অনূঢ়া

খালিদা খানুম

 

বয়সটা পঁচিশ থেকে ত্রিশের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে মেরির। খাতাকলমে এক হিসেব, লোকের মুখে এক হিসেব, আবার বিয়ের সম্বন্ধ এলে মেরির মা বলে, ওমা পঁচিশ হবে কেনে? মেরির বয়স দেখতে ওমন লাগে, আসলে পঁচিশ হয়নি এখনও।

বয়স নিয়ে মেরির মাথাব্যথা নেই। বয়স নিয়ে কেবল নয়, মেরির কোনও কিছু নিয়েই কোনও মাথাব্যথা নেই। সে তার দুনিয়ায় থাকতে ভালোবাসে। তার দুনিয়ায় মানুষ নেই বললেই চলে। তার দুনিয়া জুড়ে আছে হাসনুহানার নতুন চারাগাছ, বেলফুল, টাইমফুলের ঝাড়। সারাটা দিন সে টবের ফুলের সঙ্গে কাটিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। মাটি খুঁড়ে, পুরনো পাতা কেটে বেলা গড়িয়ে যায়, সকালের খাবার খেতে দুপুর হয়ে যায়। খেয়েদেয়ে একটা উপন্যাস নিয়ে বসে।

তার একটা নিজস্ব ঘর আছে। একটা নিজস্ব ঘর তার সমবয়সী বেশিরভাগ মেয়ের নেই। মেরির বাবা এই কার্পণ্য করেনি। মেরি এইজন্য মেরির আব্বার কাছে সে কৃতজ্ঞ। এই ঘরটা সে সাজিয়েছে নিজের মতো করে। কাঠের আলমারি, ড্রেসিংটেবিল, একটা ছোট সোফা৷ বইয়ের র‍্যাক। একটুকুও ধুলো কোথাও খুঁজলে পাওয়া যাবে না মেরির ঘরে। বিছানার চাদর সর্বদা টানটান, আলনার কাপড়ের সিমেট্রি এদিক ওদিক হয় না। দুপুরে খাওয়ার পর এলোচুলে সে বই পড়তে বসে, এইটুকু তার বিলাসিতা।

মেরির জীবনে সাদাকালোর চেয়েও কম রং। কিন্তু এ নিয়ে মেরি খারাপ নেই। খারাপ না-থাকাটা সম্ভবত কেউই বেশিদিন ভোগ করতে পারে না, তাই আবার নতুন করে মেরির বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে হাজির হয় আত্মীয়-কুটুম। উচ্চমাধ্যমিকে যখন পড়ে তখন আসে প্রথম বিয়ের প্রস্তাব। বুকের মধ্যে এমন ধড়ফড়ানি শুরু হয়েছিল যে ভেবেছিল অজ্ঞান না হয়ে যায়। আনন্দে নয়, ভয়ে। তারপর থেকে শুরু, বিয়ের কথা এলেই মেরির মনখারাপ শুরু হয়। অজানা বিষাদের রং ছেয়ে যায় সদ্য ফোঁটা বেলির কুঁড়িগুলোতে। মেরি আয়নার সামনে দাঁড়ায়, মুখ ভ্যাংচায়, ঠোঁট ব্যাঁকায়, চোখ ট্যারা করে। এসব সে অনেক কষ্ট করে রপ্ত করেছে। আগের ছেলেপক্ষরা বলেছে, মেরির চোখ ট্যারা বা ঠোঁট ব্যাঁকা। মেরি নিঁখুতভাবে অভ্যেস করে। এছাড়াও ছেলে দেখতে আসার আগের রাতে না-ঘুমানোর কৌশলটাও মন্দ নয়, তাতে চোখের তলায় বেশ বসে যায়। চোখগুলো ঢুকে যায় গর্তে।

নতুন একটা সম্বন্ধ এসেছে, পাত্র বিদেশে চাকরি করে। ছেলে আসতে পারবে না, কেবল বিয়ের সময় আসবে। কেবল আত্মীয়পরিজনরা আসবে। মেরির মা পইপই করে বলে দিয়েছে, এবার যেন সে মিথ্যা অভিনয়টা না করে। আল্লার কিরা দিয়েছে। মেরির পাত্রপক্ষ বাতিল করার সহজ উপায় বাতিল হয়ে যাওয়ার পর মেরির সত্যিসত্যিই চিন্তা হতে থাকে।

পাড়ার লোক কানাকানি করে মেরির সমস্যা আছে। না হলে দামড়ি একটা মেয়ে বিয়ে করতে চায় না। এমন নয় যে পড়াশোনায় খুব ভালো, পরীক্ষা দিয়ে বিশাল চাকরি করবে। মেরি ডানাকাটা পরী নয়, বরং বলতে গেলে মেরি সুন্দরীর পর্যায়ে পড়ে না। পাড়া-প্রতিবেশী কুটুম-বাটুম বলতে বাধ্য হয় যে, পড়াশোনা করলে কি বিয়ে করে না মানুষ! না চাকরি করলে স্বামীর ভাত রাঁধতে হয় না! ইন্দিরা গান্ধিও বিয়ে করেছে বাচ্চা মানুষ করেছে! এ ছুঁড়ির যত ঢং। আসলে গোপন কোনও রোগ আছে।

মেরির যে সমস্যা আছে, সে-ব্যাপারে পাড়ার লোক নিশ্চিত। শুধু একটা ব্যাপারে নিশ্চিত নয় যে সমস্যাটা কোথায়। সমস্যাটা জানার জন্য তারা সদা চেষ্টা জারি রাখে। মেরি কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, এমনকি মেরির মাসিক ঠিকভাবে হচ্ছে কি না।

এই তো কিছুদিন আগে মেরিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল মেরির মাসি। মেরির মাসি বলেছিল, ডাক্তার দেখাস না কেন? মেরির মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, এসব কুন ডাক্তারকে গিয়ে বলব বলো তো বইন। ডাগর মেয়ে বিয়ে করতে চায় না, এ সমিস্যে কোন ডাক্তার ঠিক করাবে। এ আমার কপালের দোষ। মেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে দেব, জামাই আসবে। কত আমোদ আহ্লাদ হবে। না তো… ছেলেও বড় হচ্ছে। ক দিন পর ওরও বিয়ে দিতে হবে। লোকে কী বলবে! ঘরে সমোত্ত মেয়ে রেখে ছেলের বিয়ে দিয়ে দিলাম।

মেরির মা নিজের কপালকে দোষারোপ করলেও মেরিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। প্রথমে গাইনোকোলজিস্ট, তারপর নিউরোরোজিস্ট। গাইনোকোলজিস্ট মেরির সঙ্গে কথা বলে ইউএসজি লিখেছিলেন আর বলেছিলেন সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে সাহস হয়নি। মেরি চায় তার সমস্যার সমাধান হোক, বলেছিল, মা সাইকোজিস্ট মানে পাগলের ডাক্তার না, তার কাছে যারা যায় তারা সবাই পাগল না। মেরি মা মেরির কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন, তুই এই তো চাস। পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই তোকে আর দুনিয়ার লোক তোকে বলুক পাগল। এখন যে সব সম্বন্ধ আসছে বিয়ের জন্য, তখন সেটুকুও আসবে না। পাগল মেয়েকে কে ঘরে নিয়ে যাবে!

মেরির মা প্রায়-সময় ফুঁপিয়ে কাঁদে। নিজের কপালকে দোষ দেয়। মৌলবির কাছ থেকে পানি-পড়া, তাবিজ নিয়ে আসে। কে জানে জ্বিনের আসর থাকতে পারে। মেয়ে যেভাবে সারাদিন নিজের ঘরে থাকে আর সন্ধ্যাবেলা খোলা চুলে ফুলগাছের সঙ্গে বিড়বিড় করে! ফকির-মিসকিনকে মাংস-ভাত খাওয়ায়, তাদের দোয়া করতে বলে, যেন মেরির বিয়েতে মন বসে। মাদ্রাসা মসজিদে দান করতে কার্পণ্য করে না মেরির বাপ। যদি কারও দোয়া কাজে লাগে। বড় আদরের মেয়ে, বিয়েতে দু-হাত ভরে খরচ করার ইচ্ছে, কিন্তু মেয়েকে তো জোর করে বিয়ে দেওয়া যায় না।

সদ্য ফোটা রজনীগন্ধার সুগন্ধে ম ম করে ছাদবাগান। খাতাকলমে ভরা বর্ষা কিন্তু বৃষ্টির মাতামাতি নেই। কখনও আকাশ জুড়ে কালো মেঘ করে, একটু ওলট-পালট বাতাস বয়, সে কালো মেঘ হুশ করে পালিয়ে যায়। ঝুপ করে বর্ষা নামে। মেরি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ। পরের রবিবার ডঃ দত্তের সেশন।

তার মা সাইকোলজিস্টের কাছে না নিয়ে গেলেও মেরি গিয়েছিল একা। ডাঃ তপন দত্ত। ডাক্তার প্রশ্ন করার আগেই মেরি জিজ্ঞেস করেছিল, আমার বিয়ে করতে ভয় লাগে কেন?

ডাক্তার বলেছিল, বিয়ে করতেই হবে বা কেন বলুন? বিয়ে না করলে একটা মানুষ কী মনুষ্যেতর প্রাণী হয়ে যায়? আমার কাছে এলে আমার লাভ, ফি জমা হবে। কিন্তু বিয়ে যেদিন ইচ্ছে হবে সেদিনই করুন।

—যদি ইচ্ছে না হয়।
—করবেন না। অনেক মানুষ একা থাকে। তবে ভয় পাবেন না। একা থাকা হোক, বা বিবাহিত জীবন— কোনওটাই আলটিমেট নয়। কোনটাতেই সুখ চিরন্তন নয়। দুটোই কঠিন।
—কিন্তু ভয় করে।
—কেন?
—আমি যে কিচ্ছু পারি না। রান্না পারি না। দেখতে ভালো নয়। নতুন দায়িত্ব নেব কীভাবে? আমার যে ভয় করে।

কত কিছু কথা সেদিন ডাক্তারকে উজাড় করে দিয়েছিল মেরি। ডাক্তারের কাছে নতুন শব্দ শিখেছিল, গ্যামোফবিয়া।

খুব আনন্দ হয়েছিল সেদিন। কতদিন পর মন খুলে কথা বলেছে। কেউ তাকে বকবে না। ডাঃ তপন দত্ত সত্যিই ভালো ডাক্তার। আরও আসবে সে, ভেবেই নিয়েছিল। কিন্তু বাড়ির মানুষ জেনে গেলে? কী বলে বের হবে বাড়ি থেকে? কলেজের কথা বলে তো রবিবার বের হওয়া যাবে না। আগেরদিন বান্ধবী লীলার সঙ্গে গিয়েছিল সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে। হুট করে নাম লিখিয়ে ডাক্তার কনসাল্ট।

গরম আবহাওয়ার মধ্যে ঠান্ডা বাতাসের স্রোত ঢুকছে মিহি সুরে। কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে মনে হয়। আলোর ঝলক দূরে। সন্ধ্যার আকাশ কালো হয়ে আছে। রজনীগন্ধার সুগন্ধ মেরিকে টানছে। আলতো করে হাত বোলায় মেরি। বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে। মাধবীলতার লম্বা লতা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে মেরিকে। ভালো লাগে মেরির, চেম্বারে যাওয়া সংক্রান্ত উত্তেজনা তাকে গ্রাস করছে। গোপন অভিসার যেন। ডাঃ তপন দত্ত বলে, ভয় কীসের? মেরি মোমবাতির মতো গলে গলে পড়ে। তখন বৃষ্টি নামে আকাশ ভেঙে। মেরি ধুয়ে যায়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...