বিস্মৃত বন্ধুত্বের ইতিহাস: তেহরান ঘোষণা থেকে আজকের ভারতের রহস্যময় নীরবতা

আশিস গুপ্ত

 


মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বলন্ত পরিস্থিতিতে ভারতের নীরবতা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি নয় বরং এটি গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রশ্নাতীত নেতৃত্বের মূলে কুঠারাঘাত। গত কয়েক বছর ধরে ভারত নিজেকে দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর মসিহা হিসেবে জাহির করে এলেও ইরানের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলার বিষয়ে এই সুবিধাবাদী অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলির মনে সন্দেহের বীজ বপন করেছে। ব্রিকস-এর বর্তমান সভাপতি হিসেবে ভারতের যেখানে একটি ন্যায়সঙ্গত ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল সেখানে ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের তুষ্টির রাজনীতি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে আজ একটি প্রহসনে পরিণত করেছে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত ভারত আজ যেন তার ঐতিহ্যবাহী আদর্শ বিসর্জন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সামরিক অক্ষের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ছে এবং একটি স্বাধীন প্রতিবেশী রাষ্ট্র তথা ব্রিকস সদস্যের ওপর এই হামলার বিষয়ে ভারতের দ্বিমুখী আচরণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে

 

২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। গাজার তেল আল-হাওয়া এলাকা থেকে পরিবারের সঙ্গে পালানোর সময় পাঁচ বছরের হিন্দ ও তার স্বজনদের গাড়িটি ইজরায়েলি বাহিনীর কবলে পড়ে। গুলিতে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য মারা গেলেও হিন্দ ও তার ১৫ বছর বয়সী তুতো ভাই লায়ান হামাদ বেঁচে ছিল। সেই গাড়িটির মধ্যে থেকেই রেড ক্রিসেন্ট ভলান্টিয়ারদের ফোন করেছিল হিন্দ। সেই অডিওতে শোনা যায়, ঘাতক ট্যাঙ্কগুলো তাদের ক্রমশ ঘিরে ধরছে। দীর্ঘ আলোচনার পর রেড ক্রিসেন্ট একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর অনুমতি পেলেও পরবর্তীতে সেটির আর হদিস পাওয়া যায়নি। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ৩৩৫টি বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া সেই গাড়ি এবং তার পাশেই ভস্মীভূত একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে উদ্ধার করা হয় হিন্দ ও উদ্ধারকারী চিকিৎসকদের নিথর দেহ।[1] এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের হ্যামিল্টন হলের নাম পরিবর্তন করে ‘হিন্দ’স হল’ রাখার দাবি তুলেছিল। শিউরে ওঠা ওই বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তিউনিসিয়ার পরিচালক কাউথার বিন হানিয়া নির্মিত ডকু-ফিচার ফিল্ম দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব। চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ৯৮তম অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল ছবিটি। ২০২৬ সালের অস্কারের দৌড়েও সামিল সেই ছবিটি ভারতীয় দর্শকদের কাছে পৌঁছাবে না। চলতি সপ্তাহে ভারতে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দিনের ইজরায়েল সফর থেকে ফেরার পরদিনই সেন্সর বোর্ডের সদস্যদের জন্য সিনেমাটির স্ক্রিনিং করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ছবিটির পরিবেশকদের জানানো হয় যে, এই ছবি মুক্তি পেলে ভারত ও ইজরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে।[2] উল্লেখ্য, আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো ইজরায়েলের পরম মিত্র দেশগুলিতে ছবিটি ইতিমধ্যেই মুক্তি পেয়েছে।[3] ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ছবিটির পরিচালক সমাজমাধ্যমে আক্ষেপ করে লিখেছেন যে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য একটি গণতন্ত্রের মধ্যেকার সখ্যতা কি এতটাই ঠুনকো যে একটি চলচ্চিত্র তা ভেঙে দিতে পারে?

 

ঠুনকো নয়! আজকের ভারতের বিদেশনীতি এক চাটুকারের দেওয়ালের উপর বসে থাকা। কোনও স্থায়ী বন্ধু নেই, যখন যেদিকে যার পাল্লাভারী, তার পক্ষেই চাটুকারিতা। সহস্রাব্দ প্রাচীন দুই সভ্যতার আত্মিক বন্ধন যখন কূটনীতির গোলকধাঁধায় পথ হারায়, তখন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসে এক চরম অকৃতজ্ঞতার আখ্যান। ভারত ও ইরানের সম্পর্কের শিকড় কোনও আধুনিক রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তা প্রাচীন আর্য সভ্যতার সংযোগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব পর্যন্ত বিস্তৃত যা ভারতের স্থাপত্য, সাহিত্য এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে ঋদ্ধ করেছে। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের বিদেশনীতি যে গভীর নৈতিক ও কৌশলগত সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, তা এই হাজার বছরের ঐতিহ্যে কেবল ফাটল ধরায়নি, বরং আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির নিরপেক্ষতার দাবিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে জেনেভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে পাকিস্তান যখন কাশ্মির ইস্যুতে ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোণঠাসা করার নীল নকশা তৈরি করে ফেলেছে, তখন ভারতের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী দীনেশ সিং শয্যাশায়ী ও গুরুতর অসুস্থ হলেও দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় স্ট্রেচারে শুয়ে এক দিনের ঝটিকা সফরে তেহেরানে পৌঁছেছিলেন। রাষ্ট্রপতি আকবর হাশেমি রাফসানজানি প্রোটোকল ভেঙে তাঁর সেই অসুস্থ বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে আশ্বস্ত করেছিলেন যে ইরান কখনও ভারতের ক্ষতি হতে দেবে না এবং ইরানের সেই ঐতিহাসিক সমর্থনেই পাকিস্তান পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।[4] এই বন্ধুত্বের ধারা বজায় রেখে ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ি ঐতিহাসিক তেহরান ঘোষণা স্বাক্ষর করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন যে ভারত ও ইরান একটি ন্যায়সঙ্গত ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দেশগুলির সার্বভৌমত্বের অখণ্ডতা রক্ষায় বিশ্বাসী। বাজপেয়ি সেই সফরে আরও উল্লেখ করেছিলেন যে ভারত ও ইরানের সম্পর্ক কেবল দুটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি একটি গভীর সভ্যতার সেতুবন্ধন যা এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৌশলগত অংশীদারিত্বের শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে।[5] এমনকি ২০১২ সালেও যখন পশ্চিমি দুনিয়া ইরানকে একঘরে করার চেষ্টা করছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং সমস্ত মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে তেহেরানে জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে ভারতের বিদেশনীতি নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত।[6]

খামেনেইয়ের সঙ্গে বাজপেয়ি, তেহরান ২০০১

 

ভারতের বিদেশনীতির ইতিহাস ছিল আত্মমর্যাদা ও সাহসিকতার, যেখানে বিশ্ব-রাজনীতির মেরুকরণের যুগে জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য এবং ভারত ছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি ওয়াশিংটনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং ভারতের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন যা প্রমাণ করেছিল যে ভারতের নীতি নির্ধারিত হয় নিজস্ব আদর্শ ও ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে।[7] অথচ আজ তিন দশক পর সেই একই ইরানের সার্বভৌমত্ব যখন ভুলুণ্ঠিত, তখন ভারতের বিদেশনীতি এক চরম বিচ্যুতির স্বাক্ষর রাখছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিধ্বংসী হামলা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইর হত্যাকাণ্ড যখন বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে, তখন ব্রিকস-এর বর্তমান সভাপতি হিসেবে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক ও একপাক্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার একটি প্রতিরোধমূলক প্রচেষ্টা হিসেবে এই হামলাকে বর্ণনা করা হলেও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এমন কোনও প্রমাণ পায়নি[8] এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় মার্কিন-ইরান পারমাণবিক আলোচনার তৃতীয় ধাপ শেষ হওয়া সত্ত্বেও কোনও কংগ্রেসীয় অনুমোদন ছাড়াই এই হামলা চালানো হয়। বিশ্ব এটিকে মার্কিনিদের পছন্দ হিসেবে দেখলেও ভারত এর কোনও সমালোচনা না করে কেবল একে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে, যা আসলে কৌশলগত অস্পষ্টতার আড়ালে নৈতিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা মাত্র। আধুনিক যুগেও ইরান ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি সরবরাহকারী দেশ এবং কৌশলগতভাবে চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানে ভারতের প্রবেশের একটি বিকল্প পথ হিসেবে স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও ব্রিকসের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র যখন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছে, তখন ভারত তার রহস্যময় নীরবতার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বকীয়তা ও বন্ধুত্বের মর্যাদা হারিয়েছে। ব্রাজিল এই হামলাকে শান্তি প্রক্রিয়ার অন্তরায় বলেছে, রাশিয়া একে সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক সশস্ত্র আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছে এবং চিন একে জাতিসংঘ সনদের অবমাননা হিসেবে বর্ণনা করলেও ভারত নীরব থেকেছে।

 

ব্রিকস জোটের নতুন সদস্য ইরানের প্রতি ভারতের এই উদাসীনতা প্রমাণ করেছে যে ভারতের বিদেশনীতি এখন অনেকাংশেই ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের স্বার্থ দ্বারা চালিত হচ্ছে। ১ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা জানালেও খামেনেইর হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর বিষয়ে ভারতের নীরবতা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ ও শান্তির আহ্বান জানানোর বিষয়টি একপাক্ষিক মনে হয়, কারণ তিনি ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। ভারতের এই অ-সংলগ্ন অবস্থানের ওপর সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে প্রথম হামলার দুদিন আগে থেকে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বহুলপ্রচারিত সফরে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে আলিঙ্গন করেন এবং পরবর্তীতে ভারত মহাসাগরে ভারতের আয়োজিত মহড়া শেষে ফেরার পথে ইরানি যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা আক্রান্ত হলে তিনি নীরব থাকেন। ব্রিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারতই একমাত্র দেশ যারা এখনও ইরান আক্রমণের সরাসরি নিন্দা করেনি। এ নিয়ে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও কৌশলগত সম্পর্ক বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবন বলেছেন যে এই যুদ্ধে ভারত বস্তুনিষ্ঠভাবে আক্রমণকারীদের পক্ষ নিয়েছে। রাঘবনের মতে ভারত কী বলছে সেটা বড় কথা নয় বরং ভারত কী করছে এবং অন্যরা তার কাজকে কীভাবে দেখছে সেটাই আসল, এবং এই ক্ষেত্রে ভারতকে আক্রমণকারীদের পাশেই দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৩৬ ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রীর ইজরায়েল সফরকে অস্বাভাবিক অভিহিত করে তিনি বলেন যে যুদ্ধের প্রাক্কালে সেখানে যাওয়ার মতো কোনও বিশেষ কারণ ছিল না, এবং এটা ভাবা অসম্ভব যে ভারত সরকার আসন্ন আক্রমণ সম্পর্কে অবগত ছিল না। ইজরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভাষণে ভারতের দৃঢ়ভাবে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর বার্তাটি কেবল হামলার প্রতি সমর্থনই নয় বরং গাজায় ইজরায়েলের দীর্ঘকালীন সামরিক অভিযানের প্রতিও পরোক্ষ সমর্থনের মতো শোনায়। রাঘবন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাতে ভারতের ব্যর্থতা, শোকপ্রকাশে বিলম্ব এবং আইআরআইএস ডেনা রণতরী ডুবিয়ে দেওয়ার পর ভারতের নীরবতাকে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর বলে সতর্ক করেছেন।[9]

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বলন্ত পরিস্থিতিতে ভারতের নীরবতা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি নয় বরং এটি গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রশ্নাতীত নেতৃত্বের মূলে কুঠারাঘাত। গত কয়েক বছর ধরে ভারত নিজেকে দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর মসিহা এবং জি-২০-র মতো মঞ্চে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে জাহির করে এলেও ইরানের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলার বিষয়ে এই সুবিধাবাদী অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলির মনে সন্দেহের বীজ বপন করেছে। ব্রিকস-এর বর্তমান সভাপতি হিসেবে ভারতের যেখানে একটি ন্যায়সঙ্গত ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল সেখানে ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের তুষ্টির রাজনীতি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে আজ একটি প্রহসনে পরিণত করেছে। দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলি ঐতিহাসিক কারণেই সাম্রাজ্যবাদ এবং একপাক্ষিক সামরিক আগ্রাসনের বিরোধী এবং যখন ব্রাজিল, চিন বা দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় তখন ভারতের মৌনতা অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাছে এই বার্তাই দেয় যে বিপদের দিনে ভারত হয়তো তার আদর্শের চেয়ে শক্তিশালী মিত্রদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে। সাম্প্রতিককালে ভারতের বিদেশনীতিতে এই পরিবর্তন রাফসানজানি-দীনেশ সিং যুগের সেই মেরুদণ্ডসম্পন্ন কূটনীতির ওপর এক নগ্ন কুঠারাঘাত যা ২০০১ সালের তেহরান ঘোষণা কিংবা ২০১২ সালের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে বজায় রাখা ভারসাম্যকে বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত ভারত আজ যেন তার ঐতিহ্যবাহী আদর্শ বিসর্জন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সামরিক অক্ষের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ছে এবং একটি স্বাধীন প্রতিবেশী রাষ্ট্র তথা ব্রিকস সদস্যের ওপর এই হামলার বিষয়ে ভারতের দ্বিমুখী আচরণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী যে সংকটের সময়ে নীরবতা অনেক সময় পরোক্ষ সম্মতিরই নামান্তর আর ভারতের এই নীতিহীন অবস্থান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে না বরং বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক হিসেবে তার নৈতিক উচ্চতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

 


[1] Williamson, Lucy. Hind Rajab, 6, found dead in Gaza days after phone calls for help. BBC. Feb 10, 2024.
[2] Pulver, Andrew. Indian film board blocks release of Oscar-nominated Gaza drama The Voice of Hind Rajab. The Guardian. Mar 19, 2026.
[3] CBFC refuses to clear Oscar-nominated ‘The Voice of Hind Rajab’ over India-Israel relationship; Shashi Tharoor says ‘That’s pretty disgraceful’. TOI. Mar 21, 2026.
[4] What Iran did for India and why it is hurt. ORF. Oct 4, 2005.
[5] The Republic of India and the Islamic Republic of Iran “The New Delhi Declaration”. MEA. Govt. of India.
[6] India PM Manmohan Singh arrives in Iran. BBC. Aug 29, 2012.
[7] Bangladesh Liberation War. [1971]. Britannica.
[8] No Evidence Iran Is Building a Nuclear Bomb: IAEA. News on Air. Mar 4, 2026.
[9] Thapar, Karan. ‘India on the Side of Aggressors in Mid-East War & It’s Damaged Our Credibility as a Partner’: Srinath Raghavan. The Wire. Mar 19, 2026.

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5333 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...