শুভজিৎ বসাক
চৌরাস্তার মানুষ
আমার নাম অমল। পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট শহরে থাকি। শহরটা খুব ছোট— একটা বাসস্ট্যান্ড, দুই প্রান্তে দুই স্কুল, মাঝখানে এক লাইন দোকান। সপ্তাহে দুইদিন হাট বসে। সেই হাটেই আমার মা শাকসবজি কিনতেন, আমি ছোটবেলায় জিলিপি খেতাম।
আজ আমি চল্লিশের কাছাকাছি। বাবা মারা গেছেন কবে। মা এখন আমার কাছেই থাকেন। সংসারে আমি, মা, আমার স্ত্রী মালা, আর দুই সন্তান— ছেলে সোহম আর মেয়ে শ্রেয়া। সোহম দশম শ্রেণিতে, শ্রেয়া সপ্তমে পড়ে।
দিনে আমি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করি। ছোট কোম্পানি, লজিস্টিক সেক্টরে। কাজ হল নথিপত্র সামলানো, ডেটা এন্ট্রি, কখনও কখনও ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথা বলা। বেতন তেমন বেশি নয়, কিন্তু সংসার চলে যায়। মালাও একটি টিউশন করে। ওর আয়টুকু যোগ হলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চলে যায়।
রাতে ফোন হাতে শুই। ফোনটা আমার বিলাসিতা নয়। ফোনই আমার জানলা— দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এই ফোন দিয়েই খবর দেখি, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি, মাঝেমাঝে গান শুনি। এই ফোন দিয়েই বুঝি দুনিয়ায় কী হচ্ছে, কী আসছে আমাদের ওপর।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে এই ফোন হাতে শুয়ে আমি অদ্ভুত এক অস্বস্তি অনুভব করি। খবর দেখি— এআই, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। দেখি— ট্রেসেবিলিটি, নতুন আইটি রুলস। দেখি— ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্মার্ট সিটি। দেখি— সরকারি নেতারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন, ভারত বিশ্বগুরুর পথে এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু এই সব শোনার পর আমি যখন ফোন রেখে চোখ বন্ধ করি, তখন আমার চোখের সামনে অন্য ছবি ভাসে। আমার প্রতিবেশী সুজন, যে আইটি কোম্পানি থেকে ছাঁটাই হয়েছে। আমার পাড়ার শিলা, যে বিপিও-র চাকরি হারিয়েছে। আমার নিজের কোম্পানি, যেখানে ধীরে ধীরে এআই টুলস আসছে, মানুষ কমছে।
তারপর আবার যখন খবর দেখি— সরকার বলছে, ট্রেসেবিলিটি জরুরি, নিরাপত্তার স্বার্থে। মেসেজের উৎস জানতে হবে। ফেক নিউজ ঠেকাতে হবে।
দুই দিক থেকে দুইরকম কথা। একদিকে এআই বলছে, আমি তোমার কাজ করে দেব, তুমি বসে থাকো। অন্যদিকে ট্রেসেবিলিটি বলছে, আমি তোমায় দেখে রাখব, তুমি নিরাপদে থাকো।
আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবি— আমি কী চেয়েছিলাম? শুধু একটা শান্তির সংসার, একটা চাকরি, একটু স্বাস্থ্য, একটু শিক্ষা, আর নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা। এই চাওয়াটা কি খুব বেশি?
আজ আমি এই চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের মনেই নিজের সঙ্গে কথা বলছি। নিজের ভয়গুলোকে সামনে রেখে তাদের চোখে চোখ রাখছি।
এআই-এর প্রতিশ্রুতি
সুজনের গল্প
সুজন আমার প্রতিবেশী। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। বিয়ে হয়েছে দুই বছর হল। বউ গৃহিণী, এক বছর বয়সি একটি মেয়ে। সুজন একটি আইটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিল। কলকাতার একটি নামী কোম্পানি, ভালো বেতন।
গত বছর সুজন হঠাৎ আমার বাড়িতে এল বিকেলবেলা। অসময়ে এল, বুঝলাম কিছু হয়েছে। মুখ শুকনো, চোখ লাল। বলল, “দাদা, চাকরি গেল।”
আমি অবাক। “কেন রে? তোর তো খুব ভালো চলছিল। কোম্পানি বলল কী?”
সুজন জানাল, কোম্পানি একটি এআই টুল কিনেছে। সেটা এখন নিজেই কোড লিখছে, টেস্ট করছে, ডিপ্লয় করছে। আগে যেখানে দশজন ইঞ্জিনিয়ার লেগে থাকত, এখন সেখানে তিনজনেই চলছে। বাকি সাতজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সুজন ছিল সেই সাতজনের একজন।
“দাদা, ওরা বলে এআই এখন নিজের কোড নিজেই লিখছে। নিজের ভুল নিজেই শুধরে নিচ্ছে। আমরা যেখানে একটা কোড লিখতে আধঘণ্টা সময় নিই, ও সেটা করে দুই সেকেন্ডে। কোম্পানিগুলো এখন হিসাব কষছে— দশজন ইঞ্জিনিয়ার রাখব, নাকি একটা এআই সফটওয়্যার কিনব। সফটওয়্যার সস্তা, কোনও ছুটি চায় না, বেতনবৃদ্ধি চায় না।”
সুজনের কথা শুনে আমার মাথা ঘুরে যায়। আমি বলি, “তুই তো সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। তোকে ছাঁটাই করবে?”
সুজন মাথা নাড়ে, “সিনিয়ররাও যাচ্ছে, দাদা। জুনিয়ররা তো আগেই গেছে। এখন ওদের দরকার যারা এআই টুল চালাতে পারে, যারা এআই-কে নির্দেশ দিতে পারে। বাকিদের প্রয়োজন নেই।”
সুজনের কথা মনে করিয়ে দেয় সংবাদপত্রে পড়া একটি খবর— বড় একটি টেক কোম্পানি ১০০০ ইঞ্জিনিয়ার ছাঁটাই করেছে এআই টুল কেনার জন্য। আরেকটি কোম্পানি ঘোষণা করেছে জুনিয়র লেভেলে হায়ারিং বন্ধ করে দিচ্ছে।
আমি সুজনকে জিজ্ঞেস করি, “এখন কী করবি?”
সুজন বলে, “রি-ট্রেনিং-এর কথা শুনছি। সরকারি কিছু প্রোগ্রাম আছে বলে শুনেছি। কিন্তু দাদা, নতুন করে শেখা কি এত সহজ? আমার বয়স তো আর কম হচ্ছে না। সংসারের দায়িত্ব। বউ, মেয়ে। এই বয়সে নতুন করে সব শিখে আবার চাকরি খোঁজা?”
সুজনের চোখে জল দেখা দিল। আমি কিছু বলতে পারলাম না। শুধু ওর পিঠে হাত রেখে বললাম, “দেখ, কিছু একটা হবে।”
কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি জানি— এই কথা ফাঁকা। কিছু হবে না। হয়তো অনেক সুজনই এরকম হবে। হয়তো আমারও হবে।
শিলার গল্প
সুজনের কথা বলার এক মাস পর শিলার গল্প শুনি। শিলা আমাদের পাড়ারই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল দশ বছর আগে। স্বামী দিনমজুর। আয় অনিয়মিত। শিলা একটি বিপিও-তে কাজ করত। রাত জেগে আমেরিকার গ্রাহকদের কল ধরত। ওর আয়টাই ছিল সংসারের একমাত্র নিয়মিত রোজগার।
শিলা আমাকে একদিন রাস্তায় দেখে থামাল। বলল, “দাদা, একটু দাঁড়ান।”
আমি থামলাম। ওকে দেখে মনে হল খুব ক্লান্ত। চোখের নিচে কালি, মুখ শুকনো।
শিলা বলল, “দাদা, আমার চাকরিটা চলে গেছে।”
“কেন? কী হয়েছে?”
“কোম্পানি এআই চ্যাটবট বসিয়েছে দাদা। এখন আর মানুষের দরকার নেই। রোবটই সব গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। কল সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানি।”
আমি কিছু বলার আগেই শিলা বলে, “দুটো ছেলে দাদা। ওদের পড়াশোনার খরচ দিই কী করে? ওদের বাবার যা আয়, তাতে তো সংসারই চলে না। আমি চাকরি হারালাম মানে ওদের পড়াশোনা বন্ধ।”
শিলার চোখে জল। ও কাঁদছে। আমি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে। কী বলব? কী করব?
শেষে বললাম, “সরকার তো কিছু প্রোগ্রাম চালু করেছে শিলা। রি-স্কিলিং-এর। তুমি কি খোঁজ নিয়েছ?”
শিলা হেসে ফেলল— এমন হাসি, যা কান্নার চেয়েও করুণ। “রি-স্কিলিং দাদা? আমি দশম পাস। ইংরেজি বলতে শিখেছি কাজ শেখার জন্য। এত বছর রাত জেগে কল ধরেছি। এখন আবার নতুন করে শিখব কী? কে শেখাবে? টাকা দেবে কে?”
শিলা চলে গেল। আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবছি— এই তো সেই ডিজিটাল ইন্ডিয়া। এই তো সেই এআই বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লবের বলি হচ্ছে সুজন, শিলা— হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। যাদের নাম সরকারি রিপোর্টে নেই। যাদের কথা কেউ ভাবে না।
নীতি আয়োগের রিপোর্টে পড়েছি, ১৫ লাখ মানুষকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরি বাঁচানো যাবে। কিন্তু বাকি ৬৫ লাখ মানুষের কী হবে? সুজন আর শিলা কি সেই ১৫ লাখের মধ্যে? না। তারা ৬৫ লাখের। তাদের জন্য কোনও পরিকল্পনা নেই। তারা অদৃশ্য। তাদের অস্তিত্ব নেই সরকারি নথিতে।
নিজের কোম্পানির গল্প
শিলার কথা বলার পর আমার নিজের কোম্পানির দিকে খেয়াল হল। আমরা একটি লজিস্টিক কোম্পানি। কাজ হল নথিপত্র সামলানো, ডেটা এন্ট্রি, ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ।
গত তিন মাসে কোম্পানি অনেক বদলে গেছে। ম্যানেজার একদিন সবাইকে ডেকে বলল, “আমরা নতুন একটি সফটওয়্যার কিনেছি। এআই-ভিত্তিক। এটা নিজেই ডেটা এন্ট্রি করবে, নিজেই নথি তৈরি করবে। তোমাদের কাজ এখন শুধু সফটওয়্যারটা মনিটর করা।”
শুরুতে সবাই খুশি। কাজ কমবে, ভেবেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, কাজ কমছে না— কর্মী কমছে। যে পাঁচজন ডেটা এন্ট্রি করত, এখন দুইজনই চলছে। বাকি তিনজনের কী হয়েছে? তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে।
আমি এখনও আছি। কারণ আমি একটু সিনিয়র, একটু বেশি কাজ জানি। কিন্তু ভয় হচ্ছে— কালকের মধ্যে কি আমারও চাকরি চলে যাবে? আজ যে এআই ডেটা এন্ট্রি করছে, কাল কি এআই ম্যানেজারের কাজও করবে না? পরশু কি এআই আমার পুরো কোম্পানিই চালাবে না?
রাতে ঘুমাতে পারি না। মালাকে বলি, “আমার চাকরি নিয়ে খুব ভয় হচ্ছে।”
মালা বলে, “কেন? কী হয়েছে?”
“এআই আসছে। সব কাজ কেড়ে নিচ্ছে। সুজন-শিলার মতো আমারও হবে নাকি?”
মালা চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “তা হলে কী হবে আমাদের? সোহম-শ্রেয়ার পড়াশোনা? মায়ের ওষুধ? বাড়ির খরচ?”
আমার কোনও উত্তর নেই।
ভারতের এআই স্বপ্ন— সংখ্যার ফাঁদ
একদিন অফিস থেকে ফিরে খবর দেখছি। নীতি আয়োগের একটি রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের আইটি খাতের রাজস্ব ৮০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
সংখ্যাটা শুনে চমকে উঠি। আটশো বিলিয়ন ডলার! এত টাকা!
কিন্তু তারপর খাতা-কলমে বসি। বর্তমানে আইটি খাতের রাজস্ব প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান বৃদ্ধির হার ৪-৫ শতাংশ। এই হারে বাড়লে ২০৩৫ সালে রাজস্ব হবে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। ৮০০ বিলিয়ন হতে গেলে লাগবে ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি প্রতিবছর।
এত বড় বৃদ্ধি কী সম্ভব? বিশেষ করে যখন এআই আসছে, যখন চাকরি কমছে, যখন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে?
আমার ছেলে সোহম জিজ্ঞেস করে, “বাবা, ২০৩৫ সালে আমি ২৫ বছরের যুবক। ততদিনে কী আমার চাকরি হবে?”
আমি ওর কথার উত্তর দিতে পারি না। শুধু বলি, “হবে, হবে। তুই পড়াশোনা কর।”
কিন্তু মনে মনে জানি— ২০৩৫ সালের চাকরির বাজার আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। আজকের যে দক্ষতা দরকার, তখন হয়তো তার কোনও মূল্য থাকবে না। তখন যে দক্ষতা দরকার হবে, তা আজ আমরা জানিও না।
রিপোর্টে আরও পড়ি— ভারত এআই-তে বিনিয়োগ করছে ১০,০০০ কোটি টাকা— পাঁচ বছরের জন্য। অন্যদিকে অ্যামাজন একা এক বছরেই এআই-তে খরচ করে ৮০ বিলিয়ন ডলার। ওপেন এআই এক কোয়ার্টারে খরচ করে ২ বিলিয়ন ডলার।
হিসাবটা বুঝুন— ওপেন এআই তিন মাসে যা খরচ করে, ভারত খরচ করে পাঁচ বছরে!
আমরা কি এই সামান্য পুঁজি নিয়ে দৌড়াতে চাই? এটা কি হাতি আর পিঁপড়ের লড়াই নয়?
চিনকে দেখুন
খবরে পড়ি, চিন ডিপসিক বানিয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তারা নিজেদের এআই মডেল তৈরি করেছে। বিশ্বের সেরা ২০ এআই কোম্পানির তালিকায় চিনের নাম আছে। ভারতের নেই।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে— আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা কি কম মেধাবী? না। তারা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন— সব জায়গায় আমাদের ছেলেমেয়েরা শীর্ষ পদে। তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা হল আমাদের স্বপ্ন দেখার ধরনে। আমরা স্বপ্ন দেখি ২০৩৫ সালের, অথচ প্রযুক্তি বদলায় প্রতি সপ্তাহে। এআই-এর জগতে এক মাস মানে এক যুগ। সেখানে আমাদের পরিকল্পনা ২০৪৭ সালকে লক্ষ্য করে।
চিনকে দেখি। তারা শুধু ডিপসিক বানায়নি। তারা বানিয়েছে নিজেদের সোশাল মিডিয়া, নিজেদের সার্চ ইঞ্জিন, নিজেদের এআই মডেল। তাদের সবকিছু নিজেদের। তাদের ডেটা তাদের নিয়ন্ত্রণে।
আমাদের কী আছে? আমাদের গুগল চালাই, ফেসবুক চালাই, হোয়াটসঅ্যাপ চালাই, চ্যাটজিপিটি চালাই। সব ওদের। আমরা শুধু ইউজার। গ্রাহক। ক্রেতা। কখনও নির্মাতা নই।
একটি প্রশ্ন মনে আসে— আমরা কি চিরকাল অন্যের তৈরি রেসিপিতেই ভরসা রাখব? যে প্রযুক্তির মূল কাঠামো নিজের হাতে না থাকে, সে কি সত্যিই সেই প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী?
ট্রেসেবিলিটির ছায়া
রমেশের গল্প
রমেশ আমার পুরনো বন্ধু। ও একটি কারখানায় কাজ করে। কারখানাটি সরকারি ঠিকাদারি নিয়ে কাজ করে। ম্যানেজার দুর্নীতি করে— টাকা আত্মসাৎ করে, নকল পণ্য সরবরাহ করে।
রমেশ সহকর্মীদের সঙ্গে হোয়াটস্যাপে এই নিয়ে আলোচনা করে। “ম্যানেজার যা করছে, তা তো ঠিক না। আমরা কী করব? কাকে বলব?” এইরকম কথাবার্তা।
গত সপ্তাহে রমেশ আমাকে ফোন করে বলল, “দাদা, খুব ভয় করছে।”
“কেন? কী হয়েছে?”
“শুনলাম, সরকার এখন হোয়াটস্যাপের মেসেজ ট্রেস করবে। মানে, আমি কী মেসেজ পাঠালাম, কাকে পাঠালাম, সব জানতে পারবে সরকার।”
আমি বললাম, “তা হলে কী হবে?”
“দাদা, ম্যানেজারের দুর্নীতি নিয়ে আমি যে কথাগুলো বলেছি, সেগুলো যদি সরকার দেখে? ম্যানেজার যদি সরকারি দলের লোক হয়, তাহলে আমি ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হয়ে যাব না? আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?”
রমেশের কথায় আমি চুপ। কারণ ও ঠিক বলছে। সরকার যদি সব মেসেজ দেখে, তবে ম্যানেজারের দুর্নীতির কথা বলা মানেই কি সরকারের বিরোধিতা? বিশেষ করে যদি ম্যানেজার ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়।
আমি রমেশকে বললাম, “তুই কি এখনও ওই গ্রুপে কথা বলিস?”
রমেশ বলল, “না দাদা, গ্রুপটা ডিলিট করে দিয়েছি। আর কিছু বলিও না। ভয়ে আছি।”
এই ভয়টা কি ভয়ঙ্কর নয়? একজন শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা নিয়ে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে। কারণ সে জানে— তার প্রতিটি কথা ট্রেস করা হচ্ছে। তার প্রতিটি মেসেজ সরকারি ফাইলে জমা হচ্ছে।
এনক্রিপশন কী— সহজ ভাষায়
এনক্রিপশন শব্দটা শুনলে অনেকে ভয় পায়। কিন্তু খুব সহজ জিনিস এটা।
ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুকে একটা চিঠি পাঠাবেন। সেই চিঠিটা যদি খোলা অবস্থায় পাঠান, পথে যে কেউ পড়ে ফেলতে পারে। পোস্টম্যান পড়তে পারে, চিঠি বিতরণকারী পড়তে পারে, এমনকি আপনার বাড়ির লোকও পড়তে পারে যদি চিঠিটা খোলা থাকে।
এজন্য আপনি চিঠিটা একটা তালাবদ্ধ বাক্সে ভরে পাঠান। শুধু আপনার বন্ধুর কাছেই সেই তালার চাবি আছে। তিনিই শুধু বাক্স খুলে চিঠি পড়তে পারেন। এটাই এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন।
হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রাম— এই সব অ্যাপ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। মানে, আপনার মেসেজ শুধু আপনি আর আপনার প্রাপক দেখতে পারেন। হোয়াটসঅ্যাপও দেখতে পায় না। সরকারও দেখতে পায় না। কেউ দেখতে পায় না।
এখন সরকার বলছে, এই তালাবদ্ধ বাক্সের একটা অতিরিক্ত চাবি তাদের কাছেও রাখতে হবে। যাতে সন্ত্রাসী বা অপরাধী কেউ হলে তারা সেই বাক্স খুলে দেখতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হল— এই অতিরিক্ত চাবিটা শুধু সরকারের কাছেই থাকবে, তার গ্যারান্টি কে দেবে? হ্যাকাররা কি সেই চাবি চুরি করতে পারবে না? বিদেশি গুপ্তচররা কি সেই চাবির নকল বানাতে পারবে না?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এনক্রিপশন হল একটা ‘সব অথবা কিছুই না’ ব্যাপার। মানে, এনক্রিপশন যদি সবার জন্য নিরাপদ না হয়, তবে তা কারও জন্যই নিরাপদ নয়। একটা ছিদ্র রাখা মানেই পুরো দেওয়ালটাকে দুর্বল করে দেওয়া।
ফেক নিউজের গল্প
সরকার বলছে, ট্রেসেবিলিটি দরকার ফেক নিউজ ঠেকাতে। গুজব রটনাকারীকে ধরতে। পুলওয়ামার মতো ঘটনা এড়াতে।
কিন্তু প্রশ্ন হল— ‘সঠিক তথ্য’ আর ‘ভুল তথ্য’র বিচারক কে?
গত বছর একটি ঘটনা মনে পড়ে। তামিলনাড়ুর এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল একটি ফেসবুক পোস্টের জন্য। পোস্টটা ছিল সরকারের সমালোচনা। শিক্ষক লিখেছিলেন, জেলা প্রশাসনে দুর্নীতি হচ্ছে। তিনি কিছু প্রমাণও দিয়েছিলেন।
সরকার বলল, এটা ফেক নিউজ। শিক্ষক বললেন, এটা সত্যি। কিন্তু কে সিদ্ধান্ত দিল? সরকার। শিক্ষক জেলে গেলেন।
এটা কি ভয়ঙ্কর নয়? সরকার যখন নিজেই একটা ‘ফ্যাক্ট চেক ইউনিট’ তৈরি করে সিদ্ধান্ত নেয় কোনটি সত্য, তখন সরকারের সমালোচনাকেও কি ‘ফেক নিউজ’ বলে চালিয়ে দেওয়া হবে না?
আরেকটি ঘটনা। বিবিসি একটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছিল। সরকার তা পছন্দ করেনি। তারপর বিবিসি অফিসে আয়কর হানা। নিউজক্লিক-এর সাংবাদিকদের ওপর ইউএপিএ-র মতো কঠোর আইন প্রয়োগ। ইউএপিএ হল সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন। সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন প্রয়োগ!
এগুলো কি কাকতালীয়? নাকি একটা প্যাটার্ন?
আমার মনে হয়, এটা একটা প্যাটার্ন। এটা ধীরে ধীরে আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া।
অ্যাপ কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া
সিগন্যাল অ্যাপ ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে, যদি ভারত সরকার এনক্রিপশন ভাঙতে বাধ্য করে, তবে তারা ভারত ছেড়ে চলে যাবে।
হোয়াটসঅ্যাপ বলেছে, তারা আইনি লড়াই করবে। কারণ তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তিই হল গোপনীয়তা। এনক্রিপশন ভাঙলে তাদের আর কোনও মূল্য থাকে না।
টেলিগ্রাম বলেছে, তারা নিয়ম মানবে না।
কিন্তু যদি তারা চলে যায়, তাহলে আমরা কী ব্যবহার করব? সরকারি অ্যাপ? যেখানে সব কথাবার্তা সরকার দেখছে?
মনে পড়ে, একবার একটি সরকারি অ্যাপ নিয়ে শোরগোল হয়েছিল। সেই অ্যাপে কথা বললে সরকার সব শুনতে পায়— এই অভিযোগ উঠেছিল। তখন সরকার তা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু ট্রেসেবিলিটির পর কি সেই অ্যাপই হবে আমাদের একমাত্র ভরসা?
ভাবুন তো, আপনি আপনার স্ত্রীকে কী বলছেন, আপনার বন্ধুকে কী লিখছেন, আপনার ডাক্তারকে কী জানাচ্ছেন— সব যদি সরকার দেখে, তবে আপনার আর কোনও গোপনীয়তা থাকল না। আপনার আর কোনও ব্যক্তিগত জীবন থাকল না।
১৯৭৫ বনাম ২০২৫
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ বসানো হয়েছিল। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনও খবর ছাপা যেত না। কুলদীপ নায়ারের মতো সাংবাদিকরা জেল খেটেছিলেন শুধু সত্যি খবর ছাপানোর অপরাধে।
আমার বাবা তখন যুবক। তিনি বলতেন, সেই সময় কত ভয়ের ছিল। খবরের কাগজে শুধু সরকারের প্রশংসা। কোনও সমালোচনা নেই। কোনও প্রতিবাদ নেই। মানুষ চুপ।
২০২৫ সালে সেই জরুরি অবস্থা ফিরে আসছে ডিজিটাল রূপে। এখন আর সংবাদপত্র বন্ধ করার দরকার নেই। আপনার ফোনের চ্যাট লিস্টেই বসছে সেন্সরশিপ। আপনি নিজেই নিজেকে সেন্সর করতে শিখে যাবেন ভয়ের কারণে।
কারণ, যখন আপনি জানবেন আপনার প্রতিটি মেসেজ ট্রেস করা যায়, তখন আপনি ভয় পাবেন। কোনও রাজনৈতিক রসিকতা, সমালোচনা বা প্রতিবাদ শেয়ার করার আগে দশবার ভাববেন। ধীরে ধীরে আপনি চুপ হয়ে যাবেন। আপনার আর কোনও মতামত থাকবে না। থাকলেও তা প্রকাশ করবেন না।
মানুষ ভয়ে নিজে থেকেই চুপ হয়ে যাবে— এটাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
আমার বন্ধু রাজেশ, যে খুব রসিকতা করে, রাজনীতি নিয়ে অনেক মজার মজার কথা বলে। এখন সে বলে, “দাদা, আর বলতে ভয় লাগে। কে জানে, কালকের মধ্যে আমার নাম সরকারি ফাইলে চলে যায় কি না।”
ওর এই ভয়টাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। সে নিজেই নিজেকে সেন্সর করছে। সরকার কিছু করেনি, কিন্তু ভয়ই তাকে চুপ করে দিয়েছে।
একই সিকির দুই পিঠ
ডেটা— আমাদের সোনার খনি
ভারত আজ বিশ্বের বৃহত্তম ডেটা উৎপাদনকারী দেশ। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছে, ইউটিউব দেখছে, ফেসবুকে লাইক দিচ্ছে, হোয়াটস্যাপে মেসেজ করছে, ইউপিআই দিয়ে টাকা পাঠাচ্ছে, অনলাইনে কেনাকাটা করছে।
এই বিপুল ডেটা একটা সোনার খনি।
কিন্তু এই সোনার খনি কার?
বিদেশি কোম্পানির দখলে: ইউজার হিসেবে আমরা প্রতিদিন যে ডেটা জেনারেট করি, তার বাণিজ্যিক মূল্য অপরিসীম। গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন— এরা সেই ডেটা ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলার আয় করে। তারা আমাদের ডেটা বিশ্লেষণ করে জানে আমরা কী পছন্দ করি, কী দেখতে চাই, কী কিনতে চাই। তারা সেই অনুযায়ী আমাদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন দেয়।
আমরা পাই শুধু ‘ফ্রি’ সার্ভিসের তকমা। গুগল ফ্রি, ফেসবুক ফ্রি, হোয়াটসঅ্যাপ ফ্রি। কিন্তু এই ‘ফ্রি’-র দামটা কি আমরা দিচ্ছি না? আমাদের গোপনীয়তা, আমাদের পছন্দ, আমাদের মনোযোগ— সব তো ওদের দখলে।
সরকারের নজরদারিতে: অন্যদিকে, সেই একই ডেটা এখন সরকারের নজরদারির হাতিয়ার। ট্রেসেবিলিটির মাধ্যমে সরকার চাইলে জানতে পারবে কে কাকে কী মেসেজ পাঠাল। আপনার চ্যাট, আপনার অবস্থান, আপনার রাজনৈতিক মতামত— সবই এখন সরকারের কাছে ডিজিটাল ফাইল।
একদিকে বিদেশি কোম্পানি আমাদের ডেটা নিয়ে বাণিজ্য করছে, অন্যদিকে সরকার আমাদের ডেটা দিয়ে নজরদারি করছে। আর আমি? আমি শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে হা করে দেখছি!
আমার ডেটা, আমার তথ্য, আমার ব্যক্তিগত বিষয়— সবাই নিচ্ছে, সবাই ব্যবহার করছে। শুধু আমি পাচ্ছি না কিছুই।
এটা কি অন্যায় নয়? এটা কি ডাকাতি নয়?
ডিজিটাল উপনিবেশবাদ
রাহুল গান্ধির একটা প্রশ্ন মনে পড়ে— আমেরিকা যদি তার ডলার রক্ষা করতে চায়, তবে তার চাবিকাঠি কি ভারতীয় ডেটা?
আমরা কি জাতীয় শক্তিকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি?
আমাদের ডেটা বিদেশি কোম্পানি নিচ্ছে, আমাদের চাকরি এআই নিচ্ছে, আর আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সরকার নিচ্ছে— এই তিন সুতোয় বাঁধা পড়ে আমরা কি ‘ডিজিটাল উপনিবেশ’-এর দিকে এগোচ্ছি না?
উপনিবেশ মানে কী? উপনিবেশ মানে একটা দেশের সম্পদ অন্য দেশ নিয়ে যায়। উপনিবেশ মানে একটা দেশের মানুষ অন্য দেশের দাস হয়ে কাজ করে। উপনিবেশ মানে একটা দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য— সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়।
আজকের ভারত কি সেদিকেই যাচ্ছে না?
আমাদের ডেটা— আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ— বিদেশি কোম্পানি নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মেধা— আমাদের ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, বিজ্ঞানী— বিদেশি কোম্পানিতে কাজ করছে। আমাদের সংস্কৃতি— আমাদের ভাষা, আমাদের ঐতিহ্য— বিদেশি কনটেন্টের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিশুরা গুগল আর ইউটিউবে বড় হচ্ছে, তারা জানে না আমাদের নিজেদের কী ছিল।
আমার ছেলে সোহম জানে টেইলর সুইফট কে, কিন্তু জানে না লালন ফকির কে। ও জানে এলন মাস্ক কে, কিন্তু জানে না সিভি রমন কে। ও জানে চ্যাটজিপিটি কী, কিন্তু জানে না আর্যভট্ট কী আবিষ্কার করেছিলেন।
এটা কি উপনিবেশের নতুন রূপ নয়?
প্রচারের আলো আর বাস্তবের অন্ধকার
দিল্লির রাজপথে এআই সম্মেলনের জাঁকজমকপূর্ণ পোস্টার দেখি। ৫০০-র বেশি সেশন, ৩০০০ বক্তা। মঞ্চে বসে বড় বড় নেতারা বক্তৃতা দিচ্ছেন। মিডিয়ায় ছবি আসছে। টিভিতে দেখাচ্ছে। সবাই বলছে, ভারত এগিয়ে যাচ্ছে। ভারত বিশ্বগুরুর পথে।
কিন্তু এই আয়োজনের বাইরে কী হচ্ছে?
লোদি গার্ডেনের সেই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র লোহার সিংহটা দেখেছেন? ১২ বছর আগে যে জৌলুস নিয়ে বসানো হয়েছিল, আজ তা অবহেলায় মরচে ধরছে। কেউ দেখে না। কেউ খেয়াল করে না। কারণ, নতুন স্লোগান এসে গেছে। এখন নতুন করে আরেকটা সিংহ বসানো হবে। আরেকটা জাঁকজমক হবে। আরেকটা ফটোসেশন হবে। তারপর সেটাতেও মরচে ধরবে।
আমাদের স্লোগানগুলো কি কেবল সংবাদপত্রের হেডলাইন হওয়া পর্যন্তই সীমিত? প্রচারের আলো নিভে গেলে কি প্রোজেক্টগুলোও এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়ে?
জি-২০ সামিটের সময় দিল্লিকে যেভাবে সাজানো হয়েছিল, আজ সেই সাজসজ্জার চিহ্ন নেই। ফ্লাইওভার রং করা, ডিভাইডারে টব বসানো— এই সাময়িক জাঁকজমক দিয়ে কি কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো ঢেকে দেওয়া সম্ভব?
আমার শহরে এলইডি বাতি লাগানো হয়েছে। খুব আলো। খুব ঝলক। কিন্তু রাস্তার গর্তগুলো এখনও আছে। ড্রেনগুলো এখনও খোলা। স্কুলে এখনও শিক্ষকের অভাব। হাসপাতালে এখনও ওষুধের অভাব।
এআই সম্মেলনে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, অথচ আমাদের শহরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এখনও পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, ডাক্তার থেকেও নেই। এই টাকায় কটা স্কুল বা হাসপাতাল হতে পারত? এই টাকায় কটা রাস্তা তৈরি হত? এই টাকায় কটা গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছত?
আমলাতন্ত্রের লাল ফিতে
এআই-এর মতো ক্ষিপ্র গতির বিষয় নিয়ে আলোচনার সময়ও কেন আমাদের এখনও ‘সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’-এর মতো দশ বছরের পুরনো বুলি শুনতে হচ্ছে?
গত এক দশকে যদি আমরা ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াগুলোকেই সহজ করতে না পারি, তবে সেকেন্ডে সেকেন্ডে বদলে যাওয়া এআই প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দেব কীভাবে? প্যান কার্ড, আধার কার্ড আর জিএসটিএন-এর ডেটাগুলো আজও কেন একে অপরের সঙ্গে সঠিকভাবে যুক্ত নয়? এই সমন্বয়টুকু করতে কি আমাদের আরও এক দশক সময় লাগবে?
আমার এক বন্ধু ব্যবসা করতে চায়। ও অনলাইনে একটা ছোট কোম্পানি খুলতে চায়। ওকে কতগুলো ফর্ম পূরণ করতে হয়েছে, কতগুলো অফিসে যেতে হয়েছে, কতগুলো লাইসেন্স নিতে হয়েছে— তার ইয়ত্তা নেই।
ও বলে, “দাদা, একটা ছোট ব্যবসা খুলতে এত ঝামেলা, তাহলে বড় ব্যবসা খুলতে কত ঝামেলা হয় কে জানে!”
ও হাল ছেড়ে দিয়েছে। এখন ও চাকরিই করে। ব্যবসা করার স্বপ্ন মরে গেছে।
এটাই আমাদের দেশের অবস্থা? যেখানে ব্যবসা শুরু করাই এত কঠিন, সেখানে স্টার্টআপ ইন্ডিয়া, মেক ইন ইন্ডিয়া— এগুলো ফাঁকা বুলি নয়?
আর নজরদারির ক্ষেত্রে আমরা হঠাৎ করেই এত চটপটে! এনক্রিপশন ভাঙতে, মেসেজ ট্রেস করতে, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে আমাদের কোনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নেই! বরং সেখানে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রশাসন!
এই দ্বিচারিতা আমাদের ডিজিটাল নীতির অসঙ্গতি তুলে ধরে। এক জায়গায় আমরা ধীর, আরেক জায়গায় আমরা দ্রুত। এক জায়গায় আমরা উদ্যোক্তাদের বাধা দিই, আরেক জায়গায় আমরা নাগরিকদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে দ্রুত।
সাধারণ মানুষের দ্বিমুখী সংকট
সংসারের হিসাব
আমার মাস শেষ হয় পঞ্চম দিনেই। বেতন পাই সাত হাজার টাকা। মালার টিউশন থেকে আয় তিন হাজার। দশ হাজার টাকায় চলে সংসার— চারজন মানুষ, আর মা।
ভাড়া আঠারোশো। সোহম-শ্রেয়ার টিউশন দু-হাজার। মুদির দোকানে বাকি পনেরোশো। মায়ের ওষুধ হাজারখানেক। বাকি টাকায় সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস— রান্নার তেল, ডাল, চাল, সাবান, শ্যাম্পু।
শেষের দিকে হাঁড়ি চড়ে না। মালা তখন চিন্তায় পড়ে যায়। টাকা ধার করতে হয় পাড়ার দোকান থেকে।
এমন সংসারে এআই আসছে। আমার চাকরি নিয়ে ভয় হচ্ছে। যদি ছাঁটাই হয়ে যাই? যদি সাত হাজার টাকা বন্ধ হয়ে যায়? তাহলে কী হবে সংসারের?
সুজনের মতো আমিও কি বেকার হব? শিলার মতো আমিও কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদব?
আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। মালাকে বলি না, ওর চিন্তা বাড়াতে চাই না। কিন্তু মালা বুঝে ফেলে। ও চুপ করে আমার হাত ধরে রাখে। কিছু বলে না। কিন্তু ওর চোখে চিন্তা দেখি।
সোহম জিজ্ঞেস করে, “বাবা, আমার নতুন সাইকেল কবে কিনে দেবে?”
আমি বলি, “দেখি বাবা, কিছুদিন পর।”
সোহম মুখ কালো করে। ও জানে, কিছুদিন পর মানে না। ওর সাইকেল হবে না।
শ্রেয়া বলে, “বাবা, স্কুল থেকে পিকনিকে যেতে চাই। টাকা দেবে?”
আমি বলি, “হ্যাঁ রে, দেখি।”
মনে মনে জানি, পিকনিকের টাকাটা ওঠানো খুব কঠিন হবে।
এই সব চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যাই। আর ঘুমের মধ্যে দেখি এআই এসে বলছে, “তোমার চাকরি আমি নিচ্ছি।”
মনের ভয়
শুধু চাকরি নিয়ে ভয় নয়। আরও ভয় আছে।
রমেশের মতো আমারও ভয় হয়— আমার কথাগুলো কে শুনছে? আমি যা লিখি, যা বলি, সব কি সরকার দেখছে?
আমি রাজনীতি নিয়ে কথা বলি না। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, সরকার ভালো করছে না। রাস্তাঘাট ভালো নেই। দাম বেড়ে যাচ্ছে। চাকরি যাচ্ছে। এই কথা মনে এলে মন খারাপ হয়। কখনও কখনও বন্ধুদের সঙ্গে বলি।
কিন্তু এখন ভয় হয়— ওই কথাগুলো যদি কেউ শুনে ফেলে? যদি আমার নাম সরকারি তালিকায় চলে যায়?
আমার আরেক বন্ধু আছে, প্রভাত। সে খুব সক্রিয়। সামাজিক মাধ্যমে সে নিয়মিত সরকারের সমালোচনা করে। দুর্নীতির কথা বলে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।
এখন সে খুব সতর্ক হয়ে গেছে। সে আর আগের মতো পোস্ট করে না। কারণ, তার ভয় হয়— কালকের মধ্যে তার নাম সরকারি তালিকায় চলে যাবে কি না।
ও একদিন আমাকে বলল, “দাদা, ভাবুন তো, আমি যা লিখি, তা যদি সরকার দেখে? আমি যা ভাবি, তা যদি সরকার জানে? তাহলে তো আমার আর কিছুই ব্যক্তিগত থাকল না।”
ওর কথা শুনে আমার গা শিউরে ওঠে। এটা কি সত্যিই হচ্ছে? আমরা কি সত্যিই এমন এক দেশে বাস করছি, যেখানে আমাদের চিন্তাও সরকার জানতে পারে?
ধর্ম আর প্রযুক্তি
আমাদের শহরে এখন ধর্ম নিয়ে খুব কথা হয়। মন্দির নিয়ে কথা, মসজিদ নিয়ে কথা, হিন্দু-মুসলমান নিয়ে কথা। টিভিতে সব সময় দেখায়— কোথাও হিন্দুদের মিছিল, কোথাও মুসলমানদের বিক্ষোভ। কোথাও গরু নিয়ে মারামারি, কোথাও নামাজ নিয়ে ঝামেলা। কোথাও কোথাও বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকদের বাংলা বলার অপরাধে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেলছে।
আমি ভাবি— যে দেশের গলি-ঘুপচিতে আজও ধর্মীয় মেরুকরণের সম্মেলন হয়, সেই দেশ কি বিশ্বমানের এআই ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করার মানসিক পরিবেশ দিতে পারে?
একদিকে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিখরে ওঠার কথা বলছি, অন্যদিকে সমাজকে মধ্যযুগীয় বিতর্কে ব্যস্ত রাখছি। একদিকে আমরা বলছি এআই, অন্যদিকে বলছি রামমন্দির। একদিকে আমরা বলছি টেকনোলজি, অন্যদিকে বলছি ধর্মীয় মেরুকরণ।
এই দুই কি একসঙ্গে চলে?
একজন তরুণ আইটি ইঞ্জিনিয়ার যদি দেখে তার চারপাশে ঘৃণা আর বিভেদের বাতাবরণ, যদি দেখে মুসলমান আর হিন্দুর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, যদি দেখে এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোককে ঘৃণা করছে, তবে সে কি সৃজনশীল চিন্তা করতে পারবে? সে কি মুক্তমনে চিন্তা করতে পারবে? সে কি উদ্ভাবন করতে পারবে?
যে সমাজে মুক্তচিন্তা নেই, সেখানে কি উদ্ভাবন সম্ভব? ইতিহাস বলে, না। যে সমাজে ধর্মান্ধতা বাড়ে, সেই সমাজে বিজ্ঞান পিছিয়ে যায়। যে সমাজে কুসংস্কার বাড়ে, সেই সমাজে প্রযুক্তি পিছিয়ে যায়।
আমরা কোন পথে যাচ্ছি?
মাঝখানের মানুষ
এআই বলছে, আমি তোমার কাজ করে দেব। ট্রেসেবিলিটি বলছে, আমি তোমায় দেখে রাখব।
আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
কার কাজ হবে? কার দেখবে? আমার কী হবে?
আমি তো কিছু চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম একটা চাকরি, একটা সংসার, একটু শান্তি। এইটুকু চাওয়া কি অনেক বেশি?
আমার মতো কত মানুষ আছে এই দেশে— যারা দিনরাত খেটে খায়, যারা স্মার্টফোন হাতে খবর দেখে, যারা এআই-এর নাম শুনে ভয় পায়, যারা ট্রেসেবিলিটির নাম শুনে আতঙ্কিত হয়।
তাদের কথা কেউ ভাবে না।
সরকারি রিপোর্টে তাদের নাম নেই। সংবাদপত্রে তাদের খবর নেই। টিভি চ্যানেলে তাদের সাক্ষাৎকার নেই। তারা অদৃশ্য। তারা সংখ্যা মাত্র। ৬৫ লাখ মানুষ— একটা সংখ্যা।
কিন্তু এই ৬৫ লাখ মানুষের প্রত্যেকের একটা মুখ আছে। একটা পরিবার আছে। স্বপ্ন আছে। আশা আছে। ভয় আছে।
সুজনের মুখটা মনে পড়ে। শিলার চোখের জল মনে পড়ে। রমেশের ভয় মনে পড়ে। প্রভাতের চুপ করে যাওয়া মনে পড়ে।
তারাই তো এই দেশ। তারাই তো ভারত।
আশার আলো
সোহমের স্বপ্ন
সব ভয়ের মধ্যেও কিছু আশা আছে।
সোহম আমার ছেলে। দশম শ্রেণিতে পড়ে। ও খুব মেধাবী। গণিতে খুব ভালো। কম্পিউটার নিয়ে খুব আগ্রহ ওর।
একদিন ও আমাকে বলল, “বাবা, আমি এআই নিয়ে পড়তে চাই।”
আমি অবাক। “এআই? ওটা আবার কী?”
“বাবা, এআই মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। যে প্রযুক্তি নিজে নিজে শিখতে পারে। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমি একটা মডেল বানাতে চাই যা বাংলা ভাষা বুঝবে। যা আমাদের সংস্কৃতি বুঝবে। যা আমাদের মানুষের কাজে লাগবে।”
সোহমের কথা শুনে আমার চোখে জল চলে আসে। আমার ছেলে! আমার সন্তান! ও যে এত বড় স্বপ্ন দেখছে!
আমি বলি, “তুই পারবি বাবা। আমি বিশ্বাস করি।”
সোহম হাসে। ওর হাসিতে আমি দেখি— আশা। সম্ভাবনা। ভবিষ্যৎ।
ওর মতো কত লক্ষ লক্ষ তরুণ আছে এই দেশে। যারা স্বপ্ন দেখে। যারা বড় হতে চায়। যারা দেশের জন্য কিছু করতে চায়।
তাদের জন্য যদি সঠিক সুযোগ তৈরি করা যায়, যদি সঠিক শিক্ষা দেওয়া যায়, যদি সঠিক প্ল্যাটফর্ম দেওয়া যায়, তাহলে তারাই এআই-এর জগতে বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে।
সোহমকে দেখে আমার ভরসা হয়। ও হয়তো পারবে। ওর প্রজন্ম হয়তো পারবে।
ইউপিআই-এর গল্প
আমাদের দেশে কিছু ভালো জিনিসও হয়েছে।
ইউপিআই— এই একটি জিনিস আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। এখন আর টাকা নিয়ে ভাবতে হয় না। ফোন দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠানো যায়। দোকানে গেলে স্ক্যান করে পেমেন্ট করা যায়। রিকশাচালকও এখন ইউপিআই নেয়।
এই প্রযুক্তি আমাদের নিজেদের। ভারতীয়। এটা নিয়ে আমরা গর্বিত।
ঠিক তেমনি, আধার, ডিজিলকার— এসব ডিজিটাল পরিকাঠামো বিশ্বে অন্যতম। এই পরিকাঠামোর ওপর ভর করে আমরা এআই-ভিত্তিক অসংখ্য পরিষেবা তৈরি করতে পারি, যা সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
ইউপিআই যেমন টাকা লেনদেনকে সহজ করেছে, তেমনি আমরা এআই-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি— সব ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারি।
শুধু দরকার সঠিক দিকনির্দেশনা, সঠিক বিনিয়োগ, সঠিক নীতি।
আমাদের কাছে সেই পরিকাঠামো আছে। শুধু দরকার রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি।
সচেতন নাগরিক সমাজ
সবচেয়ে বড় আশার কথা হল, আমাদের দেশে সচেতন নাগরিক সমাজ আছে।
ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন আছে, এসএফএলসি-র মতো সংস্থা আছে। তারা আদালতে যায়, জনমত গড়ে তোলে, সরকারের নজরদারি নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।
গত বছর যখন নতুন আইটি রুলস আসে, তখন অনেকেই প্রতিবাদ করেছিল। সাংবাদিকরা লিখেছিলেন। আইনজীবীরা কথা বলেছিলেন। সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় সরব হয়েছিলেন।
এই সচেতনতাই শেষ পর্যন্ত আমাদের অধিকার রক্ষা করবে। কারণ, সরকার যখন দেখবে মানুষ সচেতন, মানুষ প্রতিবাদ করছে, মানুষ আদালতে যাচ্ছে, তখন তারা তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে।
আমি নিজেও এখন আরও সচেতন হয়েছি। আমি এখন আর ফাঁকা স্লোগানে বিশ্বাস করি না। আমি প্রশ্ন করি। আমি খোঁজখবর নিই। আমি অন্যদেরও সচেতন করি।
এই সচেতনতাই আমাদের শক্তি। এই সচেতনতাই আমাদের অস্ত্র।
ছোট ছোট প্রতিরোধ
আমাদের পাড়ায় একটি ছোট লাইব্রেরি আছে। সেখানে আমরা বসি, কথা বলি, বই পড়ি। সম্প্রতি আমরা সেখানে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি।
আমি গিয়ে বলি, “দাদা, শুনেছেন? সরকার আমাদের মেসেজ দেখবে।”
কেউ কেউ অবাক হয়। কেউ কেউ বলে, “ও সব কিছু হবে না।”
কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করেছে। তারা প্রশ্ন করছে। তারা জানতে চাইছে।
ছোট ছোট এই প্রতিরোধগুলোই বড় পরিবর্তনের সূচনা।
আমার প্রতিবেশী অনিল, যে সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহার শুরু করেছে। ও বলে, “হোয়াটসঅ্যাপে আর বিশ্বাস হয় না। সিগন্যাল বেশি নিরাপদ।”
ওর মতো কত মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে। নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তারা নতুন উপায় খুঁজছে।
এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই একদিন বড় আন্দোলনের রূপ নেবে। আমি বিশ্বাস করি।
যা করা দরকার
এআই-তে বিনিয়োগ
সরকারকে এআই-তে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ১০,০০০ কোটি টাকার বাজেট হাস্যকর। এটা বাড়িয়ে অন্তত ১ লক্ষ কোটি টাকা করা দরকার।
বেসরকারি ক্ষেত্রকেও উৎসাহিত করা যেতে পারে এআই গবেষণায় বিনিয়োগ করতে। ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হোক, সহজ ঋণ দেওয়া হোক, গবেষণা সহায়তা দেওয়া হোক— যা কিছু দরকার, তা করা হোক।
কারণ, এআই-এর দৌড়ে টিকে থাকতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছোট পুঁজিতে বড় কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব না।
শুধু বিনিয়োগ নয়, দরকার সঠিক দিকনির্দেশনা। আমাদের নিজস্ব ভাষা মডেল তৈরি করতে হবে, যা ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে বুঝবে। যা বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলুগু— সব ভাষায় কথা বলতে পারবে। যা আমাদের প্রেক্ষাপট বুঝবে। যা আমাদের মানুষের কাজে লাগবে।
আইআইটি, আইআইএম-এর মতো প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। স্টার্টআপদের উৎসাহিত করতে হবে। তরুণ গবেষকদের জন্য ফেলোশিপ চালু করতে হবে।
তাহলেই আমরা এআই-এর জগতে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারব।
কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা
যাদের চাকরি যাবে, তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
বেকারভাতা চালু করতে হবে। পুনরায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য ঋণ দিতে হবে। নতুন সেক্টরে চাকরির সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সরকার যদি ১৫ লাখের কথা ভাবে, তাহলে বাকি ৬৫ লাখের কথাও ভাবতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে কোনও পরিকল্পনা সফল হবে না।
শিলার মতো মানুষদের কথা ভাবতে হবে। যারা দশম পাশ, যাদের ইংরেজি জ্ঞান সীমিত, যারা শুধু কাজ শিখেছে, শিক্ষা নয়। তাদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা দরকার।
সুজনের মতো তরুণ ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য দরকার উচ্চতর প্রশিক্ষণ। নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে নতুন চাকরির বাজার।
এআই শুধু চাকরি কেড়ে নেবে না, নতুন চাকরিও তৈরি করবে। কিন্তু সেই চাকরিগুলো পেতে হলে নতুন দক্ষতা দরকার। সেই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সরকারকে তৈরি করে দিতে হবে।
গোপনীয়তার সুরক্ষা
নজরদারির নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা যাবে না।
এনক্রিপশন ভাঙার কোনও প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ট্রেসেবিলিটির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সীমা মেনে চলতে হবে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মৌলিক অধিকার— সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সম্মান জানাতে হবে।
সরকারের উচিত, নজরদারি নয়, বরং গোপনীয়তা রক্ষার নীতি গ্রহণ করা। কারণ, গোপনীয়তা ছাড়া স্বাধীনতা অর্থহীন। স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন।
আমরা চাই না আমাদের প্রতিটি মেসেজ সরকার দেখুক। আমরা চাই না আমাদের প্রতিটি কথা সরকার শুনুক। আমরা চাই একটি ব্যক্তিগত জীবন, যেখানে আমরা নিজেদের মতো করে কথা বলতে পারি, ভাবতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি।
সরকার যদি নিরাপত্তার কথা বলে, তবে তাদের উচিত স্বচ্ছ হওয়া। কাদের মেসেজ ট্রেস করা হচ্ছে? কেন করা হচ্ছে? কতদিন রাখা হচ্ছে? কে দেখছে? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত সরকারের।
তবেই আমরা আস্থা রাখতে পারব। তবেই আমরা নিরাপদ বোধ করব। অর্থাৎ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
আমলাতন্ত্রের সংস্কার
ব্যবসা শুরু করা, লাইসেন্স নেওয়া, অনুমোদন নেওয়া— এসব প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
এক দিনের কাজ যদি এক মাস লেগে যায়, তবে সেই দেশের এআই-এর দৌড়ে জেতা সম্ভব না।
ডিজিটাল পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্যান, আধার, জিএসটিএন— সব ডেটাবেসকে একীভূত করতে হবে। এক জায়গায় আবেদন করলেই সব কাজ হয়ে যাবে, এমন ব্যবস্থা করতে হবে।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য দরকার সহজ নিয়ম। তারা আইনজীবী রাখতে পারে না। তারা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট রাখতে পারে না। তারা নিজেরাই সব করে। সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে সরকারকে।
বিদেশে এক ক্লিকে কোম্পানি খোলা যায়। আমাদের দেশে এখনও কাগজপত্রের ঝামেলা। এই ফারাকটা ঘোচাতে হবে।
সামাজিক সম্প্রীতি
ধর্মীয় মেরুকরণ বন্ধ করতে হবে।
বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়াতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা, মানবিক মূল্যবোধ— এসবের ওপর জোর দিতে হবে। তবেই সৃজনশীল মেধা বিকশিত হবে।
কারণ, উদ্ভাবনের জন্য দরকার মুক্তচিন্তা। মুক্তচিন্তার জন্য দরকার সামাজিক সম্প্রীতি। সামাজিক সম্প্রীতির জন্য দরকার ধর্মনিরপেক্ষতা।
আমাদের দেশে সব ধর্মের মানুষ আছে। সব ভাষার মানুষ আছে। সব সংস্কৃতির মানুষ আছে। এই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। এই বৈচিত্র্যই আমাদের সম্পদ।
এই বৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিভেদ নয়, ঐক্য দরকার। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা দরকার। সংঘাত নয়, সম্প্রীতি দরকার।
তবেই আমরা এগোতে পারব। তবেই আমরা উন্নতি করতে পারব।
মানুষের মুখে হাসি
শেষ পর্যন্ত, একটা দেশ তখনই সত্যিই উন্নত হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ বোধ করে— শুধু রাস্তায় নয়, নিজের কাজের জায়গাতেও, নিজের ডিজিটাল দুনিয়াতেও।
আমরা স্মার্ট ইন্ডিয়া চাই ঠিকই, কিন্তু তার আগে এমন একটা ভারত চাই যেখানে:
প্রথমত, মেশিনের বুদ্ধির চেয়ে মানুষের জীবনের দাম বেশি হবে। যে মানুষটা রোজ রাস্তায় নামে পেটের দায়ে, তার মুখে হাসি ফোটানোই হবে প্রযুক্তির সার্থকতা।
দ্বিতীয়ত, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর চেয়ে ‘রিয়াল হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’-এর দাম বেশি হবে। মানুষের সহমর্মিতা, মানুষের ভালোবাসা, মানুষের সংবেদনশীলতা— এসবের দাম মেশিন দিয়ে মাপা যায় না।
তৃতীয়ত, চটের আড়ালে রোবট নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটে। রোবট আমাদের কাজ কেড়ে নেবে না, তার বদলে আমাদের নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এআই আমাদের সাহায্য করবে, আমাদের প্রতিস্থাপন করবে না।
চতুর্থত, পকেটে পোষা গোয়েন্দা নয়, বন্ধু থাকে। যে ফোন আমাদের কথা শোনে, সেটা যেন আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে না নেয়।
পঞ্চমত, ডিজিটাল ইন্ডিয়া মানে শুধু শহর নয়, গ্রামও। শুধু এসি রুম নয়, রোদে পোড়া রাস্তাও। শুধু ইংরেজি নয়, মাতৃভাষাও। শুধু ধনী নয়, গরিবও। সবাই মিলে এগোনোই হবে সত্যিকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়া।
চৌরাস্তার মানুষ
আমি এখনও সেই চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে।
দুই দিক থেকে ঘুড়ি ওড়ানো হচ্ছে। একদিকের ঘুড়ির নাম ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’, আর একদিকের নাম ‘ট্রেসেবিলিটি’।
একজন বলছে, “চিন্তা করো না, আমরা তোমার কাজ করে দেব। তুমি শুধু বসে থাকো।”
অন্যজন বলছে, “চিন্তা করো না, আমরা তোমায় দেখে রাখব। তুমি নিরাপদে থাকো।”
আমি এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু আমি কি শুধু দর্শক? নাকি আমিই সেই সুতো? নাকি আমি শুধু একটা পুতুল, যার হাত-পা বেঁধে এই দুই ঘুড়ি ওড়ানো হচ্ছে?
আমার নাম অমল। আমি পশ্চিমবঙ্গের একটা ছোট শহরে থাকি। দিনে খাটি, রাতে ফোন হাতে শুই।
আমি এনভিডিয়া বা ওপেনএআই-এর মানে বুঝি না, কিন্তু এটা বুঝি— প্রযুক্তি যদি মানুষের হাত থেকে কাজ কেড়ে নেয় আর সমাজকে আরও ভাগ করে দেয়, তবে সেই প্রযুক্তি আমাদের শত্রু।
আমি এনক্রিপশন বা ট্রেসেবিলিটির কারিগরি দিক বুঝি না, কিন্তু এটা বুঝি— যদি ফোনের ওপাশে কেউ আড়ি পেতে থাকে, তবে মনের কথা বলতে ভয় পাই।
বিজ্ঞানের জয়গানে আমাদের আপত্তি নেই, আপত্তি শুধু সেই ‘প্রগতিতে’ যেখানে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঝকঝকে পর্দার আড়ালে শ্রমিকের চোখের জল আর বেকারত্বের দীর্ঘশ্বাস ঢাকা পড়ে যায়।
আপত্তি সেই ‘নিরাপত্তা’র নামে যেখানে ব্যক্তির ঘরের ভেতর উঁকি দেওয়া সংস্কৃতি হয়ে ওঠে।
শেষ প্রশ্ন
আমাদের সামনে এখন দুই পথ।
এক পথে মেশিনের রাজত্ব— যেখানে মানুষ হবে শুধুই একটা ডেটা পয়েন্ট, একটা ‘পুরনো হার্ডওয়্যার’।
আরেক পথে মানুষের রাজত্ব— যেখানে মেশিন হবে হাতিয়ার, কর্তা নয়।
কোন পথ বেছে নেব আমরা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বসিনি আমি। শুধু কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছি, কিছু সত্যি কথা বলেছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, প্রশ্ন করাই জাগরণের প্রথম পদক্ষেপ।
আমি একজন সাধারণ ভারতীয়। চটের রোবট আমাকে ফেলে রাখুক বা পকেটের গোয়েন্দা আমাকে দেখুক— আমি কিন্তু থেমে থাকব না।
কারণ আমি জানি, মেশিন যতই শিখুক, মানুষের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। মানুষের আবেগ, মানুষের স্বপ্ন, মানুষের সংগ্রাম— এসবের কাছে এআই আজও শিশু।
আর এই বিশ্বাস নিয়েই আমি দাঁড়িয়ে আছি— ডিজিটাল চৌরাস্তায়, মেশিনের যুগে মানুষের সন্ধানে।
কারণ শেষ পর্যন্ত, প্রযুক্তি যদি মানুষের জন্য না হয়, তবে সেই প্রযুক্তির কোনও মূল্য নেই। প্রযুক্তি হবে মানুষের সেবক, মানুষের মনিব নয়। প্রযুক্তি হবে মুক্তির হাতিয়ার, বন্দিশালার চৌকিদার নয়।
এই বিশ্বাস নিয়েই আমি হাঁটতে থাকি। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি প্রশ্ন করি। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি লড়াই করি।
ফিরে দেখা
আজ আবার রাত হয়েছে। ফোন হাতে শুয়ে আছি।
সোহম ঘুমিয়ে গেছে। শ্রেয়া ঘুমিয়ে গেছে। মালা পাশে শুয়ে আছে। মা অন্য ঘরে।
আমি ফোনে খবর দেখছি। আবার এআই-এর খবর। আবার ট্রেসেবিলিটির খবর। আবার ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্লোগান।
খবর দেখতে দেখতে চোখ বুজে আসে। ঘুম আসে।
স্বপ্ন দেখি— একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, সব ঠিক হয়ে গেছে। এআই আমাদের কাজ করে দিচ্ছে, কিন্তু চাকরি যায়নি। বরং নতুন চাকরি এসেছে। নতুন সুযোগ এসেছে।
ট্রেসেবিলিটি আছে, কিন্তু সেটা শুধু সত্যি অপরাধীদের ধরতে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগতই আছে। আমরা ভয় ছাড়া কথা বলতে পারি।
সোহম বড় হয়েছে। ও এআই ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। ও নিজের ভাষায়, নিজের সংস্কৃতিতে এআই বানিয়েছে। সেই এআই আমাদের সবার কাজে লাগছে।
শিলার চাকরি ফিরে পেয়েছে। সুজন নতুন চাকরি পেয়েছে। রমেশের আর ভয় নেই। প্রভাত আবার পোস্ট দিচ্ছে।
আমার চাকরি আছে। সংসার ভালো চলছে। মালা হাসছে। মা সুস্থ আছে। সোহম-শ্রেয়া পড়ছে।
এই স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ি।
হঠাৎ ফোনের অ্যালার্ম বেজে ওঠে। সকাল হয়ে গেছে। আবার নতুন দিন শুরু।
আমি উঠে বসি। জানলার বাইরে তাকাই। সূর্য উঠেছে। পাখি ডাকছে। রাস্তায় লোকজন চলছে।
জীবন চলছে।
মালা চা বানায়। সোহম-শ্রেয়া স্কুলে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। মা ওদের টিফিন বেঁধে দিচ্ছে।
আমি অফিসের জন্য তৈরি হই। আজ আবার কাজ আছে। আবার সংগ্রাম আছে। আবার ভয় আছে।
কিন্তু আজ একটু অন্যরকম লাগছে। গতরাতের স্বপ্নটা মনে পড়ছে। ওই স্বপ্নটাই সত্যি হতে পারে। যদি আমরা চাই। যদি আমরা লড়াই করি। যদি আমরা প্রশ্ন করি।
আমি বেরিয়ে পড়ি। রাস্তায় নেমে দেখি, আকাশে ঘুড়ি ওড়ে। দুই দিকে দুই ঘুড়ি। মাঝখানে আমি।
কিন্তু আজ আমি আর শুধু দর্শক নই। আজ আমি সুতো টানতে শিখেছি। আজ আমি জানি— এই ঘুড়ি দুটো আমারই। আমি চাইলেই এদের ওড়াতে পারি। আমি চাইলেই এদের নামাতে পারি।
কারণ শেষ পর্যন্ত, প্রযুক্তি আমার জন্য। আমি প্রযুক্তির জন্য নই।
এই বিশ্বাস নিয়েই আমি হাঁটি। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি বাঁচি।
আর আমি এখনও স্বপ্ন দেখি।

