Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

নিহিত কোমলগান্ধার : সিনেমা সঙ্গীত ও ঋত্বিক ঘটক — আট

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

 

সপ্তম পর্বের পর

যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪)

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নির্দেশনার পাশাপাশি ঋত্বিক বুনে ফেলেছিলেন ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র প্লট। বরং বলা ভালো বহু আগেই ছকে ফেলেছিলেন নিজের এই শেষ প্রযোজনার কথা। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন সময় কমে আসছে তাঁর। তাই দরকার ছিল একটি নিজস্ব আত্মসমীক্ষণের। ফলস্বরূপ, ‘যুক্তি তক্কে’র অবতারণা। Protagonist নীলকণ্ঠ বাগচির চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে নিজেই অবতীর্ণ হন স্ব-মহিমায়। আজ সেই চরিত্র ‘মিথে’ পরিণত। তাই ‘তিতাস’ শেষ করার এক বছরের মাথায় নিজেকে নিয়ে শুরু করেন এই অতীন্দ্রিয় খনন, যাকে আমরা ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র নামে চিনি।

অন্যান্য সিনেমাগুলির মতনই নিজের এই ‘আত্মজীবনী’র সঙ্গীত ও আবহকেও যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়েছিলেন ঋত্বিক। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ঋত্বিকই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজের চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মিত ছবিতে নিজেরই চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘নীলকণ্ঠ বাগচি’ যে আদি অকৃত্রিম ঋত্বিকই সে বিষয়ে একমত এপার ও ওপার বাংলার চলচ্চিত্র অনুরাগীরা। রীতা প্রোডাকশনসের সাথে হাত মিলিয়ে এই ছবিতে প্রযোজনার দিকটাও সামাল দেন ঋত্বিক। সঙ্গীতের ভার ছাড়েন যথারীতি ওস্তাদ বাহাদুর খানের উপর। ছবিটির শব্দ গ্রহণে ছিলেন শ্যামসুন্দর ঘোষ, সঙ্গীতগ্রহণ ও সংযোজনার দায়িত্বে জ্যোতি চট্টোপাধ্যায়। ‘প্লে ব্যাকে’ ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস, তস্য ছাত্র সুশীল মল্লিক, আরতি মুখোপাধ্যায়, রনেন রায়চৌধুরী ও বীণাপাণি রায়চৌধুরী। ছায়ানৃত্যের একাধিক দৃশ্যের সার্থক রূপায়ন করেন শম্ভু ভট্টাচার্য ও সম্প্রদায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সব মিলিয়ে সিনেমা সঙ্গীতের দিক থেকে যথেষ্টই সম্ভ্রম আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল ঋত্বিকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’।

বহু সমালোচক, চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞের মতে ভ্যান গঘের ‘আত্ম-প্রতিকৃতি’র মতোই ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ আসলে ঋত্বিকের নিজস্ব, ব্যাক্তিগত আত্ম-প্রতিকৃতি বা আত্ম-জীবনী বা আত্ম-দর্শন। তার প্রথম ছায়াছবি ‘নাগরিক’-এর মতনই তার শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’র মুক্তিও দেখে যেতে পারেননি ঋত্বিক। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজেকে ভাঙাচোরা ও নতুন করে গড়ার যে আরশিনগর এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি করেন ঋত্বিক, তা ওই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশভাগ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সর্বোপরি তৎকালীন বঙ্গ সমাজের উদ্বাস্তু সমস্যার এক অস্বস্তিকর চালচিত্র যা কমবেশি সমস্ত বাঙালি মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী মহলের সামনে তার বিবেকের ‘আয়না’টি তুলে ধরেছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে আলোচিত ছবি এটি। একই সাথেই যুক্তি তক্কো প্রবলভাবে রাজনৈতিক সচেতন ছবিও বটে। এক জাগ্রত বিপ্লবীর মতোই এই ছবিতে ঋত্বিক নিজেকে এবং নিজের মতবাদ ও আদর্শকে বিশ্লেষণ করেছেন, ফালাফালা করেছেন। কখনও আপোষহীনতা থেকে যেমন এক ইঞ্চিও সরে আসেননি, তেমনি আবার কোথাও না কোথাও নিজেকেই দাঁড় করিয়েছেন যুক্তিবাদের কাঠগড়ায়। বাংলা চলচ্চিত্রে এমন সাহসী ছবি খুব কমই আছে। উজাড়ও করেছিলেন নিজেকে জীবনের এই শেষ ছবির জন্য। অনেকেই এই কালজয়ী সৃষ্টিকে জঁ কঁকতোর ‘টেস্টামেন্ট অব অর্ফিয়ুস’ কিংবা নিকোলাস রে ও উইম ওয়েন্ডারের বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘লাইটিং ওভার ফায়ারের’ সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। বলা বাহুল্য, তা মোটেও অতিকথন নয়।

যুক্তি তক্কোর introductory scene-টি ছিল একটি অনন্য ব্যাতিক্রমী চিন্তার ফসল। এই ছবির প্রথম দৃশ্যে এক অসাড় কিংকর্তব্যবিমূঢ় বৃদ্ধের মুখ উঠে আসে। বিস্ময়ভরা চোখে সে কিছু একটা দেখছে। দেখছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না। ওই অক্ষম, জড়ভরত মানুষটি আসলে অস্থির সে সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দুই বাংলার গৃহহীন, অসহায় মানুষদের প্রতীক। তার পাশাপাশি উঠে আসে তিনটি মানুষের ছায়ানৃত্য। দেশ-কাল-মানুষের মধ্যে নিহিত মধ্যবর্তী শূন্যতাস্বরূপ। শম্ভু ভট্টাচার্য ও সম্প্রদায়ের একটি অসামান্য shadow ballet। নেপথ্যে বাজে ঢাক, যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি। তার সাথে সরোদের মূর্ছনা। উঠে আসে রাগমালার অংশবিশেষ। মনে পড়িয়ে দেয় সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’-এর (১৯৬৯) সেই বিখ্যাত ভুতুড়ে নৃত্য। ঋত্বিক কতটা সত্যজিৎ অনুপ্রাণিত ছিলেন সে নিয়ে প্রশ্নটা আজও রয়ে গেছে।

পরের দৃশ্যে দেখা যায় নীলকণ্ঠকে। শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী অথচ ঘোর মাতাল নীলকণ্ঠ চূড়ান্ত anarchist. যার জেরে মধ্যবয়সে স্ত্রীপুত্র বিচ্ছেদ। বালক সত্যকে নিয়ে বিদায় নিতে আসে স্ত্রী দুর্গা। বিচ্ছেদদৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে ঋত্বিক ব্যবহার করেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের এক অদ্ভুত মিশেল। বেজে ওঠে বেটোফেনের ফিফথ সিম্ফনি ইন সি মাইনরের (5th symphony in C minor, Ludwig Van Beethoven, 1804-1808) মূর্ছনা। সেই সুরের রেশ ধরেই উঠে আসে সেতারের আলাপ। জৌনপুরী রাগে। যুক্ত হয় বাঁশি ও বেহালার ঐকতান। এখানেই সরোদিয়া ও সঙ্গীতকার বাহাদুর খান সাহেবের ‘মাস্টার-স্ট্রোক’।

পরের দৃশ্যে প্রবেশ হয় বঙ্গবালার। সে পূর্ব বাংলার মেয়ে, উদ্বাস্তু, সহায়সম্বলহীন। নীলকণ্ঠর সাথে প্রথমবার মুখোমুখি হয় সে। নেশার ঘোরে উড়ে আসে প্রশ্ন– “তুমি কে মা? তুমি কী আমার হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের আত্মা?” সাথে সাথে বেজে ওঠে মঙ্গলধ্বনি। সেতারের ঝালাতে মূর্ছনা ছড়ায় সর্বত্র।

অন্য একটি দৃশ্যে গৃহহীন নীলকণ্ঠর তরুণ সঙ্গী নচিকেতা তাদের আশা-আকাঙ্খা ও সম্ভাবনার (Prospect) কথা বলে আক্ষেপ করে। তাকে কটাক্ষ করে নীলকণ্ঠ। সময়ের মারে দুই অসমবয়সী মানুষের কিছু না করে উঠতে পারার হতাশা ও ক্ষোভকে ফোটাতে ঋত্বিক ব্যবহার করেছেন বাঁশি। পিলু রাগের করুণ সুর বেজে ওঠে বাঁশিতে। অন্য দৃশ্যে দেখা যায় রাতের কলকাতায় চোলাইয়ের ঠেকে গেছে নীলকণ্ঠ। দেশি মদের ঠেকের পরিবেশ বোঝাতে হারমোনিকার ব্যবহার এখানে উল্লেখযোগ্য।

এরই সাথে উঠে আসে রাতের কলকাতার সেই দৃশ্য। গৃহহীন তিনটি মানুষ নীলকণ্ঠ, বঙ্গবালা ও নচিকেতা– রাত কাটানোর জন্য আশ্রয় নেয় পার্কের বেঞ্চে। পুলিসের হানার মধ্যেই চলে তাদের অলৌকিক কথোপকথন। এই দৃশ্যে যথাযথ প্রয়োগ হয়েছে বাঁশি। লোকধুনের সুরে।

তাদের কথোকথনের মাঝেই উঠে আসে ‘ফ্ল্যাশব্যাক’। যৌবনকালের কথা ভাগ করে নেয় নীলকণ্ঠ। বলে তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমের কথা। আর এখানেই সার্থক প্রয়োগ হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রেমপর্যায় থেকে ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি’। রবীন্দ্রসঙ্গীতে সংযোজিত হওয়া সরোদের ধুন তাকে আরও মোহাবিষ্ট করে।

পরের দৃশ্যে উঠে আসে ভোরের কলকাতার ছবি। মধ্যবিত্তের প্রাতঃভ্রমণের দৃশ্য। নেপথ্যে বাজে সারেঙ্গী। ললিতের সুরে। দেখা যায় আরেক গৃহহীন বৃদ্ধ মাস্টারমশাই জগন্নাথ ভট্টাচার্যকে। জগন্নাথ দুহাত জোড় করে সূর্যস্তব করেন। ‘জবাকুসুমসঙ্কাশ’-এর সাথে মিশে যায় সেতারের আলাপ।

অন্য একটি দৃশ্যে দেখা যায় এক বাউলকে। গঙ্গার ধারে একতারা হাতে সে গাইছে দূরবীন শাহের গান– ‘নামাজ আমার হইলো না আদায়’। সত্তরের দশকে উদ্বাস্তুপীড়িত অশান্ত কলকাতার বুকে এইভাবেই একটুকরো বাংলাদেশ তুলে এনেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। গানের সুরে এক হয়ে যায় গঙ্গা-পদ্মা।

আরেকটি দৃশ্যে ঋত্বিকের সমসাময়িক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’দের দেখা মেলে। তারা বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্রকার শত্রুজিৎ বসু ও তার দলবল। বহু বিদ্বজ্জন মনে করেন, ঋত্বিকের এই শত্রুজিৎ চরিত্রটি আসলে অন্য কেউ নন, সত্যজিৎ রায় স্বয়ং। দুই চলচ্চিত্রকারের মধ্য দিয়ে উঠে আসা মতাদর্শের ফারাকটুকুই পর্দায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তুলে আনতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সে দৃশ্যে দেখা যায় গঙ্গার ধার দিয়ে মোটর গাড়ি ছুটিয়ে যাওয়ার সময় বাউলগান শুনে ভাবুক হয়ে পড়েন শত্রুজিৎ। পরে তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে গড়ের মাঠে মদের আড্ডাতেও সেই উদাসীনতা পিছু ছাড়ে না শত্রুজিতের। গানের রেশ তার ভাবনার জগতকে ঢেকে ফেলে। বন্ধুবান্ধব বা ‘সিউডো-বুদ্ধিজীবী’ মহলকে তিরস্কার করেন তিনি। এই দৃশ্যে হারমোনিকার প্রয়োগ মনে দাগ কেটে যায়।

পরের দৃশ্যে দেখা যায় এক উদ্বাস্তু রমণীকে। তিনি তার সন্তানকে পুকুরের জলে স্নান করাচ্ছেন। নেপথ্যে বেজে ওঠে বাঁশির করুণ শব্দ। দূরে করুণ মুখে বসে থাকতে দেখা যায় বঙ্গবালাকে। তার ফেলে আসা মা, মাতৃভূমি পূর্ব বাংলার কথা মনে পড়ে তার। গেয়ে ওঠে একটি সিলেটি লোকগান– ‘বাইতাম তরী দ্যাশে যাইতাম।’ এই গানের রচয়িতা কে তা সঠিক অর্থে জানা যায় না। অনেকের মতেই এটি একটি ‘প্রচলিত’ গান। করুণ-বিষাদঘন সুরে এই গানটির চলন পরিবেশ ভারি করে তোলে। গানটি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে বীণাপাণি দেবীর অসামান্য লোক-গায়কীর অবদানে। তার সাথে যুক্ত হয় সরোদের মূর্ছনা।

গান শেষ হলে দেখা যায় নীলকণ্ঠকে। গানটি শুনে তিনি মোহিত। গভীর রেখাপাত করে তার মনে। জীবনকে আরও একটি সুযোগ দিয়ে দেখতে চান। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থিত কাঞ্চনপুরে স্ত্রীপুত্রদের কাছে যেতে চান তিনি। গ্রামাঞ্চল পেরিয়ে পায়ে হেঁটে পাড়ি দেয় চারজনে। এ দৃশ্যে বাঁশির ব্যবহার উল্লেখজনক।

ক্রমেই শুরু হয় যাত্রা। এই চারজন এক সাথে পথ চলা শুরু করে এক সময় তারা এসে পৌঁছায় রাঢ়ভূমি পুরুলিয়ায়। গোটা পুরুলিয়া জুড়ে তখন হিংসার আগুন। ছৌ নাচের শিল্পীদের সঙ্গে সেখানে ভূমি দখলদারদের লড়াই চলছে। নীলকণ্ঠরা আশ্রয় পায় ছৌ শিল্পী পঞ্চানন সর্দারের বাড়ি। নেপথ্যে উঠে আসে ছৌ নৃত্য, আদিবাসী সঙ্গীতে বাঁশি, মাদল, ধামসা, নাকাড়ার সাথে ছৌ শিল্পীদের যুদ্ধের মহড়া।

অন্যদিকে দেখা যায় বৃদ্ধ ছৌ শিল্পী পঞ্চানন সর্দার আর বঙ্গবালার কথোপকথন। পঞ্চানন ছৌ শিল্পের অবক্ষয়ের কথা দুঃখের সাথে তুলে ধরে বঙ্গবালার কাছে। তুলে ধরে ছৌ নৃত্যে কীভাবে উঠে আসে যুদ্ধের মহড়া (আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে ছড়া কেটে) তার ব্যাখা। বালিকাসুলভ বঙ্গবালা দুর্গার ছৌ মুখোশ পড়ে নাচতে চায়। মহিলা নৃত্য ছৌ শাস্ত্রবিরুদ্ধ জেনেও তার মুখের দিকে তাকিয়ে পরম স্নেহে পঞ্চানন তাকে বাধা দিতে পারে না। দুর্গা মুখোশ পড়ে বঙ্গবালা যেন নিজেই দশপ্রহরণধারিনী। এই দৃশ্যে সাবেকী ছৌ নৃত্যের অংশ তুলে ধরেছেন ঋত্বিক। দেখা যায় মহিষাসুরমর্দিনী পালা। আবারও বাজে ঢাক, নাকাড়া, বাঁশি। দেখা যায় অসুরদলনী দুর্গাকে। এই দৃশ্যে শঙ্খধবনি যেন যুদ্ধে যাওয়ার ইঙ্গিতবাহী। ছৌ শিল্পীদের সাথে ভাবোন্মত্ত হয়ে নাচতে দেখা যায় জগন্নাথ পণ্ডিতকে। বেজে ওঠে সেতার ও বাঁশি। যুক্তি তক্কোর শেষাংশ জুড়ে বহুবার এই আদিবাসী সঙ্গীতে সেতার ও বাঁশির মিশেল ঘটিয়েছেন ঋত্বিক।

একটি দৃশ্যে নীলকণ্ঠ ও তার সাকরেদ নচিকেতা গ্রাম ঘুরে দেখতে বেরিয়ে জোতদার মাধব হালদারের বিষনজরে পড়ে। জোতদার সন্দেহ করে তারা বুঝি বিক্ষুব্ধ ছৌ শিল্পীদের মদত দিতে এসেছে। দেখে নেয়ার হুমকি দেয় সে। নেপথ্যে আদিবাসী নৃত্য, যুদ্ধপ্রস্তুতিস্বরূপ উঠে আসে। এই দৃশ্যে একটি শিশুকে নাকাড়া বাজাতে দেখা যায়। বাজে ধামসা। বিদ্রোহের সাজোসাজো রব উঠে আসে যেন এই আদিবাসী সঙ্গীতের মাধ্যমে। পরপর দৃশ্য জুড়ে দেখা যায় এই আদিবাসী ছৌ নৃত্য। দেখা যায় আদিবাসী মহিলাদের সম্মিলিত নৃত্যশৈলী। একইভাবে এখানে ধামসা, মাদল ও বাঁশির যথাযথ ঐকতান তুলে ধরে দৃশ্যটিকে অন্য মাত্রা দেন ঋত্বিক।

একটি দৃশ্যে শিশুসুলভ বচসায় লিপ্ত নচিকেতা ও বঙ্গবালা। বঙ্গবালার দাপটের কাছে পর্যুদস্ত হয় নচিকেতা। নেপথ্যে বাঁশিতে লোকসুর ও ঢাকের শব্দ দেবীমাহাত্ম্য ফুটিয়ে তোলে। এরই continuation-এ দেখা যায় পঞ্চানন সর্দারের বাড়ির দাওয়ায় খেতে বসেছে তার শহুরে অতিথিরা। মাতৃস্বরূপা বঙ্গবালা খাবার পরিবেশন করে। কিন্তু ক্রুদ্ধ নচিকেতা সে খাবার গ্রহণ করতে চায় না। থালা ঠেলে সরিয়ে দেয়। উঠে যায় সে। দুঃখে, অপমানে বঙ্গবালা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যে দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘কেন চেয়ে আছো গো মা মুখপানে’ ধ্বনিত হয়। নীলকণ্ঠর গলায় এই দেশাত্মবোধক গান এই সিনেমার অন্যতম সেরা সম্পদ। বিশেষ করে এই দৃশ্যে নীলকণ্ঠ ও বঙ্গবালার অভিব্যক্তি বা expression ছিল কালোত্তীর্ণ। এই গানের মাধ্যমে ওপার বাংলার সারল্য ও অসহায়তার প্রতি এপার বাংলার মধ্যবিত্তের উপেক্ষা ও যাতনার রূপটির কথা প্রকাশ পায়।

সকালে পঞ্চানন সর্দারের কাছে বিদায় নেয় সকলে। গ্রামীণ সারল্য মাখা পঞ্চানন এই বিদায়ে ব্যথিত হয়। কন্যাসম বঙ্গবালা চলে যাবে দেখে সে চোখের জল ধরে রাখতে পারে না। এই দৃশ্যে সরোদের করুণ আলাপ স্বজনবিচ্ছেদের দৃশ্যটিকে ভরাট করে তোলে। গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পথে নীলকণ্ঠদের পথ আটকে দাঁড়ায় অত্যাচারী জোতদার মাধব হালদার। সে নীলকণ্ঠকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। কিন্তু নিজের বুকে গুলি নিয়ে নীলকণ্ঠকে রক্ষা করে বৃদ্ধ জগন্নাথ পণ্ডিত। মারা যান তিনি। নেপথ্যে মারোয়া রাগের করুণ সুরে সেতারের মূর্ছনায় দৃশ্যটি ফুটিয়ে তোলেন ঋত্বিক। এরই সাথে সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দেখা জড়ভরত সেই বৃদ্ধের মুখ ও সংক্ষিপ্ত ছায়ানৃত্য সেই অস্থির ও ভারাক্রান্ত সময়ের দ্যোতনা ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু থেমে থাকে না নীলকণ্ঠ। তাকে যে এগিয়ে যেতেই হবে। তাই পরের দৃশ্যে শালবনের মধ্যে দিয়ে উদাস মনে নীলকণ্ঠকে অক্লান্ত পায়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। নেপথ্যে নট ভৈরব রাগে সেতারের মূর্ছনা মনে দাগ কেটে যায়। চলতে চলতে থেমে গিয়ে নীলকণ্ঠর মুখে ধ্বনিত হয় সেই মন্ত্রোচ্চারণের মতো সেই অমোঘ স্বগতোক্তি ‘সব পুড়ছে… ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে… আমি পুড়ছি’-র সময় ও দেশকালের বুকে দাগ কেটে বসার মতো সেই অনির্বচনীয় সংলাপ।

পরের দৃশ্যে দেখা যায় দীর্ঘ পথ চলে অবশেষে নীলকণ্ঠ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা কাঞ্চনপুর এসে পৌছায়। স্ত্রীর বাড়ির হদিশ জানতে রাস্তায় পড়ে থাকা এক মাতালের সাহায্য চায় তারা। মাতাল চরিত্রে জহর রায়ের মুখে ‘কালো মেয়ের পায়ের তলা’র মতন একটি শ্যামাসঙ্গীতকেও ব্যবহার করেছেন ঋত্বিক। স্বল্প হলেও এই গান সামান্য হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে দর্শকের মুখে।

অন্য একটি দৃশ্যে পূর্ববঙ্গীয় লোকগীতিকে ব্যবহার করেন ঋত্বিক। ‘জন্তি গাছে জন্তি ফল’ গানটি গেয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। সেই দৃশ্যে দেখা যায় বহু কষ্টসাধনার পর নিজের স্ত্রীপুত্রের সাথে মিলিত হয় নীলকণ্ঠ। একটি বিচ্ছিন্ন পরিবারের এই মিলনে খুশি সবাই। সেই আনন্দে বঙ্গবালা এই গানটি গাইছে। এতদিন পরে সেও যেন ঘর পেয়েছে। বহুজনের মতে গানটির উৎস সম্পর্কে দুটি তথ্য পাওয়া যায়। এক, গানটি প্রচলিত সিলেটি কথন ও দুই, গানটির রচয়িতা কবি জসিম্মুদ্দি। লোকগীতির সাথে এই দৃশ্যে সরোদের ব্যবহার তাকে অন্যমাত্রা দেয়।

এরই পাশে দেখা যায় মদ্যপ ও কাণ্ডজ্ঞানহীন নীলকণ্ঠকে আশ্রয় দিতে চায় না দুর্গা। সে স্বামীকে চলে যেতে বলে। কিন্তু বঙ্গবালাকে সে রেখে দিতে চায় নিজের কাছে। এ নিয়ে কথা বলে দুর্গা ও বঙ্গবালা। এ দৃশ্যের নেপথ্যে বাঁশির প্রয়োগ মনে রাখার মতো। দৃশ্য এগিয়ে চলে। অন্য একটি দৃশ্যে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে নীলকণ্ঠ দুর্গাকে বলে ছেলে সত্যকে সে একবারের জন্য দেখতে যায়। একটি রাত লোকালয়ের বাইরে শালবনে কাটিয়ে ভোরের প্রথম আলোয় সন্তানের মুখ দেখে সে চলে যেতে চায়। এই দৃশ্যে সেতার ও বাঁশির জোড়া ব্যবহার তারিফযোগ্য।

দৃশ্যের পর দৃশ্য এগিয়ে চলে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে নীলকণ্ঠ। সাথে নচিকেতা, বঙ্গবালা। রুক্ষ বনপথে প্রবেশ করার আগে নীলকণ্ঠর ভাবদর্শনের মধ্যে দিয়ে তার সমাজ সচেতনতা ফুটিয়ে তোলেন ঋত্বিক। একের পর এক প্রশ্ন তোলে নীলকণ্ঠ। সেই প্রশ্ন সামাজিক অবক্ষয় ও স্বকীয় ভূমিকা সম্পর্কিত। এই আত্মিক টানাপোড়েনের দৃশ্যটি ফুটিয়ে তুলতে সাঁওতালি বাঁশির প্রয়োগ নিঃসন্দেহে ঋত্বিকের নান্দনিকতার পরিচয়বাহী।

এরই মধ্যে নকশাল আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি হন তারা। তরুণ নকশাল নেতার মুখোমুখি হয় নীলকণ্ঠ। রাতের অন্ধকারে, বনের মধ্যে শুরু হয় অতীন্দ্রিয় কথোপকথন। উঠে আসে মার্ক্স-এঙ্গেলসের বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ থেকে পুঁজিবাদী স্তরে রূপান্তরের ইতিবৃত্ত। উঠে আসে আত্মমন্থনের অসহায় স্বীকারক্তি– “আমি কনফিউজড। সবাই কনফিউজড।” জীবন, জীবিতের ধর্ম– এই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন নীলকণ্ঠ বাগচি। আত্মসমীক্ষণের সেইক্ষণে সরোদের মূর্ছনা ও বাঁশির প্রয়োগ নতুন এক ইতিহাস রচনার ইঙ্গিত দেয়। ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গীতদর্শনের সার্থকতা এখানেই।

অবশেষে সেই ‘ক্লাইম্যাক্স’। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে জঙ্গলে ঢোকে সশস্ত্র পুলিশ। আত্মগোপনকারী নকশালদের খোঁজে। শালবনের মধ্যেই শুরু হয় দুই পক্ষের গুলির লড়াই। মেশিনগান ও গ্রেনেডের শব্দে উত্তাল হয়ে ওঠে বনবনান্তর। পুলিশ ও নকশালদের গোলাগুলির মাঝে পড়ে যায় নীলকণ্ঠ ও তার দলবল। গুলি লাগে নীলকণ্ঠর পেটে। মারা যায় সে। মারা যাবার আগে দেখতে পায় তার সাথে শেষবার দেখা করতে এসেছে দুর্গা ও সত্য। শেষবারের মতো তার মুখে ধ্বনিত হয় সেই অমোঘ স্বর– “সব পুড়ছে, ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে, আমি পুড়ছি।”

নীলকণ্ঠর মৃত্যুদৃশ্যে আবারও ঝমঝম শব্দে বেজে ওঠে বেটোফেনের ফিফথ সিম্ফনি। যেন এক অনন্ত, অপ্রতিরোধ্য জীবনের বিস্ময়কর পরিসমাপ্তির সাক্ষ্য হয়ে ওঠে এই সিম্ফনিটি। দেখা যায় দুজন কনস্টেবল নীলকণ্ঠর ‘ডেডবডি’ উঠিয়ে নিয়ে যায়। যা দেখে অন্য একটি পুলিশ টুপি খুলে বলে ‘আস্তে’! এইভাবেই যেন শেষ লড়াইতে জিতে গেল নীলকণ্ঠ বাগচি। যেন সমস্ত অপমান, বঞ্চনা ও গঞ্জনার স্বীকৃতিদান। দৃশ্যের নেপথ্যে সরোদ ও বাঁশির যৌথ মূর্ছনা সেই পরিপূর্ণতার সাক্ষ্যবাহী।

পরিশেষে, দুর্গা-সত্য-বঙ্গবালা ও নচিকেতা সহ ধৃত নকশালরা ও নীলকণ্ঠ বাগচির লাশ নিয়ে পুলিশদের ফিরে যেতে দেখা যায়। অবর্ণনীয় সুরে বেজে ওঠে উলুধ্বনি। যেন আগমনীর বার্তাস্বরূপ, যেন দিনবদলের মাহেন্দ্রক্ষণের অপার ইঙ্গিত। শেষ দৃশ্যে পর্দা জুড়ে দেখা যায় সেই বৃদ্ধের মুখ। আবারও ভেসে ওঠে সেই ছায়ানৃত্য। একতারা ধ্বনির মধ্যে উঠে আসে স্বস্তিক চিহ্ন।

পড়ে থাকে একরাশ যুক্তি ও তক্কো। আর এমন এক গপ্পো যার শুরু নেই কোনও… তেমনি যার শেষও নেই আজও! অনন্ত কালখণ্ডের মধ্যে ধ্বনিত হতে থাকে ব্রহ্মাণ্ড পোড়ার শব্দ।

আবার আগামী সংখ্যায়