছপ পাশাপাশি গর্তে ডিম পাড়তে আসে। এই সময় ওদের ধরে ফেলা খুব সহজ। স্ত্রী কচ্ছপরাই ধরা পড়ে। সমুদ্রে পুরুষ কচ্ছপ যথেষ্ট থাকলেও স্ত্রী কচ্ছপ কমে যাচ্ছে। যে কারণে তাড়াতাড়ি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই অসহায় প্রজাতি। আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, পানামা ইত্যাদি জায়গায় এরা ডিম পাড়তে পাড়ি দেয় হাজার মাইল। পাকিস্তানের করাচির উপকূলে সিন্ধু নদীর মোহনায় এরা সেই হরপ্পা মহেঞ্জোদারো আমল থেকেই আসত। এসময় ডিমগুলো স্থানীয় লোকেরা রাহাজানি করত। কচ্ছপ অবশ্য সে দেশে খাওয়ার চল নেই, তবু খেলাচ্ছলে মেরে ফেলতে বাধা কোথায়?

স্থানীয় বিজ্ঞানীরা করাচির নগরপালকে একদিন দেখিয়ে দিলেন কচ্ছপের কান্না! হ্যাঁ কচ্ছপ কাঁদছে। মানুষের অত্যাচারে তাদের সন্তানসন্ততি বিপন্ন। ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখে বিশ্বাস করলেন নগরপাল ও কর্মকর্তারা। ঘিরে ফেলা হল কাঁটাতার দিয়ে তাদের সূতিকাগার। বেঁচে গেল হতভাগ্য কচ্ছপকূল।

ভারতেও মাদ্রাজে ও উড়িষ্যার ভিতরকণিকার কাছে এরা আসত। কাছিমের ডিম আর জ্যান্ত কাছিম চালান দেওয়ার নোংরা ব্যবসায় সেখানে যারা জড়িত সেই ধনকুবেরদের সাথে রাজনৈতিক হোমরাচোমরাদের বড় ওঠাবসা। তরুণ এম কে চাড্ডা, ফরেস্ট সার্ভিসে যোগ দিয়ে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার হিসেবে আসেন রাজনগর ফরেস্ট রেঞ্জে। প্রাণীবিদ্যার মেধাবী ছাত্র, সৎ অফিসার অবাক হয়ে গেলেন অলিভ রিডলে দেখে, এদের চাক্ষুষ দেখাই তো বিরল। কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোল। কচ্ছপদের সূতিকাগারে ইতিমধ্যে বুলডোজার চালিয়ে জেটি বানানো হচ্ছে, রাজ্য মৎস্য দপ্তরের কোটি টাকার প্রোজেক্ট! কাজ বন্ধ করার হুকুম দিলেন চাড্ডা, ফিশারিজ ডিপার্টমেন্ট-এ আইডল লেবার ক্লেইম গেল ঠিকাদারের তরফে। চাড্ডা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন পান্না কচ্ছপ এনডেঞ্জারড স্পেসিস, যে কোনও মূল্যে তাদের বাঁচাতে হবে। রাজধানী ভুবনেশ্বরে ডাক পড়ে ঘন ঘন। চাড্ডার এক জবাব চীফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন লিখিত অনুমতি দিন তবে কাজ শুরু হবে। সে অনুমতি চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন দেন কী করে! এ তো সত্যিই বিশ্ব সংস্থার ঘোষিত এনডেঞ্জারড স্পেসিস!

মাফিয়াদের এমন অত্যাচার, হুমকি, শুরু হল যে দেহরক্ষী ছাড়া জঙ্গলে যেতে পারতেন না চাড্ডা। শোনা যায় উড়িষ্যায় বিজু পট্টনায়কের মন্ত্রীসভার খোদ মাথারা পর্যন্ত ছিলেন তার বিরুদ্ধে। হবেই, কোটি টাকার কামাই। শেষে পরিবেশদরদী সংগঠন, ওয়াইল্ড লাইফ বিভিন্ন সংস্থা, মিডিয়া হইচই শুরু করে, কাগজে ফলাও করে বেরোয় চাড্ডার অসম লড়াইয়ের কথা। উড়িষ্যা হাইকোর্ট স্টে অর্ডার দিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে এম কে চাড্ডা তখন হিরো। বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপদের বাঁচিয়ে অসাধ্যসাধন করেছেন। বিধায়ক, মন্ত্রী, সাংসদদের ডিঙিয়ে তার কাছে লোকে এগিয়ে দেয় অটোগ্রাফের খাতা!

সরকারী প্রতিশোধ অবশ্য জারি ছিল। চাড্ডা অচিরেই বদলি হয়ে গেলেন অন্য জায়গায়।

 

*কচ্ছপের বেদনা অবশ্যই আছে, কিন্তু তারা কাঁদে কিনা জানা যায় না। তবে চোখ দিয়ে নেমে আসে বারিধারা। গর্ভবতী কচ্ছপ যখন সমুদ্র থেকে উঠে আসে তখন তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ে। দেহস্থ লবণের আধিক্য ওরা এভাবেই কমিয়ে ফেলে। যাকে বলা যায় অসমোসিস বা আস্রবণ প্রক্রিয়া। একেই ভুল হয় কচ্ছপের কান্না বলে।