Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

তিনটি অণুগল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

গ্রিল্‌ড

 

উষ্ণ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তরুণী, বয়স… না, বয়স জানতে নেই। আঙুলে ভর দিয়ে আছে চিবুক, চিবুকে ভর দিয়ে আছে এক চিলতে হাসি। আর সূর্য পাটে বসার আগে ধরা পড়েছে চোখের তারায়। চোখের তারায় যে এইভাবে আহ্বান জন্ম দেওয়া যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না।

একই টেবিলে,  সমকোণে চেয়ার টেনে বসে থাকা ব্যক্তির চুলে পাক ধরেছে, ট্রিম করে সাজানো দাড়িও সাদা। থুতনির কাছে উল্লম্ব রেখাটি কিন্তু কালো, মনে হয় কৃত্তিম। ওটা ফ্যাশন। হাসিকে হয়ত আরও ধারালো করার জন্য। সেই ধার ঝলসে ওঠে তার তীক্ষ্ণ নাক, আর চোখেও। তার নাক দেখে মন হয় একটা বঁড়শি, তার হাসি দেখে মনে হয় সুস্বাদু টোপ। সে আহ্বান চেনে, আগ্রহ বোঝে। অভিজ্ঞ, মধ্যবয়স্ক পুরুষ।

হালকা ঝাঁকুনিতে কপালে এসে পড়া চুল সরিয়ে নিয়ে তরুণী চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল— সে এক ধ্রুপদী নাচের মুদ্রা, যার ঘরানা সেই তরুণীই ধারণ করে আছে। তারপর পেছন ফিরে একবার হাসল, হাসিটা নিয়ে এগিয়ে গেল সামনের কাউন্টারের দিকে। স্যান্ডউইচ কাউন্টার। হাসিটা আর একটু ছড়িয়ে দিয়ে জানতে চাইল তাদের অর্ডার দেওয়া গ্রিল্‌ড স্যান্ডউইচ প্রস্তুত কিনা। প্লেটটা নিল, আর ফিরে গেল একদম সেই একই গমন রেখায়… যে পথ ধরে এসেছিল। স্যান্ডউইচটি তিন টুকরোতে কাটা। এবারে তা ভাগ হবে। এক একটিতে কামড় দেবে দু’জন মিলে। হয়ত একটা টুকরোতেও দু’জনের কামড় বসতে পারে। স্বাদ ব্যক্তিগত… তৃপ্তিও তাই।

স্যান্ডউইচ কাউন্টারের ছেলেটি হঠাৎ আমাকে বলল— “কী যেন একটা বাদ দিতে হবে?”

আমি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বললাম ‘অ্যাঁ?’ দেখলাম হাসছে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল— “কী যেন দিতে বারণ করলেন? পেয়াঁজ?” বললাম, “না… পেঁয়াজ কম। ক্যাপসিক্যামও দেবে।”

যেটা মূল উপকরণ, তা নিয়ে কোনও কথাই হ’ল না। কারণ ওটা ওকে দিতেই হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে দিতে হবে – মাংসের টুকরো।

একটা টিশু পেপার সযত্নে টেবিলের ওপর রেখে আর একটা টিশু পেপার দিয়ে তরুণী তখন তর্জনী, অনামিকা, মধ্যমা সবাইকে মুছে পরিষ্কার করে নিচ্ছে আলতো করে; জিভ দিয়ে মুছে নিচ্ছে মুখের ভেতরটা। টুকরো লেগে থাকে ভেতরে— ফাঁকে, কোণে, গর্তে। আমারও মন হ’ল খিদে পেয়েছে, বসালাম প্রথম কামড়, গরম থাকতে থাকতেই। আর ঠিক তখনই একটা ধপাস করে শব্দ। একটি তিন-চার বছরের বাচ্চা মেয়ে উপুর হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। ছুটে এসে একজন তাকে কোলে তুলে নিল। হলুদ ক্যান্ডি ফ্লসের মতো উজ্জ্বল মেয়েটির হলুদ ফ্রক। মেয়েটা কেঁদেই চলেছে। আর লোকটি মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে সেই হলুদ ক্যান্ডি ফ্লসকে ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঝুলবারান্দায় সূর্যাস্ত দেখাতে। সেই হাসিতে পিতৃস্নেহ স্পষ্ট। মেয়েটা ঢোক গিলতে গিলতে কান্না গিলে নিতে শিখবে লাল পপিন্‌সের মতো সূর্য দেখতে দেখতে। হুমড়ি খেয়ে পড়ার ব্যথা ভুলতে শিখবে। আর, তরুণীর চোখের আহ্বান অভিজ্ঞ বঁড়শিকে নিয়ে যাবে কোনও যাদু-জলাশয়ের আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনে নৈশভোজ খেতে। এদের দেখে বোঝা যায়, একটা সিঁড়ি দু’জনেরই পরিচিত। শুধু একজন খানিকটা ওপরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে দেখছে, আর একজন খানিকটা নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে। আমি গ্রিল্‌ড স্যান্ডউইচটা শেষ করে হয়ত ভাবব— জল খেতে পারি; অথবা একটা চকলেট ব্রাউনি খেয়ে তারপর জল খেতে পারি। আর আপনি ভাববেন— নির্ণয় করল? ইঙ্গিত করল? না বিচার করল জাজমেন্টাল খিদে নিয়ে?

ও হ্যাঁ, সেই কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা কোনও দিন জিজ্ঞেস করে না— ওর বানানো গ্রিল্‌ড স্যান্ডউইচ খেয়ে কেমন লাগল। আর, খেতে ভাল লাগলেও আমি কোনওদিন ওকে বলিনি— আজ বেশ লাগল খেতে।

অথচ সেই ভূমধ্যসাগরের মৃদু ঢেউয়ের মতো তরুণী তার সেই ধ্রুপদী হাসি আর চোখের আহ্বান নিয়েই ওর গ্রিল্‌ড স্যান্ডউইচের প্রশংসা করে গেল।

 

নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা

 

খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।

সকালে বেসিনের কল খুলে, সামনের আয়নার দিকে তাকাতেই চমকে উঠল অতসী। টুথপেস্টের প্রায় সবটাই শেষ করে মাঝারী হরফে স্পষ্ট বাংলায় লেখা। যাতে আয়নার দিকে তাকালেই নজরে আসে। যতি চিহ্নগুলোও আছে। প্রথমে কমা, তারপর দাড়ি। সচেতন প্রয়োগ। বুকটা ধক করে উঠল। দৌড়ে শোয়ার ঘরে এসে দেখল প্রতিম তখনও ঘুমোচ্ছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখল বাবার ঘরের দরজার পাল্লা খোলা, পর্দা উড়ছে ফ্যানের হাওয়ায়। ঘরে গিয়ে দেখল বাবা, মানে অতসীর শ্বশুরমশাই ঘরে নেই। এর পরেই সদর দরজা, খুলতে গিয়ে বুঝল বাইরে থেকে টেনে দেওয়া। এই তালাগুলো বেশ করিৎকর্মা— ভেতর থেকে ডোর লক চেপে দেওয়া থাকলে বাইরে থেকে জোরে দরজা বন্ধ করলেই দরজা লক হয়ে যায়। এখনও তাই হয়েছে, চাবি দিয়েই খুলতে হবে।

খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।

প্রতিমের আজ অফিস যাওয়া হ’ল না। সম্ভব নয়। এত কিছুর মধ্যে আয়নাটাই মোছা হয়নি। এখন চোখে পড়তেই মনে হ’ল— এবার মোছা দরকার। তোয়ালের কোণটা ভিজিয়ে লেখাটা মুছতে গিয়েও থেমে গেল। একবার ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেখল অক্ষরগুলোর ওপর। আলতো স্পর্শের মতো। তারপর আসতে আসতে মুছতে শুরু করল। আয়নায় দেখা যাচ্ছে, পেছনে ডাইনিং টেবিলে মাথায় হাত দিয়ে বসে অতসী। মোবাইল ফোনের পর্দায় আঙুল বুলিয়ে যাচ্ছে। ওর মাথার ভেতর ঢুকতে পারলে ওর নিজের সঙ্গে বলা কথাগুলো শুনতে পেত প্রতিম—

“বাবা এর আগে তো কখনও এমন করেননি!… ভোরবেলা মর্নিং ওয়াকে যান… কিন্তু হঠাৎ এমন কেন লিখলেন? কিছু বললেনও না… ফিরে এলেন এমন নর্মাল, যেন কিছুই হয়নি! ও জিজ্ঞেস করল, আমি এতবার জানতে চাইলাম… কী হয়েছে কে জানে?… পরে না হয় আবার একবার জিজ্ঞেস করব… ক’দিন যাক। তারপর না হয়…”

খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।

কী হচ্ছে?… কেন হচ্ছে?… কেন করছেন এমন?— কিচ্ছু বুঝতে পারছে না অতসী। ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানকে ডাকা হয়েছিল। উনিও সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ শারীরিক কোনও অসুস্থতা নেই যে ওষুধ-পথ্য দিয়ে নিরাময় করা যাবে। সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে আলোচনা দরকার… তবে সাবধানে। এতদিন ধরে বাবাকে দেখছেন, কিন্তু তাও এর বেশি কিছু বলতে পারলেন না। হয়ত চাইলেনও না বহুবছরের পরিচিত পারিবারিক চিকিৎসক। 

বাবা সময়মতো খায়, ঘুমোয়, ঘুম থেকে ওঠে। সব কথাবার্তা স্বাভাবিক। অনিয়ম নেই। সামান্য কিছু নিয়মিত ওষুধ, তাও নিয়ম করেই খেয়ে নেন নিজেই। ভোরবেলা হাঁটতে বেরোন। বিকেলেও একটু বেরিয়ে আসেন। এমন কিছুই হাবভাবে নজরে পড়ে না যা নোট করার মতো। অনেকবার জিজ্ঞেস করতেও কোনও অসুবিধে বা অভিযোগের কথা জানাচ্ছেন না। কিন্তু তাও গত একমাসে এই নিয়ে চারবার একই ঘটনা ঘটল। “খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।”; প্রথমদিন আয়নায়, তারপর ডাইনিং টেবিলে, তারপর সদর দরজার ওপর— যেদিকটা ঘরের ভেতর থেকে দেখা যায়, আর আজ সকালে দেখা গেল বাথরুমের দেওয়ালে— কাগজে লিখে টেপ দিয়ে আটকে দিয়েছেন। বাবাই করেছেন! আর কে করবে? অথচ জিজ্ঞেস করলে স্বীকার করছেন না। কিছুতেই স্বীকার করানো যাচ্ছে না। উলটে এমনভাবে তাকিয়ে থাকছেন, যে তারপর বেশি কিছু বলাও যায় না। মানুষটা চিরকালই ভালোমানুষ… ‘গোবেচারী’ বলতে যা বোঝায়। 

ব্যাপারটা এবার মাথার ওপর ভীষণ চাপ ফেলছে। নিজেদের লাইফ তো ডিস্টার্বড হচ্ছেই, আরও চিন্তা হচ্ছে টুবাইয়ের জন্য। ও-ও তো সব দেখছে। বাচ্চা ছেলে, ওর ওপর এসবের কোনও এফেক্ট কি পড়ছে না?

খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।

এখন একেবারে বন্ধ না হলেও, লেখাটা কমেছে। হয়ত মাসে দু-একবার। কোথাও লেখা আছে দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলে প্রতিম, বাবা বা অতসী কাউকে কিছু বলে না। ছেলেকে বলেছে এই নিয়ে দাদুর সঙ্গে কোনও কথা না বলতে। দাদু’র শরীর খারাপ। ছেলে বুঝদার। আজকালকার বাচ্চারা অনেক পরিণত। একবারেই বুঝে যায়। 

প্রতিমের বাবা অনেক বছর হ’ল চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, তা প্রায় দশ বছর তো হবেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহকর্তা যেমন হয়, তেমনই। সাধারণ। আপাত স্বাভাবিক। তেমন চোখে পড়ার মতো কোনওদিন কিছু করতে বা বলতে দেখা বা শোনা যায়নি। নিজের বাবাকে তেমন আলাদা করে কিছু ভাবেনি কখনও প্রতিম। বাবা ‘বাবা’-ই, বাবার যা যা করার করেন, বাবার জন্য যা যা করার প্রতিম করে। এ নিয়ে আর ভাবার কী আছে? চার বছর আগে মা মারা যাওয়ার পর অনেকে বলেছিল ‘তোমার বাবা এবার একেবারে একা হয়ে গেলেন… এত বছর একসাথে… ‘, কিন্তু তেমন কোনও একাকিত্ব বাবার মধ্যে দেখেনি প্রতিম। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল মা-বাবার। একটা শূন্যতা আসা স্বাভাবিক। ওই নিজেকে একটু বেশি ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। টিভি দেখে, নাতির সঙ্গে বসে এটা-সেটা গল্প করে, বই পড়ে, বাইরে হাঁটতে বেরোয়। মাঝে মাঝে রিকশা বা অটো করে এখানে-ওখানে কাছাকাছি যাওয়া আসাও করে একা। শারীরিকভাবে ফিট। ঘরে বা বারান্দায় চুপচাপ বসে বা শুয়ে-ঘুমিয়ে সময় কাটায় না। কোনও চাহিদা নিয়ে ছেলে-ছেলের বউকে বিব্রত করে না। কোনও কিছু পাওয়া বা না-পাওয়া নিয়ে অভিযোগও করে না। সত্যি বলতে প্রতিম বা অতসী যে খুব একটা অভিযোগের সুযোগ দেয়, এমনও না। অন্তত প্রতিমের তো তাই মনে হয়। তাও ওদের  বাবা হঠাৎ এমন করছেন কেন? সমীরকাকু, মানে ওদের পারিবারিক চিকিৎসকের কথা মতো একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল প্রতিম। অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে বাবাকে নিয়েও গেল দেখাতে। বাবাকে বলল কার্ডিওলজিস্ট, সমীরকাকু বলেছেন। সেই ‘কার্ডিওলজিস্ট’-এর নানারকম প্রশ্ন শুনে বাবা ফিকফিক করে হাসছিল আর মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল প্রতিমের দিকে।

অনেক ভেবেও অনিয়ম বলতে একটা কথাই মনে পড়ল প্রতিমের—

মায়ের জন্মদিন বা মৃত্যুদিনে বাড়ি থাকে না বাবা। সকাল সকাল কোথাও চলে যায়, ফেরে রাত করে। এসে শুয়ে পড়ে। সেদিন কারও সাথে কথা বলে না। কোথায় যায়, কী করে… তাও বলে না। পরের দিন আবার অ্যাজ ইউজুয়াল। গত তিন বছর ধরে এমনই চলছে। 

খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না। 

লাল, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজ, সাদা… এই ছ’টা রঙের ছ’টা বেলুন একসাথে খাটের কোণে বাঁধা। প্রতিটা বেলুনে আলাদা আলাদা শব্দ লেখা, যারা একসঙ্গে হয়— “খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।”

ফ্যানের হাওয়ায় উড়ছে বেলুনগুলো, নাচছে। একই সঙ্গে নাচছে শব্দগুলো। বাবা ঘুমোচ্ছে, পাখাটা অফ করতে ইচ্ছে হ’ল না প্রতিমের। 

সকালবেলা ফোন পেয়েই সমীরবাবু এসে গেছেন। ঘরে ঢুকতে গিয়ে বেলুনগুলো দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দরজায় দাঁড়িয়েও অক্ষরগুলো স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। প্রতিমের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বললেন “মাস ছয়েক তো সব ঠিকই চলছিল…।” তারপর নিজের কর্তব্য শেষ করে প্রতিমের কাঁধে হাত রেখে বললেন “ভোর রাতে বুঝলি… ঘুমের মধ্যেই মনে হচ্ছে…  ন্যাচারাল রে… লিখে দিচ্ছি, চিন্তা করিস না। শক্ত হ’।” অতসী হাউহাউ করে কেঁদে ভাসাতে পারে না। খাটের পাশটা শক্ত করে ধরে বসেছিল, বেলুনগুলোর দিকে তাকিয়ে। টুবাইও কাঁদছে না। মেঝেতে ছড়ানো স্কেচ পেনগুলো তুলে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। আজকালকার বাচ্চারা অনেক পরিণত। 

অতসী শ্মশানে গেল না। টুবাইকে নিয়ে ঘরেই থেকে গেল। বাবার ঘরটা সারাদিন পর পরিষ্কার করতে এসে হঠাৎ নজরে পড়ল টুবাই বেলুনগুলো খুলে নিয়ে গেছে। একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ছুটে গিয়ে সব ক’টা বেলুন ফাটিয়ে ঠাস করে ছেলেকে একটা চড় মেরে দিল। টুবাই হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল মা’র দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল অতসী। আজ এই প্রথম অঝোরে কাঁদল কিছুক্ষণ। টুবাই শক্ত করে জড়িয়ে রাখল মা’কে। দাদু’র ঘরে গিয়ে দুজনেই লক্ষ করলে দেওয়ালে ঠাম্মা’র ছবিটা নেই। অতসী আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে ভুরু কুঁচকে দেওয়ালের ওই ফাঁকা অংশটার দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই তো… ছবিটা কোথায় গেল! কালও তো এখানেই ছিল! ঘরের এদিক ওদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল না। অবশেষে বাবার আলমারিটা খুলে দেখল ছবিটা আলমারির ভেতরে। তবে ফ্রেমটা আলাদা, জোড়া ছবি রাখার ফ্রেম। একটা ফ্রেমে মায়ের ছবি, আর একটা ফ্রেমে বাবার। 

খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না। 

ঘুম থেকে উঠে, ডাইনিং টেবিলের ওপর আঁকার খাতা রাখা দেখে দাঁত মাজতে মাজতেই ভুরু কুঁচকে এগিয়ে এসেছিল অতসী। টুথব্রাশটা ঠক করে পড়ে গেল হাত থেকে। 

বাবা’র বাৎসরিক ক’মাস আগেই হয়ে গেল। বাবা চলে যাওয়ার পর এই লেখাটার কথা আসতে আসতে ভুলতে শুরু করেছিল অতসী। মাঝে মাঝে শুধু কষ্ট হ’ত এটা ভেবে যে— “বাবা মনে মনে একটা অভিমান নিয়ে চলে গেলেন, আমাদের বলতে পারতেন না… এইভাবে প্রকাশ করতেন নিজেকে।” কিন্তু কথাগুলো যে আবার কখনও দেখতে হবে, এটা বুঝতে পারেনি। 

আয়না নয়, দরজা বা বাথরুমেও নয়… টুবাইয়ের যে আঁকার খাতাটা ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা, তার যে পাতাটা সিলিং-এর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে, তার শরীরে একটা গাছ। তার শেকড় আছে, ডালপালা আছে। পাতা নেই। তার শাখাপ্রশাখায় বাঁধা রঙিন বেলুন। আর শেকড়ে জড়িয়ে কালো রঙ দিয়ে বড় বড় করে লেখা শব্দগুলো— “খুঁজিবার চেষ্টা করিও না, পাইবে না।”

 

অচল পয়সা 

 

আগে কোনও পয়সা বাজারে অচল হয়ে এলেই জমিয়ে রাখতাম। এক পয়সা, দু পয়সা, পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, কুড়ি পয়সা, চার আনা… সব এক এক করে অচল হয়ে গেল। একটা করে রেখে দিলাম। তারপর, হঠাৎ একদিন দেখি পয়সাগুলো কেমন ঘষে ঘষে গেছে। মর্চে পড়েনি, অথচ কেমন ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে, ওপরের লেখাগুলো আর পড়া যায় না ভালো করে। এদিকে ততদিনে পঞ্চাশ পয়সার বড় সাইজটা অচল হওয়ার মুখে। তখন ঠিক করলাম একটা ভাল পলিথিন প্যাকেটে মুড়ে, তারপর একটা টিনের বাক্সে ঢুকিয়ে রাখব। তারপর ওই নতুন পঞ্চাশ পয়সা থেকে বড় মাপের এক টাকার কয়েনগুলো… সব তাই করলাম। কতরকম একটাকার কয়েন যে জমিয়েছিলাম। সব বর্ষপূর্তি, মনীষীদের ছবি, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর… আরও কত। দু’টাকাও ছিল পুরনো। ধর… বাষট্টি সাল থেকে দু’হাজার অবধি… ক’ত বছর হচ্ছে? অ্যাঁ… সব। 

–সেগুলো সব আছে? 

–ওই রেখে দিয়েছিলাম তো, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভালো করে মুড়ে। তারপর একটা টিনের কৌটোর ভেতর। ভালোই থাকত। বাইরের বাতাস লাগত না। ড্যাম্প লাগত না। পোকায়… না, পোকায় তো পয়সা খায় না। বল?

–লোকজনের বিদেশের কারেন্সি জমানো হবি থাকে দেখেছি। তুমি এইসব পুরনো… মানে অচল পয়সা কালেক্ট করো? 

–নাহ্‌… এখন আর করি না। 

–তাহলে তখন কি ঘাড়ে ভূত চেপেছিল?!

–হ্যাঁ। ভূতই হবে। আসলে, একবার একজন বলেছিল অচল পয়সারও দাম আছে। একটা সময় আসে যখন সেই পয়সা লোকে অনেক দাম দিয়ে কেনে! এই যেমন ব্রিটিশ আমলের পয়সাগুলো, অচলই তো… কিন্তু নাকি বেশ ভালো দাম ছিল বাজারে। এখনও আছে। 

–আর তুমি তাই শুনে পয়সা জমাতে শুরু করলে? একশো বছর পর তোমার থেকে কেউ কিনতে আসবে বলে? কী ক্ষ্যাপা মাল ভাই! 

–না না… আমি কি আর একশো বছর পর থাকব? আমি আর কাকে বেচতাম, আর কে-ই বা কিনত!!

–তাহ’লে?

–আসলে, একবার মনে হ’ল— কেউ কেউ যেমন গুপ্তধন রেখে যায়, তেমন আমিও এমন পুরনো খুচরো পয়সা সিন্দুক ভর্তি করে রেখে দেব! একদম লুকিয়ে রাখব কোথাও। কেউ টের পাবে না! তারপর একটা ধাঁধা বানিয়ে রেখে দেব। সেই সিন্দুক খুঁজে বার করার সন্ধান। ব্যস্‌… আমি মরার একশো বছর পরেও লোকে ওই সিন্দুক খোঁজার চেষ্টা করবে। ধাঁধা উদ্ধার করে তার সন্ধান জানার চেষ্টা করবে। আমি কিছু করি আর না করি… আমার নামে একটা সিন্দুক ভর্তি গুপ্তধন। আর ওই সিন্দুকের জন্যেই আমার নাম মনে রাখবে! ভাব!

–(চুপ)

–কী হ’ল? তাকিয়ে দেখছিস কী? আইডিয়াটা হেব্বি না? টর্চে বা পয়সার আলোয় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে একশো বছর পুরনো আট আনা, চার আনা, ইন্দিরা গান্ধীর ছবি, নেতাজির ছবি! ভেবে দেখ!

–তোমার তো সিরিয়াস মাথা খারাপ! এসব করে কী লাভ?

–তাহ’লে একটা গল্প বলি শোন। আমাদের পাড়ায় একটা বুড়ি ছিল। সবাই বলত খাঁদি মাসি। লোকের বাড়ি কাজ করে খেত। তারপর থুত্থুরি বুড়ি হয়ে আর কাজ করতে পারত না। তিনকুলে কেউ ছিল না। এত বছর ধরে চেনা-জানা। পাড়ার লোকজনই টাকা-পয়সা দিয়ে আসত মাঝে মাঝে। ওতেই দিন চলত।  আর বুড়ির পাশাপাশি আর একটি পরিবার থাকত, তারা দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিত। তারপর একদিন শুনলাম খাঁদি মাসি মরে গেছে। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি বডি পড়ে। পাড়ার কাকুদের সঙ্গে আমার ছোটকাকাও দাঁড়িয়ে বুড়ির বডির পাশে। ম্যাটাডোর এলে শ্মশানে নিয়ে যাবে। অবাক লাগল, বুড়ির ওপর কেবল চার-পাঁচটা মালা। সাদা চাদরটা কেমন খাঁখাঁ করছে। পাড়ায় অন্য কেউ মরলে দেখতাম অনেক মালা, ধূপ, তারপর ফুল দিয়ে মোটা-গোড়ের রিং-এর মতো, কপালে চন্দন। বেশ পরিপাটি সাজানো গোছানো ব্যাপার আর কি! কিন্তু এখানে স্রেফ পাঁচটা লিকলিকে রজনীগন্ধার মালা। চেনের মতো আড়াআড়ি রাখা। চোখে তুলসীপাতা। আর কপালের মাঝামাঝি একটা চন্দনের ফোঁটা। এই অবধি দেখেই বাড়ি চলে এলাম। 

–তারপর?

***

তারপর কী হ’ল। সেই গল্পটা শেষ না করেই রতনকাকা উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে, লুঙ্গিটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল— “মালা কম থাক, আর বেশি থাক… কিছু যায় আসে না বুঝলি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম এর সঙ্গে ওই গুপ্তধন, পয়সা জমানোর কী সম্পর্ক? কিছুই বলল না। পাঞ্জাবির ভেতর হাত ঢুকিয়ে পিঠ চুলকোতে চুলকোতে চলে গেল। পেছন দিকে না তাকিয়েই বলে গেল— ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে রে… সন্ধ্যাহ্নিক সেরে আবার বেরুতে হবে!’ মোটামুটি সবাই জানে মাথায় হালকা ছিট। তাও মাঝে মাঝে খোঁচালে বেশ রগড় হ’ত। 

আজ হঠাৎ ঘটনাটা মনে পড়ে গেল এইসব আয়োজন দেখে। রতনকাকার ছেলেরা দেখলাম বেশ রজনীগন্ধা স্টিক, মালা, সব কিছুরই ব্যবস্থা করেছে। ছেলের বউরা চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়েও দিয়েছে শ্বশুরমশাইকে। দুই ছেলের বউই দেখলাম সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। একজনের মুখে আঁচল চাপা। আর একজন ভুরু কুঁচকে। ম্যাটাডোরটা ছাড়ার আগে ওতে উঠে পড়ে রতনকাকার ছোটছেলে কমলের পাশে উবু হয়ে বসলাম। তারপর আসতে আসতে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম— “সেই অচল পয়সার বাক্সটার কথা জানিস? কিছু বলে গেছেন?” কমল ভুরু কুঁচকে এমনভাবে তাকালো, যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি। আমি আর একবার জিজ্ঞেস করতে বেশ গলায় চড়িয়ে বলল “কীসের বাক্স?” আমি বডির দিকে তাকিয়ে মালা ঠিক করতে করতে বললাম “নাহ্‌, কিছু না।” 

ওই বুড়ির গল্পটা, ফুলের মালা, এসবের মধ্যেই কি কোনও ক্লু ছিল? এখন কী করব বুঝতে পারছি না… শ্মশানে গিয়েই বা কী করব?