Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আহমেদ শামীমের লেখা

আহমেদ শামীম

 

বাংলাদেশের সেকুলারদের এখন যা করণীয়

আগামীতে বাংলাদেশে যেভাবে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে বর্তমান সরকারের (পুনঃ)পুনঃনির্বাচনের পথে কোন হুমকি নাই– চাণক্যের সাম-দান-দণ্ড-ভেদ নীতি অবলম্বন করে আওয়ামী লীগ সেটা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগ সফলতার সঙ্গে অ-দক্ষিণপন্থীদের এই সাম (শলা) দিয়েছে বা বুঝিয়েছে যে বিএনপি বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে তাদের কচুকাটা করা হবে, দেশ জঙ্গিদের হাতে চলে যাবে। সামরিক বাহিনীসহ অন্যান্য প্রভাবশালী পক্ষ, যেমন ভারতকে, এমন দান দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে যেটা বলাই এখন বাহুল্য। জামাত এবং বিএনপি নেতৃত্বকে এমন দণ্ড দিয়েছে যে জামাত আর দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না, বিএনপিও খোঁড়াচ্ছে। আর বাকি থাকে বামপন্থী আর কমিউনিস্টরা। আওয়ামী লীগ সেখানে কাঁচা পাকায় ভেদ করে দিয়েছে বহু আগে থেকেই। ফলে, এটা স্পষ্ট যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভিন্ন প্রস্তাবিত অন্য কোনও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য হুমকি নয়। আগামীতে আওয়ামী লীগের হুমকি হবে গণ-আন্দোলন। এই প্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলাম ছোট্ট হলেও একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। সেই গুরুত্ব আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে বলেই আওয়ামী লীগের এই হেফাজত তোষণ– সে বিষয়টি তুলে ধরে সেকুলারদের জন্য একটি পরামর্শ তুলে ধরার জন্য এই লেখা।

আগামীতে আওয়ামী লীগ ৫ই জানুয়ারির মতো নির্বাচিত হতে থাকলে গণ-আন্দোলন অনিবার্য হবে। সেটা নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাব্য গ্রুপ কারা? এককভাবে কেউ নয়– এটা বাস্তবতা। আওয়ামী লীগের মতো একটা রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে বিএনপির মতো একটা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠার বাস্তবতা নাই। জামাত নেতৃত্বহীন। জাপা? গণ-আন্দোলনে যে দল ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে তার জন্য কাজটা দুরূহই বটে। বামদলগুলো স্থানীয় পর্যায়ে গণ জাগরণ ঘটাতে পারে বৈকি, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কর্মী মবিলাইজ করে গণ সহানুভূতির জাগরণ তৈরি করার ক্ষমতা রাখে কে? সরকারের সমীক্ষায় সেই শক্তি হল হেফাজত। হেফাজত নিজে স্বীকৃত রাজনৈতিক দল নয়, গণ-আন্দোলনের ফসল ঘরে আনার সামর্থ্য তাদের নেই, কিন্তু একটা উলট-পালটের সুরুয়াত করে দেয়ার খ্যামতা তাদের আছে– সেটা মতিঝিলে তারা প্রমাণ রেখেছে।
হেফাজতকে বশে আনতে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল। প্রমাণিত হয়েছিল হেফাজত হাত থেকে ছুটে গেলে আবার তারে হাতে আনতে সেই মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের প্রয়োজন পড়বে। আর হেফাজত এমনই একটি গ্রুপ, যার উপর বার বার বল প্রয়োগ করা যাবে না কারণ এটা একদিকে যেমন কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ছাড়া, অন্যদিকে এটা তেমনি একটি প্রেশার গ্রুপ যার গায়ে মজলুম মুসলমানের মার্কা মারা। মজলুমের উপর বল প্রয়োগ জুলুম। ইসলামে জুলুমের বিষয়টি বড় ধরনের মবিলাইজেশনের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে– এটা দেখা গেছে ইতিহাসে। এ কারণে এই প্রেশার গ্রুপটি সরকারের অস্তিত্ব চ্যালেঞ্জ করার মতো আন্দোলন করার ক্ষমতা রাখে। আরও দুইটি বড় কারণ হল, ওয়ার অন টেররের যুগে আওয়ামী লীগ হেফাজতকে আপন ঘরে না রাখতে পারলে তাদের নিয়ে পলিটিকাল প্যারানয়ায় ভুগবে। আবার, হেফাজত আর বিএনপির বন্ধুত্ব হতে আদর্শিক কোনও বাধা নাই। আওয়ামী লীগের জন্য এটা বড় ভয়ের ব্যাপার। ফলে তাদের হাতে রাখতে, তাদের কথা আমলে নিতে সরকার বাধ্য।

অন্যদিকে সেকুলার প্রেশার গ্রুপটি সরকারের অস্তিত্বের জন্য কোনও ভাবে হুমকি তো নয়ই, বরং তারা সরকারের ত্রাতা। এই গ্রুপটির সঙ্গে সরকারের মান অভিমান চাওয়া পাওয়ার ব্যবধান যাই থাকুক না কেন, এরা বিএনপি কিংবা বিএনপি-জামাত জোটকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এরা পুঁজিবাদের ভক্ত, ফলে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাদের জন্য শত্রু। ফলে আওয়ামী লীগ ছাড়া এদের গতি নাই। বর্তমান সরকার তা ভালো করেই জানে। তাহলে এই সরকার কেন পকেটে থাকা গ্রুপের কথা আমলে আনবে! তাছাড়া বেহতর আওয়ামী বানানোর জন্য আওয়ামী লীগের ভিতরে আভ্যন্তরীণ যে দ্বন্দ্ব থাকার দরকার ছিল তা বহু আগেই খতম। ফলে সেকুলারদের হয় সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগ করতে হবে, নাহয় হা হুতাশ করে ধুঁকে মরতে হবে এই মনলিথিক আওয়ামী লীগের তলে।

তবে হ্যাঁ, বিএনপিকে সাপোর্ট করা বা ঐ ধুঁকে মরা ছাড়া সেকুলার পক্ষের জন্য বন্ধুর পথ খোলা আছে। হেফাজত-সেকুলার বাইনারিকে বাদ দিয়ে কমিউনিস্ট ভাবধারার যে দলগুলো দাবী দাওয়া নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে গণ-আন্দোলন তৈরি করে হাত পাকিয়েছে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গণ-আন্দোলনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলা, তথা সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির যোগ্যতায় পৌঁছে যাওয়া। এখানে ঝুঁকি আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা কালে গণ আন্দোলন করতে গেলে সেকুলারদের সরকারের হাতে মতিঝিলের মতো মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের শিকার হবার সম্ভাবনা আছে। সত্যি বলতে সেকুলারদের আবার শক্তিশালী প্রভাব বলয় হয়ে উঠতে সেই পথেই যেতে হবে যে পথে হেফাজত গিয়েছিল, এবং গিয়েছিল বলে আজ তারা ফল পাচ্ছে। আর তা না হলে সেকুলারদের ভাগ্যে ছালাও থাকবে না। তিক্ত হলেও সত্য যে, আওয়ামী লীগকে কীভাবে কথা শোনাতে হয়ে সেটা হেফাজত দেখিয়ে দিয়েছে। সেই দেখানো পথ যাওয়া ছাড়া সেকুলারদের আর উপায় নাই।

শাহবাগ-ধরনের আন্দোলনের কিছু নগদ ফল সেকুলাররা ঘরে তুলতে পেরেছিল বৈকি। কিন্তু সেই আন্দোলনের ধরনটাই এমন যে এটা সরকারের জন্য হুমকি নয়, বরং সেটা ছিল সরকারের এমন একটা স্থান তৈরি করে দেয়া যেখান থেকে সরকার লাঠি না ভেঙে সাপ মারতে পারে। কারণ আদর্শিক কোনও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় নাই সেখানে। কিন্তু মতিঝিল-ধরনের আন্দোলন প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আদর্শ তথা ইসলামের শরণ নিতে পারে এমনভাবে যেটা তথাকথিত রাজনীতি নয়। এটা একটা বিশাল শক্তি। এই শক্তির বলেই জামাত যুদ্ধাপরাধ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে রাজনীতিতে সফল ভাবে এগিয়েছে, সরকারও গঠন করেছে। ঐ একই শক্তির উপর আজ হেফাজত দাঁড়িয়েছে। এই শক্তি আদর্শিক শক্তি। এটাকে দণ্ড দিয়েও যেমন নির্মূল করা যায় না (বাতি নিভিয়েও পারা যায় নাই), দান দিয়েও বশে আনা যায় না (জমি জিরাত, টাকা পয়সা পুরো হাটাজারি দিয়েও হবে না)। এই শক্তিকে সাম বা শলা দেয়া দুরূহ এবং এটা দুর্ভেদ্য বা ভেদ করাও শক্ত। এর সঙ্গে সমঝে চলতে হয় নিজের অস্তিত্বের খাতিরে। সেই আদর্শের রাজনৈতিক বাস্তবায়ন করে দিতে হয় ক্ষেত্র বিশেষে। তাই হচ্ছে এখন। সেকুলারগণ পুরো বিষয়টাতে অবাক, হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। কিন্তু তাদের একটু বোঝা উচিত– বোঝা উচিত যে তারা নিজেরা আদর্শচ্যুত, ফলে শক্তিহীন, তাই আওয়ামী লীগের এখন সেকুলার পোছার দরকার নাই।

ফলে রাগ ক্ষোভ অভিমান ফেলে সেকুলারপক্ষের আদর্শে ফিরে আসা ছাড়া আর পথ নাই। নিজেদের আদর্শের রাজনৈতিক বাস্তবায়ন চাইতে গেলে বর্তমান সরকারের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠা ছাড়া গত্যন্তর নাই। এমন সব কর্মসূচি নিতে হবে যাতে আওয়ামী লীগ মনে করতে বাধ্য হয় যে সেকুলার এই পক্ষটি হাতছাড়া হলে নিজেদের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে। এমন হুমকি তৈরি করতে পারলে আওয়ামী লীগের টনক নড়বে আশা করা যায়, কেননা আওয়ামী লীগ এটা ভালোই জানে হেফাজত-বিএনপি বন্ধুত্ব সময়ের ব্যাপার মাত্র। যে কোনও সরকারের জন্যই হুমকি তৈরি করে বন্ধুত্ব আদায় করবে হেফাজত– তার আদর্শের শক্তি দিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এতকাল একটু সুবিধার জন্য আদর্শ জলাঞ্জলি দেয়া সেই অ-দক্ষিণপন্থীরা মধ্যসত্ত্বভোগী মধ্যপন্থী একটি ক্ষমতাসীন দলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারবে কিনা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা অ-দক্ষিণপন্থীদের জন্য খুবই জরুরি।

২৬শে এপ্রিল, ২০১৭