আরএসএস-কে খুলে দেখা

ফেলিক্স পাল

 


ফেলিক্স পাল ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া-র রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এর লেকচারার। তাঁর এই তথ্যানুসন্ধানমূলক গবেষণা-নিবন্ধটি গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ দ্য ক্যারাভান পত্রিকায় ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। গত ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তাদের একশো বছর পূর্ণ করল। সেই উপলক্ষে, এবং আরও বিশেষ করে দেশের আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সঙ্ঘ সম্পর্কে জানাবোঝা খুবই জরুরি বলে আমরা মনে করছি। সেইজন্যই এই গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধটি আমরা বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করলাম।

 

“সঙ্ঘ কোনওভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে না— না সরাসরি, না দূর থেকে,” আগস্টে এক সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাংগঠনিক উৎসভূমি হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি এ-বছর তার শতবর্ষ উদ্‌যাপন করছে। এই উপলক্ষে আয়োজিত একের পর এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে ভাগবতের ভঙ্গি ছিল যেন এক উদাসীন অভিভাবকের— যে নিজের সন্তানদের থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখতে আগ্রহী।

আরএসএস একটি বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে থাকলেও, ভাগবতের দাবি— সঙ্ঘ-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলি “স্বাধীন, স্বশাসিত এবং তারা ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে।” আরএসএসের বিভিন্ন প্রকাশ্য নথিপত্রেও একই সুর শোনা যায়— সহযোগী প্রায় যে তিন ডজন সংগঠনকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়, তার বাইরে থাকা সাংগঠনিক ‘সন্তানদের’ সঙ্গে সম্পর্কের কথা তারা বারবার অস্বীকার করে।

তবে এ কথাও সর্বজনবিদিত যে সঙ্ঘের প্রভাব এই সীমিত পরিসরের অনেক বাইরেও বিস্তৃত। ভাগবতের ওই মন্তব্যের মাত্র কয়েক দিন আগেই, লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন— আরএসএসই হল “বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও।” মোদির এই বক্তব্য আসলে সেই সূক্ষ্ম অস্পষ্টতাকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, যেটি আড়াল করাই ভাগবতের মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল। সমাজের নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা, আরএসএস-সংযুক্ত অসংখ্য সংগঠনের এক বিস্তৃত নক্ষত্রমালার অস্তিত্ব, যাদের সম্মিলিত প্রভাবই সঙ্ঘের ক্ষমতার মূল ভিত্তি।

এই নেটওয়ার্কের আকার, গঠন ও প্রকৃতি আজ পর্যন্ত বাস্তব তথ্যভিত্তিকভাবে কেন কখনও খতিয়ে দেখা হয়নি? কারণ সঙ্ঘ নিজেই চায় এই বিষয়গুলিকে আড়ালে রাখতে। বারবারই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আরএসএস কোনও আইনি কাঠামোর অধীনে নথিভুক্ত নয়— না একটি এনজিও হিসেবে, না কোনও ধর্মীয় ট্রাস্ট হিসেবে, না অন্য কোনও আইনি সত্তা হিসেবে। দ্য ক্যারাভান পত্রিকার জুলাই সংখ্যার কভার স্টোরি— “The RSS does not exist”[1]— দেখিয়েছিল, কাগজে-কলমে এই অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়েই সংগঠনটি কীভাবে জাতীয় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে একটি সদর দপ্তর গড়ে তুলতে পেরেছে, অর্থের উৎস কোথা থেকে আসছে বা সদস্য কারা— সে সব কিছু প্রকাশ না করেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আরএসএস প্রকাশ্যেই নানা প্রক্সি-সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করলেও, সেই প্রক্সি-সংগঠনগুলি কারা এবং তাদের সঙ্গে সঙ্ঘের সম্পর্ক ঠিক কী— এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট জবাব তারা ধারাবাহিকভাবেই এড়িয়ে গেছে।

আসলে সঙ্ঘের নিজস্ব প্রকাশ্য নথিপত্রেই দেখা যায়— এই সংগঠনগুলি ঠিক কী ধরনের, সে বিষয়ে বর্ণনায় এক ধরনের মাথা ঘোরানো বৈচিত্র্য রয়েছে, এমনকি একই লেখার মধ্যেও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাকেশ সিনহার ২০১৯ সালের বই Understanding RSS-এ এই সংগঠনগুলিকে কখনও একত্রে “অ্যাফিলিয়েট”, কখনও “অঙ্গ”, কখনও “ফ্রন্ট”, আবার কখনও এমন “সন্তান” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা “আরএসএস-এর অন্তর্ভুক্ত”। এক বছর আগে প্রকাশিত রতন শার্দার RSS 360: Demystifying Rashtriya Swayamsevak Sangh বইটিতেও একই প্রবণতা দেখা যায়— সেখানে “অ্যাফিলিয়েট”, “আরএসএস-অনুপ্রণিত”, “প্রকল্প”, “সিস্টার অর্গানাইজেশন”, “মিত্র সংগঠন”, “আরএসএস-সম্পর্কিত সংগঠন” এবং “সহযোগী সংগঠন”-এর মধ্যে অনায়াসে যাতায়াত করা হয়েছে, যেগুলি নাকি আরএসএস দ্বারা “পরিচালিত”।

এইরকম তরল ও অনির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহারের ফলে সঙ্ঘ নিয়ে অধিকাংশ গবেষণা ও অনুসন্ধান যে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির আবহে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তা মোটেই আশ্চর্যের নয়। কারণ সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আরএসএস-এর অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালিতে অর্থবহ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি; ফলে তাঁদের গবেষণা সাধারণত সীমাবদ্ধ থেকেছে সঙ্ঘের মতাদর্শ কিংবা তার সবচেয়ে দৃশ্যমান সহযোগী সংগঠনগুলির মধ্যেই— যেমন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ

এর ফল হল এমন এক ধরনের কাজের ভাণ্ডার, যা আমরা জানি আরএসএস কী বলছে— সেটুকুই, তারা বাস্তবে কী করছে— সেটা নয়। জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাদের উচ্চকিত ঘোষণায় কিংবা জাতব্যবস্থা ও ভারতের মুসলমানদের অবস্থান নিয়ে তাদের এড়ানো-বাগানো বক্তব্য নজর পড়ে, কিন্তু কীভাবে এক বিশাল অথচ গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা ক্ষমতা গড়ে তোলে ও তা ধরে রাখে— সেই দৈনন্দিন কার্যপ্রণালির খুঁটিনাটি প্রায় অধরাই থেকে যায়।

এই পরিস্থিতি সঙ্ঘের পক্ষে অত্যন্ত লাভজনক। এর ফলে সংগঠনটি মৌলিক পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি এড়িয়ে যেতে পারে— এমনকি শতবর্ষ পূর্তির মুহূর্তেও, যখন তারা নিজেদের ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেছে, তখনও তাদের সম্পদ কীভাবে স্থানান্তরিত হয়, কোথায় তাদের কর্তৃত্ব কার্যকর, আর কত দূর তাদের প্রভাবের সীমা— এই সব বিষয়ে নিশ্চিতভাবে খুব কমই জানা যায়।

এ ছাড়া, হিন্দুত্ববাদী বয়ানকে ঘিরে অতিরিক্ত মনোযোগ হিন্দু ডানপন্থার সাংগঠনিক পরিসর সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে একরকম একমুখী করে দিয়েছে। এর ফলে এমন এক ধারণা তৈরি হয়েছে যে মতাদর্শই নাকি পুরো আন্দোলনটিকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে, এবং সব হিন্দুত্ববাদী শক্তিই স্বচ্ছন্দে সঙ্ঘের অংশ। লোকায়ত বোঝাপড়ায় প্রায়শই যতি নরসিংহানন্দ, তপন ঘোষ ও দত্তাত্রেয় হোসাবালে— এই তিনজনের নাম এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়, যেন তাঁরা তিনজনই সমানভাবে সঙ্ঘের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। কিন্তু এই উপলব্ধি— আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সবাই মতাদর্শগতভাবে একইরকম উৎসর্গীকৃত এবং শুধুমাত্র মতাদর্শই একটি নেটওয়ার্ককে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য যথেষ্ট— বারবারই ভেঙে পড়ে। এই ক্ষেত্রেই যেমন, নরসিংহানন্দের সঙ্গে সঙ্ঘের কোনও শনাক্তযোগ্য যোগাযোগ নেই, বরং তিনি সঙ্ঘকে যথেষ্ট ‘উগ্র’ না হওয়ার জন্য নিয়মিত সমালোচনা করেন; ঘোষ নিজেকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন বলে দাবি করেছেন; আর হোসাবালে হলেন সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক।

সব হিন্দুত্ববাদী সংগঠনই যে আরএসএস-এর কর্তৃত্বাধীন— তা নয়; আবার সঙ্ঘের অন্তর্গত সব সংগঠনই যে স্পষ্টভাবে মতাদর্শনির্ভর— তাও নয়। হিন্দু ডানপন্থাকে যখন কুয়াশার পর্দা ভেদ করে দেখা যায়, তখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়— কারণ অন্যান্য যে কোনও আন্দোলনের মতো এটিও গড়ে উঠেছে রক্তমাংসের মানুষ, ইট-পাথরের প্রতিষ্ঠান এবং জটিল, অগোছালো সম্পর্কের সমষ্টিতে। সঙ্ঘের ভেতরে যেমন, তেমনি তার বাইরের হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলির মধ্যেও দ্বন্দ্ব প্রবল; আর এই দ্বন্দ্বগুলিকে সামলানো, নির্দিষ্ট পথে চালিত করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঙ্ঘ বিপুল পরিমাণ শক্তি ব্যয় করে।

সঙ্ঘ কখনও কখনও তার এই অস্বচ্ছতার সুফল নিয়ে এক ধরনের আত্মতুষ্টিও প্রকাশ করেছে। ভাগবতের মতো প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বরা যখন জোর দিয়ে বলেন যে নিছক “প্রেরণা” ছাড়া এখানে আর কিছু খোঁজার নেই, তখন অভ্যন্তরীণ পাঠকের উদ্দেশে রচিত সঙ্ঘ-প্রকাশনাগুলিতে শোনা যায় একেবারে ভিন্ন সুর। উদাহরণ হিসেবে আরএসএস-এর মতাদর্শিক লেখক রতন শার্দা লিখেছেন— “আরএসএস-এর পক্ষে সৌভাগ্যজনক, আর অন্য সংগঠনগুলির পক্ষে দুর্ভাগ্যজনক যে, এই দৃষ্টিভঙ্গি [আরএসএস একটি বৃহৎ নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী] থেকে কেউ আরএসএস-কে নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা করেনি।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “আরএসএস-কে দেখার ক্ষেত্রে তাঁদের দৃষ্টি বরাবরই ছিল দোষ খোঁজার দিকে। অথচ আরএসএস-এর কাছে ‘সমন্বয়’— নিজেদের ভেতরে এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলির সঙ্গে সুসমন্বিত সম্পর্ক বজায় রাখা— একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়, আর এই সমন্বয়ই এই বৃহৎ অবিভক্ত হিন্দু পরিবারের সুশৃঙ্খল সহাবস্থানের গোপন রহস্য।”

হাজার হাজার অন্যান্য সংগঠনের থেকে সঙ্ঘের এই কৌশলগত দূরত্ব তাকে নানা ধরনের সুবিধা এনে দেয়। এর ফলে তারা আইনি বা আর্থিক নজরদারি এড়িয়ে যেতে পারে। কাজ বাইরের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রয়োজনে বিশ্বাসযোগ্য অস্বীকারযোগ্যতা (plausible deniability) দাবি করতে পারে। পরস্পরবিরোধী নেতৃত্বের দাবিগুলিকে মানিয়ে নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন সামলাতে পারে। একই সঙ্গে সব সময়ে সবার উদ্দেশে সবরকম কথা বলার মতো খণ্ডিত বার্তাপ্রচারও চালাতে পারে। সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলিকে যেন এক ধরনের সুইচবোর্ডের মতো পরিচালনা করা যায়— প্রয়োজনমতো বৃহত্তর নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের সংযোগ কখনও সক্রিয় করা হয়, কখনও আবার আড়াল করা হয়। এই জটিল অথচ গোপন শ্রমবিভাজনই সমাজের নানা স্তরে আরএসএস-এর প্রসারের একেবারে কেন্দ্রীয় কৌশল। এর ফলে একসঙ্গে বহু ক্ষেত্রে কট্টর ডানপন্থী উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়— বিভিন্ন শ্রোতৃমণ্ডলের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়, নতুন সমর্থকভিত্তি বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়, এবং সঙ্ঘের জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়।

কিন্তু সঙ্ঘকে ঘিরে এই রহস্যময়তাই আরেকটি, প্রায় প্রতিফলিত উদ্দেশ্যও সাধন করে— এর প্রভাববলয়কে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা এবং তার আকারকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো। এর ফলে এমন এক ধারণা তৈরি হয় যে আজকের দিনে হিন্দু ডানপন্থার রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন স্বাভাবিকভাবেই, তৃণমূল থেকে উঠে আসা এক সাংগঠনিক উত্থানের ফল। আড়ালে যা থেকে যায়, তা সঙ্ঘের প্রকল্পের প্রতি সমর্থন কিংবা সংগঠনগুলির অস্তিত্ব নয়, বরং তাদের পারস্পরিক সমন্বয়ের বাস্তবতা। প্রমাণ বলছে, আমরা এমন কোনও স্বতঃস্ফূর্ত হিন্দু জাতীয়তাবাদী আবেগের উত্থান দেখছি না, যা অলৌকিকভাবে নিজেই নিজেকে সংগঠিত করে ফেলেছে; বরং আমরা প্রত্যক্ষ করছি এক সুবিশাল আমলাতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের সচেতন ও পরিকল্পিত নির্মাণ। সঙ্ঘের হাত যখন অদৃশ্য থাকে, তখন খুব সহজেই— তাড়াহুড়ো করে এবং ভুলভাবে— এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যায় যে তারা সর্বত্র বিরাজমান।

ভোপালে আর এস এস ক্যাডারদের মার্চ। ছবি: সুযশ দ্বিবেদি, উইকিমিডিয়া কমনস

 

কিন্তু সঙ্ঘ না অসীম, না অজ্ঞেয়। ছয় বছর ধরে পরিচালিত একটি বিশেষ অনুসন্ধান— যার নেতৃত্বদানে আমি সহায়তা করেছি— এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এই অনুসন্ধানে সংগৃহীত তথ্য বর্তমানে সায়ঁস পো-র Centre de recherches internationales-এ সংরক্ষিত রয়েছে এবং দ্য ক্যারাভান পত্রিকা তা তথ্যযাচাই করে প্রকাশ করেছে। এই গবেষণার মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো আরএসএস-এর একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক মানচিত্র নির্মিত হয়েছে, যেখানে সঙ্ঘের সঙ্গে সরাসরি, অনুসরণযোগ্য ও বাস্তব বস্তুগত সম্পর্কযুক্ত আড়াই হাজারেরও বেশি সংগঠনের অস্তিত্ব উন্মোচিত হয়েছে।

এই ডেটাসেটটি একই ধরনের মতাদর্শগত অবস্থান ভাগ করে নেওয়া কয়েকটি সংগঠনের একটি দায়সারা তালিকা নয়। বরং এটি এমন এক বস্তুগতভাবে সংযুক্ত সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি করে, যেখানে বহু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিরা যুক্ত, একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, নিয়মিত একসঙ্গে কর্মসূচি আয়োজন করা হয়, কাজের ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে, এবং দেশীয় ও বিদেশি— উভয় উৎসের অর্থপ্রবাহ তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। এই প্রমাণগুলি ইঙ্গিত দেয় যে এই সংগঠনগুলি কোনও শিথিল ‘পরিবার’ নয়, বরং একক সত্তারই ঘনিষ্ঠভাবে জালবদ্ধ অংশ— যে বাস্তবতা সঙ্ঘ নিজেই তার অভ্যন্তরীণ প্রকাশনাগুলিতে স্বীকার করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই সংগঠনগুলির প্রকৃত আন্তঃসংযোগ— যা ভাগবত নিরন্তর অস্বীকার করেন এবং মোদি নিয়মিতভাবে মহিমান্বিত করেন— আমাদের জানিয়ে দেয় সঙ্ঘ আসলে কী।

 

আলাদা আলাদা করে দেখলে আমরা যে বহু সংগঠনের সন্ধান পেয়েছি, সেগুলির অনেকটাই বিশেষ নজরকাড়া বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একত্রে ধরলে তারা একটি স্পষ্ট ও উন্মোচক ছবি তৈরি করে। তাদের মধ্যবর্তী যে সংযোগস্থল— সঙ্ঘ আসলে ঠিক যেটিকে আড়াল করতে চায়— তা স্পষ্ট করে দেয় যে আরএসএস কোনও ঢিলেঢালা দ্বীপপুঞ্জ নয়, বরং একটি একক, জালবদ্ধ সত্তা।

আমাদের তথ্য সংগ্রহের সময়, উদাহরণস্বরূপ, আমরা দেখেছি যে জম্মুর আমফালা এলাকায় একটি একক ঠিকানায় একাধিক সঙ্ঘ-সংযুক্ত সংগঠন অবস্থান করছে। ওই স্থানটি, একটা চার হেক্টরের প্লট, প্রথমবার ১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জম্মু ও কাশ্মিরের ডোগরা শাসক প্রতাপ সিংহ কর্তৃক এক ধর্মীয় নেতা চম্পা নাথকে বৈদিক শিক্ষার প্রচারের জন্য প্রদান করা হয়েছিল। এর সঙ্গে একটি মন্দির নির্মাণের জন্য ১০,০০০ টাকা অনুদানও দেওয়া হয়েছিল। মন্দির পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত ‘বেদ মন্দির কমিটি’-কে ১৯৬৪ সালের মে মাসে একটি সোসাইটি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

কোনও এক সময়ে এই মন্দির, এই কমিটি এবং এই প্রাঙ্গণ সঙ্ঘের হাতে চলে যায়। আজ এই ঠিকানায় আরও ২০টির বেশি সঙ্ঘ-সংযুক্ত সংগঠন অবস্থান করছে, যা জম্মু ও কাশ্মিরে সঙ্ঘের সাংগঠনিক উপস্থিতির প্রায় অর্ধেক। সেগুলি হল—

১. হোম ফর দি এজেড অ্যান্ড ইনফার্ম – বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য আবাসিক কেন্দ্র;
২. জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির গোরক্ষা সমিতি – একটি গোরক্ষার কেন্দ্র;
৩. শান্তি সাধনা আশ্রম – উপাসনার স্থান;
৪. ইনস্টিটিউট অফ ন্যাচারাল হাইজিন – রোগের প্রাকৃতিক চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠান;
৫. জয় কার্গিল জয় ভারত কোশ ট্রাস্ট – কার্গিল যুদ্ধের প্রবীণ সৈনিকদের জন্য এনজিও;
৬. দিশা ছাত্রাবাস-এর অফিস, কাটরা শহরে একটি হোস্টেল;
৭. বেদ মন্দির বালনিকেতন – অনাথ ছেলেদের জন্য আশ্রম;
৮. বেদ মন্দির বালিকানিকেতন – অনাথ মেয়েদের জন্য অনুরূপ আশ্রম;
৯. বেদ মন্দির পাঠশালা – উপরোক্ত দুটি অনাথাশ্রমের জন্য বিদ্যালয়;
১০. বেদ মন্দির ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার;
১১. একটি হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি;
১২. স্বামী বিবেকানন্দ মেডিকেল মিশন – দাতব্য হাসপাতাল;
১৩. জম্মু-কাশ্মির সহায়তা সমিতি – সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষদের জন্য সামাজিক-কল্যাণ সংস্থা;
১৪. ভারতীয় শিক্ষা সমিতি – সঙ্ঘের শিক্ষা-সংগঠন বিদ্যা ভারতী-র একটি শাখা;
১৫. সঙ্ঘের সেবা শাখা সেবা ভারতী-র জম্মু-কাশ্মির অফিস;
১৬. কেশর বেন ভেলজি পোপাট ভবন – অনাথ মেয়েদের জন্য আরেকটি আশ্রম;
১৭. অখিল ভারতীয় পূর্বা সৈনিক সেবা পরিষদ-এর জম্মু শাখা, প্রবীণ সেনাদের জন্য কাজ করা একটি সঙ্ঘ-সংযুক্ত সংস্থা;
১৮. মাতা বৈষ্ণো লোক কল্যাণ সংস্থা – তীর্থযাত্রীদের জন্য নিকটবর্তী লজ পরিচালনা করে;
১৯. জনক মদন গার্লস হোস্টেল-এর অফিস – স্কুলযাত্রী মেয়েদের জন্য হোস্টেল যা সেবা ভারতী পরিচালনা করে;
২০. ভারত বিকাশ পরিষদ-এর জম্মু শাখা, সঙ্ঘের অ-লাভজনক প্রতিষ্ঠান;
২১. মহারাজা প্রতাপ সিং বেদ বিদ্যালয় – বেদ অধ্যয়নের জন্য বিদ্যালয়।

এই সংগঠনগুলির বস্তুগত এবং সাংগঠনিকভাবে সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত থাকার ঘটনায় এটি স্পষ্ট হয় সঙ্ঘের সেবা ও শিক্ষাক্ষেত্র— উভয়েই— এই ঠিকানা থেকেই পরিচালিত হয়। তবে গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, সবগুলোই শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত, যারা বিভিন্ন সংগঠনেই একাধিক দায়িত্ব-প্রাপ্ত।

আরএসএস-প্রোজেক্টের বেদ মন্দির নেটওয়ার্কের স্ক্রিনশট। দেখা যাবে এখানে

 

বেদ মন্দির বালনিকেতন-এর তালিকাভুক্ত চারজন অফিসধারীর সকলেই সঙ্ঘের কর্মী। এর সভাপতি, গৌতম মেঙ্গি, হলেন জম্মুর আরএসএস ‘সঙ্ঘচালক’— সমন্বয়কারী— এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে বেদ মন্দির কমপ্লেক্সের সঙ্গে যুক্ত পরিবারের সন্তান। মেঙ্গি বেশ কয়েকটি উচ্চ পর্যায়ের আরএসএস-বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে সঙ্ঘের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা-র সভা। এর উপ-সভাপতি, বাল কৃশান গুপ্ত, যিনি বেদ মন্দির কমিটিরও সদস্য, সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন। যেমন থাকেন সচিব সুদেশ পাল এবং উপ-সচিব সতীশ মিত্তলও। মিত্তল ভারতীয় শিক্ষা সমিতি-র কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। বেদ মন্দির কমিটির সভাপতি, সুরেশ চন্দ্র গুপ্ত, একইসঙ্গে মাতা বৈষ্ণো লোক কল্যাণ সংস্থান-এরও সভাপতি, আর এর উপ-সভাপতি অমিতা শর্মা ভারত বিকাশ পরিষদ, জম্মু-র সভাপতি।

স্পষ্ট বোঝা যায়, এই সব সংস্থা স্বাধীন সত্তা নয়, বরং একটি একক নেটওয়ার্কের অন্তর্গত।

সঙ্ঘের সঙ্গে এই সংযোগ আরও গভীর— জম্মুর বাইরেও, এবং প্রকৃতপক্ষে ভারতেরও বাইরে বিস্তৃত। উদাহরণস্বরূপ, মহারাজা প্রতাপ সিং বেদ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল পুনে-ভিত্তিক একটি সংস্থা মহর্ষি বেদ ব্যাস প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠাতা গোবিন্দদেব গিরি আরএসএস-এর সদস্য, ভিএইচপি-নিয়ন্ত্রিত ট্রাস্ট রামজন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র-র কোষাধ্যক্ষ এবং নাগপুরের মাধব নেত্রালয় হাসপাতালে পরামর্শক বোর্ডে রয়েছেন। হাসপাতালটি প্রাক্তন আরএসএস প্রধান মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর-এর নামে নামকরণ করা। আরএসএস-এর মুখপত্র অর্গানাইজার অনুযায়ী, গোবিন্দদেব গিরির “প্রাথমিক সংস্কারগুলি আরএসএস স্বয়ংসেবক হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে” এই প্রতিষ্ঠানে।

প্রাঙ্গণের অন্য একটি সংগঠন, কেশর বেন ভেলজি পোপাট ভবন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল India Development and Relief Fund-এর সংগৃহীত অর্থ দিয়ে। এটি একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক তহবিল সংগ্রহ সংস্থা, যার দীর্ঘদিন ধরে সঙ্ঘের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তীতে এটি আমেরিকার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অর্থায়নেও পরিচালিত হয়েছে। অনুরূপভাবে, জনক মদন গার্লস হোস্টেল-ও সেবা ইন্টারন্যাশনাল-এর কানাডা শাখা দ্বারা অর্থায়িত।

এই আন্তঃসংযুক্ত সংস্থাগুলির নেটওয়ার্ক সঙ্ঘের জন্য কোনও প্রান্তিক বিষয় নয়। একটি ছোট হোস্টেল পরিচালনায় আরএসএস সঙ্ঘচালক-এর অংশগ্রহণ স্পষ্ট করে দেয় যে এই ফ্রন্ট সংস্থাগুলি সঙ্ঘের ক্ষমতাবিস্তারের বৃহত্তর কৌশলের একটি পার্শ্বপ্রয়াস নয়, বরং ঠিক সেই মাধ্যম— যার মাধ্যমে আরএসএস সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, নতুন সদস্য সংগ্রহ করে এবং সমাজে প্রভাব বিস্তার করে।

আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বেদ মন্দির কমপ্লেক্সটি রাজ্যব্যাপী সঙ্ঘের কাজের জন্যও একটি কেন্দ্রীয় নোড হিসেবে কাজ করে। প্রকাশনাগুলিতে এই প্রাঙ্গণকে “কেশব ভবন” নামে উল্লেখ করা হয়েছে— এটি স্থানীয় আরএসএস সদর দপ্তরগুলোকে সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার-এর নামে নামকরণেরই একটি ধারাবাহিকতা। এছাড়া এই কমপ্লেক্সটিতে সিনিয়র আরএসএস কর্মীরা, যেমন ভাগবত, এই অঞ্চলে ভ্রমণের সময় নিয়মিতভাবে আতিথ্য গ্রহণ করেন।

স্থানীয় প্রকাশনাগুলো স্পষ্টভাবে এই ঠিকানাকে সঙ্ঘের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে:

কেশব ভবন, বেদ মন্দির-এ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে আরএসএস প্রধান অবস্থান করবেন এবং জম্মু ও কাশ্মিরের সঙ্ঘ এবং এর শাখা সংস্থাগুলি, যেমন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, সনাতন ধর্ম সভা, সংস্কার ভারতী, বিদ্যা ভারতী, সেবা ভারতী, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ, অধিভিক্তা পরিষদ, স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ ইত্যাদির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠক করবেন। আরএসএস প্রধান এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন এবং তাদের কাজকর্মের অভিজ্ঞতার কথা শুনবেন।

এর পাশাপাশি, এই কমপ্লেক্সে সংস্কৃত ভারতী— সঙ্ঘের এই শাখা সংস্কৃত ভাষার পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করে— দ্বারা আয়োজিত বৈদিক পণ্ডিতদের সম্মেলন থেকে স্থানীয় উৎসবের উদযাপন, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা সংক্রান্ত কার্যক্রম সবই আয়োজন করা হয়। ২০১২ সালে, সেবা ভারতীর জম্ম-কাশ্মির শাখা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের জন্য রাজ্যের সঙ্ঘ ইকোসিস্টেমের বিস্তৃত অংশ এখানে উপস্থিত হয়েছিল। সঙ্ঘের প্রকাশনা সংবাদা জানিয়েছিল, প্রায় ৫০টি সংগঠন উপস্থিত ছিল। (তবে অধিকাংশই আবার এমন সংগঠন, যাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি কেবল সেই সম্পর্কের মাধ্যমে আরএসএস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।)

সঙ্ঘের নিজস্ব বিবরণে এই সমাবেশগুলোকে উপস্থাপন করা হয় যেন এগুলি মতাদর্শগতভাবে এক জায়গায় থাকা সংগঠনগুলোর একটি ঢিলেঢালা জোট, যারা হিন্দুত্ব, জাতীয়তাবাদ বা সামাজিক সেবার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে, যৌথ কার্যক্রম, ভাগ করা অফিস এবং সাধারণ কর্মকর্তা— সবকিছুই নির্দেশ করে একটি কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে, যার মধ্যে ভূমিকা ও পদ অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত।

অতএব, বেদ মন্দির কমপ্লেক্সটি সঙ্ঘের বৃহত্তর কৌশলের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে দেখা যেতে পারে— যেখানে সংগঠনগুলি তৈরি হয়, কিন্তু সবকিছুই একটি ঘন প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যা আপাতদৃষ্টিতে প্রায় ২০টিরও বেশি স্বাধীন সংগঠন বলে মনে হয়, যেগুলি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও ফোকাসের ওপর কাজ করে, তা বাস্তবে একটি ঘন, সুসংগঠিত ক্লাস্টার— যেখানে সংগঠনগুলো একে অপরকে অনুসরণ এবং অনুকরণ করে। কীভাবে আরএসএসকে একক, সমগ্রতান্ত্রিক নেটওয়ার্ক ছাড়া অন্যভাবে বোঝা সম্ভব হবে, যখন সিদ্ধান্তগুলি একই ব্যক্তিদের দ্বারা, একই কারণে, প্রতিসাম্যপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে, একই নেতা অনুসরণ করে এবং একই শৃঙ্খলার মধ্যে নেওয়া হয়?

এই পদ্ধতি সঙ্ঘের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এ-পর্যন্ত অপরিষ্কার থাকা নানা প্রশ্নকে সামনে আনে। উদাহরণস্বরূপ, এই ক্লাস্টারের সাতটি সংগঠনই দাবি করে যে তারা একই ধরনের কাজ করছে— যেমন স্কুল ও হোস্টেল পরিচালনা— এবং তালিকাভুক্ত সামাজিক-কল্যাণ সংস্থাগুলিরও অনুরূপ কার্যক্রম দেখা যায়। কিছু সংগঠন দেশের মধ্যে সমমনা ট্রাস্ট বা কর্পোরেট দানের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে, আবার অন্যগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে Foreign Contribution (Regulation) Act, 2010-এর অধীনে বিদেশি তহবিল গ্রহণ করে। এই বিস্তারিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করা যে কাউকে যে বিভ্রান্ত করতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু, সঙ্ঘের পক্ষে, ঠিক এখানেই মূল উদ্দেশ্য নিহিত।

কিন্তু মূল বিষয় শুধুমাত্র এ-টুকুই নয় যে সঙ্ঘ শেল সংস্থাগুলির জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছে। বেদ মন্দির-এর ঘটনা এবং আমাদের বিস্তৃত গবেষণা আরও গভীর অস্তিত্বমূলক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। যদি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জম্মু-কাশ্মিরে সঙ্ঘের অর্ধেকের বেশি উপস্থিতি একটি একক সম্পত্তির সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে আরএসএস-কে বোঝার জন্য যে মৌলিক ধারণাগুলো আমরা গ্রহণ করি, এবং যে তথাকথিত স্বতঃস্ফূর্ত হিন্দুত্বের উত্থানে এটি “প্রেরণা জোগায়”— সেগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের সঙ্ঘের অত্যাবশ্যকীয় ভিত্তিগত কাঠামোর দিকে ফিরে যেতে হবে।

 

যখন আমরা সঙ্ঘের সংযোগগুলির খোঁজ শুরু করি, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে বেদ মন্দির কোনও ব্যতিক্রম নয়। জম্মুতে আমরা যা উদঘাটন করেছি, তা সঙ্ঘের প্রায় ৪৬টি ‘প্রান্ত’ বা প্রদেশের জন্যই প্রযোজ্য, যেখানে প্রতিটি প্রদেশকে নানা প্রশাসনিক পদমর্যাদা দ্বারা তদারকি করা হয়— যাতে নেতৃত্ব দেন ‘প্রচারক’, ‘কার্যবহ’ (জেনারেল সেক্রেটারি) এবং ‘সঙ্ঘচালক’। প্রতিটি প্রান্তের নিজস্ব সঙ্ঘ-সংযুক্ত প্রধান সংস্থাগুলির পুনরাবৃত্তি থাকে: যেমন, বিদ্যা ভারতী পাঞ্জাবে হয়ে যায় সর্বহিতকারী শিক্ষা সমিতি; সেবা ভারতী কর্নাটকে হয়ে যায় হিন্দু সেবা প্রতিষ্ঠান; এবং বনবাসী কল্যাণ আশ্রম ঝাড়খণ্ডে হয়ে যায় বনবাসী কল্যাণ কেন্দ্র

এই প্রতিটি সংস্থাকে, নতুন উপ-সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যেগুলি পরবর্তীতে তাদের নিজস্ব উপ-সংস্থা শুরু করার কাজ শুরু করে। আমরা উত্তরাখণ্ডের সিতারগঞ্জের একটি ছোট হোস্টেল বরাহ রানা স্মারক ছাত্রাবাস-কে আরএসএসের সঙ্গে তিন স্তরের দূরত্বের মাধ্যমে যুক্ত দেখেছি: বরাহ রানা স্মারক সমিতি— যা প্রতিষ্ঠা করেছে সেবা প্রকল্প সংস্থান— যেটি বনবাসী কল্যাণ আশ্রম-এর প্রাদেশিক শাখা। শেষোক্ত সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত আরএসএস-সংযুক্ত তিন ডজন সংস্থার মধ্যে একটি।

একটি বিস্তৃত সিভিল-সোসাইটি নেটওয়ার্ক গঠনের এই পদ্ধতি সাধারণ রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্পষ্টভাবে পৃথক। বিদ্যমান সংগঠনগুলির সঙ্গে জোট তৈরি করার পরিবর্তে, এটি একটি প্রয়াসমূলক প্রক্রিয়া, যেখানে নতুন সংগঠন সৃষ্টি করে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হয়, সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত করা হয় যে তারা যেন একটি কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। আমি অন্যত্র এই পদ্ধতিকে “সাংগঠনিক বিস্তার” (organisational diffusion) নামে অভিহিত করেছি,[2] যা হল “একটি বৃহৎ সংখ্যক প্রক্সি সিভিল-সোসাইটি সংগঠন কৌশলগতভাবে সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের নির্বাহীরা গোপনে জটিল শ্রমবিভাজন পরিচালনা করতে পারে।”

সাংগঠনিক বিস্তার সঙ্ঘের জন্য একটি স্নোবল প্রভাব তৈরি করে। নেটওয়ার্কটি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সঙ্ঘের কর্তৃত্বের অধীনে থাকে, যার ফলে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হয় যাদের সীমা প্রায়শই ছিদ্রযুক্ত বা প্রায় অদৃশ্য। জম্মুর ঘটনার মতো, এই অদৃশ্য সীমাগুলো আমরা প্রায় প্রতিটি স্থানে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি।

বেঙ্গালুরুতে, অভ্যুদয়, যা কেশব ক্রুপা সংবর্ধনা সমিতি নামেও পরিচিত, ইয়ুথ ফর সেবা, বিদ্যা চেতনা এবং স্থানীয় সেবা ভারতী-র অফিসের সঙ্গে একই ঠিকানায় অবস্থিত। আকোলার আদর্শ সংস্কার মণ্ডল-এর অফিস একটি রক্তদান কেন্দ্র ডঃ হেডগেওয়ার রক্তপেড়ি-র সঙ্গে একই ঠিকানায়। কখনও কখনও এই সংযোগ সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ্য। উদাহরণস্বরূপ, চিহ্ন ভাণ্ডারা জনকাম্মা সঞ্জীবা রাও এডুকেশনাল চ্যারিটেবল পাবলিক ট্রাস্ট, সেবা ভারতী ট্রাস্ট এবং দেসা সেবা সমিতি কড়াথানাড তাদের নিজ নিজ স্থানীয় আরএসএস অফিসের ভিতরেই অফিস পরিচালনা করে।

প্রকৃতপক্ষে, এই ধারা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, হিউস্টনের পশ্চিমি উপশহর পর্যন্তও একইরকমভাবে ক্রিয়াশীল। সেখানে স্টার পাইপ প্রোডাক্টস সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গোডাউন— যার মালিক ভুটাদা পরিবার, যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্ঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবার— তা-ও কেশব স্ম্রুতি নামে পরিচিত। সংস্থার প্যাম্ফলেট অনুযায়ী, কেশব স্ম্রুতি হল “হিউস্টনের দক্ষিণ-পশ্চিম আরএসএস অফিস”— সঙ্ঘের বিদেশ শাখা। রমেশ ভুটাদা দীর্ঘদিন ধরে এই এইচএসএস-এর উপ-সভাপতি। একই ঠিকানা অনলাইন ডিরেক্টরিতে ভিএইচপি আমেরিকা-র সদর দপ্তর হিসেবেও তালিকাভুক্ত, যা প্রশ্ন তোলে যে যুক্তরাষ্ট্রে দুটি বৃহত্তম হিন্দুত্ব গ্রুপকে আলাদা সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না।

কিন্তু চিত্রটি এখানেই আরও জটিল হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট ঠিকানাটি— 4018 Westhollow Parkway— আরও প্রায় আধডজন ভূমিকায় চিহ্নিত হয়েছে: ভুটাদা-সহপ্রতিষ্ঠিত যোগ সংস্থা SVYASA-র ঠিকানা হিসেবে, যার সঙ্গে মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে; সঙ্ঘ-নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় সংগঠন হিন্দুস অফ গ্রেটার হিউস্টন-এর সদর দপ্তর হিসেবে; ভিএইচপি অফ আমেরিকাএইচএসএস-পরিচালিত বিভিন্ন যুব শিবিরের আয়োজনস্থল হিসেবে; ভারতের আরএসএস নেত্রী নিবেদিতা ভিড়ের মতো নেতাদের বক্তৃতাস্থল হিসেবে; এবং সেবা ইন্টারন্যাশনাল-এর ঠিকানা হিসেবে— যা এইচএসএস-দ্বারা গোপনে পরিচালিত একটি তহবিলসংগ্রহ শাখা, এবং যা অজ্ঞাত দাতাদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ ডলার অনুদান সংগ্রহ করে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালে প্রাক্তন টুইটার নির্বাহী জ্যাক ডরসি প্রদত্ত ২৫ লক্ষ ডলারের অনুদান— যে অর্থ পরে ভারতে সঙ্ঘের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ভৌগোলিক সীমানা ছাপিয়ে সঙ্ঘের পরিসরে ভুটাদা পরিবারের ছাপ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজকোটে ভুটাদা পরিবারের মালিকানাধীন স্টার পাইপ ফাউন্ড্রি— আরএসএস-সংযুক্ত থিঙ্কট্যাঙ্ক ভিশন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন-এর এক প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন করে আত্মপ্রকাশ করেছে ঋষিহুড ইউনিভার্সিটি নামে, এবং তাদের ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজ়ম ইনিশিয়েটিভ-এর লক্ষ্য হল প্রাক্তন আরএসএস প্রচারক ও ভারতীয় জনসঙ্ঘের নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায়ের “চেতনাকে জাগ্রত বা প্রজ্বলিত করা”। কেশব স্ম্রুতি-র সঙ্গে একই ঠিকানায় রয়েছে ভুটাদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন-এর অফিস— যে ফাউন্ডেশনটি সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত আরও বহু সংগঠনে বিপুল আর্থিক সহায়তা জুগিয়ে থাকে। এই পরিবারের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে হিন্দু আমেরিকান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (HAPAC, হাপাক)-র মাধ্যমে, যা আমেরিকায় সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদদের অর্থসাহায্য দেয়। হাপাক আবার হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন (HAF, হ্যাফ)-এর একটি সহযোগী সংগঠন— যে অ্যাডভোকেসি গোষ্ঠীর সঙ্ঘের পক্ষে লবি করার দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে। রমেশ ভুটাদার পুত্র ঋষি ভুটাদা এবং তাঁর খুড়তুতো বোন কবিতা পাল্লোদ বহু বছর ধরে হ্যাফ-এর বোর্ডের সদস্য।

রমেশ ভুটাদা আরও নানা সংগঠনের পরিচালন পর্ষদের সদস্য। এর মধ্যে রয়েছে পরম শক্তি পীঠ অফ আমেরিকা— একটি ফাউন্ডেশন, যা কুখ্যাত হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী ভাবনাচিন্তাবিদ ঋতম্ভরা-র জন্য তহবিল সংগ্রহ করে; হিন্দু সোসাইটি অফ আমেরিকা, যা তিনি অন্যান্য এইচএসএস আধিকারিকদের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন; এবং পতঞ্জলি যোগপীঠ ফাউন্ডেশন, যা গডম্যান রামদেব-এর জন্য প্রবাসীভিত্তিক একটি ফাউন্ডেশন হিসেবে কাজ করে। সিনিয়র ভুটাদার বিদেশি আরএসএস কর্মীদের জন্য আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিতে ভারতে আসার ঘটনাই দেখায়— এত দূরের এই সব শাখা-প্রশাখাকেও কীভাবে সঙ্ঘ সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ করে।

পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে রমেশ ভুটাদা ও তাঁর পুত্র ঋষি ভুটাদা। ছবি: মায়রা বেলট্রান, হিউস্টন ক্রনিকল, গেটি ইমেজেস

 

ভুটাদা পরিবারকে ঘিরে যে প্রভাবের ঘনত্ব দেখা যায়, তা কোনওভাবেই শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যতিক্রম নয়। আমাদের ডেটাসেট ক্রমশই দেখিয়েছে যে তুলনামূলকভাবে অল্প কয়েকজন ব্যক্তি— বিশেষত যাঁরা প্রচারক— অত্যন্ত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আরএসএস-এর শ্রমিক শাখা ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ-এর অস্তিত্বের বড় অংশই ঋণী দত্তোপন্ত ঠেঙ্গড়ি-র প্রতি— এই সেই প্রচারক, যাঁর ছবি আজও প্রায় প্রতিটি বিএমএস-অনুষঙ্গী সংগঠনের দেওয়ালে শোভা পায়। সঙ্ঘের অন্যান্য বহু শাখার মতোই, বিএমএস-ও স্পষ্টভাবে কল্পিত হয়েছিল বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠীর ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী সংগঠনী ক্ষমতার প্রতিক্রিয়াশীল উত্তর হিসেবে। তবে বিএমএস আজও তুলনামূলকভাবে অল্প আলোচিত, এবং তার প্রকৃত শক্তি কতটা— তা এখনও অস্পষ্ট। পাঁচ হাজার অনুষঙ্গী ইউনিয়নের মাধ্যমে এই সংগঠনের সদস্যসংখ্যা প্রায় এক কোটি; কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আশ্চর্যজনকভাবেই অনুপস্থিত।

কেরলে প্রচারক পি পরমেশ্বরন, যিনি পঁচিশ বছর ধরে বিবেকানন্দ কেন্দ্র-এর নেতৃত্ব দিয়েছেন, একই সঙ্গে কেরলে সঙ্ঘের মুখপত্র কেশরী-র প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিরুবনন্তপুরমে অবস্থিত সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ভারতীয় বিচার কেন্দ্রম-এর সঙ্গে, পাশাপাশি এর ত্রৈমাসিক গবেষণা পত্রিকা প্রগতি-র সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর নেতৃত্বে বা উদ্যোগে গড়ে ওঠে ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর ইন্ডিয়া’স হেরিটেজ নামের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং কেরলে ভগবদ্গীতার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত গীতা স্বাধ্যায় সমিতি

 

এই সব উদাহরণ, এবং এগুলিকে সংযুক্ত করে রাখা সম্পর্কগুলির ঘনত্ব, আমাদের নিঃসন্দেহে একটাই সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়— সঙ্ঘ শুরু থেকেই একটিমাত্র রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কাজ করে এসেছে, এবং সেই কাঠামোটি সচেতনভাবেই নির্মিত হয়েছে ঠিক সেই নেতৃত্বের হাত ধরে, যারা প্রকাশ্যে তার বিপরীত দাবি করে। সঙ্ঘের ভিতরে বৈচিত্র্য রয়েছে, রয়েছে স্বার্থের সংঘাত, ব্যক্তিগত অহং এবং সক্ষমতার তারতম্যও। তবু ধোঁয়াশা আর আড়ালের স্তর সরিয়ে তাকালেই সঙ্ঘের ছাপ— কেশব নামের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার থেকে শুরু করে সংগঠনগুলির শীর্ষস্তরে বসানো আরএসএস কর্মকর্তারা, কিংবা প্রবাসী অর্থদাতাদের কাছ থেকে আসা অর্থপ্রবাহ— ক্রমশ এতটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তা আর উপেক্ষা করা যায় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল— আরএসএস নিজে কিন্তু শুরু থেকেই জানে যে তারা কী এবং তারা নিজেদের কীভাবে দেখে। বাস্তবিকই, সঙ্ঘের কূটকৌশল বা ভাষাগত পিচ্ছিলতায় বিভ্রান্ত না হয়ে যদি তাদের অভ্যন্তরীণ প্রকাশনায় নির্মিত মূল বার্তাগুলোর দিকে মন দিই, তাহলে একটি একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে তাদের সংহতি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সঙ্ঘ-সমর্থক কে জয়প্রসাদ বিষয়টি একেবারে খোলাখুলিভাবেই বলেছেন—

এই সব সহযোগী চাপগোষ্ঠীই আরএসএস-এর নিয়ন্ত্রণাধীন। এই সংগঠনগুলোর দুটি ভূমিকা আছে— প্রথমত, তারা আরএসএস-এর ভাবধারা ছড়িয়ে দেয়; দ্বিতীয়ত, তারা নিজেদের সংগঠনের স্বার্থ রক্ষা করে। … দৈনন্দিন কাজকর্মে এই সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব নেতৃত্ব ও অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে কাজ করে। কিন্তু তারা আরএসএস-এর নিয়ন্ত্রণ ও দিশানির্দেশের অধীনেই থাকে।

একইভাবে, সঙ্ঘ-ব্যাখ্যাকার এমজি চিতকারা আদিবাসী রাজনীতির সঙ্গে আরএসএস-এর সম্পর্ক আলোচনা করতে গিয়ে জানান যে, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম কোনওভাবেই “অরাজনৈতিক এনজিও” নয়। তাঁর কথায়, “আদিবাসীদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর রুখতেই এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আরএসএস-এর অন্যান্য সংগঠনের মতোই, বনবাসী কল্যাণ আশ্রমও আরএসএস-এরই একটি কাঠামো— যা প্রশিক্ষিত আরএসএস কর্মীদের দ্বারা সংগঠিত ও পরিচালিত।”

সঙ্ঘ নিজেকে সমাজের এক ‘অর্গানিসিস্ট’ বা সাংগঠনিক সামগ্রিকতার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের অপরিহার্য অংশ বলে মনে করে। এই অর্গানিসিজম মূলত এক স্বভাবতই চরম দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ— যেখানে সমাজকে কল্পনা করা হয় একটি স্বাভাবিক, অবিচ্ছেদ্য ও সুশৃঙ্খল জীবদেহ হিসেবে, আর যেখানে সংখ্যালঘু কিংবা ‘বিদেশি’রা হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক উপাদান, যাদের বহিষ্কারযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, এই অর্গানিজম বা ‘দেহ’-টিকে প্রায়শই রোগাক্রান্ত হিসেবে কল্পনা করা হয়— যাকে ‘জাতীয় পুনরুজ্জীবন’-এর জন্য শুদ্ধিকরণ ও আরোগ্য লাভ করাতে হবে। কখনও সেই দেহ ‘দূষিত রক্তে’ আক্রান্ত (আরএসএস-এর বিশিষ্ট মতাদর্শী একনাথ রানাড়ে), কখনও তা একটি ‘ক্ষত’ (চিতকারা), আবার কখনও ‘ফোঁড়া’য় ভরা (গোলওয়ালকর)। এই দেহকে আরোগ্য দিতে পারে একমাত্র আরএসএস— যা নিজেই নানা অঙ্গ, কোষ ও পেশি দিয়ে গঠিত— এবং যার ‘রোগ-প্রতিরোধক গুণাবলি’ নাকি এই আরোগ্য সাধন করতে সক্ষম। সঙ্ঘের ধারাবাহিকভাবে ঘোষিত লক্ষ্য হল এই দেহকে প্রথমে ‘শুদ্ধ’ করা, তারপর নিজেই সেই দেহে পরিণত হওয়া।

এই সামষ্টিকতা বা সংগঠন-এর প্রতি অঙ্গীকার— সঙ্ঘের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন— কথিত হিন্দু খোজাকরণ ও অনৈক্যের অবসানের জন্য অপরিহার্য। সঙ্ঘের কাছে সংগঠন একসঙ্গে উপায়ও, আবার লক্ষ্যও— হিন্দুরাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার পথ এবং সেই পথের শেষ বিন্দু।

এই অর্গানিসিজম তাই নিছক রূপক নয়। এটি এক ধরনের বাস্তুতান্ত্রিক সংগঠনী নীতি— যা সঙ্ঘের ঘোষিত লক্ষ্য “সঙ্ঘ সমাজ বনেগা”, অর্থাৎ সমাজই সঙ্ঘে পরিণত হবে— এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আরএসএস স্পষ্টভাবেই বোঝে যে বহুবিধ সংগঠন জন্ম দেওয়া এবং একই সঙ্গে সংগঠনিক একত্ব বজায় রাখা— এই দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। বরং এই দ্বৈততাই তাদের কৌশলের মূল।

এই ধারণাটি আরএসএস নেতারা বারবার উচ্চারণ করেছেন, হেডগেওয়ার থেকে—

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা ডঃ কেবি হেডগেওয়ারের এই দিকনির্দেশ আরও স্পষ্ট হয়েছে— আরএসএস যেন সমাজের ভেতরে আর একটি সংগঠন না হয়ে ওঠে, বরং সমাজেরই সংগঠন হয়ে ওঠে।

গোলওয়ালকর হয়ে—

সঙ্ঘ কখনওই সমাজের ভেতরে একটি স্বতন্ত্র ও পৃথক সংগঠন গড়ে তোলার ধারণা পোষণ করেনি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সঙ্ঘ স্পষ্টভাবে তার লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে— সমাজের কোনও একটি অংশকে নয়, বরং সমগ্র সমাজকেই একটি সংগঠিত সত্তায় রূপান্তরিত করা।

বর্তমান আরএসএস মুখপাত্র সুনীল আম্বেকর পর্যন্ত—

সঙ্ঘ হল নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক। সমাজে যে নানাবিধ বিষয়ে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, সেগুলিকে সমাধা করতে কতগুলি সংগঠন গড়ে তোলা হবে— তার কোনও সীমা নেই।

আসলে, সঙ্ঘ যখন নিজের সংগঠনিক পরিসরের লোকেদের উদ্দেশে লিখছে, তখন বারবারই দেখা যায়— তার অভ্যন্তরীণ সংগঠনগুলির মধ্যে কোনও স্পষ্ট ভেদরেখা টানা হচ্ছে না। কখনও Organiser-এর কোনও লেখায় পঞ্জাবের বিদ্যা ভারতী এবং তার রাজ্যভিত্তিক শাখা সর্বহিতকারী শিক্ষা সমিতি— দুটির নামই পরস্পরের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে; কখনও আবার হিন্দু স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (ইউকে)-র প্রকাশিত কোনও স্মারক সংখ্যায় সদস্যরা সঙ্ঘে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণা করছেন ন্যাশনাল হিন্দু স্টুডেন্টস ফোরাম-এ তাঁদের কাজের উল্লেখ করে। আবার, আরএসএস-এর প্রবীণ মতাদর্শিক রাকেশ সিনহা যখন দাবি করেন যে “ভারতের সবচেয়ে বড় স্কুল-চেনটি পরিচালনা করে বিদ্যা ভারতী যা আরএসএস-এরই অন্তর্ভুক্ত”, কিংবা সেবা সাধনা-র প্রকাশিত প্রকল্প-তালিকায় যখন সক্ষম, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বিদ্যা ভারতী, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, ভারত বিকাশ পরিষদ, রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি, এবিভিপি এবং দীনদয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউট— এই সমস্ত সংগঠনের প্রকল্প একসঙ্গে “রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ: সেবা বিভাগ” শিরোনামের অধীনে তালিকাভুক্ত করা হয়— তখন সেই অভেদ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

সমগ্র সঙ্ঘ নেটওয়ার্ককে যখন একটি একক সাংগঠনিক সত্তা হিসেবে ধরা হয়, তখন তাকে বোঝার নতুন নতুন পথ খুলে যায়। এই প্রকল্পে আমরা Contemporary South Asia-তে ২০২২ সালে প্রকাশিত আমার একটি প্রবন্ধে প্রস্তাবিত সংজ্ঞাটিকেই অনুসরণ করেছি। সেখানে সঙ্ঘকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এইভাবে— সঙ্ঘ হল এমন এক সত্তা, যা গঠিত হয়েছে সেই সমস্ত সাংগঠনিক পরিসর বা সাইটের মাধ্যমে, যেগুলির ভেতর দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় সঙ্ঘ নেতৃত্ব (executive) কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে: (ক) বিদ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ-চ্যানেলের সাহায্যে, এবং (খ) প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগ ছাড়াই। এই নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বাধ্য করেছে একটি নির্দিষ্ট, বস্তুগত ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের মানচিত্র আঁকতে— অর্থাৎ কেবলমাত্র হিন্দুত্বে বিশ্বাসী সংগঠনগুলির তালিকা বা মানচিত্র তৈরি করার বদলে সঙ্ঘের নিজস্ব একটি মানচিত্র নির্মাণ করতে।

উপরে যেমন বলা হয়েছে, কেবলমাত্র চরম-ডানপন্থী আদর্শের প্রকাশ্য অনুগত্যই এই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করা বা তাদের কার্যপ্রণালী বোঝার জন্য যথেষ্ট সূচক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেদ মন্দির কমপ্লেক্সের অধিকাংশ সংগঠনই হয়তো দৃশ্যমান চরম-ডানপন্থী আদর্শিক অবস্থানের নিরিখে নেওয়া কোনও ‘লিটমাস টেস্টে’ উত্তীর্ণ হবে না। তবু বাস্তবে তারা সকলেই একটি আরএসএস নেতৃত্বের কর্তৃত্বাধীন— স্বেচ্ছায়, এবং আমলাতন্ত্র ও সংগঠনের নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

যদি কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রকাশ্য বা ব্যক্তিগতভাবে ধারণ করা অতি-ডান রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্ভরযোগ্যভাবে তাদের অংশগ্রহণ বা কার্যক্রম চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের ফোকাস পরিবর্তন করতে হয়েছিল বস্তুনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে। আমরা মনোযোগ দিয়েছি মানবসম্পদ, ভৌত সম্পদ, অর্থায়ন এবং আমলাতন্ত্র-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর, যা মূলত সঙ্ঘের নিজস্ব নথিপত্র থেকে প্রাপ্ত। আরএসএস যে তিন ডজন সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেগুলি থেকে শুরু করে আমাদের দল এই সংগঠনগুলির ব্যাপক নথিপত্র— সাংগঠনিক নথিপত্র, আত্মজীবনী, ব্লগ ও সোশাল-মিডিয়া পোস্ট— পর্যালোচনা করে অতিরিক্ত সংগঠনগুলিকে শনাক্ত করেছে। আমাদের কাজ ছিল তর্কিত তথ্য, বোকা বানানো আত্মজীবনী এবং প্রায়শই সরাসরি মিথ্যা তথ্যের মধ্যে থেকে কার্যকর তথ্যের টুকরো খুঁজে বের করা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের সংগঠনের তালিকা তৈরি হয়েছে, যেগুলিকে সম্ভাব্য সঙ্ঘ-সংক্রান্ত সংগঠন হিসেবে ধরা হয়েছিল এবং তা শুধুমাত্র বহুমাত্রিক যাচাই করেই নিশ্চিত করা হয়েছিল— সঙ্ঘের উৎসগুলির তথ্য অ্যাকাডেমিক সাহিত্য, আর্থিক ফাইলিং, সরকারি নথি এবং অন্যান্য সঙ্ঘ-উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল। গবেষকরা প্রতিটি তথ্য সংগ্রহ করেছেন প্রকাশ্যে প্রাপ্ত উৎস থেকে, তবে সঙ্ঘের নিজস্ব উৎসকে আমাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাখা হয়েছে।

সম্ভাব্য সঙ্ঘ-সংশ্লিষ্ট সংগঠন থেকে নিশ্চিত সঙ্ঘ-পরিচালিত সংগঠন হিসেবে চিনে নেওয়ার জন্য আমরা একটি মানক পদ্ধতি তৈরি করেছি। উদ্দেশ্য ছিল সংগঠনকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন হিসেবে মূল্যায়ন না করা, বরং তা নির্ধারণ করা যে সেটি সঙ্ঘের সংযোগকারী তন্তুর সঙ্গে কতটা, কীভাবে এবং কোন পরিমাণে যুক্ত। আমরা সংগঠনের ঘোষণাপত্র বা কার্যক্রমের ওপর কম মনোযোগ দিয়েছি, এবং বেশি মনোযোগ দিয়েছি এই অস্বীকৃত সম্পর্কগুলিতে বিভিন্ন সংগঠনের একই কর্মকর্তা ও কর্মী, মিলিত অফিস, যৌথভাবে আয়োজিত অনুষ্ঠান এবং আর্থিক প্রবাহের দিকে— সেগুলোই সঙ্ঘ-নেটওয়ার্ককে সংজ্ঞায়িত করে।

উদাহরণস্বরূপ, যখন একজন গবেষক ফরিদাবাদের দোন্যি পোলো ছাত্রাবাস নিয়ে অনুসন্ধান চালালেন, তখন তাঁরা দেখলেন যে এর প্রাঙ্গণে গোলওয়ালকর ও হেডগেওয়ার-এর ছবি প্রদর্শিত রয়েছে, হোস্টেলের কক্ষগুলো সঙ্ঘের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের নামে নামকরণ করা হয়েছে, এবং পাশের খেলার মাঠে শাখার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া, এটি বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের মাধ্যমে পরিচালিত, হরিয়ানার সদর দপ্তর হিসেবে তালিকাভুক্ত অফিস থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে, এবং এটি বিভিন্ন আরএসএস ও ভিকেএ নেতাদের আতিথ্য দিয়েছে— এই সমস্ত তথ্যই সঙ্ঘের সঙ্গে এর গভীর সংযুক্তির অতিরিক্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।

একইভাবে, আমাদের একজন গবেষক মালয়েশিয়ার হিন্দু সেবাই সঙ্ঘম-কে সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হন কেবল তখনই, যখন তিনি সঙ্ঘমের প্রকাশনায় কার্যাবহ এবং সহ সঙ্ঘচালক-এর মতো সাংগঠনিক পদ লক্ষ করেন। একটি প্রায় সম্পূর্ণ তামিল সম্প্রদায়ের সংগঠনের মধ্যে এমন নাম অস্বাভাবিক। এই ছোট সূত্র থেকে গবেষক অনুসন্ধান বাড়ান এবং দেখেন তাদের সোশাল মিডিয়ায় আরএসএস-এর শাখার কায়দায় গোলওয়ালকরের উদ্ধৃতি এবং ছবি প্রকাশিত রয়েছে। আমরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাই, যে হিন্দু সেবাই সঙ্ঘম হল কেবল হিন্দু স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মালয়েশিয়ার অবতার।

ডঃ আবাজি ঠাট্টে সেবা ও অনুসন্ধান সংস্থা-টি আমাদের নজর আসে যখন আমরা লক্ষ করি গোলওয়ালকরের ব্যক্তিগত সহকারী-র নামে এটির নামকরণ করা হয়েছে। তারপর দেখলাম, এর সাধারণ সম্পাদক শৈলেশ জোগলেশকর একজন আরএসএস সদস্য, যিনি ভিএইচপি-র সঙ্গে যুক্ত, এবং একসময় বিদর্ভের বজরং দল-এর সভাপতি ছিলেন, পাশাপাশি তিনি সঙ্ঘ-নিয়ন্ত্রিত ভোঁসালা মিলিটারি স্কুল-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়করি এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস— দুইজনই সঙ্ঘ নেতা— এর অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন। ফলে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই সংস্থাকে সঙ্ঘের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সঙ্ঘের প্রকাশনাগুলির গভীর ও সমগ্রিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, আমাদের নেতৃত্ব-দল আরএসএস নেটওয়ার্ক সদস্যতার সাধারণ নিদর্শনের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিল। আমরা এই তালিকাকে আরও সুনির্দিষ্ট করি ভারতের শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও গ্রামীণ কর্মীদের সঙ্গে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পরামর্শ করে, যাঁরা আমাদেরকে তাঁদের কর্মজীবনে শনাক্ত করা বিভিন্ন প্রমাণের অংশগুলো বর্ণনা করেছিলেন, যেগুলো সঙ্ঘের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্তি নির্দেশ করে।

এ থেকে আমরা একটি ব্যাপক ও ওজনযুক্ত মাল্টিপ্লেক্সিটি ম্যাট্রিক্স তৈরি করি— একটি চেকলিস্ট, যাতে ৩৪ ধরনের বিভিন্ন তথ্যবিন্দু আছে, যা সঙ্ঘের সঙ্গে সংযোগের বিভিন্ন মাত্রা নির্দেশ করে। সঙ্ঘের সংগঠন নির্মাণের পদ্ধতি-র নিজস্ব স্বতন্ত্র ছাপ, আমলাতান্ত্রিক ভাষা এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এবং আমরা এই নির্দিষ্ট ও পুনরাবৃত্ত নিদর্শনগুলোকে একটানা মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও সংস্থা ঘোষণা করে যে এটি আরএসএস প্রচারকের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, সেই তথ্যবিন্দু ১ হিসেবে চিহ্নিত হবে। অন্যদিকে, আরএসএস প্রতিষ্ঠাতাদের মাল্যপ্রদান করা ছবির প্রদর্শন করা সংস্থা ০.৫ পাবে, এবং কোনও সংস্থা যদি কোনও সঙ্ঘ সংস্থার সহযোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়, তবে ০.২৫ পাবে। একটি সংস্থার সঞ্চিত স্কোর, সর্বোচ্চ ১ পর্যন্ত, তার সঙ্ঘের সঙ্গে সংযোগের শক্তি প্রকাশ করে— ১ মানে সঙ্ঘের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত, এবং ০.২৫ মানে প্রমাণ অনুযায়ী দুর্বলভাবে সংযুক্ত হিসেবে বিবেচিত।

 

আমাদের অনুসন্ধান আরএসএস-এর সঙ্গে সংযুক্ত ২৫০০টি সংস্থা চিহ্নিত করেছে। সঙ্ঘকে একটি কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত মডেলে সংগঠিত করা হয়েছে, যা একটি ঘনসন্নিবিষ্ট মূল কেন্দ্র এবং একটি পরিধিস্থ সংগঠন-সমূহের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য প্রকাশ করে, যাদের মধ্যে খুবই কম সংযোগ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, সঙ্ঘের কেন্দ্রীয় মূল অংশ হাই-প্রোফাইল সংস্থাগুলি, যেমন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP), ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP), বনবাসী কল্যাণ আশ্রম (VKA) এবং সেবা ভারতী, সঙ্গে কিছু বড় ফান্ডরেইজিং সংস্থা, যেমন IDRF এবং Support a Child USA, যেগুলো একসঙ্গে শত শত সংস্থাকে তহবিল প্রদানে ব্যবহৃত হয়— এই নিয়ে গঠিত।

আরএসএস-প্রোজেক্টের মানচিত্রের জুমড-ইন ভার্সনের স্ক্রিনশট। মানচিত্রটি দেখা যাবে এখানে

 

সঙ্ঘের নির্বাহী অংশের মধ্যে আরএসএস-এর নেতৃত্বের পাশাপাশি কিছু অ-আরএসএস সংস্থার নেতৃত্বও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

এই ম্যানেজেরিয়াল আরএসএস-এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেন প্রচারক, সঙ্ঘের নেটওয়ার্ক-সংগঠনে যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে জানা আছে। এই প্রচারকরা কেন্দ্রীয় আরএসএস মিশনে প্রশিক্ষিত হন এবং যোগ্যতা অর্জনের পরে নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ও সংহত করতে তাঁদের সঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়, প্রায়শই সংগঠন মন্ত্রী (সংগঠন সচিব) হিসেবে। এই কর্মকর্তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ, আদর্শগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শৃঙ্খলা থাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত সংস্থাগুলিতে কেন্দ্রীয় আরএসএসের পক্ষে নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। গুরুত্বপূর্ণভাবে, এর মধ্যে রয়েছে নতুন সংস্থা এবং সংস্থাগত শাখা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা, যা আমরা দেখেছি, প্রচারকরা ঠিক এই পদ্ধতিতে শত শত সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

২৮ এপ্রিল ২০২৪-এ নয়ডায় হনুমান জয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের মিছিল। ছবি: সুনীল ঘোষ, HT Photo

 

তবে এই কেন্দ্রীয় মূল অংশের বাইরের সঙ্ঘের স্তরগুলিই বিশেষভাবে আগ্রহোদ্দীপক। আরএসএস ও বিজেপির শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীবাহিনীই সঙ্ঘের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রকাশ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হলেও, শাসনক্ষমতা দখল বা পরিচালনাই সঙ্ঘের একমাত্র— বা এমনকি প্রধান— লক্ষ্য নয়। হাজার হাজার নিরীহ, প্রায় অচেনা সংস্থার উপস্থিতি সঙ্ঘের বিস্তৃত অগ্রাধিকারটিকেই চিহ্নিত করে— তা হল ভারতীয় সমাজের সামগ্রিক রূপান্তর, কেবল প্রশাসনিক শাসন নয়। এই সংস্থাগুলি ঠিক তাদের এই নিরীহ চেহারার কারণেই এবং সেই পথ ধরেই সঙ্ঘকে সমাজের নানা স্তরে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়, প্রায়শই একসঙ্গে— এবং পরস্পরবিরোধী ভঙ্গিতে— বিভিন্ন স্তরের শ্রোতার সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা দেয়। আমাদের গবেষণায় সঙ্ঘের এই বিস্তৃত সংস্থাজগৎকে একটি বৃহৎ শ্রেণিবিন্যাসে (typology) ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সঙ্ঘের সদস্যভিত্তিক ক্যাডার সংগঠন-গুলো হল সেই সব সংগঠন, যাদের জনতাকে পরিচালিত করার ক্ষমতা রয়েছে। চিরাচরিত ক্যাডার সংগঠনের সবকটি মূল বৈশিষ্ট্যই এই সংগঠনগুলির মধ্যে থাকে— শাখাভিত্তিক সংগঠন কাঠামো, আনুষ্ঠানিক ব্যুরোক্র্যাটিক স্তরবিন্যাস, কর্মীদের আদর্শগত আনুগত্য, প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া এবং বিশেষ সদস্যপদ। সঙ্ঘের অন্যান্য সংগঠনে কর্মী ও উপভোক্তা থাকলেও, এগুলো এমন সংগঠন যেখানে সদস্যরা সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমে ‘কাজ করিয়ে নেয়’। এর মধ্যে আরএসএস-এর ক্যাডার বাহিনী আছে— যাদের প্রকাশ্য শোভাযাত্রাগুলি সঙ্ঘ সম্পর্কে আমাদের দৃশ্যমান কল্পনাকে প্রভাবিত করে; রয়েছে এবিভিপি— যারা ছাত্রদের মিছিলের জন্য সংগঠিত করে; বিজেপি-র সদস্যসংগঠন— যারা নির্বাচনের জন্য জনসমর্থন গড়ে তোলে; বনবাসী কল্যাণ আশ্রম-এর সেই নিবেদিত কর্মীরা— যারা আদিবাসীদের ‘সংঘী’ করে তোলার কাজে নিযুক্ত; অথবা বজরং দল-এর কর্মীরা— যারা ক্ষুব্ধ তরুণদের উত্তেজক সমাবেশে সংগঠিত করে। সঙ্ঘের এই ক্যাডার সংগঠনগুলো সাধারণত আরএসএস-এর সরাসরি সাংগঠনিক উত্তরসূরি— মাঝখানে কোনও মধ্যবর্তী সংগঠন ছাড়াই এরা শক্তিশালী প্রচারক-নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং এগুলি প্রায় সবকটিই সঙ্ঘের প্রথম দফার সম্প্রসারণপর্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই ক্যাডার সংগঠনগুলো নিজেদের— এবং একইভাবে অনেকেই— সঙ্ঘের মূল কেন্দ্র বলে মনে করে, এবং সঙ্ঘের রাজনীতির পক্ষে গণমানুষের প্রকাশ্য সমর্থন দৃশ্যমান করতে এরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৭ নভেম্বর, ২০১৭-তে আরএসএস-স্বীকৃত ট্রেড ইউনিয়ন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘের প্রতিবাদ। ছবি: রবি চৌধরী, HT Photo

 

সমন্বয়কারী সংস্থা-গুলো ব্যুরোক্র্যাটিক শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে সঙ্ঘের কেন্দ্রীয় সংস্থা ও প্রান্তবর্তী সংস্থাগুলির মধ্যে তথ্য ও অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এই সংস্থাগুলির সাধারণত বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত সদস্য থাকে না; বরং, বেদ মন্দির কমিটির মতো, এখানে বিস্ময়করভাবে খুব অল্পসংখ্যক পেশাদার কর্মী কাজ করেন। সমন্বয়কারী সংস্থাগুলির “বাস্তব কাজ”-এর বড় অংশই প্রায়শ তাদের অধীনস্থ উপসংস্থাগুলি সম্পন্ন করে। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যা ভারতী বারো হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এক বিশাল শিক্ষাসেবা নেটওয়ার্কের দাবি করে। আমরা এই বিদ্যালয়গুলিরও মানচিত্র তৈরি করেছি, তবে অন্য সংস্থাগুলি যাতে আড়াল না হয়ে যায়, সেইজন্য এই ডেটাসেটের বাইরে রেখেছি। কিন্তু এই পরিষেবাগুলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজ্যস্তরের সংস্থাগুলির হাতে ন্যস্ত থাকে— যেমন মধ্যপ্রদেশে সরস্বতী শিক্ষা পরিষদ, জম্মুতে ভারতীয় শিক্ষা সমিতি, অথবা উত্তরপ্রদেশে ভারতীয় শ্রীবিদ্যা পরিষদ

বিপুল সংখ্যক অধীনস্থ সংস্থা প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রয়োজন, তার ফলে সমন্বয়কারী সংস্থাগুলি সাধারণত সঙ্ঘের অপেক্ষাকৃত পুরনো সংস্থা এবং সেই কারণেই এগুলিকে সম্মানীয় সংস্থা হিসেবে ধরা হয়। এই সম্মান, এবং মূল কেন্দ্র ও প্রান্তিক স্তরের মধ্যে সেতুবন্ধনের দ্বাররক্ষী হিসেবে তাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কারণে, অন্যান্য সংস্থার তুলনায় এখানে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নির্বাহীর উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। কারণ এই মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলিই সেই স্থান, যার মধ্যে দিয়েই সমস্ত যোগাযোগ ও সম্পদের যাতায়াত ঘটে। এই নেটওয়ার্কে গড়ে প্রতিটি সংস্থা ও আরএসএস-এর মধ্যে অন্তত একটি সংস্থা থাকে। এর সঙ্গে যদি যোগ করি যে সঙ্ঘের প্রায় অর্ধেক সংস্থা মাত্র একটি সংযোগসূত্রে যুক্ত, তবে এই মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেবা ভারতী, IDRF, VHP, হিন্দু সেবা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি মধ্যস্থতাকারী সংস্থা যদি না থাকত, তবে সঙ্ঘের অর্ধেকেরও বেশি সংস্থা সম্পূর্ণভাবে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত।

একই সঙ্গে, এই সংস্থাগুলিই সঙ্ঘের কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে প্রকাশ্যে স্বীকৃত সম্পর্কের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। এরা যে সাংগঠনিক সমন্বয় ঘটায়, তা-ই আরএসএস-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার বা অস্বীকার করার কৌশলগত অস্পষ্টতা তৈরি করে। এই ধরনের অন্যান্য সংস্থার মধ্যে রয়েছে বেঙ্গালুরু-স্থিত ভারতমাতা গুরুকুল আশ্রম ট্রাস্ট, মধ্যপ্রদেশের পদ্ম কেশব ট্রাস্ট, এবং দিল্লি-স্থিত ডঃ মুখার্জি স্ম্রুতি ন্যাস

ক্যাম্পেন সংগঠন-গুলি সাধারণত এককালীন ব্যবহারের জন্য তৈরি— কোনও নির্দিষ্ট আন্দোলন, নীতিগত পরিবর্তন বা ইস্যুকে ঘিরে। কাজ শেষ হলে এগুলি অনেক সময় পরিত্যক্তও হয়। এর উদাহরণ হিসেবে রয়েছে দেশভাগ-পরবর্তী শরণার্থী সহায়তার জন্য গঠিত পাঞ্জাব রিলিফ কমিটিবাস্তুহারা সহায়তা সমিতি; প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সংগঠন যেমন মোরভি রিলিফ কমিটি; মন্দির আন্দোলনের জন্য রামজন্মভূমি ন্যাস; অথবা আদিবাসীদের মধ্যে খ্রিস্টান-বিরোধী প্রচার-সংগঠন জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ। সম্প্রতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘ এমনকি আম্বেদকর-ফুলে নেটওয়ার্ক অব আমেরিকান দলিত অ্যান্ড বহুজনস নামে একটি সংগঠনও গড়ে তুলেছে— ক্যালিফোর্নিয়ায় জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধে প্রস্তাবিত আইনগুলির বিরোধিতা করার স্পষ্ট উদ্দেশ্যে।

একই সঙ্গে, এই সংগঠনগুলো আরএসএস-এর ভেতরে সংগ্রামের মিথ নির্মাণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। মানবজাতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশকে শাসন করে এমন একটি সরকারের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও, সঙ্ঘ হিন্দু নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় হয়রানির বয়ান থেকে বিপুল মানসিক ও রাজনৈতিক রসদ আহরণ করে। এই প্রেক্ষিতে, ন্যায্য আন্দোলনের ছবি, অথবা যখন আর কেউ এগিয়ে আসেনি তখন সেবা দেওয়ার কাহিনি, সঙ্ঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করে।

ফ্রন্ট সংগঠন শব্দটি আমরা এখানে প্রচলিত অর্থের চেয়ে আরও নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করছি। আমাদের ক্ষেত্রে এর অর্থ— এমন সংগঠন, যেগুলো বস্তুগতভাবে অভিন্ন— একই অর্থায়ন, একই কার্যক্রম, একই সাংগঠনিক কাঠামো, একই কর্তৃত্বপ্রবাহ ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও— ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন নামে পরিচালিত হয়, অনুলিপি ও বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল হিসেবে। এই সংজ্ঞা সঙ্ঘের কিছু সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে সবগুলোর ক্ষেত্রে নয়।

উদাহরণস্বরূপ, সেবা ভারতী সারা ভারতজুড়ে কাজ করে, কিন্তু তার রাজ্যভিত্তিক শাখাগুলো প্রায়শই ভিন্ন নাম ও আলাদা আইনি পরিচয়ে পরিচালিত হয়। ওড়িশায় এটি উৎকল বিপন্ন সহায়তা সমিতি, মহারাষ্ট্রে জনকল্যাণ সমিতি, ত্রিপুরায় বিবেকানন্দ সেবা ন্যাস, এবং উত্তরাখণ্ডে উত্তরাঞ্চল উথানা পরিষদ নামে কাজ করে। একইভাবে, বিদ্যা ভারতী জাতীয় স্তরে সক্রিয় হলেও, ঝাড়খণ্ডে তা বনাঞ্চল শিক্ষা সমিতি, তামিলনাড়ুতে বিবেকানন্দ কেন্দ্র, দিল্লিতে সমর্থ শিক্ষা সমিতি, এবং পাঞ্জাবে সর্বহিতকারী শিক্ষা সমিতি নামে পরিচিত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভ্যন্তরীণ প্রকাশনা ও আলোচনায় প্রায়শই মূল সংগঠন ও ফ্রন্ট সংগঠনের মধ্যেকার এই ভেদরেখা মুছে যায়।

আমরা আরও কিছু গোপন সংস্থার সন্ধান পেয়েছি। অনেকেই সঙ্ঘ বলতে মূলত এই ধরনের সংস্থাকেই বোঝেন, কারণ সঙ্ঘের সঙ্গে যে চমকপ্রদ সহিংসতার চিত্র জড়িয়ে আছে, তাতে এদের ভূমিকা রয়েছে। গোপন সংস্থা শুধু সঙ্ঘের সঙ্গে তাদের সম্পর্কই লুকিয়ে রাখে না, অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের অস্তিত্ব বা কার্যকলাপও আড়াল করে। এই গোপনীয়তার প্রধান কারণ হল— এদের অনেক কর্মকাণ্ড অবৈধ বা সুনামহানিকর, যা প্রকাশ্যে এলে বৃহত্তর সঙ্ঘের ক্ষতি করতে পারে।

সিএএ-র সমর্থনে আমেদাবাদে এবিভিপি-র মিছিল, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ছবি: স্যাম পান্থাকি, এএফপি, গেটি ইমেজেস

 

সঙ্ঘের একটি লক্ষ্য হল হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পূরণে শক্তিশালী, পুরুষালি ও আক্রমণাত্মক সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে কিছু ধরনের উগ্র সংগঠন ভোটের জন্য কার্যকর হলেও, এগুলির সঙ্গে বড় ধরনের সুনামগত ঝুঁকিও জড়িয়ে থাকে। তাই সঙ্ঘের গোপন সংগঠনগুলির সাধারণত খুব কম দৃশ্যমান নেটওয়ার্ক সংযোগ থাকে এবং এদের সম্পর্কে তথ্যও অল্পই পাওয়া যায়। হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, বিজেপি নেতা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নানা “সেনা”, এবং অতীতের হিন্দু ধর্ম রক্ষা সমিতিরাষ্ট্রীয় উৎসব মণ্ডল— এরা সবাই এই ধরনের গোপন সংগঠনের উদাহরণ।

এদিকে, সঙ্ঘ তার ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের এবং আরও মানুষকে সমাজ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির দিকে আকৃষ্ট করার জন্য এক ধরনের কৌশলগত সঙ্কেতব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সত্তরের দশকের শেষের পর সঙ্ঘ শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, সমাজের কিছু অংশকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় তারা এক নতুন ধরনের সংগঠন সৃষ্টি করে— যাকে বলা যেতে পারে প্রদর্শনমূলক বা শো-পিস সংগঠন

শো-পিস সংগঠনগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল— তাদের অস্তিত্বের মাধ্যমেই সঙ্ঘ সম্পর্কে একটি বক্তব্য হাজির করা। এগুলো সাধারণত খুব প্রকাশ্য হলেও সাংগঠনিকভাবে দ্বিমাত্রিক। সঙ্ঘের জাতিবাদী, সাম্প্রদায়িক ও হিন্দু আধিপত্যবাদী চরিত্র নিয়ে ওঠা অভিযোগকে খণ্ডন করা বা ঘুরিয়ে দেওয়াই এদের লক্ষ্য, এবং সেই সঙ্গে আরও মানুষকে সঙ্ঘের পরিসরে টেনে আনা। ১৯৮১ সালে মীনাক্ষীপুরমে দলিতদের গণহারে ইসলাম গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয় সামাজিক সমরাস্তা মঞ্চ। ১৯৮৪-র ভয়াবহ শিখ-বিরোধী সহিংসতার পরে, হিন্দুত্ব ও শিখ ধর্মের তথাকথিত সামঞ্জস্য দেখানোর জন্য ১৯৮৬ সালে গঠিত হয় রাষ্ট্রীয় শিখ সঙ্গৎ। আবার ২০০২ সালের গুজরাতের মুসলিম-বিরোধী গণহত্যার কয়েক মাসের মধ্যেই মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ গড়ে তোলা হয়— সঙ্ঘ যে মুসলিম-বিদ্বেষী নয়, সেই ভাবমূর্তি নির্মাণের একটি রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট টুল হিসেবে।

নেটওয়ার্কে এদের অবস্থান সাধারণত টার্মিনাস-প্রকৃতির— অর্থাৎ, অন্যান্য সঙ্ঘ সংগঠনের মতো এরা শাখা-প্রশাখা ছড়ায় না। সাধারণত এরা আরএসএস-এর সরাসরি সন্তান সংগঠন, প্রচারকদের শক্ত উপস্থিতি থাকে। সঙ্ঘের বড়সড় মোবিলাইজেশন কৌশলের কেন্দ্র এরা নয়। উদাহরণস্বরূপ, দুই দশকেরও বেশি আগে প্রতিষ্ঠিত এমআরএম-ই যদি সঙ্ঘের মুসলিম সম্পৃক্ততার শেষ বিন্দু হয়, তবে সেই অগ্রাধিকার সম্পর্কে তা অনেক কিছু বলে।

আমরা আরও একটি ধরনের প্রশিক্ষণমূলক সংস্থা চিহ্নিত করেছি। এক শতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই, সঙ্ঘ যেটিকে বারবার প্রকাশ্যে তার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বলে দাবি করে এসেছে, সেই লক্ষ্যটি হল মানুষ গঠন (man-making)। এই মানুষ গঠন বলতে বোঝানো হয়— মানুষের দেহ, মানসিকতা, বিশ্বাস ও পরিচয়কে এমনভাবে নির্মাণ করা, যাতে তারা হিন্দু রাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিকে পরিণত হয়। শাখা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মানুষ গঠনের কথা বহুবার আলোচিত হয়েছে, কিন্তু এই কাজটি শুধু আরএসএস-ই করে— এমন নয়। সঙ্ঘের আরও বহু সংগঠন এই মিশনে যুক্ত।

সঙ্ঘ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণমূলক সংস্থায় বিনিয়োগ করেছে, যেগুলোকে দেখা হয় এমন এক-একটি যন্ত্র হিসেবে, যা সঙ্ঘের বাইরের মানুষকে সঙ্ঘ বিস্তারের উপকরণে রূপান্তরিত করে। রামভাউ মালগি প্রবোধিনী প্রশিক্ষণ দিয়ে রাজনৈতিক নেতা তৈরি করে। সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটি সংঘী সৈনিক উৎপাদন করে— এই প্রত্যাশায় যে ভবিষ্যতে তারাই একদিন সংঘী জেনারেল হবে। আর স্বামী বিবেকানন্দ যোগ অনুসন্ধান সংস্থান (SVYASA) এক বিস্তৃত উৎপাদন-রেখার মতো কাজ করে, যেখান থেকে নিয়মিতভাবে যোগশিক্ষক তৈরি হয়— যারা সারা পৃথিবীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী যোগচর্চার সফট পাওয়ার ছড়িয়ে দিতে পারে।

এই প্রশিক্ষণ সংগঠনগুলির পাশে রয়েছে জ্ঞান উৎপাদন সংগঠন, যারা এমন বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে সঙ্ঘের অন্য সংগঠনগুলির কার্যকলাপ ন্যায্যতা পায়। জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতি বিষয়ে কাজ করা সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে— ফোরাম ফর ইন্টিগ্রেটেড ন্যাশনাল সিকিউরিটি, ফোরাম ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ, জম্মু কাশ্মির স্টাডি সেন্টারবিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনদ্য কারাভান–এর প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, কাশ্মিরে সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে এই ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবনাগুলিই পরবর্তীতে সেখানে সরকারি দমননীতির যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই ক্যাটেগরির মধ্যে, আমরা সঙ্ঘের গবেষণামূলক কার্যক্রমকে এর বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, নীতি প্রতিষ্ঠান এবং ভারতীয় জ্ঞান কেন্দ্রের ইকোসিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে পেরেছি। উদাহরণস্বরূপ, দীনদয়াল শোধ সংস্থা এবং সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজ অর্থনৈতিক এবং বিশেষত গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ে কাজ করে; ভারতীয় বিচার কেন্দ্রম এবং বিশ্ব অধ্যয়ন কেন্দ্র সভ্যতার কৃতিত্ব বিষয়ে মনোনিবেশ করে। এছাড়াও লিঙ্গ বিষয়ক গবেষণায় দৃষ্টি স্ত্রী অধ্যয়ন প্রবোধন কেন্দ্র; শিক্ষাক্ষেত্রে সম্বিত রিসার্চ ফাউন্ডেশন কার্যক্রম চালায়; এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কালচারাল স্টাডিজ আদিবাসী বিষয়ক গবেষণায় কাজ করে। সঙ্ঘ সম্পর্কে যে ধারণাগুলি রয়েছে— যেমন, হিন্দু জাতীয়তাদাবাদী শিবিরে বুদ্ধিজীবীদের অভাব, ভারতের শাসনব্যবস্থার বিষয়ে তাদের কোনও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নেই, তারা কেবল বেদম জনমৈথুনকারীদের একটা শিবির-বিশেষ— এই বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যক্রম সেই ধারণাগুলির বিরুদ্ধে সঙ্ঘের একটা প্রতিক্রিয়াশীল বিকাশ প্রতিফলিত করে। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির বাড়বাড়ন্ত ১৯৯০ দশকের শেষ এবং ২০০০ দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ছিল না। ঠিক তখন থেকেই এগুলি গড়ে ওঠা শুরু করে যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্ররোচিত করার জন্য আক্রমণের মুখোমুখি হচ্ছিল।

শেষত, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সঙ্ঘের মধ্যে অনেকগুলি সংগঠন লাস্ট-মাইল অর্গানাইজেশন হিসেবে কাজ করে— ছোটখাটো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যা সঙ্ঘ ও অ-সংঘী জনসাধারণের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। এগুলো হল ছোট চক্ষু ক্লিনিক, রক্তদান কেন্দ্র, গ্রামের স্কুল, অনাথাশ্রম এবং কুষ্ঠরোগী ক্লিনিক, যেগুলো সেই সব সম্প্রদায়কে সেবা প্রদান করে যাদের কাছে সঙ্ঘ পৌঁছাতে চায়। এই সংগঠনগুলোর পরিসর ও বিস্তার, কমিউনিটির মধ্যে তাদের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রায়শই অপরিহার্য সেবা প্রদান করার কারণে এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে সঙ্ঘ বিস্তৃত এলাকায় থাকা মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সংযোগ রাখতে সক্ষম।

এই সংগঠনগুলি মূলত আরএসএস নেটওয়ার্কের কাঠামোর পরিধি অংশে অবস্থান করে। এদের বেশিরভাগই সঙ্ঘ নেটওয়ার্কের একটি শেষ বিন্দু হিসেবে কাজ করে, যা কেবল একটিমাত্র সমন্বয়কারী সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং অন্যান্য সমগোত্রীয় পরিধি সংগঠনের সঙ্গে আনুভূমিকভাবে খুব কম যোগাযোগ রাখে বা কোনও সংযোগই রাখে না। এই সংগঠনগুলি সঙ্ঘের শক্তিশালী সামাজিক পরিমণ্ডলে কাজ করে না এবং প্রায়শই হিন্দুত্ববাদী আদর্শকে কম গুরুত্ব দেয়, নতুন সমর্থকদের জন্য একটি অ-ভীতিপ্রদ, বিতর্কমুক্ত প্রবেশদ্বার হিসেবে উপস্থিত হয়। গ্রামীণ স্তরে সেবা প্রদানের এই মনোযোগ সঙ্ঘের নিজস্ব চিন্তা এবং নিজেদের তারা কীভাবে দেখাতে চায় তার সঙ্গে মৌলিকভাবে সম্পর্কিত, এবং একই সঙ্গে প্রচারণা এবং মানসিক অভিযোজনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এছাড়া, অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এগুলোই প্রবাসী সঙ্ঘের পক্ষ থেকে দানকৃত প্রচুর তহবিল প্রবাহের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।

 

আমাদের দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এই গবেষণা ভবিষ্যতে নানা নতুন গবেষণা ও অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার পথ খুলে দেবে— যেমন, সঙ্ঘ কীভাবে অর্থ ও সম্পদ স্থানান্তর করে তার অনুসন্ধান; সঙ্ঘের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত অগ্রাধিকারগুলির (ধরা যাক, শতাধিক আবাসিক বিদ্যালয় ও হোস্টেলের নেটওয়ার্ক) নতুনভাবে অনুধাবন; এমনকি সঙ্ঘের ভেতরে দীর্ঘদিন আড়ালে রাখা নানা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কল্পনা ও উন্মোচনের এক নতুন পদ্ধতিও। সঙ্ঘ নিয়ে যাঁরা অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে আগ্রহী, তাঁদের সামনে থাকা এই সব প্রশ্নের— এবং আরও বহু প্রশ্নের— উত্তর খোঁজার পূর্বশর্ত হল, সঙ্ঘ আসলে কী, তার একটি স্পষ্ট বোঝাপড়া। আমরা আশা করি, এই ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক রোডম্যাপ তুলে ধরতে পেরেছি।

তবে আমাদের বিশ্বাস, এই প্রকল্পের আরেকটি মুখ্য অবদান কেবল অভিজ্ঞতাভিত্তিক নয়, বরং ধারণাগত। কয়েক দশক ধরে সঙ্ঘকে বোঝার ক্ষেত্রে দুটি সমান্তরাল ব্যাখ্যা সহাবস্থান করে এসেছে। প্রথমটি সঙ্ঘের বিভিন্ন উপাদানকে অস্পষ্ট ও ঢিলেঢালাভাবে সংযুক্ত বলে দেখে— যেখানে কেবল একটি অভিন্ন আদর্শিক লক্ষ্যই তাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছে, এবং যেখানে আরএসএস নিজেকে সীমিত রেখেছে একধরনের ‘অনুপ্রেরণা’ জোগানোর ভূমিকায়, যাতে একের পর এক নিবেদিত স্বয়ংসেবক ও সংগঠন তৈরি হয়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি, তার বিপরীতে, সঙ্ঘকে এমন একটি কাঠামো হিসেবে দেখে, যা দৃশ্যমান আদর্শগত একরূপতার চেয়ে বেশি গঠিত হয়েছে একটি সাংগঠনিক ব্যুরোক্রেসির মাধ্যমে— যেখানে ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ই অন্যতম প্রধান কাজ। এই দ্বিতীয় ধারণায়, সঙ্ঘ ইচ্ছাকৃতভাবেই বিভিন্ন শ্রোতা বা গোষ্ঠীর কাছে ভিন্ন ভিন্ন মুখ হাজির করতে পারে, কিন্তু সে একই সঙ্গে জানে যে এই সব অবতারই একই মাদারশিপ থেকে উদ্ভূত; এই বিভিন্ন রূপকে সে একই একক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং তা নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আরএসএস নিজেই এই দু-ধরনের উপলব্ধিকেই ইন্ধন দেয়। যেটা ধরার, সেটা হল, একটা ফ্রেমওয়ার্ককে বারংবার জনগণের সামনে হাজির করা হয়, আর একটাকে অভ্যন্তরীণ লোকজনের জন্য লুক্কায়িত রাখা হয়। আজ সঙ্ঘ নিজের অস্তিত্বের একশো বছর পূর্ণ করছে— ফলে জনগণের অধিকার রয়েছে তাদের প্রকাশ্য প্রকাশনার বাইরে গিয়েও তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে সঠিক খবরগুলি জানার, এবং সেই জানাবোঝার ভিত্তিতে নিজেদের পছন্দ ঠিক করার।


[1] Singh, Amrita. The RSS does not exist. The Caravan. Jul 1, 2025.
[2] Pal, Felix, Organizational Diffusion: What India Tells Us about How the Far Right Wins. Sage Journals. Oct 30, 2024.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5313 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...