নন্দন রায়
দুটো বিশ্বযুদ্ধের শেষে এবং সোভিয়তের পতনের পরে দুনিয়া একবিংশ শতাব্দীতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করল যার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্বযুদ্ধ-পূর্বেকার দুনিয়ার বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অনেক আলাদা। সেখানে পুঁজিবাদী দুনিয়ার নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কোনও উপনিবেশ নেই, অথচ নেতৃত্বের দায়ভার মেটানোর হেতু তাকে বহির্বিশ্বের কাছে ঋণগ্রস্ত হতে হয়েছে। ফলে আমরা এক উদ্ভট অবস্থা দেখতে পাচ্ছি— দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রটি একই সঙ্গে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রও বটে! এরূপ পরিস্থিতিতে ‘শেষের সেদিনের সর্বনাশ’ ঠেকাতে আমেরিকা অবশ্যই তার সামরিক শক্তিকে প্রয়োগ করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর উপনিবেশ দখলের চেষ্টা করবে যাতে অনুরূপ সংকটের মুখোমুখি আর কখনও হতে না হয়। এটাই ট্রাম্পের অ্যাজেন্ডা
ক্রমশ ছোট হয়ে আসা বুর্জোয়া উদারবাদী মহলের মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির ঝোঁক বা প্রবণতার বশবর্তী হয়ে যা করে বেড়াচ্ছেন, সেটা নেহাতই উন্মাদের কাজ। যে কোনও দেশ, এমনকি পশ্চিমি মিত্রদেশগুলির সঙ্গেও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার স্বার্থানুসারী পদক্ষেপ না নিলেই ট্রাম্প খুশিমতো শাস্তিমূলক শুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছেন। ট্রাম্পের এহেন কার্যকলাপ সম্পর্কে উদারবাদীদের মতামতের পেছনে রয়েছে তাঁদের এরূপ বিশ্বাস যে আধুনিক পুঁজিবাদ উপনিবেশ ছাড়াই স্বচ্ছন্দে বিকশিত হতে পারে। সত্যি হল এটাই যে ট্রাম্পের কার্যকলাপ মোটেই উন্মাদের দিনলিপি নয়, এটাই হল আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র— উদারবাদীদের ভ্রান্ত ধারণার শূন্যগর্ভতাকে ট্রাম্প উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
নিজের সম্পদকে গচ্ছিত রাখার জন্য পুঁজিবাদের প্রয়োজন একটি নিরাপদ, স্থায়ী ও সুস্থিত বিনিময়-মাধ্যম। অপ্রতুলতার দরুণ এককভাবে সোনা এরূপ মাধ্যম হতে পারে না। আরও কিছু মাধ্যম চাই যা সোনার মতোই নির্ভরশীল, ‘সোনার মতোই দামি’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং এই ভূমিকা পালন করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়েও ব্রিটেন এই ভূমিকা পালনের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আমেরিকান ডলার এই ভূমিকা পালনে এগিয়ে এল। ব্রেটন উড সমঝোতার সময়ে এক আউন্স সোনা ৩৫ ডলারের সমমূল্যে বিবেচিত হবে এমন ঘোষণা করা হল। পরে অবশ্য নানা কারণে সোনার সঙ্গে ডলারের এই প্রত্যক্ষ গঠবন্ধন আর নেই বটে, কিন্তু ডলারের প্রতি ধনকুবেরগণের আস্থা অটুট রয়েছে প্রধানত আমেরিকার বিপুল বৈভবের কারণে এবং আমেরিকার অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কিন্তু ডলার ‘সোনার মতো দামি’ এই বিশ্বাসের টিকে থাকার জন্য উপরের বৈশিষ্ট্যগুলি যথেষ্ট নয়। দুনিয়াজুড়ে ডলারের জোগান ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এর মানে উদীয়মান পুঁজিবাদী দেশগুলিতে যথা ইওরোপ মহাদেশীয় দেশগুলি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশের পুঁজিবাদকে বিকাশলাভ করানোর জন্য, তাদের শিল্পোন্নত দেশে পরিবর্তিত করার জন্য পুঁজির জোগান নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি এইসব দেশের রপ্তানি করা পণ্য ও পরিষেবা কেনার জন্য সর্দার দেশটিকে নিজের দেশের বাজারকেও উন্মুক্ত করতে হবে। এর অবধারিত ফল হল সর্দার দেশটিকে চলতি খাতে ঘাটতি মেনে নিতে হয়। বস্তুত, বিশ্ব-পুঁজিবাদের নেতৃত্বদান করছে যে সর্দার দেশটি, তাকে আপাতদৃষ্টিতে বিপরীতধর্মী এই দাবি মেনে নিতে হয়েছে। ঔপনিবেশিক দেশগুলির অভ্যন্তরে ঔপনিবেশিক প্রভুদের বিরুদ্ধে নানা বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে যে অসন্তোষ ধিকি ধিকি করে জ্বলছে এবং ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে তার বিপরীতে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে বিশ্ব-পুঁজিবাদের সংহতি ও বিকাশের স্বার্থে। এই জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে যে ব্রিটেন ছিল বিশ্বপুঁজির নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে, তাকেও ইওরোপের উদ্ভিন্ন পুঁজিবাদী দেশগুলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের সাপেক্ষে চলতি খাতে ঘাটতি সহ্য করতে হয়েছিল বটে, কিন্তু তাই বলে বহির্বিশ্বের কাছে সামগ্রিকভাবে ঋণগ্রস্ত ছিল না, বরং তার বিপরীতে ব্রিটেন ছিল মোট জমাখরচের হিসেবে নিট পুঁজি রপ্তানিকারক দেশ। কারণ তার হাতে ছিল ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় এলাকায় বিপুল উপনিবেশের মালিকানা। ব্রিটেনের এই উপনিবেশগুলি ছিল নানা যুদ্ধ ও হীনতম চক্রান্তের মাধ্যমে জয় করা। অর্থাৎ এসব উপনিবেশকে ‘colonies of settlement’-এর বিপরীতে ‘colonies of conquest’ বলা যায়। কোনও কিছু না দিয়েই এসব উপনিবেশ থেকে অবাধে লুন্ঠন করে আনত বিপুল সম্পদ। রমেশ চন্দ্র দত্ত, দাদাভাই নওরোজি প্রভৃতি জাতীয়তাবাদী লেখকগণ এই লুন্ঠনকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘drain of wealth’। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য থাকার কারণে চলতি খাতে বাণিজ্যঘাটতি সয়েও ব্রিটেন কখনও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েনি এবং স্বচ্ছন্দে পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতৃত্বের পদে আসীন থেকেছে।
দুটো বিশ্বযুদ্ধের শেষে এবং সোভিয়তের পতনের পরে দুনিয়া একবিংশ শতাব্দীতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করল যার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্বযুদ্ধ-পূর্বেকার দুনিয়ার বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অনেক আলাদা। সেখানে পুঁজিবাদী দুনিয়ার নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কোনও উপনিবেশ নেই, অথচ নেতৃত্বের দায়ভার মেটানোর হেতু তাকে বহির্বিশ্বের কাছে ঋণগ্রস্ত হতে হয়েছে। ফলে আমরা এক উদ্ভট অবস্থা দেখতে পাচ্ছি— দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রটি একই সঙ্গে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রও বটে! এইরূপ অবস্থা সাধারণভাবে শুধু যে গোটা পুঁজিবাদী দুনিয়ার টিকে থাকার ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করতে পারে শুধু তা-ই নয়, বরং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। যদি কোনও বৃহৎ রাষ্ট্র অথবা সেই দেশের কোটিপতিরা এত ঋণগ্রস্ত একটি দেশের মুদ্রার ওপর এতদিনের স্থিত আস্থা হারায় এবং অন্য কোনও পণ্য বা বস্তুকে আস্থার উপযুক্ত মনে করে তাদের সম্পদ সেখানেই ন্যস্ত করে, তবে ডলারের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। এরূপ পরিস্থিতিতে ‘শেষের সেদিনের সর্বনাশ’ ঠেকাতে আমেরিকা অবশ্যই তার সামরিক শক্তিকে প্রয়োগ করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর উপনিবেশ দখলের চেষ্টা করবে যাতে অনুরূপ সংকটের মুখোমুখি আর কখনও হতে না হয়।
এটাই ট্রাম্পের অ্যাজেন্ডা— খনিজ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এলাকার ওপরে ঔপনিবেশিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দুনিয়াজোড়া একাধিপত্যকে শক্তিশালী করা। এই কাজে তিনি পশ্চিমি মিত্র দেশগুলিকেও রেয়াত করছেন না। দুনিয়ার বৃহত্তম খনিজ তেলের ভাণ্ডার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে স্রেফ গুন্ডামি করে অপহরণ করেছেন, গ্রিনল্যান্ডের দিকেও হাত বাড়িয়েছেন— কারণ সেই দ্বীপটি রেয়ার আর্থ খনিজের এক বিশাল ভাণ্ডার। এছাড়াও ইরান-সহ বিভিন্ন দেশকে তিনি ক্রমাগত হুমকি দিয়ে চলেছেন। এসবই হচ্ছে দুনিয়ার চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যে আমেরিকার স্বার্থের প্রতি সকলকে যত্নবান হতে হবে। বন্ধুত্বের স্থান এখানে নেই। ট্রাম্পের পাগলামির গল্প আসলে নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তৈরি মিথ মাত্র। এ-কথাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে উপনিবেশহীন সাম্রাজ্যবাদ এক ঐতিহাসিক উৎক্রমণকালীন পর্যায় মাত্র।
এখন অন্তত দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে— এক, ইতিহাস কি পেছন দিকে চলতে শুরু করেছে? এবং দুই, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে তথাকথিত যে তৃতীয় বিশ্ব উপনিবেশের জোয়াল ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, তারা কি আবার সেই জোয়ালে পিষ্ট হতে সম্মত হবে?

