সাম্য
পরিকল্পনাহীন বৃক্ষহত্যা, অবৈজ্ঞানিক পাহাড় ওড়ানো, বয়সে নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উপর বাড়তে থাকা কংক্রিটের চাপ আর নদী ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই বাঁধে বাঁধা— পরিণাম অজানা নয়। তাও প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করার দুঃসাহস রাখা যায় কারণ পরিণাম ছুঁতে পারে না সেই পরিকল্পনাকারী, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কিংবা পর্যটন থেকে বড় মুনাফাকারী সংস্থাদের, যারা থেকে যায় নিরাপদ দূরত্বে। জলে ভাসে স্থানীয় সাধারণ মানুষ যাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়নি কোনওদিন। উন্নয়নের সুফল পান অর্থবান বহিরাগত আর ধ্বংসের সঙ্গে যোঝেন দরিদ্র স্থানীয়জন
কিন্নর থেকে ফিরলাম কিছু দিন আগে। আনন্দ, সুর, রূপ আর প্রেমের প্রতীক দেবলোকের গায়ক পবিত্র কিন্নর। সমনামী কিন্নর উপত্যকা। সেখানে পাহাড় যেমন উঁচু উঁচু, তেমনটাই কাছে কাছে। দুই পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় অনেক গভীরে সরু, রোগাসোগা নদী। এ এক এমন জায়গা যেখানে গঙ্গার উৎপত্তি হয়নি। এ দেবভূমি হিমাচল। গিরিরাজ তার বিপুল বিশালতা নিয়ে চোখের সামনে। কী প্রশান্ত অথচ কী অপরূপ তাঁর রূপ! সাদা বরফের মুকুট, মেঘে প্রতিফলিত নীলচে আভার চাদর গায়ে জড়িয়ে যেন কোনও ধ্যানী তপস্বী। তাঁর বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তাঁর মৌনতা শিখিয়ে দেয় কেমনভাবে নির্বাক থেকে অনুভব করতে হয় পৃথিবীর গুঞ্জন। বাইরের সুরের প্রবাহ একসময় বয়ে আসে অন্দরে, অন্তরে। তখন চারিপাশে সবকিছুর সঙ্গে একটা আত্মীয়তা অনুভব করা যায়। শিকড়ে শিকড়ে একে অপরকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, মিলেমিশে বেঁধে বেঁধে গায়ে গা লাগিয়ে বেড়ে ওঠা শত-সহস্র বছরের সুপ্রাচীন অরণ্য দেহের উপর ত্বক যেমন, তেমন করেই গায়ের উপর লেপ্টে থেকে ধরে রেখেছে পিতার দেহখানি। পিতাও তেমনি বুক দিয়ে আগলে রাখছেন ছানাপোনাদের। সে অপত্যের মাঝে দিব্যি জায়গা করে নিয়ে সুখে ঘরকন্না করছে ডানাওয়ালা পাখি, হিলহিলে সাপ, কোটি কোটি পোকা-পতঙ্গ, লেজওয়ালা চারপেয়ে, লেজছাড়া দুপেয়ে। মিলেমিশে সক্কলের সুখের সংসার কোন আদিমকাল থেকে।

দেবভূমি হিমাচল। দেবতার বাস এখানে। ঈশ্বরকে চোখে দেখা যায় না। অনুভব করতে হয়। তা যায়। এই বিশালতার মধ্যে, এই একাকী নিস্তব্ধতার মধ্যে, প্রকৃতির সন্তানদের একজন হয়ে তাঁকে অনুভব করা যায় বইকি। এ ফাঁক-ও ফাঁক দিয়ে বয়ে আসা ঝিরিঝিরি ঝর্ণা— হিমবাহ গলা জল নয়, সে গাছ-গাছড়া ছুঁয়ে আসা অমৃত। খেলে বদহজম, পেটগরম, পিলে ব্যথা নিমেষে উধাও। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘাসের উপর শুয়ে প্রাণ খাঁচাছাড়া হতে হতে ফিরে আসে কোটরে। গন্ধে। বুনো ঘাসের গন্ধে। গন্ধ নাকের দরজা দিয়ে ঢুকে শিরায় শিরায় পৌঁছে যায় কোষ থেকে কোষে। মাথাব্যথা ফুরুৎ, ঝরঝরে শরীর, ফুরফুরে মন। জাদু নয়, এ ঈশ্বরের আশীর্বাদ। ঈশ্বর এখানেই বাস করেন। পাহাড়ের মাথায় ন্যাড়া খাড়া লিঙ্গসদৃশ পাথরে নয়। মানুষের ঠিক করা কোনও বিশেষ স্থানের বিশেষ ঘরে নয়।
এ দেবালয়েই গত ৫ আগস্ট মঙ্গলবার মেঘভাঙা বৃষ্টির ফলে হড়পা বানে কিন্নর কৈলাসের পথের অনেকটা ভেসে যায়, মৃত ৫, গৃহহীন বহু মানুষ। উত্তরকাশির ধারালিতে মেঘভাঙা বৃষ্টি-পরবর্তী হড়পা বানে ৭০ জন মৃত ধরে নেওয়া হয়েছে, ৫ জন নিখোঁজ, পঞ্চাশটি হোটেল, পঞ্চাশটি বাড়ি বয়ে গেছে। গ্রামটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে। ১৪ আগস্ট কিশতওয়ারের চসিটিতে মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ৬৭ জন মৃত, ৩০০ আহত, ২০০ নিখোঁজ। ২২ আগস্ট উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার থারালিতে রাতভর বৃষ্টির জেরে তুনরি সাধেরা খাল উপচে হড়পা বান নামে। বাড়িঘর, বাজার ভেসে যায়। ১ জন মৃত, ২ জন নিখোঁজ। ২৬ আগস্ট জম্মুতে বৈষ্ণোদেবীর কাছে অর্ধকুমারীতে মৃত ৪১ তীর্থযাত্রী— কারণ মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে ভূমিধস। ২৯ আগস্ট চামোলি, রুদ্রপ্রয়াগ, তেহরিতে মেঘভাঙা বৃষ্টিতে বাড়িঘর ভেসে যায়। মৃত ৪ জন, নিখোঁজ ৩ জন, ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা ত্রিশ-চল্লিশ পরিবার। ৩০ আগস্ট রিয়াসি জেলায় ধস নামে। ১১ জন মৃত। ৩১ আগস্ট রামবনের রামগড় গ্রামে ৫ জন মৃত, কারণ মেঘভাঙা বৃষ্টি। উত্তরাখণ্ডের বাগেশ্বরীর বাঁধ ভেঙে যায় ওইদিনই। সিমলায়, পুরনো মানালিতে ধস নামে। উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে ধসের জেরে বদ্রিনাথের সড়ক পাঁচ জায়গায় বন্ধ। পিথোরাগড়ে ধৌলিগঙ্গা বিদ্যুৎ প্রকল্পে ধস নামে। ভিতরে আটকে পড়েন ন্যাশনাল হাইড্রোলিক ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন লিমিটেডের ১৯ জন কর্মী।

নিজের রাজ্যের দিকে ফিরে তাকানো যাক। গত ৫ অক্টোবর তিস্তা সেতু লাগোয়া নদীর মূল বাঁধে তিনটি ফাটল দেখা যায়। রায়ডাক নদী উপচে জল ঢোকে আলিপুরদুয়ারে। সুখিয়াপোখড়ির রাস্তায় ধ্বস নামে। বেড়াতে বেরিয়ে অকস্মাৎ ধসে কেউ রাস্তায়, কেউ হোমস্টেতেই আটকে পড়েন। চোখের সামনে হোমস্টের অর্ধেক ধসে যায়, পর্যটক নামেন দড়ি ধরে। কোথাও গোটা বাড়ি, কোথাও চাষের জমি, কোথাও দোকানপাট হারিয়ে যায় নদীগর্ভে। জনপ্রিয় পর্যটনস্থল তাবাকোশি গ্রাম অস্তিত্ব হারানোর মুখে। ধুপগুড়ির বেতগাড়ায় ভাঙে রেলসেতু। ঘরবাড়ি হারিয়ে মানুষ ওঠেন রেললাইনে, হাসপাতালে, অন্যের বাড়িতে। বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ভেসেছে তাঁদের সম্পদ, আসবাব আর পড়ুয়াদের গোটা বছর। প্রত্যন্ত এলাকার আড়াইশোর বেশি রাস্তা নষ্ট, ক্ষতিগ্রস্ত তিনশোর বেশি বাড়ি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃতি।

বর্ষায় দুকূল উপচে বন্যা হবে— এ-ই নদীর চরিত্র। তিস্তাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বয়োবৃদ্ধ মানুষেরাও মনে করতে পারছেন না জঙ্গল ছেড়ে গন্ডার এসে উঠেছে বাঁশবাগানে এ দৃশ্য কোনওদিন দেখেছেন কিনা। গরুমারা জঙ্গলের একাধিক বন্যপ্রাণী এবারের বন্যায় ভেসে যায়। মৃত গন্ডারের দেহ পড়ে থাকে লোকালয়ে। বন্যপ্রাণী কোথাও আতঙ্কে ছোটাছুটি করে, কোথাও মানুষকে হামলা করে। কোচবিহারের বন্যায় ভেসে আসা বুনো শুয়োরের হানায় একজনের, ধূপগুড়িতে আটজনের, মাথাভাঙায় দুজনের মৃত্যু হয়। কোচবিহারের ঘোষডাঙায় একাধিক হরিণ, প্রেমেরডাঙ্গায় দুটি গন্ডার হত। কালচিনিতে বন্যার জলে ভেসে আসা পলিতে বিস্তীর্ণ চা-বাগান সম্পূর্ণ ঢেকে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে হিমালয়ের উচ্চতায় মেঘের সঙ্গে এমন রাগ, অনুরাগ চলে আসছে তার জন্মলগ্ন থেকে। মেঘভাঙা বৃষ্টি এখনই হঠাৎ পাঁচ রাজ্যজুড়ে ধ্বংসলীলায় মেতেছে কেন? যুগ যুগ ধরে হিমালয় আর তার প্রকৃতি ভাঙাগড়া নিয়ে ছিল একইরকম। মানুষ সভ্য হল আর প্রকৃতির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ল এমনটা নয় বোধহয়। সুপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসা প্রাকৃতিক জ্ঞানের অমর্যাদা, দেশজ শিক্ষা, দেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে অগ্রাহ্য করে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকেই সভ্যতার মাপকাঠি মনে করা হয় এ সরলীকরণও সত্য নয় বোধহয়।
স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত গিরিরাজ মোটের উপর নিরুপদ্রবেই ছিলেন। ভূপ্রাকতিক চরিত্র বিশ্লেষণ করে বন্যাপ্রবণ কোশি নদীকে বাঁধে বাঁধবার প্রস্তাব আস্তাকুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সেই ফাইলই আবার আস্তাকুঁড় থেকে তুলে আনা হয়। দামোদরকে দুঃখ আখ্যা দিয়ে বাঁধে বেঁধে অরণ্য, নদীজীবী মানুষদের উৎখাত করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে শুরু করে নমামি গঙ্গে— মা গঙ্গাকে প্রণাম করে গঙ্গোত্রী থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত সাতটা বাঁধের ফাঁসিতে লটকাবার সুবন্দোবস্ত… সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। পাহাড়ের গা কেটে, নদীর সঙ্গমে বাঁধ দিয়ে (বাস্পা আর সুৎলেজের সঙ্গম, কর্ছম) নদীর তলদেশ থেকে গোটা চরাচর ছাইয়ে ভরিয়ে (জেএসডব্লিউ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ছম) নদীকে জন্মের পরেই পিষে মেরে, দেবতার বুক চিরে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে দেবতাকে তাঁর ভিটেছাড়া করে সভ্য মানুষের দেবদর্শনের ব্যবস্থা হচ্ছে। শক্তিমানে শক্তি (পড়ুন, অসভ্যতা) প্রদর্শন করে বাইরে। নিবর্লের যত দাপাদাপি ঘরে। তাই তো স্রোতহীন টেমস্, রাইন আজও তির তির করে বয়ে চলে আর দুরন্ত যমুনার বুকে চড়া পড়ে, দামোদর যায় মরে।

আচ্ছা, আপনার গায়ের চামড়াটা যদি ছাড়িয়ে নেওয়া হয় তাহলে কেমন হয়? ছাড়াবার আগে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রস্তাবটাতেই ঠিক কেমন বোধ হবে? ছাল ছাড়িয়ে নেব, চামড়া গুটিয়ে দেব— এ-বাক্যগুলোতে অসম্মানের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতিরও কিছু আভাস কি থাকে না? আর ধরুন সত্যি সত্যি ছালটা হাপিস হয়ে গেল, তাহলে? তাহলে উন্মুক্ত কাঁচা পেশি, ঘা-পুঁজ, গ্যাংগ্ৰিন, অঙ্গহানি, মৃত্যু। সেটাই হচ্ছে। পাহাড়ের অঙ্গ চর্মহীন। কোথাও সভ্য মানুষের বর্বর প্রযুক্তি তার মাংস চেঁছে নিচ্ছে। কাটা জায়গা থেকে কাঁচা মাংসের দলা হুড়হড় করে বেরিয়ে নামছে। লোকে বলে ল্যান্ডস্লাইড।
পাহাড়ি নদী কিশোরী কন্যার মতো— উচ্ছল, টগবগে, প্রাণশক্তিতে ভরপুর। আজ তিস্তা নদীর উপর ত্রিশটা নদীবাঁধ! মূর্তি নদীর ধারে অম্বুজার রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স! চোদ্দোটি সুড়ঙ্গ-সম্বলিত সেবক-গ্যাংটক রেলপথ প্রকল্প! সিকিমে চোদ্দোটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প! ভুটানের পাহাড়ি নদীগুলোর নাব্যতা এমনিতেই কম, তার ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দোসর! পরিবেশবিদ, ভূতাত্ত্বিকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কিশোরী কন্যার এমন শাসন হচ্ছে যে তার মৃত্যু অনিবার্য। ছোট ছোট সীমিত জনসংখ্যার গ্রামগুলোতে এখন যত্রতত্র হোটেল, হোম স্টে। বালাসনের একদা নিরিবিলি হ্রদের চারপাশে এখন বিস্তর ছোট-বড় হোটেল, রেস্তোরাঁ। এত বিপুল নির্মাণের জন্য চাই স্থানসঙ্কুলান। আর তার জন্য খুবই জরুরি বৃক্ষছেদন।
সেবকের কাছে কালিঝোরায় তিস্তা নদীতে বাঁধ দেওয়ার বিপুল প্রতিবাদ দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা কানে তোলেননি। তাদের চাই বিদ্যুৎ, তাদের চাই জলের বড় ভাগটা (তার স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে)। এবার তিস্তাবাজারে বন্যার ওই প্রলয়ঙ্করী রূপের কারণ এই অবজ্ঞা। তিস্তা আর রঙ্গিত খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর মিলিত প্রবাহ সঙ্গমের পর পরই কালিঝোরায় বাঁধে আটকে পড়ে। ঠিক যেমন হিমাচলের বাস্পা আর সুৎলেজ। যে পলির নিক্ষেপ হওয়ার কথা বন্যার সময় কূল উপচে দু-পাড়ে কৃষিজমির উর্বরতা বাড়িয়ে, যে বালি যেত অন্তিমে সাগরে, সেসব জমেছে বাঁধের আগে, নদীর গর্ভে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। নদী তার ধারণক্ষমতা হারাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে নদীর বাস্তুতন্ত্র। নদী তার দুপাশে একটু অবকাশ চায়। পাশ্চাত্যপ্রভুদের চরণচিহ্ন পড়ার আগে আমাদের পিছিয়ে থাকা প্রাচ্যপূর্বজরা দেশজ নদীর এ চরিত্রটি বুঝতেন বলে বাস রাখতেন নদী থেকে দূরে, চাষ করতেন নদীর কোল ঘেঁষে। রাস্তা হোক বা বাড়ি, উন্নয়নের স্বার্থে প্রথম বলি হয়— গাছ। হিমাচল থেকে মধ্যপ্রদেশ হয়ে নিকোবর— সর্বত্র। গাছহীন মাটি জৈব হিউমাসের অভাবে হয়ে পড়ে শুষ্ক। তার জলধারণ ক্ষমতা যায় কমে। যে মাটি গাছের ছায়ায় থাকে তার ফাঁক গলে গলে জল সেঁধিয়ে যায় অনেক গভীরে, সমৃদ্ধ হয় ভূগর্ভস্থ জলস্তর। সেই একই মাটি গাছ না থাকলে সেই একই জল আর ধরে রাখতে পারে না। তা মাটির ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যায় নিচে। একে প্রকৃতির রোষ বলার মানে নিজেদের দায় প্রকৃতির ঘাড়ে ঠেলা। পরিকল্পনাহীন বৃক্ষহত্যা, অবৈজ্ঞানিক পাহাড় ওড়ানো, বয়সে নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উপর বাড়তে থাকা কংক্রিটের চাপ আর নদী ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই বাঁধে বাঁধা— পরিণাম অজানা নয়। তাও প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করার দুঃসাহস রাখা যায় কারণ পরিণাম ছুঁতে পারে না সেই পরিকল্পনাকারী, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কিংবা পর্যটন থেকে বড় মুনাফাকারী সংস্থাদের, যারা থেকে যায় নিরাপদ দূরত্বে। জলে ভাসে স্থানীয় সাধারণ মানুষ যাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়নি কোনওদিন। উন্নয়নের সুফল পান অর্থবান বহিরাগত আর ধ্বংসের সঙ্গে যোঝেন দরিদ্র স্থানীয়জন।
আর সবার উপরে রাজনীতি সত্য। পশ্চিমবঙ্গনিবাসী হিসেবে আমরা সকলেই একই রাস্তা প্রতি বছর তৈরি হওয়া আর পাঁচ মাসের মধ্যেই তা চাঁদের পাহাড়তুল্য হয়ে পড়ার পেছনের সমীকরণ সম্বন্ধে কমবেশি ওয়াকিবহাল। আর সেই কবেই গোখলে বলে গিয়েছিলেন হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো। রাজনীতির পায়ে, লোভের দায়ে প্রকৃতির বলি হয়ে চলাই নিয়তি এ পোড়া দেশে। কারণ এ দেশটা যতটা সুন্দর ঠিক ততটাই কুৎসিত এ রাষ্ট্র। এখানে উন্নয়নযজ্ঞ চলছে দিবারাত্রি দেবতা বিদায়ের।

