Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

কথা অমৃত সমান

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

 

[আদিবংশাবতরনপর্বাধ্যায়]

১. 

পরাশর

গাঢ় হও সন্নিকটে পরাশরপ্রিয়া
ঘোরা রজনী আনো চারুসুহাসিনী

তৃপ্ত হও মৎস্যস্নাতা, নৌকাবিহারে
তীর্থপর্যটনে সূচি অক্ষত যোনি

তাহাকে ধারণ করো দেবদ্বৈপায়নে
অদ্রিকা যেভাবে হন গিরি-গর্ভিণী

গাঢ় হও, কুজ্ঝটিকা নিবিড় শাসনে
বেদান্ত ভাগ করো, চারুসুহাসিনী…

 

২.

ব্যাস

হাতের ওপর হাত রাখো, প্রিয়তমা

তারপর সরাসরি চোখ রাখো চোখে
বলো কী দেখলে তুমি? ঘনান্ধকার?

লৌহগর্ভে ধরো জন্মান্ধকে…

জানি, কদাকার এই মুখব্যাদানে
তমসা লিখেছি আমি, ঘাতকের শোক

সেই ঠোঁট ছুঁয়ে দেখো, রোরুদ্যা নারী
দ্বিতীয় ফসল তবে পাণ্ডুর হোক।

কে তুমি দাসানুদাস, অকুতোভয়া

শিশ্নশিখরে হাত রাখো মৃদু হেসে
নাও তবে রক্ত, স্বেদ, বীর্যানুসূয়া

আর্যাবর্ত সেই ক্ষণে উঠে এসে
লেহন করেছে মাটি… ত্রিখণ্ড কীট,

অন্ধের হাত ধরে,
জরা সন্তর্পণে

বিষাদ ঘেঁটে, মহাভারত চিনে নিক…

 

৩.

গঙ্গা

প্রশ্ন কোরো না। শর্ত মনে রেখো।
আমাকে ভাসাতে দাও…

যেভাবে ভাসিয়েছি সূতিকাগার গত জন্মের
যেভাবে উড়িয়েছি বস্ত্র, অনাবৃত দেহে
প্রজাপতির স্পর্শ মেখেও
তাকিয়েছি তোমার দিকে, সরাসরি…

সময় এসেছে সেই নিরঞ্জনের
মন্ত্রপাঠ, গব্যঘৃত মাখা হোমাগ্নির ধূম্রচারণ
সময় এসেছে একে একে মুক্তির
আহা, অষ্টম গর্ভজাত

যেমন বহুদূর কোথাও
মথুরা কারাগারে জন্ম নেবে সাতটি প্রাণ,
পাথরে পাথরে তাদের ঘূর্ণায়মান শরীরের
শাখা উপশাখা… চিনে নিও তুমি

তবু মনে রেখো, প্রশ্ন করা বারণ
আমাকে ভাসাতে দাও…

ভাসাতে দাও এই গর্ভজলে
যত ক্লেদ, যত শোক-তাপ
ভাসাতে ভাসাতে চলি ভাসানের সুরে
জাগা যত পুণ্য, পাপ…

আমি তাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি, দেখি শ্বাস
প্রশ্বাসের মতো শরীরের ওম

ভাসতে ভাসতে ফিরবে তারা,
নিয়ে প্রজ্ঞা, স্থিতি, সংযম…

ততক্ষণ হে মূর্খ, প্রশ্ন কোরো না
শর্ত মনে রেখো,

আমাকে ভাসাতে দাও
আমাকে ডুবে যেতে দাও…

 

৪.

শান্তনু

ক্ষুধার্ত আমি। আমাকে শরীর দাও।
দাও কাম, মোহ-মহাভিষ, বিভঙ্গ মহিমা

কী নিতে চাও বলো গূঢ় প্রতিদানে?
সন্তানের প্রিয়সুখ, সংকলিত… অমা

নিশিশোক মুছে যাক অনাদির গ্রাসে
খণ্ড রেখেছি তুলে যমুনার জল

আমাকে ভেজাও সেই গুহ্য আবেশে
রতিভারে ডুবে যাই, যোনিমঙ্গল

শরীরের ভাঁজে ভাঁজে নদীর পুরাণ
কর পেতে সেই জলে আচমন করি

দূরে থাক রাজপাট, অসি, ধনুর্বাণ
দেহভাণ্ডে জাগ্রত সিদ্ধেশ্বরী

এক হাতে কাম তার, পুত্র ওই হাতে
উৎসর্গ করি তাকে রতি যন্ত্রণাও

এই নাও প্রিয়মুখ, ভস্ম-ললাটে
ক্ষুধার্ত আমি… আমাকে শরীর দাও।

 

৫.

সত্যবতী

যেভাবে অমোঘ কুহকে জালিকার
ষড়যন্ত্রে ধরা দেয় মাছ,
আমি সেই বশীকরণ জানি

অধৈর্য হোয়ো না, স্থিত হও, শিখে নাও
কীভাবে স্রোতের বিপরীতে ভেসে
বুঝে নিতে হয় মৎস্যহননের কৌশল…

ধীবর জানে কতটা সময় নেবে এই
জলক্রীড়া, কতটা ক্ষণ-অনুপলের
শেষে গুটিয়ে নিতে হবে জাল

ততক্ষণে বুঝে যাবে ফাঁতনার চাড়ে
লেগে থাকা সুগন্ধী, টোপ ছাড়া
কিছু নয় আর

বাকি সব অনির্মোক, বুদবুদ মাত্র
বাকি সব পরাশরের বিরুদ্ধাচরণ…

অবশিষ্ট আর যা কিছু
রক্ত, মাংস, শল্ক

অন্ত্যজের শাসন দখলের অধিকার!