আপাতত চার তারিখ অবধি অপেক্ষা

তাপস কুমার দাশ

 


পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে জনগণেশের ভূমিকাই শেষ কথা, কোনও তাত্ত্বিক অ্যানালিস্টের নয়। এবং সেই ভূমিকা খুবই রহস্যময়— কখন যে জনতা লাগ ভেলকি লাগ বলে গণেশ উল্টে দেবে, তা কেউ জানে না

 

 

তৃণমূলের মোট ভোট, এবং আসন, দুই-ই কমবে। তবু তৃণমূলই ক্ষমতায় আসবে এবার। এর অন্যথা হবে না। প্রধানত সমাজমাধ্যম এবং শহরাঞ্চলে মানুষ যে যে কারণে তৃণমূলের ওপর ক্ষুব্ধ (বা বিরক্ত, ক্রুদ্ধ, ঘৃণাবর্ষী) অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই, সেই ইস্যুগুলির সঙ্গে (এমনকি আরজিকর বা শিক্ষক নিয়োগের বিষয়গুলিতেও) গ্রামবাংলার বা দূর মফস্বলের মানুষ, প্রান্তিক জনগণ, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন জনজাতির মানুষ নিজেকে রিলেট করে উঠতে পারেননি। সেইসব মানুষরা পশ্চিমবঙ্গের ভোটারের সিংহভাগ। এছাড়া আছে ভাতার সুকৌশলী প্রয়োগ। ফলে তৃণমূল মোটামুটি নিশ্চিন্ত। তবে হাওয়া কিছুটা থমথমে বলে এই মুহূর্তে শাসকদলের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীকে আপাতত সংযত রাখা হয়েছে, ঔদ্ধত্য অন্যান্যবারের মতো দৃশ্যমান নয়। তবে ভালো মার্জিনে জিতলে অবিলম্বে প্রবল হিংসাত্মক এবং প্রতিশোধমূলক ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনা আছে।

বিজেপির ভোট এবং আসন দুই-ই বাড়বে। কিন্তু সেটার মানে এই নয় যে বাংলার সাধারণ মানুষের ধর্মীয় মেরুকরণ বেড়েছে। এই বর্ধিত ভোট প্রায় পুরোটাই অ্যান্টিইনকামবেন্সি ভোট। শাসক দলের নষ্টামিতে (প্রধানত শহুরে) মানুষ ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, এবং ঘৃণায় ফুটছেন। তাঁরা যে কোনও মূল্যে দাদাগিরির অবসান চান, এবং সাধারণ মানুষ যেহেতু নীতিবাগীশ বা বুদ্ধিব্যবসায়ী নন, তাঁরা কোনও পলিটিক্যাল ইজমের ধার ধারেন না, তাঁরা চান এমন শক্তিশালী কাউকে যারা দাদাগিরি বন্ধ করাতে পারবে। তাই তাঁরা বিজেপিকে বাছবেন দাদাতর হিসেবে, যেহেতু কেন্দ্রে বিজেপি সরকার তাই তাঁদের মনে হচ্ছে দাদাগিরি আটকানোয় বামপন্থীদের থেকে বিজেপির ক্ষমতা বেশি। এই বিজেপিমুখীনতা এই মুহূর্তে বিশুদ্ধ আত্মরক্ষার সংগ্রাম, জেনেরিক্যালি এবং গ্রসলি রিলিজিয়াস পোলারাইজেশন নয়।

তবে বঙ্গে বিজেপির সংগঠন ভালো নয়। ফলে সাধারণভাবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার সামান্যতম কোনও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বিজেপি হিংস্রতমভাবে ঝাঁপাবে, কারণ বাংলা দখলের এটাই সম্ভবত শেষ সুযোগ বিজেপির। সর্বভারতীয় অবস্থানগতভাবে বিজেপি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, আজ থেকে পাঁচ বছর বাদে পরিস্থিতি তাদের পক্ষে খুব সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা কম। তার সঙ্গে, মোদির বয়স বাড়ছে, এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কাছে মোদি জমি হারাচ্ছেন উচ্চস্তরে। ফলে সাধারণভাবে যদিও কোনও অবস্থাতেই বিজেপির এবারে জেতার কোনও আশা নেই, কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ল এনফোর্সমেন্ট (রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনা সবার আগে আঁচ করে সমাজবিরোধী এবং আইনরক্ষকরা, এবং সেইভাবে তারা ছাতা পাল্টায়), ইভিএম ট্যাম্পারিং, ইত্যাদি সম্ভাব্য সকল অনৈতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে, পরিস্থিতি ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব, সে ব্যাপারে এই মুহূর্তে কিছু কনক্লুসিভ বক্তব্য রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বামেদের ভোট যথেষ্ট পরিমাণে বাড়বে। আসন কটা পেতে পারে সেই ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব না, কারণ ভোট বেশি পেলেই আসন বেশি— এরকম নাও হতে পারে, ইলেকটোরাল ডেমোক্রেসির অনেক টেকনিক্যাল ফ্যাকড়া আছে, ভোট এবং সিটের ডিস্ট্রিবিউশন ফাংশানের ইমপেয়ারিটি সেগুলোর মধ্যে একটা। তবে ভোট বাড়বেই। নবীন প্রার্থী এবং তাঁদের সমর্থকরা যেভাবে জান লড়িয়ে রাস্তায় নেমেছেন অনেককাল বাদে, তা প্রকৃতই প্রশংসনীয়, এবং অবশ্যই অসম্ভব শ্রদ্ধার্হ। শিক্ষিত, ভদ্র, সৎ, ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী, মননশীল ও সংবেদনশীল একঝাঁক তরুণ রক্ত যেভাবে দিনরাত এক করে রাস্তায় পড়ে আছেন এবং জনসংযোগ করছেন, তাতে করে প্রকৃতই একটা নতুন জোশ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে চারদিকে— রঙ্গলাল বাঁড়ুজ্জে অ্যাড্রিনালিন ছড়াচ্ছেন:

অই শুন! অই শুন! ভেরীর আওয়াজ হে,
ভেরীর আওয়াজ।
সাজ সাজ সাজ বলে, সাজ সাজ সাজ হে,
সাজ সাজ সাজ

মানুষ দেখতে পাচ্ছে এই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা, অ্যাপ্রিসিয়েট করছে, যথেষ্ট শ্রদ্ধাও করছে। এই গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে যদিও, বহু আগে থেকেই নিরন্তর এই পদ্ধতিতে থাকার প্রয়োজন ছিল, ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ায় গুছিয়ে উঠতে একটু সময় লেগে গেছে। তৎসহ, বামযুগের শেষের দিকে যে বিচ্যুতিগুলি সাধারণ, অরাজনৈতিক, ফ্লোটিং ভোটারদের ক্ষুব্ধ করেছিল, মাত্র পনেরো বছর সেগুলি ভুলে গিয়ে পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট সময় নয় মানবমনে। ফলে অতিরিক্ত ভালো ফল করার স্বপ্ন দেখা এই নির্বাচনে রিয়েলিস্টিক নয়। কিন্তু বাম এগোচ্ছে। এগোবে। দু-হাজার একত্রিশে তৃণমূল-বিজেপি এই বাইনারির জায়গায় তৃণমূল-বাম বাইনারি দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এদিক-ওদিকে ব্যক্তিগত স্তরে পরিচ্ছন্ন এবং সৎ ভাবমূর্তি থাকা হাতেগোনা সামান্য কিছু প্রার্থীকে বাদ দিলে, দল হিসেবে কংগ্রেসের অবস্থা সম্ভবত খুব কিছু একটা উল্লেখযোগ্য নয় এই নির্বাচনে। তাদের ওপর বাজি ধরা ফলত খুব একটা বাস্তবমুখী বলে মনে হয় না। তবে ভবিষ্যতে একটা বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা আছে দলটির। এ-কথা বুঝতে খুব কিছু মেধার প্রয়োজন নেই যে তৃণমূল সুপ্রিমোর অবর্তমানে (বা কোনও কারণে তিনি বসে গেলে) সম্পূর্ণ তৃণমূল দলটি মুহূর্তে কোল্যাপ্স করবে যেহেতু অভিষেকবাবুর আদৌ কোনও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই নেই, প্রকৃতপক্ষে ওঁর বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক অস্তিত্বই নেই সুপ্রিমো ছাড়া। তৃণমূল কোল্যাপ্স করলে পশ্চিমবঙ্গে উল্কার বেগে উঠে আসবে কংগ্রেস। কারণ ভারতবর্ষে রাজনীতি চালায় কর্পোরেটরা, রাজনৈতিক নেতারা (বাম দলগুলি ছাড়া) তাদের ইচ্ছার ক্রীড়নক মাত্র। সেখানে দাঁড়িয়ে, সর্বভারতীয় স্তরের বিচারে যেহেতু কংগ্রেস (এবং গান্ধি ডাইন্যাস্টি) কর্পোরেটদের বেস্ট বেট, সেহেতু কংগ্রেসকেই তুলে আনা হবে। ভেঙে যাওয়া তৃণমূলের অধিকাংশই কংগ্রেসে ঢোকার জন্য ভিড় করবে, বিজেপিতে না, কারণ বাংলায় বিজেপি বলে কোনও পার্টির অস্তিত্বই নেই প্রকৃত প্রস্তাবে— সবাই জানে ওটা তৃণমূলের বি টিম।

ফলে, তৃণমূল-বিজেপি বাইনারির বদলে, ভবিষ্যতে কোনও এক সময় আবার কয়েক দশক আগের মতো বাম-কংগ্রেস বাইনারি ফিরে আসার সম্ভাবনাকেও কিন্তু মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবশেষে একটা কথা বলার— পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে জনগণেশের ভূমিকাই শেষ কথা, কোনও তাত্ত্বিক অ্যানালিস্টের নয়। এবং সেই ভূমিকা খুবই রহস্যময়— কখন যে জনতা লাগ ভেলকি লাগ বলে গণেশ উল্টে দেবে, তা কেউ জানে না।

চার তারিখ কোন ভেলকি অপেক্ষা করে আছে, তা জানতে গেলে ফলত চার তারিখ অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5364 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...