অভি বিশ্বাস
কী করে যে বিয়েবাড়িটায় ভিড়ে গেছিল, এখন আর মনেই নেই।
গত কয়েক বছরে মহারাষ্ট্রের এদিকটা ভালোই চিনে গেছে সজল, গাড়ি চালিয়ে তিনশো কিলোমিটার ওর বাঁ-হাতের খেল।
গাড়ি বলতে একটা পুরনো মারুতি এস্টিম। সিলভার কালার, কালো কাচ। ডিকির ওপর একটা স্পয়লার, তার তলার অংশটা জং ধরা। রং চটে যাওয়া কালো লেদারের সিট।
এছাড়া আর উপায় ছিল না। আর কোনও গাড়ি ছিল না যেটার খোঁজ পড়ত না। অন্য গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করারও কোনও প্রশ্ন ছিল না।
—ওয়াই দ্য হেল ডু য়ু কিপ লুকিং ব্যাক? আমরা কি ইলোপ করছি, না তুমি আমাকে কিডন্যাপ করেছ?!! উই আর জাস্ট টেকিং আ ব্রেক… নোবডি ইজ ফলোইং আস!
—ডিকিটা ভালো করে আটকাচ্ছে না…
—ফর দ্য আম্পটিন্থ টাইম, ওটাকে ডিকি বলে না। ট্রাঙ্ক বলে!!
আমেরিকায় বলে হয়তো। এখানে ডিকি-ই বলে। এসব ফালতু তর্কে যাওয়ার সময় নেই সজলের। রাস্তার দিকে মনোযোগ দেওয়া অনেক বেশি জরুরি এখন।
হ্যাঁ! মনে পড়েছে!
ডেকরেটরের দলে ভিড়ে বিয়েটায় ঢুকে পড়েছিল। তারপর কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল…
খোয়াইকে সঙ্গে নিতেই হত। নইলে খোঁজ পড়তে সময় লাগত না। আর এমনিতেও ও দিন সাতেক বাদেই আমেরিকা ফিরে যাবে।
—কিডন্যাপ-ফিডন্যাপ নয়… তোমার খোঁজ পড়বে না?
—আনলাইক্লি… এমনিতেই বিয়ে নিয়ে সবাই লাইক সুপার বিজি, অন টপ অফ দ্যাট এভরিবডি নোজ মাই ডেভিল-মে-কেয়ার অ্যাটিটিউড… আর ফ্র্যাঙ্কলি, দেশে এসেই ছোটপিকে বলে দিয়েছিলাম, রিসেপশানের পর আমি আর রিভ্কা দু-তিনদিনের জন্য কোনও সি বিচ থেকে ঘুরে আসব। বিফোর গোয়িং ব্যাক, দ্যাট ইজ…
পানভেল ছাড়িয়ে মহাবালেশ্বরের দিকে গাড়ি ছুটেছে। চেইনেজ ধরে এগোতে হবে।
পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা জায়গা।
—বিয়েটা অ্যাটেন্ড করার কোনও প্ল্যানই ছিল না। নেহাত মা-বাপি কেউই কলকাতা থেকে আসতে পারবে না, আর মা এত করে আমাকে বলল, কেউ না গেলে ছোটপিরা মাইন্ড করবে, আর আমার তো এমনিতেই ইন্ডিয়া আসার কথা… ব্লা ব্লা ব্লা…। তাও আসতাম না! মাঝখান থেকে এই রিভ্কা… ইন্ডিয়ান ম্যারেজ দেখব, ইন্ডিয়ান ম্যারেজ দেখব বলে এত লাফালাফি শুরু করে দিল, বাধ্য হয়ে আসতে হল। জুইশ্ গার্ল ওয়ান্টস টু সি ইন্ডিয়া!
ওদের গন্তব্য রত্নগিরি। পাহাড়ের ওপর কেল্লায় রাত কাটিয়ে পরদিন গাড়ি নিয়ে নেমে যাবে গণপতিপুলে বিচে।
কথা বলতে বলতে ফোনে গণপতিপুলের হোটেল দেখছিল খোয়াই।
—এমটিডিসি… রিভিউ ভালো না… গ্রিন লিফ, থ্রি পয়েন্ট নাইন, অতিথি লজ… নাহ্ এটা বাজে…
—আগে থেকে বুক করার দরকার নেই। এটা অফ সিজন, ওখানে সস্তায় ভালো হোটেল পেয়ে যাব। লোকাল জায়গায় সবসময় কিছু হোটেল থাকে যেগুলোয় আইডি নিয়ে কড়াকড়ি নেই।
—আই ডোন্ট হ্যাভ এনি প্রবলেম ইন শোয়িং মাই পাসপোর্ট।… শিবসাগর প্যালেস… ধুস, ড্যাম দ্যা রেচেড সিগনাল…
পালে থেকে খেড় যাওয়ার শর্টকাট ধরেছিল সজল একটা গ্রামের ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রাস্তা হারিয়েছে।
—…ম্যাগনোলিয়া… নট ব্যাড… ওয়েট, হোয়াট??! হ্যাপি আওয়ার, কায়াকিং… ফোর পয়েন্ট সেভেন!!
—কী নাম?
—উর্বশী… বাট নো ফোটোস… মুভিং অন…
একটা কাঁটাওয়ালা গাছের ডাল সামনের কাঁচে সপাটে ঝাপটা মেরে গাড়ির সাইডে কিঁ-ই-ই-ই-চ শব্দে লম্বা আঁচড় কেটে পেছনে হারিয়ে গেল।
শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল সজলের।
এত ঘাটের জল খেয়েও এই একটি জিনিস কিছুতেই অতিক্রম করতে পারেনি।
—সজল…
—হুঁ?
—আর উই লস্ট?
কিছুক্ষণ ধরেই সজলেরও কেমন যেন মনে হচ্ছে একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
—না না, ওই ছেলেটা বলল না, এটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট…
—ধুর, কোনও সিগনাল নেই। আর রিভ্কাই বা যে কোথায় গেল… ফোনে কন্ট্যাক্টই করতে পারছি না। ইন্ডিয়ান সিম কি ওর ফোনে চলছে না…?
ফোন বন্ধ করে চোখ বুজে সিটের ব্যাকরেস্টে মাথা এলিয়ে দিল খোয়াই।
শক্তহাতে স্টিয়ারিং ধরে রইল সজল।
—প্রবাব্লি এনজয়িং দ্য রিচুয়ালস… থাক, ফিরে গিয়ে ওকে শপিংয়ে নিয়ে যাব।
হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষল সজল, ঝাঁকুনি দিয়ে ড্যাশবোর্ডের ওপর এসে পড়ল খোয়াই।
গাড়ির সামনে দিয়ে একটা জন্তু মুখে করে গোল একটা জিনিস নিয়ে ডানপাশের কাঁটাঝোপে অদৃশ্য হয়ে গেল।
—দেখলে!!… দেখলে??… ওটা… ওটা কী নিয়ে গেল মুখে করে??!!
—ও কিছু না। ইস্পাতের মতো থান্ডা নার্ভ সজলের।
—কী বলছ!! একটা মানুষের মাথা!
—ভুল দেখেছ…
—আমরা দুজনেই ওটা দেখেছি সজল। দ্যাট… দ্যাট হেড… ওটা তো ঠিক রিভ্কার মতো দেখতে!!
—কী আবোলতাবোল বলছ! একটু আগেই বন্ধুর কথা ভাবছিলে, তাই তোমার ওইসব মনে হচ্ছে। রিল্যাক্স, এক্ষুনি রাস্তা পেয়ে যাব…
—ড্যাম ইট! একবার নেমে দেখবে না??
—এখানে? এখন??… সন্ধে হয়ে আসছে, জন্তুজানোয়ার আছে… আর এই জঙ্গলের মধ্যে আমি এখন নামব?
—কেন যে এই রাস্তা দিয়ে এলে…
—তুমিই তো বললে, অ্যাডভেঞ্চারাস রোড-ট্রিপে যাবে…
ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছিল। সজল আবার স্টার্ট দিল।
গাড়ি তিনবার ঝাঁকানি দিয়ে জেগে উঠে, পড়ে থাকা একটা গাছের ডাল মড়াৎ করে ভেঙে এগোতে শুরু করল।
স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে বসল সজল।
একটু এগোতেই ডানদিকে কড়া টার্ন।
শুকনো ডালপালা কট্-কটা-কট্ আওয়াজে ফাটাতে ফাটাতে গাড়িটা স্পিড তুলে একটা চড়াই ধরে অনেকখানি উঠল, তারপর বাঁদিকে ঘুরে এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে খানিক সোজা এগিয়ে পরের উপত্যকায় নেমে গেল।
দুই.
—ইশ, এখানে কেন যে কোনও ডেঞ্জার সাইন নেই…
—এটা ইন্ডিয়া, আমেরিকা নয়। আমরা একটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।
—দিজ রোড ইস নাথিং বাট ব্লাডি টুইস্টস অ্যান্ড টার্নস… লুক আউট ফর দ্যাট্ রক!!…
বলতে বলতে গাড়িটা একটা বড়সড় পাথরের গা ঘেঁষে বাঁক নিল। নিচে কী একটা খটাং শব্দ করে লেগে, গাড়ির সঙ্গে ঘষটাতে ঘষটাতে চলতে থাকল।
সজলের চোখ একবার তেলের কাঁটায় গেল।
দু-দাগ।
—স্লো ডাউন। আমাদের পেছনে কেউ আসছে না।
সজল গাড়ির স্পিড কমিয়ে এনে দাঁড় করাল।
পকেট হাতড়ে দেশলাই বের করে সিগারেট ধরাল একটা। মাথা ঠান্ডা করে একটু ভাবা দরকার।
—মাই হার্ট স্কিপ্পড্ আ বিট! আ হিউমান হেড!!!
—আবারও বলছি, ভুল দেখেছ। ভালো করে কিছু বোঝার আগেই জন্তুটা সাঁই করে চলে গেল।
—আর যদি ভুল না হয়…?
—তুমি কি ফিরে যেতে চাও?
—তুমি চাও?
—এখান থেকে ফেরার আর এখন উপায় নেই।
সিগারেটে একটা বড় টান দিল সজল। সুগন্ধি তামাক শরীরের টানটান ভাবটা শিথিল করল খানিকটা।
—আচ্ছা যদি ধরেও নিই ওটা একটা লোকের মাথা ছিল, আমরা এখন কী করব? ফিরে গিয়ে ওটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে হোটেল ম্যানেজারের হাতে দিয়ে বলব, এই নিন, ধরুন… ফ্রন্ট ডেস্কে সাজিয়ে রাখুন…? এসব ফালতু ঝামেলায় জড়ালে ছুটিটা বরবাদ হয়ে যাবে…
—আমি মাথার কথা ভাবছি না…
—তাহলে?
—বাকি অংশের কথা…
—মাথা বাদ দিয়ে বাকিটা কি খুব একটা কাজে লাগবে লোকটার…?
—ওহ্ স্টপ ইট!!! ইট ওয়াসেন্ট আ ম্যান এনিওয়ে!
—কাম অন খোয়াই…
—লম্বা চুল, সবুজ কানের দুল, ঠিক যেমন ছোটপি রিভ্কাকে দিয়েছিল…
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ছোঁয়া দিয়ে গেল সজলের।
—ডেন্টাল ব্রেস ছিল না? দেখোনি?
—আয়াম নট ফিলিং পারটিকুলারলি ফানি, য়ু নো…
নিঃশব্দে খানিকক্ষণ সিগারেট টেনে শেষ করে ফেলে দিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিল সজল।
—ঠিক আছে, রত্নগিরি পৌঁছে আমি কায়দা করে জেনে নেব, রিসেন্টলি কোনও মিসিং পার্সন কেস রেজিস্টার হয়েছে কিনা। যদি হয়, তাহলে আমাদের ঘটনার কথা বলব। আদারওয়াইজ, বোবার শত্রু নেই। ওকে?
খোয়াই কিছু বলল না। ভুরু কুঁচকে সামনের দিকে চেয়ে রইল।
ওরা একটা শুকনো নালা পেরিয়ে খানিকটা উঠে একটা খালি জায়গায় এসে পৌঁছল। সামনে অনেকটা সোজা রাস্তা, দু-ধারে কাঁটাঝোপ।
আলো কমে আসছে।
—সজল… দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল খোয়াই।
—ইয়েস ম্যাম…
—আই স অ্যান আর্ম স্টিকিং আউট অফ আ বুশ…
—কোথায়?????
—নালাটা যখন ক্রস করলাম
—বললে না কেন??
—কী জানি… তুমি হয়তো বলতে ওটা একটা ট্রি রুট… বলে একটা কাঁধঝাকানি দিল।
—তাহলে হাত বললে কেন?
—জানি না!! আমার আর ভালো লাগছে না… আই ওয়ান্ট টু গেট আউট অফ দিজ গড্ফরসেকেন ফরেস্ট!
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল সজল।
যা সন্দেহ করছিল, তাই।
ডিকিটা অর্ধেক খুলে ঢক ঢক করছে।
গাড়ি থেকে নেমে একবার দেখা দরকার। ভীষণরকম দরকার। কিন্তু সেটা এখন করা যাবে না।
ধুলোয় ঢাকা ঝোপঝাড় দু-ধার থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তাটাকে সরু করে দিয়েছে।
বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চলল।
খোয়াইকে দেখে মনে হচ্ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে, অন্ধকার ঘরে ঢোকার আগে ভয়ে কুঁকড়ে আছে। সজল নিজেও শান্ত নয় একটুও।
তেলের কাঁটা এক দাগ দেখাচ্ছে…
আরও খানিকক্ষণ পর মুখ খুলল খোয়াই।
—নাহ, তুমিই ঠিক বলেছিলে… ওটা একটা বড় নারকোল ছিল…
—কুমড়ো নয় তো…?
—ওহ্ শাটাপ
—আর চুল?
—নারকোলের ছোবড়া
—সবুজ কানের দুল…?
—উফ্! আমরা কি বাকি সময়টা এই নিয়েই কথা বলে যাব…? আই এগ্রি, এসব ঝামেলায় না জড়ানোই ভালো
একটা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে আস্তে আস্তে ছাড়ল সজল। এবার একটু রিল্যাক্সড লাগছে।
ও জানে, খোয়াই যেটা বলছে সেটা একরকম মনভোলানোর জন্য।
তাও।
গাড়ি আরেকবার থামাল। একটা ছোট টিলার ওপরে দাঁড়িয়েছে ওরা। তিরতির করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে।
দরজা খুলে নামল সজল। পেছনে গিয়ে আধখোলা ডিকির ভেতর চটের বস্তাটার দিকে তাকাল।
যে দড়ি দিয়ে মুখটা বাঁধা ছিল, সেটা কোথায় খুলে পড়ে গেছে কে জানে। নিচটা ভিজে, চটচট করছে। ডিকির খানিকটা অংশও ভিজিয়ে দিয়েছে। হোটেলে গিয়ে মুছে নিতে হবে।
খোয়াই সিগনাল খোঁজার জন্যে ফোনটাকে উঁচু করে ধরেছে।
ডিকি থেকে একটা রেঞ্চ বার করে খোয়াইয়ের পাশে এসে দাঁড়াল সজল।
—এটা দিয়ে আমি কী করব?
—কিচ্ছু না, শুধু ধরে থাকো।
—কেন…?
—জন্তুজানোয়ার আসে যদি…
—তুমি কী করছ?
—গাড়ির নিচে কী লাগল একবার দেখে নিই। এখানে তাও একটু আলো আছে, নেমে গেলে আর দেখা যাবে না।
মাথার ওপর একটা গেঁটে, প্যাঁচানো গাছ ডাইনিবুড়ির আঙুলের মতো লম্বা, সরু, বাঁকানো ডালপালা মেলে আকাশ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাঁঝের আকাশে তারা মিটমিট করছে।
সজল গাড়ির পেছনে গিয়ে ঝুঁকে নিচু হয়ে দাঁড়াল।
—জ্যাক অ্যান্ড জিল ওয়েন্ট আপ আ হিল
টু ফেচ এ পেইল অফ ওয়া-আ-আ-টার
জ্যাক ফেল ডাউন অ্যান্ড ব্রোক হিস ক্রাউন
অ্যান্ড জিল কেম টাম্বলিং আ-আ-ফটার…
খোয়াই ছড়া বলছে… থেমে থেমে, আস্তে আস্তে… প্রায় ফিসফিস করে।
নিঃশব্দে বস্তাটা বার করে আনল সজল। পেছনের নুড়িফেলা রাস্তা ধরে আট-দশ পা গেলেই খাদের ধার। গোটা উপত্যকা জুড়ে অদ্ভুত গাঢ় লালচে বাদামি আলো। তার মধ্যে মিশমিশে কালো ডাইনি গাছ আর ও।
বস্তায় বাকি যা ছিল, খাদের ধার ধরে ঢেলে দিল সজল। বস্তাটাও ফেলে দিল দূরে, খাদের ভেতর ছুড়ে।
তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে গাড়ির দিকে ফিরল।
হঠাৎ, যেন আকাশ ফুঁড়ে, ওর মুখের ওপর একটা তীব্র আলো এসে পড়ল।
তিন.
মুহূর্তের জন্যে হতভম্ব হয়ে গেছিল সজল।
তারপর ভালো করে তাকাতে দেখল সামনের নিচু ঢাল বেয়ে একটা ট্রাক উঠছে, তার হেডলাইট ওদের গাড়ি ভেদ করে ওর মুখে এসে পড়েছে। হেডলাইটের ভেতর দিয়ে সিলুয়েটের মতো খোয়াইয়ের মাথাটা দেখা যাচ্ছে।
দৌড়ে গিয়ে এক হ্যাঁচকা টানে গাড়ির দরজা খুলে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে এসে বসে পড়ল সজল।
বসে গাড়িতে স্টার্ট দিল। গাড়ি দুবার কেশে থেমে গেল।
—ধুত্তোর!!! বলে আবার চাবি ঘোরাল সজল।
ইঞ্জিন এবার ধরে নিল, গাড়ির লাইট অন হল। সামনের ট্রাকের হেডলাইট দুটো চোখধাঁধানো সূর্যের মতো সোজা ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। সজল জোরে হর্ন চেপে ধরল। গাড়ি থেকে ফুট তিনেক দূরে এসে ট্রাকটা থামল।
অনেকটা উঁচু ট্রাক, সামনে একটা বিরাট বড় লাল-সাদা ডোরাকাটা বাম্পার।
ড্রাইভারের দরজা খুলে একটা লোক লাফিয়ে নামল। লোকটা সজলের থেকে খুব বেশি লম্বা না, কিন্তু অনেক বেশি চওড়া আর পেশিবহুল চেহারা। গায়ে খাকি-সবুজ রঙের জামা প্যান্ট, পায়ে বুটজুতো।
ওদের গাড়ির একদম সামনে এসে চোখ কুঁচকে একটা হাসি দিল লোকটা।
খোয়াই আলতো করে ওর হাতের রেঞ্চটা সজলের হাতে গুঁজে দিল।
—ওর কোমরে বন্দুক আছে, সজল!
—তুমি কোনও কথা বোলো না, আমাকে বলতে দাও… এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল সজল।
—তোমরা মারাঠি…? গলা তুলে আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করল লোকটা।
—না, তবে বুঝতে পারি… বলল সজল।
লোকটা এটা শুনে ট্রাকের দিকে ফেরত গেল। ট্রাকের ভেতরে আরও কেউ আছে, যার সঙ্গে লোকটার আঞ্চলিক মারাঠিতে খুব তাড়াতাড়ি কিছু কথাবার্তা আদানপ্রদান হল।
লোকটা ফিরে এল।
ডান হাত তুলে ইশারায় ওদের অপেক্ষা করতে বলে ট্রাকের পেছন দিকে চলে গেল।
—ও কি আমাদের যেতে বলল?
—না, দাঁড়াতে বলছে…
—তুমি ওর কথা বুঝলে?
—সবটা না, খুব তাড়াতাড়ি কথা বলছিল দুজনে।
প্রায় দু-মিনিট কোনও সাড়াশব্দ নেই। ড্রাইভারের স্যাঙাৎ হেডলাইটটা কম করেছে।
লোকটা ট্রাকের পেছন থেকে বেরোল।
ওর হাতে একটা বীভৎস, মাথাকাটা শরীর!! একটা হাত আর একটা পা নেই।
লোকটা এগিয়ে এসে বডিটা ওদের উইন্ডস্ক্রিনের সামনে উঁচু করে তুলে ধরল।
খোয়াই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে রইল।
ঝট্কা দিয়ে সজল যেন হুঁশ ফিরে পেল!
ম্যানিকুইন!!
ট্রাকড্রাইভার ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর মারাঠি মিশিয়ে বলতে শুরু করল, এটা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়ি। এই অঞ্চলে লেপার্ড দেখা গেছে, তাদের ট্র্যাক করার জন্যে বিশেষ বিশেষ জায়গায় ক্যামেরা লাগানো হচ্ছে। ক্যামেরা আছে ম্যানিকুইনের মাথায় ফিট করা। ম্যানিকুইন দেখলে লেপার্ডের আক্রমণ করার সম্ভাবনা বেশি।
সজলের গোটা শরীর যেন ওই ডাইনিগাছের ডালগুলোর মতো পেঁচিয়ে টাইট হয়ে ছিল। হঠাৎ করে গিঁট খুলে গিয়ে পেশিগুলো তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল।
ড্রাইভার বলে চলল, কীভাবে তার ট্রাকের পেছনের ডালা খুলে গিয়ে একাধিক ম্যানিকুইন ভেঙে উপত্যকার বেশ কয়েক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।
জিজ্ঞেস করল, ওরা সেরকম কিছু দেখেছে কিনা।
খোয়াই কিছু বলার আগেই সজল তাড়াতাড়ি মারাঠিতে বলে উঠল, ওরা পানভেল থেকে আসছে, গণপতিপুলে বিচের দিকে যাবে… রাতটা রত্নগিরিতে থাকবে। শর্টকাট নিতে গিয়ে রাস্তা হারিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ড্রাইভার ওকে আঙুল তুলে ট্রাকের পেছনদিকে দেখিয়ে বলল, সামনের টিলাটা পেরোলেই নিচে মেন রোড দেখতে পাবে, সোজাসুজি আধ মাইলটাক গেলেই ওঠার রাস্তা পেয়ে যাবে।
লোকটা এবার ফিরে গিয়ে ট্রাকটাকে সামান্য ব্যাক করে একটু সাইড করে দাঁড়াল, হাত নেড়ে ওদের যেতে বলল।
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ট্রাকের সাইড কাটিয়ে বেরিয়ে গেল সজল। যাওয়ার সময় খোয়াই হাত নেড়ে দিল লোকটার দিকে।
তেলের কাঁটা এক দাগের নিচে দেখাচ্ছে।
সজল চুপচাপ গাড়ি চালাতে থাকল।
কেউ কোনও কথা বলছে না।
টিলা পেরিয়ে মেন রাস্তা দেখা গেছে, আর একটু গেলেই ওঠার রাস্তা পেয়ে যাবে।
গাছের ফাঁক দিয়ে আধফালি চাঁদ উঠেছে… মিটমিটে জ্যোৎস্নায় জঙ্গল ভেদ করে মারুতি গাড়ির হলদে লাইট সড়ক লক্ষ করে ছুটে চলেছে।
আর এ-ক-টু।
মাথা নিচু করে ফোঁপাচ্ছিল খোয়াই।
—কাঁদছ… না হাসছ?
—দুটোই!
তারপর একটু থেমে বলল, য়ু থিঙ্ক আই ওয়াজ বিয়িং সিলি…?
—কে, তুমি??
—হুম…
—নাহ্
গাড়িটা একটা ছোট্ট গর্তে পড়ে লাফ মেরে উঠল, আর সোজা গিয়ে পড়ল পাকা রাস্তায়।
ব্যাকরেস্টে মাথা এলিয়ে ফোন বের করে হাতে নিল খোয়াই।
—হোটেল বুক করাই আর হল না…
—কেন, ওই যে হ্যাপি আওয়ার, কায়াকিং… কীসব বলছিলে… কী যেন নাম?
—উর্বশী… কিন্তু ঘরের ছবি নেই…
ড্যাশবোর্ডে তেলের কাঁটা শূন্যে গিয়ে হলুদ বাতি জ্বলে গেছে।
ঠিক তক্ষুনি, সামনে দূরে একটা পেট্রল পাম্পের আলো দেখতে পেল সজল।
অ্যাক্সিলারেটরে চাপ পড়তেই গাড়ি বুনো ষাঁড়ের মতো উড়ে চলল সেদিকে।

