উত্তপ্ত বরফ: গ্রিনল্যান্ড ও ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদ

বর্ণিল ভট্টাচার্য

 


ব্যক্তিগত আঘাতের জবাবে একটা দেশের উপর দখল? এতে মিত্র দেশগুলির উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক। এখানে ভূ-রাজনীতি যেন নির্ভর করছে একজন নেতার মেজাজ, অহমিকা, কিংবা নিজের উত্তরাধিকার গড়ার বাসনার ওপর। ইতিহাসের গতি যেন একজন মানুষের খেয়ালখুশির হাতে না ছেড়ে দেওয়া হয়। অতীতে এমন হয়তো একটু বেশিই ঘটেছে, এবং তার ফল আজও ভুগতে হচ্ছে

 

শক্তিমানরা যা করতে পারে তা-ই করে, আর যা সহ্য না করে উপায় নেই তা সয়ে চলে দুর্বলরা, বলেছিলেন প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাসিস। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যে-সব কথা বলছেন, আর যেভাবে তা দখল করতে কোমর বাঁধছেন, তা দেখে অনেকেরই সেই পুরনো সতর্কবাণী মনে পড়বে।

২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ট্রাম্প দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ‘অধিগ্রহণ’ করতে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাৎক্ষণিক আলোচনা’ চায়। তিনি জোরের সঙ্গে দাবি করেন যে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন না। হঠাৎ করেই গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যাবশ্যক’ হয়ে উঠল। ট্রাম্পের ভাষায়, এটা নাকি “ছোট্ট একটা দাবি”— কারণ গ্রিনল্যান্ড তো কেবল “এক টুকরো বরফ।”

সত্যিই তো আর গ্রিনল্যান্ড মানচিত্রের মধ্যে খানিকটা শূন্যস্থান নয়। তা বাস্তবে বহু মানুষের মাতৃভূমি, আধুনিক আইনি কাঠামোর মধ্যেই দেশটির অবস্থান; এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট-সম্পর্কে বাঁধা। এই সব সম্পর্ক তৈরি করাই হয়েছিল ঠিক এই ধরনের চাপ ঠেকাতে।

হোয়াইট হাউস প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্বকে ব্যাখ্যা করতে চায় বড় বড় ভূ-রাজনৈতিক ধারণার মাধ্যমে— উত্তর মেরু অঞ্চলের নিরাপত্তা, চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি দিয়ে। কিন্তু ট্রাম্প নিজে প্রায়ই এর সঙ্গে আরও কিছু উপাদান যোগ করেন— তাঁর অহমিকা, অপরের প্রতি বিদ্রূপ, হুমকি, এমনকি নিতান্ত ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য। যা হওয়ার কথা ছিল কেবল নীতিগত মতভেদ, এই মিশ্রণ তাকে ঠেলে নিয়ে যায় সংকটের দিকে।

গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। এটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝখানে অবস্থিত, যার অধিকাংশ অংশ উত্তরমেরুর বৃত্তের ভেতরে। সেখানে প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ বাস করেন। ইনুইট জনজাতি হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূমিতে বসবাস করে আসছে। রাজনৈতিকভাবে, গ্রিনল্যান্ড হল ডেনমার্ক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। গ্রিনল্যান্ডের উপর ডেনমার্কের দাবি গড়ে উঠেছিল অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে, সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের মধ্যে দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান বদলেছে। ১৯৫৩ সালে এটি ডেনমার্কের সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হয়; পরে পায় হোম রুল (১৯৭৯), তার পরে আরও ক্ষমতা পায় স্বশাসন ব্যবস্থায় (২০০৯)। আজ গ্রিনল্যান্ড অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ বিষয় নিজেই পরিচালনা করে, তবে দ্বীপটির পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ডেনমার্ক এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্বশাসনের ধারণাটি এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত। গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকরা নিজেরাই তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চান। সে কারণেই তাঁরা বারবার স্পষ্ট বলেন— এই দ্বীপ বিক্রির জন্য নয়।

 

গ্রিনল্যান্ডের স্থানিক গুরুত্ব

ট্রাম্পের ভাবভঙ্গি যতই খাপছাড়া হোক, ‘হার্ড ম্যাপ’ যুক্তি, অর্থাৎ মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থানের নিরিখে তাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক ও উত্তর মেরু অঞ্চলের মাঝখানে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে অবস্থান করছে। বিশ্ব-উষ্ণায়নে বরফ গলতে থাকায় এবং জাহাজ চলাচল ও সামরিক গতিবিধি সহজ হয়ে ওঠায় এই অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

 

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আগে থেকেই গভীরভাবে জড়িত। গ্রিনল্যান্ডে একটি বড় মার্কিন নির্মাণ রয়েছে— পিটুফিক স্পেস বেস (পূর্বে থুলে এয়ার বেস)— যা ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ও মহাকাশ নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। ডেনমার্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্র নানা ধরনের সামরিক কর্মসূচি চালানোর সুযোগ পেয়ে আসছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্রের যখন এমনিতেই গ্রিনল্যান্ডে অবাধ প্রবেশাধিকার আছে, তখন ট্রাম্প বারবার “মালিকানা” নিয়ে এত জোর দিচ্ছেন কেন? বহু ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে সংযুক্ত না করেও নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন ট্রাম্প— চুক্তি করে, ঘাঁটি তৈরি করে, এবং যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার ফিরে যান দখল করার মানসিকতায়।

খনিজ সম্পদের কারণেও গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ। রেয়ার আর্থ মিনারেলস (REM) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এখানে পাওয়া যায় যা স্বচ্ছ জ্বালানি প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষাশিল্পের জন্য অপরিহার্য। কয়লা, তেল থেকে সরে স্বচ্ছ শক্তিতে রূপান্তর আসলে খনিজ ব্যবহারে রূপান্তরও। উন্নত দেশগুলো শুধু ব্যাটারি আর বায়ু টারবাইন চায় না; তারা চায় স্বচ্ছ শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ জোগানের শৃঙ্খল।

যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হল, এই সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য চিনের ওপর নির্ভর করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড কীভাবে এই খনিজ বাণিজ্যে চিনের বিকল্প হয়ে উঠবে, সে-বিষয়ে পরিষ্কার করে ভাবা হয়নি। খনন করা কঠিন, ব্যয়বহুল, এবং রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। গ্রিনল্যান্ডের মানুষ স্বভূমিতে ব্যাপক খনন চাইতেও পারেন না। তবুও ট্রাম্প দেশটিকে যেন একটি খনিজ গুদাম হিসেবেই দেখছেন।

 

নোবেল না-পাওয়ার রাগ

এবার আসা যাক সেই জায়গায়, যেখানে এই কাহিনি আর নীতি-কৌশল নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, কারণ ট্রাম্পের মনের নাগাল পাওয়া সত্যিই কঠিন।

জানুয়ারির মাঝামাঝি প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানা যায়, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর চাপকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার হতাশার সঙ্গে জুড়েছেন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় তিনি ইঙ্গিত দেন যে তিনি আর “শুধু শান্তির কথা ভেবে” চলতে বাধ্য বোধ করছেন না। তিনি গ্রিনল্যান্ডের ওপর “সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ” দাবি করেন।

ব্যক্তিগত আঘাতের জবাবে একটা দেশের উপর দখল? এতে মিত্র দেশগুলির উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক। এখানে ভূ-রাজনীতি যেন নির্ভর করছে একজন নেতার মেজাজ, অহমিকা, কিংবা নিজের উত্তরাধিকার গড়ার বাসনার ওপর।

ট্রাম্পের কাজের ধরনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, তিনি বিদ্রূপ ও অপমানকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। ট্রাম্প প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ছবি শেয়ার করেন, যেখানে তাঁকে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন পতাকা পুঁততে দেখা যায়; তিনি মিত্রদের নিয়ে ঠাট্টা করেন, অপমানজনক ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেন। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়েও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন (যার মধ্যে ‘কুকুরের স্লেজ’ মন্তব্যও আছে)।

কোনও নেতা যখন প্রকাশ্যে মিত্রদের অপমান করেন, তখন রাজনৈতিক সম্পর্কের লাভক্ষতির হিসেব বদলে যায়। ইউরোপীয় নেতারা একজন আত্মম্ভরী নেতার কাছে ‘নতজানু’ হিসেবে নিজেদের দেখাতে চান না। আমেরিকার জনগণ এই ঘটনায় বিস্মিত, লজ্জিত এবং ক্ষুব্ধ। সিএনএন চ্যানেলের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন, আর এক-চতুর্থাংশ এর পক্ষে।

ট্রাম্পের নিজের রিপাবলিকান দলেও অস্বস্তি রয়েছে। সবাই সরাসরি তাঁর মোকাবিলা করতে না চাইলেও, দলের কিছু নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সামরিক পদক্ষেপ তাঁরা সমর্থন করেন না, এবং কংগ্রেস চাইলে উত্তেজনা বাড়ানো ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

ইউরোপের বিরোধিতা আরও তীব্র, উৎকণ্ঠিত। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইইউ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ স্থগিত রেখেছে। ট্রাম্প যেন এবার নিজেরই ওষুধের স্বাদ পাচ্ছেন: সীমান্ত বদলাতে তিনি শুল্ক চাপানোকে চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ইউরোপ দেখাতে চায় যে তার হাতেও চাপ সৃষ্টির উপায় আছে।

ন্যাটো নীরব এবং বিভক্ত। পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ধারণার ওপরই ন্যাটোর ভিত্তি। কিন্তু এই বিরোধে মুখোমুখি দুই পক্ষই মিত্ররাষ্ট্র। ন্যাটোর সীমিত ও সতর্ক প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া ইউরোপীয় রাজধানীগুলোকে অস্থির করে তুলেছে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ও ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি জোট কি টিকে থাকতে পারে, যখন তার সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য ছোট সদস্যদের বিরুদ্ধে দাদাগিরি করে?

 

বিক্রি নয়, বাড়তি সুবিধে

এই কাহিনির শেষ ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা কেউই নিশ্চিত করে জানে না। তবে একটা দেশকে কিনে নেওয়া, বা তাকে অন্য দেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, এগুলো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বাধাগুলো অত্যন্ত বড়— গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব রাজনীতি, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব, ন্যাটো-র সংকট, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমত।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এর চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত পথ হল দরকষাকষি করে এমন একটি প্যাকেজ আদায় করা, যা গ্রিনল্যান্ডের মালিক না হয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে তার চাহিদা পূরণ করতে দেবে। এতে থাকবে এমন বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো চুক্তি, যেগুলো গ্রিনল্যান্ড স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে পারে। যেমন, খনিজ সম্পদে অংশীদারিত্ব; এবং আইনি কাঠামোর ভিতরে থেকেই বাড়তি সামরিক উপস্থিতি।

ট্রাম্পের ‘মালিকানা’-ভিত্তিক ভাষা এই সম্ভাব্য সহযোগিতাকেই পরিণত করছে এক অপচয়ী, অসার সংঘাতে। ইতিহাসের গতি যেন একজন মানুষের খেয়ালখুশির হাতে না ছেড়ে দেওয়া হয়। অতীতে এমন হয়তো একটু বেশিই ঘটেছে, এবং তার ফল আজও ভুগতে হচ্ছে।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5271 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...