বোরো বাস্কে
বিরসা মুন্ডা আজ আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রায় একশো পঁচিশ বছর আগেই তিনি আমাদের জীবিকা রক্ষার যে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আজ আমরা এগোচ্ছি, তার আগাম আভাস দিয়ে গিয়েছিলেন
আদিবাসী জীবন মানেই সংগ্রামের জীবন। ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে আজ পর্যন্ত নিজেদের সুস্থিত জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্য ভূমি ও বন বাঁচানোর লড়াই আদিবাসীদের ক্ষেত্রে নানা রূপে অব্যাহত রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আদিবাসীরা তাঁদের জীবিকা ও জীবনযাপনে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে শাসক প্রশাসন বা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যখন সেই কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত থেকেছে, তখন তাঁরা বাধ্য হয়েছেন সরাসরি সংঘাতে নামতে। বাংলার চুয়ার বিদ্রোহ, কোলহান বা হো দেশে কোল আন্দোলন, খুটিতে মুন্ডাদের উলগুলান আন্দোলন, কিংবা দামিন অঞ্চলে সাঁওতাল বিদ্রোহ— এই সব ক্ষেত্রেই তাঁদের কণ্ঠস্বর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সংগঠিত বিদ্রোহ দেখা গিয়েছে।
সমস্ত আদিবাসী বিদ্রোহের মধ্যে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা উলগুলান আন্দোলন অন্যতম প্রধান হয়ে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিরসা মুন্ডা সর্বকালের আদিবাসী নেতাদের মধ্যে এক প্রতীকী নাম হয়ে উঠেছেন। তিনিই একমাত্র আদিবাসী নেতা, যাঁর মূর্তি ভারতীয় সংসদ ভবনে স্থাপিত হয়েছে। ডাকটিকিটে তাঁর ছবি প্রকাশ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাস্তার নাম তাঁর নামে রাখা— এর পাশাপাশি মহান এই নেতার জন্মদিনেই নতুন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ঘোষণা করা হয়েছিল। আদিবাসী সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে রাষ্ট্রের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি বড় পদক্ষেপ।
তবে এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, এই সংগ্রামের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া আরও বহু আদিবাসী নেতা আজও প্রায় অচেনাই থেকে গেছেন। সাঁওতাল বিদ্রোহে দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়া সিধু, কানু, ফুলো ও ঝানো লড়াই করতে করতেই শহিদ হন। কিন্তু ইতিহাস সেই সংগ্রামকে মূলত একটি কৃষক আন্দোলন হিসেবেই স্মরণ করেছে, আর সিধু-কানুকে মনে রাখা হয়েছে ব্রিটিশ, মহাজন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করা আদিবাসী নেতা হিসেবে। গবেষকরা বা রাষ্ট্র কেন এই সংগ্রামকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার কাজ করেননি— তা একটি পৃথক বিতর্কের বিষয়।
আজ আমি আলোচনা করব— বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরসা মুন্ডা ও তাঁর সংগ্রাম ‘উলগুলান’ কেন আজও প্রাসঙ্গিক, এবং কেন তাঁর সেই বিখ্যাত আহ্বান— “আমরাই এই মাটির সন্তান; এই জমির উপর আমাদের অধিকার আছে”— আজও আমাদের দেশের সমস্ত আদিবাসী গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমি ব্যাখ্যার সুবিধার্থে দুটি দিক তুলে ধরব। বিরসা মুন্ডার জীবন লক্ষ করলে দেখা যায়, তাঁর পরিবার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং তাঁকে চাইবাসার একটি মিশনারি স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীকালে তিনি সেই স্কুল ত্যাগ করেন, ধর্মান্তরিত বিশ্বাস থেকেও সরে আসেন এবং নিজের জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে খুটি অঞ্চলে এক ধরনের আধ্যাত্মিক পথ বেছে নেন। তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে মানুষের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করেন এবং তাঁদের চরম দুঃখ-দুর্দশার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের কারণে মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়, ধীরে ধীরে তাঁকে অনুসরণ করতে শুরু করে এবং তাঁকে অবতার হিসেবে বিশ্বাস করে ‘ভগবান বিরসা’ নামে অভিহিত করে।
আত্মা বা প্রেতবিশ্বাস আদিবাসী ধর্মব্যবস্থার কেন্দ্রীয় উপাদান। মানুষের জীবনের সর্বত্রই আত্মার উপস্থিতি আদিবাসী বিশ্বাসে স্বীকৃত— মানুষ, পশু, নদী কিংবা ঝরনা, সব কিছুর মধ্যেই আত্মার অস্তিত্ব রয়েছে বলে মনে করা হয়। আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন, কল্যাণকর ও অকল্যাণকর আত্মার শক্তিকে ঘিরেই সমস্ত কিছু আবর্তিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে ধর্মের রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় স্তরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সরাসরি আদিবাসী বিশ্বাসব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছে। ফলে এখন আদিবাসীরা ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে উঠেছেন এবং ধর্মের নামেই নিজেদের জন্য পৃথক পরিসর খোঁজার চেষ্টা করছেন। সারনা, সারি সারনা, সারি ধর্ম, খ্রিস্টান আদিবাসী ও হিন্দু আদিবাসী— এগুলি হল কিছু ক্ষেত্র যার মধ্যে তাঁরা নিজেদের স্থান নির্ধারণ করতে চাইছেন।
প্রশ্ন ওঠে, ক্ষুদ্র আচারগত পার্থক্য নিজেদের মধ্যে রেখেই কেন ‘আদিবাসী ধর্ম’ নামেই সকল গোষ্ঠীর একটি অভিন্ন পরিচয় গড়ে তোলা যায় না? কিন্তু ‘বিভাজন ও শাসনের’ রাজনীতি থেকে যাঁরা লাভবান হন, তাঁরা কখনও এই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে দেবেন না। আজ আদিবাসীরাই সম্ভবত ধর্মীয় দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিভক্ত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন। যে আত্মা-বিশ্বাস এক সময় আমাদের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, সেটাই আজ আমাদের বিভক্ত করার এক কার্যকর উপকরণে রূপ নিয়েছে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি বিরসা মুন্ডা সামনে এনেছিলেন, তা হল বন ও জমির উপর অধিকার। ওরাঁও ও মুন্ডা জনগোষ্ঠী যখন জমিদারিব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের ভূমির অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেমেছিল, সেই সময়েই বিরসা তাঁর কণ্ঠস্বর তুলেছিলেন। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারদের জমির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অল্প বয়সেই বিরসা উপলব্ধি করেছিলেন যে আদিবাসীদের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে জল, জমি ও জঙ্গলের উপর— এগুলিই যদি হারিয়ে যায়, তবে আদিবাসীরা শুধু জীবিকাই নয়, তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও হারাবে।
অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, বড় বাঁধ নির্মাণ কিংবা নগরায়নের কারণে যেসব আদিবাসী তাঁদের পৈতৃক ভূমি থেকে উৎখাত হয়েছেন, তাঁরা আর কখনও নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পারেননি, কিংবা মর্যাদাপূর্ণ সামষ্টিক জীবনযাপন গড়ে তুলতে সক্ষম হননি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ভোপালের মানব সংগ্রহালয়ে একটি কর্মশালায় যোগ দেওয়ার সময় আমার সঙ্গে গোন্ড আদিবাসীদের দেখা হয়— যাঁরা বনভূমি থেকে উৎখাত হয়ে ভোপাল শহরে বস্তি-সদৃশ পরিবেশে বাস করছেন এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য আবর্জনা কুড়িয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলায় বর্তমানে আমরা ভুয়ো তফসিলি উপজাতি শংসাপত্র বাতিল এবং বেআইনি ভূমি হস্তান্তরের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। এই উদ্যোগগুলি আমাদের সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়, মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে এবং সামাজিক স্বীকৃতি এনে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হল— এই সুযোগ থেকে আদতে সম্প্রদায়ের কতজন মানুষই বা উপকৃত হবেন? যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যাঁরা প্রতিদিন অন্ন জোগাড় করতেই হিমশিম খান, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
যদি আমরা জমি রক্ষা করতে পারি, তাহলে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার পথ খুলে দেওয়া সম্ভব।

আমরা প্রায়ই আমাদের দেশের একজন আদিবাসী রাষ্ট্রপতি, মুখ্যমন্ত্রী কিংবা সরকারি আমলাতন্ত্রে উচ্চপদে পৌঁছানো ব্যক্তিদের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করি। নিঃসন্দেহে এগুলি তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে আদিবাসীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিচ্ছিন্ন সাফল্য বা প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই মানুষদের কোনও কাজে আসে না, যাঁরা আজও খাদ্য, আশ্রয় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মতো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
আমরা কি আদৌ নীতি নির্ধারণের ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারছি? ‘উন্নয়ন’ ও নগরায়নের নামে আদিবাসীদের জমি ও বনভূমিতে যে অবৈধ দখল চলছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের সংলাপের পথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং ক্ষমতাসীনদের সামনে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান স্পষ্ট করে তুলতে হবে।
সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সাঁওতালি ভাষার অন্তর্ভুক্তি সাঁওতালদের জন্য নিঃসন্দেহে এক সৌভাগ্যের বিষয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাঁওতালি ভাষা আজ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ফলে বহিরাগতদের দেওয়া অবমাননাকর পরিভাষা ও বিকৃত বয়ানগুলিকে সংশোধন করে নিজেদের বর্ণনা নিজস্ব ভাষায় তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে লেখালেখি ও গবেষণার মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষদের আদিবাসী জ্ঞানভাণ্ডার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করার পথও খুলে গেছে।
অ্যাকাডেমিক চর্চায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মননশীলতা আনা এখন অত্যন্ত জরুরি। নিজেদের ইতিহাস নতুন করে লেখার সংগ্রামে যে সব আদিবাসী গোষ্ঠী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তারা এখন সাঁওতালদের দিকে তাকিয়ে আছে কারণ তাঁরা সংখ্যায় বেশি। তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যেই সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না; সম্প্রদায়গত মূল্যবোধকে সামনে রেখে আমাদের অন্যান্য সহযোদ্ধা জনগোষ্ঠীর প্রতিও আরও সংবেদনশীল ও সহমর্মী হতে হবে।
বিরসা মুন্ডা আজ আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রায় একশো পঁচিশ বছর আগেই তিনি আমাদের জীবিকা রক্ষার যে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আজ আমরা এগোচ্ছি, তার আগাম আভাস দিয়ে গিয়েছিলেন।


