Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

দুনিয়াজুড়ে কর্পোরেটভিত্তিক বিকাশের আড়ালে ধ্বংস হচ্ছে আদিবাসীরা

তুহিন

 

 


কর্পোরেট ঘরানার তথাকথিত উন্নয়ন মডেলের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে আদিবাসী সম্প্রদায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র নয় শতাংশ আদিবাসী হলেও, কর্পোরেট লুটের ফলে যাঁরা নিজেদের জমি থেকে উৎখাত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ছাপ্পান্ন শতাংশই আদিবাসী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন ফ্যাসিবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-এর মতে আদিবাসীরা আদিবাসী নন, বরং ‘বনবাসী’। কারণ আদিবাসীদের এই দেশের আদি বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করলে আরএসএস-এর তত্ত্বেই সংকট দেখা দেবে— যেহেতু সংঘ-পরিবারের মতে আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে আসেননি, বরং তাঁরাই এই দেশের মূল বাসিন্দা। অথচ ঐতিহাসিক সত্য ঠিক তার উল্টো

 

এই বছর মুন্ডা উলগুলান বিদ্রোহের মহানায়ক বিরসা মুন্ডার ১৫০তম জন্মজয়ন্তী সারা দেশ জুড়ে পালন করা হচ্ছে। এই উপলক্ষে আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের তথাকথিত সভ্যতা, এইসব অঞ্চলের মূলনিবাসীদের মৃতদেহের ওপর ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এর মধ্যে সামিল রয়েছে আফ্রিকায় হিরে সমেত অন্যান্য খনিজ সম্পদ হরণ করার জন্য লোমহর্ষক গণহত্যা, হাত-পা কেটে নেওয়া কিংবা গায়ের জোরে আফ্রিকার কালো মানুষদের তুলে নিয়ে দাসব্যবসায় নিয়োগ করে মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলা।[1] ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়ম, ডেনমার্ক, স্পেন, পর্তুগালের সমৃদ্ধি ও বৈভব দাসব্যবসা তথা এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশগুলোয় ভয়ানক লুটের ফলেই সম্ভব হয়েছে।

আমেরিকা খুঁজে পাওয়ার পর ঔপনিবেশিক দেশগুলো একদিকে রেড ইন্ডিয়ানদের রক্ত-মাংসের ওপর তাদের সমাজ গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে দাসেদের এনে শ্রমের বাজার তৈরি করেছে। আফ্রিকা থেকে দাসেদের আনার সময় জাহাজের ছোট খোলের মধ্যে পানীয় কিংবা খাবার ছাড়াই তাঁদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হত। তাঁরা যাতে বিদ্রোহ না করতে পারেন, সে জন্য হাত ও পায়ে পেরেক পুঁতে আটকে রাখা হত। এর ফলে অর্ধেক দাস পথেই মারা যেতেন; বাকি যাঁরা বেঁচে যেতেন, তাঁরা আমেরিকায় পৌঁছে বাগানমালিকদের ভয়ানক অত্যাচারের শিকার হতেন। সেই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে যদি কোনও দাস পালাতে চাইতেন, আর পালানোর সময় ধরা পড়তেন, তবে সাদা চামড়ার মালিক তাঁকে ধরে ক্রুশে লটকে দিত, নয়তো ধরা-পড়া দাসের হাতের তালুদুটো কেটে স্মারক হিসেবে রেখে দিত।

আফ্রিকার মূলনিবাসী দাসেদের সহবত শেখানোর জন্য শ্বেতাঙ্গ বাগানমালিকেরা ‘কু ক্লুক্স ক্ল্যান’ নামে একটি হত্যাকারী দলও তৈরি করেছিল। এই ফ্যাসিস্ট দলটির অস্তিত্ব আজও আমেরিকায় রয়েছে— ভারতের বজরং দল, হিন্দু রক্ষা বাহিনী, শ্রীরাম সেনা, সনাতন অভিনব ভারতের মতো ফ্যাসিস্ট সংঘ-পরিবারের প্রকাশ্য দলগুলোর মতোই। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-এ আছে মৌর্য রাজবংশের শত্রু আদিবাসীদের খতম করার জন্য মদ ও বিষ প্রয়োগের নিদান। ঠিক একইভাবে আমেরিকার আদিবাসী (রেডস্কিন)-দের নিকেশ করার জন্যও মদ ও বিষের ব্যবহার করা হয়েছিল।

দক্ষিণ আমেরিকার ‘এল ডোরাডো’-র কাহিনির সঙ্গে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। পেরুর ইনকা আদিবাসীদের রাজা ছিলেন অতাহুয়ালপা। স্পেনীয় সেনাপতি পিজ়ারো বন্ধুত্বের আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজা অতাহুয়ালপাকে ডেকে এনে বন্দি করেন। রেড ইন্ডিয়ানদের রাজাকে ছাড়ানোর জন্য রাজার পুত্র ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন পিজ়ারোর চাহিদা অনুযায়ী প্রচুর সোনা বহু গাড়িতে বোঝাই করে সেই স্থানের উদ্দেশে রওনা দেন, যেখানে রাজাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। মাঝপথে তাঁরা জানতে পারেন, স্পেনীয় সেনাপতি ইনকা রাজাকে অত্যাচার করে হত্যা করেছে। এই খবর পেয়ে পেরুর ইনকা আদিবাসীরা প্রচুর সোনা এক জায়গায় গলিয়ে একটি বিরাট শেকল তৈরি করে, কিন্তু সেটি তারা পিজ়ারোর হাতে না সঁপে দুর্গম এক পাহাড়ের মধ্যে কবর দিয়ে দেয়। সেই জায়গাটির নামই ‘এল ডোরাডো’। আর এই ‘এল ডোরাডো’-র সন্ধানে বহু বছর ধরে স্বর্ণলোভী ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে গেছে। এই কাহিনিকে কেন্দ্র করে হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ম্যাকেন্নাস গোল্ড নির্মিত হয়। ঔপনিবেশিক ইউরোপের লুট এবং মূলনিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াকেই ইউরোপের পণ্ডিতেরা তাঁদের তথাকথিত ‘সভ্যতা’ বলে মনে করেন।

একুশ শতকের শুরুর সময় আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশের দেশীয় রেড ইন্ডিয়ান সম্প্রদায় এবং শ্রমজীবী শ্রেণি প্রতিরোধে দাঁড়িয়েছিল। বলিভিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর লুটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশীয় সম্প্রদায়ের ইভো মোরালেস। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলির— যারা বলিভিয়ায় তেলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত— জাতীয়করণ করেন। তাঁর এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ়ের আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আর আমেরিকার স্বার্থে আঘাত করার কারণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে তাঁদের টক্কর হয়। ফলে আমেরিকা এই সরকারগুলিকে উৎখাত করার বহু প্রচেষ্টা চালায়।

 

 

একদিকে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশগুলি, যাঁদের রাষ্ট্রপ্রধানরা মূলনিবাসী— তাঁরা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখছেন। অন্যদিকে আমাদের দেশে দেখুন— মণিপুর-সহ সারা দেশে মানবতা লুটপাট হচ্ছে, কিন্তু দলিত বা আদিবাসী হওয়া সত্ত্বেও দেশের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কোনও ভাবান্তর নেই।

আমাদের দেশে আদানি-আম্বানির মতো কর্পোরেট গোষ্ঠীর জল, বন, জমির বেপরোয়া লুটপাটের মধ্যে দিয়ে আদিবাসীদের ধ্বংস করে দেওয়াকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) বা মনুবাদী সংঘ তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিস্ট সরকার ‘উন্নয়ন’ বলে আখ্যা দেয়। মোদি সরকার আদানির মতো কর্পোরেট পরিবারের স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্পদের এই লুটের প্রচেষ্টায় বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে চলেছে। তাই আমরা দেখতে পাই, ছত্তিশগড়ের বিষ্ণুদেব সায়-এর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার— যাকে বলা হয় মধ্য ভারতের ফুসফুস— সেই হাসদেও জঙ্গলকে আদানির হাতে তুলে দিয়েছে। সেখানে কয়লা ব্লকের নিয়ন্ত্রণহীন লুটের জন্য আদানিরা লক্ষ লক্ষ গাছ কাটছে, আর অন্যদিকে স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতিরোধকে বিজেপি সরকার লাঠি-গুলির মাধ্যমে দমন করছে।

 

আদানির পায়ের তলায় পড়তে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার কিংবা কেরলের পিনারাই বিজয়নের বামফ্রন্ট সরকারও পিছিয়ে নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বীরভূম জেলার দেউচা-পাঁচামিতে স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও আদানির প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন, আর কেরলের মাকপ্পায় স্থানীয় জেলেদের তীব্র বিরোধিতা দমন করে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন আদানির হাতে একটি বন্দর হস্তান্তর করছেন। ছত্তিশগড়ে মাওবাদী দমনের নামে বিজেপি সরকার ২০০৫ সালে সালওয়া জুড়ুমের নামে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের লড়াইয়ে নামানোর যে রক্তক্ষয়ী খেলা শুরু করেছিল, তা আদালতে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আজও অব্যাহত।

 

প্রকৃতপক্ষে আদানি, এসার, জিন্দালের মতো কর্পোরেট হাউসগুলি যাতে জল, বন, জমির সম্পূর্ণ লুটপাটে কোনও বিরোধিতার মুখে না পড়ে, সেই জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী কার্যত কর্পোরেট হাউসগুলির দুর্গ হিসেবে কাজ করছে। বস্তার অঞ্চলের সাতটি জেলা— যশপুর, সুরগুজা, কোরবা ও রায়গড়ের মতো আদিবাসী-অধ্যুষিত জেলাগুলিতে রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের স্বার্থে নিরীহ, দরিদ্র আদিবাসীদের ব্যাপক আকারে বন্দি করা হচ্ছে। এই জেলাগুলিতে পুলিশ প্রশাসন নির্বিচারে ভুয়া এনকাউন্টার চালানোর পাশাপাশি, সর্বত্র পুলিশ ও আধাসামরিক শিবির গড়ে তুলে আদিবাসী মেয়েদের ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা, হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে আদিবাসীদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই আরএসএস–বিজেপির বারো বছরের শাসনে ‘উন্নয়ন’-এর নামে আদিবাসীদের ধ্বংস করা হচ্ছে।

 

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এবং তার দেশীয় দালাল সামন্তবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ আদিবাসীরাই করেছেন। ১৮৫৭-র অনেক আগেই ছোটনাগপুরে (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) প্রথম অমর শহিদ বাবা তিলকা মানঝির নেতৃত্বে বিদ্রোহের ঝান্ডা ওড়ানো হয়। তার পরে বাঙালির চুয়াড় বিদ্রোহ, সিধু–কানু–চাঁদ–ভৈরব–ফুলো–ঝুনোর নেতৃত্বে সাঁওতাল হুল, বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে উলগুলান বা মুন্ডা বিদ্রোহ; অল্লুরি সীতারাম রাজুর গিরিজন বিদ্রোহ (অন্ধ্রপ্রদেশ), বীর নারায়ণ সিংয়ের নেতৃত্বে সোনাখান বিদ্রোহ, গুণধুরের নেতৃত্বে বস্তার বিদ্রোহ (উভয়ই ছত্তিশগড়), রানি গাইডিনলিউর নেতৃত্বে নাগা বিদ্রোহ— এ ছাড়াও মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, বাংলা, আসাম, মিজোরাম, মণিপুর, তামিলনাড়ু, কর্নাটক, কেরল, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, বিহার-সহ সারা দেশে আদিবাসীরা তাঁদের স্বাধীনতা এবং জল, জঙ্গল, জমি লুঠের বিরুদ্ধে অসংখ্য আন্দোলন ও বিদ্রোহ গড়ে তুলেছেন।

কিন্তু প্রধান ধারার ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা— যাঁরা মূলত অভিজাতশ্রেণির ছিলেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত ছিলেন— তাঁরা এই সংগ্রামগুলির প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছেন এবং পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসচর্চায় সেগুলিকে অবহেলা করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে আদিবাসীদের অবদানের কোনও উল্লেখযোগ্য স্থান সেখানে দেওয়া হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মণিপুরে জ্বলন্ত জাতিগত সংঘাতের দৃশ্য দেখে আবারও মনে হচ্ছে, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ মনুবাদী ফ্যাসিস্ট কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলি মণিপুরের জল, জঙ্গল ও জমি লুঠ করার পথ প্রশস্ত করতে কুকিদের মতো আদিবাসী সম্প্রদায়— যাঁরা জঙ্গল ও পাহাড়ে বসবাস করেন— তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই উদ্দেশ্যে ঘৃণা ও বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে অ-আদিবাসী মেইতেই সম্প্রদায় এবং মণিপুর পুলিশ বাহিনীকে পূর্ণশক্তিতে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কর্পোরেট ঘরানার তথাকথিত উন্নয়ন মডেলের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে আদিবাসী সম্প্রদায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র নয় শতাংশ আদিবাসী হলেও, কর্পোরেট লুটের ফলে যাঁরা নিজেদের জমি থেকে উৎখাত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ছাপ্পান্ন শতাংশই আদিবাসী। ফ্যাসিস্ট সংঘ-পরিবারের কল্পিত হিন্দু রাষ্ট্রে— যা আসলে শুধুমাত্র অতি ধনী আদানি, আম্বানিদের মতো কর্পোরেটদের স্বার্থেই নির্মিত— আদিবাসীদের কী দশা হবে, তারই নগ্ন প্রমাণ মধ্যপ্রদেশে এক বিজেপি নেতার দ্বারা এক আদিবাসী যুবকের গায়ে প্রস্রাব করার ঘটনা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন ফ্যাসিবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-এর মতে আদিবাসীরা আদিবাসী নন, বরং ‘বনবাসী’। কারণ আদিবাসীদের এই দেশের আদি বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করলে আরএসএস-এর তত্ত্বেই সংকট দেখা দেবে— যেহেতু সংঘ-পরিবারের মতে আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে আসেননি, বরং তাঁরাই এই দেশের মূল বাসিন্দা। অথচ ঐতিহাসিক সত্য ঠিক তার উল্টো।

১৯৬৪ সালে ছত্তিশগড়ের যশপুরে আরএসএস প্রথম ‘বনবাসী কল্যাণ আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করে আদিবাসীদের হিন্দুকরণ প্রকল্প শুরু করেছিল— যে আদিবাসীদের সনাতনী ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ কখনও হিন্দু বলে মান্যতা দেয়নি। বস্তুত আরএসএস–বিজেপির সংবিধানস্বরূপ ‘মনুস্মৃতি’-তে দলিত, পিছড়ে বর্গ, আদিবাসী, মহিলা এবং সমস্ত শ্রমজীবী মানুষকে শূদ্র বা অতিশূদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা হয়েছে। কর্পোরেট পুঁজিনির্ভর এই উন্নয়ন— যা প্রকৃতপক্ষে আদিবাসী সমাজ ও পরিবেশ ধ্বংস করছে এবং যাকে লালন করছে সংঘী মনুবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তি— তার বিরুদ্ধে আজ প্রয়োজন জনগণকে সংগঠিত করা এবং শোষণ ও লুটপাটমুক্ত, জনপক্ষীয় বিকল্প উন্নয়ন; প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা, লিঙ্গসমতা, জাতি-বিমোচন ও বৈজ্ঞানিক সচেতনতার উপর ভিত্তি করে নতুন সামাজিক সমাধান তুলে ধরা।

অমর শহিদ বিরসা মুন্ডার প্রতি সেটাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

 


[1] দাস, অয়নেশ। সেই চাঁদের পাহাড়। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম।