নহি যন্ত্র— আট

সৈকত ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

—আজ থেকে এত গাদাগুচ্ছের বইপত্র না-পড়া, ইন্টারনেট তো হাজার আলোকবর্ষ দূরের কথা— কাগজের ব্যবহার অবধি না-জানা, প্রদীপের আলোয় অন্ধকার দূর করা কিছু মানুষের মনে জ্ঞানলাভের এত ইচ্ছা, যে তারা একটা এমন তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা শুরু করে দিয়েছিল! ধন্য মানবজন্ম, ধন্য এই সভ্যতা। মঞ্জুশ্রী নিজের মনেই বলল কথাগুলো।
—তবেই ভাব! আর আমরা আজকের এই এআইয়ের যুগে বসে নিজেদের ‘আই’ ব্যবহার করতে আলস্য বোধ করি। কিছু একটা না করার জন্য হাজার একটা অজুহাত খুঁজি। জয়দা যোগ করল।
—বোধহয় এত সহজলভ্যটাই আমাদের সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বহন করে আনা স্বাভাবিক জ্ঞানের প্রবৃত্তিটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আগে কিছু জানতে গেলে কষ্ট করতে হত। এখন হাতের মোবাইলের স্ক্রিনে স্পর্শ করলেই সব উত্তর হাজির। তাই বুঝি জ্ঞানের দাম ছিল আগে, এখন আর নেই। মঞ্জুশ্রী আবার বলল।

শুভ এতক্ষণ কিছু বলেনি। কিন্তু এবার মঞ্জুশ্রীকে বলল, তুই কেন এত টেনশন নিচ্ছিস?

—বৌদ্ধদের জ্ঞানের দেবতার নাম মনে আছে? জয়দা মিটিমিটি হেসে প্রশ্ন করল।

জয়দা তিব্বতের গল্প বলার সময় বলেছিল। বাকি সব মনে না থাকলেও এটা ভুলিনি আমরা কেউই। আমি আর শুভ সমস্বরে বললাম, মঞ্জুশ্রী!

—অতএব, কেন টেনশন নেবে না? বলেই জয়দা হেসে ফেলল। সঙ্গে আমরাও।
—যাই হোক, পাইয়ের কথা হচ্ছিল। ব্যাবিলন থেকে পাওয়া যে মৃৎফলকের কথা শুরুতে বলছিলাম, সেখানে ফেরত যাই। সেই ফলকে দেখা যাচ্ছে একটা বৃত্ত আঁকা, উপরে লেখা ৩, মাঝে লেখা ৪৫ আর ডানদিকে ৯। অবশ্যই কীলক লিপিতে। ছবি দেখে বেশ একটা গুপ্তধনের সঙ্কেত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইন্ডিয়ানা জোন্স হলে হয়তো একটা অভিযানই করে ফেলতেন এর জন্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সে গুড়ে বালি দিয়ে বলেছেন যে এটা সঙ্কেত-টঙ্কেত কিস্যু না, একটা অঙ্ক। পাইয়ের মান নির্ণয়ের জন্য কষা হয়েছিল। অবিশ্যি তখন ‘পাই’ নামটার অস্তিত্ব ছিল না— কারণ গ্রিকরা তখনও সভ্যতার আলো দেখেনি। তবে সুমেরীয়রা তার মান বের করেছিল তিন। যেটা কাছাকাছি কিন্তু দশমিকের পরের সংখ্যাগুলো অনুপস্থিত। কেন বল তো?
—সুমেরীয়রা দশমিকের ব্যবহার জানত না? মঞ্জুশ্রী উত্তর দিল।
—এক্সেলেন্ট! সুমেরীয়রা দশমিকের ব্যবহার জানত না শুধু না, তাদের নাম্বার সিস্টেম বা যাবতীয় হিসাবনিকাশ দশের বদলে ষাটের এককে চলত।
—ষাট! কী বোকাবোকা! শুভ মন্তব্য করল।
—বালাই ষাট! বোকা হবে কেন? ব্যবহারের সুবিধার জন্য তৈরি হয়েছিল এই সেক্সাজেসিম্যাল সিস্টেম। ষাটের ব্যবহার সুবিধা এই কারণে যে ষাটকে কতগুলো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায় দেখ— এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, দশ, বারো, পনেরো, কুড়ি, তিরিশ। আর তখন প্রতি আঙুলে দুই করের মাঝের জায়গাটাকে এক ধরে আঙুল গোনা হত। আর বুড়ো আঙুল নিজেকে গুনত না। ফলে এক হাতে তিন গুণ চার আঙুল মানে বারো অবধি গোনা হত। বারো ষাটের একটা গুণনীয়ক। তখন তো আর ডিজিটাল ক্যালকুলেটর ছিল না! আবার অনেকে বলেন যে সুমেরীয়রা বছরে তিনশো ষাট দিন হিসাব করত। তিনশো ষাটকেও ষাট দিয়ে ভাগ করা যায়। মোদ্দা কথা হল, তখনকার হিসাবে ষাট খুব সুবিধার সংখ্যা ছিল। আর তার একটা প্রয়োগ আমরা এখনও নিত্য ব্যবহার করে চলেছি। কী বল তো?
—ঘড়ি? তড়িঘড়ি বললাম আমি।
—ঠিক। সময়ের মাপ। এটা অবিশ্যি রোমানরা দিয়েছে। কিন্তু রোমানরাও এই ষাটের ব্যবহার সুমেরীয়দের থেকেই পেয়েছিল। যাই হোক, যে কথা বলছিলাম। এই পাইয়ের মান সুমেরীয়দের মতো আমাদের ভারতবর্ষেও মুনিঋষিরাও তিন ধরে চলতেন। তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় মহাভারতে।
—মহাভারতে পাই? অবাক হওয়ার পালা আমাদের।
—ওই যে বলে না, যাহা নেই ভারতে, তাহা নেই ভারতে। প্রথম ‘ভারত’ অর্থাৎ মহাভারত। মহাভারত হল এমন এক মহাকাব্য যাতে তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, লোকাচার থেকে ধর্মাচার— সব কিছু স্থান পেয়েছে। সেখানে পাই পাওয়া যাবে না, হয়? মহাভারতের ভীষ্মপর্বে সঞ্জয় যখন ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধের লাইভ রিলে করছিলেন, তখন যুদ্ধের কমেন্টারির ফাঁকে ফাঁকে সমগ্র জম্বুদ্বীপ, আকাশের গ্রহনক্ষত্র ইত্যাদি নিয়েও অনেক কিছু বলছিলেন। যেমন টেস্ট ক্রিকেটের ধারাভাষ্যের সময় মাঝেমধ্যেই হর্ষ ভোগলে কিংবা সুনীল গাভস্কর প্রায়ই নানাবিধ অক্রিকেটীয় বাক্যালাপ করে থাকেন আর কি। এক জায়গায় যখন বোধহয় যুদ্ধের ফাঁকে পাণ্ডব-কৌরবরা একটু জিরিয়ে-টিরিয়ে নিচ্ছিল, ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করছেন যে, আকাশের রাহু, চাঁদ আর সূর্য সম্পর্কে কিছু বলো দেখি। উত্তরে সঞ্জয় বলছেন, হে কুরুশ্রেষ্ঠ, রাহুর কথা যখন জিজ্ঞেসই করলেন বলে রাখি যে রাহু আকৃতিতে গোলাকার, ব্যাস বারো হাজার যোজন এবং এর পরিধি ছত্রিশ হাজার যোজন। চাঁদের সাইজ একটু ছোট— ব্যাস এগারো হাজার যোজন আর পরিধি তেত্রিশ হাজার। আর সূর্যের আকৃতি আরও ছোট। ব্যাস মোটে দশ হাজার যোজন এবং পরিধি তিরিশ হাজার যোজন।
—অতএব সঞ্জয়ের হিসাবে পাই-এর মান যদি হয় তিন তাহলে তাঁর বর্ণিত রাহু, চন্দ্র এবং সূর্যের ব্যাস এবং পরিধির হিসাব মিলে যাচ্ছে। মঞ্জুশ্রী চটপট বলে উঠল।
—রাইট। তবে এই দিক থেকে প্রাচীন মিশরীয়দের গাণিতিক প্রতিভা এগিয়ে ছিল বেশ কয়েক কদম। বৃত্তের ক্ষেত্রফল পরিমাপ করার জন্য একটা কৌশল বের করেছিল তারা। রাইন্ড প্যাপিরাসের কথা বলছিলাম না? তার পঞ্চাশ নম্বর প্রশ্নটা এরকম— একটি বৃত্তাকার ক্ষেত্রের ব্যাস ৯ খেত হলে, তার ক্ষেত্রফল কত? খেত ছিল ওদের একটা দৈর্ঘ্য পরিমাপের একক। এখনকার হিসাবে এক খেত সমান প্রায় বাহান্ন মিটার ধরতে পারিস। একটু বেশি। এই অঙ্কের নিচে উত্তরও লেখা আছে— ৯ খেতের চেয়ে এর ১/৯ অংশ, অর্থাৎ ১ খেত বাদ দিলে পড়ে থাকে ৮ খেত। একে ৮ দিয়ে গুণ করলে দাঁড়ায় ৬৪— অর্থাৎ এই বৃত্তের ক্ষেত্রফল ৬৪ সেটজাত। সেটজাত হল ক্ষেত্রফলের একক। এবার আমাদের আধুনিক গণিত অনুযায়ী বৃত্তের ক্ষেত্রফল ব্যাসার্ধের বর্গের সঙ্গে পাইয়ের গুণফলের সমান। অতএব উপরের অঙ্কটার সঙ্গে যদি মেলাই, তাহলে রাইন্ড প্যাপিরাসের রচয়িতার মতে পাই-এর মান দাঁড়ায় ২৫৬/৮১ অর্থাৎ ৩.১৬-র মতো। আশ্চর্যের বিষয় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে মিশরীয়দের হিসাব আধুনিক হিসাবে পাই-এর মানের খুবই কাছাকাছি।
—কিন্তু এই আজব ফর্মূলাটা কোদ্দিয়ে এল? শুভ প্রশ্ন করল।
—ভাল প্রশ্ন। জয়দা একই দিনে শুভকে দুবার তারিফ করল। আমার জ্ঞাতকালের মধ্যে এমন হয়নি। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, ওই রাইটিং প্যাডটা দে তো।

আমি চটপট হাত বাড়িয়ে প্যাড আর পেনটা বাড়িয়ে দিলাম জয়দার দিকে। সে কাগজে কী একটা আঁকতে আঁকতে বলল, এই প্রশ্নের উত্তর আছে ওই প্যাপিরাসেই। শুধু পাতা উল্টে যেতে হবে আটচল্লিশ নম্বর অঙ্কে। সেখানে একটা অষ্টভুজের ক্ষেত্রফল বের করা হয়েছে। এই দ্যাখ, এটা একটা বর্গক্ষেত্র। বলে কাগজে আঁকা নকশাটা দেখাল। এবার এই বর্গক্ষেত্রের মধ্যে একটা অষ্টভুজ আঁকলাম। এবার ওই প্যাপিরাসে মিশরীয় গণিতজ্ঞ দেখিয়েছেন যে বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের মোটামুটি একের নয়ভাগ বাদ দিলে এই অষ্টভুজটার ক্ষেত্রফল পাওয়া যাবে। এবার এই অষ্টভুজটার মধ্যে যদি এইভাবে একটা বৃত্ত আঁকি এইভাবে, তবে দেখতেই পারছিস যে অষ্টভুজ আর বৃত্তটার ক্ষেত্রফল খুব কাছাকাছি হওয়া উচিত। অতএব বর্গক্ষেত্রের মধ্যে যদি একটা বৃত্ত আঁকা হয়, যা বর্গক্ষেত্রের বাহুগুলিকে স্পর্শ করে থাকবে, তাহলে সেই বৃত্তের ক্ষেত্রফল হবে বর্গের ক্ষেত্রফলের প্রায় নয় ভাগের আটভাগ। এবার আগের পঞ্চাশ নম্বর অঙ্কে ফেরত যাওয়া যাক। বৃত্তের ব্যাস যদি ৯ হয়, তার অর্থ ওই পরিবেষ্টনকারী বর্গক্ষেত্রের একটা বাহুর দৈর্ঘ ৯— বাকিটা জলবৎ তরলং।

চিত্র ৩ – জয়দার আঁকা নকশা

 

—বৃত্তের বাইরে এবং ভিতরে বহুভুজ এঁকে তার মাধ্যমে বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় এবং তার থেকে পাই-এর মান বের করার এই পদ্ধতি চলেছে প্রায় সপ্তদশ শতাব্দী অবধি। অবশ্যই প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সুবিধা হয়েছে হিসাব করার। অষ্টভুজ বা বর্গক্ষেত্রর জায়গায় আরও অনেক বাহুবিশিষ্ট বহুভুজের ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক বেশি সূক্ষ্মতার সঙ্গে পাই-এর মান নির্দিষ্ট করা গেছে। যেমন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আর্কিমিডিস খ্রিস্টের জন্মের আড়াইশো বছর আগে মিশরীয় পদ্ধতির সঙ্গে পিথাগোরাসের তত্ত্ব যোগ করে বের করেছিলেন পাই-এর মান। অবিশ্যি একটা নির্দিষ্ট মানের বদলে আর্কিমিডিস বলেছিলেন, পাই-এর মান ২২/৭-এর কম এবং ২২৩/৭১-এর বেশি হবে।
—আমরা কি তবে আর্কিমিডিসের কথামতো ইশকুলে পাই-এর মান ২২/৭ ধরে অঙ্ক করেছি? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
—ঠিকই ধরেছিস। এই জ্যামিতির সাহায্যে পাই-এর মান নির্ণয়ের পদ্ধতি চলেছিল বহুদিন। পরিবর্তন এল ষোড়শ শতাব্দী-সপ্তদশ শতাব্দীর আশেপাশে। ততদিনে হাজার হাজার বাহুবিশিষ্ট বহুভুজের মাধ্যমে পাই-এর মান দশমিকের পর প্রায় পঁয়ত্রিশটা সংখ্যা অবধি বের করে ফেলেছেন অনেকে। পঞ্চদশ শতাব্দী নাগাদ আমাদের কেরালাতে বিখ্যাত গণিতজ্ঞ মাধব ত্রিকোণমিতির সাইন, কোসাইন, ইত্যাদির মাননির্ণায়ক অসীম শ্রেণি আবিষ্কার করেন। অবিশ্যি সাইন বা কোসাইন-এর বদলে তাদের তখন ভারতীয় নাম ছিল যথাক্রমে জ্যা এবং কোটিজ্যা। মাধব এই জ্যা এবং কোটিজ্যা-র অসীম শ্রেণি থেকে বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত অর্থাৎ পাই-কেও প্রকাশ করেছিলেন আর একটা অসীম শ্রেণি হিসাবে। এর প্রায় তিনশো বছর পর ইউরোপে অনুরূপ পদ্ধতিতে পাই-এর মান বের করার চেষ্টা করেন বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত দুইজন— গটফ্রিড উইলহেলম লিবনিজ এবং স্যার আইজ্যাক নিউটন।
—বাপরে। দুইজন বাঘা বাঘা বৈজ্ঞানিক… তা কী পাইলেন তাঁরা? শুভ ফুট কাটল।
—যাহা চাইলেন, তাহাই পাইলেন। অবিশ্যি দুজনের পদ্ধতি আলাদা ছিল। স্কুলে থাকতে তো পড়েছিলিস, মনে আছে কি না জানি না, নিউটনের একটা বিখ্যাত আবিষ্কার ছিল দ্বিপদ উপপাদ্য বা যাকে ইংরেজিতে বলে বাইনোমিয়াল থিওরেম। ষোলশো ছেষট্টি সালে ইংল্যান্ডে বিউবনিক প্লেগ মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, গোটা দেশে লকডাউনের মতোই অবস্থা। নিউটনও গৃহবন্দি। কিন্তু প্রতিভাবান মানুষের মস্তিষ্কে তো আর লকডাউন হয় না। বাড়ি বসে খাতার পাতায় আঁক কষে আবিষ্কার করলেন বিখ্যাত দ্বিপদ উপপাদ্য— আর এই দ্বিপদ উপপাদ্যর খুব সহজ প্রয়োগে পাই-এর মান।
—ষোলশো ছেষট্টি সাল মানে নিউটনের বয়স তখন মাত্র… তেইশ বছর! মঞ্জুশ্রী হিসাব করে বলল।
—ভাব তবে। তেইশ বছর বয়সে আমরা বিড়ি সিগারেট খেয়ে আড্ডা মেরে দিন কাটাচ্ছিলাম। আর এই ভদ্রলোক আজকের ইন্টারনেটের যুগের তুলনায় প্রায় প্রাগৈতিহাসিক যুগে তেলের বাতির আলোয় খাতার পাতায় খাগের কলম দিয়ে কী না কী করে ফেলেছেন! জিনিয়াস আর সাধারণ মানুষের তফাত এইখানেই। অন্যদিকে আর একজন জিনিয়াস ইউরোপের অন্য এক দেশে বসেও একই কাজ করলেন প্রায় সমসময়ে।
—লিবনিজ?
—গটফ্রিড উইলহেলম লিবনিজ। তাঁর গণনা ছিল একদম আমাদের দেশের মাধবের পদ্ধতিতে। অসীম শ্রেণির সাহায্যে। না জেনেই করেছিলেন অবিশ্যি। ওই সময় ভারতীয় গণিতজ্ঞের কাজ ইউরোপে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভবই ছিল। ফলে নাম হল লিবনিজের। লিবনিজ সিরিজ হিসাবে বিখ্যাত হল এই অসীম শ্রেণি। পরে মাধব ওই একই কাজ লিবনিজের অনেক আগে করেছিলেন— সেটা জানা যায়। ফলে মাধবের নামও জুড়ে দেওয়া হয় তার সঙ্গে— নতুন নাম হয় মাধব-লিবনিজ সিরিজ। তবে মজার ব্যাপার কী জানিস, এই যে এত সব তাবড় বৈজ্ঞানিকেরা— তাঁরা কেউই কিন্তু পাই-এর নাম পাই রাখেননি। পাই-এর নামকরণ হয় আরও কিছু বছর পরে। সতেরোশো ছয় সালে। তার আগে একটা ছোট্ট ক্যুইজ। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা কে?

যথারীতি আগে জানতাম এবং এখন ভুলে গেছি। শুভ আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি এমন সময় বিশ্বাসঘাতকের মতো মঞ্জুশ্রী বলে উঠল, স্যর উইলিয়াম জোন্স না?

—কারেক্ট!

জয়দা খুশি হয়ে গেল উত্তর পেয়ে। আমরা বেকুব বনে কটমট করে মঞ্জুশ্রীর দিকে তাকালাম বটে কিন্তু ও পাত্তা দিল না। জয়দা আবার বলতে শুরু করল, এই স্যার উইলিয়াম জোন্সের বাবার নামও ছিল উইলিয়াম জোন্স। অবিশ্যি এ হামেশাই হত সেকালে ইউরোপের বনেদি বাড়িতে। এই সিনিয়ার উইলিয়াম জোন্স ছিলেন এক বিখ্যাত গণিতজ্ঞ। নিউটন এবং এডমন্ড হ্যালির বন্ধু। সতেরোশো ছয় সালে তিনি Synopsis Palmariorum Matheseos নামে একটা অঙ্কের বই প্রকাশ করেন। সেখানে নানাবিধ তত্ত্বকথার মধ্যে কিছু কথা ছিল পাই-এর মান নির্ণয় প্রসঙ্গেও। এবং সেখানেই সর্বপ্রথম গ্রিক বর্ণ পাই ব্যবহার করেন বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাতকে প্রকাশ করার জন্য। তবে পাই-এর নাম প্রচার পায় আর এক বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকের হাত ধরে— যাঁর নাম লিওনার্ড অয়লার।

—তা পাই যে একটা ইরর‍্যাশনাল নাম্বার বা অমূলদ সংখ্যা— এই ব্যাপারটা কি তাহলে নিউটন বা লিবনিজই আবিষ্কার করেন? নাকি মাধব লিখে গেছিলেন? মঞ্জুশ্রীর প্রশ্ন।
—কেউই না। অবিশ্যি মাধব লিখে গেছিলেন কি না জানি না, কারণ তাঁর লেখা বইপত্র কিছুই অবশিষ্ট নেই। কালের স্রোতে কোথায় যে হারিয়ে গেছে কেউ জানে না।
—তাহলে? জানা গেল কী করে এই অসীম শ্রেণির সাহায্যে পাই-এর মান নির্ণয়ের চেষ্টার কথা? এবার প্রশ্ন করি আমি।
—ওঁর শিষ্যদের ক্লাসনোটস দেখে। বলে জয়দা হাসল। মাধবের গুণী শিষ্যকুল ছিল। তাঁরা নানারকম নোটস নিয়ে রেখেছিলেন গুরুবাক্যের। সেইসব অনুলিখন, টীকা ইত্যাদি থেকে জানা যায় তাঁর কাজ সম্বন্ধে। আসল বইপত্র হাওয়া হয়ে গেছে। যাই হোক, মঞ্জুশ্রীর প্রশ্নের উত্তর দিই এবার। এই পাই যে আসলে অমূলদ সংখ্যা সে কথা প্রথম অঙ্ক কষে দেখান স্যুইস বৈজ্ঞানিক যোহান ল্যাম্বার্ট। ল্যাম্বার্ট সতেরোশো একষট্টি সালে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে পাই আসলে একটা অমূলদ সংখ্যা— অর্থাৎ একে দুটি সংখ্যার ভগ্নাংশ হিসাবে কখনওই প্রকাশ করা যাবে না এবং এটা একটা এমন সংখ্যা যার মান সারাজীবন ধরে হিসাব করে গেলেও শেষ হবার নয়। দশমিকের পর গড়গড়িয়ে চলতেই থাকবে।
—সাধে কি রবিঠাকুর লিখে গেছেন, মধুর তোমার শেষ যে না পাই— প্রহর হল শেষ! মঞ্জুশ্রী এবার ফুট কাটে।

আমরা সকলে হেসে উঠি।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5333 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...