Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্বাধিকারের জয়

অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

 

প্রবেশিকা পরীক্ষা হবে কি হবে না, তার থেকেও যে বড় প্রশ্নটি যাদবপুরের ছাত্র-ছাত্রীরা তুলে ধরেছে তা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার বজায় থাকবে কিনা। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়ম করে দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে। সর্বোপরি, জয়েন্টের মতো প্রবেশিকা পরীক্ষাও চালু আছে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল শিক্ষায়। কেউ বলতেই পারেন, এইসব পরীক্ষাও তুলে দেওয়া উচিত এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই ভর্তি প্রক্রিয়া চলুক। কিন্তু তা এখনও কেউ বলেননি। তাহলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এত শোরগোল কেন? পাশাপাশি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে আসেন যারা বিভিন্ন +২ বোর্ডের অধীনে পাশ করেছেন। এইসব বোর্ডগুলিতে নানা ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি ও নম্বরের বিবিধ রকম। দেখা যাবে, কোনও বোর্ড ঢেলে নম্বর দিচ্ছে, কোনও বোর্ড নম্বরের ক্ষেত্রে কৃপণ। তেমন পরিস্থিতিতে, প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি হলে, অনেক ভালো ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে পড়ার সুযোগ নাও পেতে পারেন। বিশেষত, পশ্চিমবঙ্গের উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের যখন এমনিতেই অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় কম নম্বর দেওয়ার বদনাম আছে। তাই, একটি সুনামী বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার সুবাদে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রচলন করে একটি সম-পাটাতনে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত মনস্কতার পরিচয় দিয়েছে বলেই সাব্যস্ত করি।

বুঝতে হবে, আসলে আঘাতটা এসেছে স্বাধিকারের ওপর। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি, পদ্ধতি এইসবের নিয়ন্তা কে? এই প্রশ্নটি নিয়েই বারবার আলোড়িত হয়েছে শিক্ষার দুনিয়া ও সমাজ। যদিও, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাদ দিলে, সরকারই অন্যান্য সমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের যোগানদার, তাই এমন একটা আওয়াজ প্রায়ই ওঠে যে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলিকে অতএব সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হতে হবে। বিষয়টা কার্যত দাঁড়ায়, শিক্ষা পরিচালনা ও অর্পণের কোনও যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও আমলাকুল ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই শিক্ষার মূল নিয়ন্তা হবে। এইভাবেই শিক্ষার পরিসরকে শাসকের তরফে দখল করে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলে। যেমন, ফুটবল একাদেমির নিয়মনীতি ও প্রশিক্ষণকে যদি আমলা ও রাজনীতিবিদরা দখল করে নেয় তবে সেখানে ফুটবল ছাড়া আর সব কিছুই সাধিত হতে পারে, সেভাবেই শিক্ষার অঙ্গন যদি শিক্ষক ও ছাত্রদের নাগালের বাইরে থাকে তবে শিক্ষাদীক্ষার অন্ত অতএব স্বতঃসিদ্ধ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাক্রম আজ এই মৌলিক প্রশ্নটির সামনে এসেই দাঁড়িয়েছে। আরও আশ্চর্যের কথা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজিকিউটিভ কাউন্সিল, যার হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব, গত সাত বছর সেখানে কোনও নির্বাচন হয়নি। চেষ্টা চলেছে শাসকের তরফে মনোনীত সদস্যদের দিয়ে কাজ চালানোর। আসলে উদ্দেশ্য, শাসকের ইচ্ছাগুলিকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া যা মোদ্দা কথায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ছড়ি ঘোরানো।

প্রবেশিকা পরীক্ষা সম্পর্কিত এতদিনের একটি প্রথা যদি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তুলে দিতে চায় বা তার পুনর্বিন্যাস করে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র ও উপযুক্ত পরিচালন সমিতির আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক হওয়াটাই কাম্য। দূর থেকে বসে কোনও মন্ত্রী, আমলা বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তা কখনই করতে পারে না। এখানে মুশকিল কী হয়েছে, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজিকিউটিভ কাউন্সিলে দীর্ঘদিন কোনও নির্বাচন নেই, মনোনীত একটি সংস্থা হিসেবে তার দিনযাপন, তার পক্ষে রাতারাতি এমন কোনও পট পরিবর্তনকামী সিদ্ধান্ত পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে তা রাজনৈতিক অঙ্গুলিহেলনেই ঘটেছে।

গত কয়েকদিনের ঘটনা দেখিয়েছে, ছাত্ররা দৃঢ়বদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, অনশন আন্দোলনে নেমেছেন। শিক্ষকদের একটি বড় অংশও এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার ডাক দিয়েছেন। সরকারও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের প্রশ্নটিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তার অটল অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। তবে সব বিষাদের পরেই আলোর যেমন উদয় হয়, ঠিক সেভাবেই, অবশেষে গত ১০ জুলাই ছাত্রদের দৃঢ়বদ্ধ আন্দোলনের সামনে মাথা নোয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আচার্য যখন কোনও বিধান দিতে অস্বীকার করলেন, বলটা আবার ঠেলে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের ঘরে, তখন অনশনরত ছাত্রদের আন্দোলনের সামনে পড়ে একজিকিউটিভ কাউন্সিল আবারও এক জরুরি সভায় বসে সিদ্ধান্ত নিল যে প্রবেশিকা পরীক্ষা বহাল থাকছে। নিঃসন্দেহে এ ছাত্র আন্দোলনের জয়, ছাত্রদের অটুট একতা ও লড়াইয়ের কাছে রাজনৈতিক শক্তি, শাসক ও কর্তৃপক্ষের পরাজয়। জয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকারের।