Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

নয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তুপ্রণালী

রোমেল রহমান  

 

কয়েকজন মানুষের থেকে একজন কেউ বলল, আমরা কি বাদুড় হয়ে গেছি? অন্য একজন বলল, উঁহু এখনও না, তবে হয়ে যাব আর কিছুদিন এভাবে থাকলেই! কে যেন খিলখিল স্বরে বলল, প্রক্রিয়াধীন? দ্বিতীয়জন বলল, হুম্ম! সেরকমই! অন্য একজন জিজ্ঞাস করল, আমার কিন্তু খারাপ লাগছে না! সহ্য হয়ে গেছে! এভাবেও কিন্তু চিন্তা করা যাচ্ছে। প্রথমজন বলল, তোমার সামর্থ ভালো তাই টিকে যাচ্ছ আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, পেটের গু মাথায় চলে আসছে! এখন থেকে যাই ভাবব তার মধ্যে গু চলে আসবে! সেই খিলখিলে লোকটা আবার খিলখিল স্বরে বলল, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ব্যাটম্যান সিরিজের নতুন সিজন এখান থেকেই শুরু হবে! নিচের থেকে একজন পুলিশ চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, হেঁই চুপ! জবানে কুলুপ! উল্টো করে ঝুলিয়ে দেবার পরেও কথা বকেই যাচ্ছে! উফফ মাথাটা আউলে দিচ্ছে বিচিত্র হাবিজাবি হিজিবিজি বলে বলে! খিলখিলে লোকটা বলল, কেন আমাদের চিন্তা তুমি শুনছ নাকি? পুলিশ বলল, আমার বালে কান্দে আপনাদের অইসব বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যাট শোনার জন্য! প্রথমজন বলল, তারপরেও তুমি শুনছ? এবং তোমার মনে হচ্ছে কথাগুলো তোমার মনের মধ্যেও জমা হয়? কোনও উত্তর আসে না। তিনজন পুলিশের একজন ঝিমায়, একজন হেঁদো কিসিমের আর অন্যজন ভাবুক টাইপের। ফলে ভাবুক পুলিশটা সিলিঙের দিকে তাকিয়ে হা করে থাকে। তখন ঝুলে থাকাদের ভেতর থেকে দ্বিতীয়জন বলে, প্রক্রিয়াধীন! শালা দলে আসবে, আসল বলে! তারপর আমাদের সঙ্গে বাদুরের মতো উল্টো ঝুলে থাকবে! খিলখিলে লোকটা কথাটা শুনেই খিলখিল করে হেসে উঠল! ফলে সিলিঙে ঝুলন্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটা হাওয়া লাগল। একটা আঁকুপাঁকু ব্যাপার তৈরি হল। তখন পুলিশের হেঁদো সাইজের লোকটা বলল, হাসি কীসের? এ্যাঁ? বাদুরের মতো ঝুলিয়ে দেবার পরেও হাসি আসে? লজ্জা করে না? আপনাদের তো লেখাপড়া জানা ভদ্রলোক ভেবেছিলাম, আপনেরা দেখি আমাদের থেকেও জঘন্য? হা করে সিলিঙে তাকিয়ে থাকা পুলিশটা বলল, স্যর বুদ্ধিজীবী জিনিসটা আসলে একটা জিনিস যেটার লেজ মাথা বোঝা যায় না! উল্টো আর সদরের তফাৎ বোঝা যায় না! হেঁদো পুলিশটা বলল, অত দিয়ে আমাদের কী কাজ? উপরের নির্দেশ বন্দি করে উল্টো ঝুলিয়ে সাইজ করা। তাই করো তো বাপু! অযথা পর্যবেক্ষণ করে ফলাফল দিতে এসো না। উল্টো ঝুলে থাকা বুদ্ধিজীবীদের একজন জিজ্ঞাস করলো, উল্টো ঝোলা ছাড়া আর কোনও শাস্তি নেই? মানে ধরো একটু চুবানি খাওয়া! মানে ধরো চায়ের কাপে টি ব্যাগ যেমন চুবানি খায় তেমন আমাদেরকে চুবানি দেবেটেবে না? হেঁদো পুলিশটা বলল, সময় হলে সব টের পাবেন আপাতত ঝুলুন! পিনপিনে গলার এক বুদ্ধিজীবী বলল, আপনাদের উপর আমাদের কতজনকে ঝোলাবার আদেশ আছে? হেঁদো পুলিশটা বলল, সেটা সময় হলেই দেখতে পাবেন। ছাদে তো অজস্র কপিকল লাগানো হয়েছে। আশাকরি ফাঁকা থাকবে না। এক শীর্ণ বুদ্ধিজীবি বলল, আমার যে তর সহ্য হচ্ছে না ভাই। আমাদের সবাইকে একবারে ধরে গুলি করে দাও। পুলিশদের একজন ঘুম ভেঙে খেঁকিয়ে উঠে বলল, মাদারচোদগুলোর জন্য একটু ঘুমোতেই পারছি না। রাত জেগে খ্যাপলা জাল ফেলে এদেরকে একেক যায়গা থেকে ধরে ধরে আনতে হয়। এদেরও চোখে ঘুম নেই, ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে। নিজেরা না ঘুমাবি বাপ আমাকে একটু ঝিমোতে দে? তারপর পুলিশ লোকটা মশার কামড়ে ফুলে ওঠা জায়গাগুলো চুলকাতে লাগল। একজন খাটোমতো বুদ্ধিজীবী ঝুলে থাকার থেকে বলল, পিপাসা পাচ্ছে! নিচে বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে থাকা পুলিশটা তখন আবার হা করে তাকিয়ে থাকা। উল্টো ঝুলে থাকা দ্বিতীয় বুদ্ধিজীবী বলল, কল্পনা করুন আপনি পিপাসার ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন।  ওসব আপনার লাগে না। খাটোমতন বুদ্ধিজীবী বললেন, ফাজলামো রাখুন। আমার বইয়ের পাণ্ডুলিপিটা চোখের সামনে পুড়িয়ে দিল হারামজাদাগুলো। তারপর ধরে আনল, এক গ্লাস জল খাবার সময় দিল না। আগেরজন বলল, মেরে ফেলেনি এই তো ভাগ্য! আরও বোনাস চান? একজন উল্টো ঝোলা বুদ্ধিজীবী ম্লান স্বরে বলল, আমার গায়ে হাত তুলেছে, মাথাটা এখনও টনটন করছে। মৃত্যু হলেই ভালো হত। অন্য একজন শান্ত স্বরে বলল, এ রাজার শাসনামলে অপমান গায়ে মেখে লাভ নেই। বরং পাল্টা হাসুন! খিক খিক! ওটা প্রতিবাদ হিসেবে কাজে দেবে। একজন কেউ বলল, আহা! আপনি না খুব সস্তা! এরকম একটা সিচুয়েশনে আপনি ভাঁড়ামো…! দ্বিতীয় বুদ্ধিজীবী বলল, চুপ করো তো! একটা মানুষ আমাদের পক্ষে নেই আর তুমি নিজেকে বিরাট তালগাছ মনে করছ! আগেরজন বলল, আমার মনে হয় বাইরে বিরাট আন্দোলন হচ্ছে আমাদের মুক্তির দাবিতে! খিলখিলে বুদ্ধিজীবী এবার চিৎকার দিয়ে হেসে ফেলল! নিচের হেঁদো পুলিশ বলল, এরকম চললে কিন্তু আমরা হোস পাইপ সিয়ে গরম পানি ছিটিয়ে দেব! দ্বিতীয় বুদ্ধিজীবী বলল, আমাদের তলপেটে অবশিষ্ট যা আছে আমারাও তাই ছিটিয়ে দেব! ফলে নিচে হা করে এইসব পর্যবেক্ষণ করা চিন্তক পুলিশটি এবার কপ্‌ করে মুখের হা বন্ধ করে ফেলল নিরাপত্তার খাতিরে।

আরও কয়েকজন মানুষকে ধরে আনা হল শাস্তিগৃহে। উপর থেকে উল্টো দেখে তারা বলে, ঐ যে আরেকদল আনা হয়েছে। চিনতে পারছ? বাহ! কেউ বাকি যাচ্ছে না দেখি। একেবারে লিস্ট ধরে রোলকল করে তুলে আনা! একজন বলল, ঐ দেখো আমাদের প্রথম শহিদও হাজির হয়ে গেছেন। খিলখিলে লোকটা হেসে বলল, কার কথা বলছ, বুড়োদার কথা? আগেরজন বলল, হ্যাঁ! উনার আছে কঠিন এজমা! দেখছ না হাঁপাচ্ছে। এখন ঝুলিয়ে দিলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মরে সুতো হয়ে যাবে! ইতিহাসে এমন নজির তো আছেই! তখন ঝুলন্তদের একজন কেউ বলল, তারপর বিস্ফোরণ হবে! একজন কেউ স্পষ্ট চোয়ালে বলল, কেন বুড়োদা কি এটম বোমা নাকি? আগেরজন থতমত খেয়ে বলল, না বলছিলাম গণবিক্ষোভ! পিনপিনে গলার লোকটা বলল, সময় নেই সবাই টেলিভিশন প্রোগ্রামের চিন্তায় চিন্তিত! রাস্তায় বেশিক্ষণ এখন কারও পোষায় না! এবার নিরাসক্ত একটা কণ্ঠ বলল, জ্বালাতে না জানলে পোষাতে যাবে কোন দুঃখে? আগুনের কারবার করো, আগুনই নেমে আসবে তোমার দিকে। প্রথমজন বলল, সমস্যা হচ্ছে, নিচে যাদের চোখ বেঁধে আনা হয়েছে তাদের মধ্যে একজন লুঙ্গি পরা! এর যে কী হবে! এর তো উল্টো ঝুলিয়ে দিলেই সব ঝুলে যাবে! সবাই হেসে ফেলল! কয়েকজন নারী বুদ্ধিজীবীকে আনা হল, উপর থেকে একজন বলল, এবার মানিয়ে গেছে। ষোলো কলা পূর্ণ হল। এবার রাজার ষড়যন্ত্র ঠান্ডা মাথার। তখন হেঁদো পুলিশটা খেঁকিয়ে চিন্তক পুলিশটাকে হুকুম দিল। আর সে হুমড়ি খেয়ে বুদ্ধিজীবীদের একে একে পায়ে দড়ি বেঁধে ফেলতে লাগল। ফলে পায়ের সঙ্গে কপিকলের একেকটা হুক বেঁধে যেই টান দেয়া হতে লাগল, আর অমনি একেকজন বুদ্ধিজীবী মুহূর্তের ভেতর শূন্যে উল্টো ঝুলে দুলতে থাকল। ঝুলবার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকের চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হল আর বলা হল, আপনি মুক্ত! ফলে তারা একে একে ঝুলে দুলতে দুলতে একে অপরের গায়ে টক্কর খেতে লাগল আর হাসতে লাগল। মাটিতে থাকার সময়ে এরা অনেকেই পরস্পরের মুখদর্শন পর্যন্ত করত না। আজ এই একই ডালে ঝুলতে বাধ্য হয়ে তারা পরস্পরের সহযাত্রী হয়ে গেছে। এক সঙ্গে হাসতে হাসতে তারা বলল,

রাজার মুখে দিলাম ছাই… বুদ্ধিজীবী ভাই ভাই!

নিচ থেকে ঝিমানো পুলিশটা বলল, উফফ! এখানেও শ্লোগান? ইলেকশন হবে নাকি? তখন খিলখিলে সেই বুদ্ধিজীবী বলে বসল, হবেই তো! হতে বাধ্য! এই যে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করলে, এদের ভাগ্য তো এরা বানাবেই! এই যে আমরা যারা উল্টো করে ঝুলন্ত বাস্তবতার বাসিন্দা তাদের একটা গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র, মানে কোনও একটা সিস্টেম থাকা বাঞ্ছনীয়! কী বলো? নিচের চিন্তক পুলিশটার হা দ্বিগুণ হয়ে গেল। এবার হেঁদো পুলিশটাও ব্যাপারটা শুনতে লাগল, ফলে ঝিমানো পুলিসটাও কান পেতে থাকল। তখন নিরাসক্ত কণ্ঠটি বলল, এটা তাহলে কাদের দেশ? উল্টো ঝুলে থাকা মানুষের সীমানা কি? মাটির রাজার নিশ্চয়ই নিয়ন্ত্রণে নেই আমরা আর? উল্টো ঝুলে থাকা মানুষদের নিজস্ব সমাজব্যবস্থা চাই! এটা একটা নতুন জগত! এটা একটা নতুন কাঠামো! জীবন তো কেবল মাটিতেই থাকে না, পা বেঁধে উল্টো ঝুলেও থাকে। তো উল্টো ঝোলার নীতি চাই! সবাই হই হই করে উঠল, সাধু সাধু! উত্তম প্রস্তাব! এসো প্রক্রিয়ায় ফেলি ব্যাপারটাকে! একজন বলল, আচ্ছা আমরা কি এবার থেকে গাছে পাকা ফলের মতো আমাদের পক্ক চিন্তা উপর থেকে মাটিতে ফেলব? নাকি উপচে গলে গলে পরে যাবে? বুড়ো একটা কণ্ঠ বলল, ব্যাপারটা কিন্তু একটা প্যারাডক্স! এই যেমন আমরা উল্টো ঝুলে সদর আছি ভাবছি, তেমনই মাটিতে থাকা মানুষ মানে সরকারের পালিত বুদ্ধিজীবীরা দাঁড়িয়ে থেকেও হয়তো উল্টো ঝুলে আছে? মানে আমরা নিচে হলে ওরা উপরে, আর আমরা উপরে মানে ওরা নিচে! ফলাফল কিন্তু একটাই, মাঝখানে রাজা! রাজার ইচ্ছা! চিনচিনে কণ্ঠে একজন বলে, তিনি তার রঙের বাইরের বুদ্ধিজীবীদের শাস্তি গৃহে পাঠান। এই নয়া নীতি তাকে দিয়েছে তার পালিত বুদ্ধিজীবীরাই। অন্যজন বলল, হতেই পারে, এমনই তো হয়! তবে পতন আসন্ন! হয় আমরা ছিঁড়ে পড়ব ওদের মাথায় নয় তো ওরা পড়বে আমাদের পিষে ফেলতে। খিলখিলে লোকটা বলল, আলোচনা ক্রমশ সিরিয়াস লাইনে চলে যাচ্ছে! আসুন সস্তা করে ফেলি ব্যাপারটা! ঐ যে কে যেন লিখেছিল সেদিন,

মানুষের থেকে আজ গোমূত্র মূল্যবান… রাজা তোর সিংহাসন হবে খানখান।

এটাই এখন ঠিক! সেই লেখককে তো গুম করে দেয়া হয়েছে! আমারা ভাগ্যবান তাই উল্টো ঝুলে নতুন রাষ্ট্র বানাবার চিন্তা সেলাই করছি। একজন কেউ বলে উঠল, আহা সেলাই? দারুণ বলেছ শব্দটা। মনে পড়ে সেই লাইনগুলো? ঐ যে… যেটা দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল…

মগজ সেলাই করো;
মাথাটা ঝালাই করো,
গন্ধ ছড়াবে না।

আগেরজন বলে উঠল, বাহ বাহ! তখন নিচের থেকে ভাবুক পুলিশটা তার হা বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আপনাদের উল্টো ঝোলার দেশে কি শুধু বুদ্ধিজীবীরাই থাকবে? এক মহিলা বুদ্ধিজীবী বলল, উঁহু! তোমরাও আসতে পারবে! সকল দুয়ার খোলা। দলে দলে উল্টো ঝুলে ফুলের মতো হবে! তখন চিন্তক পুলিশটি ঝুলন্ত বন্দি বুদ্ধিজীবীদের দিকে হাত বাড়ায়। এক তরুণী বুদ্ধিজীবী খেঁকিয়ে বলে ওঠে, এই হাতাহাতি করবে না তো! এখানে শুরুটা নিজের করতে হবে। ফলে ভাবুক পুলিশটি নিজের পায়ে দড়ি বেঁধে হেঁদো পুলিসটাকে বলে, স্যর একটু টাইনা ঝুলায় দেন আমারে! হেঁদো পুলিশটা হা হয়ে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে টের পায়, কে যেন বুকের মধ্যে উস্কে দিচ্ছে ঝুলিয়ে দিতে! ফলে সে যত্নের হাতে চিন্তক পুলিসটিকে ঝুলিয়ে দেয় উল্টো করে! এবং সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হাততালি শোনা যায়। উল্টো ঝোলা বুদ্ধিজীবীদের উল্টো হাততালি। ফলে হেঁদো পুলিশটিরও ভালো লাগে। একটা তাড়না তৈরি হয় বুকের মধ্যে। একটু পর চিনচিনে কণ্ঠের বুদ্ধিজীবী বলে ওঠে, দেশ থেকে সব কবি লেখক শিল্পী চিন্তকদের গ্রেফতার করে উল্টো ঝুলিয়ে শেষমেশ কি আমাদের রাজা নিজেও ঝুলে পড়বেন? একজন কেউ বলল, হে হে অত সস্তা উনি না! বরং উনি উনার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে পাছা চুল্কাবেন। তখন একটা মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেল। নিচ থেকে হেঁদো পুলিশটা বলল, স্যর আমার না আপনাদের মতো হতে ইচ্ছে হয়! উপরে উল্টো ঝুলে থাকা একজন লেখক ফিসফিস করে বলল, নির্ঘাত রক্তে কাব্যদোষ আছে! অন্য একজন বুদ্ধিজীবী বলল, অত পুতুপুতু না করে চলে আসুন আমাদের সঙ্গে ঝুলে পড়ুন! জীবনকে অন্যভাবে দেখার এই তো সুযোগ! লোকটা পালে হাওয়া পায়।  ফলে সে বলে বসে, স্যর আরেকটা প্রশ্ন! আমি তো স্যর ফ্যামিলি ম্যান! আমি একাই রোজগার করি! তো আমি যদি আমার বউ বাচ্চাকে নিয়াসি? মানে আমি আবার বউ বাচ্চা ছাড়া ঘুমাইতে পারি না। মিডিলক্লাস তো। বুদ্ধিজীবীদের ভেতর একটা মৃদু টেনশন বয়ে গেল! তাদের কেউ একজন বলল, এবার তো দেখি সত্যি সত্যি জিনিসটা ছড়াচ্ছে! ফ্যামিলি আনলে, এখানে খাবারদাবারের ব্যবস্থা করতে হবে! স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। বাচ্চাকাচ্চাও জন্মাবে! চিকিৎসা। শিক্ষা। জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কর্মসূচি নিতে হবে! উফফ বিরাট কর্মযজ্ঞ! কী বলেন? নিরাসক্ত স্বরের কণ্ঠটি বলল, সেটাই স্বাভাবিক! নতুন একটা কাঠামো দাঁড় করাবেন আর তার বিস্তারের জন্য এগুলো থাকবে না তা তো হয় না! এক মহিলা বুদ্ধিজীবী বলে বসল, ব্যাপারটা কিন্তু দারুণ রোমাঞ্চকর! আমাদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে দেখা যাবে কিছুদিনের মধ্যে পৃথিবীর একদল মানুষ হেঁটে বেড়ায়, আরেকদল মানুষ উল্টো ঝুলে থাকে। মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি! মগজে মগজে টক্কর! কে যেন বলল, হিসস! চুপ করো তো আমরা সংখ্যায় কজন? নিচ থেকে চেঁচিয়ে উত্তেজিত পুলিশটি বলে, স্যর তাইলে কী করব? ফ্যামিলিরে খবর দিব? বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে হাজির হতে বলি? সূক্ষ্মবুদ্ধির এক বুদ্ধিজীবী বলল, এক কাজ করুন! আপনি যেহেতু সাইজে একটু মোটা তো আপনি নিজে আগে ঝুলে দেখুন ব্যাপারটা! তারপর ফ্যামিলি আনবেন? বিষয়টা হেঁদো পুলিশটার মাথায় গেল ফলে সে বলল, এটা স্যর ভালো বুদ্ধি! তখন সে ঝিমানো পুলিশটাকে বলল, আমাকে ঝুলায় দেও! এইসব কাহিনী দেখতে দেখতে ঝিমানো পুলিশটার ঝিম কেটে গেছে। সে বলল, স্যর এইসব কী করেন? উপরে জানলে খবর আছে! চাকরি থাকবে না। তখন হেঁদো পুলিশটা উদাসী গলায় বলল, উপরে আর কী জানবে রে আমি তো উপরেই ঝুলে যাচ্ছি! উত্তরটা কেমন জানি ধাক্কা দেয় ঝিমানো পুলিশটাকে। ফলে ভয়ানক পরিশ্রম করে শক্ত কপিকলের সঙ্গে দড়িতে ঝুলানো হয় হেঁদো পুলিশটাকে! এবং যেই উনি শূন্যে ঝুলে পড়েন তখন তুমুল করতালি পরে চারদিকে। হেঁদো পুলিশটা বলে, যাক এতদিনে মুক্তি এল আমার! আর পারছিলাম না। মহিলা বুদ্ধিজীবী বলল, হি হি দারুণ! পুলিশও মুক্তি চায়? তখন এক গুরুতর প্রশ্ন করে ফেলে হেঁদো পুলিশটা সব কিছু থমকে দিল। হেঁদো পুলিশটা বলল, স্যর আপনারা সবাই তো জ্ঞানী লোক। আচ্ছা এই যে আমি এখন ঝুলে আছি এই আমি এখন কে? পুলিশ? বুদ্ধিজীবী নাকি মানুষ? তখন সবাই উল্টো ঝুলে দুলতে থাকে আর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। নিচ থেকে ঝিমানো পুলিশটা চেঁচিয়ে বলে স্যর আমারেও কি এট্টু চান্স দেয়া যায়? ঝুইলা দেখতাম বিষয়ডা কী? তখন এক বুদ্ধিজীবী বলে ওঠে, ঐ তো উত্তর, বিষয়ডা কি? ঐ ‘বিষয়ডা কি’র জন্যেই ঝোলা দরকার!

জয় উল্টো ঝোলার জয়!

সবাই চিৎকার দিয়ে ওঠে। তখন নিজের পায়ে দড়ি বেঁধে একটা বালির বস্তার সাথে বেঁধে সেটা জানালা দিয়ে ছেঁড়ে দিতেই সুরুৎ করে একটানে আসমানে ঝুলে যায় ঝিমানো পুলিশ আর সঙ্গে সঙ্গে রোমাঞ্চিত স্বরে বলে, পাখি পাখি… আমি পাখি হয়া গেছ…! অন্য বুদ্ধিজীবীরা হাততালি দেবার বদলে এবার তব্দা খায়। তারা দেখে ঝিমানো পুলিশটি উল্টো অবস্থাতেই দুই হাত ডানার মতো করে ঝাপটাতে থাকে। চোখ বুজে মনের সুখে সে যেন উড়ছে।  আর ঠিক তখনই একটা গাড়ি থামার শব্দ। কয়েকজোড়া বুটের আওয়াজ। কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে চোখ বেঁধে নিয়ে আসে একদল নিরাপত্তারক্ষী। তারা কক্ষে ঢুকেই হা হয়ে উপরে তাকিয়ে থাকে। যেন তারা ভড়কে যায়। ব্যাপারটার ভয়াবহতা দেখে। তারা দেখে হাসি হাসি মুখের একদল বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তিনজন পুলিশ ঝুলছে। তাদের একজন আবার মনের সুখে চোখ বুজে বাতাসে ডানা ঝাপটাচ্ছে। এই দৃশ্যের ছবি এবং খবর তারা দ্রুত হেডকোয়ার্টারে পাঠায়। আগত নতুন নিরাপত্তাকর্মীদের একজন বলে ওঠে, এই অপরাধীদের সঙ্গে তোমরা তিনজন কেন ঝুলছ? ওরা কি তোমাদের কৌশলে ঝুলিয়ে দিয়েছে? শুনেছি ওরা নাকি কায়দা জানে, যাদু মন্ত্র। চিন্তক পুলিশটা বলে, আপনিও আসেন স্যর। ভীষণ মজার ব্যাপার। এইখানে ক্লান্তি নাই! নাই কোনও ডিউটির চাপ! মনের বিরুদ্ধে কিছু করার দরকার নেই। প্রয়োজন পড়ে না কিছুরই। উল্টো ঝুললে স্যর রাষ্ট্রের মাথার উপর আরেকটা রাষ্ট্র হয়ে ঝুলবেন আপনি। যদি উল্টো করে দেখেন তাহলে দেখবেন আপনার মাথার উপরে আমাদের রাজার রাষ্ট্র উল্টো! হা হা হা! নিচের অফিসারটা বলল, নির্ঘাত গণ মনোবিকার হয়েছে। তিনি ওয়াকিটকিতে একটা লিফট ক্রেন পাঠাবার জন্য জানালেন। এদেরকে নামাতে হবে। কিন্তু এই নতুন আগত সৈনিকদের এক চ্যাংড়া ছেলে একটা ছবি তুলে ছেড়ে দিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলে, মুহূর্তের ভেতর ব্যাপারটা ভাইরাল হয়ে গেল। শোনা গেল জনগণ যে যার অবস্থানে নাকি উল্টো ঝুলে পড়ছে। ফলে উদ্ধারকারী পুলিশের দলটি বা ফায়ারসার্ভিস উল্টো ঝুলে পড়া জনগণকে নামাতে নামাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

খবরটা রাজদরবারে পৌঁছানো মাত্র সবাই চিন্তিত হয়ে পরে। দেশের বরেণ্য চিকিৎসকেরা বিভিন্ন সংজ্ঞা দিতে থাকে। একজন মন্ত্রী বলেন, এ নির্ঘাত ঐ বন্দি বুদ্ধিজীবীদের কালো যাদু। এরা নানাভাবে মানুষকে নিয়ে খেলতে জানে। মানুষের চিন্তার দুনিয়া নিয়ে এদের কারবার। আপনি হুকুম দিলে স্যর আমি কিন্তু এদেরকে গ্যাস চেম্বারে ভরে দিতে রাজি আছি। তার চেয়ে ভালো হয় গুম করে দিলে। এরা থাকা মানেই চিন্তার সুড়সুড়ি। আর চিন্তা মানেই আমাদের দিকে আঙুল। স্থিতধী রাজা আদেশ দিলেন এক সপ্তাহের জন্য সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হল। এবং একই সঙ্গে ঘোষণা দেয়া হল, এক সপ্তাহ পর কাউকে যদি শোনা যায় বা দেখা যায় উল্টো ঝোলা প্র্যাকটিস করছে, তাকে নামাতে উদ্ধারকারী বাহিনী যাবে না, বরং নিকটস্থ পুলিশ ক্যাম্পের যে কোনও পুলিশ তাকে গুলি করে নামাবে। ফলে একজন মন্ত্রীকে একদল ভারি অস্ত্রবাহী সৈনিক দিয়ে পাঠানো হল উল্টো ঝোলা বুদ্ধিজীবীদের আটকে রাখা ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে মন্ত্রী দেখেন সব শুনশান কেউ নেই যেন। কিছুক্ষণ পরে মন্ত্রী দেখতে পান, সিলিঙে ঝুলে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক। সৈনিকদের যে দলটি খবর পাঠিয়েছিল তারাও ঝুলে আছে। ফলে আমাদের ধারণা হয় এই পরিস্থিতিতে দেশের অন্য সব নিরাপত্তা চৌকিতে হয়তো নিরাপত্তাকর্মীরাও উল্টো ঝুলে আছে। ফলে মন্ত্রী অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন কাকে ডাক দেবেন। সম্ভবত এরা সবাই ঘুমাচ্ছে, হয়ত এখন এদের ঘুমের সময়! তাদের বুটের শব্দে একজন বয়সী বুদ্ধিজীবী জেগে উঠে মন্ত্রীকে দেখে বলে ওঠে, এই যে মন্ত্রী এসো এসো ঝুলে পর। উল্টো ঝুলে দেখো মজা। অন্য বাস্তবতা! নির্ঘাত মুক্তির স্বাদ পাবে। শৃঙ্খলিত মানুষের মুক্তির আগে মজা প্রয়োজন। বোঝা দরকার, বিষয়ডা কী?