হাসি

সোহম দাস

 

আগেকার প্রজন্মের অভ্যেস-কায়দাগুলো এ-প্রজন্মের পক্ষে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া বেশ মুশকিলের। রোজকার অনুশীলন না থাকলে আর পাঁচটা জিনিসের মতো ও জিনিসটাও ঠিক রপ্ত হয় না। মূল জায়গাতেই যখন এত বদল এসে গিয়েছে, তাতে আর পুরনো অভ্যেসগুলোর দিকে ফিরে কে চায়! হঠাৎ কোনও একদিন সাহস করে যদিও বা খানিক চেষ্টা করার ইচ্ছে জাগে, পদে পদে ব্যর্থতার ঠোক্করে সে ইচ্ছেটা দমিয়ে ফেলে নিজেদের খোপে-খোলসেই ফিরে আসতে হয়। কী দরকার বাপু? বাপ-জ্যাঠাদের নকল করতে গিয়ে খামোখা জরুরি জিনিস খোয়ানোর মধ্যে এমন কিছু বাহাদুরি তো নেই।

এখন, এই ভরভরন্ত দুপুরবেলায় বাস থেকে নামতে গিয়ে এত তত্ত্বকথা স্বর্ণেন্দুর মাথায় কেন এল? সে তো যাচ্ছে অন্য একটা কাজে। আর সে কাজের আগে এমনধারা তত্ত্ব নিয়ে না ভাবাটাই স্ট্যান্ডার্ড। অবশ্য যেটা সাধারণ লোকের ক্ষেত্রে খাটে, পাঠকপ্রিয় কলামনিস্ট, কিবোর্ডচি ব্লগার স্বর্ণেন্দু গুণের ক্ষেত্রে তেমনটা কেন খাটবে! নয়-নয় করে… যাকগে, স্বর্ণেন্দুর খ্যাতি-পরিচয়টা পরে দিলেও চলবে, আপাতত মুহূর্তে বন্দি থাকা ভালো।

ব্যাপারটা আর কিছুই না। ভিড় সরিয়ে নামতে গিয়ে পকেটে গোঁজা লাল-সাদা পেনটা কখন পড়ে গিয়েছিল, স্বর্ণেন্দু সেটা বুঝতে পারেনি। অভ্যেসে না থাকলে যা হয়। গেটে পাদানিতে দাঁড়ানো সবুজ গেঞ্জি পরা ছেলেটাকে ভালো বলতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করিয়ে দিয়েছে। যদিও দোদুল্যমান বাসে আশেপাশের নিতম্বের ভিড় সরিয়ে ঝুঁকে পড়ে পেনটা কুড়িয়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। স্টপেজে নেমে পড়তে হল।

তবে আজকে তার কপালখানা চওড়াই বলতে হবে, স্টপেজে নেমে বাসের ভাড়া মেটাচ্ছে যখন (হাসপাতালের স্টপেজ বলে প্রায় সিকিভাগ লোক হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়েছে), সবুজ গেঞ্জির সঙ্গে আরও একজনের বদান্যতায় পেনটা অবশেষে তার কাছে এসে পৌঁছল। সাদা অংশটায় খানিক ধুলো লাগা ছাড়া পেনটার বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। টিকিটটা বুকপকেটে পুরে বাসের দিকে একটা থাম্বস আপ দেখিয়ে দিল স্বর্ণেন্দু, অভ্যাসবশেই, জোড়া উপকারী তাকে দেখতে পাবে ভেবে। কিন্তু ততক্ষণে বাসের ভিতর দিকে ফাঁকা হতেই কন্ডাক্টর গেটের সামনের লোকগুলোকে হুড়ো দিয়ে পিছন দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে, কাজেই উপকারীজোড়া স্বর্ণেন্দুর এই স্বীকৃতিদান থেকে আপাতত বঞ্চিতই রইলেন।

বাসটা ছেড়ে গেল, স্বর্ণেন্দু পেনটা হাতে ধরেই হাসপাতালের রাস্তায় হাঁটা লাগাল। তার কাছে-দূরে বাসের কয়েকজন সহযাত্রীও আছে। কারও হাঁটার গতি দ্রুত, কারও ঢিমে তাল। ওরা সবাই হাসপাতালে ঢুকে যে যার মতো হারিয়ে যাবে, কেউ প্রিয়জনের খোঁজখবর নিতে, কেউ চেক-আপে, কেউ বা অন্য ধান্দায়। আর স্বর্ণেন্দু যাবে বডি ছাড়াতে। এই মুহূর্তে কেউই কারও সঙ্গে কথা বলার গরজ দেখাবে না।

হাসপাতালে ঢোকার মুখে স্বর্ণেন্দুর খেয়াল হল, পেনটা তখনও হাতে ধরা। বুকপকেটে বাসের টিকিটটা দিব্যি সেঁধিয়ে গেছে, নেহাৎ বড়সড় ঝড়ঝঞ্ঝা না হলে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, কিন্তু পেনের রকমসকম তেমন নয়। ঝোলাব্যাগে রাখাটাই কম রিস্কি। পেনটা আজ বিশেষ দরকার। বডি ছাড়ানোর ব্যাপার কিনা।

—আরে বললাম তো, সোজা গিয়ে ডানদিকে ঘুরে আবার বাঁদিক, দেখবেন আপনি ট্রমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

কথাটা অবশ্য স্বর্ণেন্দুকে নয়, অন্য আরেক বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে বলছিল হেল্পডেস্কের লোকটি। স্বর্ণেন্দুরও ওখানেই যাওয়ার আছে। জিজ্ঞাসা করার শক্তি আর সময়টুকু ক্ষয় না করেই দিব্যি যে দরকারি কথাটা জানা হয়ে গেল, তাতে সুবিধাই হল।

তার চেয়েও মস্ত লাভ হল যেটা, এই ফাঁকে একখানা নোট মাথায় বসে গেল।

এই নোটের ব্যাপারটা কিছুটা তার খেয়াল, কিছুটা কাজেরও প্রয়োজন। ভাবনা বেচে তার ব্যাঙ্কব্যালেন্স বাড়ে। চলতে-ফিরতে ভাবে, হাগতে বসে ভাবে, হাফ-ন্যাড়া গাছের নতুন পাতা নড়তে দেখলে ভাবে। টুকিটাকি কথা মাথায় নোট করে। ইউনিভার্সিটির সামনের ফুটপাথে যতীনদা রবীন্দ্র শতায়ন সঙ্কলনটা উল্টোদিক থেকে দেখে রবীন্দ্র শয়তান বলে ফেলেছিল— সেটা শুনে স্বর্ণেন্দুর হেব্বি লেগেছিল, সঙ্গে সঙ্গে নোট করেছে। সেবার প্রেসক্লাবে সুকুলদার বইপ্রকাশের পর চারটি গেলাস-সেবনের সময়ে কলেজ স্ট্রিটের উঠতি প্রকাশনীর মালিকের বউ সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে তার বরটিকে এক-টেবিল লোকের সামনে কাঁচা খিস্তি দিয়ে বলেছিল, মাগো, তোর ওটা পেট না ইন্ডিয়া গেট? সেটাও স্বর্ণেন্দু সেই মুহূর্তেই নোট করে নিয়েছে। এসব নোট রাখলে লেখালেখির সময়ে গোঁজাগুঁজি নিয়ে ভাবতে হয় না।

এমারজেন্সি, পেডিয়াট্রিক, রেডিওলজি, নিউরোসায়েন্স বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে গেলে ট্রমা কেয়ার। ব্যস্তসমস্ত আকুতি, ছাত্র আর ডাক্তার ইউনিয়নের দেওয়াল-লিখন পেরিয়ে, আরও দু-চারজনকে জিজ্ঞাসা করে-টরে যখন সে সেখানে পৌঁছল, অর্থাৎ, সত্যিই যখন ছ-তলা চেহারা নিয়ে তার সামনে ট্রমা এসে দাঁড়িয়েছে, সেই মুহূর্তে আজকের দিনটার কর্তব্য সম্পর্কে খানিক দিশেহারা লাগল তাকে। এতক্ষণ নিজের একটা গোলগাল, কাচস্বচ্ছ জগতে দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল। মিনিট পঁয়তাল্লিশের বাসজার্নি, পেন-পর্ব, রাস্তার খবর মিলিয়ে মোটামুটি দিব্যিই ছিল সে। এখন আর তেমনটা চলবে না। এখন অতলের ভাবনা ছেড়ে ভূতল-প্রয়োজনীয় বাস্তববুদ্ধি আর দৌড়ঝাঁপের ডবল ইঞ্জিন দরকার।

ওরই মধ্যে র‍্যাম্পের রেলিংয়ে ঠেস দেওয়া লাল শাড়ির মহিলাটি আছাড়িপিছাড়ি কান্না জুড়েছেন। ফোন কানে। ফোনের ওপারেও যে কোনও মহিলাই রয়েছেন, তা বেশ বোঝা গেল।

—আমার বাচ্চাটাকে কী সুন্দর দেখতে ছিল, দিদি! আমি আর চিনতে পারছি না। এমন ধাক্কা মেরেছে, একটা চোখ, হাত, পা, কোমর, কিচ্ছু কাজ করছে না আর…

এ দৃশ্যটা দেখে স্বর্ণেন্দু আরেকটু দিশেহারা হতে পারত, কিন্তু হল না। সরকারি হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারের গ্রাউন্ড ফ্লোরে এমন হা-হুতাশ না থাকলে কি মানায়! বস্তুত, এর চেয়েও অসহ্য অবস্থায় পড়তে হতে পারে, এমনটা ভেবে নিলে বরং মানিয়ে নেওয়াটা সহজ হয়ে যায়।

তার দিশেহারা ভাবটা সম্পূর্ণ অন্য কারণে।

সে এখানে এসেছে একটা বডি ছাড়াতে। বডিটা যার, সে যেটুকু সময়ের জন্য মাঠেঘাটে ভরপুর জীবন্ত ছিল, সেটুকু সময়ের মধ্যে তাকে দেখার অবকাশ বা ইচ্ছে, কোনওটাই তেমন স্বর্ণেন্দুর হয়নি। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এই মুহূর্তে এখানে যারা আছে, মানে ওর বাড়ি-বস্তির লোকজন, তাদেরও প্রায় কাউকেই স্বর্ণেন্দু চেনে না। তাদের মরণশীল ঘরে গিয়ে কখনও দু-দণ্ড বসে জানতে চায়নি বর্ষা হলে তেরপলের ফুটো দিয়ে জল-টল পড়ে এলোমেলো সংসার ভিজিয়ে দেয় কিনা, ভোটার তালিকায় বাপ-ঠাকুর্দার নামগন্ধ আছে কিনা, এসআইআরে নাম ঘ্যাচাং ফুঃ হয়ে গেলেই বা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

রিমি যায়। প্রায়ই যায়। ওদের অনেকগুলো করে আন্ডাবাচ্চা হয়, মাঝেসাঝে দু-একজন মরেও যায়। রাস্তার ধারে বস্তি। অ্যাক্সিডেন্টের সঙ্গেই ঘর-বসত, মরে যাওয়াটা এমন কিছু কঠিন নয়। বর্ষা-বাদলার দিনে ভেতর-বার সব নরক হয়ে থাকে। নোংরা জল খেয়েও কতজন টপাটপ মরেছে এত বছরে, তারই কি হিসাব আছে কোনও? এই সেদিন অবধিও ওদের পাকাপাকি থাকার জায়গা বলতে কিচ্ছু ছিল না। কোথা থেকে ওরা এসে পড়েছিল, তাও সহজে বার করা মুশকিল। এদিক-সেদিক ঘুরে, পুলিশের তাড়া খেতে খেতে এই বছর কয়েক হল, টিউব কারখানার পিছনের ফালি জমিটুকুতে খানিক গুছিয়ে বসতে পেরেছে। এখান থেকেও বারতিনেক খেদাবার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু রাস্তা আগলে রেখে রোখা গিয়েছে। সাধুগিরি, ভাগ্যগণনা, সাপের খেলা-টেলা দেখিয়ে চলত, এখন সেসব বুজরুকিতে লাগাম টানা গিয়েছে। এখন আর কেউ সাপের খেলা দেখায় না, দু-একজন বাদ দিয়ে কারও ঘরেই আর বাক্সবন্দি সাপের ঝিমুনি নেই। কেউ কেউ ছোটখাটো দোকানে কাজ নিয়েছে, কাউকে মজুরের কাজে লাগানো হয়েছে। ওরা নাকি ইদানীং ছাগল-টাগল পালছে, মুরগি পুষছে। ছাগলের দুধ, মুরগির ডিম বিক্রিবাটাও হচ্ছে। বাচ্চাগুলো কোত্থেকে একখানা শেয়ালছানাও ধরে এনেছে, সেটাকে নাকি ট্রেনিংও দেওয়া হচ্ছে, যাতে খানিক ধেড়ে হয়েই ছাগলছানা বা মুরগিছানার ঘাড় মটকাতে না যায়। এসব ওই রিমির থেকেই টুকরো টুকরো শোনা। কিন্তু তা দিয়ে বড়জোর একটা কোলাজ-ছবি বানানো যায়, তাকে কি আর জানা বলে?

রিমি একটা নম্বর দিয়েছিল। জোহরার। এ মেয়েটাকে অবশ্য স্বর্ণেন্দু চেনে। ও যে পাড়ায় ভাড়া থাকে, সেটা বস্তি থেকে একটু দূরে, ওই পাড়ার আরও দু-একজনকে স্বর্ণেন্দু চেনে। মাসুদকে চেনে, বরকতকে চেনে, গোপাল-সমীরদেরও চেনে। ওরা সব শ্রমিক সংগঠন করে, মিছিল বের হলে পতাকা বয়, স্লোগান দেয়। তবে এখানেও ওই পর্যন্তই, তার বেশি ওদেরও সে তেমন চেনে না। জোহরার সম্পর্কে একটু বেশি জানে, কারণ সে প্রায়শই তাদের ভাড়ার ফ্ল্যাটে আসে বইয়ের খোঁজে। তেইশ-চব্বিশ বছর বয়স।

জোহরার বাড়ি এখানে নয়। সেই শীতলপুরে, জেলাটা বোধহয় নদীয়া। গ্র্যাজুয়েশনের সময়ে এখানে এসেছিল, পাশ করে একটা কাজ নিয়েছিল, সেটা এখন ছেড়ে দিয়েছে। এখন টিউশনি করছে, আরও ভালো চাকরি খুঁজছে, আর ডিসট্যান্সে এমএ ক্লাসেও ভর্তি হয়েছে বছরখানেক আগে। এতকিছু করছে বলেই এই তেইশেও চাকরি খোঁজার অধিকার আছে, চাকরি খোঁজা বয়ফ্রেন্ড রাখারও স্বাধীনতা আছে।

এখন ওই জোহরাই স্বর্ণেন্দুর এন্ট্রি টিকিট। অগত্যা, তাকেই ফোন লাগাল সে। কলার টিউনে কে যাস রে, ভাটি গাঙ বাইয়া…, দ্বিতীয়বারের কে যাস-এর মাঝে ফোনটা ধরল জোহরা।

—হ্যাঁ দাদা, বলো!
—আচ্ছা, আমি ট্রমা কেয়ারে। তোমরা কোথায় আছ?
—আমরা পুলিশের এখানে, দাদা। তুমি ওখানেই থাকো। আমরা ওখানে আসছি।
—পুলিশের ওখানে ব…

ততক্ষণে ফোনটা কেটে গিয়েছে বলে আর কথাটা এগোল না। পুলিশের ওখানে বলতে কোথায়? থানায় কি? থানায় যাওয়ার একটা ব্যাপার হবে, এমন একটা কথা রিমি সকালে ফোনে বলছিল বটে। সেই কারণেই যে স্বর্ণেন্দুর মতো কইয়ে-বইয়ে লোক দরকার, সেটাও তখনই বলা। কিন্তু সেক্ষেত্রে ওদের তো তার জন্য অপেক্ষা করার কথা! তাকে ছাড়াই… উত্তরটা পেতে অবশ্য বেশি ভাবতে হল না, তার আগেই আরও একবার ফোন। জোহরাই। স্বর্ণেন্দু ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে নির্দেশ এল: তুমি একবার পুলিশের এখানে চলেই এসো, দাদা।

—পুলিশের ওখানে মানে কোথায়?
—এই তো দাদা, গেটের কাছে একদম।
—গেটের কাছে?
—হ্যাঁ দাদা, একদম গেট দিয়ে ঢুকেই, ওপিডির গায়ে পুলিশের ওই একটা ইয়ে আছে না! তোমাকে অনেকটা হেঁটে আসতে হবে অবশ্য।
—ও, ওদিক দিয়েই ঢুকলাম বোধহয়। পুলিশের চৌকিটা খেয়াল করিনি। ঠিক আছে, আসছি।

গেটের দিকে হাঁটা দিল স্বর্ণেন্দু। উজ্জ্বল লালরঙা শাড়ি-পরা সেই মহিলাটি আর ততক্ষণে ও তল্লাটে নেই। স্বর্ণেন্দু পিছন ফিরেই একবার মাথাটা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করল। নেই। হয়তো বিল্ডিংয়ের মধ্যে আছেন। যখন ও ফোনে ছিল, তখন ঢুকে গিয়েছেন, বা আপাতত অন্য কোনও দিকে গিয়েছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে ওই মহিলাকে খুঁজতে মন চাইল কেন? মাঝেমধ্যে গৌণ দৃশ্যগুলো হঠাৎ উথালপাথাল ভাবনার স্থির মুখ হয়ে ওঠে, তাদের আরেকটু খুঁড়ে দেখতে ইচ্ছে হয়, বোধহয় সেই কারণে।

গেটের কাছে এসে খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়েই পুলিশ আউটপোস্টটা দেখতে পেল সে। সবুজ সালোয়ার পরা শ্যামলা এক মেয়ে তাকে হাত দিয়ে ডাকছে। ও-ই তো জোহরা।

জোহরার সঙ্গে তিনজন লোক। একজন বেশ ষণ্ডামার্কা, থ্যাবড়া নাকের তলায় গোছা গোঁফ। বাকি দুজন রোগাসোগা, বেঁটেখাটো, একজনের গায়ে একটা লাল চাদর জড়ানো। মুখচোখের ধ্বস্ততা দেখলে বোঝা যায়, এরাই ওই ‘বডি’র হতভাগা দাবিদার।

স্বর্ণেন্দুর লম্বা চেহারা দেখে ষণ্ডা লোকটা ভাবল, সে-ই বোধহয় এদের হসপিটাল গার্জেন বা ওরকম কিছু। জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি মেডিসিনের লোক?

—না না। আমি এসেছি, ওদের যাতে একটু…

লোকটা কথা বলতে বেশি সময় দেয় না। সরকারি হাসপাতালে সেটাই স্বাভাবিক বটে। স্বর্ণেন্দুর কথার ওজনটা মোটামুটি বুঝে নিয়ে বলল, থানাটা চেনেন? এই কাগজটা নিয়ে একবার থানায় যান। থানা থেকে ওরা যেখানে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, সেই থানায় বলে দেবে। ওই থানা এই থানাকে বলবে। যে বডি নেবে, তাকে নিয়ে যান। তার আধার কার্ড যেন থাকে। থানা থেকে একটা কাগজ দিয়ে দেবে, সব নিয়ে আবার চলে আসুন। পোস্টমর্টেম হয়ে যাবে। আর গাড়ি লাগলে বলবেন, কমে করে দেব। আপনারা অশোকা ম্যাডামের লোক আছেন তো! কমে হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চলে যান।

এই এতগুলো কথা বলতে লোকটা সময় নিল বড়জোর চল্লিশ সেকেন্ড। স্বর্ণেন্দুকে কি সে এসব ব্যাপারে এক্সপার্ট ঠাওরাল নাকি? স্বর্ণেন্দু ভুরু-টুরু কুঁচকে একবার জোহরার দিকে চাইতে সে-ও কেমন মিইয়ে গেল। ভাবটা এই, এসব সামলাতেই তো তোমায় ডেকে আনা দাদা!

আরেকবার জিজ্ঞাসা করা ছাড়া উপায় নেই। তার আগেই লোকটা ফের তাড়া দিল, চলে যান, এদিকে যত দেরি করবেন, ওদিকে তত দেরি হবে।

স্বর্ণেন্দু গলাটা তুলে বলল, অ্যাই দাঁড়ান দেখি, অত হড়বড় করে বললে কিছু বোঝা যায় না। এখানে থানায় গিয়ে কী করব, আগে বলুন।

—থানায় গিয়ে এই কাগজটা দেখাবেন। ওরা ওদিকের থানায় জানিয়ে দেবে। ওরা আবার এদের জানাবে। এদিকের থানা একটা কাগজ দেবে, সেটা নিয়ে চলে আসুন। আর…
—দাঁড়ান, আগে থানার ব্যাপারটা ভালো করে বুঝি। ওদিকের থানা মানে যেখানে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, সেখানে?
—হ্যাঁ। ওদেরকে এরা জানাবে, ওরাও ওদিক থেকে বলবে। তারপর পোস্টমর্টেম করতে দেবে।
—বুঝলাম। আর বডি হ্যান্ডওভারে কেসটা?

লোকটি এবার খাপ্পা হয়ে উঠছে। বিরক্তিসূচক অতি-পরিচিত ‘চুক’ শব্দটা করে বলল, ওই তো বললাম, যার আধার কার্ড আছে, তাকে থানায় নিয়ে যান। থানা থেকে প্রসেস করে দেবে।

এই বলে বাঁহাতের তেলোয় খৈনি ডলতে ডলতে খানিক তফাতে সরে গেল, বোধহয় আর বেশি কথা বলতেও চায় না। স্বর্ণেন্দু আরও কিছু জিজ্ঞাসা করত, কিন্তু ওদিকে জোহরা বলল, আরে দাদা, এখানে আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই। চলো, থানায় চলো। ওখানে গিয়েই দেখা যাবে, কী করার আছে।

—বেশ, তাই চলো।

জোহরার পিছন পিছন স্বর্ণেন্দু হাঁটা শুরু করল। জোহরা খুব দ্রুত হাঁটে, কিংবা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে হাঁটার গতি এমনিই বেড়ে গিয়েছে। বাকি দুজনও গেট অবধি এল। স্বর্ণেন্দু এখনও জানে না, এদের কার ঠিক কী পরিচয়। কিন্তু সেটা সরাসরি জিজ্ঞাসা করবে? কেমন একটা শোনাবে না? ওরাও তো অপ্রস্তুত হতে পারে। কাজেই, সে খানিক কায়দা করে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, ওই হ্যান্ডওভারের ব্যাপারটা যে বলল, সেটা কে নেবে? কার আধার কার্ড আছে?

ওতে কাজ হল। প্রশ্ন শুনে জোহরা থমকাল। সত্যি তো, এটা তো এক্ষুনিই ঠিক করে নেওয়া দরকার। জোহরা ওদের চিনিয়ে দিল। দুজনের মধ্যে যার গোঁফ রয়েছে, সে সুখলাল। ছেলেটার বাবা। আর অন্যজন বাসু। কাকা। জোহরা বলল, আধার কার্ড দুজনেরই আছে। বাসু আমাদের সঙ্গে চলো। সুখলালদা এখানে থাকুক, অন্য দরকার লাগে যদি। আমি তোমাকে বাসুর আধার কার্ডের ছবিটা হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে দিচ্ছি।

জোহরা যখন এ নির্দেশ দিচ্ছে, স্বর্ণেন্দু দুজনের দিকেই ভালো করে দেখছিল। সুখলালকে দেখলে তবু বাপ-বাপ মনে হয়, কিন্তু বাসুকে মোটেই কাকাগোত্রের দেখতে নয়। মানে কারও কাকা হতে গেলে ঠিক কীরকম দেখতে হওয়া উচিত, তারও কোনও মানদণ্ড নেই, তবু নাম-পরিচয়ের সঙ্গে একটা মানানসই চেহারা থাকলে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকে না। বাসুর বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ হবে, তার আধার কার্ড অন্তত তাই বলছে। অর্থাৎ, আজকাল যাদের নিয়ে হেব্বি হইচই, যারা এধারে-ওধারে সরকার অবধি উলটে দিচ্ছে, বাসুও ওই জেনজিকুলেরই আলগা প্রতিনিধি। দাড়ি-গোঁফ কামানো, রোগা চেহারাটা এক ধাক্কায় আরও যেন হালকা হয়ে জোহরার চেয়েও কমবয়সি করে দিয়েছে। সকাল থেকে এদের খাওয়াদাওয়া হয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না, অথচ দুজনেরই লালচে ঠোঁটের নড়ানড়ি আর মাঝেমাঝে ছোপ-লাগা দাঁতের পাটি দেখে বোঝা যাচ্ছে, এর মধ্যেও বিমল-এর লুকোচুরি বন্ধ হয়নি।

থানাটা হাসপাতাল থেকে কিলোমিটার দেড়েক দূর। বেরিয়েই একটা নো-রিফিউজাল ট্যাক্সিকে দাঁড় করাল স্বর্ণেন্দু। ফিক্সড রেট একশো বলছিল, স্বর্ণেন্দু বলেকয়ে আশিতে নামাল। অনলাইন হবে কিনা, সে-কথা চালককে জিজ্ঞাসা করে সামনের সিটে বসতে যাচ্ছে, জোহরা বলল, দাদা, তুমি বাসুর সঙ্গে পিছনে বসো। সামনে আমি বসছি।

তেইশ বছরের মেয়েটার কথা বলার মধ্যে কী যেন একটা আছে। ঠিক মাস্টারনি ভাব নয়, আবার আলগা নির্দেশও নয়, বরং আঁটোসাঁটো একটা ব্যক্তিত্ব, তাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করায় মুশকিল। চালকের পাশে সামনের সিটে বসাটাকে শক্তিশালী পুরুষ তার প্রবল অধিকার বানিয়ে ফেলেছে, সেই অধিকারটাই এই মুহূর্তে এত সহজে হাত ফস্কে গেল দেখে স্বর্ণেন্দুর মোটেই ভালো লাগেনি। এমনকি, সে এও বলতে যাচ্ছিল, কেন— কিন্তু শেষ অবধি চেপে গেল। বাসুর পাশে বসায় সমস্যা আছে নাকি? কে জানে! ওদের ব্যাপারস্যাপার সে আদপেই জানে না, অতএব, প্রশ্নটা না করাই ভালো। রিমি জানতে পারে, তার থেকে একবার জেনে নিলেই হবে।

তবে থানা অবধি যাওয়ার দেড় কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে জোহরার সজীবতার কাছে আরও অন্তত দুবার যে তাকে লজ্জায় পড়তে হবে, তেমনটা তখনও ভাবেনি। প্রথম ঘটনাটা অবশ্য গুরুতর কিছু ছিল না, জোহরা কেবল তাকে আর বাসুকে দুখানা কলা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, এগুলো খেয়ে নাও, সারাদিনে আর খাওয়ার সময় হবে কিনা, জানো না তো!

বিমল চেবাতে চেবাতে বাসু না বলেছিল, মরা ভাইপোকে ছাড়াতে এসে কলা খাওয়ার ইচ্ছে তার না হওয়ারই কথা। জোহরা তবু একবার নরম ধমক দিয়ে চেষ্টা করেছিল, আরে শুধু বিমল খেলেই হবে না, কাল রাত থেকে কিছু খাওনি, খাবার খাওয়াও জরুরি। কাজ হয়নি।

কলা-পর্বটা তবু সামলানো গিয়েছিল, বাসু না খেলেও স্বর্ণেন্দু সোনামুখ করে কলাটা খেয়ে নিয়েছিল। ট্যাক্সির জানলা দিয়ে খোসাটা ফেলতে গিয়ে জন অরণ্য-র দৃশ্যটা মনে করে খোসাটা ফেলেনি, সেজন্য নিজের মনে-মনে একটা তৃপ্তিও পেয়েছিল।

কিন্তু আরও বেশি বেইজ্জত হল পরের ঘটনাটায়, আর এটার জন্য তার সমস্ত রাগটা গিয়ে পড়ল ভুঁড়িদার চালকটার উপর। অর্ধেক রাস্তা এসে সে ব্যাটা সটান বলে দিল, অনলাইনটা প্রবলেম করছে, দাদা। ক্যাশ দিলেই ভালো হয়।

—মানে? এই তো বললেন, হবে, এখন এসব বললে কী করে হবে! (গলার স্বর আচমকাই চড়ে গেল)
—আরে দাদা, মাক্কালীর দিব্যি! কাজ করছে না।

পাল্টা আরও কিছু বলে স্বর্ণেন্দু নিজেকে আরও খানিক প্রবল করে তুলতে যাবে, এমন সময়ে জোহরা মুখ খুলল, ছেড়ে দাও, দাদা। আমার কাছে ক্যাশ টাকা আছে।

বাসুটা গুম হয়ে বসেছিল, স্বর্ণেন্দুর এমন আচমকা হম্বিতম্বি দেখে চমকে উঠল। তবে মুখে কিছুই বলল না। ওদিকে জোহরার উপস্থিত বুদ্ধির কল্যাণে ব্যাটা হোঁৎকা চালক দিব্যি পার পেয়ে গেল, ক্যাশলেস স্বর্ণেন্দুর কষ্টার্জিত হম্বিতম্বি স্রেফ কোনও কাজেই এল না। তবু একবার শেষরক্ষার জন্য জোহরাকে বলল, তোমার এই নম্বরে জিপে বা ফোনপে আছে তো? আমি তোমায় আশি টাকা পাঠিয়ে দেব।

ততক্ষণে থানা এসে গিয়েছে। জোহরা পার্স থেকে বেগুনি রঙের নোটটা ড্রাইভারকে দিতে ড্রাইভার একবার স্বর্ণেন্দুর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে নিল। পাল্টা স্বর্ণেন্দুও কিছু দিতে পারত, নিদেনপক্ষে একটা ঠোঁট-বাঁকানো হাসি, কিন্তু সেসব কিছুই ঘটল না। তার পিছনেও জোহরা। কুড়ি টাকার সবুজ, মুড়মুড়ে নোটটা পার্সে ঢোকাতে ঢোকাতে স্বর্ণেন্দুকেই উদ্দেশ করে বলল, সে দেখা যাবে! আগে কাজ সারা হোক।

থানাটা রাস্তার ওপারে। এই কবছর আগে অবধিও নীল দেওয়ালের গায়ে সাদারঙে লেখা Police Section Hovse নামটা দিব্যি পড়া যেত। এখনও নামটা আছে, কেবল নতুন শেড লাগিয়ে থানার নাম বসেছে বলে আড়ালে চলে গিয়েছে, এই যা! রাস্তা থেকে আর দেখা যায় না। দেখা গেলে, u-এর জায়গায় v বসেছে কেন, সে ব্যাপারে অন্তত জোহরাকে একটু শেখানো-পড়ানো যেত।

থানার ভেতরকার চেহারাটা আগের চেয়ে পরিষ্কার, নতুন আসবাব, আলো-টালো লাগিয়ে শ্রী ফিরেছে। কত্তাদের মর্জি-মেজাজও মোলায়েম হয়েছে বলে মনে হল। একদম বাঁদিকে বসা বড়কর্তাটি জিজ্ঞাসু ভাবভঙ্গি নিয়ে তাকাতে তার দিকেই এগিয়ে গেল ওরা তিনজন। এখানে স্বর্ণেন্দুরই অগ্রাধিকার, সে হাসপাতালের রিপোর্টটা লোকটির হাতে দিয়ে ব্যাপারখানা একবার বুঝিয়ে দিল। পুরোটা বোঝাতে হল না, কোনওভাবে খবর আগেই এসে গিয়েছিল। বড়কর্তাটি রিপোর্টটা নিয়ে বলে দিলেন, ও আচ্ছা, ওই বাইক অ্যাক্সিডেন্ট কেসটা তো? আমরা প্রসেস শুরু করে দিচ্ছি। একটু বসুন। বেশিক্ষণ লাগবে না।

লোকটির নাম রহমত খান। বুকপকেটের কাছে নামের ট্যাগটা সে পরিচয়ই দিচ্ছে। স্বর্ণেন্দু লম্বা বেঞ্চটায় বসল। পাশাপাশি জোহরাও। বাসুকেও টেনে বসানো হল। স্বর্ণেন্দুর কাছে এখনও বডি হ্যান্ডওভারের কেসটা পুরো পরিষ্কার হয়নি। রহমত খানও তো সে ব্যাপারে কিছুই বললেন না। একবার জিজ্ঞাসা করবে? না থাক। তেমন প্রয়োজন হলে পুলিশ নিজেই বলবে। জোহরার কাছে আর মান-ইজ্জত খুইয়ে…

রহমত খান ঠিকই বলেছিলেন। সত্যিই বেশিক্ষণ লাগল না। দশ মিনিট পরেই ওদের ডাক পড়ল। লোকাল থানাকে ইমেলের একটা কপি স্বর্ণেন্দুর হাতে দিয়ে তিনি বললেন, একবার দেখে নিন। আমরা লোকাল থানাকে জানিয়ে দিয়েছি যে এদিক থেকে সব ক্লিয়ার। এবার ওরা ওদিক থেকে ক্লিয়ারেন্স দিলে আমরা পোস্টমর্টেমের ক্লিয়ারেন্সটা দিয়ে দেব। এখন ওদের দিক থেকে কতক্ষণে আসে।

—আমাদের কি তাহলে এখনও বেশ কিছুক্ষণ বসতে হবে?

স্বর্ণেন্দুর প্রশ্নটায় রহমত খান মুখটা এমন করলেন, সামনে গত শতকের কোনও রসিক লেখক-টেখক থাকলে সে ভাবখানা একটা জবরদস্ত সংলাপের রূপ পেয়ে যেত, অনেকটা এরকম— এসেছ বাপু সরকারি জটাজুট খোলার কাজে, দেরি হবে না, কোন শাস্ত্রে লেখা আছে হে!

যদিও মুখে কিছু বললেন না।

ঘড়িতে বাজছে দেড়টা। জোহরা স্বর্ণেন্দুকে বলল, দাদা, আমি তাহলে একবার গোপালদাকে ফোন করি। ওরা লোকাল থানায় সকাল থেকে বসে আছে। জানিয়ে দিই যে, এখান থেকে চিঠি করে দিয়েছে।

—দাও। আমিও রিমিকে একবার ফোন করি।

তিনজনে তিনখানে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। স্বর্ণেন্দু থানার ভিতরের বেঞ্চে বসে রিমিকে ফোন করে আপডেট দেওয়া শুরু করল, এতক্ষণ জোহরার সঙ্গে একতরফা টক্করের মাঝে বোঝেনি, রিমি ইতিমধ্যে অন্তত তিনবার ফোন করেছে। জোহরা বাইরের হেল্পডেস্কটার সামনে দাঁড়িয়ে গোপালকে ফোন করল। কিন্তু থানার বাইরের ফুটপাথে নাগরিক হুলুস্থূলকে ডজ করে বাসু যে ঠিক কার সঙ্গে কথা বলছে, তাও একটানা নয়, বারে বারে, সেটা বোঝার উপায় নেই, যেমন বোঝার উপায় নেই, ওর ভাষাটা কতখানি হিন্দি আর কতখানি ভোজপুরি। প্রতিবারই দু-চার বাক্যের বেশি এগোচ্ছে না কথা। কে করছে, বোঝা না গেলেও এটা বোঝা যাচ্ছে, ওদেরই ঘরবাড়ির কেউ।

জোহরা ফোন সেরে এসে স্বর্ণেন্দুর পাশটায় বসল। তার সেকেন্ড ত্রিশেক পর স্বর্ণেন্দুর স্ত্রী-আলাপ শেষ হল। জোহরা জানাল, গোপালদের কাছে খবর চলে গিয়েছে। ওরা চেষ্টা করছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এদিকের থানায় যাতে চিঠিটা চলে আসে। তারপরেই জোহরা বলল (মানে স্বর্ণেন্দুর মতে, এক্ষুনিই সেটা বলার দরকার ছিল না, তাও বলল), আচ্ছা দাদা, ওই বডি হ্যান্ডওভারের ব্যাপারটা এখানেই হবে না? ওনারা তো কিছু বলছেন না!

যেখানেই মানইজ্জতের ভয়, সেখানেই মেয়েমানুষ কথা কয়!

তবে স্মার্টনেসের ঘোঁতঘাঁত স্বর্ণেন্দুও কিছু কম জানে না। সে জোহরাকে কোনও উত্তর না দিয়ে সটান ওই রহমত খানকে গিয়েই ধরল, আচ্ছা, বডি হ্যান্ডওভারের জন্য যে নেবে, তার আধার কার্ডের জেরক্স লাগবে তো? সেটা কখন দেব?

রহমত খান সাদা কাগজে খসখস করে কী একটা লিখছিলেন। কিনলে কোম্পানির ছোটো বোতলটা থেকে চুকচুক করে খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে বললেন, থানা আগে ওটা আমাদের পাঠাক। তারপর আমি এখানে ওটা প্রসেস করে দেব। চিন্তা করবেন না। হয়ে যাবে। আপনি বরং জেরক্স রেডি রাখুন। ওরা মেল করলেই আমি ফটাফট পুরোটা করে দেব।

লোকটা কি সত্যিই এমন ভদ্র? নাকি এরকম ব্যাপার ঘটেছে বলেই সমানে এত ভালো ব্যবহার করছে?

স্বর্ণেন্দু আর সেটা নিয়ে না ভেবে জোহরাকে প্রশ্ন করল, তুমি তখন বাসুর আধারের জেরক্সটা আমায় পাঠিয়েছিলে?

জোহরা বলল, ও না, পাঠানো হয়নি। এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

—পাঠাও। আমি প্রিন্ট করে নিয়ে আসি কয়েক কপি।

প্রিন্ট করতে গিয়ে সেখানেও আরেক পোঁচ কেলো। যেন আজ স্বর্ণেন্দুকে কোণঠাসা করতেই ওই ছেলেটার বডি ছাড়ানোর জন্য রিমি তাকে এখানে পাঠিয়েছে। চার কপি প্রিন্টের দাম পড়ল কুড়ি টাকা। কিউআর কোডটা স্ক্যান করতে যাবে, ব্যাটাচ্ছেলে বাসু হুট করে ফুলহাতা জামার পকেট থেকে কুড়ি টাকার একটা নোট বের করে সোজা দোকানিকে এগিয়ে দিল। খুচরো পেয়ে লোকটা স্বর্ণেন্দুর দিকে এমন একখানা হাসি ছুড়ল, অমন হাসি রবিঠাকুরও ছার উপাধিটা ব্রিটিশ সিংহের মুখে ছুড়ে মারার সময়ে দেননি।

প্রিন্টগুলো নিয়ে আসার সময়ে আবার রিমির ফোন। ফোনটা ধরতেই সে বলল, একটা ঝামেলা হয়েছে। জোহরাকে গোপালদা ফোন করেছিল। নিশ্চয়ই বলেছে। বড়বাবু কীসব আবার চাইছে!

—কীসের কী চাইছে?
—আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। কী একটা বলছে, যে বডি নেবে সে তো ওই থানায় আছে, তাকে এখানে না দেখে আমরা ক্লিয়ারেন্স দিতে পারব না।
—যাহ শশালা, এখানেও তো একই কেস। এখানকার থানাও যে বডি নেবে, তাকে দেখেই ক্লিয়ারেন্স দেবে।
—তুই একবার ওখানে যিনি কাজটা করছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে পারবি?
—আচ্ছা, দেখছি।

থানার গেটের কাছে যতক্ষণে ওরা এসেছে, জোহরা বেরিয়ে এসেছিল। ওদের দেখে গোপালের গো-টা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, স্বর্ণেন্দু ওকে বাকিটা আর বলতে দিল না। তাড়াতাড়ি বলল, আমি জানি, তোমার রিমিদি ফোন করেছিল। তুমি একবার ওই গোপালকে ফোন করো। ফোনটা ওই খানস্যারকে দিয়ে দাও। উনিই ওখানকার বড়বাবুকে বলে দেবেন, কী করতে হবে।

জোহরা কিঞ্চিৎ ঠান্ডা গলায় উত্তরটা দিল। সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম তোমাকে। স্যারের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে।

স্বর্ণেন্দুর ব্যাপারটা বুঝতে সময় লাগল। কথা হয়ে গেছে মানে?

—মানে ওই বড়বাবুর সঙ্গে… স্যারের কথা হয়ে গেছে।
—সেকি! কখন হল?

প্রশ্নটা করেই স্বর্ণেন্দু অনুভব করল, বেমালুম কাঁচা কাজ হয়ে গেল। জোহরা আদপেই কচি খুকি নয় যে এ-কাজটা তার দ্বারা হত না। সে উত্তর দিল, এই তো, গোপালদা যখন ফোন করল, তখনই। ও তো থানাতেই বসে আছে। ও-ই বুদ্ধিটা দিল।

—আচ্ছা, যাক।

পরাজয়ের স্বগতোক্তি করে স্বর্ণেন্দু বেঞ্চিতে আবার এসে বসল। বাসুর আধার কার্ডের প্রিন্টগুলো জোহরাকে দিল, সবুজ ফোল্ডারে ঢোকানোর জন্য। থানায় একটা রোগাটে বউ এসে ঢুকেছে, সঙ্গে দুখানা ইস্কুলড্রেসের বাচ্চা, হাঁইমাই করে অভিযোগ জুড়েছে। অভিযোগটা নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে। ভাই মাকে মারছে, দিদিকে মারছে, এমনকি রাতে মদ গিলে ফিরে এসে নিজের বউকেও ছাড় দিচ্ছে না। বলতে বলতে ছোট ছেলেটার হাত-ধরা অবস্থায় ফোঁপাতে শুরু করল। রহমতের পাশের দিলীপ চৌধুরী লোকটিও নেহাত মন্দ না। কান্না দেখে বেশ মাখনের মতো নরম গলায় বউটাকে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমরা দেখব। আপনি থানায় এসেছেন যখন, নিশ্চয় অ্যাকশন নেব। আপনি ওই স্যারকে সব বলুন…

বউটা ওই চোখের জল মুছতে মুছতেই কথা বলছিল, স্বর্ণেন্দু অন্য একটা লেখা ভাবতে ভাবতে সেগুলো শুনে নিচ্ছিল, মানে ওই নোট নিচ্ছিল আরকি। একটা-আধটা নতুন শব্দ, চাবুক সংলাপ পেয়ে গেলে মন্দ হয় না। ক্ষয়াটে বউটার স্বামী শীতকাল পড়লে ওড়িশায় কাপড় ফেরি করতে চলে যায়। এখন আবার চারিদিকেই বড্ড ভয়। মাসকয়েক আগে হেবি মারধর শুরু হল, তখন ভয়ে পালিয়ে এসেছিল, এখন আবার বাধ্য হয়ে ফিরে গিয়েছে। না গেলে খোরাকি জোটে কোথায়, ছেলেমেয়ে দুটোর প্রাইভেট ইস্কুলের মাইনেই বা জোটে কোথায়! আরও অন্য কিছু বলতে যাচ্ছিল, পুলিশ থামিয়ে দিয়ে তাকে পয়েন্টে ফেরাল।

ছেলেমেয়ে দুটো ততক্ষণে মায়ের শাঁখা-ঘেরা সরু হাতের নাগপাশ থেকে গাবদা ফোনটা কেড়ে এনে গেম খেলতে লেগেছে।

বাসু ওপাশের বেঞ্চিটায় বসেছে, ফোনে চার্জ দেবে।

এতসব কাণ্ডের মধ্যে ছিমছাম থানার বেঞ্চিতে বসে স্বর্ণেন্দু এলোমেলো লেখা ভাবছিল। কতদিন গল্প-গাছা লেখা হচ্ছে না। অবশ্য লিখে বিশেষ লাভই বা কী! লেখা প্রকাশের চোদ্দো গণ্ডা জায়গা আছে, বদলে টাকা দেওয়ার বেলায় ফি-সম্পাদকের উপরে কেমন এক ঐশ্বরিক নির্লিপ্তি ভর করে। কারও আবার অবরে-সবরে বিপ্লবী হওয়ার শখ জাগে, পয়সা দেওয়াকে তারা তখন শ্রেণি-শত্রুতা বলে ভাবতে শুরু করে। সেজন্যেই এখন গল্প লেখার বেগ তেমন জোরে না এলে গল্প লেখার পরিশ্রমটাও করতে ইচ্ছে করে না। ফালতু পণ্ডশ্রমের বিকল্প অনেক।

এরই ফাঁকে জোহরা একবার বলল, সুমনের মুখটা আমার বারবার মনে পড়ছে, দাদা!

ভাবনার মাকড়সা-জালটা ছিঁড়ে যেতে স্বর্ণেন্দু একটা অজ্ঞ-অসহায় ভাব নিয়ে জোহরার দিকে তাকাল। এতক্ষণে ছেলেটার নাম প্রথম শুনল স্বর্ণেন্দু। এটুকু অবশ্য সে জানত। আরও দু-একটা খবর ওই রিমির মুখেই শুনেছিল। ছেলেটা ভালো ফুটবল খেলে, সকাল-সন্ধে মাঠে বল নিয়ে পড়ে থাকে, পুরসভার কী একটা টুর্নামেন্টে সাত-সাতটা গোল করে কাপ জিতিয়েছে।

সে জোহরাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি চিনতে ওকে?

—হ্যাঁ, চিনব না আবার! আমাদের পাড়াতেই পড়তে আসে, মানে আসত আরকি! আমার কাছেও আরেকটু ছোট ছিল যখন, পড়েছে।
—তুমিও বস্তিতে পড়াও নাকি?
—হ্যাঁ, ওই যে গোপালদা, বরকতদাদের পার্টি থেকে বস্তি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি করেছে না, ওরাই তো কোচিং স্কুল চালায়। ওদের হয়েই পড়াই। আমি ছোটদের পড়াই একদিন করে। দিদিও তো মাঝেমাঝে আসে।
—হ্যাঁ, সে জানি। আমি একবারই গিয়েছিলাম।
—মাঝেমাঝে আসতে পারো তো দাদা! তুমি তো এত পড়াশোনা করো, লেখো, ওদেরকে খানিক পড়াতে পারো তো।

এই শেষের একটা কথায় জোহরার কাছে আগের সমস্ত হারগুলো কেমন ফুল হয়ে উঠল। আর শেষের কথাটা সমস্ত ফুলের মাঝে ঘুমন্ত কীট, যে থাকলে অবশ্যম্ভাবী ভয়, কিন্তু না থাকলে মহাবিশৃঙ্খলা। স্বর্ণেন্দু মুখ-টেপা হাসি হেসে মাথাটা নামিয়ে নিল।

স্বর্ণেন্দুর অত সময় কোথায়? নিয়মিত ব্লগে লেখা তুলতে হয়, তার উপর ফরমায়েশি লেখার চাপ থাকে, স্ক্রিপ্ট ডেলিভারির ডেডলাইন থাকে। ব্লগের লেখার জন্য টাইমে-টাইমে রসদ খোঁজার পরিশ্রম আছে। তাদের ফ্ল্যাটের নিচে কাঠগোলাপের যে গাছটা, তার গোড়ায় কে যেন একটা কাচের টুকরো বেশ কায়দা করে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় সাপ্লিমেন্ট জড়িয়ে রেখে দিয়েছিল, আজ কতদিন হয়ে গেল। নোংরা তোলার বিশু কাঠ-কাঠ গলায় একদিন ঘোষণা করে দিয়েছিল, কাচের জিনিস তারা ড্রামে তোলে না, হাত কাটার রিস্ক থাকে। তারপরও কেউ বুদ্ধি খাটিয়ে কাগজে মুড়ে কাচটা রেখে দিয়েছিল, বিশুও নেয়নি। তারপর থেকে যে-কে সেই পড়ে আছে। রোজ বেরোনোর সময়ে স্বর্ণেন্দুর ওদিকে চোখ পড়ে— জীবনানন্দের বিষণ্ণ মুখ, বড় ফন্টে লেখা নিবন্ধের নাম অফুরন্ত রৌদ্রের তিমির। জল-রোদে সে রৌদ্রের তিমির আরও হলদেটে মেরে গেল, জীবনানন্দের ধূসর মুখটা আরও খানিক বিষণ্ণ হয়ে উঠল— স্বর্ণেন্দুর ভাবনার রসদও পুষ্ট হল। অথচ বিশুর ঘর-বারের খবর নেওয়ার কথা মনে আসেনি কখনও। এ ব্যাপারটা রিমি জানে, কিন্তু জোহরার কাছে এসব কি আর বলা যায়?

ওপাশের বেঞ্চে বাসুর ফোন এসেই চলেছে। থানার মধ্যে বসে বারে বারে ফোন ধরছে দেখে প্লেন ড্রেসের একজন তাকে একটা ধমকও লাগাল, আরে ভাই, ফোন ধরতে হলে বাইরে গিয়ে ধরো। দেখছ না, এখানে সবাই কাজ করছে!

বাসু আর কী করে! প্লাগপয়েন্ট থেকে ফোনটা খুলে নিয়ে বাইরে গেল। স্বর্ণেন্দু কিংবা প্লেন ড্রেসের লোকটা আর কী করেই বা জানবে, ফোনের ওপারে ফিরে ফিরে আসছে সুমন যোগীর মা, আর আসল খবর এখনও তাকে দেওয়া হয়নি। অবশ্য সেটুকু না জানলেও চলত, অন্তত ভাইপোর বডি নিতে বাসুকে এখানে থাকতে হচ্ছে, এমন অবস্থায় ধমকটার বিরুদ্ধে একটা মোলায়েম দেখে নৈতিক প্রতিবাদ স্বর্ণেন্দু করতেই পারত। বোধহয় থানার ব্যাপারস্যাপার বলেই তার জিভ সরল না।

সুমনের দেখাদেখি জোহরাও বেরিয়ে গেল।

ওদের এই কিছুক্ষণের চলে যাওয়ার বিষাদ-গন্ধটা ফুরিয়ে এলে স্বর্ণেন্দু লেখাটার কথা ভাবা শুরু করল। এই সুমন ছেলেটাকে নিয়ে কিছু একটা লেখা যায় যদি। আজই। ব্লগে। একখানা ব্যক্তিগত গদ্য? না, জমবে না। তার চেয়ে খোলা চিঠি ব্যাপারটা খোলতাই হবে ভালো। তার উপর ফুটবলের মতো এমন সহজ পণ্যের লোভ। এখন ফুটবল নিয়ে কান্না-কান্না লেখা সবচেয়ে বিক্রি হয়— ক্রিকেট নিয়েও হয়, তবে কোথায় ক্রিকেট আর কোথায় ফুটবল! মেসি গোটাপাঁচেক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোল করুক না, পাঁচ মিনিটের মধ্যে এমন গদ্য নামবে, পড়ে বোঝার উপায় নেই, আয়তাকার মাঠে মেসি খেলোয়াড়দের কাটিয়ে বেরোবার সময়ে কখন টুক করে লোহিত সাগর কেটে ফেলা মোজেস হয়ে উঠেছেন। স্বর্ণেন্দু এসব লেখা পড়ে হেসে গড়াগড়ি যায়, কিন্তু তারপর রাত দুটোয় মদ্রিচের একটা ট্রিভেলা পাস দেখলে তারও হাত নিশপিশ করে ওঠে। চুপিসাড়ে সে কিবোর্ডচি-র ড্রাফট পেজটা খোলে, ঘুমন্ত রিমিকেও ভুলে যায় তখন, তার আঙুলে খেলা করে ওঠে নিজস্ব উপকথার শব্দভাণ্ডার।

কিবোর্ডচি-তে ফুটবল নিয়ে একগুচ্ছ লেখা আছে, কোনওটার হিট দশ লাখ ছাড়িয়েছে— দিদিয়ের দ্রোগবার যুদ্ধ থামানো থেকে গত বিশ্বকাপে লিও মেসির মেক্সিকো ম্যাচের গোলটা। এমনকি গত আগস্টে যখন নেতানেয়াহুর চ্যালাচামুণ্ডারা ত্রাণভিক্ষার লাইনে বোমা মেরে সুলেইমান আল-ওবেইদকে খুন করল, তখনও যে লেখাটা সে লিখেছিল, সে লেখাটাও হাজার তিরিশেক লোক পড়েছিল। লেখাটা পড়ে আরও গোটাকয়েক হাউস তাকে স্টোরির অফার দিল। বাংলা, ইংরেজি দুইই। আল-ওবেইদকে কখনও সে দেখেনি, জানত না, তার ড্রিবলিং স্কিল কতখানি, কোন পা-টা বেশি ভালো চলে, সিগনেচার মুভ কোনটা, তবু কয়েক আউন্স বিশ্বরাজনীতি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর মণখানেক আবেগ ব্লেন্ড করে দিব্যি একটা লেখা নেমে গেল।

আল-ওবেইদের মতো এই সুমনকেও তো সে কখনও সাদা চোখে দেখেনি, সকালে-বিকেলে তার প্র্যাক্টিসে যাওয়ার আকুতি সামনে থেকে দেখে অনুভব করেনি, এখন দুজনেই মরে গিয়েছে। তাহলে আল-ওবেইদ যদি সুমন যোগীকে একটা চিঠি লেখে? অবশ্য তাতে অন্য ঝুঁকি আছে। যাদের খেলা কখনও দেখেনি, তেমন দুজনের মধ্যে কীই বা কথা হতে পারে, সেটা একেবারে ফুটবলের টুকিটাকি বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। আল-ওবেইদকে নিয়ে লেখাটায় সেসব অত দরকার ছিল না, সেখানে লক্ষ্যও ছিল আলাদা।

আল-ওবেইদের থেকে বরং ডিয়োগো জোটা ভালো অপশন। জোটাও তো অ্যাক্সিডেন্টেই মরল সেবার। আর, জোটার খেলা তো দিব্যি চোখের সামনে ভাসছে, না ভাসলেও ইউটিউব, হটস্টার খুললেই সে খেলার ক-খ-গ-ঘ একদম থরে থরে সাজানো।

লেখাটা সবে মাথার মধ্যে তৈরি হতে শুরু করেছে, আবার জোহরার আগমন। দাদা, ওই আউটপোস্টের লোকটা এসেছে আবার। বলছে, তিনটের সময়ে নাকি মর্গ বন্ধ হয়ে যাবে, তারপরে আর বডি নেয় না। এখন আড়াইটে। ওদিকে লোকাল থানা তো এখনও জানাল না কিছু। ও গাড়ির ব্যাপারেও জিজ্ঞাসা করছে।

জোটার দোমড়ানো ল্যাম্বর্গিনি থেকে একেবারে মড়ার গাড়িতে এসে পড়াটা সামলাতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। কিন্তু সে পেশাদার লেখক। লেখা একবার জট পাকাতে শুরু করেছে মানে সে লেখাকে আর কোনওভাবেই হারাতে দেওয়া চলে না। এখন প্রায় কোনও কাজই হয়নি, আসল কাজ এরপর শুরু হবে। ডোম আসবে, মর্গে ছুটতে হবে, কে জানে, নাকে রুমাল বেঁধে মর্গের ভেতরেও ঢুকতে হবে কিনা, তারপর পোস্টমর্টেম শেষ হলে বডি পাওয়ার জন্যে বিরক্তিকর অপেক্ষায় সময় কাটবে, কিন্তু ওরই মধ্যে কচি লেখাটাকে ঠিকমতো ভাবনার জলহাওয়া দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা তারই দায়িত্ব।

অতএব, স্বর্ণেন্দু ঠিকই সকালের খৈনি-ডলা লোকটার সঙ্গে গুছিয়ে কথা বলল, লোকটার নাম যে রাঘব, সেটা জেনে নিল, ফোন নম্বর নিল, তারপর লোকাল থানায় তাড়াতাড়ি কাজ করার নির্দেশ দিতে জোহরাকে দিয়ে বারকয়েক ফোন করাল। সেখানে ফোন করে জানা গেল, এদিকের থানা থেকে সব বুঝিয়ে দেওয়ার পরও লোকাল থানার বড়বাবু বিশেষ ঝুঁকি নিতে চাননি, তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন ওই সুমন যোগীর জ্যাঠাকে। বাসুদেব যোগীর হাতে বডি তুলে দেওয়া হবে, এই মর্মে জ্যাঠার চিঠির দরকার ছিল। মুখ্যু সে জ্যাঠা বেচারি পড়েছিল ফাঁপরে, শেষ অবধি সে চিঠি লিখে দিয়েছে গোপাল বা বরকতদের কেউ, এককালের পার্টিক্লাসের সুবাদে বইপত্রের সঙ্গে যাদের বোঝাপড়া গড়ে ওঠার একটা সুযোগ এসেছিল। এবার আসল চিঠি আসবে।

ঘড়িতে পৌনে তিনটে হয়ে এল। আর মিনিট পনেরোর মধ্যে হাসপাতালে না গিয়ে পৌঁছলে পোস্টমর্টেমের গুড়ে বালি। আপাতত ভাবনাঘরের একপাশে লেখাটাকে সরিয়ে রেখে অন্যপাশ থেকে লাভা হয়ে উঠে আসছে রাগ। পৌনে তিনটে থেকে তিনটে বাজতে দশ। আরও দুমিনিট যাওয়ার পর ভেতর থেকে ডাক এল। রহমত খান তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। স্বর্ণেন্দু তাড়াতাড়ি তাঁর টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

ক্লিয়ারেন্স এসেছে। রহমত খান সেটা স্বর্ণেন্দুকে দিয়ে বললেন, আপনি এক্ষুনি এটা নিয়ে চলে যান। ওরা এত দেরি করল! তিনটে দশ হয়ে গেলে ওরা আর নেবে না।

—আচ্ছা। আর বডি হ্যান্ডওভারের স্লিপটা?
—ওটা আমি রেডি করছি। ও নেবে তো? ও এখানে থাকুক, আধার কার্ডের জেরক্সগুলো ওকে দিয়ে যান। ওটা করতে সময় লাগবে।

জোহরা পাশ থেকে বলল, তুমি আর আমি তাহলে হাসপাতালে যাই। বাসু এখানে থাকুক। একেবারে কাজটা সেরে আসুক।

প্রস্তাবটা খুব প্র্যাক্টিক্যাল নয়। স্বর্ণেন্দু বলল, না না। তুমি ওর সঙ্গে থাকো। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। তোমরা কাজ সেরে পরে এসো।

—ঠিক আছে, দাদা।

জোহরা গেট অবধি এল। কী মনে হতে সবুজ ফোল্ডার থেকে বাসুর আধার কার্ডের একটা জেরক্স বার করে দিয়ে বলল, এক কপি রাখো। যদি লাগে।

স্বর্ণেন্দুর আর ভাবার সময় ছিল না। জোহরার এ নির্দেশটাও বাধ্য ছেলের মতো পালন করে সেটা ঝোলাব্যাগে ঢুকিয়ে যখন রওনা দিচ্ছে, শুনল, রহমত খান বলছেন, আজ আমার নমাজের না দেরি হয়ে যায়! একে রমজান চলছে, তার মধ্যে… শেষের বিড়বিড়ানিগুলো আর স্পষ্ট হয়নি।

মিনিবাসে চেপে, তারপর হেঁটে হাসপাতালের গেটে পৌঁছতে পৌঁছতে তিনটে দশ বেজেই গেল। পুলিশ আউটপোস্ট থেকে জেনে নিয়ে ভেতরে গিয়ে কাজ সারতে সারতে আরও মিনিট দশেক। অশোকা ম্যাডামের পরিচিত বলেই কাজ হল কিনা কে জানে! সে যা হোক, সুদীপ মাইতি লোকটাকে ভালোই বলতে হবে। তেমন প্রশ্ন-টশ্ন করেনি। বরং, বডি ধরে রাখলে যে হাসপাতালেরই ঝামেলা বাড়ে, সে-কথাই অন্তত তিনবার ধরে বোঝানোর চেষ্টা করল। কাগজ দেখেশুনে আরও জেরক্স করতে পাঠাল। জোহরা ভাগ্যিস বাসুর আধার কার্ডের কপিটা দিয়ে দিয়েছিল, সেটার তিন কপি দরকার পড়ল। সব সেরে বডি নম্বর নিল যখন, তখন তিনটে কুড়ি।

—আমার সঙ্গে একবার মর্গে চলুন। বডিটা আইডেন্টিফাই করে দেবেন, দিলেই আমরা পোস্টমর্টেমে ঢুকিয়ে দেব। নির্দেশ দিল সুদীপ মাইতি।
—এই গাঁড় মেরেছে রে!

না, স্বর্ণেন্দুর সেটুকু জ্ঞানগম্যি আছে, কথাটা সে অস্ফুটেই বলল।

—কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লেন যে! চলুন, অনেক দেরি হয়ে গেছে এমনিতেই। আইডেন্টিফিকেশন না করলে আজ আর পোস্টমর্টেম হবে না।
—একটু সমস্যা হয়ে গেল যে দাদা! আমি তো ওকে চিনি না। বলতে বাধ্য হল স্বর্ণেন্দু। ইতিমধ্যেই সে ফোন লাগিয়েছে জোহরাকে।

সুদীপ মাইতিও কথা শুনে থমকেছে। সেকি, আপনি বাড়ির লোক না? মুশকিল হল…

হাতের ইশারায় সুদীপ মাইতিকে থামতে বলে স্বর্ণেন্দু বলল, দাঁড়ান, দেখছি… হ্যাঁ, জোহরা, তুমি একবার সুখলালের নম্বরটা এক্ষুনি পাঠাও। আরে, বডি আইডেন্টিফাই করতে হবে। আমি তো চিনি না ওকে।… তোমরা কতক্ষণে আসছ?

ফোন রেখে সে বলল, একটু ওয়েট করুন। ওর বাবা-টাবা সব এখানেই আছে। ওদের ফোন করছি।

সুদীপ মাইতি চোখের চশমাটা খুলে নিয়ে মুছতে মুছতে বলল, তাহলে শুনুন, আমি মর্গের দিকে যাচ্ছি। বডি রেডি করছি। আপনি ওদের নিয়ে মর্গে চলে আসুন, চেনেন তো? এই গেট দিয়ে বেরিয়ে সোজা গিয়ে ডানদিকে। তাড়াতাড়ি, বেশি দেরি করবেন না। গাড়ি চাইলে ডোমেদের সঙ্গে কথা বলে নিন।

এতগুলো কথা একসঙ্গে বলে লম্বা লোকটা হনহন করে হেঁটে চলে গেল। সুখলালের নম্বরটা জোহরা পাঠিয়েছে। স্বর্ণেন্দু সেটায় ডায়াল করতে কী একটা গান শুরু হল। ওই ওরা যে ভাষায় কথা বলে, ভাবটা সেরকমই। সুখলাল ফোনটা ধরতে প্রথমে তাকে নিজের পরিচয় দিতেই কয়েক সেকেন্ড গেল। তারপর মর্গে আসার নির্দেশ বুঝিয়ে দিয়ে স্বর্ণেন্দুও সোজা হাঁটা শুরু করল।

মর্গে যাওয়ার রাস্তাটা বুঝতে অসুবিধা হল না। যারা সেরে উঠতে আসে, তাদের ব্যস্ত চলাচল পার হয়ে যে রাস্তাটায় নিষ্ঠুর অপেক্ষার ভিড় জমে, ওটা দিয়ে গেলেই মর্গ, ডোমেদের অফিস, বিষণ্ণ জগদ্দলের মতো সাদা সাদা শববাহী যান। মর্গের সামনে মানানসই একটা মন্দির, মন্দির ঘিরে জিরোনোর ব্যবস্থা। স্বর্ণেন্দু ওখানেই সুখলালদের দেখতে পেল। তার আগেই ওরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছে। সুখলালের গায়ে সকালের সেই লাল চাদরটা এখনও জড়ানো, ঠোঁট নড়া দেখে বোঝা যায়, বিমল চেবানোতেও বিরাম নেই। সঙ্গে আরও কয়েকজন আছে। ওরা ওর জন্যেই অপেক্ষা করছিল।

—সুমন যোগী, তিনশো আটষট্টি। সুমন যোগীর বাড়ির লোক কে আছেন?

স্বর্ণেন্দু সঙ্গে সঙ্গে মর্গের দিকে এগিয়ে গেল। গেটের সামনে সেই রাঘব বলে লোকটা। শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে এখন গেঞ্জি আর লুঙ্গি। সুদীপ মাইতিও আছে, স্বর্ণেন্দুকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কই? ওর বাড়ির লোক এসেছে?

—এসেছে। আনছি ওদের।

লোকটা সেই আগের কথাটাই আবার আওড়াল, তাড়াতাড়ি! সাড়ে তিনটে বেজে গেছে। দুজনকে লাগবে।

সুখলাল আর শঙ্কর যাবে ঠিক হল।

মর্গের ভেতরের উৎকট গন্ধটা খোলা গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নাকে ধাক্কা মারছে। গেটের সামনে একটা আঠেরো-উনিশ বছরের ছেলে মাস্ক বিক্রি করছে। স্বর্ণেন্দু ওদের বলল, দুজনেই মাস্ক নিয়ে নাও একটা করে।

ওরা ঢুকে যেতে স্বর্ণেন্দু বসার জায়গাটার কাছে ফিরে এল। বস্তি থেকে অন্তত জনা সাতেক লোক এসেছে। সকলেই তাকে প্রথমবার দেখছে, সকলের চোখেই কৌতূহল আর কৃতজ্ঞতার কমবেশি ছাপ। মৃত্যু-অসাড় মুহূর্তে প্রথম পরিচয় হলে ঠিক কী কথা বলা যায়, স্বর্ণেন্দু ভাবছিল। এমন সময়ে দেখল, মর্গ থেকে ফিরে আসছে দুজনে। সুখলালকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে শঙ্কর। লাল চাদরটা গা থেকে খুলে গিয়েছে, মাটিতে এলিয়ে এলিয়ে পড়ছে তার কান্না-ভাঙা শরীর, মাথা নাড়ছে উদভ্রান্তের মতো, ওরই মধ্যে বিমল-রাঙা দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছে, সব মিলিয়ে দুঃসহ দেখাচ্ছে তাকে। সিমেন্টের বেঞ্চে কোনওরকমে বসানো হল। স্বর্ণেন্দু কাছে যেতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে কান্নার গতিটা আরও গভীর হল।

—আমার অত তাজা ছেলে, দাদা, আমার হীরার টুকরা ছেলে, আমায় বারবার বলত, বাবা, আর কটা বছর যেতে দে, তোকে আর কাম করতে দেব না। সেই ছেলে আমার চলে গেল, দাদা…

ওর কাঁচাপাকা চুলে হাত বোলাতে লাগল স্বর্ণেন্দু। ওদিকে রাঘবের চিৎকার শুনল ওরা, অর কেউ আসুন। সুমন যোগী। শঙ্কর স্বর্ণেন্দুকে বলল, দাদা, ও পারবে না।

স্বর্ণেন্দু জিজ্ঞাসা করল, সেকি, তাহলে আইডেন্টিফিকেশন হয়নি?

—না দাদা। ও ভেতরে ঢুকতেই পারল না। ও পারবে না।
—আচ্ছা, আরেকজন কেউ এসো। আমিও দাঁড়াচ্ছি ওখানে।

রাজীব বলে আরেকটা ছেলে শংকরের সঙ্গে ঢুকল। রাঘব ওদের বলল, অন্দরে যাও। একটা সই করতে হবে। স্যার আছে ভেতরে।

দুজনে ঢুকল, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বেরিয়েও এল। সঙ্গে সুদীপ মাইতি, হাতে একটা কাগজ। স্বর্ণেন্দুকে দেখে চশমার ফাঁক দিয়ে সুদীপ মাইতির চোখটা কোনও কারণে জ্বলজ্বল করে উঠল। বলল, এই তো আপনি আছেন! ওরা পারবে না। সব টিপ্পা। (স্ট্যাম্প) প্যাডটাও অফিসে ফেলে এলাম। আপনি একটা সাইন করে কাজটা সেরে দিন, প্লিজ! বডি ঢোকাতে ঢোকাতে এমনিই চারটে বেজে যাবে।

স্বর্ণেন্দু অবাক। কাজ সেরে দেওয়া মানে তো সেই আইডেন্টিফিকেশন, যেটা তার দ্বারা সম্ভব ছিল না বলেই এতক্ষণ ধরে কাজটা হয়ে ওঠেনি, শেষে কিনা তাকেই…

—আহা, আপনাকে তো বললাম যে, আমি ওকে চিনি না। জাস্ট হেল্প হবে বলে আসা!

কী এক অজানা অস্বস্তিতে স্বর্ণেন্দুর মাথা আর কাজ করছে না। সুদীপ মাইতি বলতে যাবে, তার আগে রাঘবই বলে উঠল, সাইন একজনের হলেই হবে। ওদের একজন তো থাকছে, সে তো চিনে। আপনি একটা সাইন করে দিবেন, বাস। অত কে দেখতে যাচ্ছে! আপনার কাছে পেন আছে তো?

তাই তো! এটা তো তার মাথায় আসেনি।

ঝোলাব্যাগ থেকে লাল-সাদা পেনটা বার করে আনল। বাসের ওই দুজন উদ্ধারকারীর আরও একবার ধন্যবাদ প্রাপ্য।

সই হয়ে গেলে সুদীপ মাইতি বলল, এবার দুজনে একবার আসুন। বডির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ফটো নিতে হবে।

মাঝারি প্যাসেজটা ধরে স্বর্ণেন্দু এগোল। পিছু পিছু শঙ্কর। এধার-ওধার মিলিয়ে অন্তত পাঁচখানা দেহ। যত ভেতরে ঢোকে, গন্ধের চরিত্রটা প্রকট হয়। রাঘব বা সুদীপ মাইতির অবশ্য সেসব সয়ে গিয়েছে। স্বর্ণেন্দুর মাস্ক নেওয়া হয়নি, পকেট থেকে রুমাল বার করেই চাপা দিল। রিমিকে এসব বললে রাগারাগি করবে।

প্যাসেজের একদম শেষপ্রান্তে যেখানে রাস্তাটা ঘুরে ভেতরের দিকে চলে গিয়েছে, ওই অবধিই তাদের যাওয়ার ছাড়পত্র আছে। ওখানেই সুমন যোগীর দেহটা পরিপাটি চাদর মুড়ে রাখা। পায়ের দিকে নম্বরটা ঝুলছে— ৩৬৮। সুদীপ মাইতি চাদর সরিয়ে শঙ্করের দিকে তাকাল। এই মুখটাই তো? শঙ্কর মাথা নাড়ল। হ্যাঁ।

আইডেন্টিফায়েড!

স্বর্ণেন্দুর মাথা নাড়ার প্রশ্ন নেই। বরং ছেলেটাকে দেখার একটা সুযোগ হল। ডান চোখের নিচে কড়া কালসিটের দাগ। নাকের তলায় গোঁফটা সবে উঠতে শুরু করেছিল। আরও বেশি কিছু দেখার আগেই আবারও সুদীপ মাইতি নির্দেশ দিল, দুজনে এবার মাথার কাছে দাঁড়ান। একটা ফটো নেব। পকেট থেকে ততক্ষণে তার ফোন বেরিয়ে এসেছে।

স্বর্ণেন্দুর একটা খচখচানি হচ্ছিল, শেষমেশ থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলল, আচ্ছা, আমি তো ওকে চিনতাম না। কিন্তু সই করে দিলাম, এখন ফোটোও উঠে যাচ্ছে। তা এটা নিয়ে পরে প্রবলেম হবে না তো?

ফোনক্যামেরাটা চালু করে সুদীপ মাইতি আশ্বাস দিল তাকে, না না, এটা জাস্ট রেকর্ড রাখার জন্য। যে সই করে, তার একটা ফটো দেখাতেই হয়। কে চিনত, কে চিনত না, এসব অত লাগে না। আপনি দাঁড়ান। দুজনেই আঙুল দিয়ে ওর দিকে দেখান। আরে ভাই, তুমি মাস্কটা খোলো। মুখ না দেখা গেলে হবে না।

শঙ্কর মাস্কটা খুলে গলার কাছে নামিয়ে রাখল। স্বর্ণেন্দু রুমালটা বাঁহাতে রাখল। সুদীপ মাইতি বলল— রেডি! তারপরেই সাদা ক্লিক বাটনে বুড়ো আঙুল বসাল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই…

ডানহাতের তর্জনীটা সুমন যোগীর মাথার দিকে তাক করা, চোখজোড়া ক্যামেরার দিকে স্থির— এই সময়ের প্রবল পাঠকপ্রিয় কলামনিস্ট, কিবোর্ডচি ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্ণেন্দু গুণ মৃত ফুটবলারের সামনে দাঁড়িয়ে আলতো করে হেসে উঠলেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5337 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...