Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের দীর্ঘকালীন অশুভ আঁতাতই গো-রক্ষার নামে হত্যার জন্য দায়ী

সফিউল

 

 

গো-রক্ষক বাহিনীর হাতে খুনের ঘটনাগুলিকে আমরা এখন অনেক স্বাভাবিকভাবে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বুলন্দশহরে গো-রক্ষক বাহিনীর গুলিতে মৃত ইন্সপেক্টর সুবোধ-এর সন্তান অভিষেক সিং বলেছেন এভাবে হিন্দু-মুসলমান করে খুনোখুনি চলতে থাকলে আমাদের দেশের বিপদ পাকিস্তান বা চিন থেকে নয়, বিপর্যয় ঘনিয়ে আসবে দেশের মধ্য থেকেই। কথাটা একদিক থেকে ঠিক। তা সত্ত্বেও এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রতিবেশীর প্রতি সাধারণীকৃত অবিশ্বাস, আশঙ্কার বীজ, যা আমাদের দেশের জনগণের মনের মধ্যে যে ক্রমাগত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাই হোক, সাধারণ মানুষ মরলে আমরা এখন নির্বিকার থাকি, যা একটু-আধটু হেলদোল দেখাই সেটাও যদি অভিজাত বা উচ্চপদে চাকরিরত কেউ বেঘোরে মরেন, তখন। এইসব হত্যাগুলির কোনও বিচার তো হয়ই না, উল্টে “মুসলমান” মারার জন্য আঞ্চলিকভাবে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে খুনিরা ইদানিং বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন। সে আলোচনাও আজকাল পানসে হয়ে গেছে। আখলাক, জুনেইদ নামটা যত মানুষের স্মৃতিতে টিকে আছে সেই তুলনায় আখলাখকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর থেকে নভেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত গণপিটুনিতে ৮৬টি মৃত্যুর খতিয়ান রয়েছে ‘দ কুইন্ট’ নামক এই ওয়েব পোর্টালে, সেই সমস্ত ঘটনাগুলির স্মৃতি মাথায় সমানভাবে ধরে থাকা স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব। ভারতের মানচিত্রে এই ঘটনাগুলির স্থান বিচার করলেই ‘এক দেশ এক জাতি’ নামক স্লোগানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে গোটা দেশ ‘গণপিটুনি’ নামক ‘এক রোগ’-এ আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে।

মণিপুর, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড হয়ে জম্মু থেকে কেরালা পর্যন্ত সর্বত্র গণপিটুনি রোগের মধ্য থেকে আলাদা করে দিল্লির আশেপাশের হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রেদশে ঘটনার ঘনঘটা বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য। আখলাখ, জুনেইদ বা খুব সম্প্রতি পুলিস অফিসার সুবোধ সিং-এর মৃত্যুর ঘটনাস্থান রাজধানী দিল্লির উপকণ্ঠে ১০০ বা ২০০ কিমির মধ্যেই ঘটেছে। বুলন্দশহরে এই পুলিশ অফিসার হত্যায় একটা পরিকল্পিত চক্রান্তের সম্ভাবনা নানা দিক থেকেই দেখা যাচ্ছে। ভারতের যেখানে যেখানে দাঙ্গা বা দাঙ্গার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেখানেই বিজেপির ভোট লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এটি অ্যাকাডেমিক্যালি স্বীকৃত একটি তথ্য। বর্তমানে বেশ কিছু রাজ্যে চলতে থাকা বিধানসভার ভোট ও আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে দাঙ্গার মতো ফলদায়ক প্রচারব্যবস্থা বিজেপির কাছে অদ্বিতীয়। অতীতে মন্দিরে গো-মাংস ছুঁড়ে দেওয়ার অভিযোগে বোরখা পরিহিত আরএসএস-এর যুবক ধরা পড়েছেন এটি অনেকেই জানেন। সম্প্রতি ইন্সপেক্টর সুবোধ হত্যার ঘটনাটিকেও কয়েকদিন পর উত্তরপ্রদেশ মুখ্যমন্ত্রী নিছক দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন, অথচ সুবোধকে মারার অব্যবহিত আগে মারমুখী বাহিনীর মধ্যে থেকে সুবোধকে লক্ষ করে ‘দাদরি-কে ওহ ইন্সপেক্টর’ ইত্যাদি ঘৃণা-মাখা আওয়াজ উঠেছিল। হত্যার দিনে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্যস্ত ছিলেন আর উত্তরপ্রদেশ মুখ্যমন্ত্রী যোগী একটি লেজার শো দেখতে ব্যস্ত ছিলেন। ঘটনার দিনে বিষয়টি নিয়ে কেউ একটি বাক্যও ব্যয় করেননি। দেশে এরকম একটার পর একটা হত্যা নিয়ে বক্তব্য রাখার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি নেহেরুর জামায় থাকা গোলাপ নিয়ে কথা বলতে বেশি ভালোবাসেন। কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর যোগী এই হত্যাটিকে ‘মব লিঞ্চিং’ না বলে ‘দুর্ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন। যোগী ‘দুর্ঘটনা’ বলতে কী অর্থ করতে চাইছেন তিনিই জানেন। ‘গো-রক্ষকের’ মুখোশ পরা হিংস্র জনতা জোটবদ্ধ হয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যথেষ্ট আতঙ্কের আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছিল এবং তারাই গুলি চালিয়েছিল। তাহলে কি যোগী বলতে চাইছেন যে ‘গো-রক্ষকদের’ বুলেটের লক্ষ্য অন্য কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ছিল, দুর্ঘটনাবশত সেটি ইন্সপেক্টরের খুলিতে লেগেছে। এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আপাতত কোনও সম্ভাবনা নেই। এখন অস্ত্রধারী উন্মত্ত দলটির উদ্দেশ্য যদি ঐ অঞ্চলে দাঙ্গা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে সে চেষ্টা সফল হয়নি, দাঙ্গা সৃষ্টির প্রচেষ্টা শুধু একজন ইন্সপেক্টরের মৃত্যুতে পর্যবসিত হওয়ায় যোগী দুঃখ পেয়ে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলেছেন কিনা তাও জানা নেই। ঘটনার জন্য আরএসএস-এর পক্ষ থেকে মুসলিমদের একটি ধর্মীয় সভার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, অথচ ইন্সপেক্টর সুবোধ হত্যার স্থল ও মুসলিম ধর্মসম্মেলনের মধ্যে প্রায় ২০ কিমি দূরত্ব আছে। কারা গো-হত্যা করেছিল সেটি নিয়ে এখনও কোনও সঠিক খবর না পাওয়া গেলেও পাঠক নামে এক আরএসএস কর্মী গো-হত্যা হয়েছে বলে বুলন্দশহরের ঐ অঞ্চলে ব্যাপক মানুষকে একত্র করে রাস্তায় নামিয়ে জনজীবন স্তব্ধ করে দেন। ইন্সপেক্টর সুবোধকে হত্যা সংক্রান্ত ঘটনায় আপাতত চারজনকে কিছুদিন ধরে রাখা হয়েছে, তারা হয়তো ছাড়াও পেয়ে যাবে, কিন্তু তার সাথে চারজন মুসলিম-কে গরু হত্যার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক গুজব হিসাবে কুন্দন বলে এক আরএসএস কর্মী গরুর মাংস রাস্তায় ছড়িয়েছিলেন বলে শোনা যাচ্ছে। এই গুজবের মধ্যে সত্যতা থাকলে তা দাঙ্গা তৈরির চিরাচরিত ও পরীক্ষিত পদ্ধতিকেই মান্যতা দেবে। বুলন্দশহরেরই সাধারণ হিন্দু পরিবারও যেখানে বলেন ঐ মুসলিম ধর্মসভার সঙ্গে গরু নিয়ে এই হুজ্জতির কোনও সম্পর্কই নেই, প্রশ্ন ওঠে গরু-হত্যা মুসলিমরাই করুক বা আরএসএস কর্মী কুন্দন নামে অন্য কেউ করুক, কোন সেই পরিস্থিতি যার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিমেষে জোটবদ্ধ করে ও ভাঙচুর-মারপিট করাতে শক্তি যোগায়?

হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান বা গুজরাটে গোরক্ষা বাহিনীর নামে যে ভয়ঙ্কর শক্তি সংগঠিত হয়েছে, সেটিকে এই অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চরম বৈষম্য থেকে পৃথকভাবে দেখলে এক ভয়ঙ্কর ভ্রান্তির সম্ভাবনা থেকে যায়। গোবলয়ের উচ্চমধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে সাধারণভাবে হিন্দু বা মুসলিম বিদ্বেষ চোখে পড়বে না। তারা একসুরে সামগ্রিকভাবে রাজনীতির কদর্যতাকে গালমন্দ করে চিয়ার্স বলে পানীয় তুলে নিয়ে টিভির চ্যানেল বদলে নেন। অতঃপর নির্বিঘ্ন জীবনযাপন ও সস্তায় কায়িক শ্রমিক যোগান দেওয়া মতো পরিস্থিতি তৈরির করার জন্য বিজেপিকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ দিতেও তারা অভ্যস্ত। কিন্তু এই শ্রেণির বাইরে রয়ে গেছে বিপুল জনতা। এক দঙ্গল কুকুরের মধ্যে এক খণ্ড রুটির ভাগ নেওয়ার জন্য যেভাবে কামড়াকামড়ি হয়, ঠিক সেভাবেই এদের নিজেদের জীবনকেও উপার্জনের জন্য প্রতিদিন যুঝে নিতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ বিবেচক মানুষ গরুর নামে মানুষ হত্যা ভালোভাবে নেন না, বিরক্ত হন, কিন্তু তাদের প্রতিক্রিয়ার একটা বড় অংশে থাকে ‘গরুকে মাতৃজ্ঞান’ করা মানুষদের জন্য কটাক্ষ। এই কটাক্ষ আসলে অজ্ঞতাজনিত যা উপেক্ষা করে এই গোবলয়ের বাস্তবিক পরিস্থিতিকে। এখানকার মানুষ ‘গরুকে কে ভালোভাবে রক্ষা করতে পারবে’, ‘কে বেশি করে রামের মর্যাদা দিতে সক্ষম’ তার জন্য কংগ্রেসকে বিজেপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামায়। সারা দেশ জুড়ে গণপিটুনিতে হত্যা ইত্যাদি যে লাল দগদগে ঘা দেখা যায়, তার একটা সাধারণ কারণ হচ্ছে জীবনে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে দৈনন্দিন ভাগ-দৌড়ে (শারীরিক ও মানসিক) মানুষের হৃদয়ের স্বাভাবিক কোমলতা ও অনুভূতির বিলোপ।

এই পরিস্থিতিতে সারাদেশের গণপিটুনি থেকে হত্যার থেকে গোবলয়ের হত্যাগুলিকে কি কোনওভাবে পৃথক করা যায়? শিশু চুরি, গরু চুরি প্রতিরোধ করার জন্য কোনও বাহিনী তৈরি হয়নি, কিন্তু গোরক্ষক বাহিনী তৈরি হয়েছে। জীবনধারণের অত্যধিক খরচ ও তা উপার্জনের জন্য অত্যধিক স্ট্রেস মানুষকে হিংস্র ও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-সাহিত্যে একটা লম্বা সময়ে এই মার্জিনাল মানুষদের জীবনের কথা যতটা উঠে এসেছে এই অঞ্চলে সেই তুলনায় কিছুই আসেনি। উপরতলার আর নিচের তলার মানুষের মধ্যে এক অলঙ্ঘ্য প্রাচীর স্বচ্ছল শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সহানুভূতি বা ভালোবাসার উদ্রেক করতে পারেনি। এই হিংস্র যুবকদেরকেই সংগঠিতভাবে কাজে লাগাচ্ছে এখানকার মাটির সঙ্গে সরাসরি মিশে থাকা আরএসএস/ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ/ বজরং দলের মতো সংগঠনগুলি, যারা বিজেপির বুথ লেভেল কন্ট্রোলের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। ঠিক যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে বেকারবাহিনীদের লেঠেল হিসাবে কাজে লাগাবার উদ্দেশ্যে ক্লাবগুলিকে অনুদান দেওয়া হয়।

প্রশ্ন ওঠে, এই গো-রক্ষা বাহিনী কি দেশে গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারবে? বিরোধী শিবিরে একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায় যে মাংস রপ্তানির ক্রমাগত বৃদ্ধি দেখিয়ে বিজেপির গো-রাজনীতির হিপোক্রেসি দেখানোর, কিন্তু সেটি ঠিক নয়। মোষের মাংস (carabeef) রপ্তানিতেই এই বাণিজ্যের ক্রমাগত বৃদ্ধি (এই মাংস বাণিজ্যে ব্রাজিলের পর ভারত দ্বিতীয় স্থানে), কিছু কিছু গোমাংস বেআইনিভাবে রপ্তানির চেষ্টা হয়েছে। কিছু ফার্ম ধরাও পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে। কিন্তু আসল চিত্র হল গোরক্ষকদের তাণ্ডবে গরুপালন কমছে। ২০০৭, ২০১২ সালে গৃহপালিত পশুর সেন্সাসে যে রেটে গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস থেকে যে সেন্সাস শুরু হয়েছে তার রিপোর্ট বের হলে প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে। তবে ধারণা করা যায় যে বৃদ্ধির রেট বাড়েনি। বরং যেভাবে গো-রক্ষকদের তাণ্ডব চলছে, সেরকম চলতে থাকলে এক স্বল্পকালীন বৃদ্ধির পর আগামী ৫/১০ বছরে দেশে গরুর সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকবে বলে ধারণা করা যায়। সাধারণ মানুষের গরুকেন্দ্রিক সেন্টিমেন্ট আর আরএসএসের গরুকেন্দ্রিক অ্যাক্টিভিটি এক নয়। আরএসএসের গরুকেন্দ্রিক রাজনীতি গরুকে ভালোবাসা থেকে নয়, একটি জাতির প্রতি ঘৃণা থেকে। এখনই রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশে যত সহজে মোষের দুধ, ঘি পাওয়া যায়, গরুর দুধ ঘি সেইভাবে পাওয়া যায় না। সাধারণ পশুচাষিরা বাড়িতে কয়েকটা মোষের সঙ্গে একটি বা দুটি গাই ঠিক তুলসিগাছের মতো সাজিয়ে রাখছেন।

গো-বলয়ে মোটামুটি এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে যারা গরীব তারা আসলে নিজেদের স্বভাবের জন্যই গরীব। তারা খাটতে চায় না। এক সময় ক্রীতদাসদের যেভাবে মনুষ্যেতর কোনও প্রাণী হিসাবে দেখা হত, গো-বলয়ের শ্রেণিবিভেদ একটা গরিষ্ঠ শ্রেণিকে নিম্নস্তরের ভাবতে শেখাচ্ছে। তাদের প্রতিই আবার আরএসএসের নানা শাখাসংগঠন করুণা করে কিছু চ্যারিটি বিলিয়ে তাদের সমর্থনটা সুনিশ্চিত করছে। সেই চ্যারিটির অংশ হিসাবে কখনও দাঙ্গার ফুট সোলজার, কখনও টুকরোটাকরা লেবার হিসেবে কাজের সুযোগ। তাই পেটের তাগিদেই আরএসএসের সর্বগ্রাসী ঘেরাটোপ থেকে বাইরে থাকাও সম্ভব হয় না। এই গরীব মানুষদের ছেলেমেয়েদের অক্ষরজ্ঞানের জন্য কলেজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষিত সমাজ থেকে আরএসএস স্বেচ্ছাসেবক পাঠিয়ে শিক্ষিত সমাজটাকে চ্যারিটির মাধ্যমে ইনক্লুসিভ বানিয়ে নিচ্ছে, অন্য দিকে নিরীহ গরীব মানুষদেরও সঙ্গে নিয়ে নিচ্ছে। আর এইসবের মধ্যে থেকে কোথাও কোনও রকম বিদ্রোহ যাতে মাথাচাড়া না দিতে পারে, সেটা দেখার জন্য সর্বত্র রাস্তায় গোরক্ষক বাহিনী পাহারা দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গো-বলয়ে ছোট হলেও প্রতিরোধের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না কেন? এবং গো-বলয়ের বাইরেও এইসব হত্যার বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের যথাযথ প্রকাশ ঘটছে না কেন?

গো-বলয়ের বাইরের মানুষদের ক্ষেত্রে বলতে হয় যে, পূর্বেই উল্লেখ করেছি, বিভিন্ন কারণে তারাও পিটুনিতে মানুষের মৃত্যু দেখতে দেখতে আজ মোটামুটি একরকম অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। উদাহরণ হিসাবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গেই পঞ্চায়েত ভোটের আগে ও পরে প্রায় ৭০ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা যায়। নির্বাচনী হিংসায় মৃত্যুর ঘটনা দেখতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। যারা এই মৃত্যু আটকাতে পারেননি বা পারছেন না তাদের তীব্র নিন্দা করেও দুটি ঘটনাকে আলাদা করা যায়। পৃথিবীতে যে কোনও হত্যা বা মৃত্যুতেই ব্যক্তিগতভাবে সেই পরিবারে সমান প্রভাব ফেলে স্থাননিরপেক্ষভাবে, যাদের ব্যাক্তিগত ক্ষতি হচ্ছে তা পূরণ হবার কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু সেই পরিবারগুলির বাইরের সামাজিক জীবন নির্বাচন মিটে যাওয়ার পরেই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যায়। এই মৃত্যু বা হত্যার দীর্ঘকালীন প্রভাব সীমিত, কিন্তু গরু, ধর্ম, ভাষা, জাতিকেন্দ্রিক হত্যা পরিবার ছাড়িয়ে এক বা একাধিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়ায়, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ধর্ম, ভাষা বা জাতিগতভাবে আতঙ্কিত করে তোলাকেই সমাজের ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপ বলা হয়। গরু-কেন্দ্রিক এই হত্যা একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘকালীন সাইকিক প্রভাব সৃষ্টি করে ও সমাজের সার্বিক বিকাশে ভয়ংকর ক্ষতিসাধন করে। ভোটের সময় মানুষের মৃত্যু দেখতে অভ্যস্ত সাধারণ জনগণের কাছে অজান্তেই ফ্যাসিস্ট প্রভাবের বিপদ লঘু হয়ে যায়। তাই যে শাসক ভোটকেন্দ্রিক হিংসায় মৃত্যু আটকাতে পারে না, সেই শাসক দল জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্ত মেরুদণ্ডও খুঁজে পায় না।

আর গো-বলয়ে গরুকে কেন্দ্র করে যে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিন সব ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তোল্লাই দেওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে, হঠাৎ করে মোদি বা যোগীর সময়ে হয়নি, বিরোধী থাকার সময়েও শাসকদের টেক্কা দিয়ে তারা এই বিষবৃক্ষের পরিচর্যা করেছে। আবার শাসক হয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে বাড়িয়ে তোলা বৃক্ষের ফল খাচ্ছে। তাই সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ এই ব্যবস্থার বদল চাইলে, রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যুক্ত সকল মানুষের প্রকাশ্যে ধর্মাচরণের বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদ ঘটানোর দাবি জানিয়ে এক ব্যপক সাংস্কৃতিক বদলের জন্য লড়াই করতেই হবে। রাষ্ট্র পরিচালকদের প্রকাশ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে নিষেধ তাৎক্ষণিকভাবে ধর্মের নামে সুড়সুড়ি দেওয়া বন্ধ করবে। এই সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক লড়াই দীর্ঘকালীন। এই দুই পথে গরুর নামে হোক বা অন্য কিছুর নামে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যার আশু ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চাই।