Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বাংলা প্রকাশনা বর্তমানে এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে

মারুফ হোসেন

 

বর্তমান বাংলা প্রকাশনা নবজাগরণের পূর্ব মুহূর্তে অবস্থান করছে। এক ঝাঁক মেধাবী তরুণ প্রকাশক ও গ্রন্থপ্রেমীর গত কয়েক বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম ও একাগ্রতার ফল এই আনন্দজনক অবস্থান। এর সঙ্গে অবশ্যই পূর্বসুরী প্রকাশকদের যোগ্য সঙ্গত ও গর্বিত উত্তরাধিকারকেও স্বীকার করা প্রয়োজন।

আজকের বাংলা বইবাজার এক বিরাট সম্ভাবনার চূড়ামুখে অবস্থান করছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের 25 কোটি বাঙালিসহ সারা পৃথিবীর প্রায় 30 কোটি বাঙালির যদি এক শতাংশও বাংলা বইয়ের বাজার হয়ে থাকে তাহলে সেই সংখ্যাটা হয় 30 লক্ষ। অথচ সেই সংখ্যাটার আশপাশ পর্যন্তও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। ফলে আমাদের সামনে অফুরান সম্ভাবনা। এবং সবচেয়ে আনন্দের যেটা তা হল গত পাঁচবছরে একজন প্রকাশক হিসাবে আমাদের জন্য এই পাঠকদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার এক বিরাট সুযোগও তৈরি হয়েছে কোনও প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছের বাইরেও। এক্ষেত্রে সোসাল মিডিয়ার কথা অনস্বীকার্য।

পাঠকদের আগ্রহ নিয়ে আমরা সবসময়ই ভাবি। একটা বিকাশমান প্রকাশনার কর্ণধার হিসাবে বইয়ের বিষয় নির্বাচনে এটা মাথায় রাখতেই হয়। কোনও বিশেষ বই ভালো চলছে অথচ আমাদের প্রকাশনার রুচি ও মানের সঙ্গে সেটা যায় না, তবু সেই বইটি বা বইটির মতো কোনও বই আমরা ছাপব এটা হতে পারে না। বিক্রি হচ্ছে বা হবে বলেই কোনও বই আমরা ছাপি না। আমি খুব জোরের সঙ্গে বিশ্বাস করি বইয়ের ব্যাবসায়ী আর প্রকাশক দুটো আলাদা শব্দ যার অর্থ আলাদা। আমি কখনও বইয়ের ব্যবসায়ী হতে চাইনি। পাঠক রুচি সবসময় মাথায় রাখি কিন্তু তা কখনওই আমাদের রুচিকে ধ্বংস করে নয়। এক্ষেত্রে আমাদের বিরাট কোনও সমস্যা না-হওয়ার মূল কারণ, আমরা খুব কম সময়ের পাঠকরুচিকে প্রাধান্য না দিয়ে একটু বেশি সময়কালের পাঠকরুচিকে গুরুত্ব সহকারে ভাবনার ভিতর রাখি।

আমি একটু আগেও বললাম, বাংলা বইয়ের বাজার একটা সুবর্ণ সময়ের পূর্ব মুহূর্তে আছে। তিরিশ লক্ষ পাঠক যদি মাসে একশো টাকার ননটেক্সট-বই কেনেন তাহলে তা হয় মাসে তিরিশ কোটি। বছরে সাড়ে তিনশো কোটির উপর। এবং মাথায় রাখতে হবে এটি কিন্তু ব্যক্তিগত সংগ্রহ। এরপরে আছে ইনস্টিটিউশনাল সংগ্রহ। সেই অঙ্কটাও কম নয়। বছরের অন্তত দেড়শো কোটির উপর। মানে বাংলা ননটেক্সট বইবাজার কমপক্ষে বছরে পাঁচশো কোটির। আমাদের সম্মিলিতভাবেই এই বাজারটাকে বাড়াতে হবে। এটি কোনও একক সংস্থার কাজ নয়। অথচ এটা খুব দুঃখের যে বাংলার কোনও প্রকাশকদের সংগঠনই এই বিষয় চিন্তাভাবনা করে না। গত এক-দেড়দশকে বাংলা প্রকাশনায় যুক্ত হওয়া তরুণ প্রকাশকদের বেশিরভাগ অংশ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই উপেক্ষিত এবং ঘুমন্ত পাঠকবৃত্তের কিছু অংশকে বাংলা বইয়ের কাছে আনতে পেরেছেন। ফলত বাংলা বইয়ের যে বাজার নতুন সহস্রাব্দের শুরুর দশকে প্রায় ধ্বংসের মুখে মনে হচ্ছিল সেই বাজারই এক বিপুল সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় দশকের শেষের মুখে। আমাদের এখন একটাই কাজ হওয়া উচিত এই পাঠক অন্বেষণ যেন যেভাবেই হোক জারি থাকে। আর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগের সঙ্গে সমষ্টিগত উদ্যোগকে যদি কোনওভাবে জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে বাংলা প্রকাশনায় চরম সুখের দিন আসতে খুব বেশি দেরি হবে না।

বর্তমান মোবিবিশ্বে যোগাযোগ খুব সহজ। আর তাই শুধুমাত্র কলেজস্ট্রিট বা কলকাতা বইমেলা বা একুশের বইমেলা নয় এর বাইরে বিভিন্ন সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমার পাঠক বা সম্ভাব্য-পাঠকের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ রাখা সম্ভব। খুব সহজেই তাদের একটা বই সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব। এবং এর সঙ্গে কলকাতা ও ঢাকার বাইরে অনুষ্ঠিত শতাধিক বইমেলার প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তাকেও স্বীকার করতে হবে।

এছাড়া বাংলা ননটেক্সট বই বিষয় বৈচিত্রেও এই মুহূর্তে রকমারি হয়ে উঠছে। প্রতিটি পাঠকের রুচিকে স্পর্শ করার সহজ সুযোগ এবং প্রয়োজনে কম সংখ্যক বই ছাপার বিকল্প মুদ্রণ পদ্ধতির উন্নতিই আমাদের সামনে এই বিরাট প্রান্তর খুলে দিয়েছে। এরফলে যেকোনও প্রকাশকই অল্প পুঁজিতেই একাধিক নিরীক্ষামূলক লেখা অল্প পাঠকের জন্য ছেপে ফেলতে পারছেন। এই সুযোগটা কিন্তু এক দশক আগেও প্রকাশকদের সামনে ছিল না।

সব মিলিয়ে আগামী দিন বাংলা প্রকাশনার সুসময়। প্রিয় পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী বাংলা প্রকাশনার এই সন্ধিক্ষণে একটু বেশি বেশি করে পাশে থাকুন, সঙ্গে থাকুন। 

বাংলা ননটেক্সট প্রকাশনার জয় হোক।