ইউক্রেন যুদ্ধে চিনের কৌশল এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার সম্ভাব্য রূপ প্রসঙ্গে

পিয়ের আন্দ্রিউ

 


ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য চিনের তেমন কোনও প্রণোদনা নেই; এমনকি তারা যদি তা চায়ও তাহলেও রাশিয়ার উপর প্রভাব খাটানোর মতো কার্যকর ক্ষমতা তার হাতে খুব কম। ফলে রাশিয়ার ইউক্রেনবিরোধী যুদ্ধে চিনের নীরব সমর্থনের উপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে কেবল পশ্চিমি চাপ— যা এখনও পর্যন্ত কার্যত ফলপ্রসূ হয়নি

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে শান্তি আলোচনা চলতে থাকলেও, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধ এখনও অব্যাহত, এবং এর সমাপ্তিও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। এই শান্তি আলোচনায় চিন হয়তো প্রধান ভূমিকা পালন করছে না, কিন্তু এই সংঘাতের ফলাফলের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িয়ে আছে। এই প্রবন্ধে মস্কো, ওয়াশিংটন, কিয়েভ ও ব্রাসেলসের বৃহৎ শক্তিগুলির কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন সংঘাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বেইজিংয়ের হিসাব-নিকাশ এবং সম্ভাব্য ভূমিকা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

রাশিয়ার নিরবচ্ছিন্ন সামরিক অভিযানের মুখে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস এবং বেইজিং— প্রত্যেকেই এই যুদ্ধকে ঘিরে স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রধান শান্তি-মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভ ও মস্কোর পরস্পরবিরোধী শান্তি-চুক্তির দাবিগুলিকে সমন্বয় করার জন্য ক্রমাগত তার নীতি পরিবর্তন করে চলেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান ক্রমশ ইউক্রেনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে, আর চিন নিরপেক্ষ কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা বললেও সেগুলি কার্যত রাশিয়া-পন্থী অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যেহেতু এই যুদ্ধ প্রসঙ্গে চিনের উদ্যোগগুলি মূলত রাশিয়ার অবস্থানের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই বাস্তবে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাতে তাদের খুব একটা সদর্থক ভূমিকা দেখা যায়নি। বরং তারা নিজেদের এমন এক নীতিনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, যে শান্তিপ্রতিষ্ঠা ও উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরোধিতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সময়ে, এই অবস্থান সত্ত্বেও, বেইজিং কিয়েভের সঙ্গে বিশেষত বাণিজ্য ও ব্যবসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে তুলতে দ্বিধা করেনি। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চিনের এই অবস্থান যুদ্ধবিরতির শর্ত ও নিয়মাবলি নিয়ে কিয়েভের প্রধান লক্ষ্যগুলির থেকে বেইজিংকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

সেই অনুযায়ী, এই প্রবন্ধে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে: শান্তি-আলোচনার চলমান অচলাবস্থার মধ্যে ইউক্রেন নিয়ে চিনের অভিপ্রায় কী? এবং চিনের কূটনৈতিক প্রস্তাবগুলি সারা বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে?

 

মঞ্চ নির্মাণ

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মস্কো যুদ্ধবিরতির যে কোনও চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে সমগ্র ডনবাস অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণের দাবি বজায় রেখেছে। এই অবস্থানটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের পরিপন্থী— তিনি বর্তমান ফ্রন্টলাইন বরাবর উভয়পক্ষের সেনাবাহিনীর অবস্থান স্থির রেখে যুদ্ধ থামানোর কথা বলেছেন। এর মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুটি প্রধান রুশ তেল কোম্পানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় রুশ ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে বুদাপেস্টে নির্ধারিত একটি বৈঠক গত অক্টোবরে বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপের “coalition of the willing”-এ যোগ দিয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও প্রদান করেছে।[1] তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রাক্তন ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ইউরোপ ও রাশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ডিরেক্টর ফিওনা হিল Le Monde-কে বলেন, পুতিন প্রচণ্ড দৃঢ়: “ইউক্রেনের জন্য পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না, কিন্তু রাশিয়ার জন্যও নয়। দু-পক্ষই এই ভয়াবহ যুদ্ধে ফেঁসে গেছে। পুতিন যেভাবেই হোক যুদ্ধ জিততে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যদি যুদ্ধক্ষেত্রে না পারেন, তবে অন্য যে-কোনও উপায়ে।”[2]

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য কিয়েভের সেই অবস্থানকেই সমর্থন করে চলেছে যে, রাশিয়ার দখল করে নেওয়া কোনও ভূখণ্ডই ইউক্রেনের ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

আর শেষত চিন— যে “রাশিয়া-পন্থী নিরপেক্ষতা”-র অবস্থান গ্রহণ করেছে— ইউক্রেন আক্রমণের আগে থেকেই মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে এবং এখনও তাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয়।[3]

এই প্রেক্ষাপটে চিনের সক্রিয়ভাবে সমাধান খোঁজার সম্ভাবনা কম, কারণ সংঘাত অব্যাহত থাকা অনেক দিক থেকেই তার স্বার্থের অনুকূল। একই সঙ্গে বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চিন ইউক্রেনের সঙ্গেও প্রধানত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কিছু সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে তাদের পারস্পরিক রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত দূরত্বের কারণে, এবং অবশ্যই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফলে, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং দুই দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যে বিস্তৃত আদান-প্রদান সীমাবদ্ধই রয়ে গেছে।

তবে পরস্পরের বাজারে চিন ও ইউক্রেনের অর্থনৈতিক স্বার্থ উল্লেখযোগ্য, এবং তাদের মধ্যে বাণিজ্য হওয়া পণ্যের পরিসরও বিস্তৃত— এমনকি তার মধ্যে চিনা ড্রোনও রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যের ভারসাম্য চিনের রপ্তানির দিকেই অত্যন্ত বেশি ঝুঁকে রয়েছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম।[4] এর সঙ্গে, ইউরোপীয় বাজারে যোগদানের লক্ষ্যে কিয়েভ যে আলোচনাগুলি চালাচ্ছে, তার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপিত বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক বাধানিষেধও এই দুই দেশের মধ্যে কোনও অর্থবহ ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠা কঠিন করে তুলছে। তদুপরি, চিন-রাশিয়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতা— বিশেষত ইউক্রেনের সঙ্গে চিনের সম্পর্কের তুলনায়— এতটাই বেশি যে, এই যুদ্ধে মস্কোর অবস্থানের উপর বেইজিংয়ের পক্ষে কোনও বাস্তব ও কার্যকর প্রভাব খাটানো প্রায় অসম্ভব।

সংক্ষেপে বলা যায়, রাশিয়ার সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে চিনের স্বার্থই সম্ভবত অগ্রাধিকার পাবে; ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রশ্নটি সেই তুলনায় গৌণ হয়ে পড়বে— বিশেষত যদি যুদ্ধবিরতি চিন-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই পর্যায়ে কেবল পশ্চিমি দেশগুলিই সম্ভবত মস্কোর প্রতি চিনের সমর্থন সীমিত করতে বেইজিংয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে পরোক্ষভাবে রাশিয়ার ইউক্রেন-নীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ ধরনের কূটনৈতিক তদ্বির ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের প্রচেষ্টা এখনও পর্যন্ত খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি; কারণ বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

সংক্ষেপে, এই প্রবন্ধের বক্তব্য হল— ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য চিনের তেমন কোনও প্রণোদনা নেই; এমনকি তারা যদি তা চায়ও তাহলেও রাশিয়ার উপর প্রভাব খাটানোর মতো কার্যকর ক্ষমতা তার হাতে খুব কম। ফলে রাশিয়ার ইউক্রেনবিরোধী যুদ্ধে চিনের নীরব সমর্থনের উপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে কেবল পশ্চিমি চাপ— যা এখনও পর্যন্ত কার্যত ফলপ্রসূ হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে প্রবন্ধটি এমন একটি ধারণাকে ভিত্তি করে এগোবে, যা এখনও জনসমাজের আলোচনায় কঠোরভাবে পর্যালোচিত হয়নি: মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের কারণে বেইজিং কিছুটা সীমাবদ্ধ থাকলেও, মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে শান্তি-আলোচনার অগ্রগতি ভবিষ্যৎ বছরগুলিতে ইউক্রেনের উপর চিনের আরও সক্রিয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

 

একটি নতুন মোড়: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের তাৎপর্য

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই মস্কো, বেইজিং এবং কিয়েভে প্রভাব ফেলেছে। নিবন্ধের এই অংশে রাশিয়া, চিন এবং ইউক্রেনের দৃষ্টিকোণ থেকে ওই অভিযানের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার পর আমরা দেখব, ইউক্রেনের সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টাকে সামনে রেখে বেইজিং এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজধানীগুলি কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আদর্শগত ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের কারণে নিকোলাস মাদুরোর অপহরণের ঘটনাকে রুশ সরকার স্বাভাবিকভাবেই তীব্র নিন্দা করেছে। গত বছর ৯ মে মস্কোতে নাৎসিবাদের উপর রাশিয়ার বিজয় স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মাদুরো উপস্থিত ছিলেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য— আনুমানিক প্রায় ১১ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলার[5]— এবং এর মধ্যে কারাকাসকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করাও অন্তর্ভুক্ত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানের সময় রাশিয়ার তৈরি S-300 বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মার্কিন বিমানকে প্রতিহত করতে কার্যত ব্যর্থ হয়। ফলে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ ক্ষতি যথেষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে মস্কোতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ওয়াশিংটন যদি ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলভাণ্ডারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তবে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৫০ ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে— সাধারণভাবে রাশিয়ার যুদ্ধ-প্রচেষ্টা টিকিয়ে রাখার জন্য যা পর্যাপ্ত নয় বলেই মনে করা হয়।[6]

মার্কিন অভিযানের অল্প সময়ের মধ্যেই ৩ জানুয়ারি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MID) এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানায়।[7] তবে ভ্লাদিমির পুতিন নিজে নীরবই থেকেছেন— যদিও অনেকেই মনে করেছিলেন যে তিনি এই ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করতে ছাড়বেন না।[8]

এই একই সময়ে, ক্রেমলিনপন্থী প্রচারকারীরা আবার আক্ষেপ করছে যে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার তথাকথিত “বিশেষ সামরিক অভিযান”— যা ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল এবং যার ঘোষিত লক্ষ্যগুলির মধ্যে জেলেনস্কির অপসারণও ছিল— তা কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের মতো সফল হয়নি। এই রুশ প্রচারকদের মতে, এখন খোলাখুলিভাবে স্বীকার করা উচিত যে ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলি মস্কোর “প্রভাব বলয়ের” অন্তর্ভুক্ত। তাদের যুক্তি হল, সে ক্ষেত্রে মস্কোও আর্মেনিয়া ও মধ্য এশিয়ায় “বিশেষ সামরিক অভিযান” চালানোর ন্যায্যতা দাবি করতে পারে— যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় করেছে।[9]

মোটের ওপর বলা যায়, ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার এই পরাজয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত মস্কোর পক্ষে তার লাতিন আমেরিকান মিত্রের সহায়তায় এগিয়ে আসা কার্যত অসম্ভব ছিল।[10]

প্রায় একই প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল বেইজিংয়েও। ভেনেজুয়েলায় তার “সর্বাবস্থার কৌশলগত অংশীদার”-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে চিন কেবল নিন্দা জানাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পেরেছিল; তাঁকে সাহায্য করার মতো কোনও বাস্তব সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা বা সুযোগ তার ছিল না। ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি, অপহরণের কয়েক ঘণ্টা আগে নিকোলাস মাদুরো লাতিন আমেরিকা-বিষয়ক চিনের বিশেষ প্রতিনিধি চিউ শিয়াওছি-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই বৈঠকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে নিজের “দাদা” বলে উল্লেখ করেন।[11] তবে আসন্ন মার্কিন অভিযানের বিষয়ে চিনের আগে থেকে খুবই কম ধারণা বা প্রস্তুতি ছিল।

রাশিয়ার মতোই, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান লাতিন আমেরিকায় নিজের উপস্থিতি জোরদার করার ক্ষেত্রে চিনের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। অর্থনৈতিক দিক থেকে, ভেনেজুয়েলা তার প্রায় সমগ্র তেল উৎপাদনই চিনে রপ্তানি করত— প্রতিদিন প্রায় ৬৪২,০০০ ব্যারেল— যদিও এই সরবরাহ চিনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। ২০১৬ সাল থেকে বেইজিং ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে— ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই বিনিয়োগের মধ্যে একটি চিনা-সমর্থিত প্রকল্প রয়েছে, যার লক্ষ্য ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ৬০,০০০ ব্যারেল উৎপাদনে পৌঁছানো; যদিও ভেনেজুয়েলার সামগ্রিক তেল উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল প্রতিদিনের কাছাকাছি। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে, গত ২০ বছরে ভেনেজুয়েলায় চিনের মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার ফলে দেশটি লাতিন আমেরিকায় চিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে।[12]

সার্বিকভাবে বলা যায়, লাতিন আমেরিকায় এই দুই ইউরেশীয় শক্তি একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে চিন এখনও সেখানে শক্তিশালী রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তাই আপাতত বেইজিংয়ের সামনে কার্যত একটাই পথ খোলা রয়েছে— “সময়ের অপেক্ষা করা” এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এগোনোর নীতি গ্রহণ করা। বেইজিংয়ের মতে, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন-বিরোধী একটি জোট গঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাদের যুক্তি হল: “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতিগুলি লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্যবিরোধী মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করবে। এর ফলে আঞ্চলিক ও বহুমেরু বিকাশের জন্য নতুন গতি তৈরি হবে, যেখানে বাইরের শক্তিগুলির সঙ্গে সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে— যাতে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।”[13]

শেষত, ইউক্রেনে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের প্রভাব দ্বিমুখী। একদিকে, মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্রকে অপসারণ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট স্বাগত জানিয়েছেন। এমনকি জেলেনস্কি মজার ছলে এমনও মন্তব্য করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখন “কী করতে হবে তা জানে”— স্পষ্টতই ইঙ্গিত, যুক্তরাষ্ট্রের ভ্লাদিমির পুতিনকে সরানোরও ক্ষমতা রয়েছে।[14]

অন্যদিকে, ইউক্রেনীয়দের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে যে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তিপ্রদর্শনকে রাশিয়া পূর্ব ইউরোপে— বিশেষত ইউক্রেন এবং আশেপাশে— তার এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।[15]

 

ট্যাঙ্গো নাচতে দুজন লাগে: সংঘাতের অবসানে রাশিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং চিনের ভূমিকা

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

সম্মুখ ফ্রন্টে রাশিয়া এখনও স্থলযুদ্ধে নিরলসভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বিপুল মানবিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমি অনুমান অনুযায়ী রাশিয়ার মোট হতাহতের সংখ্যা (আহত, নিহত ও নিখোঁজ মিলিয়ে) ১০ লক্ষেরও বেশি, যার মধ্যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ৩,২৫,০০০ জন নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির হিসাবমতে, প্রায় ৪৬,০০০ সৈন্য নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৩,৯০,০০০ জন আহত হয়েছে।[16] গত বছরে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের প্রায় ৪,৮৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে এবং কুর্স্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনী যে প্রায় ৪৭৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছিল, তাও পুনরুদ্ধার করে। মোটের উপর রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ০.৮ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করেছে।[17]

এই সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কার্যকারিতা ও পাল্লা ক্রমাগত উন্নত ও অভিযোজিত করছে। একই সঙ্গে তারা ইউক্রেনের ভূখণ্ডের গভীরে মারণবোমা বর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।[18] ইউক্রেনের বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে বিশেষ করে লক্ষ্য বানানো হচ্ছে, যাতে হাজার হাজার বাড়ি গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হয়। এর জবাবে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার ভূখণ্ডে অবস্থিত তেল শোধনাগারগুলিতে আঘাত হেনেছে, যার ফলে রাশিয়ার পরিশোধন ক্ষমতা প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানা যাচ্ছে।[19]

ফলে এই ক্ষয়যুদ্ধ কার্যত এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, কারণ “ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে পারছে না, আবার রাশিয়াও সামরিকভাবে ইউক্রেনকে পরাজিত করতে সক্ষম হচ্ছে না।”[20]

রাশিয়ার অর্থনীতির ক্ষেত্রে, ফরাসি ব্যবসায়িক দৈনিক Les Echos জানিয়েছে— “ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থনীতি ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই জালে জড়িয়ে পড়ছে।” ২০২১ সালে রাশিয়া তার বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছিল, কিন্তু বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে— যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৮ শতাংশের সমান। এর মধ্যে অবশ্য অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত।[21] এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার অর্থনীতির সামনে যে কঠিন সমস্যাগুলি তৈরি হচ্ছে, তা ২০২৭ সাল নাগাদ পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

তবুও Les Echos ফরাসি গবেষক ফ্রাঙ্কো হেইজবার্গের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে: “মজার বিষয় হল, ইতিহাস দেখায় যে সংঘাতে অর্থনৈতিক সামর্থ্য আমরা যতটা মনে করি, বাস্তবে ততটা নির্ধারক নয়। একটি সমাজ বা শাসনব্যবস্থার দৃঢ় সংকল্প— এবং বলা বাহুল্য, যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফল— অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”[22]

সুতরাং মনে হচ্ছে পুতিন ইউক্রেনে তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যে কোনও মূল্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।[23] এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে একটি— এখনও পর্যন্ত যার অনেকটাই তাত্ত্বিক— যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর তথাকথিত “coalition of the willing”-এর পক্ষ থেকে স্থলসেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত রাশিয়ার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ডেকে এনেছে। মস্কো সতর্ক করে দিয়েছে যে এই বাহিনীকে তারা “সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।[24]

এদিকে ইউক্রেন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুড পাল্টানোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করছে বলেই মনে হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট অ্যাঙ্কোরেজে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর পুতিনের অনমনীয়তায় হতাশা প্রকাশ করলেও, ওয়াশিংটন কিয়েভকে রুশ জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনকি ইউক্রেনের হারানো সব ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনার কথাও উত্থাপন করেছিলেন।[25] আরও একধাপ এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দূরপাল্লার টোমাহক ক্রুজ মিসাইল সরবরাহ করার বিষয়টিও বিবেচনা করেছে, যদিও এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য সামরিকের চেয়ে রাজনৈতিক বলেই বেশি মনে হয়।[26]

এই ঘোষণার পর মস্কো থেকে কড়া সতর্কবার্তা আসে। এরপর ১৬ অক্টোবর পুতিন ট্রাম্পকে ফোন করেন এবং জানা যায় যে শান্তিপ্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি সম্পূর্ণ ডনেস্ক-এর উপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন।[27] পরের দিন হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় ট্রাম্প পুতিনের এই দাবির কথা জানালেও একটি বিকল্প প্রস্তাব দেন— যুদ্ধবিরতি হলে উভয় পক্ষ বর্তমান ফ্রন্টলাইনের অবস্থান অনুযায়ী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। এর ফলে মস্কো যুদ্ধের সময় যে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দখল করেছে কার্যত তার মস্কোর দখল মেনে নেওয়া হল।[28]

রাশিয়া সঙ্গে সঙ্গেই এই সম্ভাবনারও বিরোধিতা করে।[29] এই অনড় অবস্থান এখনও বহাল রয়েছে এবং তা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কিছুটা বিরক্তও করেছে বলে মনে হয়।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে বুদাপেস্টে মার্কিন ও রুশ প্রেসিডেন্টের মধ্যে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত হয়ে যায়, কারণ মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে সংঘাত সমাধানের প্রশ্নে সম্পূর্ণ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এই বৈঠক বাতিল হওয়ার ফলে পুতিন ইউক্রেনের অভ্যন্তরে হামলা আরও জোরদার করার সুযোগ পান এবং যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকেও কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেন। এই পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশেরই একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিছুদিনের মধ্যেই রাশিয়ার তেল জায়ান্ট রসনেফট এবং লুকঅয়েল-এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা করেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য এখন ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাপিয়ে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে অধিকাংশ সহায়তা ন্যাটোর নতুন “Prioritized Ukraine Requirements List initiative (PURL)”-এর মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। এই উদ্যোগটি জুলাই মাসে ন্যাটোর মহাসচিব জেনারেল মার্ক রুট এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট-এর মধ্যে এক বৈঠকে অনুমোদিত হয়। PURL ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যাটো ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মজুত থেকে “তাৎক্ষণিক ব্যবহারের উপযোগী” অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে, যার অর্থায়ন করে অন্যান্য সদস্য দেশগুলি। আগস্ট পর্যন্ত আটটি ন্যাটো দেশ এতে অংশ নিয়েছিল— বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, লাটভিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে এবং সুইডেন। মোট প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করা হয়। ইইউ এবং জি-৭ ইউরোপীয় ব্যাঙ্কগুলিতে জব্দ করে রাখা রুশ সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনকে ১৪০ বিলিয়ন ইউরোর সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করে।[30] তবে দীর্ঘ আলোচনার পর ইইউ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় যে ইউক্রেনের যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য রাশিয়ার আর্থিক সম্পদ ব্যবহার করা হবে না; বরং সেগুলি অনির্দিষ্টকালের জন্য জব্দ অবস্থাতেই রাখা হবে।[31]

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইইউ এবং যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের অবস্থানের সঙ্গেই নিজেদের সামঞ্জস্য বজায় রেখেছে— রাশিয়ার দখল করে নেওয়া কোনও ভূখণ্ডই ইউক্রেন ছেড়ে দেবে না।[32]

এর বিপরীতে ইউক্রেন সংঘাতে চিনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।[33] চিন সংঘাত সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করে কয়েকটি কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে— যেমন ২০২৩-এর ২৩ ফেব্রুয়ারির বারো দফা ঘোষণাপত্র “China’s Position on the Political Settlement of the Ukrainian Crisis.” কিন্তু এই নথিতে মূলত আন্তর্জাতিক আইনের প্রধান নীতিগুলিরই পুনরুল্লেখ করা হয়েছে— যেমন সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান— যেগুলি রাশিয়া স্পষ্টভাবেই লঙ্ঘন করছে। এই চিনা বিবৃতিটিতে কোনও বাস্তবসম্মত সমাধান, নিষ্পত্তির পরিকল্পনা বা আলোচনার কাঠামো দেওয়া হয়নি। আবার নথিটির শেষ অংশে যুদ্ধোত্তর ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে একজন সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করতেও চিন ভোলেনি।[34] এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাশিয়ায় প্রাক্তন চিনা রাষ্ট্রদূত লি হুই-কে পশ্চিমি রাজধানীগুলিতে এবং মস্কো সফরে পাঠানো হয়েছিল, যাতে তিনি “সংঘাতের রাজনৈতিক নিষ্পত্তির” বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালাতে পারেন।[35]

সার কথায়, বেইজিং মূলত একটি “রাশিয়া-পন্থী নিরপেক্ষতা”র একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণের কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং শি বেইজিংয়ে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন, যার শিরোনাম ছিল “On International Relations Entering a New Era and Sustainable Development.” আড়ম্বরপূর্ণ ভাষায় লেখা ওই নথিতে বলা হয় যে দুই দেশের নতুন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনও সীমা নেই এবং “সহযোগিতার কোনও ক্ষেত্রই নিষিদ্ধ নয়।” দুই নেতার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা, তাঁদের শক্তিশালী শাসনব্যবস্থার পারস্পরিক সামঞ্জস্য, মতাদর্শগত মিল, পশ্চিম ও তার মূল্যবোধের প্রতি তাঁদের তীব্র ও অভিন্ন বিরোধিতা, পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত স্বার্থ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক পরিপূরকতা— এই সব কারণই জটিল অতীত থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাখ্যা দেয়।[36]

একই সময়ে বেইজিং চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিনিধিদল পশ্চিমের বিভিন্ন রাজধানীতে পাঠিয়েছে। প্যারিসে এমনই একটি প্রতিনিধিদল কয়েকটি সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানে সফর করে, যার মধ্যে ছিল French Institute of International Relations এবং Centre for International Research। সেখানে আগত প্রতিনিধিরা বিশেষ করে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এক ইউক্রেনীয় গবেষকের মতে, এই বৈঠকগুলির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মূলত বেইজিংয়ের রাশিয়া-পন্থী অবস্থানকে তুলে ধরা।

২০২৪ সালের মে মাসে চিন ব্রাজিলের সঙ্গে যৌথভাবে জাতিসংঘে ইউক্রেন সংকটের একটি কূটনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনও দেশই ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা কিংবা আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়ার দায়িত্বের বিষয়টি উল্লেখ করেনি। ফলে কিয়েভ সেই নথি প্রত্যাখ্যান করে।[37]

চিনের কূটনৈতিক প্রভাব— বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে— ২০২৪ সালের জুনে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত পিস সামিটেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।[38] চিনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও বেইজিং সেখানে অংশ নেয়নি; বরং গ্লোবাল সাউথ-এর দেশগুলিকেও এই সম্মেলনে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করেছিল।

 

কেন চিনের ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি সমর্থন করার সম্ভাবনা কম

ইউক্রেন সংঘাত সমাধানের জন্য চিনের প্রস্তাবগুলি মূলত প্রতীকী এবং এগুলির উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ধারণা সৃষ্টি করা যে বেইজিং এই সংঘাতের মুখে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে নেই। তার রুশ “মিত্রে”র সঙ্গে নিজেদের অবস্থানের সামঞ্জস্য রেখে চিনের এই বিরোধ মেটানোর জন্য কোনও বাস্তব ও গুরুতর প্রস্তাব দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং সংঘাত চলতে থাকাতেই বেইজিংয়ের কিছু স্বার্থ রয়েছে। সেই কারণে ওয়াশিংটন বা ইইউ যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাবই দিক না কেন, চিনের তা সক্রিয়ভাবে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম। চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ব্রাসেলসে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত করেছেন বলে জানা যায়।[39]

কোনও আনুষ্ঠানিক জোটচুক্তি নয়, বরং শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও তথ্যগত অংশীদারিত্বই এই সমর্থনের ভিত্তি। শেষোক্ত ক্ষেত্রে তো বেইজিং নিয়মিতভাবে রুশ প্রচারণার সুরই প্রতিধ্বনিত করে— যেমন যুদ্ধের “গভীর ঐতিহাসিক শিকড়” বা “কিয়েভের শাসকদের নাৎসি চরিত্র”-সংক্রান্ত দাবি।

সামরিক ক্ষেত্রে এই সমর্থনের মধ্যে রয়েছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও উপাদান সরবরাহ— যেগুলি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও যন্ত্রপাতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি রুশ বোমাবর্ষণের জন্য স্যাটেলাইট নির্দেশনা দেওয়া এবং রাশিয়ার পক্ষে চিনা সৈন্যদের অংশ নেওয়ার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য ইউক্রেনীয় গবেষক দিমিত্রো শুলগা-র মতে এই অংশগ্রহণ স্বেচ্ছামূলক। তবে চিনা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় “২৫০ জন অংশগ্রহণকারী সৈন্য”-এর একটি তালিকা রয়েছে, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বেইজিংয়ের জন্য যথেষ্ট মূল্যবান।

এটাও মনে রাখা দরকার যে চিন ও রাশিয়ার কথিত “সীমাহীন সম্পর্ক”-এরও কিছু সীমা রয়েছে। এই সীমাগুলির পেছনে রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা— যার ভিত্তি উনিশ শতকে জারশাসিত রাশিয়ার দ্বারা বিশাল চিনা ভূখণ্ড দখলের স্মৃতি, ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকের সীমান্ত সংঘর্ষ, এবং দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, জনসংখ্যাগত ও প্রযুক্তিগত অসমতা।[40] যদিও দিমিত্রো শুলগা বিশ্বাস করেন, চিন যখন রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতি তার সমর্থন আরও জোরদার করছে, তখন “এই সীমাগুলিও ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।”[41]

ইউক্রেনীয় গবেষক ইউরি পয়তা দেখিয়েছেন মস্কো ও কিয়েভের প্রতি বেইজিংয়ের ভিন্নতর নীতি ২০২২ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত CCP-র ২০তম কংগ্রেসেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাঁর মতে, চিন রাশিয়াকে অর্থনৈতিক, আর্থিক, তথ্যগত ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যত সমর্থন জানাবে, ততই ইউক্রেনকে তার সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।[42] আর তার চার বছর পরে দেখা যাচ্ছে চিন রাশিয়ার প্রতি তার সমর্থন আরও বাড়িয়েছে এবং এখন এমন সরঞ্জামও সরবরাহ করছে যা সরাসরি সামরিক ব্যবহারের উপযোগী— যেমন ড্রোন পরিচালনার জন্য ফাইবার-অপটিক কেবল এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। এমনকি বেইজিং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত ড্রোন উৎপাদন কারখানাগুলিতে বিশেষজ্ঞও পাঠাচ্ছে।[43]

একই সময়ে, রাশিয়াকে শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন প্রদান করলেও চিন বাস্তববাদীভাবে ইউক্রেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় রাখছে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে এই সম্পর্ক বর্তমানে এমন একটি স্তরে রয়েছে, যা রাশিয়ার আক্রমণের আগের সময়ের সঙ্গে প্রায় তুলনীয়।[44] তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক এখনও খুব বেশি বিকশিত হয়নি। অবশ্য এই পরিস্থিতির একটি প্রধান কারণ হল— বেইজিং মস্কোকে বিরূপ করতে চায় না।

মৌলিকভাবে মনে হয়, চিন এখনও ইউক্রেনকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অংশ হিসেবে দেখে এবং সেই অর্থে তাকে রাশিয়ার “প্রভাব বলয়ের” অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করে। ফ্রান্সে চিনের সাবেক রাষ্ট্রদূত লু শায়ে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন স্বাধীন প্রজাতন্ত্রগুলির সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে “ক্রিমিয়া মূলত রাশিয়ারই অংশ ছিল”— যদিও পরে চিন দ্রুতই এই বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।[45] কিন্তু এই অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য সত্ত্বেও বেইজিং পরে তাঁকে ইউরোপীয় বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে কোনও দ্বিধা করেনি।[46]

এর বিপরীতে কিয়েভের কাছে ইউক্রেন রাশিয়ার “প্রভাব বলয়ের” মধ্যে থাকবে কি না— এ নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই। বরং দেশটি দ্রুতগতিতে ইউরোপের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ২০২২ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রার্থী মর্যাদা পাওয়ার পর ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ লাভের জন্য আলোচনা শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও জোরালোভাবে প্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও, যদিও চিন এখনও ইউক্রেনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার, তবু ইউক্রেনের উন্নয়ন কৌশল মূলত ইউরোপমুখী। এর ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার ২০২৫-এর রপ্তানি কৌশল-এ, যেখানে বেইজিংকে তুলনামূলকভাবে সীমিত ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।[47]

কিন্তু তা ইউক্রেনে চিনের নতুন রাষ্ট্রদূত মা শেংকুন-এর কিয়েভের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি ইতিমধ্যেই কয়েকজন ইউক্রেনীয় মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, যার মধ্যে কিয়েভের মেয়রও রয়েছেন, এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফরও করেছেন।[48] তাঁর এই প্রচেষ্টার কিছু ফলও দেখা যাচ্ছে। দুই দেশ ইতিমধ্যেই একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে ইউক্রেন চিনে কৃষিজ ও জলজ পণ্য রপ্তানি করবে।[49]

ফলে বাস্তববাদী কারণে বেইজিং ও কিয়েভ নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যতটা সম্ভব অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে তুলছে এবং একই সঙ্গে একটি ন্যূনতম রাজনৈতিক সংলাপও বজায় রাখছে— যাতে ভবিষ্যতে কোনও শান্তিচুক্তি হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা যায়।

সব মিলিয়ে এই সমস্ত সমীকরণই ব্যাখ্যা করে কেন চিনের পক্ষে ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতিকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা— সমর্থন করার সম্ভাবনাই খুব কম। মস্কোর সঙ্গে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কার্যগত সামঞ্জস্য তার আনুষ্ঠানিক জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে অবশিষ্ট সতর্কতা কিংবা কিয়েভের সঙ্গে তার সীমিত কিন্তু বাস্তববাদী যোগাযোগ— দুটিকেই ছাপিয়ে গেছে। চিন অর্থনৈতিক ও ভাবমূর্তিগত কারণে ইউক্রেনের সঙ্গে যোগাযোগের কিছু পথ খোলা রাখলেও, এই সম্পর্ক তার কৌশলগত হিসাবকে বদলায় না। সেই হিসাবের ভিত্তি মূলত রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্ব বজায় রাখা এবং পশ্চিমের বিরোধিতা করা।

ফলত, চিনের ভূমিকাকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নয়, বরং এমন এক শক্তি হিসেবে বোঝা অধিকতর যুক্তিযুক্ত— যে রাশিয়াকে সংঘাত দীর্ঘায়িত করার সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।

 

চিন-ইউক্রেন সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা

কাঠামোগত অসাম্য এবং বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণ চিন–ইউক্রেন দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের রাজনৈতিক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করছে। যদিও চিন–ইউক্রেন সম্পর্ক এমন একটি সম্ভাব্য মাধ্যম, যা বেইজিংয়ের যুদ্ধসংক্রান্ত অবস্থানের উপর পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে কিয়েভ ও বেইজিংয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চিনের রাশিয়া বা ইউক্রেন-সংঘাত সম্পর্কে অবস্থান বদলে দেবে— এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের আগে ইউক্রেনের ব্যবসায়িক মহল ও বিভিন্ন অঞ্চল চিনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বেশ আগ্রহী ছিল— বিশেষ করে কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানো এবং চিনা বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে। চিনের দিক থেকেও নানা ধরনের কোম্পানি— ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে বিরল ধাতু খননকারী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত— ইউক্রেনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতিমধ্যেই ২০২১ সালে চিনা কোম্পানি চেনশিন লিথিয়াম ইউক্রেনে এই খনিজ উত্তোলনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছিল।[50] এমনকি ২০২২ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের মধ্যে ইউক্রেনের চিনা ড্রোন কেনার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল— যেমনটি জার্মানিতে নির্বাসিত রুশ সিনোলজিস্ট আলেক্সেই চিগাদায়েভ উল্লেখ করেছেন।[51]

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেনিস স্মাইহাল জানান যে তাঁর দেশ কনজিউমার ড্রোনের বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ চিনা কোম্পানি DJI-এর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে, বিশেষ করে Mavic মডেলটি।[52] তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই ক্রয়গুলো সম্পূর্ণভাবে, নাকি আংশিকভাবে, সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে করা হয়েছে— সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। Komersant Ukraine-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধের[53] উদ্ধৃতি দিয়ে আলেক্সেই চিগাদায়েভ উল্লেখ করেন যে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ইউক্রেন প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলারের চিনা ড্রোন কিনেছিল। তবে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেন যে চিন কিয়েভ ও অন্যান্য পশ্চিমি দেশের কাছে DJI Mavic ড্রোন বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেগুলো এখন কেবল রাশিয়ার জন্য সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে।[54]

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং দশ বছর আগে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত Deep and Comprehensive Free Trade Agreement-এর সুবিধাগুলি ইউক্রেনকে স্বাভাবিকভাবেই ইইউ-র সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেনীয় রপ্তানি পণ্যের জন্য ইইউ বাজারে প্রবেশ অনেক সহজ হয়েছে।

চিনের Belt and Road Initiative-এর রুটের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিকল্পিত ইউরো-এশীয় সংযোগ প্রকল্প Global Gateway-র করিডোরগুলোর মধ্যে একটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে অবস্থিত হওয়ায় ২০২২ সালের আগে ইউক্রেন নিজেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান “গেটওয়ে” বা প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছিল।

ইউক্রেনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিন ও ইউক্রেনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার।[55] তবে এই বাণিজ্য-সম্পর্ক বেশ অস্থির। ২০২৫-এর প্রথমার্ধে ইউক্রেনের রপ্তানি প্রায় ৪৭ শতাংশ কমে যায়, অন্যদিকে চিন থেকে আমদানি ২৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।[56] চিন ইউক্রেনের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ভারসাম্য বেইজিংয়ের দিকে অত্যন্ত ঝুঁকে আছে। চিনা কর্তৃপক্ষের বজায় রাখা ভেটেরিনারি, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি নিয়মকানুন— কখনও কোভিড ১৯-এর অজুহাতে, কখনও বা রাজনৈতিক কারণে— ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলত, কিয়েভের টিকে থাকা মূলত পশ্চিমি সহায়তা ও সংহতির ওপরই নির্ভরশীল থেকে গেছে।[57]

রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের ক্ষেত্রে ইউক্রেন ও চিনের সম্পর্ক উন্নত করা এই মুহূর্তে আরও কঠিন— এমনকি প্রায় অসম্ভব— কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান একেবারেই বিপরীত। কিয়েভের আশঙ্কা হল, নাগরিক সমাজের যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বেইজিং হয়তো ব্যক্তি নিয়োগ করা, প্রতিষ্ঠান বা এনজিওতে প্রবেশ করা এবং সেসবের মাধ্যমে নিজের প্রভাব ও সফট পাওয়ার বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এই কারণে, ইউক্রেনীয় গবেষকদের কথা অনুযায়ী, ইউক্রেনীয়রা এসব সম্ভাব্য “হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা” ঠেকাতে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে— বিশেষ করে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বা অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলিতে।[58]

তবে যদি রাশিয়া ও চিনের সম্পর্কের দিকে দেখা যায়, সেখানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যেমন আগেও বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয় সংঘাতের ক্ষেত্রে চিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বেইজিং বেশ কিছু রেড লাইনস নির্ধারণ করেছে— যেমন ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার বিষয়ে রাশিয়াকে সতর্ক করা— যে হুমকি রাশিয়া মাঝেমাঝেই দিচ্ছে।[59] যতদিন পর্যন্ত উভয় দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং সামগ্রিকভাবে পশ্চিমি বিশ্বকে তাদের স্বার্থ ও নিজ নিজ শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে চিন ও রাশিয়ার এই কৌশলগত সামঞ্জস্য সম্ভবত অব্যাহত থাকবে।[60]

চিন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতার পেছনে তাদের শক্তিশালী ও পরিপূরক অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০.১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে প্রায় ২৬.৩ শতাংশ বেড়ে ২৪৪.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।[61] ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এই পরিমাণ প্রায় ১০৬.৪৮ বিলিয়ন ডলার,[62] যদিও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি সামান্য কম। চিন-ইউক্রেন বাণিজ্যের তুলনায় এই পরিমাণ অনেকটাই বেশি।

সংক্ষেপে বলা যায়, চিন ও রাশিয়ার মধ্যে প্রায় পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমন্বয় বিদ্যমান। এর ফলে চিন-ইউক্রেন সম্পর্কের সীমিত পরিসরের পক্ষে কোনওভাবেই চিন–রাশিয়া সম্পর্কের গভীরতা ও ব্যাপ্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় চিন-ইউক্রেন সম্পর্কের পক্ষে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ সংক্রান্ত অবস্থানকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা খুবই কম। আরও কম সম্ভাবনা হল যে চিন এই কারণে রাশিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবে। ইউক্রেনীয় বিশ্লেষক ভিটা গোলোড এই বিষয়টি খুবই সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন— “সম্প্রতি বেইজিং-এ সামরিক কুচকাওয়াজে যখন শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং উন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে চিন রাশিয়ার ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করবে না বা ইউক্রেনের সংজ্ঞায়িত শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ করবে না।”[63]

 

চিনকে কি ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি তার সমর্থন কমাতে রাজি করানো সম্ভব?

বাস্তবতা হল, চিনের ইউক্রেন নীতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম একমাত্র শক্তি হল পশ্চিমি ব্লক।

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের ১৯তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ গ্রহণ করে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ও তেল রপ্তানি, এবং এগুলো পরিবহনকারী তথাকথিত “ঘোস্ট ফ্লিট”কে লক্ষ করে আরোপ করা হয়। এই প্যাকেজে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ১৭টি তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য; এর মধ্যে ১২টি ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু হল চিন এবং হংকং।[64]

যে সময়ে এই ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞাগুলো আরোপিত হচ্ছে সেই একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র দুটি বড় রুশ তেল কোম্পানি— রসনেফট এবং লুকঅয়েল-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ট্রাম্প জমানায় এরকম পদক্ষেপ এই প্রথম। এর সঙ্গে যদি ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি বাইডেন প্রশাসন যে দুটি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল— সারগাটনেফটগ্যাস এবং গাজপ্রম নেফট-কে যোগ করা হয়, তাহলে দেখা যায় যে বর্তমানে রাশিয়ার ৮০ শতাংশেরও বেশি তরল হাইড্রোকার্বন উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।[65]

তাত্ত্বিকভাবে চিনের ওপর এই পদক্ষেপগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার কথা ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে রাশিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে, যা চিনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ।[66] তবে ২০২২ সালের শেষ দিকে ইইউ রাশিয়া থেকে সব ধরনের তেল আমদানি বন্ধ করার পর থেকে রাশিয়ার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৪৭ শতাংশ চিন কিনেছে, আর ভারত কিনেছে আরও ৩৮ শতাংশ।[67]

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলস্বরূপ চিনের বড় রাষ্ট্রায়ত্ত তেলশোধনাগারগুলি রাশিয়ার তেল কেনা সাময়িকভাবে স্থগিত করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, যদি তারা এই ক্রয় চালিয়ে যায় তবে তারা ওয়াশিংটনের “সেকেন্ডারি স্যাংশনস”-এর লক্ষ্য হতে পারে। যদি এই ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবে কার্যকর হয় এবং কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে তা ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালে রাশিয়ার বাজেট আয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এসেছে তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে।[68] ফলে এই রপ্তানি সীমিত করার উদ্দেশ্যে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকলে তা সরাসরি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে অর্থ জোগানোর ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

তবে পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম এবং রুশ বিরোধী সংবাদমাধ্যম— উভয়ই প্রশ্ন তুলছে যে ট্রাম্প আদৌ দীর্ঘমেয়াদে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে আগ্রহী কিনা।

সম্ভবত চিন এই নিষেধাজ্ঞাগুলো উপেক্ষা করতে পারে, যার ফলে— যেমন বলা হয়— যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলো কার্যত কেবল একটি প্রতীকী “কাগুজে বাঘ” হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার ওপর, রাশিয়া ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে যে তারা কীভাবে বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে বা তাদের তথাকথিত “ফ্যান্টম ফ্লিট” ব্যবহার করে তেল রপ্তানি চালিয়ে গিয়ে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারে।[69]

রুশ বিশেষজ্ঞ সের্গেই ভাকুলেঙ্কো, যিনি কার্নেগি পলিটিকা-তে কাজ করেন, তাঁর মতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার তেল উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না— যেমনটি বাইডেন প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। এছাড়া নিজস্ব জ্বালানি-চাহিদার কারণে চিন সম্ভবত ভবিষ্যতেও রাশিয়ার তেল কেনা চালিয়ে যাবে। তবে সত্যিই যদি দীর্ঘমেয়াদে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়, তাহলে মস্কোর তেল রপ্তানি প্রতিদিন প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে এবং এর ফলে রাশিয়ার বিদেশি মুদ্রা আয় প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।[70]

২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় যে বৈঠক হয়েছিল সেখানে ট্রাম্প এবং শি জিনপিং–এর মধ্যে চিনের রাশিয়ান হাইড্রোকার্বন ক্রয় নিয়ে কোনও আলোচনা হয়েছে— এমনটি মনে হয় না।[71] প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু বলেছিলেন যে তিনি এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর চিনা কাউন্টারপার্টের সঙ্গে “কাজ চালিয়ে যাবেন”। তবে শি জিনপিং এ-বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি।[72] ফলে এই মুহূর্তে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে চিন রাশিয়ার ওপর কোনও চাপ প্রয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চিন-রাশিয়া সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টাও এখনও পর্যন্ত সফল হয়নি।[73]

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের ক্ষেত্রে এখনও একটি ব্যবসায়ীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি ইউক্রেন ও রাশিয়া— উভয়ের সঙ্গেই অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, এবং এক ভূ-কৌশলগত নীতি যা ইউক্রেন ও ইউরোপের নিরাপত্তা জোরদার করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিত, তাকে উপেক্ষা করছেন। মনে রাখতে হবে, ২০২৫-এর ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের মধ্যে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের যৌথ আহরণ নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে আর্কটিক অঞ্চলে জ্বালানি সম্পদ ব্যবহার করার সম্ভাব্য সহযোগিতা প্রকল্প নিয়ে অগ্রগতি ঘটাচ্ছিল।[74]

সার্বিকভাবে বলা যায়, পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞাই একমাত্র সম্ভাব্য উপায় যা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার প্রতি চিনের সমর্থনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা তাদের পরিধির ওপর নয়, বরং কতটা ধারাবাহিকভাবে এবং কঠোরভাবে সেগুলো প্রয়োগ করা হয় তার ওপর বেশি নির্ভর করে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সাময়িকভাবে চিনকে কিছুটা সতর্ক করলেও এগুলো বেইজিংয়ের মস্কোর সঙ্গে মৌলিক কৌশলগত বোঝাপড়াকে পরিবর্তন করতে পারেনি এবং রাশিয়ার ওপর স্থায়ী চাপও সৃষ্টি করতে পারেনি। যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদে দৃঢ় রাজনৈতিক সঙ্কল্পের অভাব থাকে, তবে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল প্রতীকী হয়েই থেকে যাবে এবং সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে চিন রাশিয়ার সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার যথেষ্ট স্বাধীনতা পাবে এবং এই সম্পর্কের ওপর পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করার সম্ভাবনাও সীমিতই থেকে যাবে।

 

উপসংহার

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের চার বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও যুদ্ধক্ষেত্র এবং কূটনৈতিক— দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি কার্যত অচলাবস্থায়। পুতিনের অনমনীয়তা ও অনাস্থাপূর্ণ আচরণের মুখে ইউরোপীয় দেশগুলো ও ইউক্রেন দৃঢ় বিরোধিতা বজায় রেখেছে। ট্রাম্প হতাশ, যিনি পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাইছেন।

এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বুদাপেস্ট শীর্ষ বৈঠক বাতিল করার সিদ্ধান্ত এবং পরে রুশ তেল কোম্পানি লুকঅয়েল ও রসনেফট-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই স্মারকের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে সংঘাতের তথাকথিত “মূল কারণ” স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।[75] আরেকটি কারণ ছিল মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিও এবং তাঁর রুশ কাউন্টারপার্ট সের্গেই লাভরভের মধ্যে একটি ফোনালাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই কথোপকথনে লাভরভ অত্যন্ত “অনমনীয় সুর” গ্রহণ করেছিলেন।[76]

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি পুনরায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে প্রস্তুত, কিন্তু রাশিয়ার দাবিমতো দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করতে তারা রাজি নয়।

ভেনেজুয়েলাতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন কিয়েভে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে ওয়াশিংটন এবার হয়তো রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত সমাধানের ব্যাপারে আগ্রহ হারাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ ক্রেমলিনকে ইউক্রেনে আরও অবাধ করে তুলতে পারে, সেটাই আশঙ্কার কারণ। আরও দুশ্চিন্তা— যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে— যেখানে বিশ্বকে বড় শক্তিগুলোর “প্রভাবক্ষেত্র”-এ ভাগ করে দেখা হবে এবং মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে।

চিন বর্তমানে শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নিতে কোনও নির্দিষ্ট বা বাস্তব উদ্যোগ নিচ্ছে না; তারা মূলত আন্তর্জাতিক আইনের প্রধান নীতিগুলো পুনরাবৃত্তি করেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে একই সঙ্গে বেইজিং এমন অবস্থান নিচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে যদি কোনও যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, তাহলে তা থেকে যেন তারা সুযোগ নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে তাঁর ইউক্রেনীয় কাউন্টারপার্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই সম্মেলনে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশ এবং নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ কাইয়া কালাস-কে আশ্বস্ত করেন যে “চিন শান্তির জন্য সহায়ক সব প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং ইউক্রেন নিয়ে শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়ায় ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা উচিত।”[77] চিন ইউক্রেনে জাতিসংঘের ম্যান্ডেটের অধীনে কোনও শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেনি। তবে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেননি, কারণ তাঁর মতে বেইজিং মস্কোকে সমর্থন করছে।[78] যুদ্ধ শেষ হলে ইউক্রেন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও চিন গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।[79]

যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় চিনের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারে— কারণ বেইজিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রতিযোগিতামূলক। এবং ইইউ-ও চিনের বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নীতির প্রতি সন্দিহান। এই নীতিতে প্রায়ই ইউরোপীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যা ইউরোপের স্বার্থের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।[80] তবুও পশ্চিমি দেশগুলোর উচিত ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় চিনের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা।[81] রাশিয়া হয়তো চিনের এই ভূমিকাকে স্বাগত জানাবে না, কিন্তু শান্তি আলোচনায় আরেকটি বড় শক্তিকে যুক্ত করলে কিয়েভ এবং মস্কো— উভয়কেই যুদ্ধবিরতির দিকে দ্রুত এগোতে চাপ দেওয়া যেতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে বেইজিং এখনও সেই পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত নয়।

 


[1] Irish, John. US backs security guarantees for Ukraine at summit of Kyiv’s allies in Paris. Reuters. Jan 7, 2026.
[2] Hill, Fiona. Fiona Hill: ‘The US is giving Russia tremendous influence over Europe’. Le Monde. Nov 22, 2025.
[3] Andrieu, Pierre. China-Russia Relations Since the Start of the War in Ukraine. Asia Society. Aug 20, 2025.
[4] ২০২৪-এ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রধানত চিন থেকে আমদানি, ইউক্রেনের রপ্তানি ছিল মাত্র ২.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-এর প্রথমার্ধ এই গতিকে আরও নিশ্চিত করেছে— চিনে ইউক্রেনের রপ্তানি ৪৭ শতাংশ কমে গেছে, যেখানে চিন থেকে আমদানি বেড়েছে ২৬.৮ শতাংশ। Golod, Vita. Sino-Ukrainian Trade: Strategic Trade and Geopolitical Balancing. China Observers. Oct 13, 2025.
[5] US’ Venezuela Gambit Hits Russian Interests, Influence. Energy Intelligence. Jan 15, 2026.
[6] Sauer, Pjotr. From Grudging Respect to Unease: Russia Weighs Up Fall of Maduro. The Guardian. Jan 5, 2026.
[7] Foreign Ministry Statement Regarding Further Developments around Venezuela. The Ministry of Foreign Affairs of the Russian Federation. Jan 3, 2026.
[8] US Military Action in Venezuela is Seen as Both a Blessing and a Curse for Russia’s Putin. AP News. Jan 7, 2026.
[9] Shumilin, Oleksandr. Russian Propagandist Demands ‘New Military Operations’ in Armenia and Asia. Ukrainska Pravda. Jan 12, 2026.
[10] দ্রষ্টব্য, টীকা ৬।
[11] Oveckova, Paulina and Belmonte, Emma. Venezuela Uncovers the Limits of China’s Security Promise in Latin America. CHOICE. Jan 19, 2026.
[12] Cheng, Evelyn. China Decries U.S. Action in Venezuela – Even as It Guards Billions at Stake. CNBC. Jan 5, 2026.
[13] “ভেনেজুয়েলায় যে-ধরনের মার্কিন আগ্রাসন দেখা গেল, তাতে আর যা-ই হোক, লাতিন আমেরিকার আরও বেশি করে চিনের দিকে ঢলে পড়ার ঝুঁকিই বাড়বে। ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো-সহ আরও অনেক দেশ মাদুরো অপারেশনের তীব্র সমালোচনা করেছে। এতে মার্কিন-নিয়ন্ত্রণাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিষয়ে মোহ আরও কাটবে। আর এখানেই, চিন নিজের সুযোগ দেখতে পারে।” Ratigan, Kerry E. How is China Viewing US Action in Venezuela – An Affront, an Opportunity, or a Blueprint? The Conversation. Jan 15, 2026.
[14] Shkarlat, Kateryna. Zelensky Reacts to US Operation in Venezuela and Hints at Putin. RBC Ukraine. Jan 3, 2026.
[15] Kramer, Korbinian Leo. Analysis: Fiona Hill’s 2019 Remarks on Russia-Venezuela Deal Gain New Relevance. Kiev Post. Jan 7, 2026.
[16] Melkozerova, Veronika. Russia Bleeds Troops for Microscopic Frontline Gains. Politico. Oct 13, 2025.
[17] Russian Offensive Campaign Assessment. Institute for the Study of War (ISW). Dec 31, 2025.
[18] Lister, Tim and Vlasova, Svitlana. Russian Forces, Aided by Heavy Aerial Bombardments, Edge Forward in Ukraine. CNN. Oct 19, 2025.
[19] Vakulenko, Sergey. Have Ukrainian Drones Really Knocked Out 38% of Russia’s Oil Refining Capacity? Carnegie Politika. Oct 3, 2025.
[20] Conway, Chris. When Will This War End? Brig. Gen. Kevin Ryan Reports from Kyiv. Russia Matters. Oct 10, 2025.
[21] Prokopenko, Alexandra. The Cracks in Russia’s War Economy. Foreign Affairs. Oct 20, 2025.
[22] Bourdillon, Yves. Les Echos. Sep 16, 2025.
[23] Dickinson, Peter. Putin Aims to Destroy Ukraine and Has Zero Interest in a Compromise Peace. Atlantic Council. May 21, 2025.
[24] এই তথাকথিত “coalition of the willing”-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স, এবং এতে ৩০টিরও বেশি দেশ সামিল হয়েছে। পরিকল্পনা হল, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী সময়ে একটি বহুদেশীয় বাহিনী মোতায়েন করা। ২০২৬-এর প্রথমদিকে এ-বিষয়ে ঘোষণা করা হয়, বলা হয় এই বাহিনীর লক্ষ্য হবে শান্তি সুনিশ্চিত করা, ইউক্রেনীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির কোনওরকম লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা। যদিও রাশিয়া হুমকি দিয়ে রেখেছে যে এরকম কোনও বাহিনী এলে তারাও তাদের “বৈধ লক্ষ্যবস্তু” হতে পারে। দেখুন, Dixon, William and Beznosiuk, Maksym. Putin Cannot Accept Any Peace Deal that Secures Ukrainian Statehood. Atlantic Council. Jan 13, 2026.
[25] Wintour, Patrick. Trump Says He Believes Ukraine Can Regain All Land Lost to Russia since 2022 Invasion. The Guardian. Sep 24, 2025.
[26] The Kremlin’s Latest Red Line, Trump May be Close to Sending Tomahawk Missiles to Ukraine. Could They Change the Course of the War? Meduza. Oct 15, 2025.
[27] Birnbaum, Michael. Putin Demanded Ukraine Surrender Key Territory in Call with Trump. Washington Post. Oct 18, 2025.
[28] Slattery, Gram. Balmforth, Tom and Mason, Jeff. Trump Urged Ukraine’s Zelensky to Make Concessions to Russia in Tense Meeting, Sources Say. Reuters. Oct 20, 2025.
[29] Cole, Brendan and Croucher, Shane. Russia Responds to Donald Trump’s New Proposal to End Ukraine War. Newsweek. Oct 20, 2025.
[30] Sabbagh, Dan; Rankin, Jennifer and Stewart, Heather. European Leaders Near Deal to Use Frozen Russian Assets for Ukraine. The Guardian. Oct 20, 2025.
[31] Korolev, Alexander. By Delaying a Decision on Using Russia’s Frozen Assets for Ukraine, Europe Is Quietly Hedging Its Bets. The Conversation. Nov 16, 2025.
[32] Vinocur, Nicholas. EU Pushes Back on Trump’s Demand Ukraine Cede Territory to Putin. Politico. Oct 20, 2025.
[33] Andrieu, Pierre. China-Russia Relations Since the Start of the War in Ukraine. Asia Society Policy Institute. Aug 20, 2025.
[34] পূর্বোক্ত।
[35] Sim, Dewey. Chinese Envoy’s Europe Trip a ‘Search for Common Ground’ on Ukraine War, Analysts Say. South China Morning Post. May 31, 2023.
[36] দ্রষ্টব্য, টীকা ৩৩।
[37] Ukraine’s Zelensky Dismisses ‘Destructive’ China-Brazil Peace Initiative. Reuters. Sep 12, 2024.
[38] “২০২৪-এর জুনে ইউক্রেনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সুইজারল্যান্ডে গ্লোবাল পিস সামিটে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ চিন প্রত্যাখ্যান করে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন এবং শাংরি-লা আলোচনার সময়ে তাঁর এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইউক্রেনীয় এবং পশ্চিমি অভিজাতরা চিনের এই সিদ্ধান্তকে একটি রুশ-পক্ষীয় অবস্থান বলে বর্ণনা করেন, যার লক্ষ্য হল সংঘাত অব্যাহত রাখা। তাঁদের মতে এই পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন মোড় আনতে পারে যেখানে কূটনৈতিক সংকট গভীরতর হবে।” দেখুন: Golod, Vita and Drobotiuk, Olga. Tracing the Path of Sino-Ukrainian Relations: From the Post-Soviet Era to the Russo-Ukrainian War. Journal of Contemporary China, Jan 4, 2025.
[39] Bermingham, Finnbarr. China Tells EU It Does Not Want to See Russia Lose Its War in Ukraine. South China Morning Post. Jul 4, 2025; মারিও নফল জেলেনস্কিকে উদ্ধৃত করেছেন: “আমি একটা জিনিস জানি, চিন রাশিয়াকে সাহায্য করছে…।” X. Feb 5, 2026.
[40] Brothers Forever: Unpacking the Conundrum of China-Russia Relations. Asia Society Policy Institute.
[41] Harmash, Olena. Zelenskiy Says That at Least 155 Chinese Nationals Fighting on Russia’s Side. Reuters. Apr 9, 2025.
[42] Poita, Yurii. Results of the 20th Congress of the Communist Party of China and Its Implications for Ukraine and the Russian-Ukrainian War. New Geopolitics Research Network. Jan 10, 2023; Poita, Yurii. China’s ‘Formal Neutrality’ on the Russia-Ukraine War: Implications for Ukraine. New Geopolitics Research Network. Jan 10, 2023.
[43] Spencer, Katherine. US Voices Concern Over Chinese Support for Russia Ukraine’s Invasion. Atlantic Council. Oct 23, 2025.
[44] “২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২২-এ সেটা নেমে আসে ১১.৩ বিলিয়ন ডলারে, প্রায় ৪২ শতাংশ পতন ঘটে। এই পতনের কারণ হতে পারে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ, লজিস্টিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া এবং চিনের বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রাধান্যের পরিবর্তন।… ২০২৩-এর পরে চিন এবং ইউক্রেনের বাণিজ্য আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, ২০২৩-এ আংশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২.৮ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে, যাতে বোঝা যায় নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ইউক্রেন মানিয়ে নিতে শুরু করেছে।” Simonov, Mykyta. China-Ukraine Relations and the Belt and Road Initiative: Challenges and Future Prospects. Research in Globalization, Dec 2025; “২০২৩-এর মধ্যে চিন ইউক্রেনের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। ওই বছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ইউক্রেনের আমদানি ১০.৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ২.৪১ বিলিয়ন ডলার।” Golod, Vita and Drobotiuk, Olga. Tracing the Path of Sino-Ukrainian Relations: From the Post-Soviet Era to the Russo-Ukrainian War. Journal of Contemporary China. Jan 4, 2025.
[45] Henley, Jon and Rankin, Jennifer. China Rows Back After Envoy Denies Sovereignty of Former Soviet States. The Guardian. Apr 24, 2023.
[46] China Names Combative Diplomat as Senior Envoy for Europe. Reuters. Feb 6, 2025.
[47] Golod, Vita. Sino-Ukrainian Relations: Strategic Trade and Geopolitical Balancing. China Observers in Central and Eastern Europe (CHOICE). Oct 13, 2025.
[48] Cai, Vanessa. China’s New Ukraine Envoy Ma Shangkun ‘Full of Confidence’ About Deeper Ties. South China Morning Post, Nov 21, 2024.
[49] China Signs Agreements to Open Market for Ukrainian Peas and Wild Aquatic Products. Global Times. Mar 07, 2025.
[50] Reuters. China’s Chengxin Submits Bid for Ukraine Lithium Deposits. Mining.com. Nov 29, 2021.
[51] Chigadaev, Aleksei. Chinese Pragmatism. Riddle. Oct 8, 2025.
[52] Kushnikov, Vadim. Ukraine Buys 60% of the World’s Mavic Drones. Militarnyi. Oct 13, 2023. Mavic মডেল হল ব্যক্তিগত এবং বাণিজ্যিক এরিয়াল ফটোগ্রাফি এবং ভিডিওগ্রাফি করার জন্য দূরনিয়ন্ত্রিত কম্প্যাক্ট কোয়াডকপ্টার ড্রোনের একটি সিরিজ। এটি তৈরি করে চিনা টেকনোলজি কোম্পানি DJI.
[53] Vasilevich, Sergei. Ne tol’ko drony: kak Kitai torguet s Ukrainoi. Kommersant Ukraine. Oct 27, 2025. Kommersant Ukraine ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়ান হোল্ডিং কোম্পানি Kommersant-এর অংশ ছিল, যখন সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ থেকে এই কাগজটি রুশ ভাষায় প্রকাশিত হলেও পুরোদস্তুর একটি ইউক্রেনীয় সংস্থা, তার সঙ্গে মস্কোর Kommersant-এর কোনও সম্পর্ক নেই।
[54] Nardelli, Alberto and Krasnolutska, Daryna. China Cut Drone Sales to West but Supplies Them to Russia, Ukraine says. Bloomberg. May 29, 2025.
[55] চিনা পরিসংখ্যান অবশ্য ইউক্রেনীয় ডেটার সঙ্গে মেলে না, তবে সেই পরিসংখ্যানে যেসব চিনা পণ্য তৃতীয় দেশ ঘুরে ইউক্রেনে পৌঁছায় সেগুলিও ধরা হয়েছে। Golod, Vita and Yefremov, Dmytro. How Ukraine Views Its Relations with China. The Diplomat. Sep 27, 2025.
[56] পূর্বোক্ত।
[57] দ্রষ্টব্য, টীকা ৪৭।
[58] তাঁদের মধ্যে একজন, যিনি চিনে কাজ করেন, একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা জানান— চিনা এবং ইউক্রেনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলগুলির যৌথ গবেষণার একটি প্রস্তাব এসেছিল, যা উভয়পক্ষের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।
[59] Lau, Stuart. China’s Xi Warns Putin Not to Use Nuclear Arms in Ukraine. Politico. Nov 4, 2022; Ministry of Foreign Affairs of PRC. Wang Yi Elaborates on China’s Position on Ukraine Crisis. News release. Feb 18, 2024.
[60] Sorensen, Camilla T. N. Sino-Russian Alignment Stopping at the Nuclear Threshold. Center for European Policy Analysis (CEPA). Aug 26, 2025.
[61] China-Russia Dashboard: A Special Relationship in Facts and Figures. Mercator Institute for China Studies (MERICS).
[62] Russia-China Trade Falls 9% in First Half of 2025. Moscow Times. Jul 14, 2025.
[63] দ্রষ্টব্য, টীকা ৪৭।
[64] EU Adopts 19th Package of Sanctions Against Russia. European Commission. Oct 23, 2025,
[65] Roth, Andrew. US Imposes Sanctions on Russian Oil Over Putin’s ‘Refusal’ to End War in Ukraine. The Guardian. Oct 23, 2025.
[66] US Sanctions on Russian Oil Giants Send Shockwaves Across China. Bloomberg News. Oct 23, 2025.
[67] Standish, Reid. How Might China Respond to US Sanctions on Russia’s Biggest Oil Companies? Radio Free Europe/RadioLiberty. Oct 24, 2025.
[68] Duesterberg, Thomas. The U.S. Is Poised to Rock Russia and China – If It Holds Firm. The Washington Post. Oct 28, 2025.
[69] “অন্তত কিছু ক্ষেত্রে বেইজিং পশ্চিমের সঙ্গে তার যৌথ কার্যক্রমগুলির বিপরীতে সস্তা রুশ তেলের মধ্যে কোনটা বেশি লাভজনক হচ্ছে তা মেপে দেখবে। উদাহরণস্বরূপ, ডাকিং-এর নর্দার্ন সিটির শোধনাগারগুলি রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল— বিশেষ করে, রসনেফট এবং চিনের রাষ্ট্রীয় চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে পাইপলাইন দিয়ে যে এসপো-গ্রেড তেল আসে। এই সরবরাহ দিনে প্রায় ৮ লক্ষ ব্যারেল, এবং এই ধরনের প্রকল্পের আন্তঃ-সরকারি চরিত্র একে কিছুটা সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।” Trump Goes There, Lukoil and Rosneft Account for Half of Russia’s Oil Exports. Now Both Are under U.S. Sanctions. Meduza. Oct 23, 2025.
[70] Vakulenko, Sergey. Will Trump’s Sanctions Make a Dent in Russia’s Oil Exports? Carnegie Politika. Oct 28, 2025.
[71] Standish, Reid. Trump Said That He and Xi Did Not Bring Up China Buying Russian Oil, Which Moscow Has Used to Help Fund Its War. Radio Free Europe/Radio Liberty. Oct 30, 2025.
[72] Zadorozhnyy, Tim. Trump Says Xi Agrees to ‘Work Together’ with US on Ending Russia’s War Against Ukraine. MSN. Oct 30, 2025.
[73] “যুক্তরাষ্ট্র এমন মৌলিক কিছু করেনি, যার জন্য চিন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে। তারা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চয়তা দিতে পারে যে চিনের প্রযুক্তিগত বিকাশে তারা কোনওরকম বাধা দেবে না; বা মার্কিন উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য তারা চিনে রপ্তানি করতে দেবে; বা তারা চিনের জন্য তাদের বাজার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেবে; বা চিনের বলপ্রয়োগে তাইওয়ান পুনর্দখল-প্রচেষ্টায় তারা নাক গলাবে না। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এসব কিছুই হয়নি।” Gabuev, Alexander. Russia is a Superpower of the Past. Meduza, Oct 31, 2025.
[74] Busvine, Douglas. Russia and US Eye Joint Arctic Energy Projects After Saudi Talks. Politico. Feb 20, 2025.
[75] যেমন আমরা জানি, মস্কোর কাছে “মূল কারণ” হল ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ।
[76] Trump-Putin Summit Cancelled After Moscow Sent Memo to Washington, FT Reports. Reuters. Oct 31, 2025.
[77] Wang Yi Meets with Ukrainian Foreign Minister Andrii Sybiha. Ministry of Foreign Affairs of the People’s Republic of China. Feb 13, 2026.
[78] China Signals Readiness to Send Peacekeepers to Ukraine – Welt. Ukrainska Pravda. Aug 23, 2025.
[79] Szczudlik, Justyna. China Is Gearing Up for a Post-War Ukraine. The Diplomat. May 23, 2025.
[80] Legarda, Helena and Soong, Claus. Interest First: China’s Playbook for Post-Conflict Reconstruction and Implications for Ukraine. China Horizons. Oct 30, 2025.
[81] Graham, Thomas and Liu, Zongyuan Zoe. The Role of China in Ukraine. Taipei Times. May 18, 2025.

 


*নিবন্ধটি এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট-এ গত ২ মার্চ ইংরেজিতে প্রকাশিত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5355 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...